Sukdeb Chattopadhyay

Fantasy Inspirational


5.0  

Sukdeb Chattopadhyay

Fantasy Inspirational


ও পারেতে যত সুখ

ও পারেতে যত সুখ

18 mins 835 18 mins 835

--কই গো দাও, অফিসে দেরী হয়ে যাবে যে।

-- যাচ্ছি যাচ্ছি, অত তাড়া দিও না তো।

টেবিলে খাবার বেড়ে বিজয়া একটু গলা নামিয়ে গজরাল—তুমি তো তাড়া দিয়েই খালাস। একার হাতে সব দিক সামলাতে হলে অমন ঘড়ি ধরে সব কিছু করা যায় না।

-- এ-- বাড়ির কোন খবরই তো রাখ না। ছোট বাপের বাড়ি, তার মধ্যে রান্নার মাসি দুদিন ছুটি নিয়েছে। তোমাকে বিদেয় করতে না করতেই বৌমা, তাপস, তার একটু পরেই বাবু, সব এক এক করে হাজির হবে। কেউ জলখাবার খাবে, কেউ ভাত খাবে, এক এক জনের এক এক রকম। আর পেরে উঠছি না। কদিন বাদে রিটায়ারমেন্ট, তাল তাল ছুটি পচিয়ে নষ্ট না করে মাঝেমধ্যে নিতে পারো তো। এখোনো অফিসে যাওয়ার তোমার কিসের এত আঠা বুঝি না।

তাপসের বৌ মালা এইসময় বড়জাকে হাতে হাতে অনেক সাহায্য করে, সে নেই। সত্যিই বিজয়ার আজ বড় চাপ। পুরো বিরক্তি আর রাগটা মানসের ওপরে উগরল। মানস এতে অভ্যস্ত, চরমে না উঠলে উপভোগ করে। প্রায় পঁয়ত্রিশ বছরের সঙ্গী তো।

খেতে বসে একটু চুলকোবার জন্যে মানস বলল—তুমি শুধু আমাকেই দেখলে। অনুপম, অমর, বিকাশরাও তো আমারই আশেপাশে রিটায়ার করবে, কই ওরা তো ছুটি নিয়ে বাড়িতে বসে নেই।

--ওরা সব ঝাড়া হাত পা। আমার মত এতগুলোকে নিয়ে চলতে হয় না। শিখা, রীতারা কপাল করে এসেছে, সুখের সংসার।

 

অমর চাটুজ্জ্যে, বিকাশ ঘোষ, অনুপম বসাক, এরা সব আশেপাশেই থাকে। মানসের পাড়ার বন্ধু বান্ধব। মানসের ছেলে বাবুর অফিসের বন্ধু সঞ্জয়ও এ পাড়ায় ভাড়া থাকে। সঞ্জয়ের বৌ মিলি খুব মিশুকে। অল্প সময়েই সকলের সাথে ভাব জমিয়ে নিয়েছে। এই বাড়িগুলোর মধ্যে একটা পারিবারিক সখ্যতা আছে। বৌএরা ফাঁক পেলে একসাথে বসে গল্পগুজব করে। বৌএরা বলতে বিজয়া আর ওর জা মালা, অমরের বৌ শিখা, বিকাশের বৌ রীতা আর কখনো সখনো মিলি। রান্নাবান্না, মেয়ে রিঙ্কুকে স্কুলে দিয়ে আসা নিয়ে আসা, একার সংসারে সবদিক সামলে মিলি বিশেষ সময় পায় না। তা ছাড়া মায়ের বয়সী মহিলাদের সাথে বসে আড্ডা দিতে ওর একটু অস্বস্তিও হয়। বুঝতে পারে ওর জন্য ওনাদের স্বাভাবিক আলোচনা মাঝে মাঝেই সেন্সর করতে হয়। বিজয়ার বৌমা অলি চাকরি করে তাই এমনি দিনে আসার প্রশ্ন নেই। ছুটি ছাটায় কদিচ কখনো আসে। 

অনুপম বিয়ে থা করেনি, একার সংসার।

খাওয়া দাওয়ার পাট চুকিয়ে সেদিন দুপুর বেলা বিজয়া গেল শিখাদের বাড়িতে । যাওয়াটা অবশ্য নিছক আড্ডা মারতে নয়, অসুস্থ শিখাকে দেখতে। বাড়িতে শিখা একাই ছিল। আগের থেকে একটু সামলেছে। খক খক করে কাশলেও জ্বরটা আর নেই।

-- কিগো, অমর দা কি অফিসে গেছে?

-- বাবা, বৌ এর শরীর খারাপের জন্যে দুদিন অফিস কামাই করেছে এই না কত।

-- তবু তো অফিস কামাই করে বৌএর সেবা করেছে। আমার বাড়িতে তো ইদানীং এমন ঘটনা মনে করতে পারছি না।

-- বাজে কথা বোলো না। তোমার গলব্লাডারস্টোন অপারেশনের সময় মানস দা কতদিন অফিস কামাই করে তোমার পাশে ছিল বল তো!

-- সে আমি যদি মরে যাই সেই ভয়ে। চলে গেলে বিনা পয়সায় এমন হোল টাইমার পাবে কোথায়?

