Gopa Ghosh

Abstract


4.8  

Gopa Ghosh

Abstract


সৌভাগ্য

সৌভাগ্য

10 mins 602 10 mins 602

সৌভাগ্য নেহার গোলাপী শাড়ি টা বারান্দার এক কোণে ছুঁড়ে দিয়ে চিৎকার করে উঠলো

"তোমাকে হাজারবার বারণ করেছি এই শাড়িটা পরবে না. তুমি কিছুতেই কথা শোনো না কেন?"

নেহা পিকুর গালে মাছের টুকরোটা দিয়ে খুব শান্ত ভাবে উত্তর দেয়

"গোলাপী শাড়ি কি এই শহরে শুধু আমারই আছে?"

সৌভাগ্যের আওয়াজ এবার দ্বিগুণ হয়

"আমি যখন বারণ করেছি তুমি ওটা পড়ে কোথাও যাবে না"

পিকুর খাওয়া শেষ। নেহা ওকে বেসিনে মুখ হাত ধুয়ে বিছানায় বসাতে বসাতে বলে

"এখন একটু খেলা করো তারপর আমি এসে হোম ওয়ার্ক করাবো"

নেহার আর কোনো উত্তর না পেয়ে সৌভাগ্য নেহার হাতটা ধরে টেনে পাশের ঘরে নিয়ে যায়।

"তোমার এত কথা বলতে লজ্জা করছে না একটুও, আমি সেদিন না থাকলে আজ তুমি জেলে থাকতে"

"আমি তো কতবার তোমায় বলেছি আমি দোকান থেকে কোন কিছু চুরি করি না, কিভাবে যে পরে বাড়িতে এসে ওটা ব্যাগের মধ্যে পাই সেটা সত্যি বিশ্বাস করো আমি বুঝতে পারি না"

"আমাকে পাগল ভেবেছো? তুমি আর কোনদিন কোন দোকানে কিছু কিনতে যাবে না আমার দিব্যি দেয়া রইল"

সৌভাগ্য অফিসের ব্যাগটা নিয়ে বেরিয়ে যায়।

নেহা জানে দোষটা তার। তবে আবার এটাও জানে যে ও ইচ্ছে করে কিছু করে না। সৌভাগ্যকে অনেক বোঝানোর চেষ্টা করে কিন্তু যখন চুরির জিনিসগুলো ওর ব্যাগ থেকে বের হয় তখন ওর আর কিছু বলার থাকে না। প্রথম প্রথম সৌভাগ্য ভাবতো ভুল করে দোকান থেকেই নেহার ব্যাগে জিনিসটা ঢুকে গেছে। কিন্তু পরপর বেশ তিন চার বার হওয়ার পর ও ও বেশ কিছুদিন ধরে লক্ষ্য রাখছিল। সেদিন এই গোলাপী শাড়িটার ক্ষেত্রেও একই কান্ড হলো। নেহা কাউন্টারে অনেক শাড়ির মধ্যে একটা একটা করে গায়ে ফেলে দেখছিল। সৌভাগ্য ওর পেছনে পিকুকে কোলে করে দাঁড়িয়ে ওর দিকে লক্ষ্য রাখছিল। হঠাৎ পিকুর বাথরুম পাওয়াতে ওকে রাস্তায় একবার বেরোতে হয়। ফিরে এসে দেখে নেহা দোকানের সামনের ফুটপাতে দাঁড়িয়ে। একটু অবাক হয়েই সৌভাগ্য প্রশ্ন করে

"কি হলো শাড়ি পছন্দ হয়েছে?"

নেহা পিকু কে ওর কোল থেকে নিয়ে বলল

"না এখানে তেমন পছন্দ হচ্ছে না"

একটু এগিয়ে যেতেই পেছনের দোকান থেকে একজন লোক ওদের ডাকতে ডাকতে ছুটে এলো

"বৌদি আপনারা ভুল করে বোধহয় শাড়িটা ব্যাগে ভরে ফেলেছেন"

