অন্ধকার কুঠুরির বিভীষিকা
অন্ধকার কুঠুরির বিভীষিকা
অন্ধকার কুঠুরির বিভীষিকা কম্বলটা ভালো করে গায়ের সাথে জড়িয়ে নিয়ে... জানলার পাশে জুত করে বসল দীপিকা।মন ভরে উপভোগ করতে লাগল ছুটন্ত প্রকৃতির মনোহর সৌন্দর্য। চারপাশে ছুটে চলেছে ঘরবাড়ি...ধানের ক্ষেত...বন জঙ্গল...গাছগাছালি...। সূয্যিমামা পশ্চিম আকাশে ডুব দিতে শুরু করেছে একটু একটু করে।একটা সিঁদুর রাঙা লালচে আভা... আকাশটাকে যেন পরম আদরে স্নান করিয়ে চলেছে আপন খেয়ালে। ট্রেনের জানলার ভিতরে বসে বসে... প্রকৃতির এমন ছন্দ পূর্ণ সৌন্দর্যে এখন পুরোপুরি মগ্ন হয়ে রয়েছে দীপিকা। এমন সময়ে... হাতের মোবাইল ফোন টা নিয়ে ফটফট করে বেশ কতগুলো ছবি তুলে নিল দীপিকা।ছবি তুলতে তুলতে বলে উঠল..."কি মাইন্ডব্লোইং সিনারি...না রে বর্শা...এই ছবি আমি আমার ফেসবুক প্রোফাইলের কভার পিকচার বানাব।" হঠাৎ পাশ দিয়ে কর্কশ গলায় চা ওয়ালা হাঁক দিতে শুরু করল। "চায়ে গরম...চায়ে গরম...চায়ে গরম...।" সাথে সাথে উত্তেজিত কন্ঠে ঋক বলে উঠল..."যাক... এতক্ষণ বাদে দেবদূতের দেখা পাওয়া গেল যেন...চা চেষ্টায় গলা এক্কেবারে শুকিয়ে এসেছিল।অ্যাই...তোরা সবাই চা খাবি তো এখন?আমি পাঁচটা দিতে বলি তাহলে।" ঋকের কথা শুনে দীপিকা, মধুরিমা, বর্ষা আর প্রীতম সমস্বরে বলে উঠল..."হ্যাঁ হ্যাঁ...জলদি বল...গরম গরম চা হয়ে যাক...!" হৈ হৈ করে চায়ের কাপ হাতে নিতে নিতে বর্ষা,প্রীতম মধুরিমা আর ঋক সমস্বরে বলে উঠল..."চিয়ার্স।" বর্ষা চায়ের পাত্রে সুড়ুৎ সুড়ুৎ করে আয়েশের চুমুক দিতে দিতে...অন্য হাতে আরেকটি চায়ের পাত্র ধরে... দীপিকাকে ঠেলা দিয়ে বলে উঠল..."ওরে আমার কবি... আপনি আপনার ভাব থেকে একটুখানি বেরিয়ে এসে এই চায়ের কাপটা হাতে নেওয়ার দাক্ষিণ্য করবেন?" বর্ষার রসিকতায় সকলে হো হো করে হেসে উঠল। হঠাৎ ঘোর কেটে গিয়ে বাস্তবে ফিরে এল যেন দীপিকা। "আহা ওরকম করে ওকে টোন কাটিস না বর্ষা... আমাদের এই ব্যাচটায় ও ই কিন্তু সবচেয়ে বেশি হার্ড ওয়ার্ক করে।" বলে উঠল প্রীতম। মধুরিমা বলে উঠল..."যা বলেছিস...সারা বছর পড়াশোনার চাপে আমরা সবাই ভুলতেই বসেছি... গুচ্ছের প্রজেক্ট,মোটা মোটা বই... রিসার্চের বাইরেও একটা মস্ত পৃথিবী রয়েছে। জীবনটাকে উপভোগ করার কত্ত সুন্দর সুন্দর উপায় রয়েছে... জীবনের সবচেয়ে সুন্দর সময়টা শুধু রাজ্যের ব্যস্ততা আর পড়াশোনার প্রেসারেই ঠাসা।রাবিশ।" একটা লম্বা দীর্ঘশ্বাস ফেলল মধুরিমা। ধোঁয়া ওঠা গরম কফির কাপে লম্বা চুমুক দিয়ে ঋক বলে উঠল..."এই কটাদিন রিসার্চ করার অছিলায় হলেও... একটা দুর্দান্ত ট্রিপের বন্দোবস্ত কিন্তু হয়ে গেল...কি বল?" ---"একদম...থ্যাংকস টু বাবা... আমাদের জন্য এই পুরো অ্যারেঞ্জমেন্ট করার জন্য। রিসার্চের জন্য আমাদের সবাইকে এই শীতে... একটা পাহাড়ি জঙ্গলে পাঠিয়ে দেবে বাবা...এটা প্রথমটায় আমার একেবারেই বিশ্বাস হয়নি। কিন্তু এখন আমার মনে হচ্ছে... বাবাকে গিয়ে জড়িয়ে ধরে বলি...আই লাভ ইউ বাবা...!" আদুরে গলায় বলে উঠল বর্ষা। বর্ষার কাঁধে একটা চাটি মেরে মধুরিমা এবার বলে উঠল..."তবে যে সবসময় মন খারাপ করে থাকিস...বলিস...কাকু একটুও ভালোবাসেন না তোকে... পুরো ঘরে একটা বাড়তি জঞ্জাল ছাড়া নিজেকে আর কিছুই মনে হয় না তোর... এখন বুঝতে পারছিস...তোর ধারনা কত ভুল ছিল...এই প্রোজেক্টটা কিন্তু আমাদের এই বছরে না করলেও চলত। স্রেফ তোর মন ভালো করার জন্যই তিনি পি.এইচ.ডি র প্রথম বছরেই এই আয়োজনটা করলেন।" প্রীতম মধুরিমাকে সমর্থন করে বলে উঠল..."একদম...মধু একদম ঠিক কথা বলছে।তুই কাকুকে বরাবরই ভুল বুঝেছিস বর্ষা...ওরে...কোনো বাবা তার নিজের মেয়েকে তাচ্ছিল্য করতে পারে বিনা কারণে!উনি আমাদের কলেজের প্রিন্সিপাল।কত দায়িত্ব বল তো ওনার মাথায়!এত দায়িত্ব সামলে...উনি ঘরে ফিরে তোর সাথে দুটো কথা বলার সময়টুকু হয়তো করে উঠতে পারেন না... কিন্তু দ্যাখ...তুই যাতে খুশি থাকিস...তার জন্য রিসার্চের নাম করে আমাদের সব্বার জন্য এই শীতে কি সুন্দর বেড়ানোর বন্দোবস্ত করে দিলেন...!" ---"আমি তো বাবা এই কটাদিন শুধু চুটিয়ে এনজয় করব। প্রথম বছরেই পড়াশোনার এত চাপ...তো এর পরের বছরগুলোতে তো কোনোদিকে তাকানোরই অবকাশ পাব না।আমি পাহাড়ের গায়ে গুছিয়ে বসে... সুন্দর করে কবিতা লিখব।" বলে উঠল দীপিকা। ---"ওরে আমার কবি...আমরা ওখানে আমাদের সাহিত্য চর্চার জন্য পাঠানো হয়নি...আর্কিওলজি র রিসার্চের জন্য পাঠানো হয়েছে।আরে পুরোন...ঐতিহাসিক মন্দিরে ঘুরে ঘুরে রিসার্চ করবার মজা কিছু আলাদা...আর উপরি পাওনা...এই প্রজেক্টটার জন্য আমাদের এখনই খুব একটা চাপ নেই।অতএব... আমাদের এই ট্যুর টা দারুন ইন্টারেস্টিং হতে চলেছে বস... একবার ফিল্ডে নামি আমরা...ওসব কবিতা ফবিতা তখন আপনা থেকেই উবে যাবে তোর মাথা থেকে। পাঁচ বন্ধুর জমাটি গল্প আর আড্ডায়...সময় সুন্দর তালে...ছন্দে কাটতে থাকল...।কিন্তু হঠাৎ... যান্ত্রিক গোলযোগের জন্য ট্রেন একটা জায়গাতে দাঁড়িয়ে গেল।ব্যস... সেই যে ট্রেন দাঁড়িয়ে গেল...আর তার ভাবগতিক দেখে মনে হওয়ার উপায় নেই...এই অসময়ের নিদ্রাভঙ্গ করে...আর তার আদৌ এগোনোর কোনো ইচ্ছা রয়েছে...! কলকাতা থেকে পাঙ্গোট হিলস্টেশন পৌঁছতে মোটামুটি আঠারো ঘণ্টার মতো সময় লাগার কথা।কিন্তু এখন তো মনে হচ্ছে...দিন কয়েক মতো লেগে যাবে পাঙ্গোট স্টেশনে পা রাখতে। দুপুরের ট্রেনে রওনা দিয়েছিল পাঁচ বন্ধু। ট্রেন ঠিক সময়মতো চললে... এতক্ষণে ওদের লজে পৌঁছে ফ্রেশ হয়ে নেবার কথা...!অথচ সেই যে দাঁড়িয়ে পুরোপুরি নিদ্রামগ্ন হয়ে পড়েছে...আর তার নড়াচড়ার কোনো নামগন্ধ ই নেই। একনাগাড়ে বসে বসে থাকতে থাকতে পাঁচ বন্ধুর হাত পা ধরে যাওয়ার উপক্রম হল। একরাশ বিরক্তি পুঞ্জীভূত হয়ে রয়েছে ওদের প্রত্যেকের মনে। ---"ধুত্তোর...এ ট্রেনের আবার কিরকম ব্যামো ধরল বল দিকি...!এ তো দেখতে পাচ্ছি...পাঙ্গোট পৌঁছনোর আগেই আমরা সব বুড়ো হয়ে যাব...!" ব্যাজার মুখে বলে উঠল ঋক। ---"আরে শুনছিস না... ট্রেনের কিছু একটা যান্ত্রিক গোলযোগ হয়েছে।সবাই তো বলাবলি করছে...কখন ট্রেন ফের চলতে শুরু করবে...তার কোন ঠিক নেই। কি কুক্ষণে যে আমরা এই ট্রেনে উঠেছিলাম...!এখন তো মনে হচ্ছে... পৌঁছতে পৌঁছতে না মাঝরাত হয়ে যায়...!" মোবাইল টা জ্বেলে মধুরিমা বলে উঠল..."অলরেডি এখন রাত আটটা।আর আমরা আটকে রয়েছি অন্ধ্রপ্রদেশে। কোনো মানে হয়!" বহুক্ষণ ট্রেন এক জায়গায় আটকে দাঁড়িয়ে থাকার পর...ঢিকির ঢিকির করে দুলকি চালে চলতে শুরু করল অবশেষে।ট্রেন যখন চলতে শুরু করল... তখন পাঁচ বন্ধু যেন হাঁপ ছেড়ে বাঁচল। কিন্তু খানিক পরেই বোঝা গেল...ট্রেন চলতে শুরু করেছে বলেই নিশ্চিন্ত হওয়ার কোনো কারণ নেই। এরকম হাঁটি হাঁটি পা পা করে যে গোরুর গাড়িও চলে না...! ---"ট্রেন যতক্ষণে পৌঁছবে... ততক্ষণে আমাদের সমস্ত চুলগুলো নির্ঘাৎ পেকে যাবে।" একটা লম্বা হাই তুলে বলে উঠল ঋক। বর্ষা সে কথায় সায় দিয়ে বলে উঠল..."যা বলেছিস...অ্যাই শোন...আমি ঘুমিয়ে গেলাম।পাঙ্গোট পৌঁছনোর আগে অব্দি আমাকে কেউ ডাকবি না।" গোরুর গাড়ির চেয়েও শ্লথ গতিতে চলতে চলতে... ট্রেনটা শেষ পর্যন্ত যখন পাঙ্গোট স্টেশনে পৌঁছল...তখন ঘড়ির কাঁটা রাত বারোটা ছুঁই ছুঁই।লাগেজ টাগেজ গুছিয়ে নিয়ে... পাঁচ বন্ধু অবশেষে ট্রেন থেকে নেমে তো পড়ল... কিন্তু এই এত রাতে...লজ পর্যন্ত পৌঁছনোর জন্য কোনো গাড়ি পাওয়াটাই হয়ে উঠেছে দুষ্কর। স্টেশন চত্বরটা অস্বাভাবিক রকম শুনশান।চারপাশে নেমে স্টেশনে নামার পর...একটাও গাড়ির দেখা মিলছে না।রাত নামার সাথে সাথেই একটা রেল স্টেশন... রীতিমতো নিদ্রামগ্ন হয়ে পড়েছে পুরোপুরি!এটা তো বড় অস্বাভাবিক ব্যাপার! এতটাও গ্রাম্য স্টেশন এটা নয়।ছোটখাটো ট্যুর বা...ছুটি কাটানোর জায়গা হিসেবে পাঙ্গোট অনেকের কাছেই খুব পছন্দের একটি জায়গা।এরকম একটা জনপ্রিয় জায়গায় পৌঁছে...স্টেশনে নেমে...লজে পৌঁছনোর জন্য গাড়ির দেখা মিলবে না...এ তো বড় অপ্রত্যাশিত একটা ব্যাপার!একটু খোঁজ নিয়ে জানা গেল...কিছুক্ষণ আগে...কাছাকাছি একটা গাড়ি অ্যাক্সিডেন্ট করেছে। গাড়ির ড্রাইভার সহ যাত্রীরা সকলেই স্পট ডেড হয়েছে।তাই শোক পালনের জন্য রাতে সব গাড়ির সার্ভিস বন্ধ রয়েছে। লাগেজ পত্র নিয়ে এখন কোথায় যাবে...কি করবে... কিছুই ভেবে পাচ্ছে না ওরা। ওদের প্রত্যেকেরই পেটে ছুঁচো য় ডন মারছে। ---"ধুত্তোর...এই এত রাতে লাগেজ নিয়ে আমরা কোথায় যাই বল তো...আমাদের ট্রেন লেট আর এখানে গাড়ির অ্যাক্সিডেন্ট...সব একই দিনে হতে হল! বিরক্তি মাখা কন্ঠে বলে উঠল দীপিকা। ভারি লাগেজগুলোকে এক জায়গায় গুছিয়ে রেখে... প্রীতম বলে উঠল..."একটা গাড়ি না পাওয়া গেলে...লজ পর্যন্ত পৌঁছনো তো কোনোমতেই সম্ভব নয়।কাল সকাল পর্যন্ত এই কনকনে ঠান্ডায় জমে যেতে হবে আমাদের।আমি দেখছি...যদি একটা কোনো ব্যবস্থা করতে পারি...!" এ কথার প্রত্যুত্তোরে... ফিরে এল শুধু বাকি চার বন্ধুর সম্মিলিত দীর্ঘশ্বাস। প্রীতম গাড়ির সন্ধান করার জন্য পা বাড়াতে যাবে... সেই সময়ে ঋক বলে উঠল..."ছেড়ে দে ভাই... শুধু শুধু ছোটাছুটি ই সার হবে।তার চেয়ে আজকের এই রাতটা আমরা স্টেশনেই কাটিয়ে দিই...গরম জামা আমাদের সবার কাছেই আছে।তাছাড়া আমার ব্যাগে দুটো মোটা বেডশিট রয়েছে। এত রাতে আর ফালতু ঝামেলায় যাস না... বরং আয়...আমার চাদরের ভিতরে ঢুকে একটু গা গরম করে নে...!" ---"ধুর... এইভাবে এই ঠান্ডায়... একটা গোটা রাত স্টেশনে কাটানো কি চাট্টিখানি কথা!একটু চেষ্টা করে দেখি... একান্ত ই আর উপায় করা না গেলে অগত্যা... স্টেশনেই রাত কাটাতে হবে আর কি...! এই বলে প্রীতম আর সেখানে না দাঁড়িয়ে... খড়ের গাদায় সূচ খোঁজার মতোই একটা গাড়ির সন্ধানে পা বাড়াল। ঋক আর কোনো কথা না বাড়িয়ে...হাতের চাদর খানা গায়ে ভালোমত জড়িয়ে নিল। তারপর ব্যাগ থেকে আরেকখানা মোটা চাদর বার করে বর্ষা আর মধুরিমার দিকে এগিয়ে দিয়ে বলল..."নে...এটা তোরা দুজনে ভাগাভাগি করে ভালো করে গায়ে জড়িয়ে নে...যা ঠান্ডা... শুধু সোয়েটারে আর শীত মানছে না...! দীপিকা, বর্ষা, মধুরিমা আর ঋক চারজনেই মোটা বেডশিট গায়ে জড়িয়ে রীতিমতো ঠকঠক করে কাঁপছে শীতে। হঠাৎ এমন সময়ে... ঋকের মোবাইল বেজে উঠল।এখন শীতে ওর যেরকম জবুথবু অবস্থা...তাতে চাদরের ভিতর থেকে বাইরে হাত বাড়িয়ে ফোন রিসিভ করার ইচ্ছা ওর মোটেই নেই।ফোনের চার্জ শেষ হয়ে আসায় পাওয়ার ব্যাঙ্কে চার্জ দিতে বসিয়েছে ঋক।চারপাশের নিস্তব্ধ বাতাস কাঁপিয়ে...ফোনটা বাজতে থাকল ঝনঝন করে। মধুরিমা বলে উঠল... "ফোনটা রিসিভ কর না... নিশ্চয়ই প্রীতম কল করেছে কোনো দরকারে...।" ---"হ্যাঁ... ঠিক বলেছিস।" ঋক ফোনটা রিসিভ করার জন্য ফোনটা হাতে নিল। মধুরিমা ঠিকই বলেছে। প্রীতম ই করেছে ফোনটা। ঋকের মনে একটা আশার আলো ফুটে উঠল। প্রীতম কি তাহলে কোন গাড়ির ব্যবস্থা করে ফেলল?এই কনকনে ঠাণ্ডা থেকে একটু নিষ্কৃতি পাওয়ার আশায় ওর চোখেমুখে যেন বিদ্যুতের একটা ঝলক দিয়ে উঠল।ও সাথে সাথে ফোনটা রিসিভ করে শশব্যস্ত কন্ঠে বলে উঠল... ---"কি রে... কোনো গাড়ি টাড়ি পেলি? ---"হ্যাঁ রে ভাই... একটা গাড়ি র খোঁজ পেয়ে গেলাম শেষ পর্যন্ত... কিন্তু সমস্যা তো বেঁধেছে অন্য জায়গায়। আমাদের লজের নাম শুনেই তো আর কিছুতেই সেখানে যেতে চাইছে না ড্রাইভার। আমার মনে হচ্ছে এর এত রাতে আর কোথাও যাওয়ার ইচ্ছাই নেই। এখন কিন্তু ওর আমাদেরকে নয়... আমাদেরই ওকে প্রয়োজন।যে করেই হোক ওকে রাজি করাতেই হবে।আমার একার কথায় আর চিঁড়ে ভিজবে না।তোরা সবাই এক্ষুনি চলে আয় এখানে।আমি অনেক কষ্টে ড্রাইভারকে কথা বলে আটকে রেখেছি।" প্রীতমের কথা শুনে...ঋক উত্তেজিত হয়ে বলে উঠল..."তাই নাকি? দাঁড়া দাঁড়া...আমরা সবাই এক্ষুনি আসছি।" ফোনটা রেখেই গা ঝাড়া দিয়ে উঠে দাঁড়িয়ে পড়ল ঋক।তারপর বাকিদের তাড়া দিয়ে বলে উঠল..."অ্যাই সবাই উঠে পড়।প্রীতম একটা গাড়ির খুঁজে পেয়েছে। কিন্তু ড্রাইভার গাঁইগুঁই করছে।আমরা সবাই মিলে গিয়ে ধরলে পরে ঠিক যেতে রাজি হয়ে যাবে ড্রাইভার।বুঝলি?চল চল...আর দেরি করিস না তোরা।" ঋকের কথা শোনামাত্র দীপিকা, মধুরিমা আর বর্ষা তিনজনেরই তন্দ্রাচ্ছন্ন ভাবটা এক লহমায় কেটে গেল। এতক্ষণ ধরে এ ওর গায়ে নেতিয়ে পড়ে থাকা তিন মূর্তি... মূহুর্তের মধ্যে সচল হয়ে উঠল। তারপর পড়ি কি মরি করে দৌড় দিল প্রীতমের সাথে। স্টেশনের বাইরে বেরিয়ে এসে... খানিকটা হাঁটার পরে ওরা পৌঁছে গেল গাড়িটার কাছে।ঋক সমানে গাড়ির ড্রাইভারের কাছে কাকুতি মিনতি করে চলেছে... দ্বিগুণ টাকার অফার করে তাকে লজ পর্যন্ত নিয়ে যাওয়ার জন্য রাজি করানোর চেষ্টা করে চলেছে।কিন্তু ড্রাইভার লজের নাম শোনামাত্র শুধু ঋককে একটাই কথা বলে চলেছে।"আপনি গাড়ি থেকে নেমে যান বাবু।এখন ওখানে যাওয়া কোনোমতেই সম্ভব নয়।" স্টেশন থেকে বেরিয়ে... অনেকটা পথ হাঁটতে হাঁটতে এই গাড়িটা দেখে হাত নেড়ে থামিয়েছিল ঋক।গাড়ি দাঁড়াতে...ঋক ড্রাইভারের সাথে লজে পৌঁছে দেওয়ার জন্য কথাটথা সেরে নিয়ে... গাড়িতে উঠে পড়েছিল।বাকি বন্ধুদেরকে গাড়িতে তুলে নেওয়ার জন্য...স্টেশনের দিকেই স্টার্ট নিয়েছিল গাড়িটা।কিন্তু কিছুদূর এগোনোর পরেই... ড্রাইভার ঋকের কথা শুনে বুঝতে পারল... লজের নামটা শুনতে আগাগোড়াই ভুল করেছিল।লজের নামটা যখন ঠিকভাবে কর্ণগোচর তার... তারপর থেকেই সে গাড়ি মাঝপথে থামিয়ে দিয়ে পুরোপুরি বেঁকে বসল।না...রাতের অন্ধকারে ওই লজের পথে কিছুতেই পা দেবে না সে। একেবারে গোয়ার ষাঁড়ের মতোই গাড়ি থামিয়ে মাঝরাস্তায় দাঁড় করিয়ে বলে উঠল সে কথা। মাঝরাতে পাঁচজন স্টেশনে পৌঁছে এরকম পরিস্থিতিতে পড়েছে শুনে...এই রাতে ওদের গন্তব্যে পৌঁছে দিতে রাজি হয়েছিল সে। কিন্তু ওরা যে লজে যেতে চায়... সেই লজের নাম স্পষ্ট করে যখন বোধগম্য হল তার...তখনই সে পুরোপুরি বেঁকে বসল।বলল...ওই লজে পৌঁছনোর জন্য যে রাস্তা দিয়ে গাড়ি নিয়ে যেতে হবে... সেই পথে দিনের আলো নেভার পরে পা রাখলেই বিপদ। আগামী এক বছর ধরে এই নিয়ম জারি হয়েছে গোটা এলাকায়।আর ওই লজে গাড়ি নিয়ে পৌঁছনোর জন্য অন্য কোনো বিকল্প রাস্তাও নেই।অন্য লজ যদি হত... তাহলে কোন যেতে কোনো সমস্যা ছিল না।ওই লজে পৌঁছতে হলে... দিনের আলো ফোটা পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে।এছাড়া আর কোনো উপায় নেই। কলকাতা থেকে নেট খুঁজে ওই লজ বুক করা হয়েছে। এখন এত রাতে এই পরিস্থিতিতে পড়বার পর ঋক জানতে পারল...ওই লজের ব্যবসা ইদানিং ভীষণভাবে মার খাচ্ছে। আগামী এক বছর ধরে এইরকমই যাবে। দিনের আলো নিভে যাওয়ার পর ওই লজের রাস্তায় আর পা রাখছে না কেউই।এসব যদি আগে জানা থাকত... তাহলে প্রিন্সিপাল স্যার নিশ্চয়ই ওই লজ বুকিং না করে...অন্য লজ বুক করতেন। কিন্তু এখন কি উপায়!এখন এই নির্জন আঁধার রাতে...এই গররাজি ড্রাইভারই একমাত্র ভরসা।একেই রাজি করাতে হবে...যেমন করেই হোক। গাড়ির ভেতরে জেদি এবং অনড় বাচ্চার মতো গোঁ ধরে বসে রইল ঋক।বন্ধুদের কে ফোন করে ডাক দিল।ওরা যতক্ষণ না পর্যন্ত এখানে এসে পৌঁছাচ্ছে... ততক্ষণ পর্যন্ত কিছুতেই গাড়ি থেকে নামবে না ঋক। শেষ পর্যন্ত পড়ি কি মরি করে দৌড়তে দৌড়তে ছুটে এল দীপিকা বর্ষা মধুরিমা আর প্রীতম।ওদিকে গাড়ির ভিতরে ঋক এমনভাবে গোঁজ হয়ে বসে রয়েছে...যে গাড়ি নিয়ে ড্রাইভার তাড়াতাড়ি করে স্হান পরিত্যাগ করবে... সেই পথটাও আপাতত বন্ধ।গাড়ি থেকে নেমে যাওয়ার জন্য ঋকের ওপরে সে এমনভাবে তর্জন গর্জন করতে শুরু করে দিয়েছে... যেন গাড়ি থেকে কোনো জঞ্জাল উৎখাত করতে চাইছে।ইতিমধ্যে বর্ষা মধুরিমা দীপিকা আর প্রীতম ও গাড়ির ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে... ড্রাইভারের কাছে কাকুতি মিনতি করা আরম্ভ করে দিল।এই ঠান্ডায়... এইভাবে ঘরের বাইরে থেকে রাত কাটানো টা সত্যিই খুবই কষ্টকর।ওদের পাঁচ জনের কাকুতি মিনতিতে... অবশেষে শেষ পর্যন্ত মন গলল ড্রাইভারের।আর তাছাড়া...এই এত রাতে লজ পর্যন্ত পৌঁছে দেওয়ার জন্য এখন এরা যে পরিমাণ টাকা অফার করছে...সেটা... বৃদ্ধ বাপ মা...স্ত্রী সন্তান নিয়ে টানাটানির একটা সংসারের এক দিনের ইনকাম হিসেবে যথেষ্টই লোভনীয়।এটা হাতছাড়া করাটা খুব একটা বুদ্ধিমানের কাজ হবে না। ড্রাইভার শেষমেষ বলল..."ঠিক আছে বাবুরা...আপনারা গাড়িতে উঠে পড়ুন। তবে গাড়ি কিন্তু লজ পর্যন্ত নিয়ে যেতে পারব না।লজের কাছাকাছিই নিয়ে যাব... যেখান থেকে সামান্য একটু হাঁটতে হবে আপনাদের।" ---"এত লটবহর হাতে নিয়ে ফের গাড়ি থেকে নেমে হাঁটাহাঁটি করতে হবে!এতটা যখন যাচ্ছেনই তখন লজের সামনে পর্যন্ত গিয়ে সেখানে নামিয়ে দিতে আপনার এত কি সমস্যা?" উদ্বিগ্ন কন্ঠে বলে উঠল দীপিকা। উত্তরে ড্রাইভার বলে উঠল..."দেখুন দিদি...ওই লজ পর্যন্ত যাওয়ার ওই একটাই রাস্তা।আর ওই রাস্তা দিয়ে যদি আমাকে গাড়ি চালিয়ে যেতেই হয়... তবে দিনের আলো না থাকলে আমি একটা নির্দিষ্ট সীমা ছাড়িয়ে আর যেতে পারব না। আপনাদের যদি আমার গাড়িতে যেতেই হয়... তাহলে কিছু পথ হেঁটেই যেতে হবে আপনাদের।না হলে আমায় যেতে দিন।রাত একটা বাজে... এখন আমি ঘরে ফিরব।" ড্রাইভারের এই কথা শুনে একটা লম্বা দীর্ঘশ্বাসের সাথে ঋক বলে উঠল..."ঠিক আছে...তাই চলুন অগত্যা...নেই মামার থেকে কানা মামা ভালো।" সমস্ত লাগেজ গুলো ধরাধরি করে তোলা হল গাড়ির ডিকিতে।তারপর পাঁচ বন্ধু গাড়ির ভিতর বসে পড়ল। অন্ধকার বাতাসের বুকে একরাশ ধোঁয়া উড়িয়ে গাড়ি স্টার্ট নিয়ে ছুটতে শুরু করল ওদের গন্তব্যের পথে...। অন্ধকারের বুক চিরে... গাড়ি চলতে শুরু করল।মেন রাস্তায় কিছুক্ষণ চলার পরেই গাড়ি টার্ন নিল পাহাড়ের গা কেটে তৈরি রাস্তায়।ঋক আবার হয়ে ড্রাইভারকে জিজ্ঞাসা করল... আমাদের লজ টা কোথায় বলুন তো...এরকম পাহাড়ী রাস্তা দিয়ে এঁকেবেঁকে গাড়ি নিয়ে যাচ্ছেন... পাহাড়ের মধ্যে লজ আছে নাকি?" ---"অজ্ঞে হ্যাঁ বাবু।ওই লজ পাহাড়ের গায়ে তৈরি হয়েছে বছর তিনেক আগে।ওই লজে র প্রতিটা ঘরের ভিতর থেকে প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের এত সুন্দর ভিউ আসে...যে কি বলব!কিন্তু এই মাস দুয়েক হল...ওই লজে খদ্দের হচ্ছে না একেবারেই।ওই লজে পৌঁছানোর আর বিকল্প কোনো রাস্তাই নেই যে...!" বলে উঠল ড্রাইভার। প্রীতম বলল... ---"বুঝলাম।কিন্তু একটা ব্যাপার আমার মাথায় কিছুতেই ঢুকছে না... রাত্রিবেলা ওই লজের পথ ধরে গেলে সমস্যাটা কি?" ঠিক ওই সময়ে... হঠাৎ ঘ্যাঁ-অ্যা-অ্যা-চ শব্দে সজোরে ব্রেক কষল ড্রাইভার।গাড়ি দাঁড়িয়ে গেল। প্রীতমের দিকে মুখ ঘুরিয়ে ড্রাইভার বলে উঠল... "এইখানে নেমে...নাক বরাবর সোজা হাঁটতে থাকুন।একটা পোড়ো মন্দির দেখতে পাবেন।ওই মন্দিরের সামনে পৌঁছে ডানদিকে মোড় নেবেন। কয়েক পা হাঁটলেই সামনে পড়বে আপনাদের লজ।" প্রীতম এবার বেশ ক্রুদ্ধ স্বরে বলে উঠল..."মানে টা কি? তুমি এতটা পাহাড়ী রাস্তা পেরিয়ে আস্তে পারলে...আর সামান্য একটু এগিয়ে... আমাদের লজ পর্যন্ত পৌঁছে দিতে পারছ না?মস্করা পেয়েছ?" ---"আপনাদের সাথে তো এমনটাই কথা হয়েছিল আমার।এখন অন্যরকম কথা বলছেন কেন আপনারা?এই প্রচন্ড ঠান্ডার রাতে কয়েকজন মানুষকে যাতে কষ্ট পেতে না হয়...তাই মানবিকতার খাতিরেই এতদূর পর্যন্ত এলাম। কিন্তু ওই দিনের আলো না থাকা অবস্থায় ওই মন্দিরের আশেপাশেও যেতে পারব না আমি।আপনারা এইখানে নেমে যান। সত্যিই তো... ড্রাইভারের সাথে কথা তো সেইরকমই হয়েছিল...!এখন তো তাকে আর কিছু বলে কোনো লাভ নেই।এই ঠান্ডায়... সারারাত যাতে স্টেশনে না কাটাতে হয়...তার জন্য মরিয়া চেষ্টার পরে অবশেষে একটা উপায় সামনে দেখে...সেটা আর হাতছাড়া না করে ঝটপট উঠে পড়েছিল গাড়িতে। যেকোনো ধরনের শর্ত মেনে নিয়েছিল বেশি বিচার বিবেচনা না করেই। কিন্তু এখন ওরা প্রত্যেকেই বুঝতে পারছে...কি বিতিকিচ্ছিরি ভুলটাই না করেছে তারা...! এই পাহাড়ী জঙ্গলে ঘেরা রাস্তায় সমস্ত লটবহর কাঁধে নিয়ে... ড্রাইভারের বলে দেওয়া রাস্তা ধরে হেঁটে হেঁটে এখন লজ খুঁজতে হবে!