-- ও তাই! অমন ভাল মানুষটাকে নিয়ে কি কথা। তোমার ভাই সুখের সংসার। তুমি যেমন সকলের জন্য কর তেমনি তোমার কিছু হলে বাড়ির সবাইকে পাশে পাও। এ ভাগ্য কজনের হয়? আমার তো থেকেও নেই। ছেলে, বৌমা, নাতি, তোমার মত আমারও সবই আছে, কিন্তু তাদের কোনদিন কাছে পেলাম না। বছরে একবার আসে, ওইটুকুই যা চোখের দেখা দেখতে পাই। জানি না ধীরে ধীরে এ আসাটুকুও হয়ত বন্ধ হয়ে যাবে। অমর আর আমি একে অপরের ভরসা। দুজনের মধ্যে যে আগে যাবে সে বেঁচে গেল, যে রইল তার দুর্গতির কথা ভাবলে শিউরে উঠি।

-- না না, ওভাবে বলছ কেন? অজয় তেমন ছেলে মোটেই নয়। চাকরির জন্যে বাইরে গেছে। বাইরে থাকলেও খবরাখবর ত নিয়মিত নেয়। তোমরাও তো মাঝে মাঝে ওদের ওখানে গিয়ে কিছুদিন থেকে আসতে পার। বেড়ানও হবে আর আঁতের মানুষগুলোকে কাছে পেলে মনটাও ভাল থাকবে।

-- বার দুয়েক গিয়েছি ভাই। কিন্তু এ তো আর বাড়ির পাশে নয় যে ইচ্ছে করল আর ঘুরে এলাম। যাতায়াতের খরচ আছে। আর সবথেকে বড় কথা বেশিদিন ভাল লাগে না। চেনা পরিবেশ পরিস্থিতি, নিজের ঘর সংসার, স্বাধীনতা ছেড়ে কিছুদিন বাদেই মনটা হাঁপিয়ে ওঠে। ওটা ছেলের সংসার। কেবলই মনে হয় হয়ত আমাদের জন্য ওদের স্বাভাবিক জীবনযাত্রায় ব্যাঘাত ঘটছে। কতবার ওকে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেশে ফিরে আসার কথা বলেছি। এখানে ওদের অফিসও আছে। কিন্তু ফেরার ব্যাপারে কোন রা কাড়ে না।

 

চাকরির মেয়াদ ফুরিয়ে আসছে। বিকাশ অফিসের পয়সায় শেষ বারের মত ঘুরতে গিয়েছিল নৈনিতালের দিকে। সকালে ফিরেছে। বর্ষাকাল, এতদিন বন্ধ থাকার ফলে ঘরগুলো থেকে সোঁদা গন্ধ বেরোচ্ছে। রীতা বাড়ি ঢুকে একটু ফ্রেশ হয়েই ঘরদোর পরিষ্কার করতে লেগে পড়েছে। বিছানার চাদর পাল্টাতে পাল্টাতে বিকাশকে বলল—বিয়ের পর পর প্রথম দিকে যখন বেড়াতে যেতাম কি আনন্দটাই না হত। ঘুরছি যখন তখন ঘোরার আনন্দ আর ফিরছি যখন তখন বাড়ি ফেরার আনন্দ। ফিরে দু একটা দিন শুধু বিশ্রাম আর জনে জনে কি কি দেখলাম, কেমন দেখলাম, সব বলা। বাবাকে তো আলাদা ভাবে সব বলতে হবে, না হলে অভিমান হত।

চায়ে চুমুক দিয়ে বিকাশ বলল—তখন আমাদের কত বড় পরিবার আর কি মিলমিশ। নিজের আর জাঠতুতো খুড়তুতো ভাই বোনেদের মধ্যে কোন তফাৎ বোঝা যেত না। বাবা আর মেজকাকা  মারা যাওয়ার পর থেকেই ধীরে ধীরে তাল কাটতে শুরু হল। অমন সুন্দর পরিবার ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে গেল।

-- নিজেরা আলাদা হবি হ বসত বাড়িটা পর্যন্ত আস্ত রাখল না।

-- সেটাই সবথেকে দুঃখের রীতা। কোন স্মৃতিই রইল না। একবার বাড়িটা কেনার কথা ভেবেছিলাম, কিন্তু তখন অত টাকা পাব কোথায়? যৌথ পরিবারের সুখ সাচ্ছন্দ ছেড়ে কিসের আকর্ষণে যে লোকে আলাদা একা থাকে বুঝি না।

-- বৃদ্ধ বয়সে একাকীত্ব অভিশাপ। আমাদের অবস্থাটা ভাব, যতদিন হাত পা চলছে চলছে, বসে গেলে মুখে একটু জল দেওয়ারও কেউ নেই। মানসদা দের ভরা সংসারটা দেখলে বড় ভাল লাগে।

-- রীতা, আমি বুঝি সন্তানের অভাব এখনো তোমাকে কষ্ট দেয়। আমারও যে হয় না তা নয়। পাঁচজনের মাঝে সারাদিন কাটে তো তাই হয়ত তুলনায় কম। তবে পৃথিবীর রং রূপ দু চোখ ভরে দেখার পর দৃষ্টিশক্তি হারানর থেকে জন্মান্ধ হওয়া ভাল। একেবারে না থাকার কষ্টর থেকে পেয়ে হারানর যন্ত্রণা অনেক বেশি। অমর আর শিখারা জানে পেয়ে হারানর যন্ত্রণা কি ভীষণ।

-- শিখার ছেলে বাইরে থাকে বলে মা বাবার অসময়ে দেখবে না এমনটা তুমি ভাবছ কেন? ছেলেটাতো খারাপ নয়।

-- ভাবনাটা আমার নয়, ওর মা বাবার। থাকেই না তো দেখবে কি? ভাল খারাপটা খুব আপেক্ষিক ব্যাপার।

 

অফিসে পরপর তিনদিন ছুটি। ছেলে মেয়েদের পরীক্ষা হয়ে গেছে। সঞ্জয় আর বাবু একটা বড় গাড়ি ভাড়া করে সপরিবারে বেরিয়ে পড়েছে। গন্তব্য হেনরি আইল্যান্ড। সঞ্জয়ই সব ব্যবস্থা করেছে। হাতানিয়া দোয়ানিয়া নদী গাড়ি সমেত বার্জে পার হতে হয়। দুপুরবেলা বেশ খানিকক্ষণ পারাপার বন্ধ থাকে। তার আগে না পৌঁছোতে পারলে অনেকক্ষণ অপেক্ষা করতে হবে। তাই ওরা ভোর ভোর বেরিয়ে পড়েছে। রিঙ্কু আর বাবুর ছেলে বুলু প্রায় সমবয়সী। ওরা খেলায় মত্ত। গাড়ির একেবারে পিছনের সিটে সঞ্জয় বাচ্চা দুটোকে নিয়ে বসেছে। বাবু বসেছে ড্রাইভারের পাশে একেবারে সামনের সিটে। আটটা বাজে। অলি আর মিলি দুজনে জলখাবার পরিবেশন করছে।

-- আহা রে।

পিছনে সঞ্জয়ের দিকে তাকিয়ে মিলি জিজ্ঞেস করল—কি হল?