সৌভাগ্যের প্রাণটা ধড়াস করে উঠলো। সঙ্গে সঙ্গে নেহার হাত থেকে ব্যাগটা কেড়ে নিয়ে ঐ লোকটিকে দেখিয়ে দিল। সত্যিই গোলাপি শাড়ি টা ওই ব্যাগে ছিলো না। পিকুকে কোলে নেওয়ার সময় নেহার ভ্যানিটি ব্যাগটা সৌভাগ্যর হাতে ধরিয়ে দিয়েছিল। সৌভাগ্য পিছন থেকে লোকটি ডাকার সময় ভালো করেই বুঝে ছিল শাড়িটা নেহা চুরি করেছে। ঝামেলা এড়াতে ও ভ্যানিটি ব্যাগটা পেছন দিকে ফেলে দিয়েছিল। ভ্যানিটি ব্যাগ হলেও একটা শাড়ি-ব্লাউজ ধরে যাওয়ার মত জায়গা তাতে ছিল। সেদিন যদি সৌভাগ্য ব্যাগটা রাস্তায় ফেলে না দিত তাহলে পুলিশের ঝামেলা এড়ানো খুব কষ্টকর হত। বাড়ি এসে এই নিয়ে তুমুল ঝগড়া হয় নেহা আর সৌভাগ্যর মধ্যে। আশ্চর্যের কথা এত কিছুর পরেও নেহা খুব শান্ত ভাবে কথা বলে। কোন উত্তেজনা ওর মধ্যে নেই। কিন্তু এই চুরি করা টা সৌভাগ্য কিছুতেই মেনে নিতে পারে না। কত বার বলেছে

"তোমার যা কিনতে ইচ্ছে হয় আমাকে বল, আমি গিয়ে এনে দেবো, পয়সার চিন্তা করোনা"

কিন্তু এই কথার কোন উত্তর দেয়না নেহা। এতে সৌভাগ্যর রাগ আরো বেড়ে যায়।


সৌভাগ্য আর নেহার প্রেমের বিয়ে। বছর দুই প্রেম করার পর সৌভাগ্য ই প্রথম বিয়ে র সিদ্ধান্ত নেয়। নেহার পরিবার বলতে কেউ ছিলনা। পিসি আর পিসেমশাই এর কাছে মানুষ। খুব ছোটবেলায় বাবা মা দুজনেই একটা গাড়ি দুর্ঘটনায় মারা যান। পিসি আর পিসেমশাই ওর বাবার সব সম্পত্তির অধিকারী হন কারণ তখন নেহা নাবালিকা। সম্পত্তি বলতে একটা ছোট দু'কামরার বাড়ি আর সামান্য কিছু টাকা। নেহা অবশ্য বড় হয়ে ওই বাড়ি দাবি করেনি। আর টাকা তো অনেক আগেই শেষ হয়ে গিয়েছিল। আসলে নেহার পিসেমশাই খুব কৃপণ প্রকৃতির লোক ছিলেন। নেহা আর ওর পিসির বেশ অভাবেই দিন কাটতো। নেহার পরনের ছেঁড়া পোশাক দেখে কলেজে অনেক বন্ধুরাই হাসাহাসি করত। কিন্তু পিসেমশাই বা পিসিকে বলেও কোন লাভ হতো না। কোন কোন রাত অপমানের জ্বালায় ঘুম আসতো না নেহার। কিন্তু তখনো কলেজ জীবন শেষ হয়নি তাই উপার্জন করাও ওর পক্ষে সম্ভব ছিল না। একদিন পুজোর আগে পিসির সাথে জামা কিনতে গিয়েছিল নেহা। যে জামাটা ওর খুব পছন্দ হয়েছিল সেটা পিসি কিছুতেই কিনে দিল না কারণ সেটার দাম অনেক বেশি ছিল। নেহা কিন্তু সেই জামাটা সবার আড়ালে ব্যাগে ভরে নিয়ে এসেছিল। পিসিও তখন বুঝতে পারেনি। দোকানে যে জামা দেখাচ্ছিলো তাকে পছন্দ হচ্ছে না বলে বার বার অন্য জামা আনতে পাঠিয়ে জামা টা ব্যাগে ভরে নিয়েছিল। সেই থেকে শুরু নেহার চুরি করা। এটা নেহা কোনদিন সৌভাগ্যকে বলেনি। এর পর বিয়ের আগে ও অনেক বার এই কান্ড করেছে কিন্তু কখনই ধরা পড়ে নি। গোলাপি শাড়ীটার ক্ষেত্রে ধরা পড়তে পড়তে বেঁচে গেছে। তবে এখন নেহা এটা আর করতে চায় না তবু কি করে যেন করে ফেলে ও বুঝতে পারে না।


