অদিতি সিংহ

Action Crime Thriller

4  

অদিতি সিংহ

Action Crime Thriller

নীহারিকা

নীহারিকা

34 mins
14


কলমে: অদিতি সিংহ


_ লাইটটা বন্ধ করো তো।


_ কেন, কি হলো?


_ আরে রাত হয়েছে, ঘুমাবো।


_ করছি দাঁড়াও, আর অল্প বাকি তারপর

  বইটা শেষ হয়ে যাবে।


_ আচ্ছা। তুমি পড়ো আমি ঘুমাই, কাল অফিস।


_ হ্যাঁ জানি, মনে আছে তো।

 তোমারও তো কাল স্কুল?


_ সে তো রোজই থাকে, ঠিক আছে খুব

  ঘুম পেয়েছে।


নীহারিকা, ঘুমিয়ে পড়ল। অতনু নাইট ল্যাম্প জ্বালিয়ে তখনো বই পড়ছে। ছয় বছর হলো তাদের বিবাহিত জীবন। প্রতিবছর বারংবার কাজের সূত্রে ঠিকানা বদলায়। নীহারিকা জানে, তার স্বামীর বই পড়ার প্রচন্ড শখ। শখ বললে ভুল হবে, সে এক ধরনের বড়ো নেশা। রোজ রাতে বাড়ি ফিরে, একটা বই শেষ না করতে পারলে, তার রাতে ঘুমই আসে না। তাই এর পরিবর্তন আজও হয়নি। ৮টার সময় অফিস থেকে ফিরে, ফ্রেশ হয়ে প্রতিদিন রান্না ঘরে যায়, স্ত্রীর সঙ্গে গল্প করতে। নীহারিকা একটা প্রাইভেট স্কুলে পড়ায়। মাসের শেষে দুজনের বেশ ভালোভাবেই সংসার চলে যায়। আর চলবে নাই বা কেন! দুজনে একসঙ্গে চাকরি করে যে।


অতনু বইটা শেষ করে, নাইট ল্যাম্প বন্ধ করে ঘুমিয়ে পড়ল। আবার সকাল হলে দৌড়াতে হবে, ভেবে খুব ক্লান্ত লাগলো তার। তখন রাত প্রায় গভীর, আশেপাশে ঝিঁ ঝিঁ পোকার ডাক, বাইরে থেকে শোনা গেল একটা মৃদু স্বরে কান্নার আওয়াজ। নীহারিকার ঘুমটা হঠাৎ করেই ভেঙে গেল, সে একটা খুব বাজে স্বপ্ন দেখেছে... অর্ক ও তার স্বামী ওকে মারতে চাইছে। অর্ক ওকে ভালো থাকতে দেবে নাকি! কিন্তু এই অর্কটা কে। নীহারিকার কিছুই মনে পড়ছে না। কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম, সে বেশ উদ্বিগ্ন, চিৎকার করে পাশে শুয়ে থাকা অতনু কে ডাকতে চাইছে, কিন্তু পারছে না। এই সব ভাবতে ভাবতে সে আবার ঘুমের দেশে চলে গেল। এদিকে সকাল হয়ে গেছে। তাদের দুজনের সংসারে একটা ব্যস্ততা লক্ষ্য করা যায়। এই ব্যস্ততাটা হয়তো সব পরিবারেই দেখা যায়- নীহারিকা নিজের ও অতনুর টিফিন গুছিয়ে স্কুলে চলে গেল। একটু পরে অতনুও তার অফিসের জন্য রওনা দেবে।


প্রতিদিনের মতো নীহারিকা বাসে করে স্কুলে যায়। কিন্তু আজ একটু তার অদ্ভুত লাগলো কেন? মনে হলো, তার পাশের সিটে কে যেন বসে আছে। অনবরত তার দিকেই তাকিয়ে। একবারের জন্য মনে হল পাশে তাকিয়ে দেখাই যাক না। কে? কিন্তু সেই সাহস তার মধ্যে নেই। কিছু পুরনো বাজে অতীত তাকে তাড়া করে বেড়াচ্ছে। এই অতীত তার সুখের সংসারেও বাধা হতে পারে। আচ্ছা, নীহারিকা কি অতনুকে সবটা বলে দেবে? না না অতনু যদি ভুল বোঝে। তখন কি হবে? অতনু যদি তাকে আর আগের মতো ভালো না বাসে! নীহারিকা কি অতনুকে ঠকাচ্ছে?


এইসব সাত-পাঁচ ভাবতে ভাবতে, বাসটা নির্দিষ্ট স্টপে দাঁড়িয়ে গেল। বাসের এক ধাক্কায় হঠাৎ তার হুশ ফিরলো, পরের স্টপে তাকে নামতে হবে। বাস থেকে নেমে সামনের দিকে সোজা এগিয়ে গেলে, ডানদিকে নীহারিকার স্কুল; যেখানে সে বর্তমানে চাকরি করে। স্কুলের সারা দিনের ব্যস্ততায়, তার আর মনে থাকল না; কাল রাতের স্বপ্নের কথা। কিংবা বাসে সেই ভাবনাগুলোর কথা। আজ ক্লাস ফাইভে একটা নতুন বাচ্চা ভর্তি হয়েছে। তার নাম শুনে, নীহারিকা খানিকক্ষণের জন্য নিস্তব্ধ হয়ে যায়। অন্যদিনের মতো আজকে সে বাড়ি ফিরতে আর দেরি করল না। তড়িঘড়ি করে বাড়ি ফিরে অনেক কাজ আছে, ভেবে নির্দিষ্ট স্টপ থেকে বাড়ি ফেরার বাসের উঠে পড়ল।


কলকাতা শহরে যারা প্রতিনিয়ত যাতায়াত করে, তারা জানে সন্ধের দিকে রাস্তার কেমন বেহাল অবস্থা হয়! ঠিক সময় বাড়ি ফেরা তো দূরে, কোন জায়গায় যাওয়া যায় না। সকলের চোখে মুখে দেখা যায় সারাদিনের অজস্র ক্লান্তির ছাপ। আর এক বাড়ি ফেরার তাড়না। নীহারিকার আজকে অনেক কথা বলার আছে। সে সব বলবে অতনুকে। কিন্তু সেসব বলতে পারবে তো? অতনু যদি…


(২)


সোনাগাছির এক বস্তি। রাতের দৃশ্য। কত পুরুষের আনাগোনা। কেউ খেতে আসে আর কেউ খাওয়াতে। এই পৃথিবীতে কত কিছুই বিক্রি হয়, মানুষের শরীর মাংস রক্ত কিংবা একটা গোটা মানুষ।


_ "এ বাবু যাবি!, চল না…"


_ "ভাগ শালী…যা এখান থেকে…"


_"এ বাবু চল, বাবু রে। কই যাস এদিকে আয়, আয় এদিকে…"


_"না না। সর সর কাজ আছে…"


_"কিরে তুই যাবি, যাবি আমার সঙ্গে…"


_"না মানে, হ্যাঁ… না, না…"


_"কি বাবু, এ পাড়ায় নতুন নাকি!"


_"বলছিলাম কি, তিন ঘন্টায় কত?"


ঘড়িতে তখন রাত ১১ টা, আগের খদ্দেরকে না ছাড়লে পরের জন আসতে পারবে না। এই নিয়ে ওর মনটা কেমন বিক্ষিপ্ত। এই নতুন মালটা কেমন একটা। এমনিতেই জন্মের কিপটা, কিছু পারেও না করতে। কত জন্ম চান করে নি, গায়ে কি গন্ধ বাবা গো, ধ্যের…


_ এ চামেলি, কাল কি পেলি রে?


_ যা, তোর দেখছি বড়ো লোপ হয়েছে...


_ কেন বে, ওই বাবু কি তোর একার খদ্দের?


_ তা নয় তো কি বে। তোর কাছে যায় না বলে তোর গোসা হয়েছে...


_ অমন বাবু আমার বহু দেখা আছে, থাক তুই তোর বাবু কে নিয়ে আমি গেলুম।


_ এই জেসমিন যাস নে, শোন শোন সোনালী কে কাল দেখলি?


_ এই কেন রে কি হয়েছে, ও তো ওই নতুন বাবুর সাথে ভালোই মেসেজ দিচ্ছে।


_ যা বলছিস তুই, ( দুজনে হাসতে হাসতে গড়িয়ে পড়ল)


সোনালী কদিন ধরে একটু অসুস্থ, সেটা সে ছাড়া কেউ জানে না। বেশ্যা পাড়ায় তাদের খবর কেউ রাখে না। আবার হয়তো সবাই রাখে, যখন কোনো পয়সা ওয়ালা বাবু আসে এপাড়ায়। তাদেরও তো শরীর বলে কিছু আছে! এই রে যা ভুল হয়ে গেল। তাদের তো আবার শরীরটাই সব। যত সব বড়ো বড়ো বাবুরা শরীরের খিদের জ্বালায় তাদের দরজার কড়া নাড়ে। এ পাড়ায় দিনের আলো নামতেই ব্যবসায় নেমে পড়ে সকলে। "লজ্জা-শরম" সেসব তাদের জীবনে বড্ড বেমানান শব্দ। দিনের বেলা তারা নিজেদের কাজে ব্যস্ত থাকে। আর রাত হলেই নিজেদের সাজিয়ে তোলে নতুন বউয়ের মত, কিন্তু তাদের এমনই দুর্ভাগ্য, তারা কোনোদিন কোনো বাড়ির মেয়ে-বউ হতে পারবে না। তারা কেবল নিজেদের শরীর বেচেই পেটের ভাত যোগাবে। অনেকে এ লাইনে ইচ্ছা করে আসে, অনেকে পেটের দায়ে আবার অনেককে এখানে বিক্রি করে দেওয়া হয়। 


_ "আ বাবু ছাড়, লাগছে, যা যা তোর সময় শেষ।"


_ "না, আর একটু এসো না। আর একটু কাছে এসো, আমি আরও টাকা দিচ্ছি…।"


_"এই যা তো তুই, কানের মাথা খেয়েছিস নাকি, তোরে আমার পোষায় না, ভাগ সালা। যা এখন দূর হ, পরের খদ্দের আসবে, আমাকে তৈরি হতে হবে…যা যা…।"


অবশেষে লোকটা চলে গেল, বেশ্যাপাড়ায় যারা আসে তাদের মান-অপমান বোধ কিছুই থাকে না। জেসমিনের এত তাড়াহুড়ো করে খদ্দেরকে তাড়িয়ে দেওয়ার কারণ আছে, একটু পড়ে যে একজন আসবে, জেসমিন তার জন্যই পথ দেখছে। সবার থেকে সে একটু আলাদা। কারণ সে জেসমিনের মনের কথা শোনে, এপাড়ায় যারা আসে তারা সবাই শরীর চায়। কিন্তু ঐ লোকটা বেশ অন্যরকম। এইসব কথা ভাবতে ভাবতে হঠাৎ দরজায় দুটো টোকা পড়লো। জেসমিন ঘরের ভেতর থেকে আওয়াজ দেয়…


_"হ্যাঁ বাবু আসছি রে…

আয় আয় বাবু তুই এয়েছিস। ভালো আছিস তো।


_"হ্যাঁ…"


_"আগের দিন এলি না যে, শরীর ঠিক আছে তোর?"