রাত এখন গভীর। আকাশ ফর্সা হওয়ার সময় আসতে এখনো ঢের বাকি।নিজেদের জালে যে এখন নিজেরাই ফেঁসে যাওয়ার উপক্রম হয়েছে!কি আর করা... গাড়ির ডিকি থেকে লাগেজ গুলো বার করতে করতে গজগজ করতে লাগল বর্ষা।বলল..."এই গোটা এলাকার মধ্যে...বাবা কি বুক করার জন্য আর কোনো লজ পেল না!" ড্রাইভারের পাওনা মিটিয়ে দিতে দিতেও আপ্রাণ অনুরোধ উপরোধ করতে থাকল ঋক আর প্রীতম। ---"মানবিকতার খাতিরে একবার অন্তত ভেবে দেখুন দাদা...আমরা এখানে কিচ্ছু চিনি না।এই অন্ধকার রাতে... পাহাড়ী রাস্তার ভিতর দিয়ে এত লাগেজ নিয়ে আমরা লজ খুঁজতে নামব! সাথে তিনজন মেয়ে রয়েছে আমাদের। এতদূর যখন এসেইছেন...তখন আরো কিছুটা পথ না হয় গেলেন ই...কি এমন সমস্যা হবে এতে আপনার?" গাড়ির ভিতর থেকে শীতল কন্ঠে উত্তর এল..."দেখুন দাদা... আপনাদের অবস্থাটা আমি বুঝতে পারছি।সেই জন্যই এতদূর পর্যন্ত আসতে রাজি হয়েছি।কিন্তু সূর্যের আলো ব্যতীত...ওই মন্দিরের আশেপাশেও যাওয়া আমার পক্ষে সম্ভব নয়।আপনাদের জীবন... আপনাদের দায়িত্ব।টেক কেয়ার।" এই বলে ওদের পাঁচ বন্ধুর মুখে একরাশ ধোঁয়া উড়িয়ে দিয়ে গাড়ি বিদায় নিল। গভীর রাত্রে...পাহাড়ী পথের মাঝখানে পাঁচ বন্ধু পুরোপুরি হতভম্ব হয়ে দাঁড়িয়ে রইল কিছুক্ষন।এই নিকষ অন্ধকারে এখন পাহাড়ী রাস্তা য় সমস্ত লটবহর কাঁধে নিয়ে হাঁটতে হাঁটতে এখন লজ খুঁজতে হবে...এ কথা ভাবলেই এখন গায়ে জ্বর আসছে ওদের।এই হাড় কাঁপানো ঠান্ডায় এইভাবে দাঁড়িয়ে থাকাটাও দুষ্কর। ওদিকে এইখানে মোবাইলে টাওয়ার ও পাওয়া যাচ্ছে না ঠিকমতো।মোবাইলে লোকেশন ট্র্যাক করে যে পৌঁছানোর একটা উপায় ছিল... এখন তো সে রাস্তাও বন্ধ। বর্ষা একরাশ রাগ আর বিরক্তি মাখা কন্ঠে বলে উঠল..."এর থেকে তো স্টেশনে রাত কাটানোও ঢের ভালো ছিল।খোলা আকাশের নীচে চারপাশে ঘন জঙ্গলের ভিতরে এসে বাকি রাত পার করবার কোনো মানে ছিল কি?" ---"এখন আর উপায় নেই রে বর্ষা... এখানে এইভাবে দাঁড়িয়ে থাকলে জমে যেতে হবে আমাদের। এখনো রাত অনেক বাকি।একটু একটু করে বরং পা চালা সবাই... ড্রাইভার যেরকম ডিরেকশন দিয়ে গেল... সেই মতোই এগোতে থাকি...! বলে উঠল ঋক। ---"হ্যাঁ সেটাই... এখন এ ছাড়া আর কোনো উপায় নেই। একটা লম্বা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলে উঠল দীপিকা। আঁধার রাতে...ঘন জঙ্গল কেটে তৈরি করা রাস্তা দিয়ে... মোবাইলের আলো ফেলে পিঠে... কাঁধে লাগেজ তুলে এক পা এক পা করে এগোতে শুরু করল পাঁচ বন্ধু। প্রীতম আর ঋকের হাতে ধরা রয়েছে মোবাইল ফোনে অন করা টর্চ লাইট। নিকষ অন্ধকারের বুক চিরে... পাঁচ বন্ধু এগিয়ে চলল ড্রাইভারের দিক নির্দেশ করা পথ অনুসরণ করে।এইভাবে ভারি লাগেজ ঘাড়ে... কাঁধে নিয়ে... মাধ্যাকর্ষণ শক্তির সাথে লড়াই করে পাহাড়ী রাস্তার ওপরের দিকে উঠতে উঠতে... কিছুক্ষণের মধ্যেই হাঁপিয়ে উঠল সবাই। ঋক আর প্রীতমের মোবাইলের চার্জ ক্রমেই কমে আসছে।বর্ষা দীপিকা আর মধুরিমার মোবাইলে চার্জের অবস্থাও তথৈবচ।আর কিছুক্ষণের মধ্যেই যে আলো নিভে যাবে... এটা ওরা সকলেই বুঝতে পারছে। ---"হ্যাঁ রে...ড্রাইভার যে বলে গেল...অল্প একটু হাঁটলেই লজের সামনে চলে আসব...এ তো দেখছি পথ ই আর ফুরোয় না...!" উদ্বিগ্ন কন্ঠে বলে উঠল মধুরিমা। ---"যা বলেছিস... এদিকে আমাদের ফোনের চার্জ ও শেষের মুখে।একটু পরেই আলো নিভে যাবে যখন...তখন ই একেবারে ষোলোকলা পূর্ণ হবে। রাগ আর বিরক্তিমাখা কন্ঠে বলে উঠল দীপিকা। হাঁটতে হাঁটতে... ক্রমশ ওরা সবাই বুঝতে পারল... ড্রাইভার মুখে বলে গিয়েছে বটে... গাড়ি থেকে নামার পর আর অল্প এগোলেই লজে পৌঁছানো যাবে।কিন্তু হাঁটতে হাঁটতে এ যে পথ ই ফুরোয় না...!এমনকি...যে মন্দিরের সংস্পর্শে আসার ভয়ে ওইভাবে মাঝরাস্তায় লাগেজ সমেত গাড়ি থেকে নামিয়ে দিয়ে ওইভাবে চলে গেল... সেরকম কোনো মন্দির ও তো নজরে আসছে না। প্রীতমের মোবাইলের টর্চ লাইটের আলো এবার একেবারেই ক্ষীণ হয়ে এসেছে।ঋকের মোবাইলের চার্জ পুরোপুরি শেষ হয়ে গিয়েছে কিছুক্ষণ আগেই।তারপর থেকে প্রীতমের ওই নিভু নিভু টর্চ লাইটের আলোতেই ওই পাহাড়ী রাস্তা পেরিয়ে হেঁটে চলেছে পাঁচ বন্ধু।ক্রমেই পাঁচ ওদের ধৈর্যচ্যুতি ঘটতে আরম্ভ করল। প্রীতম বলে উঠল..."আমার কি মনে হচ্ছে জানিস...ওই ড্রাইভারের নির্ঘাৎ মাথার গন্ডগোল রয়েছে।তোরা কোনো মন্দির টন্দির দেখতে পাচ্ছিস বল তো... আশেপাশে?" প্রীতমের কথা শেষ হওয়ার সাথে সাথে যে ঘটনাটা ঘটল...তাতে এবার প্রীতম সহ সকলেরই মাথায় বজ্রপাত হল।প্রীতমের হাতে ধরা টর্চের ক্ষীণ আলোটা এবার একেবারে দপ করে নিভে গেল।এই নিকষ অন্ধকারে পথ হাতড়ে হাতড়ে যাও বা কোনোমতে এগোনো যাচ্ছিল...এখন সে রাস্তাও বন্ধ। আকাশের বুকে জ্বলজ্বল করতে থাকা তারা আর ওই ক্ষীণ চাঁদের আলো কে ভরসা করে...এই পাহাড়ী রাস্তায় হেঁটে সামনের দিকে এগোনোটা বলতে গেলে আর সম্ভব ই নয়। মাথায় হাত দিয়ে বসে পড়ার উপক্রম হল পাঁচ বন্ধুর। হঠাৎ এমন সময়ে...ঋক বলে উঠল..."ওই দ্যাখ একটা জিনিস...!" ঋকের কন্ঠ ফুঁড়ে বেরিয়ে আসছে এক অদ্ভুত উত্তেজনা।ওই নিকষ অন্ধকারের ভিতরেও... সবাই বোঝার চেষ্টা করল...ঋক কি বলতে চাইছে।আলোর শেষ বিন্দুটা পুরোপুরি মুছে যাওয়ার পর...একটু চোখ টা সয়ে আসতে...ওরা পরস্পরের পরস্পরকে খুব আবছাভাবে দেখতে পাচ্ছিল। ঋকের অঙ্গুলি নির্দেশ করা দিকটা তাই মোটামুটি ভাবে সকলেরই দৃষ্টিগোচর হল।ওই অঙ্গুলি নির্দেশ অনুসরণ করে... তাকিয়ে দেখল দীপিকা, মধুরিমা, বর্ষা আর প্রীতম। ওদের প্রত্যেকেরই চোখে পড়ল... অনেক দূর থেকে ভেসে আসা একটা হলুদ আলোর বিন্দু।জলে পড়লে মানুষ যেমন খড়কুটোকেও আঁকড়ে ধরে... ওই নিকষ অন্ধকারের রাজত্বে...দূর হতে ভেসে আসা একটা ছোট্ট আলোর বিন্দু চোখে পড়ামাত্র... পাঁচ বন্ধুর মনের ভিতরে আশার আলো চলকে উঠল। ওই কম্পমান আলোক বিন্দুটি যে আগুন...সেটা বুঝতে কোনো অসুবিধা হল না ওদের।এত রাতে...এই ঠান্ডায় যদি ওই আগুনের কাছে গিয়ে হাত পা একটু সেঁকে নেওয়ার লোভটা পাঁচজনের ই প্রবল হয়ে উঠল।লজ খুঁজে... সেখানে পৌঁছনোর চিন্তা আপাতত একপাশে সরিয়ে রেখে...ওই আলোকবিন্দুটার অভিমুখেই পাঁচ বন্ধু পা চালিয়ে এবার এগোতে শুরু করল। খানিক এগোনোর পর ওরা বুঝতে পারল...ওই আলোক বিন্দুর উৎস হল একটি মন্দিরের চূড়া।একটা সুবিশাল মন্দিরের চূড়া তে লেলিহান শিখায় জ্বলছে একটি মশাল! নিকষ আঁধার ফুঁড়ে প্রজ্জ্বলিত ওই আগুনের লেলিহান শিখা যেন উন্মত্ত হয়ে উঠেছে আকাশ ছোঁয়ার তীব্র আকুতিতে।সেই আকুতি চিরে যেন বেরিয়ে আসতে চাইছে বহুযুগ ধরে চেপে রাখা কোনো ভয়াল আক্রোশ! দূর থেকে ওই আলোকশিখা... একটা ছোট্ট আলোক বিন্দু রূপে দৃশ্যমান হলেও...এখন ওদের প্রত্যেকেরই মনে হচ্ছে...এ কোনো সাধারণ আগুনের শিখা নয়।ওই অগ্নিশিখার পরতে পরতে যেন মিশে রয়েছে... সর্বগ্রাসী কোনো সত্ত্বা...! এইবার ওরা প্রত্যেকেই বুঝতে পারল...যে মন্দিরের সংস্পর্শ এড়ানোর জন্য ওইভাবে মাঝ রাস্তায় পাঁচজনকে গাড়ি থেকে নামিয়ে দিয়ে... তাড়াহুড়ো করে চলে গিয়েছিল ড্রাইভার... সেই মন্দিরের ই কাছাকাছি এখন পৌঁছে গিয়েছে ওরা...! এই হাড় কাঁপানো ঠান্ডায়... পাহাড়ী জঙ্গল কেটে তৈরি করা রাস্তা ধরে ভারি লাগেজ নিয়ে হাঁটতে হাঁটতে... পাঁচ বন্ধু ই প্রচন্ড পরিশ্রান্ত হয়ে পড়েছে। এহেন পরিস্থিতিতে... সামনে ওই মন্দির দেখতে পেয়ে...ঋক এবার চেঁচিয়ে উঠল।"আরে...ওই তো একটা মন্দির দেখা যাচ্ছে।তার মানে আমরা লজের কাছাকাছিই পৌঁছে গিয়েছি।" বাকিরা সমস্বরে উত্তেজিত কন্ঠে বলে উঠল... হ্যাঁ তাই তো...তাই তো...!" ঠিক সেই মূহূর্তে...হঠাৎ পায়ে একটা কিছুর ধাক্কা লেগে... প্রীতম হোঁচট খেয়ে পড়ল মাটিতে।ওর মুখ দিয়ে বেরিয়ে এল একটা যন্ত্রনা ক্লিষ্ট আর্তনাদ।দুই হাতে পা চেপে ধরে...ও বসে পড়ল মাটিতে। "কি রে...কি হল তোর?" ঝুঁকে বসে ওর কাঁধে হাত রেখে বলে উঠল বর্ষা। ---"আরে তেমন কিছু নয়...পায়ে একটা কিছুর ধাক্কা লাগল... অন্ধকারে দেখতে পাইনি...তাই হুড়মুড় করে পড়লাম।আমাকে একটু সময় দে তোরা...আমার পায়ের ব্যথাটা একটু কমলেই আমি এগোচ্ছি। দীপিকা বলে উঠল... "---হ্যাঁ হ্যাঁ ঠিক আছে... তোর পায়ের ব্যথা কমুক...তারপরেই এগোব আমরা। দাঁড়া...আমার ব্যাগে ব্যথার মলম রয়েছে।ওটা বার করে দিচ্ছি...পায়ে লাগিয়ে নে...ব্যথা বাপ বাপ বলে পালাতে পথ পাবে না।" নিজের কাঁধের ব্যাগের চেন খুলে... একটা ছোট্ট মলমের টিউব বার করে ফেলল। অন্ধকার এতক্ষণে ওদের প্রত্যেকেরই চোখে সয়ে এসেছে।তার ওপরে অদূরে মন্দিরের চূড়া হতে ভেসে আসা জ্বলন্ত মশালের আলো য় এখন পরস্পর পরস্পরকে ঠিকভাবে দেখতে এখন ওদের কোনো অসুবিধা হচ্ছে না।দীপিকা মলমটা বার করে প্রীতমের হাতে দিতে যাবে...এমন সময়ে ওর হাত থেকে ছোঁ মেরে ওটা কেড়ে নিল বর্ষা।তারপর প্রীতমের কাছে হাঁটু গেড়ে বসে পড়ে...মলমের ঢাকনা খুলতে খুলতে উদ্বিগ্ন কন্ঠে বলে উঠল..."কোথায় লেগেছে দেখা দেখি...!" প্রীতম বলে উঠল..."আরে...তুই এত ব্যস্ত হচ্ছিস কেন!ওটা আমার হাতে দে...আমি লাগিয়ে নিচ্ছি।" এই বলে প্রীতম...বর্ষার হাত থেকে মলমটা নিয়ে...ঢাকনা খুলে... আস্তে আস্তে করে মালিশ করতে থাকল পায়ের গোড়ালিতে।এতক্ষণ পাহাড়ী পথে মাধ্যাকর্ষণের সাথে ক্রমাগত যুদ্ধ করে করে একনাগাড়ে হেঁটে এগিয়ে যাওয়ার ফলপ্রসূ... ঠান্ডার সাথে যুঝে ওঠা যাও বা সম্ভব ছিল... এখন তো একটা জায়গায় দাঁড়িয়ে থাকার কারণে হাত পা রীতিমতো জমে ওঠার উপক্রম হয়েছে। কি আর করা... প্রীতমের পায়ের ব্যথাটা একটু না কমলে তো আর এগোনোরও উপায় নেই।প্রীতম পায়ে মলম মালিশ করছে আর বর্ষা, দীপিকা মধুরিমা পাশে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ঠান্ডায় কাঁপছে।ঋক আর দাঁড়িয়ে থাকতে না পেরে... এদিক ওদিক ঘোরাঘুরি করতে লাগল। প্রীতমের পায়ের ব্যথাটা যখন একটু সামাল দেওয়ার মতো পরিস্থিতিতে এসেছে... তখন ও আস্তে আস্তে উঠে দাঁড়াল।তারপর বাকিদের উদ্দেশ্য বলে উঠল..."চল রে... এগোতে থাকি।মন্দিরের কাছাকাছি পৌঁছে গেছি আমরা...আর বোধহয় খুব বেশি হাঁটতে হবে না আমাদের।" ---তোর পায়ের ব্যথা কমেছে?" ---হ্যাঁ রে...এখন মোটামুটি হাঁটতে পারব।" ---"তাহলে চল... এগোতে থাকি...।" সামনের দিকে এগোতে গিয়েই হঠাৎ ওরা সবাই লক্ষ্য করল... ওদের মাঝে ঋক নেই। আশ্চর্য...ছেলেটা তো এতক্ষণ সাথে সাথেই হাঁটছিল।এই কিছুক্ষণের মধ্যেই সে কোথায় উধাও হয়ে গেল! এই আবছা অন্ধকারের ভিতরেও ওরা এখন ভালো করেই বুঝতে পারছে...ঋক এখন ওদের আশেপাশে নেই। এতক্ষণ ধরে ঠান্ডায় কাঁপতে থাকা দীপিকা,বর্ষা,মধুরিমা আর সদ্য উঠে দাঁড়িয়ে এগিয়ে চলার জন্য উদ্যত প্রীতমের কপালে এবার বিন্দু বিন্দু ঘাম দেখা দিতে লাগল। মধুরিমা বলে উঠল..."ঋক টা এর মধ্যে হাঁটতে হাঁটতে কোথায় চলে গেল বল তো...! এতক্ষণে ওর দিকে তো তেমন মনযোগ ছিল না আমাদের কারোর...!" ওদের দুশ্চিন্তার কারণ যথার্থই রয়েছে।চারপাশে ঘন জঙ্গলের ভিতরে হিংস্র জন্তু জানোয়ারের অস্তিত্ব থাকাটা স্বাভাবিক। চারপাশে জঙ্গলে ছাওয়া...আঁধার ঘেরা পাহাড়ী রাস্তায় আপন মনে একলা চলতে চলতে... হঠাৎ যদি কোনো হিংস্র জানোয়ার ওকে সবলে টেনে নেয় নিজের শিকার হিসেবে...! ঋককে নিয়ে একটা দুশ্চিন্তা ক্রমে গাঢ় হয়ে উঠতে শুরু করল উঠতে শুরু করল ওদের সকলের মনে।ঠিক এমন সময়ে... হঠাৎ... অদূরেই ঋকের কন্ঠস্বর ভেসে এল।এতে সবাই বুঝে গেল... এতক্ষণ ধরে যেসব দুশ্চিন্তা আসছিল ওদের সকলের মনে...সেসব পুরোপুরি অনর্থক। নিশ্চিন্ত হল সবাই। ঋক সবার মাঝে ফিরে এসে একটুখানি দম নিল। তারপর বলে উঠল..."অ্যাই শোন না...আমি একটা কথা বলি...!রাত শেষ হতে এখনো তো অনেকটাই বাকি।ওদিকে আমাদের লজ টা ঠিক কোথায় আমরা কেউই জানি না।এখন এই রাতটুকুর জন্য আপাতত লজ খোঁজাখুঁজির ঝামেলায় না গিয়ে...একটু গা গরম করে নি চল।আমি রাত কাটানোর জন্য একটা বেশ ভালো জায়গা দেখে এলাম।" ---"কাউকে না জানিয়ে... এইভাবে হুট করে এদিক ওদিক চলে যেতে হয় এইভাবে...!আমরা সবাই তো চিন্তায় পড়ে গিয়েছিলাম!" ---"আরে...বেশি দূরে নয়...আমি ওই মন্দিরের ই কাছাকাছি গিয়েছিলাম।" ঋক অদূরে... মন্দিরের চূড়ার দিকে অঙ্গুলি নির্দেশ করল। সবাই তাকাল সেদিকে। মন্দিরের চূড়ায় জ্বলন্ত মশালের আগুনের ওই লেলিহান শিখার দিকে তাকিয়ে... ওদের শরীরে একটা অদ্ভুত শিহরন খেলে গেল যেন...! ঋক বলে উঠল..."ওই মন্দিরের আশেপাশের বাতাসটা বেশ গরম আর আরামদায়ক। এখানে দাঁড়িয়ে যেভাবে ঠান্ডায় কাবু হচ্ছিস তোরা... ওখানে গেলে বুঝতে পারবি...একটা অদ্ভুত তপ্ততার আরামে যেন ছাওয়া...বাতাসের প্রতিটি কণা।ওই মন্দিরের ভিতরে ঢোকার একটা রাস্তা রয়েছে। ওখানে একবার ঢুকতে পারলে একটু আরাম পাওয়া যাবে... সাথে মাথার ওপর ছাদ ও পাওয়া যাবে। একটা রাত কাটানোর জন্য এর চেয়ে বেশি আর কি চাই বল তো...!লজের খোঁজ কালকে সকালেই করা যাবে'খন। আপাতত ওইখানেই সবাই যাই...চল...!" ---"কথাটা মন্দ বলিসনি। এখন আর এই পাহাড়ী রাস্তা ঠেঙিয়ে অন্ধকারে লজ খোঁজাখুঁজির চাইতে একটা মন্দিরের ছাদের তলায় বসে রাত কাটানোটাই বুদ্ধিমানের কাজ হবে। মন্দিরের চূড়ায় মশালের আগুনটা জ্বলছে বলেই হয়তো সেখানকার বাতাসে শীত কামড় বসাতে পারছে না।চল সবাই...আজ রাত্তিরটা ওইখানেই কাটাই।বেশ অ্যাডভেঞ্চার ও হবে...চল চল...!" বলে উঠল প্রীতম। হঠাৎ বর্ষা বাধা দিয়ে বলে উঠল..."দাঁড়া তোরা... একবার ভেবে দেখ তো... ওখানে যাওয়া ঠিক হবে কিনা...ওই মন্দিরের সংস্পর্শে আসার ভয়েই তো ড্রাইভার আমাদের এইভাবে মাঝরাস্তায় ফেলে রেখে চলে গেল...!" ---"বর্ষা... স্টুপিডের মতো কথা বলিস না।ওই স্বল্পশিক্ষিত ড্রাইভারের হাবভাব দেখে বুঝতে বাকি থাকে না...এরা হল অশিক্ষা আর কুসংস্কারের আখড়া।এর যা কাজ এ করেছে...তাই বলে এইসব ফালতু কথায় গুরুত্ব দেওয়া আমাদের সাজে?চল তো... এখানে ঠান্ডায় রক্ত জমে যাওয়ার উপক্রম হয়েছে। ওখানে গেলে শরীরটা একটু সেঁকে নেওয়া যাবে...!" বলে উঠল মধুরিমা ঋক,প্রীতম,আর দীপিকা...মধুরিমার কথায় সায় দিয়ে বলে উঠল..."একদম ঠিক বলেছিস।এই ঠান্ডায়...এই পাহাড়ী জঙ্গলে ঘেরা মাঝরাস্তায়...আমাদের নামিয়ে দিয়ে যে চলে যেতে পারে...ওই ধরনের লোকের কথা যত কানে না তোলা যায়...ততই ভালো। বর্ষার মনটা একটু দোনামনা করছিল বটে...কিন্তু বাকিরা ওকে জোরজবরদস্তি ঠেলেঠুলে নিয়ে এগিয়ে চলল মন্দিরের অভিমুখে।অল্প সময়ের মধ্যেই ওরা মন্দিরের সামনে পৌঁছেও গেল। পাহাড়ের গায়ে এত সুন্দর একটা মন্দির দেখে... ওদের চোখ একেবারে ধাঁধিয়ে গেল। মন্দিরের চূড়ায় প্রজ্জ্বলিত আগুনের শিখায়... মন্দিরের চারপাশটা বেশ স্পষ্টভাবেই দৃশ্যমান হচ্ছে। মন্দিরটা যে কত শত বছরের পুরোনো...সেটা ঠাহর করে ওঠা শক্ত।মন্দিরের গর্ভগৃহের বাইরে চারপাশে অপূর্ব কারুকার্যখচিত কতগুলো থামের ওপরে দাঁড়িয়ে রয়েছে এই রাজকীয় মন্দিরটি।আর সবচেয়ে অদ্ভুত ব্যাপার হল...এই মন্দিরের ভিতরে পা রাখার পর একটা তপ্ত বাতাস...সারা শরীর জুড়ে এমনভাবে ইতিউতি স্পর্শ করে চলেছে...যে ব্যাপারটা খুবই অস্বাভাবিক শুধু তাইই নয়... ব্যাপারটা রীতিমতো অতিপ্রাকৃতিক। এখন এই মন্দিরের ভিতরে পা রাখার পর... এখন সকলেরই মনে হচ্ছে... এইরকম একটা অদ্ভুত জায়গায় আসাটা হয়তো উচিত হল না। এই মন্দিরের ভিতরের বাতাসের প্রতিটি কণায় যে একটা কোনো অতিপ্রাকৃতিক শক্তির অস্তিত্ব রয়েছে...এটা ওরা প্রত্যেকেই অল্পবিস্তর অনুধাবন করতে পারছে। কিন্তু এই ঠান্ডায় যাহোক একটা মাথা গোঁজার ঠাঁই পাওয়ার পর...ফের সমস্ত লাগেজ নিয়ে বেরিয়ে আসবারও কোনো মানে হয় না।তার ওপর বাইরে যা হাড় কাঁপানো ঠান্ডা... এই মন্দিরের ভিতরের বাতাসের স্পর্শটা মনের ভিতরে একটা চাপা অস্বস্তি তৈরি করছে ঠিকই... কিন্তু সেইসাথে এই প্রবল শীতের কামড় থেকে স্বস্তিও যে দিয়েছে... এটাও অস্বীকার করার জো নেই। মন্দিরের চূড়ায় আগুনের শিখা যেন দাউদাউ করে জ্বলছে।সেই আগের আগুনের সংস্পর্শেই চারপাশে বাতাস এমন উত্তপ্ত হয়ে উঠছে...এটা মানতে গিয়ে নিজের মস্তিষ্ক ও যুক্তি বুদ্ধির সাথে ওদের লড়াই করতে হচ্ছে প্রবলভাবে।মন্দিরের অতখানি উঁচু চূড়ায় উঠে আগুন জ্বালা টা যে খুব সহজ ব্যাপার নয়...এটা বুঝতে কারোরই অসুবিধা হওয়ার কথা নয়। কতগুলো প্রশ্ন...কতগুলো ধোঁয়াশা একসঙ্গে জমাট বাঁধতে শুরু করেছে ওদের মনে। ড্রাইভারের কথাগুলো এখন ওদের মনে পড়ছে বারে বারে।এই মন্দিরের সংস্পর্শ এড়ানোর জন্য সে যেভাবে মাঝপথে পালিয়ে গেল...সেটা এখন খুব একটা অযৌক্তিক বলে মনে হচ্ছে না ওদের কারোরই।এই মন্দিরের বাইরে পা রাখলেই...হাড় কাঁপানো ঠান্ডায় কাঁপতে হবে...এই কারণেই... মনের ভিতরে মাথাচাড়া দিয়ে উঠতে থাকা হাজারো কৌতূহল আর প্রশ্নকে মনের ভিতরেই দাবিয়ে রাখল সকলেই।মনস্থির করল... এখানেই রাতটা কাটিয়ে নেবে। মধুরিমা বলে উঠল... ---"আমাদের রিসার্চের জন্য এই মন্দির একেবারে আদর্শ...কি বলিস তোরা?" ধপ করে মন্দিরের মেঝেতে ব্যাগট্যাগ ফেলে...একটা লম্বা হাই তুলে প্রীতম বলে উঠল..."হ্যাঁ ঠিকই বলেছিস... তবে এই মূহুর্তে আর পড়াশোনা... রিসার্চ এইসব নিয়ে ভাবতে পারছি না... আমার বেজায় ঘুম পেয়েছে।" মেঝের ওপর নিজের সাথে করে আনা চাদরটা পাততে উদ্যত হল ও। সাথে সাথে হাঁ হাঁ করে উঠল ঋক। ---"আরে করছিস কি!এ মন্দিরের ভিতরে কত যুগ মানুষের পা পড়েনি তার নেই ঠিক... ঝাঁটপোছ পরিষ্কারের বালাই নেই...আর তুই তোর পরিষ্কার কাচা চাদরটা বেমালুম নীচে পাততে শুরু করে দিলি?কি আক্কেল রে তোর?" ---"আরে নিকুচি করেছে তোর আক্কেলের।এই মেঝেটা কিন্তু যথেষ্টই ঠান্ডা।এখানে কিছু না পেতেই...অমনি শুতে পারবি তো?নাকি সারাদিন জার্নির ধকল সেরে এসে এখন এখানে রাত জেগে বসে থাকার প্ল্যান আছে তোর?আমি বাপু এখন ঘুমোব...লম্বা করে চাদরটা পাতছি... আরেকটা যে চাদর আছে...ওটা পাতলে আশা করি সকলের শোবার জায়গা হয়ে যাবে।" মধুরিমা এগিয়ে এসে...আরেক খানি চাদর হাতে নিয়ে বর্ষার উদ্দেশ্যে বলে উঠল..."অ্যাই বর্ষা...আয়...এ চাদর খানা ধরাধরি করে পেতে ফেলি।তুই একদম ঠিক বলেছিস প্রীতম।এরকম দুখানা বড় চাদর ভাগ্যিস এনেছিলি...আজ রাতটুকু একটু শান্তি করে ঘুমোতে পারলে বাঁচি।পরে নাহয় দুখানা চাদর আমরাই কেচে পরিষ্কার করে দেব...।" বর্ষা... মধুরিমার সাথে ধরাধরি করে চাদরটা... মন্দিরের চাতালের মাঝ বরাবর পেতে ফেলল। তারপর লাগেজ গুলো পাশেই একটা জায়গায় জড়ো করে রেখে নিল।মিনিট পাঁচেকের মধ্যে সব কাজ শেষ করে...হাত ঝেড়ে... এবার পাঁচজনে একটু রিল্যাক্স করে হাত পা ছড়িয়ে বসল। ---"আঃ...কি শান্তি...হাত পা গুলো যেন ব্যথায় একেবারে ধরে গিয়েছে। আজকের রাতটা যে একটু শান্তিতে ঘুমোনোর কোনো জায়গা পাওয়া যাবে...এ তো স্বপ্নেরও অতীত ছিল!" বলে উঠল দীপিকা। ---"যা বলেছিস...তার ওপরে এই শীতে গা গরম করতে পারা যাচ্ছে ফায়ার প্লেসের মতো।সত্যিই...আমাদের পাঁচ অভাগার দিকে ভগবান মুখ তুলে চেয়েছেন।" লম্বা হাই তুলতে তুলতে বলে উঠল মধুরিমা। প্রীতম বলে উঠল... ---"নে আর কথা বাড়িয়ে লাভ নেই...চল আমরা একে একে ঘুমিয়ে পড়ি এবার।আর আমাদের লাগেজ চুরি যাওয়ার খুব একটা চান্স নেই।এই মন্দিরের আশেপাশেও ঘেঁষতে এখানকার মানুষ ডরায়।" প্রীতমের কথাকে সমর্থন করে ঋক বলে উঠল ---"হ্যাঁ...স্থানীয় এই কুসংস্কারের কারণে আমাদের যেমন অসুবিধা পোহাতে হয়েছে...তেমন ই...এই একটা সুবিধাও কিন্তু দিয়েছে।" বিছিয়ে রাখা চাদরের ওপরে নিজের কাঁধের ব্যাগটা রেখে...একটু জুত করে শুল বর্ষা। তারপর বলল..."কথাটা ঠিকই। কিন্তু তাই বলে পাঁচ জন মিলে এমন ভোঁসভোঁস করে ঘুমিয়ে পড়লাম আর জিনিসপত্রগুলোর দিকে কারোর কোনো ভ্রুক্ষেপ রইল না...সেটাও কিন্তু ঠিক নয়। এটা একটা চাতাল মাত্র... কোনো ঘেরা জায়গা নয়...দরজাও নেই।