সেদিন সৌভাগ্যের এক বন্ধু আনন্দর বিবাহ বার্ষিকী ছিল। সৌভাগ্যকে অনেক করে নেহা আর পিকুকে নিয়ে যাওয়ার জন্য বলেছিল। সৌভাগ্য অফিস থেকে ফিরে ওদের নিয়ে গেল আনন্দের বাড়ি। খুবই অবস্থাপন্ন ঘরের ছেলে আনন্দ। এটা আনন্দ আর রুমার প্রথম বিবাহ বার্ষিকী। তাই ব্যবস্থাপনায় কোনো ত্রুটি রাখেনি আনন্দ। সৌভাগ্য ঢুকতেই বলল

"কি রে এত দেরি হল কেন?"

"কি করব বল তোর মত আমার তো চার চাকা নেই"ঠাট্টা করে বললো সৌভাগ্য।

"বলতে পারতিস গাড়িটা পাঠিয়ে দিতাম"

এবার ছোট্ট পিকুর হাতটা ধরে আনন্দ বলে"পিকু বাবু তোমার জন্য অনেক চকলেট এনে রেখেছি"

পিকুর মুখ খুশিতে ঝলমল করে ওঠে চকলেটের নাম শুনেই।

আনন্দ নেহা আর সৌভাগ্যকে বাড়ির সবার সাথে আলাপ করিয়ে দেয়। নেহা কে সেদিন লাল শাড়িতে খুব সুন্দর দেখাচ্ছিল। মুখের মধ্যে সবচেয়ে আকর্ষণীয় হলো নেহার চোখ। আই লাইনার আর মাশকারা য় সেই চোখ আরো আকর্ষণীয় হয়ে উঠেছিল। এককথায় নেহা যথেষ্ট সুন্দরী। আনন্দের মা তো নেহার রূপের প্রশংসায় পঞ্চমুখ। সেদিন অনেকটা সময় ওদের খুব আনন্দ করেই কাটল। খাওয়া-দাওয়া সেরে সৌভাগ্য দেখে পিকু নেহার কোলে ঘুমিয়ে পড়েছে। পিকুকে কোলে নিতে যাওয়ায় নেহা বলল

"থাক ও আমার কোলেই ঘুমাক আর তুমি দেরী করোনা চলো বাড়ি যাই"

"তুমি তো শাড়ি পড়ে ওকে নিয়ে হোঁচট খাবে তাই ওকে আমার কোলে দাও"

"না বলছি তো ও ঘুমাচ্ছে ঘুম ভেঙে যাবে তুমি এবার বাড়ি চলো"

সৌভাগ্য কিছু বলতে যাবে এমন সময় আনন্দ ছুটে এসে সৌভাগ্য কে বলল

"সৌভাগ্য একটু বসে যা রুমার হাতের হীরের আংটি টা কোথায় পড়ে গেছে আমি একটু পর তোদের গাড়ি করে দিয়ে আসবো"

সৌভাগ্য আগেই শুনে ছিল আনন্দের মুখে খুব দামী একটা হীরের আংটি ওর মা বিবাহ বার্ষিকীতে রুমাকে দেবে। সেটাই এখন হারিয়ে গেছে। সৌভাগ্যের মনটা কিন্তু কু গাইল। ও নেহার দিকে তাকিয়ে দেখল নেহা পিকুকে কোলে নিয়ে চুপ করে দাঁড়িয়ে আছে। আস্তে আস্তে নেহার দিকে এগিয়ে এসে বলল

"পিকুকে আমার কোলে দিয়ে ভালো করে তোমার ব্যাগটা দেখো আবার অন্য বারের মতো ভুল করে চলে যায় নি তো"?