_ "সব ঠিক আছে, তুই চল।"


_"আ বাবু আজ কি আনচিস রে..."


দরজা খুলে তাকে ভেতরে বসতে বললো। কলকাতা শহরের ফ্ল্যাট বাড়িতে যে রকম বাথরুমের ঘরটা থাকে, এই ঘরটা ঠিক তেমন। একটা ছোট চৌকি, লাল রঙের একটাই আলো জ্বলছে সারা ঘরে। জানালা ও দরজায় নোংরা তেল চিটচিটে পর্দা উড়ছে। ঠিক ঘরের মাঝখানে ওপরে সিলিং ফ্যান ঘুরছে নামমাত্র, শুধু তার শব্দটাই জোরালো হয়ে শোনা যাচ্ছে।। হাওয়া গায়ে লাগে না, তবে এ আওয়াজ বেশি শুনলে মাথার ব্যামো শুরু হবে। ঘরের ভেতর থেকে কেমন একটা আঁশটে গন্ধ নাকে আসছে। লোকটা চৌকিতে গিয়ে বসে, তার সঙ্গে একটা ব্যাগ ছিল সেটা পাশে রাখে। লোকটা লম্বা হয়ে শুয়ে কোমরটা সোজা করে নিল, হঠাৎ উঠে বসে বলে...


_"তোকে আজ অনেক বড়ো কিছু দেবো রে।"


_"এ বাবু তুই সত্যি বলছিস!" জেসমিনের মুখে হালকা খুশির ঝলক। 


_"হ্যাঁ রে, তুই শান্ত হয়ে বস, আজ সারারাত আমি তোর সঙ্গে থাকবো।"


_"তুই খুব ভালো জানিস তো রে বাবু…"


_"তাই নাকি!"


_"আজ তোর পাশে বসবো রে? তুই বারণ করবি না তো?"


_"আজ তোর যা ইচ্ছা তাই করতে পারিস, আজ নিজেকে শুধু তোর করে দিলাম…"

মিনিট-দুয়েক ঠোঁটের কোণায়, এক আলতো খুশির হাসি লেগে থাকল জেসমিনের মুখে। কে জানে? হয়তো মনে মনে এই লোকটার প্রেমে পড়েছে সে। আজ তাকে সে নিজের করে পাবে, খুব খুব কাছে পাবে। এতদিন যাকে নিজের করে পাবে বলে হাজার একটা স্বপ্ন দেখেছিল। শরীর না, সে তার মন পাবে। তাদের কোন স্বপ্নই তো সত্যি হয় না, কিন্তু সে স্বপ্ন দেখে; স্বপ্ন দেখতে ভালোবাসে। এই বাবুই তাকে শিখিয়েছে 'স্বপ্ন' ছাড়া মানুষ ব্যার্থ। আজ সে নিজেকে উজাড় করে দেবে বাবুর কাছে। তার মনে হাজার একটা প্রশ্ন। বাবুও কি তাকে পছন্দ করে? মনে হয় করে, যদি না করত তাহলে বিগত ৬ মাস শুধু তার কাছেই আসত কেন? 


_ কি হয়েছে বাবু? উঠে বসলি যে। জল খাবি?...


_ হম্ম, হ্যাঁ... না না...


_ এ বাবু তুই ঠিক আছিস? তোর শরীর ঠিক আছে তো?


_ হ্যাঁ। একটা গল্প শুনবি?


_ গল্প? মানে? 


_ গল্প মানে গল্প।


_ “কিসের গল্প রে? রূপকথা?” জেসমিনের উৎসাহের আতিশয্যে ওর চোখ মুখ চিকচিক করে ওঠে। “ জানিস বাবু.. ছোটবেলায় আমার ঠাকুমা শোনাতো রাজা রানী পক্ষীরাজ ব্যাঙ্গমা ব্যাঙ্গমির গপ্পো। খুব ভালো লাগতো আমার, হা করে বসে গিলতুম সেসব গপ্পো। আচ্ছা, পক্ষিরাজ কি সত্যিই আছে রে?

_ তুই শুনবি না তো? আমার গল্প??


_ এ বাবু, হি, হি, তুই রাগ করছিস কিনে? না না, আমি তোর গপ্পই শুনবো.. তুই বল।


লোকটা বলতে শুরু করলো…

  

           (৩)


আজ অর্ণব বেজায় খুশি ও আনন্দিত। সেই আনন্দের খবর কেউ জানে না, একমাত্র সে ছাড়া। তড়িঘড়ি করে সকাল হতেই বেরিয়ে গেল, একজনের সঙ্গে দেখা করার উদ্দেশ্য নিয়ে। মালিনী, হ্যাঁ অর্ণব আজ তার সঙ্গেই দেখা করতে যাচ্ছে। কোন এক সাংস্কৃতিক মঞ্চে তাদের দুজনের প্রথম আলাপ, তারপর পাঁচ'বছর ফোনে কথা বলার পরে আজ তাদের প্রথম দেখা হবে নন্দনে।


ঘড়িতে তখন দুপুর ৩ টে, রবীন্দ্রসদন মেট্রো স্টেশন থেকে বেরিয়ে অর্ণব এক ব্যস্ততাময় মুখ নিয়ে এইদিক ঐদিকে দেখছে। চারটের সময় ওর আর মালিনীর দেখা করার কথা, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের মূর্তিটার সামনে। অর্ণব একদিকে ঘড়ি দেখছে আর অপর প্রান্তে কিছু একটা খোঁজার চেষ্টা করছে। না আপাতত সে মালিনিকে খুঁজছে না, বরং ফুলের দোকান খুঁজছে। আজ তাদের প্রথম দেখা হবে, সঙ্গে কিছু না নিয়ে গেলে হয়, অগত্যা তাই সে ভাবলো একগুচ্ছ গোলাপ নিয়ে গেলে কেমন হয়? মালিনী তো আবার লাল গোলাপ পছন্দ করে না, তার তো আবার সেই সাদা গোলাপে মন পড়ে থাকে।


পাঁচটা দোকান ঘোরার পর অবশেষে অর্ণব পেল সেই সাদা গোলাপ। মুখে হালকা একটা মিষ্টি হাসি নিয়ে, সে নন্দন চত্বরে এগিয়ে যাচ্ছে আর মনে মনে ভাবছে, "আচ্ছা! প্রথম দেখা হলে কি বলবো ওকে? কেমন আছো? কেমন চলছে দিনকাল, বাড়ির সবাই কেমন আছে? ইস কি বোকা বোকা সব...", "শাড়ি? না চুড়িদার কি পড়ে আসবে? মনে হয় শাড়ি… না..না.. চুড়িদার হতে পারে। সে যাই পড়ুক তাকে খুব সুন্দরই লাগবে।"


ঘড়িতে তখন চারটে বাজতে পাঁচ মিনিট বাকি, অর্ণব নন্দন চত্বরে রবীন্দ্রনাথের মূর্তিটার সামনে দাঁড়িয়ে আছে, মুখে হালকা মিষ্টতা নিয়ে এবং সঙ্গে উদ্বিগ্নের আশঙ্কা। "মালিনী মনে হয় এসে গেছে, মেট্রো স্টেশন থেকে নামছে পায়ে পায়ে নন্দন চত্বরে ঢুকছে, এই আর একটুখানি… তারপরে আমাদের দেখা হবে..." অর্ণবের মনের মধ্যে হাজার একটা ভাবনা চলছে এত আনন্দ সে আগে কোনদিনও অনুভব করেনি।


ঘড়িতে এখন ছয়টা বাজে। "এত দেরি হচ্ছে কেন? মালিনী কি ভুলে গেছে আজকে তাদের দেখা হবার কথা? দু'ঘণ্টা তো আমি এখানে দাঁড়িয়ে, আচ্ছা ও ঠিক আছে তো?” মনের মধ্যে হাজার একটা দুশ্চিন্তা চলছে অর্ণবের কিন্তু সে একবারও ফোন করছে না মালিনীকে। মালিনীর বক্তব্য ছিল, তাদের যেদিন প্রথম দেখা হবে সেই দিন যেন কেউ কাউকে একটাও ফোন না করে। শত ভিড়ের মাঝেও তারা একে অপরকে খুঁজে পায় কিনা এটাই তাদের ভালোবাসার পরীক্ষা।


ঘড়িতে রাত আটটা। অর্ণব ম্লান মুখ করে এখনো সেই মূর্তিটার সামনে ঠায় দাঁড়িয়ে, "না এখান থেকে চলে গেলে যদি মালিনি আমাকে খুঁজে না পায়। তখন তো সে খুব চিন্তা করবে না, না না আমি এখান থেকে কোথাও যাবো না। আমি এখানে দাঁড়িয়ে থাকবো সে যতই রাত হোক না কেন।"


ঘড়িতে এখন রাত দশটা। নানান দুশ্চিন্তা তার মাথার মধ্যে ঘুরপাক খাচ্ছে। সে আর ভাবতে পারছে না। প্রচন্ড ক্লান্ত, প্রচন্ড বিধ্বস্ত, হাতের সতেজ ফুলগুলোও কোনরকমে নেতিয়ে যাওয়ার পালায় এসে ঠেকেছে। অবশেষে সে মালিনীকে ফোন করলো। কিন্তু ফোনটা কেউ ধরছে না কেন? অর্ণব বারবার ফোন করলো ৩ বার, ৪ বার, ৮ বার, ১০, ১২, ১৫ বার... মালিনী ফোন ধরছে না, কেউ ফোন ধরছে না, কিন্তু কেন? মনের মধ্যে অর্নবের হাজার একটা দুশ্চিন্তা আসছে, অবশেষে একজন ফোনটা ধরল।


_ " হ্যালো হ্যালো মালিনী...

তুমি ঠিক আছো? কোথায় তুমি...? হ্যালো মালিনী... হ্যালো... কিছু বলছো না কেন?"


_ "আমি মালিনীর দাদা বলছি, মালিনী আর নেই।”

পায়ের তলার মাটিটা যেন হঠাৎ করেই কেউ কেড়ে নিল অর্ণবের। ওপাশের কণ্ঠ বলতে থাকলো…

“অর্ণব তোমাকে আমি চিনি, ও তোমার ব্যাপারে আমাকে সব বলেছে। আজ বিকেলে ওর তোমার সঙ্গে দেখা করতে যাওয়ার কথা ছিল। ও গেছিলও কিন্তু.. কিন্তু শ্যামবাজারের পাঁচ মাথা মোড়ে রাস্তা পার হওয়ার সময়… একটা দ্রুতগামী বাস এসে সব শেষ করে দিল।”

ওপাশের কণ্ঠ কাঁপতে শুরু করে দিয়েছে কান্নায় ইতিমধ্যে,


“ডাক্তাররা কিছু বলতে পারছেন না, মালিনী শুধু তোমাকে খুঁজে চলেছে। তুমি পারলে আর.জি.কর-এ চলে এসো আমরাও আছি..."