অতএব ঘুমের পাশাপাশি লাগেজ গুলো নিয়েও সতর্ক থাকতে হবে আমাদের।" খুব বেশিক্ষণ আর গেল না। সারাটাদিনের জার্নির ধকল আর তারপর ঘাড়ে কাঁধে এতগুলো লাগেজ নিয়ে এতটা রাস্তা হাঁটার পর... পরিশ্রান্ত বিদ্ধস্ত পাঁচখানি শরীর গভীর ঘুমের অতল সাগরে তলিয়ে গেল। দৃশ্য দুই হঠাৎ একটা অদ্ভুত শব্দে ঘুম ভেঙ্গে গেল প্রীতমের। ধড়ফড় করে উঠে বসল প্রীতম।এমনিতেই নিজের ঘর আর নিজের বিছানা ছাড়া অন্য কোথাও ঘুমোলে ওর ঘুম তেমন একটা ঘন হয় না। উঠে বসে ও দেখল... সবাই এখন অতল ঘুমে তলিয়ে রয়েছে।এই শব্দ তাহলে ওদের কারোর কানে পৌঁছায়নি। ভালো করে কান খাড়া করে প্রীতম শুনতে থাকল শব্দটা।শব্দটা যে আসলেই একটা মেয়ের ক্রন্দনধ্বনি...এটা বুঝতে ওর কোনো বাকি রইল না।ভীষণ চাপা স্বরে...ইনিয়ে বিনিয়ে কাঁদছে মেয়েটা। চারপাশের নিস্তব্ধ বাতাসের প্রতিটি কণা যেন জেগে উঠেছে এক মারণ শোকের তীব্র আকুতি নিয়ে...!পাতাল ফুঁড়ে যেন বেরিয়ে আসতে চাইছে...এক দুঃসহ যন্ত্রণার হাহাকার। হ্যাঁ...শব্দটা এই মন্দিরের মাটির তলা থেকেই আসছে। একটা প্রচন্ড কৌতূহল চেপে বসল প্রীতমের মনের ভিতরে।কি আছে এই মন্দিরের মেঝের তলায়?এই নিরেট মেঝের ভিতরে লুকিয়ে রয়েছে কোন জীবন্ত মানুষের অস্তিত্ব?সে কি তার বন্দিদশা হতে মুক্তির জন্য ছটফট করে চলেছে? প্রীতমের অন্তরাত্মা কেঁপে উঠল যেন...।ওর যুক্তি বুদ্ধি সব ওলটপালট হয়ে গেল।ওর মনে... মস্তিষ্কে চেপে বসতে আরম্ভ করল একটাই চিন্তা...।এই কান্নার শব্দের উৎস ওকে খুঁজে বার করতেই হবে। যেভাবেই হোক! প্রীতম দেখল... ঋক, দীপিকা, মধুরিমা আর বর্ষা ঘুমিয়ে কাদা হয়ে রয়েছে। সারাদিন ধকলের পর এই কিছুক্ষণ আগে একটু শান্তির বিশ্রাম পাচ্ছে এরা সবাই।প্রীতম আর ওদের কাউকে ডাকল না।ও শুধু একমনে শুনে বোঝার চেষ্টা করল... কান্নার শব্দটা ঠিক কোথা থেকে আসছে!বেশ কিছুক্ষণ কান পেতে শুনে ও বুঝতে পারল...এই শব্দটা আসছে মন্দিরের গর্ভগৃহের কাছ থেকে।ক্রমে প্রীতমের মনটা ভীষণভাবে উচাটন হয়ে উঠল। মাটির তলা ফুঁড়ে ক্রমাগত বেরিয়ে আসতে থাকা ওই চাপা ক্রন্দন ক্রন্দনধ্বনি ওর অন্তরাত্মা যেন উথালপাথাল করে দিতে আরম্ভ করল।প্রীতম মোহাচ্ছন্ন হয়ে মন্দিরের গর্ভগৃহের অভিমুখে পা বাড়াল।আর সাথে সাথে চারপাশে শুরু হল প্রকৃতির ভয়াবহ তান্ডব।চারপাশে বাতাস যেন হঠাৎ তীব্র গর্জনের সাথে ফুঁসে উঠতে আরম্ভ করেছে।শোঁ শোঁ শব্দে বাতাস প্রবলভাবে গর্জন করতে শুরু করেছে হঠাৎ...আর সেই ভয়াল দাপটে... চারপাশে জঙ্গল... গাছগাছালি এ ওর গায়ে সজোরে আছড়ে পড়তে শুরু করেছে।ঠিক এই সময়ে... হঠাৎ দপ করে... একটা ভীষণ শব্দ করে নিভে গেল মন্দিরের চূড়ায় জ্বলজ্বল করে জ্বলতে থাকা আগুন। একটা নিকষ অন্ধকার মূহুর্তের মধ্যে যেন গিলে ফেলল চারপাশে আবছাভাবে দৃশ্যমান সমস্তকিছু।ওদিকে দীপিকা, বর্ষা, মধুরিমা আর ঋক এখনো অঘোরে ঘুমিয়ে চলেছে। প্রকৃতির এই ভয়াল তান্ডব লীলা ওরা আদৌ টের পাচ্ছে না।যেন কোনো শক্তি ওদের গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন করে রেখেছে...! গাঢ় অন্ধকার চারপাশটা পুরোপুরি গ্রাস করে ফেলেছে।ওই অন্ধকারের ভিতরে প্রজ্জ্বলিত হয়ে উঠেছে...একটি রক্তাভ আলো।ওই আলোর আকৃতি... অপূর্ব সুন্দর তন্বী কায়া বিশিষ্ট এক নারীর অবয়ব সদৃশ।চারপাশে নিকষ অন্ধকারের রাজত্ব শুরু হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে... রক্তাভ আলোকরশ্মি বিশিষ্ট ওই নারী অবয়ব সচল হয়ে উঠল। অন্ধকারের বুকে বিদ্যুৎ এর ঝলকের মতো প্রতীয়মান ওই অবয়বখানি প্রীতম স্পষ্ট দেখতে পেল।ওর শরীরের সমস্ত রোমকূপ যেন খাড়া হয়ে উঠল।ওই নারী অবয়ব খানি হঠাৎ প্রীতমের দিকে ওর অপার্থিব বাহু খানি মেলে হাতছানি দিয়ে ওকে নিজের কাছে ডাকতে শুরু করল।আর তার সাথে সাথে... আকাশ বাতাস ফুঁড়ে জেগে উঠতে শুরু করেছে শতাব্দী প্রাচীন যন্ত্রনা ক্লিষ্ট আর্তনাদ ও ক্রন্দনধ্বনি। গাঢ় অন্ধকার চারপাশটা পুরোপুরি গ্রাস করে ফেলেছে।ওই অন্ধকারের ভিতরে প্রজ্জ্বলিত হয়ে উঠেছে...একটি রক্তাভ আলো।ওই আলোর আকৃতি... অপূর্ব সুন্দর তন্বী কায়া বিশিষ্ট এক নারীর অবয়ব সদৃশ।চারপাশে নিকষ অন্ধকারের রাজত্ব শুরু হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে... রক্তাভ আলোকরশ্মি বিশিষ্ট ওই নারী অবয়ব সচল হয়ে উঠল। অন্ধকারের বুকে বিদ্যুৎ এর ঝলকের মতো প্রতীয়মান ওই অবয়বখানি প্রীতম স্পষ্ট দেখতে পেল।ওর শরীরের সমস্ত রোমকূপ যেন খাড়া হয়ে উঠল।ওই নারী অবয়ব খানি হঠাৎ প্রীতমের দিকে ওর অপার্থিব বাহু খানি মেলে হাতছানি দিয়ে ওকে নিজের কাছে ডাকতে শুরু করল।আর তার সাথে সাথে... আকাশ বাতাস ফুঁড়ে জেগে উঠতে শুরু করেছে শতাব্দী প্রাচীন যন্ত্রনা ক্লিষ্ট আর্তনাদ ও ক্রন্দনধ্বনি। অন্ধকারের বুকে প্রজ্জ্বলিত ওই রক্তাভ নারী অবয়বখানি প্রীতমকে হাতছানি দিয়ে এগোতে থাকল সামনের দিকে।ওই অমোঘ আহ্বান অগ্রাহ্য করার ক্ষমতা বা দুঃসাহস কোনোটাই ওর নেই।প্রীতম যন্ত্রচালিত পুতুলের মতোই...এক পা এক পা করে এগিয়ে... অনুসরণ করতে শুরু করল ওই অবয়রটির দেখানো পথ।এমন পরিস্থিতিতেও প্রীতমের বুঝতে বাকি নেই...যে দিকে ও পা বাড়িয়েছে... সেইদিকেই সোজাসুজি পড়ে মন্দিরের গর্ভগৃহ...! দৃশ্য তিন আকাশ ফর্সা হতে আরম্ভ করেছে।আস্তে আস্তে চোখ মেলে জেগে উঠল বর্ষা।একটা লম্বা হাই তুলে ও উঠে বসল।দেখল... দীপিকা, মধুরিমা,আর ঋক এখনো মড়ার মতো ঘুমিয়ে চলেছে ভোঁসভোঁস করে।ঋকের নাসিকা গর্জনে তো চারপাশের বাতাস "মুখরিত" হয়ে উঠেছে।মনে মনে একচোট হেসে নিয়ে বর্ষা ভাবল..."সক্কলে সারাদিনের জার্নির ধকলে বিদ্ধস্ত হয়ে মন্দিরের চাতালে চাদর পেতে একটা যা হোক শোয়ার জায়গায় ব্যবস্থা করতে পেরে... সাথে সাথে ঘুমিয়ে কাদা হয়ে গিয়েছে।এমনি সময়ে যদি ওর পাশে কেউ শুতে আসে... তাহলে তার সারারাতের ঘুম সেখানেই চৌপাট হয়ে যাবে।" ঘুমন্ত বন্ধুদের দিকে তাকিয়ে ও দেখল... সকলের ভিতরে প্রীতম নেই।নিশ্চয়ই প্রকৃতির ডাকে সাড়া দেওয়ার জন্য আশেপাশেই রয়েছে ও। এক্ষুনি এখানে চলে আসবে।এত তাড়াতাড়ি ঘুম থেকে ওঠার কোনো মানেই হয় না। গতকাল সারাটা দিন যা ধকল গেছে... তারপরের ঘুমটা জম্পেশ করে না দেওয়াটা চরম বোকামি।নরম বিছানা না জুটুক....মন্দিরের এই চাতালে ... চারপাশের অনাবিল সৌন্দর্য্যের মাঝখানে... ভোরের শীতল বাতাস গায়ে মেখে...এই অভিনব ঘুমের... মাহাত্ম্য কিছু আলাদাই...। চারপাশে তাকিয়ে দেখল বর্ষা।পাহাড়ের কোলে এই মন্দির কে কবে তৈরি করেছে...কে জানে...! এখানকার মানুষগুলো শুধু শুধু এখানে আসতে এত ভয় পায়।ওরা হয়তো জানেই না...এই মন্দিরের চাতালে বসে... পাহাড়ী সৌন্দর্য কত সুন্দরভাবে নিরীক্ষণ করা যায়!এই জায়গাটা যতটা সুন্দর... এখানকার স্হানীয় লোকজন ঠিক ততটাই অশিক্ষিত আর মূর্খ। এইসব ভাবতে ভাবতে... বর্ষা নিজের গায়ের জ্যাকেটটা ভালো করে জড়িয়ে নিয়ে...ফের শুয়ে পড়ল। কিন্তু... দ্বিতীয় দফা একটি তোফা ঘুমের জন্য শুয়ে পড়বার পরেও...ও শুধু এপাশ ওপাশ করতে শুরু করল।ওর মনের ভিতরে জমাট বাঁধতে শুরু করেছে একটা অস্হিরতা।প্রীতম গেল টা কোথায়!কখন ওর ঘুম ভেঙ্গেছে কে জানে...! তারপর কাউকে কিছু না জানিয়ে কোথায় গায়েব হয়ে গেল!অবশ্য সকলেই তো ঘুমিয়ে কাদা।কাউকে জানানোর সুযোগটাই বা কোথায়!কিন্তু প্রকৃতির ডাকে সাড়া দিয়ে ফিরে আসতে একজন মানুষের এতখানি সময় লাগে! প্রীতমকে নিয়ে দুশ্চিন্তাটা ক্রমেই ঘন হয়ে জমাট বাঁধতে শুরু করল ওর মনের ভিতরে।ক্রমে ও নিজের মনকে সান্ত্বনা দিল এই বলে... নিশ্চয়ই প্রীতম কাছাকাছি কোথাও ঘুরতে বেরিয়েছে।কলকাতায় প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে ঘেরা এমন অপূর্ব জায়গা আর ও পায় কোথায়! এইসব সাতপাঁচ ভাবতে ভাবতে এপাশ ওপাশ করতে লাগল বর্ষা।ওর মন বারবার বলতে লাগল... দীপিকা অথবা মধুরিমাকে ডেকে তুলে ওদের জানায়... "প্রীতম এখন এই মন্দির থেকে পুরোপুরি বেপাত্তা। কোথায় গিয়েছে কে জানে...!" মনের দুশ্চিন্তা হালকা করার চিন্তা আসার সাথে সাথে ওর এটাও মনে হল... বেচারিদের ঘুম ভাঙ্গানোটা ঠিক হবে না। এদিকে ওর ছটফটানির চোটে ওর পাশে শুয়ে থাকা দীপিকার ঘুমটা চটকে গেল।ঘুম জড়ানো গলায় ও বলে উঠল..."আঃ বর্ষা...এত নড়ছিস কেন! ঘুমোতে দে...!" এই বলে ও পাশ ফিরে ফের ঘুমিয়ে গেল। নাঃ...আর তো পারা যাচ্ছে না...! এতক্ষণ সময় পেরিয়ে গেল...প্রীতম টা এখনো আসছে না...! আর শুয়ে থাকতে পারল না বর্ষা।ও আস্তে আস্তে চাদর থেকে উঠে পড়ল।তারপর হাঁটতে হাঁটতে মন্দিরের ভিতরে আর বাইরে প্রীতমকে খোঁজাখুঁজি করতে লাগল হন্যে হয়ে...। বেশ কিছুক্ষণ খোঁজাখুঁজির পর...বর্ষা বুঝতে পারল... প্রীতম কাছাকাছি কোত্থাও নেই।এদিকে এখানে ফোনেও ঠিকঠাক নেটওয়ার্ক পাওয়া যাচ্ছে না।প্রীতমকে নিয়ে দুশ্চিন্তায় ও সোনালী রোদ ধরতে শুরু করা ঝলমলে আকাশের নীচে দাঁড়িয়ে... দুচোখে অন্ধকার দেখতে শুরু করল।হঠাৎ পিছন থেকে ও শুনতে পেল মধুরিমার গলা।ও উচ্চৈঃস্বরে ডাকছে ওকে। ---"বর্ষা... অ্যাই বর্ষা...বলি... তোদের কি কোনো কান্ডজ্ঞান নেই?কাউকে কিছু না জানিয়ে...দুম করে দুজনে মিলে উধাও হয়ে গিয়েছিলি কেন?আমাদের চিন্তা হয় না?" মধুরিমার ক্রোধান্বিত গলা শুনে এবার আরো বেশি উচাটন হয়ে উঠল বর্ষা। একছুটে ওর কাছে এসে...ওর হাতদুটো চেপে ধরে... বর্ষা বলে উঠল..."সর্বনাশ হয়ে গেছে মধু...ভোর হওয়ার পর থেকে প্রীতমকে আর কোথাও খুঁজে পাচ্ছি না। বর্ষার কথা শুনে আকাশ থেকে পড়ল মধুরিমা। বিস্মিত কন্ঠে বলে উঠল... ---"কি বলছিস বর্ষা...তুই আর প্রীতম তার মানে একসাথে বেরোসনি?আমরা সবাই তো ভাবলাম তোরা দুজনে একসাথে আশেপাশে ঘুরতে বেরিয়ে পড়েছিস... একদিকে প্রীতম কাউকে কিছু না জানিয়ে উধাও হয়ে গেছে...আর আরেক দিকে তুই।তোদেরকে নিয়ে না সত্যিই পারা যায় না। ওকে ফোনে ট্রাই করেছিলি?" ---"সে কি আর বলতে...তুই নিজেও কি এতক্ষণে আমাদের দুজনের কাউকে ফোনে ট্রাই করিসনি?বল তো...পেলি কাউকে?" ---"কি করে পাব বল... এখানে তো ফোনে নেটওয়ার্ক ই পাওয়া যাচ্ছে না।তোর ঘুম কখন ভেঙেছিল বল তো?যখন তুই দেখলি... আশেপাশে প্রীতম নেই কোথাও...তুই আমাদেরকে কেন ডাকলি না?" ---"তোদের কি করে আর ডাকি বল তো...গতকাল যা গেল আমাদের উপরে... দীর্ঘ সময় টানা সংগ্রামের পর একখানা যাহোক শোবার বন্দোবস্ত করা গেল!আমি ভাবলাম...একটু শান্তিতে বিশ্রাম নিক সকলে...আমি বরং চারপাশে প্রীতমকে খুঁজে দেখি...আমি তো প্রথমটায় বুঝতে পারিনি...ও আশেপাশে কোত্থাও নেই। ভেবেছিলাম...একটু খোঁজাখুঁজি করলে আর একটু সময় পার হলে ও ঠিক চলে আসবে...।" ---"ওদিকে সবাই ঘুম থেকে উঠে পড়ে সমানে তোদের খোঁজ করে চলেছে।তুই আমার সাথে ওই মন্দির চাতালে চল। সবাইকে ব্যাপারটা খুলে বলি।" ---"হ্যাঁ চল।" মন্দিরের চাতালে এসে জড়ো হল বর্ষা, মধুরিমা, দীপিকা আর ঋক।সময় বয়ে চলেছে স্রোতের মতো। মোবাইলে সময় জানান দিচ্ছে...আর তা দেখে এখন সকলেরই দুশ্চিন্তায় রীতিমতো ঘাম ছুটে যাচ্ছে।সকাল সাড়ে নটা বাজে। মোটামুটি সকাল সাতটা থেকে সবাই উঠে পড়ে শুধু প্রীতমের জন্য অপেক্ষা করে চলেছে।মুখ ধোয়া... খাওয়াদাওয়া এখনো হয়নি কারোরই।দিনের আলো সেই কখন ফুটে গিয়েছে। এতক্ষণে ঝটপট করে লজ খুঁজে সেখানে থিতু হয়ে...প্রাতরাশ সেরে ফেলত সকলে।অথচ এখন বেলা গড়িয়েই চলেছে... প্রীতমের দেখা পাওয়ার কোনো নামগন্ধ ই নেই! ওদিকে বর্ষাকে সামলানো যাচ্ছে না একেবারেই। মন্দিরের চাতালে ফিরে আসার পর থেকেই সমানে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কেঁদে চলেছে। কিছুতেই ওকে একটু শান্ত করা যাচ্ছে না।ওর মাথায় হাত বোলাতে বোলাতে মধুরিমা বলে উঠল..."কি করা যায় বল দেখি এখন...।প্রীতম টা দিনের আলো ফোটার সাথে সাথে কাউকে কিচ্ছু না জানিয়ে কোথায় যে অদৃশ্য হয়ে গেল... ঈশ্বর ই জানেন।" চিন্তিত কন্ঠে ঋক বলে উঠল..."দেখ...আমরা সকলেই প্রীতম কে চিনি।ও মোটেই এইরকম দায়িত্বজ্ঞানহীন ছেলে নয়। আমার মনে হয়...ও বোধহয় কোনো বিপদে পড়েছে।" কাঁদতে কাঁদতে এবার মাথা তুলে বর্ষা বলে উঠল..."প্রীতম কিন্তু প্রথমেই বলেছিল...এই মন্দিরে এসে আমাদের রাত কাটানোর সিদ্ধান্তটা একেবারেই ঠিক নয়।আমরা এখানে এসেছি একদিন ও হয়নি। এখানকার স্হানীয় লোকেদের এমন ভয় নিশ্চয়ই অমূলক নয়...।এখন আর কি...বিপদ যা হওয়ার তাই তো হয়েই গেল!" বর্ষা মাথায় হাত দিয়ে আবার ফোঁপাতে শুরু করল। ---"আরে...তোরা মাথাটা একটু ঠাণ্ডা কর।প্রীতম কে খোঁজার একটা কোনো উপায় বার করতেই হবে আমাদের। যেভাবেই হোক!" এদিকে সময় বয়ে চলেছে আপন গতিতে।মোবাইলে এখন সময় দেখাচ্ছে... সকাল সাড়ে দশটা। এবার সবাই নিশ্চিত হল... প্রীতম আর স্বাভাবিক ভাবে এখানে ফিরে আসার নয়।ও বড়সড় কোনো বিপদে ফেঁসে গেছে আর সেই খবরটা কাউকে জানাতে ও এখন পুরোপুরি অপারগ। এদিকে সকাল গড়িয়ে বেলা হতে চলল... প্রাত্যহিক কাজকর্ম সব চুলোদ্দরে দিয়ে...চার বন্ধু... প্রীতমের ফেরার অপেক্ষায় হাপিত্যেশ করে বসেই রয়েছে। এমন সময়ে ঋক বলে উঠল..."দেখ... আমার মনে হয়... এইভাবে আমাদের হাত পা গুটিয়ে এখানে বসে বসে অপেক্ষা করে কোনো লাভ নেই।এইভাবে ও ফেরার নয়...এটা আমার আর বুঝতে বাকি নেই।আমি বলি কি...আমরা সবাই এখনকার মতো আমাদের লজ খুঁজে নিয়ে সেখানে গিয়ে জিনিসপত্র সব রেখেটেখে একটু থিতু হই...একটু ফ্রেশ হয়ে মুখহাত ধুয়ে...পেটে দুটো খাবার দিই... তারপর পুলিশে খবর দিতে হবে... ওকে খুঁজে বার করার জন্য আর যা যা করার দরকার... সেইসব মাথা খাটিয়ে ভেবে সেইমতো এগোতে হবে।" ---"কি বলছিস তুই ঋক... প্রীতমের কোনো খোঁজ মিলছে না সকাল থেকে...আর তুই আমাদেরকে লজে ফিরে ফ্রেশ হয়ে খাবার খেতে বলছিস?" কাঁদতে কাঁদতে...সিংহীর মতো ফুঁসে উঠে বলে উঠল বর্ষা। ঋক এবার বর্ষার দিকে এগিয়ে এসে...ওর কাছে হাঁটু মুড়ে বসল। তারপর বলল..."দেখ বর্ষা...আমরা সবাই বুঝতে পারছি তোর মনের অবস্থা।তুই কি ভাবিস... আমাদের কারোর চিন্তা নেই ওর জন্য? আরে পাগলি... প্রীতমকে তো আমাদেরই খুঁজে বার করতে হবে।আর তার জন্য আমাদের সবাইকে ঠিক থাকতে হবে।আমরাই যদি না খেয়ে...এই রোদে বসে বসে অসুস্থ হয়ে পড়ি... তাহলে ওকে কেমন করে খুঁজে বার করব বল দেখি... আমার কথা শোন... আপাতত আমাদের লজে ফিরে গিয়ে একটু ফ্রেশ হয়ে নেওয়াটাই উচিত। এরপর তো গোটা দিনটাই পড়ে রয়েছে প্রীতম কে খোঁজার জন্য।" ---"হ্যাঁ রে বর্ষা... রিসার্চ প্রজেক্ট সব চুলোদ্দরে যাক...এখন প্রীতমকে খুঁজে বার করাটাই আমাদের একমাত্র কাজ।আর তার জন্য আমাদের সুস্থ শরীরে ঠিকভাবে থাকাটা সবার আগে দরকার।এগারোটা বাজতে চলল।এখন প্রীতমের এইখানে ফিরে আসার আর কোনো চান্স ই নেই বুঝলি... আমাদের সবাইকে ওকে খুঁজে বার করতে হবে। বেলা বারোটা।সূর্য এখন একেবারে মাথার ওপরে। দিনের আলোয় লজ খুঁজে বার করতে ওদের খুব একটা বেগ পেতে হয়নি।লজে পৌঁছানোর পর তাড়াতাড়ি করে হাতমুখ ধুয়ে... কোনোমতে পেটে কিছু খাবার দিয়ে... এবার চার বন্ধু প্রীতম কে খুঁজে বার করার জন্য সচেষ্ট হল।বর্ষা তো খাবারের একটি দানাও মুখে তুলতে চাইছিল না।ঋক, দীপিকা আর মধুরিমা ওকে ধমক দিয়ে জোরজবরদস্তি কিছুটা খাবার খাওয়াল।বলল...এখন কান্নাকাটি করে শোক পালনের সময় নয়।এখন প্রীতম কে খোঁজার সময়।এই সময়ে তুই না খেয়ে শরীর খারাপ বাঁধিয়ে বসলে আমরা তোকে নিয়ে ডাক্তারের কাছে ছুটব নাকি প্রীতম কে খুঁজে বার করব...বল দেখি...!" কোনোমতে নিজেকে সামলে নিল বর্ষা।না...এখন এই পরিস্থিতিতে ভেঙ্গে পড়লে হিতে বিপরীত হবে।এখন সবাই মিলে একসাথে হয়ে সবার আগে প্রীতম কে খুঁজে বার করতে হবে।ওর মনের ভিতরে যে হাজারো বেদনা ভীষণভাবে মোচড় দিয়ে... যন্ত্রণায় দাপাদাপি শুরু করে দিয়েছিল... তাকে অতি কষ্টে সামলে নিল বর্ষা।এতদিন ধরে ও বুঝেই উঠতে পারছিল না... নিজের মনের কথাটা কিভাবে প্রকাশ করবে প্রীতমের কাছে...!বেশ কয়েকবার কাগজ কলম নিয়ে... নিজের ঘরের পড়ার টেবিলে বসে... লিখতে বসেছিল নিজের মনের ভিতরের সুপ্ত অনুভূতিগুলো। মোবাইলের ইনবক্সে কিংবা হোয়াটসঅ্যাপ এ ছোট্ট করে তিনটে ম্যাজিক ওয়ার্ড লিখে পাঠাবার মতো মনের জোর ও আজ পর্যন্ত একত্রিত করে উঠতে পারেনি।অথচ... নিজের ডায়রির প্রতিটি পাতায়... হাজারো শব্দের বন্যা যেন অনুভূতির দুকূল ছাপিয়ে উঠেছে।ও মনে মনে মনস্থির করেই এসেছিল এখানে।এতদিন কলকাতায়... হাজারো চেনা মানুষের ভীড়ে...ব্যস্ত জীবনের ছন্দে পা রেখে চলা ব্যস্ত প্রীতম কে একটু নিরালায়... নিজের কাছে ডেকে মনের কথাগুলো যে বলবে... সেই পরিস্থিতি করে ওঠাটা খুবই কঠিন।অচেনা একটা জায়গা... যেখানে ওকে কেউ চেনে না...চারজন কাছের বন্ধু ছাড়া কেউ ওকে ডাকবে না...খুঁজবে না...এমন একটা জায়গায় কোনো অছিলায় প্রীতম কে নিজের কাছে ডেকে নিয়ে সযত্নে উন্মোচন করবে...ওর হৃদয়ে প্রীতম কে ঘিরে আবর্তিত হতে থাকা রামধনুর সবকটি রং। নিঃসংকোচে ওকে বলবে... প্রীতমকে নিয়ে ও একটা সুখের ঘর বাঁধতে চায়।" পাঙ্গোট আসার জন্য তাই ওর ভিতরে ছিল অনেক বেশি উচ্ছ্বাস আর উত্তেজনা। কোথা থেকে যে কি হয়ে গেল...! সন্ধ্যা নেমে এসেছে।সূর্য ঢলে পড়েছে পশ্চিম আকাশে।সারাটা দিন ধরে... প্রীতমকে খোঁজার মরিয়া চেষ্টা চলছিল।থানায় ডায়েরিও করা হল। ওদের কথা শুনে স্হানীয় লোকেরা সকলেই বলল..."আপনারা করেছেন কি! দিনের আলো না থাকতে ওই মন্দিরের ছায়াও মাড়ানো নিষেধ। অবশ্য আপনাদেরকেই বা আর দোষ কি দেব...আপনারা তো কালকেই এসেছেন এই এলাকায়...কিই বা জানেন এই এলাকার মানুষদের মনে প্রতিটা মুহূর্তে পোষন করে চলা তীব্র আতঙ্কের খতিয়ান! বাস্তবিকই... প্রথমটায় ড্রাইভারের মুখে এমন কথা শুনে সেইসব খুব একটা ধর্তব্যের মধ্যে আনেনি ওরা কেউই।ওদের শুধু মনে হয়েছিল... এখানকার স্হানীয় লোকেরা আসলেই দুনিয়ার থেকে শত যোজন পিছিয়ে পড়ে থাকা কতগুলো মূর্খ মানুষ।যত রাজ্যের কুসংস্কার আর অশিক্ষা মনের ভিতরে ঠেসে ঠেসে জমা করে...তার লালন পালন করে চলেছে শুধু। কিন্তু ওই মন্দিরের ভিতরে একটা রাত কাটিয়ে আসার পর...ওরা এখন প্রতি মূহুর্তে অনুভব করতে পারছে... এখানকার স্থানীয় মানুষদের ভয়টা অমূলক কোনো কুসংস্কার বা অশিক্ষা নয়। আর সেই সাথে চার বন্ধু এখন শুধু কপাল চাপড়াচ্ছে। ড্রাইভারের সাবধান বাণী শুনে যদি ওই মন্দির চত্বরে ওরা পা না রাখত... তাহলে হয়তো এখন প্রীতম ওদের সাথেই থাকত। সবাই মিলে হইহই করে বেরিয়ে পড়ত আর্কিওলজির রিসার্চের জায়গার সন্ধানে...! সন্ধ্যা গড়িয়ে রাত হতে চলল। প্রীতমের কোনো খোঁজ ই পাওয়া গেল না! জলজ্যান্ত একটা ছেলে... একটা রাতের মধ্যে এইভাবে কর্পূরের মতো উবে গেল কিভাবে! নাঃ... কিচ্ছু মাথায় আসছে না ঋকের।গোটা দিন ধরে গোটা এলাকায় চরকিপাক খেয়ে... খড়ের গাদায় সূচ খোঁজার বৃথা চেষ্টার ব্যর্থতা মাথায় নিয়ে... এখন বিদ্ধস্ত ঋক মাথায় হাত দিয়ে বসে পড়েছে।দীপিকা আর মধুরিমা এখন বর্ষা কে সামলাতে ব্যস্ত। বর্ষার বাবার সঙ্গে এই লজের মালিকের ব্যক্তিগত আলাপচারিতা রয়েছে।এই সূত্রেই এই লজটি তিনি নির্বাচন করেছেন তাঁর ছাত্রদের থাকবার জন্য। এখন ওদের এহেন বিপদ উপস্থিত হয়েছে জেনে... লজের মালিক নিজে ওদের মাঝে উপস্থিত হয়ে এখন প্রীতম কে খুঁজে বার করার জন্য যথাসাধ্য চেষ্টা করছেন।এই জায়গা তাঁর হাতের তালুর মতো চেনা।তার ওপর এই অঞ্চলে তাঁর প্রভাব প্রতিপত্তি ও যথেষ্টই রয়েছে। তিনি নিজের সমস্ত সোর্স খাটিয়ে... এখানে সেখানে বিস্তর খোঁজাখুঁজির পর এখন তিনিও আপাতত হাল ছেড়ে দিতে বাধ্য হয়েছেন। ঋকের কাঁধে হাত রেখে তিনি একটাই কথা বললেন..."দেখো... আমার পক্ষে যতদূর সম্ভব...আমি করছি...করব ও। তোমাদের বন্ধু প্রীতম কে খুঁজে বার করার জন্য আমি সব সময় তোমাদের পাশে থেকে সাহায্য করব।কিন্তু আমার শুধু একটা জিনিসই বারে বারে মনে হচ্ছে... রাতের অন্ধকারে ওই মন্দির চত্বরে পা রেখে তোমরা মোটেই ঠিক করোনি।আমি যদি খুব ভুল না হই...এই ব্যাপারটা সম্পূর্ণভাবে থানাপুলিশের এক্তিয়ারের বাইরে।" বিহ্বলিত কন্ঠে ঋক বলে উঠল..."