লুচির সাথে এমন কশা কশা আলুর দম, একেবারে রাজযোটক গো-– তৃপ্তিতে সঞ্জয়ের চোখ প্রায় বোজা।

অনেকদিন বাদে বেরন হল- -ড্রাইভারের দিকে খাবার এগিয়ে দিতে দিতে মিলি বলল।

তোমরা তো ভাই স্বাধীন, চাইলেই বেরতে পার। আমাদের তো সে উপায় নেই। অফিসের ছুটির মত আগে থেকে অনুমোদন করাতে হবে। অফিস ছাড়া অন্য কোথাও বেরলেই ‘কোথায় যাচ্ছি, কেন যাচ্ছি, কখন ফিরব’ হাজারটা কৈফিয়ত দিতে হবে। -- অলির অমন ফর্সা সুন্দর মুখটা তখন দেখলে মনে হবে যেন কোষ্ঠকাঠিন্যের বিজ্ঞাপন।

বাবু মৃদু স্বরে বলল—ঐ মাই একটু যা জিজ্ঞেস করে। তাও বাধা তো কখনো দেয়নি।

--দেয়নি আবার। সেবার কলেজের কিছু বন্ধু মিলে একটা গেট টুগেদার এর ব্যবস্থা করা হল। আমাকে কিছুতেই যেতে দিল না।

--এটা ভুলে যাচ্ছ কেন যে তার দুদিন আগেই তুমি জ্বর থেকে উঠেছ। দুর্বল শরীর বলেই মা মানা করেছিল।

-- অলি তোমরা ভাগ্য করে এসেছ তাই এতগুলো আপনজনের সান্নিধ্য পাচ্ছ। ‘কোথায় যাচ্ছ?’, ‘কখন ফিরবে?’ এই প্রশ্নগুলো সেই মানুষই করে যে তোমাকে নিয়ে ভাবে, তোমার মঙ্গল চায়।

-- একা ঝাড়া হাত পা আছ তো তাই এগুলো সহজে বলতে পারছ মিলি। আমার জায়গায় থাকলে বুঝতে।

আর একটা হবে? বেশি না একটা।– সঞ্জয় খাবারের প্লেটটা সামনের দিকে এগিয়ে দেয়।

কি, লুচি না মিস্টি? –অলি জিজ্ঞেস করে।

--লুচি, লুচি।

একটার জায়গায় দুটো লুচি আর পরিমাণ মত তরকারি পেয়ে অলিকে ধন্যবাদ দিয়ে সঞ্জয় খাওয়ায় মন দিল।

-- ধন্যবাদ আমাকে নয় আপনার বৌকে দিন। ও বেচারিই তো কষ্ট করে এগুলো বানিয়ে এনেছে।

খাওয়া শেষে ফ্লাস্ক থেকে চা ঢেলে সকলকে দিয়ে সঞ্জয় নিজেও সশব্দে তৃপ্তির চুমুক দিয়ে বলল—আমাদের একা থাকতে একদম ভাল লাগে না। আমার তো তবু অফিসে সারাদিন কেটে যায়, রিঙ্কুরও স্কুলে বন্ধু বান্ধবের সাথে কাটে, বোর হয় মিলি। বিয়ের আগে বাপের বাড়ি আর বিয়ের পর আমাদের বাড়ি দু জায়গাতেই যৌথ পরিবারে অনেক লোকজনের মাঝে কাটিয়েছে তো, ওইজন্যে একা থাকার কষ্টটা ওর আরো বেশি। কি করব, উপায় নেই। এতদূরে বাড়ি। মা বাবারও বাড়ি ঘর, আপ্তজন কে ছেড়ে পাকাপাকি ভাবে এখানে এসে থাকা সম্ভব নয়।

সঞ্জয়ের কথার খেই ধরে মিলি মেলে ধরল ঘর ছাড়ার কাহিনী।

-- একা থাকতে আমরা কেউই চাইনি। আমার শ্বশুরবাড়ি, সেই বগুলা থেকে কোলকাতায় অফিস করা বেশ কষ্টকর। বিয়ের আগে সঞ্জয় বৌবাজারে একটা মেসে থাকত। বিয়ের পর বাড়ি থেকে যাতায়াত করতে শুরু করল। আমার অফিস ছিল কল্যাণীতে। অনভ্যস্ত ট্রেন জার্নিতে কষ্ট হলেও ধীরে ধীরে মানিয়ে নিচ্ছিলাম। আমার অফিসের দূরত্ব সঞ্জয়ের তুলনায় অনেক কম ছিল। সঞ্জয়ের দূরত্বও অনেক বেশি আর জানই তো ওদের অফিসের সময়ের কোন ঠিক নেই। প্রায়ই ফিরতে ফিরতে অনেক রাত হয়ে যেত, আবার ভোর না হতেই অফিস যাওয়ার প্রস্তুতি। বিয়ের পর এইভাবেই বছর তিনেক কাটল। এর মধ্যে রিঙ্কু হল। মেটারনিটি লিভ ফুরোতে বাড়ির লোকের কাছে ওইটুকুনি ছানাকে নিশ্চিন্তে রেখে অফিসে জয়েন করলাম। চলছিল একরকম। কিন্তু অফিসের খাটুনি, যাতায়াতের ধকল, এগুলো সঞ্জয় আর নিতে পারছেনা বুঝতে পেরে বাবা মাই জোর করলেন কোলকাতায় বাসা নেওয়ার জন্য। অগত্যা আপনার জনের নিশিন্ত আশ্রয় ছেড়ে শহরবাসী হতে হল। পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে স্বাধীন সংসারে এসে আমি হারালাম আমার চাকরি করার স্বাধীনতা। এতদিনের সাধের চাকরিটা ছেড়ে দিতে হল। কারণ রিঙ্কুকে নিরুদ্বেগে রেখে যাওয়ার মত দাদু ঠাকুমার নিরাপদ কোলটা ত এখানে নেই।