সবটা শুনে অর্ণব চুপ। কি বলবে ভেবে পাচ্ছে না। কি করবে সে জানে না, তার কি করা উচিত, তার মাথা কাজ করছে না, চোখের সামনে সব কেমন অন্ধকার ঠেকছে। হঠাৎ করে মাটিতে পড়ে যাওয়ার একটা ধপ করে আওয়াজ হল। আশেপাশের সকলে দৌড়ে এসে অর্ণবকে তুলে মাথায় জল দিতে থাকলো। চারিদিক দিয়ে নানান প্রশ্ন ভেসে আসছে...


"- কি হয়েছে দাদা? 

-আপনি ঠিক আছেন?

- হঠাৎ পড়ে গেলেন কি করে?"


অর্ণব সে সবের তোয়াক্কা না করে, কোন রকমে উঠে দাঁড়িয়ে, সেই ভিড় এড়িয়ে এক দৌড়ে চলে গেল, হাসপাতালের উদ্দেশ্যে।

কিভাবে যে সে নন্দন চত্বর থেকে আর. জি কর হাসপাতালে পৌঁছল কোনোকিছুরই হূশ ছিল না তার। চারিদিকে ভিড় আর কান্নার আওয়াজ ভেসে আসছে। তার মালিনী কোথায়! সে খুঁজে পাচ্ছে না কেন তার মালিনীকে! একসময় মালিনী বলেছিল, "যদি আমাদের ভালোবাসায় বিশ্বাস থাকে, তবে একে অপর কেউ নেই খুঁজে পেয়ে যাব শত ভিড়ের মাঝে..."


অর্ণব সারা হাসপাতালে মালিনীকে খুঁজে চলেছে। কোন প্রান্ত ছাড়েনি। বাইরে ভেতরে সব খুঁজছে। হঠাৎ তার চোখে পড়ল, এক কোণায় একটা বডি সাদা চাদর মুড়ে শুয়ে আছে। অর্ণব ধীরে ধীরে তার কাছে গেল, অর্ণব যত তার কাছে এগিয়ে যাচ্ছে, ক্রমশ তার হৃদস্পন্দন বেড়ে চলেছে। হাত-পা ঠান্ডা হয়ে যাচ্ছে। সেই শুয়ে থাকা সাদা চাদর মুড়ে থাকা বডিটর থেকে একটা হাত নিচে ঝুলছে, হাতে একটা ঘড়ি পড়া। এই ঘড়িটা অর্ণব চেনে, কিছু মাস আগে সে মালিনীকে তার জন্মদিনে কুরিয়ার মারফত ঘড়িটা উপহার দিয়েছিল। তার বুঝতে বাকি থাকল না এটা কে? মুখটা এখনো সাদা চাদরে মোড়া। একবারের জন্য অর্ণবের ইচ্ছা হলো না সে সাদা চাদরটা খুলে মুখটা দেখে। অর্ণব হাসপাতালের বাইরে গিয়ে কোন এক ফুলের দোকান থেকে, আবার একগুচ্ছ সাদা গোলাপ কিনে আনলো। শুয়ে থাকা মালিনীর গায়ের ওপর রেখে সে ওখান থেকে চিরতরে বিদায় নিল। আর পিছনে ফিরে দেখলো না।


"যে ভালো স্মৃতি নিয়ে সে মালিনীকে

নিজের মনের কঠোরায় স্থান দিয়েছিল,

সেই ভালো স্মৃতিগুলো না হয়,

থেকে যাক আজীবন ধরে তার কাছে।"


বাবু খানিক চুপ হলো, মুখটা কেমন ফ্যাকাসে দেখছে। আমার কি এখন কিছু বলা ঠিক হবে! জেসমিন মনে মনে বলে। আচ্ছা! এমন গল্প এই লোকটা আমাকে কেন বলল? আমাদের আবার কেউ গল্প শোনায়, কেউ জানতে পারলে হেসেই মরে যাবে।


_ এ বাবু এ নে জল খা।


লোকটা জল খেয়ে, ওই নোংরা বিছানায় শুয়ে পড়ে। শুয়ে পড়তেই ঘুমে তার চোখ জুড়িয়ে আসে। জেসমিন ভালো করে দেখছে লোকটাকে। এক অদ্ভুত মায়া জড়ানো রয়েছে তার মুখে। আজ সারা রাত অন্য খদ্দের তাকে বিরক্ত করতে পারবে না। এই বাবু আজ রাতে ওর কাছেই থাকবে। জেসমিনও তার পাশে বসে থাকতে থাকতে শুয়ে পড়ে, কখন যে তার চোখ লেগে যায় সে বুঝতে পারে না।


(৪)


বিয়ের আগে নীহারিকা কলকাতায় থাকত। কলেজ শেষ করে, একটা বেসরকারি সংবাদ মাধ্যমে কাজও করত। মাঝের প্রায় পনেরটা বছর পেরিয়ে গেছে। নিজেকে কলকাতায় মানিয়ে নিতে। কলকাতায় তার জন্ম তবুও সে এখানে নিজেকে প্রতিনিয়ত আবিষ্কার করে। সঠিক কাজের সন্ধান করতে, পুরনো মানুষগুলোর সঙ্গে সেভাবে আর যোগাযোগ হয়ে ওঠে না। আর না ওঠাটাই স্বাভাবিক। পুরোনো ছন্দে বেশি মেতে উঠতে নেই যে। কলেজে পড়ার সুবাদে সকলে মিলে যখন শান্তিনিকেতনে বেড়াতে গিয়েছিল, কিছু মানুষের সঙ্গে পরিচয় হয়েছিল। প্রথম প্রথম প্রায় রোজ কথা হত তাদের সঙ্গে চিঠিতে। জানি জানি, রোজ কাউকে চিঠি লেখা যায় না, অত দূরে যেতেও চিঠির একটা সময় লাগে; তবুও নীহারিকার কাছে সেটাই রোজ। তার কাছে ফোন নামক বস্তুটা থাকলেও তার ব্যাবহার ছিল কম। তাই সে চিঠি'টাই ব্যাবহার করত। ওই চিঠির মধ্যে একটা আবেগ লুকিয়ে থাকে, সঙ্গে থাকে অপেক্ষা; যা হয়তো ফোনে নেই।


এই কিছু দিন আগে, কলেজ স্ট্রিটে গেছিল একটা বইয়ের খোঁজ করতে, হঠাৎ থমকে দাঁড়াল, কাঁচের ভেতরে একটা বই দেখে। লেখকের নামটা! না মানে সে যার কথা ভাবছিল তার নাম লেখা? সত্যি! এই বই কী তার? কাঁচের দরজাটা খুলে ভেতরে প্রবেশ করল, বইটা বেশ কিছুক্ষণ হাতে নিয়ে দেখছি; কবিতার বই, লেখক অৰ্কপ্রিয় ব্যানার্জি। লেখক পরিচিতিতে একবার চোখ বুলিয়ে নিল। কাউন্টারে গিয়ে ওই বইটার বিল করিয়ে বাড়ি ফিরে এল, সেইদিন আর তার বাড়ির কোনো কাজে মন বসলো না। না ঘুমিয়ে সারা রাতে বইটা পড়ে শেষ করল। পরের দিন সকালে অতনুকে বলল,

"কাল আমরা শান্তিনিকেতন যাবো; আমি টিকিট কেটে নিয়েছি"


_ হঠাৎ! আর কাল? কাল রাতে খেয়াল করলাম তুমি ঘুমাও নি, সারারাত বেডসাইড ল্যাম্প টা জ্বলেছে, চোখের নিচে কালি ও পড়েছে দেখছি, কী হয়েছে তোমার, না মানে বলবে আমাকে সবটা, খুব চিন্তা হচ্ছে কিন্তু...


_ কিছু হয়নি, সব ঠিক আছে একদম। শুধু প্লিজ নিয়ে চলো। আমার ভালো লাগছে না, পর্ণার কথা খুব মনে পড়ছে।


_ তা এখন ওকে একটা ফোন করে নাও, তাহলে তো অনেকটা চিন্তা কমবে। কি হয়েছে বলো আমাকে, আমি আছি তো...


অতনু বিছানা ছেড়ে উঠে আসলো, নীহারিকা জানলার সামনে দাঁড়িয়ে। নীহারিকা কে তার দিকে ফিরিয়ে নিয়ে দু-হাত দিয়ে মুখটা ওপরে তুলে, মুখের সামনে থাকা চুলগুলো সরিয়ে কপালে একটা চুমু একে দিল; আর বলল, "আমি আছি তো পাশে সবসময়"। ওই কথাটা শোনার পর নীহারিকা নিজেকে আর সামলে রাখতে পারল না, ওকে জড়িয়ে ধরে খুব কেঁদেছিল সেইদিন। এই গোটা ১৫ বছরে অর্কের কথা আর সেই দিনের কথা শুধু মাত্র পর্ণা আর নীল জানতো। প্রায় বেশ কিছু বছর ওদের সঙ্গেও কোনো যোগাযোগ ছিল না।


এই গত ৬ বছর আগে নীহারিকা আর অতনুর বিয়ে হয় বাড়ি থেকে দেখাশোনা করেই। ওদের বিয়েতে বলেছিল ওদের, ওরা কেউ আসেনি। পর্ণা একমাসের বাচ্চাকে নিয়ে এত দূরে আসতেই পারবে না আগেই জানিয়ে দিয়েছিল, আর নীলের কাজের খুব চাপ। আর মেঘ! হ্যাঁ, নীহারিকা ওকেও বলেছিলো, ফোন চিঠি সব করেছিল কিন্তু ও কোনো যোগাযোগ রাখেনি। অতনু বেশ ভাল, অর্কের কথা ওকে বলেছিল; ও কিছু বলেনি শুধু বলেছিল, "যা অতীতে হয়ে গেছে, তা ভুলে বর্তমানে এগিয়ে যাও আর সবসময় আমাকে পাশে পাবে।" অর্ণবের এই কথাগুলো নীহারিকাকে ওর প্রতি আকৃষ্ট করেছিল।


বাড়ি থেকে সম্বন্ধ দেখার পর নীহারিকারা প্রথম দেখা করে, পার্ক স্ট্রিটের একটা কফি সপে। "ধুর, কেমন একটা সব, অত বড়োলোকি চাল সবার, আর কত দাম জিনিসের।’ বাইরে বেরিয়েই নীহারিকা বিরক্ত হয়ে বললো, একবার ভাবল, না উল্টোদিকের মানুষটা কি ভাববে! নীহারিকার ওই অনর্গল কথা বলাটা অতনু মন দিয়ে দেখছিল আর শুনছিল। সে বুঝতে পেরেছে এইসব তার পছন্দ হয়নি। তাই নিজেই বলে উঠলো... "এই জায়গাটা একদম ভালো না, বেশি রঙিল বড্ড ডিজিটাল, তাই না! আর একটা জায়গায় যাবেন?"