অতশত জানি না... এখন একটা চিন্তা আমাদের কুরে কুরে খাচ্ছে... প্রীতমের বাবা মায়ের সামনে আমরা এখন কোন মুখ নিয়ে দাঁড়াব!" দৃশ্য চার রাত গভীর!চার বন্ধু এখন সারাদিনের অক্লান্ত ধকলের পর এখন পুরোপুরি পরিশ্রান্ত হয়ে পড়েছে।ওদের শরীর গুলো আপনা থেকেই এলিয়ে পড়েছে বিছানায়। শুধু বর্ষা একা জেগে বসে রয়েছে চুপচাপ।অনেক্ষন ধরে ও বিছানায় এপাশ ওপাশ করেও কোনোমতে দুচোখের পাতা এক করতে পারছে না।ওর মনে হল...ওর জন্য বাকিদের ঘুমের ডিস্টার্ব হচ্ছে।সারাটাদিন ধরে সবাই মিলে হন্যে হয়ে প্রীতম কে খোঁজাখুঁজি করার পর... দিনশেষে...এখন এই ঘুমটুকু খুবই দরকার সকলের। কাউকে কিছু টের পেতে না দিয়ে...ও চুপচাপ জানলার কাছটায় গিয়ে বসল। আনমনা হয়ে চেয়ে রইল বাইরের দিকে।এমন সময়ে... হঠাৎ ও অনুভব করল...ওর হাতে লেগে রয়েছে চ্যাটচ্যাটে কিছু তরল পদার্থ। হাতদুটো কোলের ওপরে রেখে বসেছিল বর্ষা।কিন্তু এই অন্ধকারে...হঠাৎ ও আরো কিছু খেয়াল করল।ওর দুই হাতের মধ্যে একটা কোনো চটচটে নরম জিনিস ধরা রয়েছে।এবার বর্ষা মনযোগ সহকারে সেইদিকে তাকাল।আর তাকাতেই ওর শরীরের সমস্ত রক্ত হিম হয়ে গেল। আঁধার ঘেরা ঘরের ভিতরে জানলা দিয়ে আগত মায়াবী জ্যোৎস্নার আলোয় বর্ষা দেখল...ওর হাতে ধরা রয়েছে একটি মানুষের হৃৎপিন্ড! হাতে ধরা ওই মাংসল বস্তুটি হঠাৎ মৃদু নড়ে উঠল। হৃদপিন্ডটা যে সদ্য কোনো মানুষের শরীর থেকে উপড়ে নিয়ে আসা হয়েছে...এটা বুঝতে ওর কোনো অসুবিধা হল না। রক্তে মাখামাখি ওই মাংসপিন্ডটা কিভাবে ওর হাতে এল...ও সেইটাও বুঝে উঠতে পারছে না।ভয়ে... আতঙ্কে...বর্ষা আর্তনাদ করে উঠল।কিন্তু...ওর গলা দিয়ে কোনো শব্দ বার হল না।হাতে ধরা ওই মাংসপিন্ডখানি প্রচন্ড আতঙ্কে আর ভয়ে মাটিতে ফেলে দিল বর্ষা।কিন্তু ও বুঝতে পারল...ওর গলার স্বর হঠাৎ করে প্রতিবন্ধী হয়ে গিয়েছে। হাজার চেষ্টা করেও ও গলা দিয়ে কোনো আওয়াজ বার করতেই পারছে না। অন্ধকার ঘরের ভিতরে বিছানায় ঘুমিয়ে অচেতন হয়ে রয়েছে দীপিকা আর মধুরিমা। সারাদিনের ধকলে আর ক্লান্তিতে এখন ওরা একেবারে মড়ার মতো ঘুমোচ্ছে।দিশাহারা হয়ে পড়ল বর্ষা।কি যে হয়ে চলেছে...আর কেনই বা হয়ে চলেছে...তার কোনো দিশা খুঁজে পাচ্ছে না ও।হঠাৎ একটা অদ্ভুত জিনিস চোখে পড়ল ওর।এক্ষুনি যে মাংসল হৃদপিন্ডটা ও ছুঁড়ে ফেলল মেঝেতে...ওই হৃদপিন্ডটার গায়ে জ্যোৎস্নার আলো পড়ে কি যেন একটা চকচক করে উঠেছে! প্রচন্ড কৌতূহল নিয়ে নীচে ঝুঁকে পড়ল বর্ষা। মোবাইলের আলো ফেলে ও দেখল... হৃদপিন্ডটার গায়ে আটকে রয়েছে একখানি আংটি!এ আংটি যে ওর ভীষণভাবে চেনা!এই আংটি তো ও নিজে কিনেছিল।প্রীতম কে নিজের মনের কথা ব্যক্ত করে...ওর হাতে পরানোর জন্য। কিন্তু এইখানে আসবার সময়ে...ব্যাগ গোছানোর সময়ে নিজের ঘরে হাজার খুঁজেও ওটা পায়নি বর্ষা।কি আর করা... বাধ্য হয়েই আংটিটা না নিয়েই এখানে আসার জন্য ট্রেনে পা রেখেছিল বর্ষা। বর্ষার মাথার ভিতর সমস্তকিছু একেবারে তালগোল পাকিয়ে যেতে আরম্ভ করল।এই আংটির কথা একমাত্র সে নিজে ছাড়া আর কেউই জানে না।এমনকি ওর সবচেয়ে কাছের বন্ধু দীপিকা বা মধুরিমাও না। সেই আংটি টা এই জ্যোৎস্নায় স্নাত মায়াবী রাতের আঁধারে... এইভাবে চোখের সামনে দেখবে...এ তো দুঃস্বপ্নেও কল্পনা করে ওঠা সম্ভব নয়! তবে... তবে কি এই আংটির সঙ্গে প্রীতমের নিখোঁজ হওয়ার কোনো যোগসূত্র রয়েছে? কিন্তু তাই বা কি করে হয়...এই আংটির গায়ে তো কারোরই নাম লেখা নেই ষ। জিনিসটা সোনার দোকানে বিক্রি হয়েছে আর ও ক্রেতা হিসেবে কিনেছে মাত্র।কি উদ্দেশ্যে কিনে কাকে এটা দেওয়া হবে...এই চিন্তাটা একান্তই বর্ষার ব্যক্তিগত। তাহলে এই আংটির সাথে প্রীতমের নিখোঁজ হওয়ার যোগসূত্র থাকাটা কিভাবে সম্ভব! কিন্তু এখন পরিস্থিতি এমন ই... বর্ষার মস্তিষ্কের যুক্তি বুদ্ধি ছাপিয়ে মনের আকূলতাটাই প্রবলভাবে মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে।ওর দুই হাতে এখনো লেগে রয়েছে চ্যাটচ্যাটে রক্ত। ঘরের মেঝেতে পড়ে রয়েছে হৃৎপিণ্ডটা।আংটিটা হাতে নিয়ে বর্ষা ক্রমে ওর মানসিক স্থিতি হারাতে শুরু করল।ওর অন্তরাত্মা জুড়ে একটাই কথা প্রতিধ্বনিত হতে থাকল বারে বারে...।এই আংটির সঙ্গে প্রীতমের নিখোঁজ হওয়ার একটা কোনো যোগসূত্র রয়েছে।বর্ষা আংটিটা হাতে নিয়ে... পুরোপুরি অবচেতন অবস্থায়... তোলপাড় করা হৃদয় নিয়ে...জানলা দিয়ে বাইরে বেরিয়ে এল। জ্যোৎস্নায় স্নাত মায়াবী রাতের আলোআঁধারি সাঁতরে...ও এগিয়ে চলল এক অজানা গন্তব্যের অভিমুখে...! দৃশ্য পাঁচ ভোরের আলো ফোটার সাথে সাথে... ঘুম ভেঙ্গে গেল দীপিকার।না...আর দেরি করা ঠিক হবে না।প্রীতমের খোঁজ করার জন্য তাড়াতাড়ি করে বেরিয়ে পড়তে হবে। মধুরিমাকে ঠেলা দিয়ে জাগিয়ে তুলল দীপিকা। ---"অ্যাই ওঠ রে...ছটা বাজে। তাড়াতাড়ি করে মুখ ধুয়ে... খাওয়াদাওয়া করে নিতে হবে আমাদের। বর্ষা বোধহয় ওয়াশরুমে গেছে।তুই ওঠ...আমি ঋকের ঘরে গিয়ে নক করে ওকে ডেকে আনি।" দীপিকা ডাকার সাথে সাথেই তাড়াতাড়ি করে উঠে পড়ল মধুরিমা।উঠে বসে আড়মোড়া ভাঙল।আর সাথে সাথে দীপিকার ভয়ঙ্কর আর্ত চিৎকারে ভীষণভাবে চমকে উঠল ও।দীপিকা এতটাই ভয় পেয়েছে...যে ওর মুখ দিয়ে শুধু চাপা গোঙানি বেরিয়ে আসছে শুধু।ভীত সন্ত্রস্ত হরিণীর মতো প্রচন্ড বেগে বিছানায় ছুটে এসে... মধুরিমাকে জড়িয়ে ধরে থরথর করে কাঁপতে শুরু করল দীপিকা। মধুরিমার কাঁধে মুখটা সজোরে গুঁজে রেখে রীতিমতো ঠকঠক করে কাঁপছে দীপিকা। ---"কি হল রে তোর?এমন করছিস কেন? উদ্বিগ্ন কন্ঠে বলে উঠল মধুরিমা। মধুরিমার কাঁধ থেকে মাথা না সরিয়েই... হঠাৎ নড়ে উঠল দীপিকা।কম্পমান হাত দিয়ে একটু একটু করে অঙ্গুলি নির্দেশ করল যেদিকে... সেইদিকে তাকিয়ে এবার বর্ষার ও শরীরের সব রক্ত যেন জল হয়ে গেল। জানলার কাছে পড়ে রয়েছে মানুষের শরীর থেকে কেটে আলাদা করে নেওয়া একটি হৃৎপিণ্ড! লজের ভিতরে একটা ঘরের ভিতরে একটা মানুষের শরীর হতে ছেঁড়া একটা মানুষের হৃৎপিন্ড চাক্ষুষ করে দীপিকা আর মধুরিমা দুজনেই রীতিমতো থরথর করে কাঁপতে লাগল।ঠিক এমন সময়ে... হঠাৎ ওদের দরজায় টোকা দেওয়ার শব্দ হল। দরজার বাইরে থেকে ঋকের কন্ঠস্বর ভেসে আসছে। ---"দীপিকা, মধুরিমা... তাড়াতাড়ি উঠে পড়...আর দেরি করিস না। ওদিকে কোনোমতে নিজেকে একটু ধাতস্থ করে মধুরিমা উত্তর দিল...তুই ঘরে গিয়ে হাতমুখ ধুয়ে নে...আমরা আসছি।" উত্তর পেয়ে ঋক ঢুকে গেল নিজের রুমে।মধুরিমা এবার জোরে হাঁক দিয়ে ডেকে উঠল বর্ষাকে। "কি রে বর্ষা...তোর হল?একটু তাড়াতাড়ি বেরিয়ে আয়... এখানে পরিস্থিতি মারাত্মক। দীপিকাকে ওয়াশরুমে নিয়ে গিয়ে ওর চোখেমুখে জল দিয়ে দিতে হবে।" দীপিকা মধুরিমার কাঁধে মাথা রেখে এখন পুরোপুরি চেতনা হারিয়ে বসেছে।ওদিকে ওয়াশরুম থেকেও অনেক্ষন কোনো সাড়াশব্দ আসছে না। মধুরিমা এবার ভীষণ বিচলিত হয়ে পড়ল। অচৈতন্য দীপিকাকে বিছানায় শুইয়ে রেখে ছুটে গেল ওয়াশরুমের দিকে... বর্ষা কে ডাকতে। কিন্তু ওয়াশরুমের দরজার কাছে গিয়ে ও দেখল... ওয়াশরুমের দরজা খোলা রয়েছে।ও বুঝতে পারল... বর্ষা ওয়াশরুমে নেই! বুকের ভিতরটা ছ্যাৎ করে উঠল মধুরিমার। কোথায় গেল বর্ষা!ছোট একটা বেডরুম আর তার সাথে লাগোয়া ওয়াশরুম...এর ভিতরেই দরজা লক করে রাতে শুয়েছিল তিন বান্ধবী দীপিকা, মধুরিমা আর বর্ষা। হঠাৎ একটা রাতের ব্যবধানে জলজ্যান্ত বর্ষা কোথায় উধাও হয়ে গেল!হঠাৎ মধুরিমার পিঠ দিয়ে একটা ঠান্ডা স্রোত বয়ে গেল যেন...! প্রীতম তো এইভাবেই... হঠাৎ একটা রাতের মধ্যে গায়েব হয়ে গিয়েছিল। একরাশ আতঙ্ক যেন ওর পায়ের তলার মাটি ফুঁড়ে ধীরে ধীরে উঠে এসে... ওকে আষ্টেপৃষ্ঠে পেঁচিয়ে ধরতে আরম্ভ করল।ও পুরোপুরি কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে তাকিয়ে রইল মেঝেতে পড়ে থাকা ওই রক্তমাখা মাংসপিন্ডের দিকে...! হঠাৎ জোরে জোরে দরজা ধাক্কা দেওয়ার শব্দ হল ঘরের দরজায়।ঋক পাগলের মতো চেঁচিয়ে যা বলছে...তা শুনে আর স্হির থাকতে পারল না মধুরিমা। একছুটে গিয়ে দরজাটা খুলে বিস্মিত কন্ঠে বলে উঠল..."কোথায় কিভাবে পাওয়া গেল প্রীতমের খোঁজ? কোথায় আছে এখন ও?" দৃশ্য ছয় আস্তে আস্তে চোখ মেলে জেগে উঠতে আরম্ভ করল বর্ষা।চারপাশের পরিবেশটা ক্রমে ঝাপসা থেকে স্পষ্ট হতে আরম্ভ করল ওর চোখে।আর সাথে সাথে একরাশ ভয়ে আর প্রবল আতঙ্কে ও ভীষণভাবে চমকে উঠল। ও এতক্ষণ ধরে যেখানে শুয়ে রয়েছে...সেটা যে একটা ভূগর্ভস্থ একটা অতল গহ্বর...সেটা অচিরেই বুঝতে পারল বর্ষা।মাথাটা একটু তুলে...ও উঠে বসল।আর তারপর যে দৃশ্য দেখল...তাতে ওর সর্বাঙ্গে কাঁটা দিয়ে উঠল।ও দেখল...ও পড়ে রয়েছে একটা ভয়াল দর্শন... সুবিশাল দেবীমূর্তির পায়ের কাছে।মূর্তিটির ভিতরে যেন সদ্য প্রাণ প্রতিষ্ঠা হয়েছে।দেবীর চোখদুটো আগুনের লেলিহান শিখার মতো প্রজ্জ্বলিত।তার ছয়টি হাতে ধরা রয়েছে অস্ত্র!গলায় ঝুলছে... মড়ার খুলি দিয়ে নির্মিত একটি মালা! অন্ধকার কুঠুরির ভিতরে...ওই ভয়াল দর্শন দেবীর মুখে ফুটে উঠেছে এক পৈশাচিক হাসি।সেদিকে তাকালেই বুকের রক্ত শুকিয়ে যাওয়ার উপক্রম হল বর্ষার।এ সে কোথায় এসে পড়েছে!ভয়ে... আতঙ্কে...ওর কন্ঠ চিরে বেরিয়ে এল মর্মভেদী আর্তচিৎকার! কিন্তু হায়... অদৃষ্টের কি পরিহাস...এই অন্ধকার কুঠুরির ভিতরে সে নিজে ছাড়া আর কোনো রক্তমাংসের মানুষের অস্তিত্বই নেই!এই নির্মম সত্যটা অচিরেই অনুধাবন করতে পারল বর্ষা।তড়াক করে উঠে দাঁড়িয়ে পড়ল বর্ষা।এই ভয়ঙ্কর অন্ধকার কুঠুরি হতে বাইরে বেরোনোর রাস্তা খুঁজতে হবে ওকে... যেমনভাবেই হোক! ও ইতিউতি ছোটাছুটি শুরু করে দিল।আর ছুটতে গিয়েই ও পায়ের পাতায় অনুভব করল...কিছু নরম...মাংসল বস্তুর অস্তিত্ব। চকিতে ও নীচের দিকে তাকাল।নীচে তাকিয়ে ও যা দেখল...তাতে ওর পায়ের তলা থেকে মাটি সরে গেল।ও দেখল... অসংখ্য মানুষের শরীর হতে ছিন্ন করে ফেলা রক্তমাখা হৃৎপিণ্ড...কিছু কোথাও স্তূপের মতো জড়ো হয়ে রয়েছে... আবার কিছু ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে এদিকে ওদিকে...! দৃশ্য সাত প্রীতমের অচৈতন্য শরীর টা ধরাধরি করে এনে সবে রাখা হয়েছে প্রীতমের শোবার ঘরের খাটটায়। মাঝে মাত্র দুই দিন মতো গেছে।এর মধ্যেই প্রীতমের শরীরের যা হাল হয়েছে...তা আর কহতব্য নয়।এই দুই দিনেই...ও যেন দুই কুড়ি বছর বয়স পার করে ফেলেছে।চুলে পাক ধরতে শুরু করেছে...চামড়াও কুঁচকে গেছে আশি বছরের বৃদ্ধ মানুষের মতো।শুধুমাত্র মুখের আদল টুকুর জন্য ই ওকে চেনা সম্ভব হয়েছে।না হলে... অল্পদিনের পরিচিত কোনো মানুষ... কখনোই ওকে চট করে চিনে উঠতে পারবে না। ---"মাই গুডনেস...ওর এই অবস্থা হল কি করে! আস্তে আস্তে চোখ মেলতে শুরু করল প্রীতম। আধবোজা চোখের আবছা দৃষ্টিতে ও দেখতে পেল...তিনটে মাথা ওর উপরে ঝুঁকে রয়েছে।ওদের চোখেমুখে প্রচন্ড দুশ্চিন্তার ছাপ।একজন মেয়ে হাতে একখানি জলের গ্লাস নিয়ে ওর চোখে মুখে আলতো করে জল ছিটিয়ে দিচ্ছে। কারা এরা?এদের তো আগে কোনোদিন দেখেছে বলে মনে করতে পারছে না প্রীতম...!দুজন অল্পবয়সী মেয়ে আর একটা অল্পবয়সী ছেলে ওকে ঘিরে বসে রয়েছে।চোখটা পুরোপুরি মেলে তাকাতেই... যেন ওদের তিনজনেরই ঘাম দিয়ে জ্বর ছাড়ল।একজন মেয়ে উল্লসিত হয়ে বাকি দুজনকে বলে উঠল..."এসেছে... এসেছে... প্রীতমের জ্ঞান ফিরে এসেছে!" প্রীতম...সে আবার কে! জ্ঞান ফিরে আসার কথাই যখন বলছে মেয়েটা...তখন বাই এনি চান্স...ওর নিজের ই নাম কি প্রীতম! চোখ মেলে চারপাশে ভালো করে তাকিয়ে দেখতে শুরু করল প্রীতম।ওর মনের ভিতরে এখন শুধু একটাই প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে।"আমি কে?কোথা থেকে আমি এলাম এখানে? চারপাশে যারা রয়েছে...তারা কারা? এদেরকে আগে কোনোদিন দেখেছে বলে মনে পড়ছে না ওর। প্রবল এক অস্তিত্ব সংকট আষ্টেপৃষ্ঠে ঘিরে ধরতে শুরু করল প্রীতম কে। দুই হাতে মাথাটা চেপে ধরে বসে পড়ল প্রীতম। ঋক বলে উঠল... "দীপিকা... ওকে জলের বোতলটা এগিয়ে দে তো...!" সত্যিই... প্রচন্ড তেষ্টা পেয়েছিল প্রীতমের। দীপিকা ওর হাতে জলের বোতলটা এগিয়ে দিয়ে বলল..."নে খেয়ে নে...আর কোনো চিন্তা নেই তোর।এখন তুই একদম নিরাপদ।" ---"প্রীতমের খোঁজ তো পাওয়া গেল।জঙ্গলে ঘেরা পাহাড়ের গায়ে এইভাবে ওকে পড়ে থাকতে দেখব...সে কি আমরা ভেবেছিলাম!এখন বর্ষাকে কি করে...কোথা থেকে খুঁজে বার করব... সেইটাই বুঝতে পারছি না।" একটা লম্বা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলে উঠল ঋক। ---"শ্ শ্ শ্...তোর কি বুদ্ধিশুদ্ধি আর হবে না?দেখছিস ছেলেটার এখন এই অবস্থা... এখন ই ওর সামনে বর্ষার কথাটা না তুললেই নয়?" ঋকের কাঁধ ঝাঁকিয়ে দিয়ে বলে উঠল দীপিকা। দীপিকার কথায় ও বুঝতে পারল ওর ভুলটা। সত্যিই...এখন প্রীতমের যা অবস্থা...তাতে এখন...এই মূহুর্তে বর্ষার নিখোঁজ হয়ে পড়ার শকটা প্রীতম নিতে পারবে না।পাঙ্গোট আসার পথেই ঋক আর দীপিকাকে প্রীতম চুপিসারে ব্যক্ত করেছিল নিজের মনের ভিতরে ছটফট করতে থাকা দীর্ঘদিনের অনুভূতির কথা। বর্ষাকে যে ও নিজের হৃদয় অর্পণ করে বসে রয়েছে...এই কথাটা ও মনে চেপে রেখেছিল সে হাজারো ইতস্তততার সাথে...নতুন জায়গায় পৌঁছে...পাহাড়ী সৌন্দর্যে ঘেরা প্রকৃতির কোলে দাঁড়িয়ে একান্তে নিজের মনের কথাটা বর্ষাকে বলে ফেলবে এটা প্রীতম মনস্থির করে নিয়েছিল। এখন ওর এই অবস্থায়... বর্ষার নিখোঁজ হওয়ার খবর যদি ওকে জানানো হয়... তাহলে ও দুশ্চিন্তায় আরো অসুস্থ হয়ে পড়বে। দীপিকার হাতে কড়া ঝাঁকুনি খেয়ে...এই ব্যাপারটা ঋকের খেয়াল পড়ল। এক্ষুনি নিজের বলা কথা খানি আড়াল করতে...ও জোরে গলা খাকারি দিয়ে বলে উঠল..."মধুরিমা... ডাক্তার বাবুকে কখন খবর দিয়েছিলি বল তো...উনি তো এখনো এসে পৌঁছলেন না...! দৃশ্য আট বদ্ধ... স্যাঁতসেঁতে অন্ধকার এই কুঠুরির ভিতরে...ক্রমশ যেন দম বন্ধ হয়ে আসার উপক্রম হল বর্ষার।ভয়ে... আতঙ্কে... দিগ্বিদিক জ্ঞানশূন্য হয়ে ও পাগলের মতো ছোটাছুটি শুরু করে দিল। কিন্তু হায়...এই অন্ধকার কুঠুরির থেকে বাইরে বার হওয়ার কোনো রাস্তাই ও খুঁজে পেল না। পরিশ্রান্ত... বিদ্ধস্ত বর্ষা...দুই হাতে নিজের মাথাটা চেপে ধরে বসে পড়ল মাটিতে। আস্তে আস্তে ওর গতরাতের সমস্ত ঘটনা ছবির মতো ভেসে উঠতে শুরু করল।গভীর রাতে জানলার পাশে আনমনা হয়ে বসে থাকার সময়ে... হঠাৎ পায়ের কাছে ঠেকেছিল একটি মানুষের শরীর থেকে ছিঁড়ে আনা টাটকা হৃৎপিণ্ড!ওই হৃৎপিণ্ডের গায়ে আটকে ছিল... প্রীতমের নাম করে ওর কেনা সোনার আংটিখানি।আংটিটা... ওইভাবে একটা মনুষ্য শরীর হতে ছিন্ন হৃদপিন্ডের গায়ে লেগে থাকতে দেখামাত্র... প্রচন্ডভাবে উথালপাথাল করে উঠেছিল ওর মন। প্রীতমের নিখোঁজ হওয়ার সাথে যে এই আংটির কোনো যোগসূত্র রয়েছে...এই চিন্তাটা ওর মনের দুকূল ছাপিয়ে প্রবল ঢেউ রূপে আছড়ে পড়ে।ওই আংটি হাতে নিয়েই ও... উন্মাদিনীর মতো ঘরের জানলা দিয়ে বাইরে বেরিয়ে আসে। তারপর... তারপর আর কিচ্ছু মনে নেই।কিচ্ছু মনে করতে পারছে না ও।এই অন্ধকার কুঠুরির ভিতরে কিভাবে ও এসে পৌঁছাল...তার কিচ্ছু মনে করতে পারছে না ও।চোখ মেলে চারপাশে তাকালে শুধু দেখতে পাচ্ছে... চারপাশে পড়ে রয়েছে রাশি রাশি কাটা হৃৎপিণ্ড!ভয়ে... আতঙ্কে আর তীব্র ঘৃণায়...গা গুলিয়ে উঠল বর্ষার।ওর গলা চিরে বেরিয়ে এল ভয়ার্ত আর্তচিৎকার আর ক্রন্দন। দৃশ্য নয় একটু আগে প্রীতমকে দেখে চলে গেলেন ডাক্তার বাবু। প্রীতম কিছু খাবার খেয়ে... ওষুধ খেয়ে নিয়ে এখন ঘুমোচ্ছে অঘোরে। এখন ও পুরোপুরি বিপদমুক্ত।কিন্তু তাও...এখন প্রীতমকে ঘিরে ওদের দুশ্চিন্তার শেষ নেই।কারণ এখন ওরা যে প্রীতম কে দেখছে... সেই প্রীতম ওদের পুরোপুরি অচেনা।ওর হাবভাব... চালচলনে ফুটে উঠেছে একটা হিংস্র...জান্তব হাবভাব।চামড়া কুঁচকে গিয়ে আর চুলে পাক ধরে... ওকে যেন আশি বছরের বৃদ্ধের মতো দেখাচ্ছে।আর সবচাইতে বড়ো সমস্যা হল...ও এখন পুরোপুরি স্মৃতি ভ্রষ্ট হয়ে পড়েছে। যাদের মধ্যে এখন ও আছে... তাদের কাউকেই ও চিনতে পারছে না ।নিজের নামটুকু পর্যন্ত মনে করতে পারছে না।সামান্য দুই দিনের ব্যবধানে... একটা বছর বাইশের তরতাজা যুবক একটা ভাবলেশহীন ভঙ্গুর বৃদ্ধ তে পরিণত হয়েছে। ডাক্তার ওর শরীরের সুস্থতার জন্য কিছু ওষুধ প্রেসক্রাইব করে গিয়েছেন ঠিকই... তবে তিনি এও বলে গিয়েছেন... প্রীতমের এখন যা কন্ডিশান...এর ট্রিটমেন্ট কোনো আধুনিক চিকিৎসা শাস্ত্রেও নেই।" বলতে গেলে... এতদিনের চেনা হাসিখুশি প্রীতম কে সবাই চিরকালের জন্যই হারিয়ে ফেলল এই দিন কয়েকের ব্যবধানে...! দেওয়ালে সজোরে একটা ঘুঁষি মেরে ঋক বলে উঠল..."আর্কিওলজির রিসার্চের জন্য সবাই মিলে কত হইহই করে সবাই মিলে এসেছিলাম এখানে...যদি আগে ঘূণাক্ষরেও জানতাম... এখানে পা রাখার সাথে সাথেই এইসব অঘটন ঘটবে... তাহলে কক্ষনো আসতাম না।" মধুরিমা ঋকের কাছে এগিয়ে এসে...ওর কাঁধে হাত রেখে বলল..."মাথা ঠান্ডা কর ঋক...এখন যদি আমরাই এইভাবে ভেঙে পড়ি...তাহলে প্রীতম কে কি করে সুস্থ করে তুলব...আর বর্ষাকেই বা কি করে খুঁজে বার করব বল দেখি...!" এই সময়ে... হঠাৎ দীপিকা বলে উঠল..."প্রিন্সিপাল স্যার তো এখন কলকাতাতেই নেই রে।উনি এখন দেশের বাইরে গিয়েছেন পারিবারিক দরকারে।ওনার বাড়ির মেইড এই কথা বলল আমাকে।আর স্যারকে ফোনে ট্রাই করে তো পাওয়াই যাচ্ছে না...কি করি বল তো এখন... আমাদের সাথে প্রজেক্টের কাজে এসে তাঁর মেয়ে মিসিং...এই কথাটা আর কত দেরি করে জানানো সম্ভব বল দেখি...!" ঋক এবার ধপ করে বসে পড়ল বিছানায়। "এখানে পা রাখার পর থেকেই কি যে হয়ে চলেছে...তার কোনো কূলকিনারাই পাচ্ছি না। প্রথমে প্রীতম নিখোঁজ হল।তারপর বর্ষা।এখন প্রীতমের ওপর যে কি দূরূহ অসুখ ভর করেছে তা ঈশ্বর ই জানেন!" মধুরিমা হঠাৎ বলে উঠল..."ও হ্যাঁ... ভালো কথা...আজ সকালে আমাদের ঘর থেকে যে মানুষের হৃৎপিন্ডটা পাওয়া গেল...ওটা ঠিকভাবে মাটি চাপা দিয়ে দিয়েছিস তো দীপিকা?" ---"হ্যাঁ রে... আমাদের তিনজনের বাইরে যাতে ওটা কাকপক্ষীর ও নজরে না পড়ে...তাই ঠিকঠাক সময়মতো আমি ওটা মাটির তলায় চাপা দিয়ে দিয়েছি।" ঋক এবার উদ্বিগ্ন কন্ঠে বলে উঠল... এখানে আমাদের পা রাখাটাই দেখতে পাচ্ছি সবচাইতে বড়ো অমঙ্গল ডেকে এনেছে সর্বত্র। চারপাশে একটার পর একটা ছোট বাচ্চা উধাও হয়ে যাচ্ছে...আর পরদিন সকালে মিলছে তাদের হৃদপিন্ড খুবলে নেওয়া ক্ষতবিক্ষত মৃতদেহ!আমি শহরের ছেলে। অযৌক্তিক কুসংস্কার আমি বিশ্বাস করি না... কিন্তু বিগত দুদিন ধরে যা সব ঘটে চলেছে...তাতে এখন আমার কেন জানি মনে হচ্ছে... স্হানীয় লোকজনেরাই কোথাও হয়তো ঠিক।ওই মন্দিরে পা রাখাটাই একদম উচিত হয়নি আমাদের!" "এইভাবে ভেঙে পড়িস না ঋক...এখন আমাদেরকেই শক্ত থেকে পরিস্থিতি সামলাতে হবে। দেখতেই তো পাচ্ছিস... প্রিন্সিপাল স্যারের সাথে যোগাযোগ করা যাচ্ছে না... প্রীতমকে খুঁজে পেয়েছি আমরা...এখন আমাদের কাজ হল বর্ষাকে খুঁজে বার করা। ওকে খুঁজে পাওয়া গেলেই... সাথে সাথে টিকিট কেটে কলকাতায় ফিরব আমরা।পড়াশোনা... প্রজেক্টের নিকুচি করেছে।আমরা পাঁচজন অক্ষত শরীর নিয়ে ফিরতে পারলে সেটাই অনেক!" বলে উঠল দীপিকা। দৃশ্য দশ রাত গভীর।প্রীতম আর ঋক শুয়ে পড়েছে একটু তাড়াতাড়িই।দীপিকা আর মধুরিমা এখনো নিজেদের মধ্যে কথা বলে চলেছে। আসলে... ওদের মনের ভিতরের ধন্দ টা কিছুতেই কাটছে না। হঠাৎ করেই চারপাশে উধাও হতে আরম্ভ করেছে ছোট ছোট শিশুরা।আর পরদিন সকালে মিলছে তাদের ক্ষতবিক্ষত লাশ! শুধু তাই নয়... তাদের শরীর থেকে কেউ নৃশংসভাবে হৃদপিন্ডটা উপড়ে নিয়ে চলে যাচ্ছে।এইসব কে বা কারা করছে?এই দুই কি তিনদিন ধরে এই এলাকা জুড়ে শুরু হয়েছে ভয়াল ত্রাসের রাজত্ব! চারদিকে এখন কান পাতলে শুধু শোনা যাচ্ছে হাহাকার আর সন্তানহারা মায়েদের কান্না!আর এই সমস্তকিছু আরম্ভ হয়েছে মাত্র দিন দুয়েক আগে... অর্থাৎ... ওদের এখানে পা রাখার সাথে সাথে। আজ আর জানলা খুলে রেখে শোয়ার সাহস নেই ওদের।