আবহাওয়া কে ফুরফুরে করার জন্য সঞ্জয় আর বাবু প্রসঙ্গ পালটে হেনরি আইল্যান্ড থেকে বকখালি, ফ্রেজারগঞ্জ, কোথায় কোথায় যাওয়া হবে তার আলোচনা শুরু করল।

অলি চুপ করে বাইরের দিকে তাকিয়ে ভাবছে, প্রতিদিন বাড়ির গরম ভাত খেয়ে, বুলুকে নিশ্চিন্তে বাড়িতে রেখে, সংসারের দৈনন্দিন সমস্যার আঁচ গায়ে এতটুকু না লাগিয়ে, মুক্তমনে চাকরি করতে যায়। এটা ওর কাছে ছিল স্বাভাবিক ঘটনা। কিন্তু এখন উপলব্ধি করছে পরিবারের বাঁধনটা আলগা হয়ে গেলে এমনটা তো নাও থাকতে পারে। তখন...

 

মানস, অমর, বিকাশ, অনুপম, সব একে একে রিটায়ার করল। রিটায়ার করার পরে এখন সময় কাটানটাই সমস্যা। কাগজ পড়ে, বাজার করে সকাল বেলাটা মানসের একরকম কেটে যায়। সমস্যা হয় তারপর, সময় আর কাটতে চায় না। অকারণে এদিক ওদিক ঘোরে, এটা ওটা টানাটানি করে, মাঝে মাঝে রান্নাঘরে উঁকি মারে। কিন্তু নিজের বাড়িতে নিজের মত ঘোরার উপায় নেই। তির্যক মন্তব্য ভেসে আসবে “বুড়ো বয়সে সারাদিন আমার পেছনে ঘুর ঘুর না করে বাড়ির বাইরে একটু ঘোরাঘুরি করতে পার তো”। কে বোঝাবে যে দুপুরে এই রোদ্দুরে পাগল ছাড়া অকারণে রাস্তায় কেউ ঘোরাঘুরি করে না। মানস রসিক লোক, পাল্টা আদিরসাত্মক টিপ্পুনি কাটে। কিন্তু দুপুরবেলা অফিসের সময়টা কারোরই কাটতে চায় না। অনুপমের ব্যাপারটা অনেকটাই আলাদা। হাই স্কুলের বাংলার শিক্ষক ছিল। বাড়িতে প্রচুর বইপত্র আছে। পড়াশোনা আর লেখালিখির মধ্যে দিয়ে সময় ভালভাবেই কেটে যায়। কিন্তু বন্ধুদের দুর্গতি দেখে অনুপমই প্রস্তাব দিল ওর বাড়িতে আড্ডা দেওয়ার। তারপর থেকে মোটামুটি নিয়মিত অনুপমের বাড়িতে অনেকটা সময় ওরা তাস খেলে আর আড্ডা মেরে কাটায়। এ ছাড়া একটা বাড়তি আকর্ষণও আছে। সুযোগ সুবিধে মত জলযোগের আসরও বসে।

অনুপমের নিজের আত্মীয় স্বজন তেমন কেউ নেই। থাকলেও কোন যোগাযোগ নেই। ওই রাখে না। আড্ডায় নিজেই গল্প করতে করতে বলেছে—মাঝে মাঝে এক আধ জন আত্মীয়তার দোহাই দিয়ে গ্রাম থেকে আসত।  কিন্তু অচিরেই বুঝলাম যে আমার টানে নয় ব্যাটারা আসত আমার টাকার লোভে। কয়েকটাকে খেঁদানর পর থেকে আর কেউ আসে না। আমার মত বুড়ো কুমারদের টাকাই হল বউ। ওটি হাতাতে দিচ্ছি না।

অবশ্য অনুপম একেবারে একা থাকে না। ওর সাথে অনুকূল থাকে। গ্রামের থেকে সেই কোন ছোটবেলায় বাবার হাত ধরে এসেছিল, আর ফিরে যায়নি। কাজের লোক হলেও এতদিন একসাথে থাকতে থাকতে প্রায় সমবয়সী অনুকূলের সাথে অনুপমের সম্পর্কটা বন্ধুর মত। একে অপরের অবলম্বন, কারন দুজনেরই এখন আপন বলতে আর কেউ নেই। তবে সমস্যা হল অনুকূলের মাথাটা একেবারেই জমা।

বৃদ্ধদের আড্ডায় যা হয়, তাস খেলা আর গল্প গুজবের মাঝে অসুখ বিসুখ আর পারিবারিক সমস্যা খানিকটা জায়গা করে নেয়।

একদিন আড্ডার মাঝে মানস বলল—আমাদের নানা জনের নানা সমস্যা অথচ অনুপমকে দেখ। কেমন দিব্য রয়েছে। ওকে কোনোদিন কোন সমস্যার কথা বলতে শুনেছ?