_ এখন! হ্যাঁ অসুবিধা নেই যাওয়াই যায়। কিন্তু কোথায় যাবো সেটা অন্তত বলুন।


_ আরে চলো তো আগে, তারপরে দেখতে পাবে।


_ আচ্ছা বেশ, চলুন দেখি কেমন জায়গা।


প্রথমে নন্দন গেল ওরা, কলকাতায় থাকলেও সেইভাবে কলকাতাটা ঘুরে দেখা হয়নি তেমন। একটা সিনেমা দেখে ওখানে কিছু একটু ভারি খাবার খেয়ে 'ফাইন আর্ট' ঘুরে মেট্রো ধরে বেরিয়ে পড়ল শোভাবাজার। মিনিট ১৫ হাটার পরে পৌছাল; একটা জায়গায়, ঠিক নাম জানে না সে, দুর্গার মূর্তি তৈরি হচ্ছে, মনে হয় কুমারটুলী। অতনু কে জিজ্ঞেস করল, এটা কী কুমারটুলী! ও 'হ্যাঁ' বলায় বেশ ভালো লাগছিলো তার। এই প্রথম ঠাকুর বানানো কাছ থেকে দেখবে সে। তারপরে কিছুটা হেঁটে এগিয়ে গেল ঘাটের দিকে, মনে হচ্ছে এসব রাস্তা তার ভালোই চেনা! আগে এসেছে হয়তো বহুবার।


এতটা রাস্তা আসতে আসতে দুটো অপরিচিত মানুষ এক হয়েছে। কলকাতা যে ভালোবাসার শহর তা সে প্রতিবার প্রমান করে দিয়েছে। বেলাশেষে তারা পরস্পরকে ছুঁয়ে দেখছে। হঠাৎ হোঁচট খাওয়ার আগে মানুষটা তাকে সামলে নেয়, চলতি পথে বেশি কথা হয় না তাদের, তবুও একটা অনুভূতি জানান দেয় 'পাশে আছি'।


চাপাতলা ঘাট পেরিয়ে তারা আহিরীটোলার দিকে গেল, ওই ঘাটটা বেশ বড়ো, কিছুক্ষণ ঘাটে বসে হঠাৎ অতনু ওর কলেজ জীবনের প্রেমের কথা বলল; নীহারিকা সবটাই শুনছিল তবে কোনো প্রশ্ন করিনি, তারপর সে দেখাল সেই জায়গাটা যেখানে ও নীলিমা কে প্রথম চুমু খায়। নীহারিকা তখনো কিছু বলিনি, শুধু প্রশ্ন করেছিল, "নীলিমা'দির সঙ্গে তাহলে সম্পর্কটা ভেঙে দিলেন কেন? আপনি তো ওকেই বিয়ে করতে পারতেন আমাকে বিয়ে করছেন কেন?"। অতনু সেদিন একটা কথা বলল, "সব ভালোবাসার মানুষকে যে নিজের করে পেতে নেই, কিছু ভালোবাসা স্বাধীন থাকে; যেমন আসে ঠিক তেমনি আবার চলে যায়, তাদের ভুলে নতুন করে সাজিয়ে নেওয়ার নাম জীবন।"


_ আচ্ছা, এইসব কথা হঠাৎ আমাকে কেন বলছেন? নীলিমা'দির কথা তারপর আপনাদের সম্পর্কের কথা...


_ বলতে ইচ্ছে হলো, সেই তো একদিন না একদিন তুমি সব জানতে; তখন তোমারও খারাপ লাগতো আর আমারও তাই বলে দিলাম।


_ তবুও মানুষের জীবনে কিছু কিছু ব্যক্তিগত কথা থাকে, সেটা সবাইকে বলা যায়?


_ যায়, যার সঙ্গে নতুন সম্পর্ক শুরু হতে চলেছে; তাকে সবটাই বলা যায়। পুরোনো ভুলে নতুনকে আগমন করতে হয়।


_ একদিনে এতটা বিশ্বাস করেন আমাকে! আর আমি যদি বাড়ি গিয়ে বলি আপনাকে পছন্দ হয়নি তখন?


_ তা তুমি বলবে না আমি জানি, তা নাহলে আমার এক কথায় এখানে আসতে না...


_ আপনাকে বিশ্বাস করি কি না জানি না, তবে ভালো লেগেছে; সারাজীবন পাশে থাকতে চাই!


_ পাশে আছি, সঙ্গে আছি, ভালোবাসায় আছি।


_ একটা কথা বলবো! জানি না কেন সবটা বলে নতুন কিছু শুরু করতে ইচ্ছে করছে। হয়তো সবটা শোনার পর তুমি বিয়েটা না করতেও পারো, তবুও আমি কিছু মনে করবো না; শুধু দিনশেষে নিজেকে অনেকটা হালকা লাগবে।


_ হ্যাঁ বলো, নতুন কিছু শুরু করার আগে পুরনোকে বিসর্জন দিতে হয়। বলো শুনছি...


নীহারিকা বলতে শুরু করল, বোলপুরে ছোট থেকে আমার বড়ো হয়ে ওঠা, বাবা মা আর আমি একসঙ্গেই থাকতাম। দুজনকে এক ডাকে সবাই চিনত, কারুর কিছু সুবিধা অসুবিধা হলে আমাদের বাড়িতে চলে আসতো, ছোট থেকে পড়াশোনার সঙ্গে আমি নাচে খুব ভালো ছিল। বাবা বলেন, "মেয়েদের ওইসব শিখে কি হবে, তার থেকে রান্না-বান্না শিখলে কাজে দেবে। এখনো পড়াশোনা করো, কাল কানাই'কে বলে দেবো তোমাকে পড়াবে"। কানাই'কাকু আমাদের বাড়ির কটা পরেই থাকে, বিয়ে-টিয়ে করেনি সারাক্ষন ছবি আঁকা নিয়েই থাকতো; কিসব নোংরা ছবি আঁকত।


পরের দিন কানাই'কাকু আসলো আমাকে পড়াতে সঙ্গে ছবি আঁকাও... ছোট থেকেই খুব ভালোবাসে নাকি আমাকে! মা বাবা বলতেন, পরে জানলাম সেটা কোন ভালোবাসা।


তখন ৫ থেকে ৭ বছর হবে, সেই বয়েসে কোনো কথা মনে থাকার কথা না তবুও কিছু খারাপ স্মৃতি মনে গেঁথে থাকে। পড়ানোর নাম করে আমার সঙ্গে যৌন নির্যাতন হত, ব্যথা লাগতো আমি খুব কাঁদতাম চিৎকার করতাম। উনি বাবা মা'কে বলতেন পড়া পারিনি তাই মারছে। বাবাকে সব বলে দেবো ওনাকে বলায়, উনি বাবা'কে মেরে ফেলবে বলতেন। ২০২১' ৭ জানুয়ারি ওনাকে কলকাতায় দেখি, পুরনো সমস্ত স্মৃতি আমাকে তাড়া করে বেরিয়েছে। সেইদিন বাড়ি এসে খুব কেঁদে ছিলাম। মা'কে আংশিক কিছু ঘটনা বলা ছিল, সেইদিন কান্না দেখে বললো কি হয়েছে! কই এর আগে তো জানতে চায়নি কী হয়েছে? আমার মনখারাপ করে কি না! আমি সবসময় একা অন্ধকারে কেন থাকি? আমার ভিড়ে ভয় করে, অস্বস্তি হয়, দম বন্ধ হয়ে আসে কিন্তু ওরা কোনো দিনও জানতে চায়নি তাই আমিও কিছু বলি না।"


নীহারিকা এইসব যখন বলছিল অতনু তার হাতটা শক্ত করে ধরে ছিল। আর বলছিল, "আমি আছি"। পৃথিবীতে একা থাকার সব মোহ মায়া ত্যাগ হয়ে যায়, শুধুই দুটো কথায় 'আমি আছি'। সারা জীবন কেউ পাশে থাকে না, তবুও একটা একান্তই নিজস্ব বিশ্বাস "সে আছে... "


নীহারিকা আর অতনু গঙ্গার ঘাটে পাশাপাশি বসে, সন্ধ্যে নেমে আসছে একটা মৃদু মন্দ হাওয়া গায়ে লেগে জানান দিচ্ছে "ভালোবেসে সুখি নিভৃতে যতনে, আমার নামটি লিখো তোমার মনেরও মন্দিরে"। জানিনা সে দিন একটা আলাদাই শান্তি লাগছিল, পরিপূরক শান্তি; যার জন্য আমি এতগুলো বছর অপেক্ষা করেছি।


              (৫)


দেখতে দেখতে কিছু বছর পার হয়ে গেছে। এই অন্ধকার গলিগুলোতে আলোর ব্যাবস্থা কিছুটা সচল হয়েছে। অনেক ইতিহাস আছে এখানকার। সোনাগাছি কলকাতা শহরে অবস্থিত ভারতের বৃহত্তম নিষিদ্ধ পল্লি। এই পতিতালয়ের কয়েকশত বহুতল ভবনে প্রায় ১ লাখ যৌনকর্মী বসবাস করেন। সোনাগাছি উত্তর কলকাতার মার্বেল প্যালেসের উত্তরে চিত্তরঞ্জন অ্যাভিনিউ, শোভাবাজার ও বিডন স্ট্রিটের সংযোগস্থলের নিকটে অবস্থিত।


প্রায় আড়াইশো কিংবা তিনশো বছর আগে শহর কলকাতায় শুরু হয়েছিল এক নতুন আভিজাত্য। যার পোশাকি নাম ‘বাবু কালচার। যদিও নবাবদের সময়ে ‘বাবু’ ছিল একটি বিশেষ উপাধি, নবাবের অনুমতি ছাড়া যা নামের আগে ব্যবহার করা যেত না। সাধারণত নবাবের অনুগত শিক্ষিত অভিজাত ধনীরাই এই উপাধি লাভ ব্যবহারের অনুমতি পেত।


ব্রিটিশ আমলে আবার এক নতুন অভিজাত শ্রেণীর তৈরি হল। নবাব আমলের শিক্ষাকে ছাপিয়ে গেল অর্থ। অর্থাৎ ব্রিটিশ আমল থেকে বাবুর সমার্থক হয়ে উঠলো অর্থ। শিক্ষা বা বংশ পরিচয় নয়। ফলে ব্যবসা বা অন্য উপায়ে প্রচুর অর্থ উপার্জন করে রাতারাতি বাবুর সংখ্যা বেড়ে গেল তিলোত্তমায়।


দামি গাড়ি, লক্ষ টাকার বাঈজি, পায়রা ওড়ানো, রক্ষিতাদের বাড়ি করে দেওয়া, ফি শনিবার বেশ্যাদের নিয়ে আসর বসানো, মদ খেয়ে রাতের পর রাত কাটানো ছিল এই বাবুদের প্রধান কাজ। অন্যদিকে ইংল্যান্ড থেকে ভারতে আসা তরুণরা বেশীরভাগই অবিবাহিত, যাদের বিয়ে হয়ে গিয়েছে তাদের স্ত্রী-সন্তান সুদূর ইংল্যান্ডে। এই কলকাত্তাইয়া বাবু এবং ইংল্যান্ড থেকে আসা সাদা চামড়ার তরুণ, এদের চাহিদাই গোটা একটা পতিতালয়ই গড়ে উঠল তিলোত্তমায়।