দরজা জানলা বন্ধ করে রাখার ফলে...ঘরটা খুবই বদ্ধ লাগছে ঠিকই... কিন্তু তবুও...তার মধ্যেই ঘরের আলো নিভিয়ে...ডিম লাইটটা জ্বেলে বিছানায় পাশাপাশি শুয়ে রয়েছে দীপিকা আর মধুরিমা। এখন ওদের কারোর চোখে ঘুম নেই। গতকাল রাতে এই ঘরেই ওদের দুজনের সাথে ছিল বর্ষা। অথচ এখন... মেয়েটা কোথায়...কি অবস্থায় রয়েছে...তা ঈশ্বর ই জানেন...! বিছানায় শুয়ে দীপিকা আর মধুরিমা এপাশ ওপাশ করে চলেছে শুধু। হঠাৎ ঘরের ভিতরের পিন পড়া নিস্তব্ধতা ভেঙে কথা বলে উঠল দীপিকা... ---"আচ্ছা মধুরিমা...তোর কি মনে হয়...আমরা এখানে পা রাখার পর থেকে যা যা হয়ে চলেছে...তার সবটাই কি কাকতালীয়?আমরা পাঁচজন কিন্তু এখানকার স্হানীয় লোকেদের বিশ্বাস কে অশিক্ষা আর কুসংস্কার বলে উড়িয়ে দিয়ে...রাতের অন্ধকারে ওই মন্দিরে শুধু পা ই রাখিনি... সেখানে কাটিয়েছি একটা গোটা রাত।এখন কেন জানি আমার মন বলছে... আমাদের ওই অপকর্মের ই ফল ভোগ করছে সমস্ত এলাকাবাসী।" একটা লম্বা দীর্ঘশ্বাস ফেলে মধুরিমা বলে উঠল..."হ্যাঁ রে... আমার ও কেমন যেন এইরকমটাই মনে হচ্ছে। আমাদেরই কৃতকর্মের মাসুল চোকাচ্ছে এলাকাবাসী...ছোট ছোট নিষ্পাপ বাচ্চাগুলো...!" শেষের কথাটা বলার সময় গলাটা ধরে এল মধুরিমার। দীপিকা নিজের হাতের তালু দিয়ে চেপে ধরল মধুরিমার হাত। বলে উঠল..."আমাদের শক্ত হতে হবে রে মধুরিমা... ভেঙ্গে পড়লে চলবে না কিছুতেই। আমার কি মনে হয় বল তো... এইভাবে নির্বিচারে শিশু নিধন, প্রীতমের এমন ভয়ঙ্কর অসুখ... বর্ষার এইভাবে নিখোঁজ হয়ে যাওয়া... এগুলো আসলে কোনও বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়।এই প্রতিটা ঘটনার...একে অপরের সঙ্গে কোনো একটা নিবিড় যোগসূত্র রয়েছে।" মধুরিমা বলে উঠল... "গতকাল রাতে আমাদের ঘরে রক্তমাখা হৃৎপিণ্ডটা কোথা থেকে এল... এইভাবে নির্বিচারে শিশু নিধন যে বা যারা করে চলেছে... তাদের সাথে আমাদের যোগসূত্রটা কোথায় বল তো...! আমাদের ঘরে ওইভাবে একটা মানুষের হৃৎপিন্ড ফেলে রেখে যাওয়ার কি উদ্দেশ্য থাকতে পারে?" দুই হাতে নিজের মাথাটা চেপে ধরে বসে পড়ল দীপিকা..."জানি না...যা সব ঘটে চলেছে...তার মাথামুন্ডু কিচ্ছু মাথায় ঢুকছে না।তবে এই সমস্ত রহস্যের জট আমাদেরকেই ছাড়াতে হবে। বর্ষার খোঁজ পেয়ে যদি হয়... তাহলে আমাদের সমস্তকিছুর গভীরে ঢুকতে হবে।" এই বলে ও বিছানা থেকে নেমে... জানলার দিকে এগিয়ে গেল। ছিটকিনি তে হাত লাগিয়ে খুলে ফেলল জানলাটা।জানলা খোলার শব্দ হওয়ার সাথে সাথে একেবারে হাঁ হাঁ করে উঠল মধুরিমা। "আরে আরে করছিস কি তুই! সন্ধ্যে না হতেই আমি ওই জানলা বন্ধ করে দিয়েছি...আর তুই কিনা এই মাঝরাতে ওই জানলা খুলতে যাচ্ছিস!কাল রাত্রে কি হল সেসব ভুলে গেলি?" দীপিকা জানলা খুলতে খুলতে বলল..."আরে দুশ্চিন্তা করিস না।আমি যাস্ট পাঁচ কি দশ মিনিটের জন্য খুললাম জানলাটা।ঘরটা ভীষণ বদ্ধ লাগছে। একটু পরেই জানলা বন্ধ করে দেব ফের।" এই বলে দীপিকা জানলার পাল্লা দুটো ভালো করে দুদিকে মেলে ধরে প্রাণভরে মুক্ত বাতাসে শ্বাস নিতে লাগল।মধুরিমা একটু ঘুমোনোর চেষ্টা করার জন্য চোখদুটো বুজল।হঠাৎই বিনা মেঘে বজ্রপাতের মতোই... দীপিকার গগনভেদী আর্তচিৎকারে চারপাশের নিস্তব্ধ বাতাস প্রবলভাবে কেঁপে উঠল। দৃশ্য এগারো অন্ধকার কুঠুরির বদ্ধ ও ভ্যাপসা বাতাসে শ্বাস নেওয়াটাই দুষ্কর হয়ে পড়েছে বর্ষার।তার ওপর এখানকার এই ভারি বাতাসের পরতে পরতে মিশে রয়েছে এক বীভৎস পচা দুর্গন্ধ! চারপাশে ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে শুধু অসংখ্য মানুষের হৃৎপিন্ড!এই ভয়াবহ সময়েও...বর্ষা এতটুকু বুঝতে পারছে... চারপাশে ছড়িয়ে ছড়িয়ে থাকা এই মানুষের হৃৎপিন্ডগুলি কোনো প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের হৃৎপিন্ড নয়।অবোধ শিশুদেরকে নির্বিচারে হত্যা করে... তাদের শরীর থেকে এই হৃৎপিণ্ডগুলি নৃশংসভাবে উপড়ে নিয়ে এসে জড়ো করা হয়েছে এখানে! ওই ভয়ঙ্কর দর্শন দেবীমূর্তির আগুন দুই চোখ দিয়ে ক্রমে যেন ঝরে পড়তে শুরু করেছে জ্বলন্ত অঙ্গার!এক পৃথিবী ভয়াল ক্ষুধা যেন গর্জে উঠতে শুরু করেছে পরতে পরতে!ওই ক্ষুধার অনলে যে জ্বলেপুড়ে ছারখার হয়ে যেতে বসেছে গোটা ধরিত্রী...এটা আঁচ করতে বর্ষাকে খুব বেশি বেগ পেতে হল না।ক্ষুধার অনল ঝরতে থাকা ওই চোখ দিয়ে ক্রমাগত যে রক্তাভ আলোকরশ্মি ছড়িয়ে পড়ছে চারদিকে...সেই তীব্র আলোয় চারপাশের এমন বীভৎস পরিবেশ চাক্ষুষ করে...সাত জন্মের অন্নপ্রাশনের ভাত উগরে বেরিয়ে আসার মতো এই ভয়াবহ দুর্গন্ধের ভিতরে পড়ে... রীতিমতো দমবন্ধ হয়ে আসবার উপক্রম হল বর্ষার।ও এটা এখন পরিষ্কার বুঝতে পারছে...এই ভয়ঙ্কর মৃত্যুপুরী থেকে ওর বেরোনোর কোনো উপায় নেই।এই কুঠুরি লক্ষ্য যে আসলেই একটা উপাসনালয়...এটা বেশ বুঝতে পারছে বর্ষা। কিন্তু...একটা উপাসনালয়...কি করে যে এত অপবিত্র...এত পৈশাচিক হতে পারে...এটা কোনোমতে বুঝে উঠতে পারছে না বর্ষা। কিন্তু এতটুকু স্পষ্ট বুঝতে পারছে...দুর্গন্ধযুক্ত এই পৈশাচিক অন্ধকার কুঠুরির ভিতরেই একটা সময়ের পর না খেয়ে...শ্বাসকষ্ট নিয়ে... বেঘোরে মরতে হবে ওকে।ওর ফুলের মতো শরীরটা...এই রক্তমাখা মাংসপিন্ডগুলোর সঙ্গে মিলেমিশে একাকার হয়ে যাবে! দৃশ্য বারো আকাশ ফর্সা হয়ে এসেছে। মধুরিমা আর ঋক দীপিকার চোখেমুখে জল ছিটিয়ে জ্ঞান ফেরানোর চেষ্টা করছে। হঠাৎ দীপিকা প্রচন্ড একটা চিৎকার করে...তড়াক করে উঠে বসল।ওর ভয়ার্ত চোখমুখের অবস্থা দেখে ঋক আর মধুরিমা প্রচন্ড ঘাবড়ে গিয়ে ও ওর মুখ চাওয়া চাওয়ি করল।দীপিকার ভিতরে ভয় এমনভাবে চেপে বসেছে...যে ওর গলা দিয়ে আওয়াজই বার হচ্ছে না ঠিকমতো।মধুরিমা দীপিকার পাশে বসে...দুহাতে ওর কাঁধে আলতোভাবে চাপ দিয়ে বলে উঠল...কি হয়েছে দীপিকা?কিসে এত ভয় পেলি তুই?" মধুরিমার কথার প্রত্যুত্তরে ওর গলা দিয়ে শুধুই একটা চাপা গোঙানির আওয়াজ বেরিয়ে এল। মধুরিমা বেডসাইড টেবিলের ওপরে রাখা জগ থেকে গ্লাসে জল ঢেলে এগিয়ে ধরল দীপিকার দিকে।তারপর বলল..."থাক...এখন আর কোনো কথা বলার দরকার নেই তোর।" জলের গ্লাস হাতে পেয়ে দীপিকা ঢকঢক করে এক চুমুকে পুরো জলটা শেষ করে গ্লাসটা সশব্দে রাখল টেবিলে। এবার মধুরিমা ওর কপালে হাত দিয়ে দেখল। কপালে হাত রাখার সঙ্গে সঙ্গে ও মৃদু আর্তনাদ করে উঠল।বলল..."হা ভগবান...ওর তো মারাত্মক জ্বর এসেছে।" ঋক উদ্বিগ্ন কন্ঠে বলে উঠল..."ওর জ্বর এসেছে? তাহলে বরং বর্ষাকে খুঁজতে তোদের দুজনেরই আর যাওয়ার দরকার নেই। মধুরিমা...তুই ঘরে থাক... দীপিকাকে দেখভাল কর...আমি নিজেই বরং বর্ষার খোঁজে বেরিয়ে পড়ি...আর মধুরিমা শোন... তোকে কিন্তু আপাতত প্রীতমকেও একটু দেখে রাখতে হবে বুঝলি...ওর এখন মাথা ঠিক নেই একেবারে।" মধুরিমা বলে উঠল..."তুই চিন্তা করিস না ঋক...আমি ঘরে থেকে দুজনকেই দেখে রাখব।তুই যত তাড়াতাড়ি সম্ভব বর্ষাকে খুঁজে আন... আমার আর ভালো লাগছে না... প্রজেক্টের নিকুচি করেছে।এখন মানে মানে সকলে প্রাণ হাতে করে এখান থেকে পালাতে পারলে বাঁচি!" যা বলেছিস...আর এক মূহুর্তও এই নরকে থাকার কোনো ইচ্ছা নেই আমার।তুই সবটা একটু দেখে রাখিস...আমি বেরোলাম...বুঝলি!" মধুরিমা বলে উঠল..."সাবধানে যাস।" ঋক ঘরের দরজার চৌকাঠে পা রাখার সাথে সাথে... সুন্দর সকালের মাধুর্যটাকে ভেঙ্গে খানখান করে দিয়ে... ঘরের বাইরে থেকে ভেসে এল এক মর্মভেদী ক্রন্দনধ্বনি। শব্দ টা যে ঘরের জানালার কাছাকাছি জায়গা থেকেই আসছে...এটা বুঝতে পারল ঋক আর মধুরিমা। ঋক বলে উঠল..."উফ...কি যে আরম্ভ হয়েছে এখন চারদিকে...কত কান্না আর কত মৃত্যু হলে তবে যে এখানে একটু স্বস্তি আসবে...তা ঈশ্বর ই জানেন। নিশ্চয়ই আরো কোনো ফুটফুটে বাচ্চার প্রাণ গেছে নৃশংসভাবে...!কি আর করা...এখন এইদিকে তাকালে আর চলবে না। বর্ষাকে খুঁজে বার করার একটা ব্যবস্থা করতে হবে।আমি এলাম...দেখিস সবটা...।" এই বলে হনহন করে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল ঋক। ঋক ঘর থেকে বেরিয়ে যাওয়ার পর...মধুরিমা দীপিকাকে বলল...তুই বোস...আমি একটু আসছি।" সাথে সাথে ভীত সন্ত্রস্ত দীপিকা... মধুরিমার হাতখানা শক্ত করে ধরে বলল..."কোথায় যাচ্ছিস তুই... আমাকে একা ফেলে রেখে?" মধুরিমা ওর কাঁধে হাত রেখে বলল.. "আরে পাগলি...আমি এই ঘরেরই বাইরে যাচ্ছি একটু... গিয়ে দেখে আসি... এইভাবে কান্নাকাটি হচ্ছে কেন বাইরে...যাস্ট যাব আর আসব। এবার মধুরিমা একছুটে ঘরের বাইরে চলে গেল।দীপিকা নিজের মাথায় হাত রেখে চুপচাপ বসে রইল।খানিক বাদে দরজায় শব্দ পেয়ে দীপিকা তাকাল সেদিকে।ও দেখল... দরজা ধরে দাঁড়িয়ে ভয়ে রীতিমতো কাঁপছে মধুরিমা।দীপিকা মাথা তুলে ওর দিকে জিজ্ঞাসু চোখে তাকাল।নিজেকে সামলে নিতে খানিকটা সময় নিল মধুরিমা।তারপর ধীর পায়ে এগিয়ে এল খাটের দিকে।কম্পিত কন্ঠে বলে উঠল..."কি ভয়ঙ্কর দৃশ্য... আমার হাত পা একেবারে শিউরে উঠছে।" এতক্ষণে দীপিকা নিজেকে মোটামুটি সামলে নিয়েছে।ও মধুরিমার হাত নিজের হাতের মুঠোয় নিয়ে বলে উঠল..."আর এক মূহুর্তের এখানে নয়...যত তাড়াতাড়ি সম্ভব আমরা এখান থেকে চলে যাই...তত সবদিক দিয়ে মঙ্গল।" ভয়ার্ত কন্ঠে মধুরিমা বলল..."এতদিন ধরে যেসব শুনে আসছি...আজ সেই ভয়াবহতা চাক্ষুষ করতে হবে...এ আমি দুঃস্বপ্নেও ভাবিনি।উঃ...কি নৃশংস!এই কালকেও এই হোটেলের দ্বাররক্ষী র বছর সাতেকের নাতনি টাকে আদর করে গালে টিপে দিয়েছিলাম।অত সুন্দর ফুটফুটে মেয়েটারও শেষকালে ওই পরিণতি হল!" দীপিকা এবার মধুরিমার কাছ ঘেঁষে বসে শীতল কন্ঠে বলে উঠল..."এইবার আমি তোকে একটা কথা শেয়ার করি...ওর ওই ভয়ঙ্কর পরিণতির প্রত্যক্ষদর্শী আমি নিজে!" দীপিকার কথা শুনে চমকে উঠল মধুরিমা। তারপর অবাক হয়ে জিজ্ঞাসা করল..."কি বলছিস তুই!কাল রাতে তো তুই এই ঘরে আমার সঙ্গে ছিলি... বাইরে তো বেরোসনি... তাহলে ওই ভয়ঙ্কর দৃশ্য তোর চোখে পড়ল কি করে?" দীপিকা এবার আরো শীতল কন্ঠে মধুরিমার প্রশ্নের উত্তরে বলে উঠল..."তোর মনে পড়ছে...আমি গতকাল রাতে আমি এ ঘরের জানলাটা খুলেছিলাম ঘরের ভ্যাপসা ভাবটা কাটিয়ে...ঘরে একটু সতেজ বাতাস ঢোকানোর জন্য?" ---"হ্যাঁ হ্যাঁ...জানলার পাল্লা টা দুপাশে সরানোর সঙ্গে সঙ্গে একটা মর্মভেদী আর্তচিৎকার বেরিয়ে এসেছিল তোর মুখ দিয়ে।আমি বিছানা থেকে একলাফে উঠে... দৌড়ে যাই তোর কাছে।তুই ততক্ষণে চেতনা হারিয়ে আমার হাতের ওপরে লুটিয়ে পড়েছিলি...!তার মানে তুই গতকাল রাতে এই জানলা দিয়েই..." ---"হ্যাঁ...একদম ঠিক ধরেছিস।এই হোটেলের দ্বাররক্ষীর বছর সাতেকের বাচ্চা মেয়েটাকে টেনে হিঁচড়ে এই জানলার পিছনের ওই জঙ্গলের ভিতরে এনে... মূহুর্তের মধ্যে...তার কচি শরীর ফুঁড়ে...তার বুকের ভিতরে হাত ঢুকিয়ে... হৃদপিন্ডটা খুলে বার করে নেওয়ার ভয়াবহ নৃশংস দৃশ্যটা...দুর্ভাগ্যবশতঃ আমি নিজে কাল চাক্ষুষ করেছি।" দুই হাত দিয়ে নিজের মাথাটা সজোরে চেপে ধরে বলে উঠল দীপিকা। ---"কি বলছিস তুই দীপিকা! এইবার বুঝতে পারছি... কেন তুই হঠাৎ প্রচন্ড ভয়ে ওইভাবে চিৎকার করে উঠেছিলি...আর অচৈতন্য হয়ে লুটিয়ে পড়েছিলি!" খানিকক্ষণ ঘরে বিরাজ করল পিন পড়া শব্দের নিস্তব্ধতা।হঠাৎ নীরবতা ভেঙ্গে কথা বলে উঠল মধুরিমা। ---"আচ্ছা দীপিকা...ওই ঘটনা যদি তুই চাক্ষুষ করে থাকিস... তাহলে নিশ্চয়ই...ওই শিশু নিধনকারী নৃশংস পিশাচটার চেহারাও চোখে পড়েছে তোর...কি রে বল...পড়েনি?" হাত দিয়ে নখ খুঁটতে খুঁটতে দীপিকা মৃদুস্বরে বলে উঠল...এই প্রশ্নটার মুখোমুখি হওয়ার ভয়টাই যে কুরে কুরে খাচ্ছে আমায়...!" দীপিকার চোখেমুখে ফের প্রস্ফুটিত হয়ে উঠল একরাশ আতঙ্ক...আর অন্ধকারে সিঁটিয়ে থাকা ভয়। দীপিকার মুখে এমন কথা শুনে বেশ খানিকটা অবাকই হল মধুরিমা।ও এবার দীপিকার দুই কাঁধে হাত রেখে বলে উঠল..."তার মানে আমার আন্দাজ সত্যি!তুই ওই পিশাচ টার চেহারা সচক্ষে দেখেছিস...যার নৃশংস তান্ডবে ছারখার হয়ে যেতে বসেছে গোটা এলাকা!তুই ওই পিশাচ টার বর্ণনা দিতে পারবি?" চাপা স্বরে দীপিকা বলে উঠল..."হ্যাঁ পারব।" মধুরিমা একটা নিশ্চিন্ততার আবেশ মাখানো কন্ঠে বলে উঠল..."যাক... এতদিনে তাহলে এই নৃশংস হত্যালীলার একটা কোনো সুরাহা করা সম্ভব হবে।আজ পর্যন্ত কেউ ওই পিশাচটাকে চোখে দেখেনি।এই নৃশংস খুনগুলো কে... কিভাবে করে চলেছে...তার উদ্দেশ্যই বা কি...এ বিষয়ে তদন্ত করার কোনো রাস্তাই তো এযাযৎ খোলা ছিল না। এবার এই বিষয়ে তদন্ত করার একটা তো রাস্তা খুলে গেল... এইভাবে নির্বিচারে ছোট ছোট নিষ্পাপ শিশুদের এই নৃশংস মৃত্যু এবার হয়তো আটকানো সম্ভব হবে।অ্যাই দীপিকা...ওই পিশাচটার সমস্ত বর্ণনা তুই পুলিশকে দিতে পারবি তো?" দীপিকা এবার হঠাৎ আর নিজেকে সামলে রাখতে না পেরে...ঝরঝর করে কেঁদে ফেলল...বলল..."দোহাই তোর...আমায় মাফ কর...এই প্রশ্নের উত্তর আমি দিতে পারব না... কিছুতেই দিতে পারব না...!" দীপিকার এমন আচরণে এবার যারপরনাই অবাক হয়ে গেল মধুরিমা। কিন্তু তার পরক্ষণেই ও বুঝতে পারল... সত্যিই তো... ওরকম একটা বীভৎস দৃশ্য যদি সে নিজে চাক্ষুষ করত... তাহলে ওর নিজের ও মাথার ঠিক থাকত না।ওর মনে হল... এখন আর এই বিষয়ে কোনো কথা না বলাই ভালো।প্রচন্ড মানসিক শক পেয়েছে মেয়েটা। মধুরিমা দীপিকার কাঁধে হাত রেখে শান্ত গলায় বলল..."ঠিক আছে... কিচ্ছু বলতে হবে না তোকে।তুই বরং এখন একটুখানি ঘুমো।আমি বরং পাশের ঘরে গিয়ে প্রীতম কে একটু দেখে আসি... সকালের খাবার টা আদৌ খেয়েছে কিনা... এবার দেখে আসার সময় হয়েছে।তুই শুয়ে পড় বুঝলি!" এই বলে মধুরিমা বিছানা থেকে উঠে দাঁড়িয়ে দরজার দাঁড়াতেই ওর হাতে একটা বজ্র মুষ্ঠির টান অনুভব করল।ও ঘুরে তাকাতেই...দেখল... দীপিকা ভয়ার্ত দৃষ্টিতে ওর দিকে চেয়ে রয়েছে আর ওর হাতটা নিজের দিকে টেনে ধরেছে শক্ত করে। দীপিকা বলে উঠল..."প্রীতমের কাছে যাওয়ার আগে তোকে এই কথাটা জানিয়ে দিই মধু...প্রতিরাতে ছোট শিশুদের শরীর ছিঁড়েখুঁড়ে তাদের হৃদপিন্ড নিয়ে যায় যে পিশাচ...সে আর কেউ নয়...সে আমাদের প্রীতম!" দৃশ্য তেরো কোনো এক অজানা মন্ত্র বলে প্রাণ প্রতিষ্ঠা হয়ে গিয়েছে অন্ধকার কুঠুরির ভিতরে ওই বিকট দর্শন ভয়াল অপদেবীর মূর্তির ভিতরে। হ্যাঁ...এ যে কোনো অপদেবীর মূর্তি...সে বিষয়ে এখন আর কোনো সন্দেহই নেই বর্ষার।যে দেবীর পায়ে প্রতিনিয়ত নিষ্পাপ শিশুর শরীর হতে ছিঁড়ে আনা হৃদপিন্ড ভেট দিতে হয়...সে যে কোন পৈশাচিক অপশক্তির মূর্ত প্রতিরূপ...এটা আর বুঝতে বাকি নেই বর্ষার। কুঠুরির ভিতরের বাতাসে প্রতিধ্বনিত হতে শুরু করেছে ওই ভয়াল দেবীর তীব্র হুংকার...!যেন বহুযুগ ধরে বন্দি অবস্থায় থাকার পর হঠাৎ ছাড়া পেয়ে...সে হয়ে উঠেছে ভয়ঙ্করী... উন্মাদিনী! পৃথিবীর বুকে ভয়ঙ্কর প্রলয় জাগিয়ে তোলার আদিম উন্মত্ততায় সে হয়ে উঠেছে লালায়িত!বর্ষা ইতিমধ্যে নিজের অদৃষ্টকে মেনে নিতে শুরু করেছে।অন্ধকার কুঠুরির আঁধার ফুঁড়ে...এখন প্রকট হয়ে পড়েছে এক তীব্র রক্তবর্ণ আলো।দেবীমূর্তি হতে বিচ্ছুরিত ওই আলো সময়ের সাথে সাথে এতটাই উজ্জ্বল হয়ে উঠেছে...যে বর্ষার চোখ যেন তাতে ধাঁধিয়ে যাচ্ছে। নিজের অন্তিম লগ্নের প্রহর গুনতে থাকা বিশ বর্ষীয়া মেয়েটার...এখন নিজের জীবনের প্রতি এক অনির্বাচনীয় তীব্র ঘৃণার উদ্রেক হচ্ছে। ও হাতজোড় করে ঈশ্বরের কাছে মৃত্যু ভিক্ষা চাইছে।মনে মনে সৃষ্টিকর্তাকে বলছে..."হে ভগবান... আমাকে তুলে নাও...এই নরকযন্ত্রণা থেকে মুক্তি দাও...।" কিন্তু না...ওর নিজের বিলাপ প্রতিধ্বনিত হয়ে ফের ফিরে এল ওর নিজের কাছেই...!সৃষ্টিকর্তা কোনো অজ্ঞাত কারণে...মুখ ফিরিয়ে রয়েছেন বর্ষার থেকে। চারপাশে ক্রমবর্ধমান ভয়ঙ্কর দুর্গন্ধটা এখন এতটাই অসহনীয় হয়ে উঠেছে...যে বর্ষার ভিতরে পরিত্রাণের আকুতিরা ভীষণভাবে কেঁদে উঠছে প্রতিটা মূহুর্তে...! ও এখন বসে রয়েছে... চারদিকে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা রক্ত আর রাশিকৃত শিশুর হৃদপিন্ডের মাঝখানে...!এই অন্ধকার কুঠুরিতে যে কোথা থেকে কিভাবে ও এসে পড়ল...তা জানে না বর্ষা।কিন্তু...এই অতল গহ্বরের ভিতরে যে একমাত্র গন্তব্য মৃত্যু... বর্ষা তার ই ক্রোড়ে নিজেকে নিঃস্বার্থ সমর্পণ করেছে...এই পৈশাচিক নরকের উদরে দগ্ধে দগ্ধে যন্ত্রনা পাওয়ার থেকে মুক্তি লাভের আশায়...! দৃশ্য চোদ্দো ---"কি যা তা বলছিস তুই! প্রীতম একটা পিশাচ আর ও রাতের বেলায় ঘর থেকে বেরিয়ে গিয়ে শিশুদের ধরে এনে তার বুক চিরে হৃদপিন্ডটা বার করে নিয়ে উধাও হয়ে যায়!তোর দেখছি মাথাটা একেবারেই খারাপ হয়ে গিয়েছে। নিশ্চয়ই রাতে ঠিকমতো ঘুম না হওয়ার কারণে আজেবাজে সব স্বপ্ন দেখেছিস...!" ---"না রে... বিশ্বাস কর...আমি আমার নিজের বাবা মায়ের নামে শপথ করে বলছি...আমি একবর্ণ ও ভুল বলছি না। ওকে দিনের বেলায় দেখলে কিচ্ছুটি বোঝার উপায় নেই... কিন্তু রাতের অন্ধকারে ওর এই চেনা চেহারার খোলস থেকে নগ্নভাবে বেরিয়ে আসে একটা নরপিশাচ!ওর সেই রূপ আমি নিজের চোখে দেখেছি...!তুই বিশ্বাস কর মধুরিমা...!" মধুরিমা একটা লম্বা দীর্ঘশ্বাস ফেলে ঠান্ডা স্বরে বলল... ---"তুই এখন বিশ্রাম কর দীপিকা...আমি নীচে গিয়ে তোর আর প্রীতমের জন্য ব্রেকফাস্ট পাঠিয়ে দিতে বলছি।" এই বলে মধুরিমা মোবাইল ফোন টা হাতে নিয়ে ঋককে একটা কল করল। ---"বর্ষার খোঁজ শুরু করে দিয়েছিস তো ঋক?" ওপাশ থেকে উত্তর এল..."হ্যাঁ মধু... আমাদের হোটেলের ম্যানেজার যিনি...এখন তাঁর সাহায্য নিয়ে...এখানকার স্থানীয় কিছু লোকজনের সাথে খোঁজাখুঁজি শুরু করে দিয়েছি। পুলিশকেও খবর দিয়েছি।তুই এই দিকটা নিয়ে টেনশন নিস না লক্ষ্মী টি... দীপিকা আর প্রীতম কে দেখে রাখ একটু...আর শোন... প্রীতমের দিকে একটু নজর রাখিস বুঝলি...ও এখন স্মৃতিভ্রষ্ট হওয়ারর সাথে সাথে...স্বাভাবিক চিন্তা বুদ্ধিও অনেকটা লোপ পেয়েছে এখন ওর।একটা ছোট বাচ্চা ছেলের মতোই ওকে ট্রিট করতে হবে এখন আমাদের।" ---"হুম... বুঝতে পেরেছি।" ---"আর হ্যাঁ...আরেকটা কথা... দীপিকার শরীরের কন্ডিশন টা একেবারেই ঠিক নেই...ওর কাছে থেকে বুঝতে পারছিস নিশ্চয়ই... বেচারি রাতে কি দেখে যে এত ভয় পেল...তুই একবার ওকে ডাক্তার দেখানোর ব্যবস্থা কর...।" দৃশ্য চোদ্দো কখন যে দুচোখ জুড়ে তন্দ্রা নেমে এসেছিল...ঠাহর ই করতে পারেনি বর্ষা। আস্তে আস্তে চোখ টা মেলতে শুরু করল ও...আর চোখ টা মেলতেই ও ভীষণভাবে চমকে উঠল।ও দেখল...এই অন্ধকার কুঠুরির ভিতরে হঠাৎ প্রাণ প্রতিষ্ঠা হওয়া দেবীমূর্তির দুই চোখ দিয়ে ঝরে পড়ছে তীব্র ক্ষুধার আকুতির ভয়াল রোষানল...আর এক গেরুয়া বসনধারী তান্ত্রিক... দেবীর ভয়ঙ্কর ক্রোধকে শান্ত করার চেষ্টা করে চলেছেন প্রাণপণে...! কিন্তু এই গেরুয়া বসনধারী তান্ত্রিক কে দেখার পর যেন পায়ের তলা থেকে মাটি সরে যাওয়ার উপক্রম হল বর্ষার। নিজের চোখকে পর্যন্ত বিশ্বাস করে উঠতে পারছে না ও। প্রথম টায় ও নিজেকে আপ্রাণ বোঝানোর চেষ্টা করল... নানাবিধ উপায়ে শান্ত করতে চেষ্টা করল নিজেকে। নিজেকে বোঝানোর চেষ্টা করতে লাগল...এখন ও সামনে যা যা চাক্ষুষ করছে...এ কোনো অংশে সত্যি নয়।তার সবটাই ওর মনের ভুল বা ঘুমের ঘোরে দেখা কোনো অলীক স্বপ্ন! প্রথমে নিজের হাতে চিমটি কেটে দেখল...না...ও এখন ঘুমের ঘোরে আদৌ নেই।আর চারপাশের বাতাস ভারী করা তীব্র...প্রকট দুর্গন্ধ টা... এখন যেন আরো শতগুণ প্রকট আর অসহনীয় হয়ে উঠেছে...।দুর্বোধ্য মন্ত্রোচ্চারণের দ্বারা এই বদ্ধ কুঠুরির ভিতরের বাতাস তিরতির করে কেঁপে উঠছে। সবচাইতে বিস্ময়কর ব্যাপার হল...তান্ত্রিকের পোশাকে সজ্জিত যে মানুষটির গলা বর্ষা এখন অদূরেই বসে চুপচাপ শুনে চলেছে...তাকে ও যে বিলক্ষণ চেনে...!শুধু তাই নয়... জ্ঞান হওয়া ইস্তক...প্রাসাদ তুল্য বাড়িতে এই কন্ঠস্বর শুনে শুনে বর্ষা অভ্যস্ত!এই কন্ঠ শুনে এতকাল ও ভয় পেয়ে... সিঁটিয়ে থেকেছে একটা কোণায়। কিন্তু আজ ওই কন্ঠস্বর শুনে ওর ভিতরে চাগাড় দিয়ে উঠছে একটা অপরিচিত ভয়...!এ এমন এক হাড় হিম করার মতো অনুভূতি...যে তা ভাষায় প্রকাশ করার নয়...