ওর সমস্যা থাকবে কেন? ওতো সমস্যার উৎসটাই কখনো নেড়েচেড়ে দেখল না। -- মস্করা করে অমর বলল।

যাকে নিয়ে আলোচনা সে এবার আলোচনায় যোগ দিল—তার মানে তোরা বলতে চাস যে বউদের জন্যই তোদের যত সমস্যা।

বিকাশ বলে—সরাসরি ওভাবে তাক করিস না। কানে গেলে বিপদ আছে।

বউগুলোর কাছে সমস্যার কারণ জিজ্ঞেস করলে ওরাও এই ষণ্ড স্বামীগুলোর দিকেই আঙুল দেখাবে। --হাসতে হাসতে অনুপম বলতে থাকে-- শারীরিক অসুস্থতা ছাড়া বাকি সমস্যাগুলো অধিকাংশই তৈরি হয় আশা আর প্রত্যাশা থেকে। যত বেশি সম্পর্কের বাঁধনে মানুষ জড়ায় তত বাড়তে থাকে তার সমস্যা। বিয়ের সময় ছেলে মেয়েদের পরস্পরকে নিয়ে অনেক আশা,আকাঙ্খা, কল্পনা থাকে। চেতনা, বিবেচনা, বিছানা, কোন এক জায়গায় ছন্দপতন হলেই সমস্যা। এরপর ছেলেপুলে। না হলে সমস্যা, হলে মনের মত করে মানুষ করার সমস্যা। এরপর সে বড় হবে, তার বিয়ে হবে, সন্তান হবে। এই প্রতিটা ধাপেই আমাদের মনে নিজের অজান্তেই কিছু আশা বাসা বাঁধে। বাস্তবে তার প্রতিফলন দেখতে না পেলেই মন অস্থির হয়ে ওঠে।

সেই জন্যেই তো বলছিলাম যে তুই এগুলো থেকে মুক্ত কারণ সমস্যার উৎসই তো খুললি না। -- অমর তার আগের কথারই পুনরাবৃত্তি করে।

-- সমস্যা সব ব্যাটার আছে, কারো কম আর কারো একটু বেশি। আমি তো একা মানুষ, বয়স হয়েছে, সাথে আছে কেবল ওই গবেট অনুকূল। ওসব নিয়ে ভাবি না। জানি তেমন কিছু হলে তোরা তো আছিস। তোরা বিয়ে করেছিস সম্পর্ক জনিত সমস্যা তোদের একটু বেশি। আঁতের মানুষগুলোর কাছে সাহচর্যের প্রত্যাশা আছে বলেই না পাওয়ার হতাশা তোদের অস্থির করে। কিন্তু ভেবে কোন লাভ নেই রে পাগল, কেবল মন খারাপ হবে। তাই বলি ভাইসব বয়স হয়েছে, নির্লিপ্ত হয়ে যা আর গীতার সেই অমোঘ উক্তিটা জপ কর “কর্মণ্যেবাধিকারস্তে মা ফলেষু কদাচন”।

শালা জ্ঞানদাশঙ্কর, সুযোগ পেয়েই মাস্টারি ফলাতে শুরু করেছে। মাঠেই হোক বা খাটে, ফলের আশা ছাড়া আবার কাজ হয় নাকি রে? তবে ওই নির্লিপ্ত হয়ে থাকাটা আমাদের বয়সের জন্য একেবারে সঠিক টোটকা। -- স্মিত হেসে মানস বলল।

সব টোটকা সবার জন্যে নয় রে। তোর বাড়িতে পাঁচটা লোক আছে, নির্লিপ্ত হয়ে কিছুদিন চালাতে পারবি। আমরা তো মাত্র দুজন। ওতে আরো অশান্তি বাড়বে। -- অমর সখেদে মন্তব্য করল।

--অমর, নির্লিপ্ত মানে একেবারে সংশ্রবশূন্য হবি না। তা হলে বিপদ। উদাসীন হয়ে থাকতে চেষ্টা করবি। মানে, হলেও ভাল না হলেও ভাল এমন একটা ভাব। তখন দেখবি আশা, নিরাশা, প্রত্যাশা, এইসব মানসিক অশান্তির উপকরণগুলো আর তেমন বেগ দিচ্ছে না। তবে তোরা ঘোর সংসারী তো, মনকে বাগে আনতে সময় লাগবে।

এত উপদেশ দিলে, মনকে বাগে আনার পথটাও তো তোমাকেই বাৎলাতে হবে গুরুদের।– রসিকতা করে অনুপমকে অমর বলল।

আইবুড়ো এঁড়ে, জীবনে সংসার করল না, ও কি পথ বাৎলাবে রে?—হাসতে হাসতে মানস বলে।

দমে না গিয়ে অনুপম বলে—গুণের কদর করতে তো আর শিখলি না। অনেক বড় বড় কোচ আছে যারা কোন কালেই তেমন দরের খেলোয়াড় ছিল না। তবু তাদের ঝুলিতে শেখাবার মত অনেক কিছু থাকে। তুই যখন আমার শরণে এসেছিস অমর, তোকে আমি বিমুখ করব না। পথ দেখাব। একসাথে সবটা নিতে পারবি না। একটু একটু করে এগোতে হবে।

এরপর অনুপম স্কচের একটা বোতল খুলে তিনটে গ্লাসে পরিমাণ মত ঢেলে একটা নিজে রেখে বাকি দুটো মানস আর বিকাশের দিকে এগিয়ে দিল।

অমর বলে—আমার কোথায়?