শোনা যায়, ইংরেজরা ভারতীয় অল্পবয়সী বিধবাদের ধরে আনতে লাগলেন কলকাতার সোনাগাছিতে। খুব সম্ভবত কলকাতা শহরে বেশ্যাবৃত্তির শুরু সেই সময়েই। তবে অনেক ইতিহাসবিদের মতে, পূবে কর্ণওয়ালিস স্ট্রিট ও পশ্চিমে চিৎপুরের মাঝের পুরো জায়গাটা নিয়েই পতিতাদের উপনিবেশ গড়ে উঠেছিল। জায়গাটার মালিক ছিলেন প্রিন্স দ্বারকানাথ ঠাকুর, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ঠাকুরদা।


এই নিষিদ্ধ পল্লীর স্থাপনা হয়েছিল নাকি সেই জমিদারবাবুর উদ্যোগেই। কারণ, বেশির ভাগ বাবুদের একাধিক উপপত্নী থাকাটা তখনকার সময়ের ‘বাবু কালচার’। কিন্তু ঘরে স্ত্রীয়ের সঙ্গেই বারবনিতা রাখাটা দৃষ্টিকটু। সেই সমস্যার কথা মাথায় রেখে বাবুরা তাদের উপপত্নীদের রাখার ব্যবস্থা করলেন সোনাগাছি অঞ্চলে।


কথিত আছে, এই এলাকার অধিপতি ছিলেন সানাউল্লাহ গাজী বা সোনা গাজি নামক এক মুসলিম সন্ত। এই সন্ত সোনা গাজির সমাধির উপর তৈরি মাজার এখনও রয়েছে ওই এলাকায়। যেহেতু এলাকার অধিপতি ছিলেন তাই ওই গোটা চত্বরটিকেই সোনা গাজির নামে ডাকা হত। পরবর্তী কালে সেই ‘সোনা গাজি’ নামই লোকমুখে ঘুরতে ঘুরতে ‘সোনাগাছি’-তে পরিণত হয়েছে।


_ শুনেছিস মলি?


_ কিরে, কি হয়েছে! জেসমিন নাকি খুন করেছে?


_ কি বলছিস কি? কাকে, কখন?


_ চুপ চুপ, কেউ যেন শুনতে না পায়।


_ গুরুমা জানে? আর জেসমিন কোথায়?


_ যে খদ্দের আসতো শুধু ওর সঙ্গে দেখা করতে। তাকে নাকি আর খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না।


_ মানে? সেসব তুই কি করে জানলি?


_ আরে আমি শুনেছি তো। সকালে গুরুমার ঘরে কারা যেন এসেছিল লোকটাকে খুঁজতে, গুরুমা বললো একমাস ধরে ওই লোকটা এখানে আসেনি।


_ এই, গুরুমা মিথ্যে বলবো কেন? কালকেই তো লোকটাকে দেখলাম জেসমিনের ঘরে ঢুকতে।


_ সেটাই তো ভাবছিল। চল চল জেসমিনকে দেখে আসি। ও কিছু জানে কি না।


জেসমিনের ঘরে গিয়ে দেখে জেসমিন ঘরে নেই। সে পালিয়েছে। কিন্তু কোথায়? আর পালালো কি করে? তারমানে ওই লোকটার বুদ্ধি সব, এত দিন ধরে ওর ফন্দি করছিল। সারা কলকাতার অলিগলিতে তাদের সন্ধান করা হলো। কিন্তু কেউ কোথাও নেই।


_ এ বাবু আমরা কোথায় যাচ্ছি রে?


_ শোন আমার তোকে ভালো লাগে, বিয়ে করতে চাই। তোকে ওই নোংরা জায়গায় আর কোনোদিন যেতে হবে না। তুই এবার থেকে আমার সঙ্গে থাকবি। আমরা শিলিগুড়ি যাচ্ছি।


এইগুলো শোনার পর জেসমিন আর কোনো কথা বলেনি। কি বলবে সে জানে না। সে শুধু জানে, এই মানুষটা তার হাত ধরে নোংরা জগৎ থেকে তাকে উদ্ধার করেছে ব্যাস। সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে দুজনে খুব ভালো আছে। ইদানিং জেসমিন অনেক বই পড়ে। মাঝে মধ্যে সাহিত্য রচনা করে। জেসমিন আর সেই জেসমিন নেই। তার নাম হয়েছে নীহারিকা। তার স্বামী অতনু। তাদের একটা ফুটফুটে ছেলে হয়েছে, তার নাম অর্ক, তাকে নিয়েই তার যত ব্যস্ততা। অতীতের কোনো কিছুই তাকে স্পর্শ করে না। 


             (৬)


অতনু, নীহারিকা আর তাদের একমাত্র সন্তান অর্ক। এই ছিল তাদের তিনজনের সংসার। অর্কের দৌড়াদৌড়ি, সারা বাড়ি মাথায় করে রাখা এই নিয়ে মেতে ছিল নীহারিকা। আসতে আসতে সময় এগিয়ে যায়। অর্কও বড়ো হয়। কিন্তু নীহারিকা কদিন ধরেই কিছুটা সমস্যা দেখা দিচ্ছে, কিন্তু সে তো সেসব পাত্তা দেবে না। 


“নিজস্ব সংবাদদাতা: কাল আবার একটা ঘর ভাঙলো, খবর সূত্রে জানা যায় সপরিবারে সকলে বিষ খেয়েছে। কিন্তু কেন! তার উত্তর এখনো জানা যায়নি। প্রতিবেশীরদের মুখে শোনা যায়, কদিন ধরে এই পরিবার খুব শান্ত হয়ে গিয়েছিল। কারুর সঙ্গে কোনো কথা বলছিল না, নিজের মত কাজে যেত আর বাড়ি ফিরতে। সঙ্গে কোনো ঝুট-ঝামেলা ছিল না। স্বামী-স্ত্রী দুজনেই প্রচন্ড প্রাণ খোলা, সকলের সঙ্গে একসময় হেসে খেলে কথা বলতো। কিন্তু বর্তমানে এই পরিবার হঠাৎ করেই নিস্তব্ধতার আড়ালে চলে যায়। তারপর কিছুদিন হলো, সারা পাড়াময় একটা পচা দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছে। পরে সন্ধান করে জানা যায় এটা চ্যাটার্জি বাড়ির ঘটনা।”


পরিবারে তিন জন। স্বামী-স্ত্রী আর সন্তান। মানে নীহারিকা, অতনু, আর অর্ক। রোজকার মতো সেদিনও স্বামী অফিসে গেল, স্ত্রী কোলের সন্তানকে ঘুম পাড়িয়ে ঘরের মধ্যে আপন খেয়ালে কাজ করছিল। দুপুর গড়িয়ে সন্ধ্যে নামলো, ঠিক বিকেল পাঁচটা নাগাদ কলিং বেলের আওয়াজ। দরজা খুলে দেখে এক সুন্দরী মহিলা, কি একটা সাহায্য লাগবে তার যেন। ঠিক আছে, স্ত্রী মহিলাটাকে ঘরের ভেতরে ডাকলো। মহিলা তার সমস্ত কথা শুনল, "বেচারা অসহায় মেয়ে, তার কেউ নেই। কোথায় যে যাবে, তার থেকে ভালো এখানেই থেকে যাক। ঘরের কয়েকটা কাজ করে দেবে আমার হাতে হাতে বা ছোট রিহান কে দেখবে।" ছোট অর্ক অল্পক্ষণের মধ্যে সেই মহিলাটার কাছে নিজেকে মানিয়ে নিয়েছিল। কিছুদিন যাবত এই বাড়িতে একটা ঘটনা ঘটতে দেখা যায়, অর্ক খুব একটা কান্নাকাটি করত না আর দিন দিন শুকিয়ে যাচ্ছিল। অর্ক তার মায়ের কথা না শুনে সেই মহিলাটার কথাই শুনতো, সকাল থেকে শুধু তাকে চাই। দিন যত যেতে লাগলো স্বামীর এই ঘটনাগুলো অদ্ভুত চোখে ঠেকলো। স্বামী-স্ত্রী মিলে তারা একদিন সিদ্ধান্ত নিল, এই মহিলাটা কে বাড়ি থেকে বের করে দেবে। ব্যাস যেমন সিদ্ধান্ত তার তেমন কাজ। কিন্তু লক্ষ্য করা যায় এতে অর্কের শারীরিক অসুস্থতা বেড়ে চলেছে। কি করবে তারা বুঝতে না পেরে সেই মহিলাকে খোঁজার সন্ধান চালায়, কিন্তু খুঁজে পায় না। মহিলার দেওয়া ঠিকানা মত সেই স্থানে একটা শ্মশান।


এই পরিবারে হঠাৎ অকাল নেমে আসে, অর্ককে ডাক্তার দেখিয়ে জানা যায়, তার আনিমিয়া আছে বেশিদিন বাঁচবে না। মনে হলো গলার কাছে একটা কামড়ানোর দাগ, দিনের পর দিন কেউ রক্ত চুষে খেয়েছে। সেই রক্তক্ষরণতায় দুর্বলতার অভাবে সন্তানের মৃত্যুও ঘটতে পারে। স্বামী-স্ত্রীর মাথায় বাজ ভেঙ্গে পরল, ঘটনাটা শুনে দুজনেই হতভম্ব, এই সব কি? কেন? কি করে? আর আমাদের সঙ্গেই কেন? হাসপাতাল থেকে অর্ককে নিয়ে তারা বাড়ি ফিরলো, তাকে দোনলায় শুয়ে দিয়ে নীহারিকা নিজের কাছে ব্যাস্ত হয়ে পড়লো। অর্ক ঘুমাছিল, হঠাৎ উচ্চ স্বরে কেঁদে ওঠে আবার খানিকক্ষনের মধ্যে ভেতর ঘর থেকে অর্কের হাসির ফোয়ারা শোনা যায়। নীহারিকা ভাবলো, হঠাৎ কি হচ্ছে কি ছেলের! সে আবার নিজের কাজে ব্যাস্ত হয়ে পরে। সমস্ত কাজ সেরে ছেলের কাছে এসে দেখো, ছেলে কেমন একটা করছে। চুপ চাপ শুয়ে জানলার দিকে দেখছে, ছেলের মুখের চাপ ধূসর কান্না-হাসি কোনোটাই তার মুখে লেগে নেই। তাকে কোলে নিয়ে আদর করতে যাবে ঠিক সেই সময়, রিহান তার মায়ের গলায় ঝরে কামড় বসিয়ে রক্ত ক্ষেতে লাগে, এক চিকরব আর্তনাদে ফেটে পড়ে সে বলে। অর্ক ঐভাবে নিস্তর হয়ে পরে