এ অনুভূতি নিজের দুচোখ বন্ধ করে নিজের বিগত অতীতের কাটানো বাইশটি বছরের পরিচিত চিত্রের সঙ্গে তীব্র দ্বন্দ্বের!নিজের সাথে নিজের এক ভয়ঙ্কর লড়াইয়ের মুখোমুখি হয়েছে এখন বর্ষা... যেখানে ওর মস্তিষ্ক বলেছে..."এই কন্ঠস্বরের মালিককে তুই রন্ধ্রে রন্ধ্রে চিনিস"...আর ওর মন বলে চলেছে..."না...এই কন্ঠস্বরের মালিক যিনি...তাকে আমি চিনি না...কোনোদিন দেখিনি।এই কন্ঠস্বর আমার অপরিচিত।অনেক মানুষ এমন রয়েছে... যাদের কন্ঠস্বরে মিল আছে।এ ঠিক তাই।" কেটে গেল বেশ কিছু মূহুর্ত! চারপাশে যে ঠিক কি ঘটে চলেছে... সেই সম্পর্কে বর্ষার একটা মৃদু আন্দাজ তৈরি হয়েছে।এখন ও যেখানে আটকা পড়ে মৃত্যুর প্রহর গুনছে...এই বদ্ধ কুঠুরি যে আসলে কোনো এক ভয়ঙ্কর অপশক্তির উপাসনার স্হান...এটা বুঝতে এখন আর বাকি নেই বর্ষার।ও ভালো করেই জানে...এই জায়গা থেকে ও কোনোমতে পালাতে পারবে না। কিছুক্ষণ আগে পর্যন্ত ওর মনে হচ্ছিল...এই ভূগর্ভস্থ কুঠুরির ভিতরে এইভাবে আটকে পড়াটা ওর অদৃষ্টের কোনো অলীক উপহাস!কিন্তু এখন ও পরিষ্কার বুঝতে পারছে...যে এই অভিশপ্ত কুঠুরির ভিতরে অজ্ঞাত কোনো চাতুরীর দ্বারা ওকে আটকে রাখা হয়েছে কোনো শয়তানি অভীষ্ট সাধনের উদ্দেশ্যে...!কারোর পাতা ফাঁদে এখন যে ও আষ্টেপৃষ্ঠে আটকা পড়ে গিয়েছে...এটা এখন মর্মে মর্মে উপলব্ধি করতে পারছে বর্ষা।এখান থেকে পালানোর কোনো রাস্তাই নেই অথবা যদি থেকেও থাকে...তা ওর জন্য দৃঢ়ভাবে বন্ধ করে রাখা হয়েছে।এই ভূগর্ভস্থ উপাসনালয়ের ভিতরে প্রবেশের জন্য নিশ্চয়ই কোনো পথ উন্মুক্ত রয়েছে...কিন্তু ওর পরিত্রাণের জন্য কোনো পথ খোলা নেই। দেবীমূর্তির সামনে দাঁড়িয়ে নিমগ্ন চিত্তে অনর্গল... দুর্বোধ্য মন্ত্রোচ্চারণ করে চলেছেন যে গেরুয়া বসনধারী তান্ত্রিক...ও যে এখন তাঁর ই হাতের পুতুল...এই শিরায় শিরশিরানি জাগিয়ে তোলা অস্বস্তিকর সত্যটা রন্ধ্রে রন্ধ্রে উপলব্ধি করতে শুরু করেছে বর্ষা...! দৃশ্য পনেরো মধুরিমা ঋককে...দীপিকা আর প্রীতমের ব্যাপারে আশ্বস্ত করে ফোনটা রাখল।তারপর...চট করে ঘর থেকে বেরিয়ে গিয়ে... ঋকের শোবার ঘরের দরজায় গিয়ে নক করল।ওই ঘরে এখন প্রীতম ঘুমের ওষুধ খেয়ে শুয়ে আছে।বেচারা গোটা রাত্তির টা জেগে কাটিয়েছে। হঠাৎ করে কাউকে কিছু না জানিয়ে ও কোথায় উধাও হয়ে গিয়েছিল...কিভাবে কোথায় ছিল ওই সময়টা...তার কোনোকিছুই আর মনে করতে পারে না প্রীতম।এই হোটেল থেকে খানিকটা দূরে...পাহাড়ী জঙ্গলের ভিতরে ওইভাবে কেন পড়েছিল প্রীতম...তার কোনো সদুত্তর মেলেনি।বরং যত সময় যাচ্ছে...ততই যেন ও ঝড়ের গতিতে ভীষণভাবে বুড়িয়ে যাচ্ছে। চুলে পাক ধরেছে...চামড়ায় ধরেছে কুঞ্চন! প্রয়োজনের তাগিদে যেটুকু যা কথা বলে...তাতে মনে হয়...ওর কন্ঠস্বর ও যেন বয়সের ভারে ভীষণভাবে ভেঙ্গে গিয়ে দুর্বল হয়ে পড়েছে।সম্পূর্ণরূপে স্মৃতি হারিয়ে বসে আছে ছেলেটা। বাকি বন্ধুদের কাউকে চিনতে পারা তো দূরের কথা...নাম শুনেও কিচ্ছুটি মনে করতে পারছে না।এমনকি...যে বর্ষাকে নিজের মনের কথা বলবে বলে কলকাতা থেকে বুকের খাঁচায় পুরে নিয়ে এসেছিল একরাশ পাখির উন্মত্ত কূজন... সেই বর্ষার নাম পর্যন্ত মনে করতে পারছে না!এখানে পা রাখার পর থেকেই একটার পর একটা বিপদের সম্মুখীন হয়ে চলেছে ওরা পাঁচ জন।আগে ওদের মধ্যে থেকে প্রীতম বেপাত্তা হয়ে গিয়েছিল...এখন প্রীতম কে যাও বা খুঁজে পাওয়া গেল...এখন আবার বর্ষাকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না...!যে উদ্দেশ্য নিয়ে এখানে আসা... সেই প্রজেক্ট তৈরীর কাজেই... এখনো পর্যন্ত হাত দিয়ে ওঠাটাই সম্ভব হয়ে ওঠেনি। প্রিন্সিপাল স্যারকে এখনো পর্যন্ত এখানকার পরিস্থিতি জানানো টাই সম্ভব হয়ে ওঠেনি।তিনি নিজে পাঁচ বন্ধু র জন্য হোটেলে বুকিং থেকে আরম্ভ করে...ট্রেনের টিকিটের ব্যবস্থা... সবকিছুর বন্দোবস্ত করেছেন দায়িত্ব নিয়ে। কিন্তু এখন বর্ষার বাড়িতে ফোন করা তে... বাড়ির পরিচারিকা জানায়...তার মনিব দিনকয়েকের জন্য দরকারে দেশের বাইরে গিয়েছেন।ফোনেও ওনাকে কোনোমতে পাওয়া যাচ্ছে না।উফ... এখন যদি তিনি জানতেন... বর্ষা এখন নিখোঁজ... তাহলে তিনি ঠিক কি করতেন! পৃথিবীর যে প্রান্তেই তিনি থাকুন না কেন...এই ভয়ঙ্কর বিপদের খবরটা শোনবার পর নিশ্চয়ই তিনি সাথে সাথে নিজের ব্যাগপত্র গুছিয়ে ফ্লাইট ধরে চলে আসতেন এখানে...!হঠাৎ করে নিজের মেয়ের কোনো খোঁজ খবর না পাওয়া গেলে কোনো বাবার পক্ষেই যে স্হির থাকা সম্ভব নয়...! দৃশ্য ষোলো ঋক এখন উদ্ভ্রান্তের মতো একা...বর্ষার খোঁজ খবর করার জন্য...এই অচেনা অজানা জায়গায়...এর ওর হাতে পায়ে ধরে সাহায্য প্রার্থনা করছে...আর সাধ্যমতো খোঁজাখুঁজি করে চলেছে। একদিকে দীপিকা মারাত্মক ভীতির সম্মুখীন হয়ে...এখন অসুস্থ হয়ে জ্বর বাঁধিয়ে বসে আছে...আর উল্টোপাল্টা অর্থহীন প্রলাপ বকতে আরম্ভ করেছে।আর অপরদিকে... হঠাৎ করে কোন অজানা রোগের উদরে প্রীতম বিলীন হয়ে যাচ্ছে একটু একটু করে...তা ঈশ্বর ই জানেন! দীপিকা আর প্রীতম...এই দুজনের দেখাশোনার দায়িত্ব নিয়ে এখন হোটেলের রুমে আটকে থাকা ছাড়া আর কোনো উপায় ই এখন নেই মধুরিমার।সাথে আর কাউকে পেলে যে বর্ষাকে খুঁজতে বেরিয়ে...বন্ধুর সাপোর্ট অনেক বড়ো ভরসা পেত ঋক...তাতে আর সন্দেহ কি!কি আর করা... প্রিন্সিপাল স্যারের মুখোমুখি দাঁড়ানো টাই যে এখন মস্ত বড় চ্যালেঞ্জ! এইসব সাতপাঁচ ভাবতে ভাবতে... মধুরিমা হঠাৎ থমকে দাঁড়িয়ে পড়ল। মনে মনে বলল..."ছেলেটা ভোররাতে ঘুমের ওষুধ খেয়ে দুচোখের পাতা এক করেছে।এখন ই ওকে ডাকা টা ঠিক হবে না। আরো কিছুক্ষণ ঘুমোক...।" প্রীতমের ঘরের দরজার সামনে পৌঁছেও তাই আর সেখানে নক না করে... উল্টো মুখে ফিরে এল।তারপর নিজেকে ঘরে এসে পার্সটা হাতে নিয়ে দীপিকাকে বলল..."আমি একটু বেরোলাম বুঝলি... ডাক্তার ডেকে আনি।" ---"আরে না না... ডাক্তার দেখানোর দরকার নেই। সামান্য জ্বর এসেছে...ও সেরে যাবে।তুই বরং যদি বেরোস...তো আমার জন্য একটু ফল কিনে নিয়ে আয়... খেতে খুব ইচ্ছা করছে।" দীপিকার কথা শুনে নিশ্চিন্ত হল মধুরিমা।যাক...একটু একটু করে ভয় কাটিয়ে উঠছে মেয়েটা। ও দীপিকার কাছে এগিয়ে গিয়ে ওর কপালে হাত রেখে জিজ্ঞাসা করল..."আর ইউ শিওর? ডাক্তার ডেকে আনার দরকার নেই?" ---"একদম না... সামান্য জ্বর জারি তো প্রতিটা মানুষের ই হয়।তাই বলে কিছু থেকে কিছু হলেই কি কেউ ডাক্তারের কাছে ছোটে?" দীপিকার কপালে হাত রেখে মধুরিমা বুঝল...ওর জ্বর অনেকটাই কমে এসেছে এখন। মধুরিমা দীপিকা কে জিজ্ঞাসা করল..."ঠিক আছে...আমি তাহলে বাজার থেকে কিছু ফলমূল ই কিনে আনি...তারপর ফল কেটে আমরা খাব...প্রীতম কে ঘুম থেকে তুলে ওকে দেব। কিন্তু তুই এই সময়টুকু একা থাকতে পারবি তো?ভয় পাবি না তো?" ---"না না...আমি ভয় পাব না।তুই নিশ্চিন্তে বাজার থেকে ঘুরে আয়। দৃশ্য সতেরো গেরুয়া বসনধারী তান্ত্রিক... মন্ত্রোচ্চারণ ও পূজা সেরে... এবার পিছনে ঘুরলেন। একটা ক্রূর হাসি নিয়ে তিনি বর্ষার সামনাসামনি দাঁড়িয়ে ওর দিকে ছুঁড়ে দিলেন একটা প্রতিহিংসা পরায়ণ দৃষ্টি। তান্ত্রিকের চেহারা দেখে...এবার যেটুকু মানসিক স্থিতি অবশিষ্ট ছিল সেটুকুও কাঁচের ইমারতের মতো যেন সশব্দে ভেঙে চূর্ণবিচূর্ণ হয়ে গেল।এতক্ষণ ধরে ওর ভিতরে চলতে থাকা...ওর নিজের সঙ্গে নিজের ওই তুমুল দ্বন্দ্বের এই পরিসমাপ্তি চাক্ষুষ করে... পরাজিত সৈনিকের মতো ও ভিতরে ভিতরে পুরোপুরি ভেঙে পড়ল। গেরুয়া বসনধারী যে তান্ত্রিক ওর সামনে যিনি দাঁড়িয়ে রয়েছেন... তিনি আর কেউ নন...তিনি হলেন ওর বাবা। দৃশ্য আঠারো বাজার থেকে ফলমূল কিনে... হোটেলে ফিরে এসেছে মধুরিমা। রিসেপশনের পাশ দিয়ে হেঁটে যাওয়ার সময়ে... হোটেলের রিসেপশনিস্ট মধুরিমা কে উদ্দেশ্য করে বলে উঠলেন..."এক্সকিউজ মি ম্যাডাম... একবার একটু শুনে যান...!" মধুরিমা ঘুরে তাকিয়ে বলে উঠল..."হ্যাঁ... কিছু বলবেন?" রিসেপশনিস্ট চারপাশটা ভালো করে দেখে নিলেন সন্তর্পনে। তারপর চাপা স্বরে বললেন..."ইয়ে...একটা কথা জিজ্ঞাসা করি আপনাকে... কিছু মনে করবেন না...আপনারা কি কোনো সময়...রাতের অন্ধকারে ওই অভিশপ্ত মন্দিরের ভিতরে গিয়েছিলেন?" রিসেপশনিস্টের মুখে হঠাৎ এমন একখানি প্রশ্ন শুনে... এইবার ভীষণভাবে চমকে উঠল মধুরিমা। কোনোমতে নিজেকে সামলে নিয়ে মধুরিমা পাল্টা প্রশ্ন করল।"আপনি আমাকে হঠাৎ এই প্রশ্ন জিজ্ঞাসা করছেন কেন?" মধুরিমা দেখতে পেল...রিসেপশনিস্টের কপালে ফুটে উঠতে শুরু করেছে বিন্দু বিন্দু ঘাম!সে আবার চারপাশে ভালোভাবে তাকিয়ে নিয়ে...তারপর তার প্যান্টের পকেট থেকে বার করল একটা ক্ষুদ্র কালো দেবীমূর্তি। তারপর চটপট করে সেটাকে একটা রুমালে মুড়ে নিল। তারপর অতি সন্তর্পনে সেটা বাড়িয়ে ধরল মধুরিমার দিকে। প্যান্টের পকেট থেকে বার করার সময়ই মধুরিমা মূর্তিটা দেখে নিয়েছিল ভালো করে। যতটুকু ওর চোখে পড়ল...তাতে ও বুঝতে পারল...এটি একটি ভয়ঙ্কর দর্শন দেবীর মূর্তি। রিসেপশনিস্ট নীচু গলায়...চাপা স্বরে বলে উঠল..."আর কেউ বুঝুক...না বুঝুক...আমি বুঝতে পেরেছি...আপনারা রাতের অন্ধকারে ওই অভিশপ্ত মন্দিরে পা রেখেছিলেন...আর তার ই ফলে চারদিকে এখন শুধু নৃশংস শিশুমৃত্যু ঘটে চলেছে আর সন্তানহারা মায়েদের কান্নায় চারপাশের বাতাস ভারী হয়ে উঠেছে। তবে এতে আপনাদের আর কি দোষ...আপনারা এখানে নতুন এসেছেন... জেনেশুনে তো আর এমন কাজ করেননি...এই মূর্তিটা প্রীতম স্যারের মুষ্ঠিবদ্ধ হাতের মুঠোয় দেখেছি আমি।তক্কে তক্কে ছিলাম...কাল ভোর রাতে যখন প্রীতম স্যারকে আমি বাইরে থেকে ওনাদের ঘরের জানলা দিয়ে সন্তর্পনে তাঁর ঘরে ঢুকতে দেখি।আমি মুখ দিয়ে...রাতচরা হিংস্র জন্তুর হুংকারের শব্দ করে ওনাকে অন্যমনস্ক করে দিই।তার ফলে ওনার পকেট থেকে অসাবধানতাবশত মূর্তিটা বাইরে বেরিয়ে আসে...আর আমি সেটা কুড়িয়ে নিয়ে চলে আসি চুপিসারে।কর্ন পিশাচী জেগে উঠেছে প্রায় পাঁচশো বছর পর।এখন ওই মন্দিরে গিয়ে এই মূর্তিকে ফের নিদ্রিত করতে হবে।তাহলেই এই নৃশংস হত্যালীলা চিরতরে বন্ধ হবে। এইসব কথা শুনে মধুরিমা বিস্ময়ে একেবারে হতবাক হয়ে হয়ে গেল।ওর মুখ দিয়ে আর কোনো কথাই বার হল না।তবে এখন রিসেপশনিস্টের কথাগুলো শুনে একটা বিষয়ে ওর খটকা জাগল।ভোর রাতে এই রিসেপশনিস্ট প্রীতমকে হোটেলের আশেপাশে ঘোরাফেরা করতে দেখেছে!এ কি করে সম্ভব!অন্য সময় হলে... রিসেপশনিস্টের কথা ও ফুঁ দিয়ে উড়িয়েই দিত। কিন্তু দীপিকা খানিক আগে ওকে যা যা বলল...তার সঙ্গে রিসেপশনিস্টের কথায় আংশিক সাদৃশ্য রয়েছে। দীপিকাও প্রীতম কে রাতের অন্ধকারে জানলার বাইরে চাক্ষুষ করেছে।প্রীতমকে যখন উদ্ধার করে আনা হয়েছিল...তখন ওর ডান পা টা ভীষণভাবে আহত হয়েছিল।ওর পায়ে প্লাস্টার করা রয়েছে।এই অবস্থায় বিছানা থেকে নড়ে বাথরুমে যেতে গেলেও ওর সাহায্য দরকার পড়ছে...।সেই ছেলেটা... সকলের অজ্ঞাতে রাতের অন্ধকারে কি করে একা জানলা দিয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে যেতে পারে! দীপিকা আর এই রিসেপশনিস্ট... দুজনেই কি ভুল বলছে তবে? রিসেপশনিস্ট ফের চাপা স্বরে বলে উঠল..."এখন আপনার মনে যে অনেক প্রশ্ন আসতে শুরু করেছে...সেটা আমি বুঝতে পারছি।আমি যতটুকু জেনেছি...আপনাকে খুলে বলব।এই কথাগুলো এখন আপনাদের জানাটা খুব দরকার।তবে আপনি কথা দিন...আমি যে আপনাকে এই কথাগুলো জানিয়েছি...এটা আপনি গোপন রাখবেন।এখানে চাকরিতে জয়েন করেছি খুব বেশিদিন হয়নি।চাকরিসূত্রেই আমি এমন কিছু কথা জানতে পেরে গিয়েছি...যেটা চারপাশের সকল মানুষের কাছ থেকে চেপে রাখা হয়েছে।এই কথাগুলো আপনাদের জানাটা খুব দরকার। ভালো মানুষের মুখোশ পরে থাকা শয়তানকে এইবার চিনুক সকলে...!আপনি আমার ফোন নম্বর টা নিয়ে যান...আর আপনার ফোন নম্বর আমাকে দিয়ে যান কেমন...পরে আমরা যোগাযোগ করে নেব। তারপর...আমি যতটুকু জানি...তার সবকিছু সবিস্তারে জানাব আপনাকে।" রিসেপশনিস্টের কথায় সহমত হল মধুরিমা।ও নিজের ফোন নম্বরটা তাকে দিল...আর তার ফোন নম্বরটা নিজের ফোনে সেভ করে নিল।তারপর পা বাড়াল নিজেদের ঘরের দিকে। ঘরে গিয়ে দেখল... দীপিকা জ্বর ক্লিষ্ট শরীরে ঘুমিয়ে পড়েছে। মধুরিমা দরজাটা ভিতর থেকে বন্ধ করে নিল। তারপর বাজার থেকে আনা ফলগুলো বার করে একটা ছুরি হাতে কাটতে শুরু করল।ফল কাটতে কাটতে...বারে বারে অন্যমনস্ক হয়ে যেতে লাগল মধুরিমা।ওর মনের ভিতরে এখন হাজারো প্রশ্ন...আর খটকা জড়ো হতে শুরু করেছে একটু একটু করে। ওদের পাঁচ বন্ধুর ওই মন্দিরে মাঝরাতে পা রাখার ব্যাপারটা ওদের পাঁচজনের বাইরে কারোরই জানবার কথা নয়। তাহলে নিশ্চিত হয়ে বলছে কি করে...রাতের অন্ধকারে ওই মন্দিরে ওদের পা পড়েছিল...এই কথাটা এতটা নিশ্চিত ভাবে হোটেলের এই রিসেপশনিস্ট বলছে কি করে!আর এর ফলপ্রসূ ই যে চারদিকে এই পৈশাচিক হত্যালীলা আরম্ভ হয়েছে...এটাই বা সে কি করে বলছে!কে রয়েছে এই সবকিছুর নেপথ্যে?ভালো মানুষের মুখোশ পরে কে প্রতিনিয়ত সবাইকে বোকা বানিয়ে চলেছে?তাকে কি ও চেনে? কোনোদিন দেখেছে? চেয়ারে বসে বসে... টেবিলের ওপরে একটা চপিং বোর্ডের ওপর ফলগুলো রেখে...একটা ছুরি হাতে সেগুলো আনমনে কেটে চলেছে মধুরিমা। কিন্তু ফলের দিকে ওর খুব একটা মনোযোগ নেই এখন।ওর সমস্ত মনোযোগ একত্রিত হয়ে রয়েছে... টেবিলের ওপরে রাখা শতাধিক বছরের প্রাচীন...ওই ক্ষুদ্র দেবীমূর্তিটির দিকে। মনের ভিতরে জোয়ারের ন্যায়ে উথলে উঠতে শুরু করা হাজারো প্রশ্নের দাপটে রীতিমতো বেসামাল অবস্থা এখন মধুরিমার। আনমনে... মূর্তিটার দিকে তাকিয়ে ফল কাটতে গিয়ে হঠাৎ হাতটা কেটে গেল মধুরিমার। খানিকটা রক্ত ছিটকে গিয়ে লাগল চপিং বোর্ডের সামনে রাখা ওই ক্ষুদ্রাকৃতি দেবীমূর্তির গায়ে।সাথে সাথে একটা দৃশ্য দেখে এবার প্রচন্ড ভয় পেয়ে গেল মধুরিমা।ক্ষুদ্রকায় ওই মূর্তিটার চোখদুটো হঠাৎ ঝলসে উঠেছে।যেন মানুষের রক্তের স্পর্শ পেয়ে হঠাৎ ঘুম ভেঙ্গে জেগে উঠেছে কোনো পৈশাচিক শক্তি...! চারপাশের বাতাসের প্রতিটা কণায়... হঠাৎ তীব্রভাবে ছড়িয়ে পড়তে আরম্ভ করল একটা বিকট দুর্গন্ধ। প্রচন্ডভাবে চমকে যাওয়ার সাথে সাথে...বেশ আশ্চর্য হল মধুরিমা।এই গন্ধটা ওর চেনা চেনা লাগছে।প্রীতমের আশেপাশে গেলে... আজকাল এই গন্ধটা খুব মৃদুভাবে নাকে আসে মধুরিমার। কিন্তু এই ব্যাপারটাকে ও ধর্তব্যের মধ্যেই আনেনি।কিন্তু এখন... সামনে রাখা ওই মূর্তিটার গায়ে মধুরিমার শরীর খানিকটা রক্ত যখন ছিটকে এসে মূর্তিটার গায়ে লাগল... তখন ই যেন এই মূর্তিটার ভিতরে একটা প্রাণ জেগে উঠল।তার রক্তবর্ণ দুই চোখে যেন প্রজ্জ্বলিত হয়ে উঠতে শুরু করল বহুযুগের চাপা পড়ে থাকা কোনো ভয়ঙ্কর আক্রোশ! আর একটা বিকট পচা দুর্গন্ধ চারপাশের বাতাসে প্রকট হয়ে উঠতে শুরু করল ভীষণভাবে...! এই গন্ধটার সাথে যে ভীষণভাবে পরিচিত মধুরিমা...!এই ব্যাপারটা এখন মধুরিমার শরীরের প্রতিটি রোমকূপে যেন শিহরন তুলতে শুরু করে দিয়েছে...! দৃশ্য উনিশ "বাবা... তুমি এখানে?" প্রচন্ড বিস্ময়ে সারা শরীর থরথর করে কাঁপতে লাগল বর্ষার। এতক্ষণ এই পেটের নাড়ি উল্টে আসা এই বীভৎস পচা দুর্গন্ধের মধ্যেও বর্ষা নিজের মানসিক ভারসাম্য ধরে রাখতে সক্ষম হয়েছিল...কিন্তু... জন্ম ইস্তক স্যুটব্যুটে সজ্জিত কলেজের প্রিন্সিপালের ভূমিকায় নিজের বাবাকে এখন এই গেরুয়া বসন পরিহিত তান্ত্রিকের সাজে দেখে... এবার যেন বর্ষার সামনে সমস্ত পৃথিবী উথালপাথাল করতে শুরু করল।ও নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে পারছে না কিছুতেই...! ওর কন্ঠে যেন স্বর আটকে গিয়েছে। কোনোমতে ওর গলা দিয়ে অস্ফুটে একটাই প্রশ্ন বেরিয়ে এল এরপর...! ---"বাবা...তু...তু...তুমি... এখানে কি করছ?" অন্য সময় হলে...এমন কোনো বিপদের মধ্যে পড়লে... হঠাৎ সেখানে বাবাকে দেখতে পেলে ওর মনে বলভরসা আসত।কিন্তু এখন এই বাবাকে দেখে...ওর কেমন জানি অচেনা লাগছে। বাবার মুখে ধীরে ধীরে ফুটে উঠতে থাকা এক অদ্ভুত পৈশাচিক...ক্রূর হাসি...ক্রমশ ওর মনে জাগিয়ে তুলতে শুরু করেছে এক ঘনঘোর আতঙ্ক... নিজের চরম পরিণতির অশনিসংকেত! ওর মন ও মস্তিষ্কের ভিতরে জমাট বাঁধতে শুরু করা চিত্রগুলো যেন এক প্রবল বজ্র নিনাদের সাথে অট্টহাসিতে ফেটে পড়ল।বর্ষা চোখের সামনে দেখল...বাবার ভয়ঙ্কর রূপ। বাবা শীতল অথচ গম্ভীর কন্ঠে বলে উঠলেন... "এইবার আমার অপেক্ষার প্রহর গোনা শেষ।এইবার দেবীর পায়ে নিজের হাতে তোমার শিরশ্ছেদ করবার প্রহর উপস্থিত।তাহলেই সম্পূর্ণ হবে আমার প্রতিশোধ!" বর্ষার মাথায় যেন বাজ পড়ল!এই বাবাকে ও চেনে না... তাঁর এমন ভয়ঙ্কর রূপ ও কোনোদিন দেখেনি। হ্যাঁ... চিরকাল বাবা ওর প্রতি উদাসীন ছিলেন। তাঁর প্রাসাদ তুল্য বাড়ির একটা কোণায় চিরকাল আবর্জনার মতোই পড়ে থেকেছে বর্ষা। জন্মের সময়ই মাকে হারায় বর্ষা... কিন্তু মা মরা একমাত্র মেয়েটাকে কোনোদিন নিজের কাছে টেনে নেননি তিনি।একটা অব্যক্ত যন্ত্রনা বুকে নিয়েই ও একটু একটু করে বড় হয়ে উঠেছে। বাবার যে ওর প্রতি কোনো অনুভূতিই নেই...এই কথাটা ও প্রতিটা মূহুর্তে মর্মে মর্মে অনুধাবন করে করে শৈশব পেরিয়ে কৈশোর...তারপর কৈশোর পেরিয়ে যৌবনে পা রেখেছে বর্ষা।এই বোবা যন্ত্রনাটাও ওর সাথে সাথেই বড় হয়ে উঠেছে।দুই একজন কাছের মানুষকে এই ব্যাপারটা বোঝানোর চেষ্টা করে দেখেছে বর্ষা...লাভ হয়নি।তারা বরং উল্টে ওকে বুঝিয়েছে..."বাবা কখনো নিজের সন্তানকে জেনেশুনে দূরে সরিয়ে রাখতেই পারেন না।উনি কলেজের প্রিন্সিপাল। ওনার কত দায়িত্ব...তাই তোমাকে সময় দিতে পারেন না... তুমি এই নিয়ে মন খারাপ কোরো না।" ইদানিং ও এই বিষয়টা নিয়ে কারোর সঙ্গে কোনো কথা বলে না।ঘরের ভিতরে আসল ছবিটা যে আসলেই কি ঠিক কিরকম...এটা চার দেওয়ালের বাইরে অবস্থান করা কোনো মানুষকেই যে বলে বোঝানো সম্ভব নয়...এটা এখন আর বুঝতে বাকি নেই বর্ষার। কিন্তু তাই বলে যে বাবা কোনোদিন নিজের হাতে ওর রক্ত ঝরাতে মরিয়া হয়ে উঠতে পারেন... এমনটা ও দুঃস্বপ্নেও কোনোদিন ভাবতে পারেনি।বাবা তো ওর দিকে কোনোদিনই ভালো করে তাকিয়েই দেখেননি...ওর সঙ্গে ভালোবাসা বা শত্রুতা... কোনো সম্পর্ক গড়ে ওঠার কোনো ক্ষেত্রই ছিল না কোনোকালে।আজ হঠাৎ ওর সামনে দন্ডায়মান মানুষটার রক্তবর্ণ চোখদুটোয় ওর প্রতি এক ভয়াল জিঘাংসা লক্ষ্য করল বর্ষা। এখন বর্ষা পুরোপুরি আকাশ থেকে পড়ল।ও কাঁপা কাঁপা কন্ঠে বলে উঠল..."প্রতিশোধ? কিসের প্রতিশোধ?তুমি আমাকে কেন মারতে চাইছ বাবা?" বর্ষার মুখে এই কথা শুনে এবার এই অন্ধকার কুঠুরির বদ্ধ বাতাসের প্রতিটা কণায় ভয়ঙ্কর আলোড়ন তুলে বিকট অট্টহাস্য করে উঠলেন বর্ষার বাবা ওরফে প্রফেসর রনজয় চট্টোপাধ্যায়।তারপরের মূহূর্তেই ওনার মুখমন্ডলের মানচিত্র একশো আশি ডিগ্রী ঘুরে গেল।এক অনির্বাণ ক্রূরতায় তাঁর চোখমুখ রক্তবর্ণ হয়ে উঠল।রনজয় বাবু এবার নিজের বজ্রমুষ্ঠিতে বর্ষার গলা চেপে ধরলেন। তারপর ওর মুখের কাছে নিজের মুখটা নিয়ে এলেন।এই প্রথম বর্ষার এত কাছাকাছি এলেন। কিন্তু আজ... বর্ষার অন্তরে...রনজয় বাবুর প্রতি একটা ঘৃণা তীব্র হয়ে উঠতে শুরু করেছে। চাপা স্বরে ফিসফিস করে রনজয় বাবু বলে উঠলেন..."কাকে বাবা বলছ তুমি?আমি তোমার বাবা নই। তোমার জন্মদাতা পিতাকে আমি নিজের হাতে মেরে ফেলেছি বিশ বছর আগে। বর্ষার গলাটা এইবার ছেড়ে দিলেন রনজয় বাবু। তারপর ক্ষ্যাপা সিংহের মতো ফুঁসতে ফুঁসতে এদিক ওদিক ছোটাছুটি করতে শুরু করলেন। ওনাকে দেখে এখন বর্ষা পরিষ্কার বুঝতে পারছে...বহু বছরের জমে থাকা ক্ষোভ আর প্রতিহিংসা চরিতার্থ করার বিকৃত আনন্দে এখন তিনি পুরোপুরি আত্মহারা।রনজয় বাবুর শেষে বলা ওই কথাগুলো বর্ষার মনে খুব একটা আঘাত করল না।বরং বর্ষা জন্ম ইস্তক যে বাবাকে দেখে এসেছে...তার সঙ্গে তাঁর এইমাত্র বলা কথাগুলোর একটা ঠিকঠাক সাযুজ্য খুঁজে পেল। রনজয় বাবু আসলেই যে বর্ষার নিজের বাবা নন...এই বিষয়ে ও একশো শতাংশ নিশ্চিত হল।