নেহা কোন কথার উত্তর দিল না। মেন গেট বন্ধ তাই কেউ বেরোতে পারছে না। হিরেটা এতই দামি ছিল যে আনন্দর বাড়ি থেকে পুলিশে খবর দেয়া হল। অতিথিদের অপমান করার ইচ্ছা আনন্দর ছিলনা কিন্তু আনন্দর মা কিছুতেই হিরে চুরি টা মেনে নিতে পারছিল না । পুলিশ আসার পরেও ঘন্টা দুই কেটে গেল কিন্তু হীরের হদিশ মিলল না। শেষে আর কি করা যাবে অতিথিরা যে যার মত বাড়ি ফিরে গেল। শুধু সৌভাগ্যর মনে শান্তি নেই ওর বারবার মনে হচ্ছে এটা নেহারি কাজ। কিন্তু পুলিশ এসেও খুঁজে না পাওয়ায় একটু মনে আশার সঞ্চার হয়েছিল তবে বাড়ি এসে তা মিলিয়ে গেল। হীরের আংটি টা মিললো পিকুর দুধের বোতল থেকে। সৌভাগ্য অবাক,বলতে গেলে তাজ্জব। এমনও হয়?

ও নেহা কে সাবধান করতে করতে ক্লান্ত হয়ে পড়েছিল তাই আর কিছু না বলেই সেদিন ঘুমিয়ে পড়ল।


কিন্তু সারাদিন ওর মনে ওই হীরের আংটি চুরির কথাটা ঘোরে। ছি ছি একটা চোরকে ও বিয়ে করলো আর ওর সন্তানের মাও সে। ভাবল হীরের আংটি টা আনন্দকে ফেরত দিয়ে দেবে। ও একটা জিনিস খুব লক্ষ্য করেছে, একবার চুরি করা হয়ে গেলে সেই জিনিসটার প্রতি কোন আগ্রহ দেখায় না নেহা। এত কষ্ট করে দুধের বোতলের মধ্যে লুকিয়ে হীরের আংটি টা চুরি করে এনে ও সেটার আর কোন খোঁজ নেহা রাখেনা। একবার সৌভাগ্যর মনে হয় এটা নেহার অন্য অসুখ এর মতই একটা অসুখ। কিন্তু কোন ডাক্তার দেখাবে এই অসুখের জন্য সেটা ওর জানা নেই। পরের দিন আনন্দের বাড়ি গিয়ে হীরের আংটি টা ফেরত দিয়ে আনন্দকে নেহার ঘটনাটা অনেকটাই জানালো। আনন্দ কিন্তু সৌভাগ্যকে খুব ভালো একটা পরামর্শ দিলো

"দেখ সৌভাগ্য এটা বৌদির কোনো দোষ নয় আর ও ইচ্ছে করে এটা কখনোই করে না কারণ আমি জানি এটা একটা অসুখ এর পর্যায়ে পড়ে, তুই খুব তাড়াতাড়ি ডাক্তার দেখানোর ব্যবস্থা কর"

"আমি তো ডাক্তার দেখাতে চাই কিন্তু কোন ডাক্তার দেখাবো কিছুতেই বুঝতে পারছি না"

আনন্দ আশ্বস্ত করে সৌভাগ্যকে

"ঠিক আছে আমি ডাক্তারের নাম জোগাড় করছি কাল তুই যাওয়ার ব্যবস্থা কর"

সৌভাগ্য বাড়ি ফিরে নেহা কে কালকে ডাক্তারের কাছে অ্যাপয়নমেন্ট করা আছে বলে কিন্তু ডাক্তারের কাছে যেতে খুব একটা রাজি হয়না নেহা

"ডাক্তারের কাছে কেন দেখাতে যাবো বুঝতে পারছি না আমার তো কোন শরীর খারাপ হয়নি"

সৌভাগ্য বোঝে একে ডাক্তারের কথা বলে নিয়ে যাওয়া যাবে না।

"কাল তোমাকে একবার শাড়ি দোকানে নিয়ে যাব ভাবছিলাম কারণ দেখব তুমি আগের থেকে ঠিক হয়েছে কিনা"