দুজনের সেই শ্মশানের কাছে বসে আছে। তারা দুজনেই নিথর শান্ত শব্দহীন। এক ছায়ামূর্তি সুন্দরী মহিলা তাদের দিকে ধীরে ধীরে এগিয়ে আসলো। তাদের সামনেই মাটির ওপর বসে পড়লো। আর বলতে লাগলো আপন মনে একটা গল্প, "আচ্ছা জানেন তো আমার না একটা ছোট্ট মেয়ে ছিল, তার নাম রিমা। আর আমি দেবিকা..." অতনু হঠাৎ চমকে উঠলো এই দেবিকা নামটা তার খুব চেনা। কোথায় যেন পূর্ব পরিচিত এই নামটার সঙ্গে, আর একটা চেনা গন্ধ হালকা মিষ্টি, তাদের দুজনকে ঘিরে ধরেছে। মহিলাটা কিছুক্ষণ থেমে আবার বলতে শুরু করে "আমি যখন গর্ভবতী আমার অজান্তে আমাকে বিষ খাইয়ে মেরে দেয় আমার প্রেমিক, নিজের ভুলে তো সে এই সন্তান কে পৃথিবীতে এনেছে, আর আমার দোষে আমাদের মরতে হয়েছে; সে সুখে ঘর সংসার করছে স্ত্রী ও সন্তানকে নিয়ে আর আমি? আমার দোষ ছিল তাকে শুধু অগাধ বিশ্বাস করা।" মহিলাটা সব কথা বলে ওই নীহারিকা দিকে তাকায়, তারা এতক্ষণে বুঝতে পারে তাদের সন্তানকে কে মেরেছে। নীহারিকার আর্তনাদ চিৎকারে ফেটে পড়ে চারিপাশ, কাঁদো কাঁদো স্বরে বলে "এতে তো আমার আর আমার সন্তানের কোন দোষ ছিল না সে তো নির্দোষ"। মহিলাটা আবার ঠান্ডা গলায় বলে ওঠে, "এখানে তো আমাদেরও কোন দোষ ছিল না আমার সন্তান হতো নির্দোষ।" দুজনেই একসঙ্গে অতনুর দিকে তাকিয়ে বলে ওঠে, "তাহলে দোষটা কার?" 


দোষটা বিশ্বাসের, দোষটা আশ্রয়ের, দোষটা ভরসার, দোষটা ভালোবাসার। অতনু আর নীহারিকা দুজনে বাড়ি চলে যায় তারা একে অপরের সঙ্গে কোন কথা বলে না। নীহারিকা নিজের দায়িত্ব ও কর্তব্য পালন করে অতনুর যত্ন করে, খেয়াল রাখে, সবকিছু পরেও। প্রতিদিন অফিসে যায়, সঠিক সময় বাড়ি ফেরে, রাতে একসঙ্গে খেতে বসে। প্রতিদিন একটা মিথ্যে সংসারে যাপন হয়। নীহারিকা তার সন্তানের জন্মদিনে পায়েশ রান্না করে, অতিথি রূপে সেই মহিলাটাকে আমন্ত্রণ করে। স্বামী অফিস থেকে ফিরে হতবাক। চুপচাপ সেই পায়েস খেয়ে নিজের ঘরে চলে যায়, নীহারিকাও সেই পায়েস খায়, কিছুক্ষণ পরে তাদের গলা-বুক জ্বলে যায়। যখন চোখের কোণে ধোঁয়াশা লক্ষ্য করে, তখন তারা দেখে তাদের ঘরময় সেই মহিলাটা একটা শিশুকে কোলে নিয়ে বসে আছে। যত সেই মহিলাটার কাছে যায় তারা দেখতে পায়, তাদের সন্তানের গলায় সে কামড় দিয়ে রক্ত চুষছে। কিন্তু তাদের দুজনেরই আর কিছু করার থাকে না। আস্তে আস্তে তারা চিরনিদ্রায় ঘুমিয়ে পড়ে। 


একটা ঘুম, অনেক কিছু কেড়ে নিতে পারে। পৃথিবীর সবকিছু একমুহূর্তে বদলে দিতে পারে। সত্যি আর মিথ্যের মধ্যে দেওয়াল তুলে দিতে পারে। সোনাগাছির জেসমিনকে মনে আছে আপনাদের। ওই অন্ধকার গলিতে তার জীবন চলা। কথায় আছে, জীবন তো চলে না তা চালাতে হয়। জেসমিনের নতুন নাম কি, তা আপনাদের মনে থাকারই কথা। আর ওই যে ঐ লোকটা যে জেসমিনকে বিয়ে করল। তার নাম কি মনে আছে তো? তার নাম হচ্ছে অতনু, সে না খুব সুন্দর করে গুছিয়ে গল্প বলতে পারে। যে গল্পের মাধুর্যে লুকিয়ে থাকে কল্পনা, যা মাঝেমধ্যেই সত্যি হয়ে ওঠে। কিন্তু কতটা সত্যি তা কেউ কখনো জানে না। ৬ ফুটের উচ্চতার মানুষটা, দেখতে খুব সাধারণ গোছের। আহামরি কোনো বিলাসিতার বালাই তার মধ্যে নেই, আর কোনো দিন ছিলও না। জেসমিনের ঘরে প্রতিদিন নতুন নতুন খদ্দের আসে। সবার নাম-ধাম তো মনে রাখা যায় না। কিন্তু এই অতনু লোকটা তাকে খুব সুন্দর সুন্দর গল্প বলতো। সেই গল্পের মধ্যে অনেক কিছুই হত। কখনো তারা হাত ধরা ধরি করে প্রেম করত, কখনো বা চুটিয়ে সংসার। কিন্তু আপনারাই বলুন বেশ্যাদের সংসার হয়?


              (৭)


_ অর্ক এই অর্ক, কানে কথা যাচ্ছে না কখন থেকে তো দেখছি।


_ হ্যাঁ মা আসছি।


_ কি করছিলি কি তুই? একবার ডাকলে কথা শোনা যায় না। 


_ বলো এসেছি তো। 


_ যা বাবাকে ডাক,


_ সেটা বললেই হয়। এতক্ষণ নাটক না করে।


_ দিন দিন তুমি উচ্ছন্নে যাচ্ছ। মায়ের সঙ্গে এই ব্যাবহার কে করে।


_ সকাল থেকে দুজনে চিৎকার করছে। কি হলো কি ( অতনু বলে) 


ব্যাস এবার সবাই শান্ত। কেউ কোনো কথা বলে না। এক সংসার করতে গেলে মাঝে মধ্যে একটু ঠোকা ঠুকি তো লাগবেই। তবে তাদের মধ্যে কখনো কখনো প্রেম টাও জমে উঠতো। এই তো সেদিন, নীহারিকা রান্না করছিল তার পর যা হলো, প্রথমটা কিছুটা বিষণ্নতা ঘিরে কিন্তু তারপর…


_ মনখারাপ? ( নীহারিকা প্রশ্ন করে)


_ না তো।


_ আজ অফিস গেলে না কেন?


_ এমনি, তোমার কাছে থাকতে ইচ্ছা হলো তাই।


_ ও তাই বুঝি...?


_ হ্যাঁ গো তাই।


_ তা কি করবে সারাদিন?


_ কেন! তোমার বিশ্রাম দেবো…


_ ঠিক আছে, তবে আজ রান্নাটা তুমি করো।


_ ওরে বাবা রে, আবার রা… রান্না… কেন?


_ ভয় পেলে তো…


_ ঠিক আছে ঠিক আছে আমি করছি।


_ তা কি করবে শুনি?


_ সেসব বলবো কেন,

যা করবো তাই খেতে হবে কিন্তু...


এই বলে অতনু রান্না ঘরে চলে গেল রান্না করতে। সেই ফাঁকে নীহারিকা ঘরের অন্যকাজগুলো করে নিতে লাগলো। দুজনে দুজনের মত খুব ব্যস্ত। ঘর গোছাতে গিয়ে হঠাৎ নীহারিকা চোখ পড়লো, কিছু পুরোনো ডাইরির ওপর। নীহারিকা যখন ছোট ছিল তার বাবা তাকে, প্রতি বছর অফিসের পুরোনো ডাইরিগুলো এনে দিত। অত ডাইরি পেয়ে, নীহারিকা তো তখন বেজায় খুশি। হয়তো তার অজান্তে সে প্রথম লেখালিখির হাতেখড়ি বাবার 

থেকেই পেয়েছে। নীহারিকা চাকরির ৫ বছর হয়েগেছে, সে চন্দননগরের একটা সরকারি কলেজে পড়ায়। পড়াতে তার ভালোই লাগে, তার থেকেও বেশি ভালো লাগে বই নিয়ে থাকতে। তাদের ঘরে ১০০০ এর বেশি বই। লোকে বলে প্রেম কিংবা বিয়ে করলে নাকি বইপড়ার শখ কমে যায়, কিন্তু তাদের ক্ষেত্রে বরং এর উল্টোটাই প্রযোজ্য।


নীহারিকা কোনো দিন অতনুকে বলেনি। সে তাকে কতটা ভালোবাসে। অতনুও কোনোদিন জানতে চায়নি। তারা একে অপরের অভ্যাসে বিরাজ করে, সব বিপদে সঙ্গে থাকে। নীহারিকা অতনুর মধ্যে তার বাবার ছায়া দেখতে পেয়েছিল। মানুষটা কেমন বাবার মত। জ্বর আসলে জলপট্টি দেয়, মাথায় হাত বুলিয়ে ঘুম পাড়িয়ে দেয়। ওষুধ খাইয়ে দেয়, ভাত মেখে নিজের হাতে খাওয়ায়। আর নীহারিকা যদি খেতে না চায়, তবে কত ভুলিয়ে ভালিয়ে তাকে খাওয়াতে হয়।অতনু না নীহারিকা কে অফিস ফেরত কত পুরোনো ডাইরি এনে দেয়, ঠিক তার বাবার মত। নীহারিকার আবার নতুন ডাইরি খুব একটা পছন্দ না। তার মন আটকে থাকে সাল পেরিয়ে যাওয়া সেই পুরোনো ডাইরির দিকে। সেই পুরোনো স্মৃতির দিকে।


_ কি হলো। আমার রান্না তৈরি তো, তাড়াতাড়ি চলে এসো…


_ হ্যাঁ, আসছি।


নীহারিকা রান্না ঘরে গিয়ে তো পুরো অবাক, কত কিছু রান্না করেছে বাবা রে। এই অল্প সময়ে কি করে পারল। বাসন্তী পোলাও, কাশ্মীরি আলুর দম, বেগুনি আর পায়েস।


_ এইগুলো তুমি করেছ?


_ ধ্যের নানা আমি রান্না পারি নাকি…


_ কোন হোটেলের এইখাবারগুলো?


_ তোমার বরের হোটেলের…


_ আরে বাবা, তুমি আর এত কিছু!


_ ভাবছি চাকরিটা ছেড়ে দেবো বুঝলে,


_ কেন? কিছু হয়েছে নাকি?


_ প্রতিদিন তোমাকে সুন্দর সুন্দর রান্না করে খাওয়াতে হবে তো নাকি?