আজ এই মদের আসর থেকে তোর পাঠ শুরু হোক। নির্লিপ্ত হওয়ার পাঠ।

তার মানে কি বলতে চাস তুই? –অমর জিজ্ঞেস করে।

মনকে বোঝা যে সামনে যতই সকলে মদ্যপান করুক না কেন তুই ওতে আর নেই, একেবারে নির্লিপ্ত হয়ে গেছিস।

গুরুগিরি করতে এসেছিস ছ্যামড়া অথচ তোর তো দেখছি মার্গ দর্শন সম্পর্কে কোন জ্ঞানই নেই। নির্লিপ্ত হওয়ার রাজপথটাকেই তুই পরিহার করতে বলছিস। -- কথা শেষ করে অমর নিজেই গ্লাসে ঢেলে নিল প্রয়োজন মত তরল।

জানতাম পারবি না। কামনা, বাসনায় একেবারে মাখামাখি হয়ে আছিস যে। তবে মনকে ভারমুক্ত রাখার আর একটা উপায় আছে। জড়িয়ে ধর। -- অনুপম জানায়।

এ কাজটা মন্দ নয়, তবে এই বয়সে একটু রিস্কি। কিন্তু কাকে? -- মানস জিজ্ঞেস করে।

আমাদের এই মধুর পারিবারিক সম্পর্কটাকে। আজ থাক, এটা নিয়ে আর এক দিন ক্লাস নেওয়া যাবে।

নির্মল হাসি আর আনন্দের মধ্যে কাটল বৃদ্ধদের আর একটা দিন। এই জমায়েতেই ওরা খুঁজে পায় এই বয়সেও সতেজ, সবুজ থাকার রসদ।

 

রিটায়ারের পরে কর্মহারা স্বামীগুলো যখন সারাদিন বাড়িতে এদিক ওদিক ঘুর ঘুর করত তখন বৌয়েরা কর্তাদের স্বাস্থ্যের কথা ভেবেই হোক বা বিরক্তিতেই হোক বাইরে ঘোরাঘুরি করে আসতে বলত। বলার ধরণটা অবশ্য প্রায় সময়েই মিঠে হত না। অনুপমের বাড়িতে পাকাপাকি ভাবে আড্ডার ঠেক বসার পর থেকে এখন অফিসের থেকেও বেশি সময় ওরা বাইরে কাটায়। সর্বোপরি সারাদিন বেশ ফুর্তির মেজাজে থাকে। প্রথম দিকে বৌয়েরা খুশি হলেও ধীরে ধীরে মনে সন্দেহ দানা বাঁধতে শুরু করে। এই বয়সে এত ফুর্তি আসে কি করে? এর মধ্যে মানস বামাল ধরা পড়ে গেল। পেনসন তুলে ফেরার সময় মজলিসের জন্য একটা বড় বোতল ব্যাগে করে নিয়ে এসেছিল। বিজয়া খেতে বসেছে দেখে মানস নিশ্চিন্তে ধীরেসুস্থে ব্যাগ থেকে বোতলটা বার করে নিজের গোপন ড্রয়ারে রাখতে যাবে এমন সময় “দাদা পান” বলে মালা ঘরে ঢুকল। মানসের সাথে মালার সম্পর্কটা ঠিক ভাশুর আর ভাদ্দোরবউ এর মত নয়। ঠাট্টা ইয়ার্কি চলে। তাড়াতাড়িতে মানস বোতলটা আড়াল করে উঠতে পারেনি।

মালা বিস্ফারিত চোখে জিজ্ঞেস করল—দাদা ওটা কি?

মানস তাড়াতাড়ি ওকে থামিয়ে বলে—আস্তে আস্তে, এটা একজন আনতে দিয়েছিল। দিদির কানে যেন আবার তুলো না।

বিস্ময়ে মালা কথাগুলো একটু জোরেই বলে ফেলেছিল। একটু দূরে থাকলেও মালার বিস্ময়টা বিজয়ার কান এড়ায়নি। মালাও দিদির কাছে বেশিক্ষণ ব্যাপারটা চেপে রাখতে পারেনি।

বোতলটাকে যথাস্থানে গুঁজে দিয়ে মানস খবরের কাগজ দেখছিল।

-- হ্যাঁ গো, এই বুড়ো বয়সে মদ খাওয়া ধরেছ?

-- কানে পৌঁছে গেছে? ওটা একজন আনতে দিয়েছিল।

-- মিথ্যে কথা বোলো না তো। তাই বলি, কিসের এত আড্ডা যে বাড়ি ফেরার নামটি নেই। তার মানে অনুপমদার বাড়িটা এখন মালের ঠেক হয়েছে।

-- ছি ছি অমন করে বলতে নেই। পাপ হবে। স্বামী না পরমেশ্বর।

-- কথা ঘুরিও না। এত দিন ঘর করছি তোমাকে তো কখনো কোথাও ড্রিঙ্ক করতে দেখিনি।

-- এইবার তোমার শব্দ চয়নটা ঠিক হয়েছে। “মাল” বললেই সাথে সাথে “বাংলা” শব্দটা মনে এসে যায়।

আমরা তো সে গোত্রের নয়। “ড্রিঙ্ক” করার মধ্যে একটা আভিজাত্য আছে। ডাক্তাররা এখন নিয়মিত দু পেগ করে হুইস্কি খেতে বলে। তাতে হৃদয়ের বাঁধুনিটা ঠিক থাকে।

-- রাখো তোমার সব মনগড়া কথা।

--বিজু, এইজন্যেই বলি তোমাদের মেয়েদের কুটকাচালির আড্ডায় সময় নষ্ট না করে অবসর সময়ে একটু বইপত্র ওল্টাও। সব জানতে পারবে।

কথাটা বলেই মানস বুঝতে পারে যে ফাউল করে ফেলেছে।

বিজয়া ফুঁসে উঠল—কি আমরা সারাদিন কুটকাচালি করি?

-- আহা সারাদিন হবে কেন, ওই একজায়গায় হলে তখন। যাকগে, ওসব কু কথা বাদ দাও। বলি কি, আমাকে হিংসে না করে মাঝে সাঝে এক দু পাত্র চেখে দেখলেই তো পার। শরীর মন একেবারে পালকের মত হয়ে যাবে।

কলিং বেল বেজে ওঠায় সেদিনের আলোচনা ওখানেই মুলতুবি হয়।

 

বিকাশ পাওনা গণ্ডা সংক্রান্ত কিছু দরকারে অফিসে গেছে। বাড়িতে রীতা একা। ফাঁকা বাড়িতে মুক্ত পরিবেশেমহিলা মহলের আসর বসেছে। অলি আর মিলি বাদে সবাই হাজির।

খানিক গল্প গুজবের পর বিজয়া জিজ্ঞেস করল—কত্তাদের কোন পরিবর্তন কি তোমাদের নজরে পড়েছে? 