শাড়ির দোকানের নাম শুনে নেহা আর কিছু বলল না।

তবে পরের দিন শাড়ির দোকানে না গিয়ে সৌভাগ্য নেহাকে ডাক্তারের কাছে নিয়ে গেল। নেহাও তার সভাবসিদ্ধ ভঙ্গিতে চুপ করেই রইলো। সৌভাগ্যের থেকে অসুখের কথা বেশ কিছুটা শুনে ড. পাল নেহার সাথে একা কথা বলতে চাইলেন। সৌভাগ্য চেম্বার থেকে বেরিয়ে রাস্তায় এসে একটা সিগারেট ধরায়। মনটা ওর কিছুদিন ধরেই খুব খারাপ। বাবা মায়ের কাছেও অনেকদিন যাওয়া হয় নি। আসলে সৌভাগ্যের বাড়ি ত্রিপুরা, কর্মসূত্রে কলকাতায় বাস। বিয়ের পর একবার নেহাকে নিয়ে ত্রিপুরা গিয়েছিল। ওদের বিয়ে যেহেতু শুধু রেজিস্ট্রি করে হোয়েছিল, কোনো অনুষ্ঠান হয়নি, তাই কোনো আত্বিয় স্বজনও আসে নি। সৌভাগ্যের বাবা, রইলো ঝোলা চললো ভোলা টাইপের। ছোটবেলায় কতবার যে বাবাকে বাড়ি ছেড়ে চলে যেতে দেখেছে তার হিসাব নেই। আবার দিন দশ পরে নিজেই ফিরে এসেছে। কিন্তু মা একা হাতে এই তিন ছেলেকে মানুষ করে তুলেছে। সৌভাগ্য বরাবরই একটু রগচটা টাইপের, তাই সম্পত্তি নিয়ে কাকার ছেলেদের সাথে প্রায় ই মারপিট করে ঘরে আসতো। মায়ের বারণ শুনত না। শেষমেষ এক মামার সুবাদে কলকাতায় চাকরি পায়। কিন্তু প্রাইভেট ফার্মের চাকরি করতে করতেই ও পাওয়ার গ্রিড এ চান্স পায়। বিয়েটা হয় তার প্রায় চার বছর পর ।

"দাদা আপনাকে ভেতরে ডাকছেন"

চেম্বারের রিসেপশনিস্ট মহিলাটি দরজা অবধি এগিয়ে সৌভাগ্য কে ডাকলো।

"হ্যা যাচ্ছি"

সেদিন ডাক্তারবাবু কিছু টেস্ট করিয়ে পরের সপ্তাহে সৌভাগ্য কে আসতে বললেন। এটাও জানিয়ে দিলেন যে পরেরদিন নেহাকে আনার প্রয়োজন নেই।

সারাটা রাস্তা নেহা একটাও কথা বললো না। সৌভাগ্যও কিছু জিজ্ঞেস করলো না। কম কথার মানুষের সাথে থাকতে থাকতে এখন সৌভাগ্যও সেরকম হয়ে গেছে।


নেহার রিপোর্ট নিয়ে সেদিন ড. পালের চেম্বারে পৌঁছুতে একটু দেরীই হয়ে গেলো সৌভাগ্যের। তবে খুব বেশিক্ষণ অপেক্ষা করতে হলো না।

রিপোর্ট দেখে ড. পাল কিছু ওষুধের নাম লিখে বুঝিয়ে দেন কখন বা কতটা ডোজ এ খাওয়াতে হবে। সৌভাগ্য এবার সরাসরি প্রশ্ন করে

"ডক্টর এটা কি কোনো মানসিক অসুখ?"

"হ্যা এটা মানসিক অসুখ, আর অনেক আগে থেকেই এই অসুখ আপনার মিসেস এর মধ্যে বাসা বেঁধে আছে, মানে বলা যায় ছোটো থেকেই"

"এটা কি সারবে কোনো দিন, আমার তো একটা বাচ্চাও আছে"

সৌভাগ্যের গলা বুজে আসে।

ড.পাল নিজের চিয়ার থেকে উঠে সৌভাগ্যের কাছে এসে ওর কাঁধে হাত রেখে বলে

"এত চিন্তার কিছু নেই, ওষুধে অনেকটা কাজ করবে, তবে আমার সাথে যোগাযোগ টা রাখবেন, কারণ এইসব পেশেন্ট এর রিয়্যাকশন খুব চেঞ্জ হয়। "

"যদি ওষুধে কাজ না হয়, তাহলে নেক্সট কি, এটা জানতে পারি কি?"

এবার ড. পাল নিজের সিট এ গিয়ে বসে

"দেখুন ওষুধে কাজ না হলে, একটাই পথ আছে এই রোগ সারিয়ে তোলার"

সৌভাগ্য উদগ্রীব হয় জানার জন্য

"সেটা কি?"