দুজনের হেসে ওঠে। তাদের ছোট সংসার, কিন্তু সদস্য সংখ্যা অনেক। নীহারিকা, অতনু আর অনেক অনেক বই। এই বইয়ের মাঝে তারা প্রতিদিন নতুন করে হারিয়ে যায়।


অতনু খুব ক্লান্ত, নীহারিকা একটা বই পড়ছিল। অতনু হঠাৎ তার কোলে মাথা দিয়ে শুয়ে পড়ে। নীহারিকা অতনুর মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে থাকে। দুজনে দুজনের চোখের দিকে তাকিয়ে, কেউ কোনো কথা বলছে না। বাইরে মনে হয় মেঘ করেছে। তবে আজকের মেঘটা মনখারাপের না বরং ভালোবাসার। কিন্তু সব ভালোবাসা তো পরিণতি পায় না, আবার সব পরিণতির মধ্যে ভালোবাসা থাকে না। 


৮)


নীহারিকার নতুন বই লেখার কাজ সবেমাত্র শুরু করেছে, কি লিখবে সাত পাঁচ ভাবতে ভাবতেই দিনরাত শেষ হয়ে যাচ্ছে। আপন মনেই সে বলতে থাকলো; “আচ্ছা, একটা প্রেমের গল্প লিখলে কেমন হয়? ধ্যের, আবার সেই ন্যাকা রোম্যান্স! মানুষ আজকাল এসব খায় না। তাহলে, সামনে কি কোনো উৎসব আছে? সেই নিয়ে লিখলে কেমন হয়? ধুর, এই সময় সেটাও বড্ড পুরনো হয়েগেছে। তাহলে আর কী বাকি আছে?” 


এইসব ভাবতে ভাবতেই টেবিলে মাথা রেখে সে চোখটা বন্ধ করে। তার ঘুমটা হঠাৎ ভেঙে যায়, নীহারিকা দেখে সে ডাইরিতে একটা দাগও কাটেনি। মনে হল বিছানায় শুয়ে কি যেন একটা স্বপ্ন দেখছে, আচ্ছা সেই স্বপ্নের কথা লিখলে কেমন হয়? কি অদ্ভুত আর বাজে স্বপ্নটা। যাই তবে লেখাটা শুরু করে দেই। 


দমদম মেট্রো স্টেশন, প্রচন্ড ভিড় দেখে বোঝা যাচ্ছে অফিস টাইম। তড়িঘড়ি করে সে মেট্রোতে উঠলো। নীহারিকা জানে তাকে যেতে হবে একদম শেষ স্টেশন 'কবি সুভাষ' -এ একটা কাজের জন্য। আপন ছন্দে মেট্রোতে উঠে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে ছিল, কিছুক্ষন পর একটি বসার জায়গা পেল। পাশে বসা এক ভদ্রলোক ফোনে খবর দেখছিলেন, সেই খবরের কিছু ছেঁড়া ছেঁড়া কথা নীহারিকার কানে পৌঁছালো। শব্দগুলো এইরকম, "ব্যস্ততম... আবার খুন...পরিচিত কেউ... ৫২ টুকরো... নিজের স্ত্রীকে" সে কিছুটা ঘাবড়ে নড়ে চড়ে বসলো, মানেটা কি! আজকাল কি সব বাজে কথা যে বলে না খবরে। চোখটা তার হালকা লেগে গিয়েছিল, যখন চোখ খুলল তখন দেখে সে শেষ মেট্রো স্টেশনে মেট্রোটা দাঁড়িয়ে। শেষ স্টেশন বলে প্রায় খুব কম জনই এখানে নামবে। স্টেশন থেকে বাইরে বেরিয়ে, সে আপন মনে হাটা লাগালো। সোজা গিয়ে ডান দিকে প্রায় কুড়ি পা মত, তারপর একটা মিষ্টির দোকানের পাশ থেকে যে গলিটা চলে যাচ্ছে সেখান থেকে বাঁ দিকে একদম শেষ বাড়িটা। 


বাড়িটার সামনে দাঁড়িয়ে সে আপাদ-মস্তক দেখলো, কেমন জানি একটা। কোন যত্ন নেই বাড়িটার, একদিক দিয়ে সিমেন্ট খসে পড়ছে, অন্যদিকে আগাছায় বাড়িময় অন্ধকার। কলিং বেল বাজাতেই এক ভদ্রলোক হাসিমুখে দরজা খুলে দিল। পাশে তার বয়স্ক মাও ছিলেন, দুজনে বেশ ভালো অতিথি আপ্যায়ন করলেন অহনের। ঘরের ভেতরে কেমন স্যাতসাঁতে মনে হয় বহুদিন এখানে কেউ পা রাখেনি। একটা গুমোট বাজে গন্ধ চারিদিকে, কেমন একটা মাংস পচা গন্ধ। সদর দরজা ঠিক ডান দিকে, রান্নাঘর তার পাশে বাথরুম; বাথরুমের পাশে একটা বেসিন, তার সামনে সূর্যমুখী আয়না রাখা। বোঝাই যাচ্ছে আয়নাটা বহুদিন কেউ পরিষ্কার করেনি। ভেতরের দিকে পাশাপাশি দুটো ঘর, শুনলাম একটা তার মায়ের ও আরেকটা ছেলের। চারিদিকে নানা দেশি-বিদেশি বই ছড়ানো। আর এদিক-ওদিক না তাকিয়ে শান্ত হয়ে অহন সোফায় বসলো। মনে মনে ভাবতে লাগলো ভদ্রলোকের সঙ্গে কাজের কথাটা সেরে ফেলি তাড়াতাড়ি, আবার তো সেই জমের দুয়ারে, মানে বাড়ি যেতে হবে। আরে এ তো মুশকিলে পড়া গেল। কাজের কথা কিছু বলতে গেলেই ভদ্রলোক বলছেন, "এই ভর দুপুর বেলায় এসেছো আগে কিছু খেয়ে নাও তারপর হবে কাজের কথা"। নীহারিকা ভাবল, "বেশ ভালোই হলো বড্ড খিদে পেয়েছিল" আর কোন কথা বাড়ালো না, চুপচাপ ভালো মেয়ের মতো খেতে বসে গেল। কারণ সেই লোকটির মা, অর্থাৎ মহিলাটি বড্ড ভালো। 


মহিলাটি খাবার প্লেট নিয়ে নীহারিকার দিকে এগিয়ে যাচ্ছেন। তিনি বলতে শুরু করলেন, একদম সামান্য আয়োজন, মেনুতে রয়েছে… ভাত, ডাল, বেগুন ভাঁজা, মাংস, চাটনি। মাংসটা যখন নীহারিকা খাচ্ছে, মনে হলো ঘরময় একটা বাজে দুর্গন্ধ তার নাক বন্ধ করে দিচ্ছে। সে মাংসের একটা পিস হাতে তুলল, খাবার টেবিলে ঠিক সোজাসুজি টিভি, টিভিটা চলছে। টিভিতে এখন চলছে আজকের দিনে খবর, "শহরে ঘুরে বেড়াচ্ছে এক সাইকো ছেলে এবং তার মা, ছেলেটি তার নিজের স্ত্রীকে ৫২ টুকরো করে কলকাতা শহরের এ প্রান্তে ও প্রান্তে ফেলে এসেছে। আপনারা সকলে সাবধানে থাকবেন, কখন কি হয়ে যায় বলা মুশকিল, হয়তো খুনি আপনার পাশে বসে টিভি দেখছে, কিংবা হয়তো রান্না ঘরে রান্না করছে। হয়তো আপনাকে সেই মাংসের পিস রান্না করে খাওয়াচ্ছে, খুনগুলো করা হয়েছে নিজ বাসভবন 'কবি সুভাষ' মেট্রো স্টেশন থেকে খানিকটা দূরে" খবরে এসব শুনে অহনের হাত থেকে মাংসটা থালায় পড়ে যায়। সে ব্যক্তিকে হতভম্বের মতো তাকিয়ে আছে, কোন কথা বলে না, একদম চুপ। মনে মনে ভাবতে থাকে খবরেতে এও শুনলাম খুনি নাকি এক ছেলে ও তার মা। আর এলাকাও নাকি এই এলাকাটা, এখন আমি যেখানে আছি, তার মানে...! ভদ্রলোক আমার মুখটা দেখে বুঝতে পারে সঙ্গে সঙ্গে টিভিটা অফ করে দেয়, ভদ্রলোকের মা একটা ধারালো ছুড়ি আমার দিকে এগিয়ে আনে, বলতে থাকে, "তোমরা কাজ করো আমি কিছু মাংসের পকোড়া বানিয়ে আনছি"। নীহারিকা হঠাৎ করে চিৎকার করে বলে ওঠে "আমি বাড়ি যাবো"। মহিলা ও ছেলের দুজনের মাথাটা হঠাৎ করেই গরম হয়ে যায়, নীহারিকা চুপ হয়ে এক জায়গায় বসে আছে, মহিলা সেই ধারালো ছুড়িটা নিয়ে তার কাছে এগিয়ে আসছে, নীহারিকা চিৎকার করতে যাবে কিন্তু সে চিৎকার করতে পারছে না। খানিকের জন্য লক্ষ্য করে সেই লোকটার হাতেও একটা ধারালো ছুড়ি। দুজনে ক্রমশ তার দিকে এগিয়ে আসছে, সে কি করবে বুঝতে পারে না, তার হাত-পা চেয়ার এর সঙ্গে বাধা। ছেলেটা আস্তে আস্তে ছুড়িটা নীহারিকা গলায় ধরে, মহিলার অপর হাতে মাংস কাটার আর একটা ছুরি। অহন ক্রমশ চিৎকার করছে কিন্তু সে পারছে না, তার গলার কাছে কিছু একটা আটকে আছে। সেই ছেলেটা বলে ওঠে, "এবার তোর ৫২ টুকরো হবে"। 


নীহারিকার হঠাৎ ঘুমটা ভেঙে যায়, সে মাথাটা তুলে দেখে নিজের ঘরে পড়ার টেবিলে বসে। সেই মুহূর্তে নিজেকে প্রশ্ন করে "তার মানে এইসব স্বপ্ন ছিল?"। খানিকক্ষণ এর মধ্যে আবার দেখে, সে বিছানায় শুয়ে, মাথার ওপর এক অদ্ভুত ছায়ামূর্তি, তার দিকে তাকিয়ে বসে আছে। চারিদিকটা কালো অন্ধকারে পরিপূর্ণ হয়ে গেল, আরও কিছু ছায়া মূর্তি তার জানলা ঠিক সামনে দাঁড়িয়ে। নীহারিকা ভয়ে আবার একটা জোরে চিৎকার করে উঠলো। ওরা এগিয়ে আসছে নিহারিকাকে মারতে, নীহারিকা কি করবে বুঝতে না পেরে, খাটের ঠিক পাশে হাতের সামনে ফল কাটা ছুড়িটা নিয়ে নিজের গলায় চালিয়ে দেয়। নীহারিকার নিরব শরীরটা খাটের ওপর এলিয়ে পড়েছে, সেই রক্ত বিছানাসহ সারা ঘরময়। তার পাশে রাখা ডায়েরিটা রক্তে রাঙা হয়ে গেছে, ডাইরিতে লেখা "শেষ পান্ডুলিপি"।