রিটায়ার করার পরে ও একটু খিটখিটে হয়ে যাচ্ছিল। ইদানীং দেখছি হাসিখুশি চনমনে ভাবটা আবার ফিরে এসেছে।– শিখা তার পর্যবেক্ষণ জানাল।

-- হবেই। আর রীতা, বিকাশদার খবর?

-- ওকেও তো আজকাল বেশ ফুর্তিতেই দেখি।

-- আচ্ছা, তোমাদের কখনো জানতে ইচ্ছে করেনি ওদের এই হঠাত পরিবর্তনের কারণটা কি? বিজয়া জিজ্ঞাসু চোখে দুজনের দিকে তাকায়।

-- বুড়ো বয়সে ভাল আছে, আনন্দে আছে, ভাল তো। এর কারণ নিয়ে ঘেঁটে কি হবে?  মন মেজাজ বিগড়ে থাকলে না হয় কারণ খুঁজতাম। শিখা জানায়।

আমিও কি ছাই জানতে পারতাম যদি না ও মালার কাছে একেবারে হাতে নাতে ধরা না পড়ত। -- মুচকি হেসে বিজয়া বলে।

উৎসুক শ্রোতাদের বিজয়া বেশ রসিয়ে সেদিনের ঘটনাটা জানাল।

মানস দা ড্রিঙ্ক করে না ঠিকই কিন্তু বিকাশ তো বাড়িতেই মাঝে সাঝে অল্প স্বল্প ড্রিঙ্ক করে। ফলে ওটাই একমাত্র কারণ নয়। আসলে আড্ডা দিয়ে, তাস খেলে, মনের মত করে সময় কাটানর ফলে রিটায়ারমেন্টের ঠিক পরের মানসিক অস্থিরতাটা এখন আর তেমন নেই। তাই মন মেজাজও এখন আগের থেকে ভালো থাকে। এ ছাড়া আর কোন কারণ আছে কিনা অবশ্য জানি না।

রীতা তার মতামত জানাল।

বয়সটাতো ভালো নয়। আড্ডার কল্যাণে একটা মানুষ এই বুড়ো বয়সে এসে মদ ধরল। এরপর এরা এই “ম” থেকে আরো বড় “ম” য়ের দিকেও যে হাত বাড়াবে না তার কোন গ্যারান্টি নেই। একেবারে লাগামছাড়া করলে চলবে না। একটু চোখে চোখে রাখতে হবে।

বিজয়ার এই ভাবনাকে বাকি দুজনও একেবারে উড়িয়ে দিল না।

সিদ্ধান্ত হল পালের গোদা অনুপম মাস্টারের সাথে একদিন বসতে হবে।

 

অনুপম মজাদার মানুষ। বন্ধুরা তো বটেই তাদের পরিবারের লোকজনের কাছেও ও বেশ জনপ্রিয়। ফোনে মহিলাদের কাছ থেকে আলোচনায় বসার আমন্ত্রণ পেয়ে ও উৎফুল্ল হয়ে বলেছিল- এ তো ভাগ্যের ব্যাপার। একজন নয়, তিন তিনজন মহিলার আমন্ত্রণ। তবে ম্যাডাম রা যদি মিটিং এর এজেন্ডাটা একটু বলতে।

বলা হল ওটা আলোচনার সময়েই জানান হবে। তাদের আরো দাবি, মিটিং হবে অনুপমের বাড়িতে আর মধ্যাহ্নভোজে অনুপমের রাঁধা পাঁঠার মাংস যেন থাকে। আগে খাওয়া দাওয়া তারপর মিটিং। আর তারা আসছে শুধুই মাংস ভাত খেতে, এর বেশি তাদের কর্তাদের কানে যেন আর কিছু না যায়। “তথাস্তু” বলে অনুপম সম্মতি জানিয়েছিল।

অনুপম খুব ভাল রাঁধে। তাদের বাদ দিয়ে কেবল বৌ গুলোকে খাওয়াচ্ছে এটা কানে যেতেই পরদিন আড্ডায় সব রে রে করে উঠল। নানা রকম গালমন্দ শাপ শাপান্ত শুরু হল।

অমর তো বলেই দিল—শালার গতিক আমার সুবিধে ঠেকছে না। আমরা কতদিন থেকে খাওয়া দাওয়ার কথা বলছি ব্যাটা রা কাড়ে না। যেই মেয়েরা বলেছে, অমনি এক কথায় রাজি।

আমাদের আড্ডা বাতিল করে সোহাগ করে বউ গুলোকে রেঁধে খাওয়ানো হচ্ছে। মতলব মোটেই ভাল নয়--মানস সঙ্গত করল।

যার উদ্দেশ্যে টিকা টিপ্পুনি সে কেবল মিটিমিটি হেসে গেল।

 

সেদিন বন্ধু জায়াদের আপ্যায়নে অনুপম কোন ত্রুটি রাখেনি। ফরমাইস মত কেবল মাংস ভাতই নয়, ছিল আরো অনেক পদ। অনুকূলও রান্নায় হাত লাগিয়েছিল। সকলেই আপ্লুত।

অনুপমদা আপনি কত কিছু পারেন। এত ভাল রান্না আমরা জীবনেও করতে পারব না।– ধন্যবাদ জানিয়ে রীতা বলল।

আমারটাতো একেবারে ঢ্যাঁড়স। এক কাপ চাও করতে পারে না। একমাত্র পারে বাজার করতে। --সখেদে বিজয়া বলল।

আপনার বউ খুব সুখী হত। একটা মেয়েকে সেই সুখ থেকে আপনি বঞ্চিত করেছেন। এটা সামাজিক অপরাধ।–- হাসতে হাসতে শিখা বলে।