আর সেইসাথে পেল বাইশ বছর ধরে ওর মনের ভিতরে ক্ষোভের আকারে স্তূপের আকার ধারণ করতে থাকা হাজারো প্রশ্নের জবাব। কিন্তু মিস্টার রনজয় চ্যাটার্জি যদি ওর জন্মদাতা পিতা না হন... তাহলে ওর জন্মদাতা পিতা আসলে কে? একটু আগেই এই মানুষটার মুখ দিয়ে বেরিয়ে এসেছে একটা ভয়ঙ্কর কথা... সেটা শুনতে বর্ষা ভুল করেনি মোটেই।ওর জন্মদাতা বাবাকে এই লোকটা নিজের হাতে খুন করেছে।আলো আঁধারির মধ্যে একটা রক্তাভ আলো চারদিকে ছড়িয়ে পড়েছে চারদিকে।ওই আলোর উৎস...ওর সামনে প্রকটভাবে প্রতীয়মান ওই দেবীমূর্তির সামনে দাঁড়িয়ে এই লোকটার মুখ দিয়ে যে কথাগুলো বেরিয়ে আসছে...তা যে মর্মে মর্মে সত্য...এটা উপলব্ধি করতে পারল বর্ষা। কিন্তু কেন?আজ... দীর্ঘ বাইশ বছর পর তিনি যে কলেজের প্রজেক্টের নাম করে অত্যন্ত হীন চাতুরীর সাথে ওকে এই অভিশপ্ত আঁধার ঘেরা কুঠুরির গোপন উপাসনালয়ে কব্জা করে এনে ফেলেছেন... এটাও অচিরেই বুঝতে পারল বর্ষা। এই প্রথম বর্ষা রনজয় চ্যাটার্জির মার্জিত...ভদ্রতার মুখোশের আবরণে মোড়া আসল রূপ টা চাক্ষুষ করল। রনজয় বাবু এবার প্রবল অট্টহাসিতে ফেটে পড়ে এক এক করে উগরাতে শুরু করলেন... দীর্ঘ বছর ধরে তার ভিতরে জমাট বাঁধা ভয়ঙ্কর ক্ষোভ আর প্রতিশোধ স্পৃহা। তিনি বর্ষার দিকে প্রচন্ড তাচ্ছিল্য আর ঘৃণা ছুঁড়ে দিয়ে বলে উঠলেন..."তোকে আমি কেন খাইয়ে পরিয়ে এতটা বড় করেছি জানিস? তোকে এই দেবীর পায়ে বলি দেব বলে।তোর জন্মদাতা বাবা অরুন রায় ছিল আমার বাল্যবন্ধু।ওর বাবা মা একটা কার অ্যাক্সিডেন্টে মারা যায়।ওর তখন বয়স মাত্র তিন বছর। আমার ও বয়স তখন তিনের কোঠায়।আমাদের বাড়ি পাশাপাশি ই ছিল।আমার মা ওই বাপ মা মরা ছেলে টাকে নিজের পেটের ছেলের মতোই ভালোবাসা দিতেন।ওকে নিজের আমার চেয়ে কোনো অংশে আলাদা ভাবতেন না। বলতেন ও..."আমার তো একটা নয়...দুই দুটো ছেলে।" ব্যাস... সেই ছিল শুরু।ও নিজের মামা মামীর কাছে বড় হচ্ছিল বটে... কিন্তু মামা মামী...নিজের সন্তানদের দিকে মনোযোগ দিতে গিয়ে...ওকে তেমন আদর যত্ন করতেন না। ফলপ্রসূ... আমার বাড়িতে আমার জন্য যা যা বরাদ্দ ছিল...ও ও সেই সবকিছুর সমান ভাগ পেত। এই ব্যাপারটা বোঝানোর কোনোদিন আমার কোনো সমস্যার উদ্রেক করেনি।আমি বোকা ছিলাম।মস্ত বড় একটা বোকা ছিলাম।আমি বুঝতে পারিনি...এই ব্যাপারটাকে সহজভাবে মেনে নেওয়াটা আসলেই কত বড় একটা মূর্খামি! আমার সমস্ত জিনিসে ভাগ পেতে পেতে... ওর সাহস এতটাই বেড়ে গিয়েছিল...যে শেষকালে ও আমার প্রেমিকা সন্ধ্যা র দিকে হাত বাড়াল। সন্ধ্যাকে আমি এক তরফাভাবেই ভালোবাসতাম।ও আমার দিকে ফিরেও তাকাত না।আমি মনে মনে প্রচন্ডভাবে বেপরোয়া হয়ে পড়ি।একটা মেয়ে প্রতিনিয়ত আমার দেওয়া প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে চলেছে...এই ব্যাপারটা যে ভীষণ অপমানের...!বেশ কিছু সময় অপেক্ষা করার পর আমি মনস্থির করি... সন্ধ্যা কে জোর বলপূর্বক তুলে নিয়ে এসে জোর করে বিয়ে করে নেব। আমার সমস্ত পরিকল্পনা যখন সারা...তখন হঠাৎ খবর পাই...অরুন আর সন্ধ্যা মন্দিরে গিয়ে বিয়ে করে নিয়েছে।ওরা দুজনে একটা সুখের সংসার তৈরি করেছে।এই খবরটা পাওয়া মাত্র আমার মাথায় আগুন জ্বলে যায়।না... সন্ধ্যা র দিকে নজর টা প্রথম আমার পড়েছিল।ও অন্য কারোর হতে পারে না।ও শরীরে... মনে শুধু আমার।আমি ক্ষ্যাপা সিংহের মতো ফুঁসতে ফুঁসতে... ছুটে গিয়ে হাজির হই ওর ঘরের দরজায়।তখন আমি দেখতে পেলাম ...ওর কোলে খেলা করছে একটা মাসখানেকের শিশুকন্যা...! আমি ক্রোধে উন্মাদ হয়ে উঠলাম। সাথে সাথে অরুনের গলাটা দুহাতে সজোরে চেপে ধরে... ওকে শ্বাসরোধ করে খুন করলাম। সন্ধ্যা কে পুনরায় নিজের করে পাবার আনন্দে আমার মনে তখন জেগে উঠল পৈশাচিক উল্লাস!আমি আনন্দে আত্মহারা হয়ে যখন পাশে তাকাই... তখন দেখি এক মর্মান্তিক দৃশ্য!অরুনের মৃত্যু সহ্য করতে না পেরে...আমার সন্ধ্যা ছুরি বসিয়েছে নিজের বুকে! আমার জয়ের আনন্দ এক লহমায় মাটিতে মিশে গেল।হায়...এ আমি কি করলাম...!অরুনের ওপর প্রতিশোধ নিতে গিয়ে আমি আমার সন্ধ্যাকেই চিরতরে হারিয়ে বসলাম...!যেদিন আমি সন্ধ্যাকে একটা রাতের জন্য কব্জা করে... বলপূর্বক ওর শরীরটা ভোগ করেছিলাম... সেদিন আমি ভেবেছিলাম...আমি জিতে গেছি। কিন্তু না...আমি আসলে কোনোদিন জিতিনি।আমি ভেবেছিলাম...ওই কলঙ্কের বোঝা মাথায় নিয়ে ও যখন দিনের আলোয় আমার ঘর থেকে বেরোবে... ওকে কোনো পুরুষ গ্রহণ করবে না। কিন্তু আমি ভুল ছিলাম। সমস্ত কিছু জেনেশুনে...অরুন নিজের পরিবারের বিরুদ্ধে গিয়ে... সন্ধ্যার ছোট দুই বোনের বিয়ের দায়িত্ব কাঁধে নিয়ে চলা ওর বাবা মায়ের থেকে বিচ্ছিন্না ও ত্যাজ্য ধর্ষিতা মেয়েটাকে ও সসম্মানে বিয়ে করে নিজের স্ত্রীর মর্যাদা দেয়।কই... সেইসব ঝড়ঝাপটার দিনেও তো আমি সন্ধ্যা কে ভেঙে পড়তে দেখিনি...অথচ অরুনকে মৃত্যু যন্ত্রনায় তড়পাতে দেখে...আর পরিশেষে ওকে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়তে দেখে... সন্ধ্যা নিজের বুকে ছুরি বসিয়ে দিল! আমার ভিতরে ফের মাথাচাড়া দিয়ে উঠতে আরম্ভ করল এক ভয়ঙ্কর প্রতিহিংসা! আমার মনে হল...অরুন যেন মরবার পরেও অট্টহাসিতে ফেটে পড়ে আমায় বলে চলেছে..."হেরে গেলি রনজয়...তুই আমার কাছে হেরে গেলি!" আমি আর সহ্য করতে পারলাম না... মনে মনে স্হির করে নিলাম... পৃথিবী ওলটপালট করে হলেও... সন্ধ্যা কে আমাকে নিজের করে নিতেই হবে।অরুন কে আমি এত সহজে জিততে দেব না।আমি তৎক্ষণাৎ সন্ধ্যার রক্তমাখা লাশটা পাঁজাকোলা করে তুলে নিলাম। তারপর রাতের অন্ধকারে... নির্জন রাস্তা ধরে ছুটতে আরম্ভ করলাম বুড়ো বটতলার মন্দিরের অভিমুখে... যেখানে দিন কয়েকের জন্য যোগ সাধনা করতে এসেছিলেন এক তান্ত্রিক! আমার সঙ্গে তাঁর আগে থেকেই ভালো সখ্যতা গড়ে উঠেছিল।আমি তাঁকে আমার সমস্যার কথা জানিয়েছিলাম। তিনি বলেছিলেন...এই বিষয়ে তিনি সবদিক থেকে আমায় সাহায্য করবেন। নিম্ন তন্ত্রের মাধ্যমে ভয়ঙ্কর পৈশাচিক শক্তিকে জাগিয়ে তুলে ধ্বংসলীলায় মেতে ওঠা তাঁর বাঁ হাতের খেলা।কিন্তু আমি ভাবতে পারিনি... এইভাবে সন্ধ্যার মৃতদেহ হাতে মাঝরাতে আমাকে ছুটে আসতে হবে তাঁর কাছে! মন্দির চত্বরে তিনি স্হান পাননি।কারণ তিনি ছিলেন নিম্ন তন্ত্রের সাধক। মন্দিরের আশেপাশে একটা মস্ত অশ্বত্থ গাছের তলায় সম্পূর্ণ উলঙ্গ হয়ে বসে তিনি অনর্গল উচ্চারণ করে চলেছিলেন দুর্বোধ্য মন্ত্র! আমায় একটা রক্তমাখা নারীর লাশ কাঁধে করে উন্মত্তের মতো ছুটে আসতে দেখে তিনি হতচকিত হয়ে গেলেন। মন্ত্রোচ্চারণ থামিয়ে... তিনি বিস্মিত দৃষ্টিতে আমার দিকে তাকালেন।আমি সাধুবাবার পায়ের কাছে সন্ধ্যার লাশটা রেখে... তাঁর পায়ে গিয়ে কেঁদে পড়লাম। বললাম..."বাবাজি...যেমন করেই হোক...এই মৃতদেহে পুনরায় প্রাণ প্রতিষ্ঠা করে দিন...! তিনি তখন একটা তাচ্ছিল্যের হাসি হেসে বললেন..."মেয়েটাকে শেষকালে মেরেই ফেললি?" আমি ব্যাকুল কন্ঠে বলেছিলাম..."না বাবা জি...আমি সন্ধ্যাকে খুন করিনি...ও আত্মহত্যা করেছে। এখন ওকে আমি আপনার পায়ে এনে ফেললাম বাবা জি...আপনি যেমন করেই হোক...ওর এই মৃতদেহে পুনরায় প্রাণ প্রতিষ্ঠা করার একটা উপায় করুন...আমি তাহলে চিরকাল আপনার গোলাম হয়ে থাকব।" আমার কথা শুনে বাবা জি হেসে বলেছিলেন..."জীবিত থাকার সময়ই যাকে আপন করে নিতে পারলি না...তার মৃতদেহে প্রাণ প্রতিষ্ঠা হলেই ওকে তুই আপন করে নিতে পারবি?" আমি সদম্ভে বলেছিলাম..."হ্যাঁ পারব বাবা জি...ওই রাতে ওর শরীর ভোগ করার পরদিন সকালেই ওকে যেতে দেওয়াটা আমার সবচাইতে বড়ো ভুল হয়েছে।আর আমি সেই ভুল করব না।ওর এই শরীরে প্রাণ প্রতিষ্ঠা হয়ে যাওয়ার পর...আর আমার কাছ থেকে ওর মুক্তি নেই। ওকে আমি বলপূর্বক আটকে রেখে দেব নিজের কাছে...সারা জীবনের মতো...।" ---"দ্যাখ তবে চেষ্টা করে...সফল হোস কিনা...! আমি এই মৃতদেহে প্রাণ প্রতিষ্ঠার সব ব্যবস্থা করতে পারি...।কিন্তু মৃতদেহে প্রাণ প্রতিষ্ঠা করার প্রক্রিয়া মারাত্মক রকমের জটিল।ওই সমস্ত প্রক্রিয়া এখানে সম্ভব নয়।এর জন্য তোকে যেতে হবে দক্ষিণ ভারতের এক মন্দিরে। প্রায় পাঁচশো বছর আগে সেখানকার রাজাকে ওই মন্দির নির্মাণ করার নিদান দিয়েছিলেন আমার পূর্বপুরুষ।তার অভিসন্ধি ছিল অন্য। উপরে ঈশ্বরের নিত্য আরাধনার কাজে কাজে লিপ্ত থাকা আমার পূর্বপুরুষ...মন্দিরের তলায় গোপনে নির্মিত করান এক অন্ধকার কুঠুরি।আর সেখানেই তিনি কর্ন পিশাচিনীর মূর্তি প্রতিষ্ঠা করেন।অসীম ক্ষমতার লোভে তিনি লোকচক্ষুর অন্তরালে ওই অন্ধকার কুঠুরির ভিতরে কর্ন পিশাচিনীর আরাধনা শুরু করেন।গোটা গ্রাম জুড়ে শিশুদের মড়ক লাগতে শুরু করে। অচিরেই আসল সত্যটা সামনে এসে যায়...আর অতঃপর আমার সেই পূর্ব পুরুষের মৃত্যুদণ্ড হয়। সেই থেকে ওই মন্দির অভিশপ্ত মন্দির হিসেবে পরিচিত গোটা এলাকায়।কর্ন পিশাচিনী এরপর দিনের পর দিন পূজো না পেয়ে প্রবল রোষানলে ফুঁসে উঠতে শুরু করে। মন্দিরের চূড়ায় তার ক্রোধ স্বরূপ জ্বলে উঠতে থাকে আগুন।এহেন পরিস্থিতিতে...এক শক্তিশালী তান্ত্রিক এসে একটা যজ্ঞ করে ওই অপশক্তিকে নিদ্রামগ্ন করেন।আর নিদান দেন...প্রতি বছর একটা নির্দিষ্ট সময়ে কিছু উপাচারের ব্যবস্থা করে সন্তুষ্ট রাখতে হবে ওই অপশক্তিকে।এর অন্যথা হলে তার ফল হবে মারাত্মক! সেই থেকে ওই মন্দিরের ভিতরে একটি অন্ধকার কুঠুরির ভিতরে নিদ্রিত রয়েছেন কর্ন পিশাচিনী।তুই যদি এই মৃতদেহ ওই কুঠুরির ভিতরে নিয়ে গিয়ে...ওর রক্তের সম্পর্কের কোনো মানুষ...যার বয়স বাইশের নীচে...তাকে কর্ন পিশাচিনীর পায়ে বলি দিস... তাহলেই এই মৃতদেহে পুনরায় প্রাণ প্রতিষ্ঠা হবে।তবে তার আগে তোকে যোগাড় করতে হবে একটি জোয়ান ছেলে...যার জন্মের দিন ক্ষণ...তিথি নক্ষত্র সবকিছুর সাথে ওই মন্দিরের ভিতরের গোপন কুঠুরির প্রতিষ্ঠা করার দিন...তিথি নক্ষত্র মিলে যায়। কর্ন পিশাচিনীর ক্রোধ ও ক্ষোভ শান্ত করার ওই পদ্ধতি যদি এক বৎসর কালের জন্য বন্ধ রাখা সম্ভব হয়...আর সেমতাবস্হায় সেই ছেলে যদি কোনোভাবে ওই মন্দিরের কাছাকাছি পা রাখে... তাহলেই তোর অভীষ্ট অর্ধেক পূর্ণ হয়ে যাবে।কারণ ওই ছেলের সংস্পর্শেই কর্ন পিশাচী পুনরায় জেগে উঠবে আর ওই ছেলের রক্তমাংসের শরীরে গিয়ে প্রবেশ করে মেতে উঠবে পৈশাচিক হত্যালীলায়।প্রথমে শিশু... তারপর বালক বালিকা...আর পরিশেষে প্রাপ্তবয়স্ক এবং বৃদ্ধ বৃদ্ধাদের জীবন্ত শরীর ফুঁড়ে তীক্ষ্ণ ধারালো নখ যুক্ত বেপরোয়া আঙ্গুল চালিয়ে ছিঁড়েখুঁড়ে বার করে আনবে হৃদপিন্ড। এরপর জনমানবশূন্য ওই শ্মশান ভূমিতে বসে...সে তারিয়ে তারিয়ে সেগুলো ভক্ষণ করবে।আর কর্ন পিশাচিনীকে এই অভীষ্ট পূরণে যার হাত থাকবে...তার মনোবাসনা সে অবশ্যই পূরণ করবে।আর এই মৃতদেহে প্রাণসঞ্চার করার জন্য...তার নিজের রক্ত ধারণকারী... অনূর্ধ্ব বাইশের কোনো নারীজাতিকাকে কর্ন পিশাচিনীর পায়ে শিরশ্ছেদ করে বলি প্রদান করলে পুনরায় তোর সন্ধ্যা র শরীরে প্রাণ সঞ্চার হবে। কিন্তু মনে রাখিস...এই প্রক্রিয়ায় শুধু শরীরের যন্ত্র সচল হবে কৃত্রিমভাবে।এই মেয়ের আত্মা অমৃত লোকে গমন করেছে।এই মেয়ের শরীর কৃত্রিমভাবে নিজের কাছে কয়েদ করতে পারলেও... মানুষটাকে তুই হারিয়ে ফেলেছিস চিরকালের মতো। এই বাস্তব সত্যটা মেনে নিতে হবে তোকে।" আমি বলে উঠলাম..."হ্যাঁ হ্যাঁ...তাতে আমার বিন্দুমাত্র সমস্যা নেই বাবা জি।আমি শুধু যেনতেন উপায়ে অরুন কে পরাজিত করতে চাই।" বাবা জি বললেন... ---"তবে তাই হোক...আমি তোকে ওই মন্দিরের হদিস দিচ্ছি।এই মৃতদেহ আপাতত আমার হেফাজতে থাকুক।আজ থেকে খুঁজতে শুরু কর সেই দুজন অল্পবয়সী ছেলে আর মেয়েকে...যারা তোর লক্ষ্য পূরণের কাজে আসবে....।" এরপর আমি আর দেরি করিনি।আমি বাবা জি র নির্দেশ অনুযায়ী তাঁর বলে দেওয়া জন্মলগ্ন বিশিষ্ট যুবক ছেলে...আর সন্ধ্যার রক্তের সম্পর্কের কোনো বাইশ অনূর্ধ্ব মেয়ের খোঁজ করার কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়লাম। কিন্তু আমাকে দুইদিক দিয়েই ভীষণভাবে হতাশ হতে হয়েছিল।ওই নির্দিষ্ট জন্মলগ্ন সম্পন্ন একটি যুবক ছেলের খোঁজ করতে গিয়ে জানতে পারি...ওই নির্দিষ্ট গ্রহ নক্ষত্র বিশিষ্ট মাহেন্দ্রক্ষণ হাজার বছরে একবার ই আসে। খড়ের গাদায় সূচ খুঁজলে হয়তো পাওয়ায় গেলেও যেতে পারে...কিন্ত...ওই তিথি ও লগ্নে জন্মগ্রহণ করেছে...এমন কোনো যুবক ছেলে খুঁজে পাওয়া যথেষ্টই কঠিন।ওই সময়ে আমি খবর পেলাম... অরুন আর সন্ধ্যার মাস তিনেকের মেয়েটাকে নিয়ে ওদের দুই পরিবার রীতিমতো ঠেলাঠেলি শুরু করে দিয়েছে। সন্ধ্যার আপন দুই বোন সদ্য বাইশ পেরিয়ে গিয়েছে সেটা আমি জানতাম।ওর রক্তকে নিজের শরীরের প্রতিটি শিরায় বহন করে চলেছে যে ছোট্ট প্রাণ... তাকে হাতছাড়া করলে যে আমার চলবে না...এ আমি অচিরেই বুঝতে পারলাম। সদ্য বাপ মা মরা অনাথ কন্যাসন্তান টিকে আমি নিজে কোলে করে নিজের ঘরে ফিরে এলাম।এর কিছুদিন পরেই আমি গ্রাম ছেড়ে পাড়ি দিই কলকাতায়।বাবা জি তন্ত্র সাধনার মাধ্যমে সন্ধ্যা র মৃতদেহ এই কুঠুরির ভিতরে নিয়ে আসেন...আর আমার কাছে তুই বড় হতে শুরু করলি আমার নিজের মেয়ের পরিচয়ে।তোর বয়স বাইশের কোঠায় আসবার আকাঙ্ক্ষায় আমার প্রহর গোনা আরম্ভ হয় সেইদিন থেকেই...! রনজয় চ্যাটার্জির কথাগুলো যত শুনছিল বর্ষা...ততই ওর নিজের প্রতিই নিজের ঘৃণা জন্মাতে শুরু করল। এইরকম একটা নরপিশাচের সংস্পর্শে থেকে জীবনের বাইশটা বছর কাটিয়েছে বর্ষা!এর থেকে তো মরে যাওয়াই শ্রেয় ছিল...! বাতাস কাঁপিয়ে প্রচন্ড এক অট্টহাস্যের সঙ্গে ফের বলতে শুরু করলেন রনজয় চ্যাটার্জি। "সেই মাহেন্দ্রক্ষণ আসতে আর দেরি নেই। অমাবস্যার রাত নামার সাথে সাথে আমার হাতের এক কোপে তোর মাথাটা কর্ন পিশাচীর পায়ে গিয়ে গড়িয়ে পড়বে...আর আমার সন্ধ্যার শীতল শরীরে আবার ফিরে আসবে রক্ত...মাংস...স্পন্দন! এই বলে...এবার রনজয় বাবু যে কাজটা করলেন...সেটার জন্য মোটেও প্রস্তুত ছিল না বর্ষা। দ্রুত পায়ে এগিয়ে গিয়ে রনজয় বাবু কর্ন পিশাচীর মূর্তির পাদদেশ হতে দুই হাতে পাগলের মতো মাটি সরাতে শুরু করলেন।ক্রমে সেখানে উন্মুক্ত হয়ে পড়তে শুরু করল একটি নরকঙ্কাল! বর্ষার বুঝতে অসুবিধা হল না... এই হল ওর জন্মদাত্রী মায়ের অস্হিসর্বস্ব দেহাবশেষ!আর পারল না বর্ষা...হাউ হাউ করে কেঁদে ফেলল।বলল..."আপনি মানুষ না পিশাচ! নিজের বিকৃত স্বার্থ সিদ্ধির জন্য একটার পর একটা পাপকাজ করে যেতে বিবেকে বাঁধছে না আপনার?এই দুনিয়ায় সবাইকেই কিন্তু একদিন ঈশ্বরের সামনে গিয়ে দাঁড়াতে হবে...!" বর্ষা যে এখন...এই মূহুর্ত থেকে তাঁকে সম্পূর্ণরূপে নিজের পিতার আসন থেকে ঘৃণার আস্তাকুঁড়ে ছুঁড়ে ফেলে দিয়েছে...এটা পরিষ্কার বুঝতে পারলেন রনজয় বাবু।তবে বর্ষার এই ঘৃণা...রনজয় বাবুর মনে এতটুকুও দুর্বলতা জাগাতে পারল না। বর্ষার ছুঁড়ে দেওয়া ঘৃণার প্রত্যুত্তরে তিনিও একরাশ অবজ্ঞা ছুঁড়ে দিয়ে বলে উঠলেন..."দেবী জেগে উঠেছেন...বলির রক্তের জন্য ফুঁসছেন... আগামী বারো ঘন্টার মধ্যেই তোমার ভবলীলা সাঙ্গ হবে।এখন আমাকে ভর্ৎসনা না করে...ইষ্ট নাম জপ করো।" দৃশ্য কুড়ি এক মন দুশ্চিন্তা নিয়ে মধুরিমা ফল কাটা শেষ করে...তার মধ্যে কিছু ফলের টুকরো তুলে নিয়ে একটা প্লেটে রাখল।তারপর ঋক আর প্রীতমের শোয়ার ঘরের সামনে গিয়ে নক করল।নাঃ... কোনো সাড়াশব্দ পেল না।কি ব্যাপার... এতবার দরজায় শব্দ করে নক করার পরেও ও দরজা কেন খুলছে না!তার পর মূহুর্তেই ওর মনে হল... নিশ্চয়ই এখনো অঘোরে ঘুমাচ্ছে ছেলেটা...!নাঃ... এইবার ওকে ঘুম থেকে তুলে কিছু খাবার খাওয়াতেই হবে।এতক্ষণ ধরে খালি পেটে থাকা ঠিক নয়। এবার রীতিমতো দরজায় বল প্রয়োগ করে আরো জোরে নক করতে গেল মধুরিমা।এর ফলে...ক্যাঁচ করে একটা শব্দ করে দরজাটা খুলে গেল। দরজা যে ভিতর থেকে লক করে রাখা ছিল না...এইটা মধুরিমা বুঝতে পারল।ও ফলের প্লেট হাতে হনহন করে ঘরে ঢুকে দেখল... বিছানায় শুধু বালিশ আর কম্বল অগোছালো অবস্থায় পড়ে রয়েছে।প্লেটটা বেডসাইড টেবিলে রেখে আপন মনে বিড়বিড় করে উঠল মধুরিমা। "ছেলেদের ঘর কোনটা আর মেয়েদের ঘর কোনটা...এটা ঘরের ভিতরকার ছিরিছাঁদ দেখলেই যে কেউ সহজে বলে দেবে। এরকমভাবে ঘর অগোছালো করে থাকাটা ছেলেদের পক্ষেই সম্ভব!" আপন মনে বিড়বিড় করতে করতে মধুরিমা ওদের বিছানার বালিশ গুলো ঠিকঠাক করে রেখে কম্বলটা তুলে নিয়ে ভাঁজ করতে শুরু করে দিল।বেশ কিছুক্ষণ কেটে যাওয়ার পর ওর মনে হল...কি ব্যাপার... বাথরুম থেকে বেরোতে আর কত সময় লাগবে প্রীতমের!কম্বলটা ভালো করে ভাঁজ করে বিছানায় পাট পাট করে রেখে এবার মধুরিমা হন্তদন্ত হয়ে এগিয়ে গেল বাথরুমের দরজার সামনে। চেঁচিয়ে উঠে বলল..."কি রে...আর কতক্ষন বাথরুমে বসে মোবাইল স্ক্রল করবি?নিজের শরীরের প্রতি একটু তো সদয় হ... সকাল থেকে খালি পেটে আছিস...তোর জন্য একটু ফল কেটে আনলাম... তাড়াতাড়ি বেরিয়ে এসে খেয়ে নে।" এই বলে দরজায় হাত রাখতেই ও বুঝতে পারল... বাথরুমের দরজাটাও ভিতর থেকে লক করা নেই।ও তাড়াতাড়ি করে বাথরুমের দরজাটা ঠেলে ভিতরে ঢুকল। ঢুকে ও বুঝতে পারল... প্রীতম বাথরুমেও নেই। এবার ওর পিঠ দিয়ে একটা হিমশীতল স্রোত বয়ে গেল যেন...! সর্বনাশ...প্রীতম আবার কাউকে কিছু না জানিয়ে বেপাত্তা হয়ে গিয়েছে! উদ্ভ্রান্তের মতো ছুটে বাথরুম থেকে বেরিয়ে এল মধুরিমা।তার পরক্ষণেই ওর চোখে পড়ল... জানলার কাছে গুঁজে রাখা রয়েছে একটা ভাঁজ করা কাগজের টুকরো।ও তাড়াতাড়ি ছুটে গিয়ে কাগজটা বার করে ভাঁজ খুলল। তারপর পড়তে শুরু করল প্রীতমের লেখা একটা চিঠি। ঋক, মধুরিমা, দীপিকা আমি প্রথমেই তোদের কাছে ক্ষমা চেয়ে নিচ্ছি।তোদের কাউকে কিছু না বলে এইভাবে তোদের সবাইকে ছেড়ে আমি চিরতরে পরপারে পাড়ি দিতে চলেছি।প্রথমবার...ওই মন্দিরের চাতালে...আমি হঠাৎ করে তোদের মাঝে থেকে উঠে গায়েব হয়ে গিয়েছিলাম...তার জন্য তোরা আমাকে দোষী মনে করতে পারিস। কিন্তু বিশ্বাস কর...ওই ঘটনায় আমার কোনো দোষ ছিল না।যে ভয়ঙ্কর সত্যি টা তোরা জানিস না...আমি আজ তার মুখোমুখি এসে দাঁড়িয়েছি। আর্কিওলজির প্রজেক্ট করতে আমাদের প্রথম বছরেই এই পাহাড়ি সৌন্দর্যে আবৃত অপূর্ব জায়গায় পাঠানোর যাবতীয় বন্দোবস্ত করেছেন আমাদের প্রিন্সিপাল স্যার। এখানে ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে অজস্র পুরোনো মন্দির আর এখানে এসে আমাদের রিসার্চ করা এবং প্রজেক্ট তৈরী করার কথা ছিল। কিন্তু আমরা কেউই জানতাম না...এটা আমাদের প্রিন্সিপাল স্যার রনজয় চ্যাটার্জির একটা ফাঁদ! চারপাশে এত হোটেল থাকতে...উনি পাহাড়ের গায়ে এই হোটেল ই আমাদের জন্য বুকিং করেছেন যা ওই অভিশপ্ত মন্দিরের খুবই কাছে।আমরা শহরের নামী ইংরেজি মাধ্যম স্কুলে পড়া ছেলেমেয়ে। গ্রাম্য কুসংস্কারের আচ্ছন্ন কোনো চিন্তাকে আমরা যে একেবারেই ধর্তব্যের মধ্যে আনব না...এ তিনি খুব ভালোভাবেই জানতেন। তিনি এও জানতেন...চারপাশে ওই মন্দিরে রাতের অন্ধকারে পা রাখা নিয়ে নিষেধাজ্ঞা শোনার পরও আমরা ওই নিষিদ্ধ কাজটাই করব।ওই মন্দির চত্বরে আমার পা পড়ার অপেক্ষাতেই ছিলেন রনজয় চ্যাটার্জি।তিনি আমার বাবার সাথে তার আলাপচারিতা রয়েছে।সেই সূত্রে গল্পচ্ছলে তিনি জেনে নিয়েছেন...আমার জন্ম কুন্ডলী...তিথি নক্ষত্র। তিনি বুঝতে পারেন...আমিই সেই জাতক...যার অপেক্ষায় তিনি দীর্ঘকাল প্রহর গুনেছেন।আমার সংস্পর্শেই জেগে উঠবে ওই অভিশপ্ত মন্দিরের ভিতরের গোপন অন্ধকার কুঠুরির গুহ্য আরাধ্যা...কর্ন পিশাচিনী! রনজয় চ্যাটার্জির পরিকল্পনাগুলো ঠিকঠাকভাবে কাজ করতে শুরু করে।আমরা সকলেই অচিরেই ওঁর পাতা ফাঁদে পা দিয়ে বসি।রাতের অন্ধকারে ওই মন্দির চাতালে আমরা সকলেই যখন গভীরভাবে নিদ্রামগ্ন ছিলাম...ওই সময়ে হঠাৎ একটা অদ্ভুত শব্দে আমার ঘুম ভেঙ্গে যায়। কোনো মায়াবিনী নারীর মায়াকান্নায়... আমার অন্তরাত্মা উথালপাথাল করে উঠতে শুরু করে।এরপর...ওই আলোআঁধারিতে আমি স্পষ্ট দেখতে পাই...এক নারীমূর্তি আমায় হাতছানি দিয়ে ডাকছে। এরপর আর আমার কিছু মনে নেই।কিন্তু চোখ খোলার পর আমি আমার চারপাশে যা দেখতে পাই...তাতে আমার মাথায় আকাশ ভেঙ্গে পড়ে।