"খুব বড়ো একটা মানসিক ধাক্কা, মানে ওনার জীবনের অনেক বড়ো ক্ষতি হয়ত ওনার সুস্থতার কারণ হয়ে যেতে পারে।"

সৌভাগ্য ওষুধ নিয়ে বাড়ি ফিরলো বটে কিন্তু ডাক্তারবাবুর শেষ কথাটা ওর মনে ঘুরপাক খেতে লাগলো।


নেহা এখন অনেকটাই সুস্থ। ড. পালের কাছে তিন মাস অন্তর দেখাতে যায়। সৌভাগ্য আনন্দকে বারবার ধন্যবাদ জানায় কারণ ওর জন্যই নেহাকে ও সুস্থ করে তুলতে পারলো। আনন্দ আর রুমা এখন প্রায়ই ওদের বাড়ি আসে। আসলে নেহাকে কথা বলানো খুব দরকার এটা ডাক্তারবাবু বলে দিয়েছিলেন। নেহা ও এখন বেশ স্বাভাবিক ভাবে আনন্দ আর রুমার সাথে গল্প করে। মাঝে আনন্দের উদ্যোগে ওরা একবার দীঘায় ছোট একটা ট্যুরও করে এলো। সবই মোটামুটি স্বাভাবিক ভাবেই চলছিল।


কিন্তু সৌভাগ্যে টেরই পায়নি ওর জন্য এত বড়ো দুর্ভাগ্য অপেক্ষা করছিল। সৌভাগ্য দের অফিস পার্টিতে নেহা আবার আগের মতো চুরি করে ফেলল আর এটা নজরে পড়ল এক অফিসার এবং তার মিসেসের চোখে। চরম অপমানিত হল সৌভাগ্য। এটা আর কিছুতেই মেনে নিতে পারল না। সেদিন পার্টি থেকে নেহা আর পিকুকে না নিয়ে ও বাড়ি চলে এলো। পড়ে আনন্দ যখন ব্যাপারটা বুঝতে পারলো তখন নেহা আর পিকু কে নিয়ে গাড়ি করে সৌভাগ্যের বাড়িতে এলো। কলিং বেল দিতে হলো না কারণ দরজাটা আধ ভেজানো ছিল। নেহাদের শোবার ঘর ছিল দুতলায়। বাড়িতে ঢুকেই নেহা ছুটে সিঁড়ি দিয়ে ওপরে উঠে গেল। আনন্দ আর রুমা সিড়িতে উঠতে উঠতে শুনলো নেহার চিৎকার

"এটা তুমি কি করলে"

আনন্দ ওপরে উঠে দেখে সিলিং ফ্যান থেকে ঝুলছে সৌভাগ্যের দেহটা। নিচের খাটে একটা চিঠি লেখা। সৌভাগ্যের দেহে যে আর প্রাণ নেই সেটা আনন্দ দেখেই বুঝিয়েছিল তাই পুলিশেকে ফোন করে ও অপেক্ষা করতে লাগলো। নেহা বার বার জ্ঞান হারাচ্ছি লো। বাড়ির কাজের মাসি বাণী পিকুকে কোলে করে নিয়ে পাশের বাড়িতে রেখে এলো। পুলিশ এসে যাবতীয় কাজ সারার পর আনন্দ সৌভাগ্যের লেখা চিঠিটা হাতে পেল

"নেহা তোমাকে আর পিকু কে আমি খুব খুব ভালোবাসি। কিন্তু তোমার এই চুরি আমি কিছুতেই মেনে নিতে পারি না। ডাক্তার দেখিয়ে কোন লাভ হয়নি তা আজ ভালো করে বুঝতে পারলাম। ডাক্তার বাবুর মতে আর একটাই পথ ছিল তোমার অসুখ ভালো করার সেটাই আমি আজ করলাম। তুমি কষ্ট পেওনা আর ভালো করে আমার পিকুকে বড় করো। সৌভাগ্য।"


এটা যেন একটি প্রাণের জন্য আর একটি প্রাণ বলি দেওয়া। নেহা কে সুস্থ করার আর কোন পথ সৌভাগ্য দেখতে পায়নি। তাই নিজেকে শেষ করে নেহা কে মানসিক আঘাত দিতে চেয়েছে কারণ তাতে নেহা হয়তো সুস্থ হলেও হতে পারে। নেহা সুস্থ হয়ে ছিল কিন্তু নিজেকে কোনদিন ক্ষমা করতে পারেনি।


Rate this content
Log in