প্রথম গোলাপ
প্রথম গোলাপ
এতক্ষণে বৃষ্টিটা একটু ধরেছে, সমরজিৎ দোকানদারের পয়সা মিটিয়ে দিয়ে বাড়ির উদ্দেশ্যে রওনা হল। চায়ের দোকান থেকে মিনিটখানেক হেটে গেলে যে ফ্ল্যাটটা সেটাই সমরজিতের । সমরজিৎ ফ্ল্যাটের তিনতলায় থাকে। সমরজিতের জানলা থেকে ওই লেডিস হোস্টেলের মূল ফটোটা দেখা যায়। সমরজিত ঘরে ঢুকে সোফার ওপর বসে পড়ে, সে মনে মনে ভাবতে থাকে এতগুলো বছর পর সে যে মেয়েটাকে দেখলো সে কি সত্যিই রচনা নাকি তার চোখের ভুল। এবার সমরজিৎ ভাবতে লাগলো , রচনার তো বিয়ে হয়ে গেছিল তাহলে সে লেডিস হোস্টেলে কি করছে ? তাহলে কি লেডিস হোস্টেলে কোন চাকরি নিয়েছে সে ? না না তা কি করে সম্ভব সমরজিত শুনে ছিল তার হবু হাজবেন্ডের অগাধ পয়সা । যার হাজবেন্ডের এত পয়সা যে এই রকম ছোটখাটো কাজ না না এটা সম্ভব নয়। তাহলে কি তার চোখের এতটাই ভুল হলো জে সে তার রচনা কে চিনতে পারল না ? আবার সমরজিৎ ভাবে নানা এতটা ভুল আমার হওয়ার নয়। কারণ রচনার চলাফেরা তার সাজ পোশাকের পুঙ্খানুপুঙ্খ জানে সে । সমরজিত আর সোপায় বসে থাকতে পারেনা, পকেট থেকে একটা সিগারেট বের করে সেটাকে ধরিয়ে গিয়ে দাঁড়ায় জানলার সামনে। জানালা দিয়ে তার চোখটা গিয়ে পৌঁছায় ওই লেডিস হোস্টেলের সামনে । গেটের ভেতরে শুধুমাত্র ওয়াচ ম্যান কেই দেখা গেল। রাত নটার পরে লেডিজ হোস্টেলে কারো ঢোকা বা বেরোনো নিষিদ্ধ। সমরজিৎ সিগারেট টানডে টানতে সাত পাঁচ ভাবছিল, এমন সময় তার হ্যান্ডসেট টা বেজে ওঠে , জানালা থেকে আবার সোফায় ফিরে যায় সমরজিৎ ফোনটা হাতে নিয়ে সেটাকে রিসিভ করে । ফোনের অপরপ্রান্তে কোন একটি পত্রিকার সম্পাদকের গলা শোনা যায়। এখন থেকেই পত্রিকা গুলোএখন থেকেই পত্রিকাগুলো পূজা সংখ্যার লেখার জন্য লেখকদের বুকিং করে চলেছে । অপর প্রান্ত থেকে ভদ্রলোক সমজিৎকে বলেন , সমরজিৎ বাবু এ বছরের পূজার সংখ্যায় আমাদের পত্রিকার জন্য আপনার একটিলেখা চাই। সমরজিৎ বলে লেখা আমি দিতে পারি কিন্তু কোন নিয়ম-শৃঙ্খলার মধ্যে আমি বন্দি থাকতে পারবো না, আপনাদের যদি নির্দিষ্ট কোন ট্রাফিক থাকে তাহলে আমায় ক্ষমা করবেন । ভদ্রলোক একটু হেসে বলেন একটা টপিক তো আছেই মশাই, তবে আপনি যেহেতু প্রেমের গল্প লেখেন টপিকটা আপনার খুব একটা মন্দ লাগবে না। সমরজিৎ জিজ্ঞাসা করে আচ্ছা ঠিক আছে বলুন শুনে দেখি। ভদ্রলোক জানান আমরা গল্পের শিরোনাম রাখতে চাই প্রথম গোলাপ। গল্পের নাম শুনে সমরজিতের শরীরের মধ্যে একটা তড়িৎ প্রভাব বয়ে যায়। কোন উত্তর দিতে পারে না সে, আবার অপরপ্রান্ত থেকে প্রশ্ন ভেসে আসে সমরজিৎ বাবু আপনি শুনতে পেয়েছেন ? সমরজিৎ তার স্তব্ধতা কাটিয়ে বলে হ্যাঁ হ্যাঁ শুনেছি । অপরপ্রান্ত থেকে ভদ্রলোক জিজ্ঞাসা করেন আপনি কি লেখা দিতে পারবেন ? সমরজিৎ জানায় আমাকে কি দুটো দিন সময় দেয়া যেতে পারে ? ভদ্রলোক বলেন অবশ্যই আপনি ভাবনা চিন্তা করে জানাবেন , এটা আমার ফোন নাম্বার আপনি এই নাম্বারে ফোন করলে আমাকে পেয়ে যাবেন । সমরজিৎ তাকে ধন্যবাদ জানিয়ে ফোনটা কেটে দেয় । ফোনটা টেবিলের উপরে রেখে সমরজিৎ পাশের লাইব্রেরি রুমে চলে যায়। দুই কামরার ফ্ল্যাট একটা ডাইনিং , একটা রুমে সমজিৎ থাকে আর একটা রুম কে সে লাইব্রেরীতে কনভার্ট করেছে।সেখানে বহু নামি দামি সাহিত্যিকের বই রয়েছে সমরজিতের লেখা কিছু বইয়ের হার্ডকফি , আর কিছু পুরনো ডায়েরী । সমজিৎ বসু সেই লাইব্রেরি রুমে ঢুকে একের পর এক ডায়েরি গুলোকে বের করতে থাকে। বেশ কয়েকটা ডাইরি বের করার পর তার হাতে একটা লাল রঙের ডায়েরি এসে পড়ে । ডায়েরিটা খুলতেই তার মাঝখান থেকে বেরিয়ে আসে একটা শুকনো গোলাপ ফুল , বড্ড সন্দর্পনে সেটাকে রেখেছিল সমরজিৎ । হয়তো কাজের চাপে সেটার কথা ভুলে গেছিল সে , আজ ফোনে ওই ভদ্রলোকের কথা শুনে আবার সেই গোলাপটার কথা মনে পড়ে গেল তার। এটা রচনার তাকে দেওয়া প্রথম গোলাপ । আজ গোলাপটা রং বিবর্ণ হয়ে গেলেও সমরজিতের কাছে ওটা খুব মূল্যবান । ডাইরি শুদ্ধ গোলাপটাকে নিয়ে সে চলে আসলো তার বসার ঘরে । কোথায় বসে এক দৃষ্টিতে ঐ গোলাপটার দিকে তাকিয়ে থাকে সে । ওই গোলাপটার সাথে সমরজিতের জীবনের কত স্মৃতি জড়িয়ে আছে । সমরজিৎ মনে মনে ঠিক করে ফেলে ওই সম্পাদকের নির্ধারিত টাইটেলের উপর সে গল্প লিখবে , গল্প বললে ভুল হবে এবার সে যেটা লিখবে সেটা তার জীবনের এক চরম বাস্তব……….।
চলতে থাকবে………