আমি যেখানে এসে পড়েছি...সেটা একটি অন্ধকার কুঠুরি...। চোখ মেলে আমি দেখি...একটি ভয়াল দর্শন দেবীমূর্তির পায়ের কাছে আমি শুয়ে রয়েছি।ওই দেবীমূর্তি হতে আমার শরীর পর্যন্ত বিস্তৃত হয়েছে একটা রক্তাভ আলো।আমি অচিরেই বুঝতে পারি... দেবীমূর্তি জেগে উঠেছে।তার সমস্ত সত্ত্বা ধীরে ধীরে প্রবেশ করছে আমার শরীরে...। এরপর ক্রমে আমার নিজের অস্তিত্ব নিদ্রামগ্ন হয়ে পড়তে শুরু করে...আর আমার ওপর ভর করে ওই ভয়াল দর্শন পিশাচিনীর মূর্তির অন্তর্নিহিত একটা পিশাচ সত্ত্বা।ওই লাল আলো পরিণত হয় একটি ছোট মূর্তিতে।এরপর ওই অন্ধকার কুঠুরি হতে আমি বেরিয়ে আসি।ওই মূর্তি থেকে যায় আমার সঙ্গে...একটি অবিচ্ছেদ্য অঙ্গের মতোই।আর এর পর থেকেই আমার এই দুইহাতকে ব্যবহার করে ওই পিশাচিনী...রাতের অন্ধকারে একের পর শিশুদের যাদু দিয়ে কজ্বা করে ওদের ফুলের মতো কচি শরীর ছিঁড়েখুঁড়ে বার করে আনে মাংসল হৃদপিন্ড! সেগুলো আমার ই হাত দিয়ে তার খাদ্য হিসেবে জমা হতে থাকে ওই অন্ধকার কুঠুরির ভিতরে... জনমানুষের অগোচরে।এইভাবেই চলছিল... হঠাৎ কোনোভাবে ওই মূর্তি আমার থেকে আলাদা হয়ে যায়।আর তার ফলপ্রসূই আমি ফিরে পাই নিজের সত্ত্বা এবং স্মৃতি।আমি বুঝতে পারি...আমার এই দুই হাতে কি নৃশংস পাপাচার হয়ে চলেছিল বিগত কয়েকদিন ধরে। লজ্জায় ঘৃণায়... আমার মাটিতে মিশে যাওয়ার উপক্রম হয়েছিল কিন্তু গতরাতে... আমার পাশে ঋক যখন গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন...তখন আমি স্পষ্ট দেখতে পাই...আমাদের ঘরের জানলার কাছে...নিকষ আঁধারের বুকে ধীরে ধীরে প্রস্ফুটিত হয়ে উঠতে শুরু করছে এক নারী অবয়ব।ওই নারী অবয়ব যখন আমার কাছে স্পষ্টভাবে ধরা দিল...তখন আমি অবাক হয়ে দেখি...ওর মুখের ছাঁচের সাথে বর্ষার মুখের কি ভীষণ সাদৃশ্য...যেন এই মুখটাই...কেটে ঠিকঠাক করে বর্ষার মুখে বসিয়ে দেওয়া আছে!ওই নারীমূর্তির দুচোখে একটা অব্যক্ত যন্ত্রনার আকুতি আমি ভীষনভাবে উপলব্ধি করতে পারছিলাম। আমার অন্তরাত্মা কেমন উথালপাথাল করে উঠল।নিকষ অন্ধকার রাতে ওই নারী ক্রমাগত আমাকে নিজের কাছে আহ্বান জানাতে শুরু করল...আমি বুঝতে পারলাম...ওই অতৃপ্ত আত্মা আমাকে কিছু বলতে চায়।আমি ওই অমোঘ আহ্বান উপেক্ষা করতে পারিনি...আমি জানলা দিয়ে চুপিসারে বেরিয়ে যাই এবং বাতাসের সাথে ধাবমান ওই নারী অবয়বটির পিছু নিই। কতক্ষণ ওইভাবে একটি ছায়ামূর্তির পিছনে যে ছুটে ছিলাম...তা ঠাহর করতে পারি না।ওই ছায়ামূর্তি আমায় পথ দেখিয়ে যেখানে নিয়ে যায়... সেখানে আগেও আমার পা পড়েছে।আমি পৌঁছে যাই ওই অভিশপ্ত মন্দিরের গর্ভগৃহের ভিতরের গোপন দরজা ভেদ করে সেই অন্ধকার কুঠুরির ভিতরে। সেখানে গিয়ে আমি যে দৃশ্য দেখি...তাতে আমার রক্ত হিম হয়ে যায়।আমি দেখি... অসংখ্য মাংসল হৃদপিন্ডের স্তূপের মাঝখানে অচৈতন্য অবস্থায় পড়ে রয়েছে বর্ষা!আমি আতঙ্কে চিৎকার করে উঠি।আমি একছুটে বর্ষার কাছে গিয়ে ওকে পাঁজাকোলা করে তোলার চেষ্টা করতে শুরু করি। মনে মনে স্হির করি..."এই নরকে আর এক মূহুর্তও আমি আমার বর্ষা কে থাকতে দেব না।যত তাড়াতাড়ি সম্ভব ওকে নিয়ে আমাকে এই অভিশপ্ত স্হান পরিত্যাগ করতে হবে। কিন্তু কি অদ্ভুত ব্যাপার... বর্ষার রক্তমাংসে গড়া শরীরটা যেন সহস্র মণ লোহার তৈরি মনে হল। ওকে তুলতে গিয়ে যখন আমার রীতিমতো গলদঘর্ম অবস্থা... ঠিক সেই সময়ে কোনো এক অশরীরী আত্মা ওই অন্ধকার কুঠুরির বদ্ধ বাতাস কাঁপিয়ে বলে উঠল..."এইভাবে ওর মুক্তি সম্ভব নয়!" আমি আতঙ্কে চিৎকার করে উঠে বললাম..."কে?কে তুমি? পুনরায় বাতাস কাঁপিয়ে উত্তর এল..."আমিই তোমাকে পথ দেখিয়ে এখানে নিয়ে এসেছি বাবা... তুমি এইভাবে এখান থেকে ওর মুক্তির ব্যবস্থা করতে পারবে না...ও এখন এই অন্ধকার কুঠুরির ভিতরে... মিস্টার রনজয় চ্যাটার্জির ফাঁদে আষ্টেপৃষ্ঠে বাঁধা পড়ে গিয়েছে।" আমি বিস্ময়ে হতবাক হয়ে যাই ওই নাম শুনে।ওই বিদেহী আত্মার দ্বারা এইমাত্র যে নাম উচ্চারিত হল... তিনি যে আমাদের কলেজের প্রিন্সিপাল... বর্ষার বাবা...! বিদেহী আত্মা আবার বলে উঠল..."আমি বর্ষার জন্মদাত্রী মা।আমি আজ পর্যন্ত নিজেকে ক্ষমা করতে পারিনি।বাইশ বছর আগে...পরিস্থিতির চাপে দুর্বল হয়ে ক্ষণিকের জন্য আমার সব বিচারবুদ্ধি লোপ পেয়েছিল...তিন মাসের মেয়ে বর্ষাকে একা করে দিয়ে আমি স্বার্থপরের মতো আত্মহননের পথ বেছে নিই।আর আমার ওই সর্বনাশা পাপের মাসুল সারা জীবন গুনে গিয়েছে...আর আজ আমার ই কারণে এই নরকে ওকে নৃশংসভাবে মরতে হবে।তুমি আমার মেয়েটাকে বাঁচাও বাবা... আমার মেয়েটাকে বাঁচাও...!" বিদেহী আত্মার বলা ওই কথাগুলো শুনে আমি বিস্ময়ে হতবাক হয়ে পড়লাম... আমার মুখ দিয়ে অস্ফুট স্বরে শুধু একটা কথা বেরিয়ে এসেছিল।"আমি কি করে বাঁচাব বর্ষা কে?" বিদেহী আত্মা ফের বলে উঠল..."এখানকার যিনি স্হানীয় তান্ত্রিক... সবাই তার কথা মেনে চলে অন্ধের মতো। কিন্তু কেউ জানে না... সমস্ত জনহিতকর কাজের আড়ালে...তিনি আসলে নিম্ন তন্ত্রের উপাসনা করেন।বাইশ বছর আগে তাঁর সাথে বর্ষার বাবা হাত মিলিয়ে এই পুরো পরিকল্পনাটা একে নিয়েছিল।ওই তান্ত্রিকের কথাতেই এই অভিশপ্ত মন্দিরের কর্ন পিশাচীকে নিদ্রিত করে রাখার উপাচার এক বছরের জন্য মুলতুবি রেখেছে এখানকার সব মানুষ। রনজয় চ্যাটার্জির কাজ সহজ করার জন্য ই যে এই নির্দেশ...এই সত্যটা কেউ জানে না।রনজয় চ্যাটার্জি তলায় তলায় বর্ষার ব্যক্তিগত জিনিসপত্র ঘাঁটতেন...ওর জীবন সম্পর্কে ওয়াকিবহাল থাকার জন্য।ওইভাবেই তিনি বর্ষার ডায়েরী পড়ে ফেলেন... যেখানে ও অকপটে লিখে রেখেছিল তোমার প্রতি ওর ভালোবাসার কথা... তোমার জন্য একটা সোনার আংটি ও কিনে রেখেছিল...যেটা দিয়ে ও তোমাকে নিজের মনের কথা বলার জন্য উদগ্রীব ছিল। এই কথা শুনে...আমার কন্ঠ ভিজে এল।আমি বললাম..."বর্ষা আমাকে ভালোবাসে? বিদেহী আত্মা বলে উঠল..? "হ্যাঁ বাবা...আমার মেয়েটা তোমাকেই জীবন সাথী হিসেবে মনে মনে বেছে নিয়েছে। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত ওই লেখার সাথে সাথে ওই আংটিও রনজয় চ্যাটার্জির কব্জায় চলে যায়।তোমারা এখানে পা রাখার পর প্রথমে তুমি তাঁর পাতা ফাঁদে পা দিলে...আর তার কিছু পরে...ওই আংটি...তোমার সংগ্রহ করে আনা একটা শিশুর হৃদপিন্ডে গেঁথে...রাতের অন্ধকারে বর্ষার ঘরের জানলার কাছে রেখে...ওর জন্য পাতেন একটা কদর্য ফাঁদ! আমার মেয়ে সেই ফাঁদে পা দিয়ে ফেলে...যার ফলপ্রসূ ও আজ এখানে।বাবা... তোমাদের এখানে পা রাখা থেকে আরম্ভ করে প্রতিনিয়ত যা যা ঘটে চলেছে... সেই সমস্তকিছুই আসলে ওই তান্ত্রিক আর রনজয় চ্যাটার্জির পাতা ফাঁদ!এই মন্দিরের গুপ্ত কুঠুরিতে পাঁচশো বছর ধরে নিদ্রিত কর্ন পিশাচিনী তোমার সংস্পর্শেই জেগে উঠেছে।তাই ওই তান্ত্রিক ও রনজয় চ্যাটার্জির পরে একমাত্র তোমারই ক্ষমতা আছে... আমার এই বিদেহী আত্মাকে চাক্ষুষ করার... আমার কথা শোনার...! তুমি যেমন করে পারো...একটা ব্যবস্থা করো।যাতে রাত বারোটার পর রনজয় চ্যাটার্জি আর ওই তান্ত্রিক কোনোমতে এই মন্দির চত্বরে পা রাখতে না পারে।আজ রাত বারোটার পরেই আসবে সেই মাহেন্দ্রক্ষণ...যখন রনজয় চ্যাটার্জি...কর্ন পিশাচীর পায়ে আমার মেয়েকে বলি দেবে...আর আমার অস্হিসর্বস্ব দেহাবশেষ কৃত্রিমভাবে সচল হয়ে উঠবে।রনজয় চ্যাটার্জি আসল সত্যটা জানে না।ও জানে না...যে বর্ষাকে আমার ঘর থেকে অনাথ শিশু হিসেবে তুলে এনে নিজের স্বার্থসিদ্ধির জন্য নিজের বাড়িতে নিয়ে এসে প্রতিপালন করল...সে আসলেই ওর নিজেরই ঔরসজাত সন্তান! এই কথা শুনে আমি অবাক হয়ে জিজ্ঞাসা করলাম..."কি বলছেন... বর্ষা যে রনজয় চ্যাটার্জির নিজের সন্তান...এই বিষয়ে তিনি নিজেই সম্পূর্ণ অজ্ঞাত?" ---"হ্যাঁ বাবা...ও জানে না...ও কতবড় পাপ করতে চলেছে নিজের হাতে... তুমি যেমন করে পারো... ওকে আটকাও...আমি আর বেশিক্ষণ এই পৃথিবীর বাতাসে নিজেকে ধরে রাখতে পারব না। তুমি তাড়াতাড়ি যাও... ওদের আটকাও...!" আমি পুরো ব্যাপারটার আগাগোড়া কিছুই বুঝতে পারলাম না। শুধু এতটুকু বুঝলাম...আজ রাত বারোটার পর যে অঘটন ঘটতে চলেছে...সেটা আমায় আটকাতেই হবে...যেমন করেই হোক...! বিদেহী আত্মার পথনির্দেশ অনুসারে আমি কুঠুরি থেকে বেরিয়ে ওই তান্ত্রিকের আস্তানায় গিয়ে পৌঁছে যাই। সেখানে গিয়ে আমি আড়াল থেকে ওই তান্ত্রিক কে চাক্ষুষ করি...যিনি আসলে এইসব কিছুর নেপথ্যে সকলের অজ্ঞাতে কলকাঠি নেড়ে চলেছেন।আমি আড়াল থেকে শুনি...ওই তান্ত্রিক করজোড়ে কারোর সঙ্গে কথা বলছেন।খানিক পরে আমি বুঝতে পারি... স্বয়ং কর্নপিশাচী এসে ধরা দিয়েছে তান্ত্রিকের কাছে। নিস্তব্ধ বাতাস কাঁপিয়ে...ওই নির্জন স্থানের নৈঃশব্দ্য কে চূর্ণবিচূর্ণ করে...কর্ন পিশাচীর ফ্যাঁসফ্যাঁসে কন্ঠ আলোড়ন তুলেছে। রক্তের তৃষ্ণায় তার জিহ্বা যেন লকলক করে উঠেছে। আকাশ কাঁপিয়ে কর্নপিশাচী বলে উঠল..."আগামীকাল রাত বারোটার পর আমার নরবলি চাই।বহুযুগ পরে আমি আশ মিটিয়ে মানুষের শিরশ্ছেদের রক্ত পান করব।দেখিস... প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করার চিন্তা ভুলেও আনবি না। দীর্ঘ পাঁচশো বছর ধরে এরা সবাই আমাকে ঘুম পাড়িয়ে রেখেছিল।এত বছর পর আমাকে জাগিয়ে... প্রতিশ্রুতি দিয়ে...তারপর পাঁচশো বছর আগের ওই দুঃসহ রাতের মতো আমাকে যদি ফের অভুক্ত রেখে দিস...আমি এবার তোদের কাউকে ছাড়ব না।এই ধরিত্রীকে আমি শ্মশান ভূমিতে পরিণত করব...!" আমি অপার বিস্ময় নিয়ে দেখলাম... তান্ত্রিক হাতজোড় করে বলছে..."পাঁচশো বছর আগের মতো আর তোকে অভুক্ত থাকতে হবে না।তোর জন্য নরবলির ব্যবস্থা করেছি...!" ---"সত্যি... সত্যি বলছিস তুই...!" কর্ন পিশাচীর অট্টহাসিতে চারপাশের বাতাস ভীষণভাবে কেঁপে উঠল। তখন আমি বুঝতে পারলাম...অঘটন আটকানোর আর কোনো রাস্তা অবশিষ্ট নেই।কর্ন পিশাচী যদি কাল রাত বারোটার পর নরবলির রক্ত না পায়... তাহলে অনর্থ হয়ে যাবে...! যেভাবে নিস্তব্ধতার সাথে আমি তান্ত্রিকের অজ্ঞাতে ওঁর আস্তানায় পা রেখেছিলাম... সেরকমই নিস্তব্ধতার সাথে আমি সেখান থেকে বেরিয়ে আসি।ভোর রাতে আমি ফিরে আসি এই হোটেলের ঘরে। প্রথমে ভেবেছিলাম তোদের সবটা জানিয়ে তারপর সবাই মিলে একটা না একটা উপায় বার করব। কিন্তু ক্রমে একটা জিনিস আমি পরিষ্কারভাবে বুঝতে পারি...এই পরিস্থিতিতে... কর্নপিশাচীর পায়ে একটা নরবলি অর্পণ ব্যতীত... পরিত্রাণের আর কোনো উপায় নেই।তাই আমি ঠিক করি...আমি নিজেকেই কর্নপিশাচীর পায়ে ভেট দেব। সবকিছু আবার আগের মতো ঠিক করে দেওয়ার এইটাই একমাত্র উপায়।তাই আমি কাউকে কিছু না জানিয়ে সকলের অগোচরে আবার অন্তর্ধান করলাম না ফেরার দেশে পা রাখার উদ্দেশ্যে।তোরা আমায় ক্ষমা করে দিস...এ ছাড়া আর কোনো উপায়ই নেই সবকিছু ঠিক করার।আমি জানি... বর্ষা কাল সকালের পর তোদের মাঝে ফিরে আসবে।তোরা ওকে একটু দেখিস... আমার জন্য ও যেন চোখের জল না ফেলে... ওকে বলিস...ওর হাসিমুখেই আমি থাকব।বিদায়! প্রীতমের এই চিঠি পড়ে তো রীতিমতো মাথায় হাত দিয়ে বসে পড়ল দীপিকা...! তারপর কোনোমতে বিস্ময়ের ঘোর কাটিয়ে...ও সাথে সাথে ঋককে ফোন দিল। দৃশ্য একুশ রাত গভীর। দক্ষিণ ভারতের আকাশ জুড়ে নেমে এসেছে ঘনঘোর তান্ডব!কর্নপিশাচী এখন নরবলি চায়। অভিশপ্ত মন্দিরের চূড়ায় আজ যে আগুন প্রজ্জ্বলিত হয়ে উঠেছে...ওই আগুনের লেলিহান শিখা যেন আজ গোটা ধরিত্রীকে গিলে খাওয়ার ভয়াল আস্ফালনে গর্জে উঠছে।কুঠুরির ভিতরে এখন প্রীতম কর্ন পিশাচীর ভয়ঙ্কর দর্শন মূর্তির নীচে দাঁড়িয়ে রয়েছে।অদূরেই রাখা রয়েছে সুবিশাল একটি হাঁড়িকাঠ।প্রীতম অদূরেই রাখা একখানি ধারালো কাটারি তুলে নিল নিজের হাতে।ওদিকে অসংখ্য রক্তমাখা মাংসপিন্ডের মাঝে শায়িত বর্ষার চেতনা ফিরতে শুরু করেছে একটু একটু করে।প্রীতম কাটারি খানি নিজের ঘাড়ে সজোরে বসাতে যাবে... ঠিক সেই মুহূর্তে বর্ষা পাগলের মতো ছুটে এল সেখানে।নিজের শিরশ্ছেদ করার অভিপ্রায়ে মরিয়া প্রীতমের হাতখানি ও সজোরে চেপে ধরল।তারপর প্রচন্ড জোরে একটা চড় কষাল বর্ষা... প্রীতমের গালে। প্রচন্ডভাবে গর্জে উঠে বর্ষা বলে উঠল..."এটা তুই কি করতে যাচ্ছিলি প্রীতম?কি করতে যাচ্ছিলি?" প্রচন্ড আবেগে আর উত্তেজনায় থরথর করে কাঁপছে বর্ষা। প্রীতমের হাত থেকে কাটারি টা সবলে কেড়ে নিল বর্ষা।তারপর সমস্ত আড়ষ্টতা ভুলে প্রীতমের বুকে ঝাঁপিয়ে পড়ে হাউ হাউ করে কাঁদতে শুরু করে দিল বর্ষা।এই প্রথমবার প্রীতম বর্ষাকে এতটা নিজের করে পেল। কিন্তু আজ আর এই আনন্দের স্রোতে নিজের অভীষ্ট ভুলে গেলে যে ওর চলবে না...! নিজেকে অতি কষ্টে সামলে নিল প্রীতম। তারপর বলল..."বর্ষা...আমার হাতে যে আর একেবারেই সময় নেই... দেখতে পাচ্ছ না...এই অন্ধকার কুঠুরির উপাস্য দেবী কর্ন পিশাচী নরবলির রক্তপান করার তৃষ্ণায় কি ভীষণ ব্যাকুল হয়ে উঠেছে... তাকে এখন শিরশ্ছেদের রক্ত পান না করালে যে অনর্থ হবে।গোটা পৃথিবীটা শ্মশান ভূমিতে পরিণত হবে...!" ---"তাই যদি হয়...তাহলে আমি বলিদান দেব।আমি বেঁচে থাকতে তোমার এই পরিণতি আমি দেখতে পারব না প্রীতম... কিছুতেই না...এই বলে বর্ষা অকস্মাৎ একটা কাজ করে বসল।প্রীতমকে সজোরে ধাক্কা দিয়ে দূরে সরিয়ে দিল।প্রীতম কিছু বুঝে ওঠার আগেই...বর্ষা কাটারি টা এবার নিজের ঘাড়ের কাছে নিয়ে এসে সজোরে একটা কোপ বসাতে উদ্যত হল। কিন্তু কি আশ্চর্য... বর্ষার হাত সবলে আটকে দিল একটা পুরুষালি হাত।এই হাত প্রীতমের নয়।তবে এই হাত কার! বর্ষা অবাক হয়ে পিছনে ঘুরে তাকাতে যা দেখল...তাতে ও নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে পারল না।ওর সামনে অপরাধীর মতো মুখ নিয়ে যিনি দাঁড়িয়ে রয়েছেন... তিনি আর কেউ নন... তিনি হলেন রনজয় চ্যাটার্জি। তাঁর দুই চোখ দিয়ে অবিরাম নির্গত হয়ে চলেছে অনুতাপের অনলে দগ্ধ হওয়ার ফলপ্রসূ অশ্রুর বারিধারা...!কাটারি টা তিনি বর্ষার হাত থেকে ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে বললেন..."মা রে...তোর এই অধম বাপটাকে তুই ক্ষমা করে দে...সারা জীবন ধরে আমি তোর সাথে অন্যায় করে গিয়েছি।বাবার স্নেহ ভালোবাসা থেকে তোকে বঞ্চিত করেছি।তোর সামনে সোজা হয়ে দাঁড়ানোর মতো শক্ত শিড়দাড়া আমার নেই।তবু...যদি পারিস.. আমাকে মার্জনা করে দিস...! বর্ষা অপার বিস্ময় নিয়ে সহস্র প্রশ্ন চোখে নিয়ে তাকাল রনজয় চ্যাটার্জির দিকে। রনজয় চ্যাটার্জি আবার বলে উঠলেন..."গতকাল রাতে এখানে পা রেখে...সন্ধ্যার বিদেহী আত্মার বলা কথাগুলো আমার কর্ন গোচরে আসে।আমি প্রথম জানতে পারি...তুই আসলে আমার মেয়ে... আমার ঔরসজাত সন্তান।" এই বলে কান্নায় ভেঙে পড়লেন রনজয় বাবু। হঠাৎ চারপাশ... একটা পৈশাচিক হুংকারে যেন ভীষণভাবে গর্জে উঠল।বর্ষা আর প্রীতম বুঝতে পারল...কর্ন পিশাচীর ক্ষুধা এখন লেলিহান শিখায় গর্জে উঠেছে।তার এখনই নরবলি চাই! এক্ষুনি! ঠিক সেই ই মুহূর্তে সেখানে প্রবেশ করলেন তান্ত্রিক।রনজয় বাবুর কন্ঠে এক অনির্বাচনীয় এক দৃপ্ততা ভীষণভাবে গর্জে উঠল।তিনি বজ্রকঠিন কন্ঠে বলে উঠলেন..."আমিই সমস্ত নষ্টের মূল।তাই আজ আমার রক্ত দিয়েই ধরিত্রীর বুকে নেমে আসা সমস্ত সর্বনাশের যবনিকার পতন হোক।বাবা জি...আপনি আর এক মূহুর্তও দেরি করবেন না... এক্ষুনি ওই কাটারি টা দিয়ে আমার শিরশ্ছেদ করে আমার ছিন্ন মুন্ড টা দেবীর পায়ে ভেট দিন...জলদি...! এই বলে তিনি হাঁড়িকাঠে নিজের মাথাটা রাখলেন। তান্ত্রিক ও আর কালবিলম্ব করল না। চোখের নিমেষে ছুটে গিয়ে কাটারি টা হাতে তুলে নিয়ে... সজোরে একটা কোপ বসিয়ে দিল রনজয় বাবুর গলায়।সাথে সাথে রনজয় বাবুর ভয়ঙ্কর আর্তচিৎকারে আকাশ যেন ফেটে পড়ল। পুরো ব্যাপারটা ঘটে গেল চোখের নিমেষে। বর্ষা আর প্রীতম কিছু ঠাহর করে উঠতে পারার আগেই...রনজয় বাবুর ছিন্ন মস্তক খানি ছিটকে গিয়ে পড়ল কর্ন পিশাচীর পায়ে।আর সাথে সাথে ওই মূর্তি জীবন্ত হয়ে উঠলো।সে উদ্দাম নৃত্যের সাথে ওই ছিন্নমুন্ডের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে পরম তৃপ্তির সাথে চেটে চেটে খেতে শুরু করল চারপাশে প্রবাহমান রক্ত!তার গগনবিদারী অট্টহাসিতে প্রীতম আর বর্ষার সারা শরীর ঘিনঘিন করে উঠল।বর্ষার চোখের কোলজুড়ে উথলে উঠল পিতৃ বিয়োগের অশ্রু। কান্নাভেজা কন্ঠে বর্ষা এবার ভীষণভাবে আর্তনাদ করে উঠল। জীবনে প্রথমবার বাবা ওকে নিজের সন্তানের স্হানে পরম আদরে বসিয়ে...পরম স্নেহের সাথে ওকে স্পর্শ করেছিল।আর তার কিছুক্ষণের মধ্যেই মানুষটার এমন ভয়ঙ্কর পরিণতি হল...এ যেন কিছুতেই মেনে নিতে পারছে না বর্ষা। সমস্ত প্রতিহিংসা...রেষারেষি...এক লহমায় রক্তের স্রোতের সাথেই যেন ধুয়ে মুছে সাফ গেল। হঠাৎ প্রীতম জোরে চেঁচিয়ে উঠল..."আগুন...!" বর্ষা এবার চারপাশে দেখে বুঝতে পারল...এই কুঠুরি যে আগুন লেগে গিয়েছে। প্রীতম বর্ষার হাত শক্ত করে ধরে বলে উঠল..."আর এক মুহূর্তও এখানে নয় বর্ষা... আমাদের এখান থেকে পালাতে হবে। প্রীতম বর্ষার হাতটা নিজের হাতের সাথে শক্ত করে ধরে কুঠুরির বাইরে যাওয়ার পথ অনুসরণ করে ছুটতে শুরু করল প্রাণপণে।ছোটার সময়ে একবার চকিতে পিছনে ফিরে দেখল বর্ষা।ওর চোখে পড়ল... দ্রুত ছুটতে না পারার কারণে ক্রমাগত ওই ভয়ঙ্কর আগুনের লেলিহান শিখা... বৃদ্ধ তান্ত্রিক কে আষ্টেপৃষ্ঠে নিজের উদরে শুষে নিচ্ছে। তান্ত্রিকের ভয়ঙ্কর আর্তচিৎকারে আকাশ বাতাস যেন শিহরিত হয়ে উঠছে। প্রচন্ড গতিতে ছুটতে ছুটতে... অবশেষে কুঠুরি পেরিয়ে মন্দিরের চাতালে পা রাখল প্রীতম আর বর্ষা।ওরা বুঝতে পারল...এই মন্দিরটা ভস্মীভূত হতে আর খুব বেশি দেরি নেই।মন্দিরের চাতাল পেরিয়ে... মন্দিরের বাইরে পা রাখতেই সাথে সাথে একটা ভয়ঙ্কর বিস্ফোরণ সংঘটিত হল। বর্ষা আর প্রীতমের চোখের সামনে ধূলিসাৎ হয়ে পড়ল পাঁচশো বছরের পুরনো মন্দির! ওরা বুঝতে পারল...কর্ন পিশাচী যার রক্তের পিয়াসী ছিল... সেই বর্ষার বদলে অন্য মানুষের রক্তে সন্তুষ্ট থাকতে হল বলেই তার ভয়ঙ্কর ক্ষোভের আগুনে ভস্মীভূত হল এই প্রাচীন মন্দির।কিন্তু যেহেতু নরবলি সে পেয়েছে...তাই সেই সন্তুষ্টি সাথে নিয়েই সে চিরকালের মতো বিদায় নিয়েছে এই ধরিত্রী থেকে। দ্রুতবেগে ছুটতে ছুটতে ওরা দুজনে যখন মন্দিরের বাইরে এসে পা রাখল... তখন ই দীর্ঘ সময় ধরে বুকে চেপে রাখা উদ্বিগ্নতা নিয়ে ওদের কাছে ছুটে এল ঋক, দীপিকা আর মধুরিমা। ওদের ক্ষতবিক্ষত রক্তাক্ত অবস্থা দেখে ওরা ভয়ে রীতিমতো দিশাহারা হয়ে পড়ল। ঋক বলে উঠল... বলিহারি যাই তোদের দুজনের... কোথায় যাচ্ছিস...কেন যাচ্ছিস... একবারটি আমাদেরকে যদি জানাতিস...আমরা কি তোদের রোম্যান্সে বাধা দিতাম?আর প্রীতম তুই...কি সব আজগুবি চিঠি লিখে ঘরে গুঁজে রেখে এইখানে এসে দুজনে রাশলীলায় মেতেছিলি?তোরা দুজনেই হচ্ছিস বন্ধু নামের কলঙ্ক!" বর্ষা প্রীতমের দিকে অবাক দৃষ্টিতে তাকাল। প্রীতম বুঝল... পুরো ব্যাপারটা ওদের বোঝাতে সময় লাগবে।আপাতত ওদের রাগ ভাঙ্গানো টা আগে দরকার। প্রীতম কিছু বলতে যাবে...এমন সময়ে মধুরিমা বলে উঠল..."আহা... রাগারাগি পরে হবে। ওদের হাল টা একেবার দেখ... ওদের দুজনকেই এখন বেড রেস্টে থেকে চিকিৎসা নিতে হবে।আগে ওরা সুস্থ হয়ে উঠুক...তারপর আমরা সবাই আছি না... বন্ধুর ভালোবাসা দেখেছে...রাগ টা দেখেনি।" দীপিকা মধুরিমার কথায় সমর্থন করে বলে উঠল..."হ্যাঁ একদম ঠিক বলেছিস মধুরিমা... এদেরকে ধরে এখন ডাক্তারের কাছে নিয়ে যেতে হবে।সারা গায়ে ছড়ে যাওয়া আর পোড়ার দাগ!কি ভয়ঙ্কর অবস্থা...তোরা দুটিতে প্রেম করার জন্য ভালো জায়গা বেছেছিলি বটে। আমরাও তো ওই মন্দিরের ভিতরে ঢুকতে গিয়েছিলাম... কিন্তু ওই গর্ভগৃহের পর আর আমরা এক পাও এগোতে পারিনি...তোরা কি করে ভিতরে ঢুকেছিলি ঈশ্বর ই জানেন।নে... তাড়াতাড়ি চল... ডাক্তার দেখিয়ে এখন সব ক্ষতগুলো রিকভার করতে হবে।" পাঁচ বন্ধু একসাথে হোটেলের পথে পা বাড়াল।প্রীতম বর্ষার হাতটা আড়ালে চেপে ধরে বলল..."বাবাকে হারালে বলে ভেঙ্গে পোড়ো না বর্ষা...আমি আছি তোমার সাথে...সারাটা জীবন আমি তোমার সাথে থাকব...।" সমাপ্ত