ওই ভুরিভোজের পরে কোন সিরিয়াস আলোচনা সম্ভব নয়। হয়ও নি। কিছু আলাপ আলোচনা হয়েছিল। বিজয়াদের সন্দেহ নিরসন করতে অনুপমকে তেমন বেগ পেতে হয়নি। অনুপম প্রস্তাব দিল একটা সর্বদলীয় বৈঠক ডাকার।

আমাদের ঘরোয়া ব্যাপারে আবার রাজনীতি ঢোকাচ্ছেন কেন অনুপমদা? বিস্মিত হয়ে শিখা প্রশ্ন করে।

অনুপম হেসে বলে—এ দল সে দল নয়। তোমরা আজ দল বেঁধে এখানে এসেছ তোমাদের অতি আপন আর এক দলের ব্যাপারে কিছু কৌতূহল নিয়ে। দুটো দল তো এখানেই হয়ে গেল। প্রত্যেকেরই কিছু সমস্যা আছে আর সেটা থাকাই স্বাভাবিক। এই সমস্যাগুলোর গভীরে খেলা করে আর এক সমস্যা। “ও বা ওরা কত ভাল আছে”। তাতে নিজেদের কষ্টটা আরো বেড়ে যায়।

এটা আপনি ঠিক বলেছেন অনুপমদা।–বিজয়া সহমত পোষণ করে।

পরিবেশ, পরিস্থিতি, মানসিকতা, কারণ যাই হোক না কেন যৌথ পরিবার ধীরে ধীরে মুছে যাচ্ছে। সাথে সাথে হারিয়ে যাচ্ছে পারস্পরিক নির্ভরতার বর্মটাও। বৃদ্ধ বয়সে একাকীত্ব, অনিশ্চয়তা, জীবনকে দুর্বিষহ করে তুলছে। তবে দিদিমণিরা এই সবের থেকে বেরোবার পথ আছে। অন্তত আমাদের কাছে তো আছেই। -- কথাগুলো বলে অনুপম সামনের মানুষদের প্রতিক্রিয়া জানার জন্যে একটু থামল।

নিঃসঙ্গতার কষ্ট আর অসহায়তা আমার আর বিকাশের থেকে ভাল কেউ জানবে না। বয়স বাড়ার সাথে সাথে প্রায় সময়েই নানান অজানা আশংকা মনে ছেয়ে থাকে। -- চিন্তান্বিত মুখে রীতা বলে।

অবস্থা আমারও একই। সব থেকেও নেই।–রীতার ভাবনারই প্রতিধ্বনি শিখার কথায়।

যৌথ পরিবারই এর থেকে পরিত্রাণের একমাত্র পথ আর তার জন্যই দরকার সর্বদলীয় বৈঠক।– অনুপমবলে।

হেঁয়ালি না করে যা বলতে চাইছেন একটু পরিষ্কার করে বলুন তো। আমরা নিঃসন্তান দম্পতি। এই বয়সে যৌথ পরিবার কোথায় পাব? আর এই সর্বদলীয় বৈঠকটাই বা কি? – রীতা জানতে চায়।

এই যে আমরা কটা পরিবার পরস্পরকে পছন্দ করি, নিজেদের মত আড্ডা দিই গল্পগুজব করি, তার সবটাকে নিয়ে একটা ইউনিট হিসাবে ভাবতে চেষ্টা কর তাহলেই অনেক সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে। খুঁজে পাবে এক পরিমার্জিত যৌথ পরিবার যার নিশ্চিন্ত আশ্রয়ে জীবনটা হয়ে উঠবে অনেক সহজ, সরল আর সুন্দর। সেই যৌথ পরিবারটাকে চাঙ্গা রাখতে গেলে আর সংঘবদ্ধভাবে এগিয়ে নিয়ে যেতে গেলে মাঝে মাঝে দরকার সর্বদলীয় বৈঠক অর্থাৎ পিকনিক বা বেড়ানো ধরণের কোন কিছুকে উপলক্ষ করে সকলের অবাধ মেলামেষা। এত সঙ্গীর মাঝে কেউ নিঃসঙ্গ থাকতে পারে না। দিদিমণিরা এবার ব্যাপারটা পরিষ্কার হল? – স্মিত হেসে অনুপম আরো বলে—আর এই মেলবন্ধনের প্রাথমিক উদ্যোগটা মা লক্ষ্মীদেরই নিতে হবে।

এই না হলে শিক্ষক। আমাদের ভাবনাগুলোকে গোড়া থেকে ঝাঁকিয়ে কত সুন্দর পথের সন্ধান দিল। এত চেনা পথ কিন্তু কোনদিন সেভাবে হেঁটে দেখিনি। --শিখার কথায় অন্য দুজনও সমর্থন জানাল।

সর্বদলীয় বৈঠকের শুরুটাও হল অনুপমের বাড়িতে। এবার অনুপম মধ্যাহ্নভোজে সকলের জন্যই পাঁঠার মাংস রেঁধেছিল তাই আর কারো ক্ষোভ নেই। ভোজ শেষে তৈরি হল যৌথ পরিবার পরিচালন কমিটি। নির্লিপ্ত নয় বেশ উদ্দিপ্ত ভূমিকাতেই দেখা গেল কত্তাদেরও। চরম উৎসাহ আর উদ্দীপনার মধ্যে আগামী এক বছরের কর্মসূচীও তৈরি হল। অচিরেই হতে থাকল তার রূপায়ন। সেই মানুষ, সেই পরিবার, অথচ পুরো ছবিটাই বদলে গেছে। শিখার ছেলে এখন ফোনে মাঝে মাঝে বলে—মা তোমরা কত মজায় আছ, আমি খুব মিস করি।

এর থেকে বড় পাওয়া আর কি হতে পারে! তবে শিখা বা অমর এখন আর আগের মত ছেলেকে অতটা মিস করে না।   


Rate this content
Log in