              (৯)        

                           

একমাত্র ঘুমই পারে, সারাদিনের ক্লান্তি সব দূর করে দিতে। নিয়ে যেতে পারে এক গভীর স্বপ্নের দেশে। যে ঘুমের মধ্যে কেবল বিরাজ করে একরাশ স্বপ্ন। আবার সেই স্বপ্নের মধ্যে লুকিয়ে থাকে, কত ছোট ছোট ঘটনা ও চরিত্র। 


মন- মনন- মনস্তত্ত্ব এর আবিষ্কারক সিগমুন্ড ফ্রয়েড। মনোবিজ্ঞানের সাইকোডাইনামিক পদ্ধতির প্রতিষ্ঠাতা হিসাবে তিনি বিবেচিত; যা মানুষের আচরণ ব্যাখ্যা করার জন্য অচেতন ড্রাইভের দিকে দেখায় । ফ্রয়েড বিশ্বাস করতেন যে মন মানসিক চালনার ভিত্তিতে সচেতন এবং অচেতন উভয় সিদ্ধান্তের জন্য দায়ী। তিনি বিশ্বাস করতেন যে, লোকেরা "[তাদের] নিজের মনের নাটকে কেবল অভিনেতা, আকাঙ্ক্ষা দ্বারা ধাক্কা দেওয়া, কাকতালীয়ভাবে টানা। 


এটি ফ্রয়েড 1901 সালে লিখেছিলেন এবং এটি মনোবিশ্লেষণ তত্ত্বের ভিত্তি স্থাপন করেছিল। বইটিতে নাম, শৈশবের স্মৃতি, ভুল, আনাড়ি, জিভের স্খলন এবং অচেতনের নির্ণয়ের মতো বিষয়গুলি ভুলে যাওয়ার বারোটি অধ্যায় রয়েছে। ফ্রয়েড বিশ্বাস করতেন যে এমন কিছু কারণ রয়েছে যা লোকেরা শব্দ, নাম এবং স্মৃতির মতো জিনিসগুলি ভুলে যায়। তিনি আরও বিশ্বাস করতেন যে বক্তৃতায় ভুলগুলি, যা এখন ফ্রয়েডিয়ান স্লিপ হিসাবে উল্লেখ করা হয় , দুর্ঘটনা নয় বরং "গতিশীল অচেতন" অর্থপূর্ণ কিছু প্রকাশ করে।

ফ্রয়েড পরামর্শ দিয়েছিলেন যে আমাদের প্রতিদিনের সাইকোপ্যাথলজি হল মানসিক জীবনের একটি ছোটখাটো ব্যাঘাত যা দ্রুত চলে যেতে পারে। ফ্রয়েড বিশ্বাস করতেন এই সমস্ত কাজগুলির একটি গুরুত্বপূর্ণ তাৎপর্য রয়েছে; জিভ বা কলমের সবচেয়ে তুচ্ছ স্লিপগুলি মানুষের গোপন অনুভূতি এবং কল্পনা প্রকাশ করতে পারে। প্যাথলজি দৈনন্দিন জীবনে আনা হয় যা ফ্রয়েড স্বপ্ন, বিস্মৃতি এবং প্যারাপ্র্যাক্সের মাধ্যমে নির্দেশ করেছিলেন। তিনি এই জিনিসগুলি ব্যবহার করেছিলেন একটি অচেতনের অস্তিত্বের জন্য তার কেস তৈরি করতে যা চেতনা দ্বারা ব্যাখ্যা করা বা ধারণ করতে অস্বীকার করে । ফ্রয়েড ব্যাখ্যা করেছেন যে কীভাবে আমাদের দৈনন্দিন জীবনে একাধিক ঘটনা ভুলে যাওয়া দমন, দমন, অস্বীকার, স্থানচ্যুতি এবং সনাক্তকরণের পরিণতি হতে পারে। 


স্বপ্নের ব্যাখ্যা সিগমুন্ড ফ্রয়েডের সবচেয়ে পরিচিত প্রকাশিত রচনাগুলির মধ্যে একটি। এটি তার মনোবিশ্লেষণমূলক কাজ এবং স্বপ্নের ব্যাখ্যার বিষয়ে অচেতনের প্রতি ফ্রয়েডের দৃষ্টিভঙ্গির মঞ্চ তৈরি করে। রোগীদের সাথে থেরাপি সেশনের সময়, ফ্রয়েড তার রোগীদের তাদের মনে কী ছিল তা নিয়ে আলোচনা করতে বলবেন। প্রায়শই, প্রতিক্রিয়াগুলি সরাসরি একটি স্বপ্নের সাথে সম্পর্কিত ছিল। [১৩] ফলস্বরূপ, ফ্রয়েড স্বপ্নের বিশ্লেষণ করতে শুরু করেন এই বিশ্বাস করে যে এটি তাকে গভীরতম চিন্তায় প্রবেশ করতে দেয়। উপরন্তু, তিনি একজনের বর্তমান হিস্টেরিক্যাল আচরণ এবং অতীতের আঘাতমূলক অভিজ্ঞতার মধ্যে লিঙ্ক খুঁজে পেতে সক্ষম হন। এই অভিজ্ঞতাগুলি থেকে, তিনি একটি বই লিখতে শুরু করেছিলেন যা অন্যদের স্বপ্নের ব্যাখ্যা বুঝতে সাহায্য করার জন্য ডিজাইন করা হয়েছিল। বইটিতে তিনি তার অচেতন তত্ত্ব নিয়ে আলোচনা করেছেন।

ফ্রয়েড বিশ্বাস করতেন যে স্বপ্নগুলি অচেতন মুখোশের বার্তা যা অভ্যন্তরীণ উদ্দীপনা দ্বারা নিয়ন্ত্রিত ইচ্ছা হিসাবে। স্বপ্নের ব্যাখ্যায় অচেতন মন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। ঘুমের অবস্থায় থাকার জন্য, অচেতন মনকে নেতিবাচক চিন্তাগুলিকে আটকে রাখতে হবে এবং যে কোনও সম্পাদিত আকারে তাদের উপস্থাপন করতে হবে। অতএব, যখন কেউ স্বপ্ন দেখে তখন অচেতন দ্বন্দ্ব মোকাবেলা করার চেষ্টা করে। এটা তাদের উপর কাজ শুরু করতে সক্ষম হবে.

সুপ্ত বা অচেতন চিন্তা থেকে স্বপ্নকে প্রকাশ্য বিষয়বস্তুতে রূপান্তর করতে চারটি ধাপ প্রয়োজন। সেগুলি হল ঘনীভবন, স্থানচ্যুতি, প্রতীকবাদ এবং গৌণ সংশোধন। ধারণাগুলি প্রথমে ঘনীভবনের একটি প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যায় যা চিন্তাগুলিকে গ্রহণ করে এবং সেগুলিকে একটি একক চিত্রে পরিণত করে। তারপর, স্বপ্নের প্রকৃত আবেগগত অর্থ স্থানচ্যুতির একটি উপাদানে তার তাত্পর্য হারায়। এর পরে প্রতীকবাদ চাক্ষুষ আকারে আমাদের সুপ্ত চিন্তার প্রতিনিধিত্ব করে। স্বপ্নের ব্যাখ্যায় প্রতীকবাদের উপর বিশেষ জোর দেওয়া হয়েছিল। 


আমাদের স্বপ্নগুলি একটি অন্তর্নিহিত নীতির অর্থ সহ অত্যন্ত প্রতীকী। সিম্বলিক পর্যায়গুলির অনেকগুলি যৌন সংজ্ঞার উপর ফোকাস করে। উদাহরণস্বরূপ, একটি গাছের শাখা একটি লিঙ্গ প্রতিনিধিত্ব করতে পারে। ফ্রয়েড বিশ্বাস করতেন যে সমস্ত মানুষের আচরণ আমাদের যৌন চালনা এবং আকাঙ্ক্ষা থেকে উদ্ভূত হয়েছে। স্বপ্নকে রূপান্তরের শেষ পর্যায়ে রূপান্তরিত বিষয়বস্তুতে স্বপ্নকে বুদ্ধিমান করা হয়। ম্যানিফেস্ট কন্টেন্টের চূড়ান্ত পণ্য যা আমরা আমাদের ঘুম থেকে বেরিয়ে আসার সময় মনে রাখি।

            ( ১০)

ইনসোমেনিয়ার ঘোর কাটেনি এখনো, ভিন্ন ধরনের বিষন্নতা ঘিরেছে চোখের পাতায়। ঘুমের দৃঢ়তা ও গলার স্বরও ক্রমশ কমে আসছে। নিজের চারিপাশটা অনেকটা শান্ত, কেবল নীরবতার আর্তনাদে তীব্রতা বৃদ্ধি পাচ্ছে। জলের স্বচ্ছতাকে ঠিক চোখের মত, তবুও আকাশ মানে না শত মন খারাপে। শীতের আমেজ ঘিরে ধরেছে, উষ্ণতার হাতছানি দেয় দূরের আলো, যা ধরতে গেলে কেবল নিজেকে পোড়ায়। 


হাওয়ার একটা নিজস্ব গন্ধ হয়, প্রতিটা জায়গার হাওয়ার একে অপরের থেকে আলাদা। এই যেমন বাড়ির ছাদের হাওয়া, ধুলোমাখা রাস্তার হাওয়া, বারান্দার হাওয়া, গঙ্গার হাওয়া, সমুদ্রের হাওয়া, শ্মশানের হাওয়া, এবং প্রিয় মানুষ ছেড়ে যাওয়ার ঠিক পরক্ষনে এক হালকা শীতল দমকা হাওয়া, যা কেবল অনুভবকারী-কে ভেতর থেকে শুন্য করে দেয়। 


আমরা সকলে বাঁচার আসায় মৃত্যু রেখা বরাবর হেটে চলেছি, এক চিলতে নিজের মত বাঁচবো বলে। ধর্ম নিরীপেক্ষ অর্থবান শহরে, মানুষ কেবল ভালোবাসার জন্য আর্তনাদ করে। খুব নীরবে আঁকড়ে ধরতে চাই একটা ভরসার হাত, খুব নীরবে বিশ্রাম নিতে চাই একটা ভরসার কাঁধে। চারিদিকের শোরগোল থেকে অনেকটা দূরে পালাতে চায়, একা একদম একা।


জেসমিনের কঠিন আসুক করেছে। সে ওই অন্ধকার গলির কোনো এক ঘরের মধ্যে বন্ধ। নিজেকে প্রতিদিন সুন্দর করে সাজিয়ে তোলে, তবে কারুর বিছানায় যাওয়ার জন্য না বরং সংসার করার জন্য, স্বপ্ন দেখার জন্য। স্বপ্ন ও বাস্তব একে অপরের সমানুপাতিক সম্পর্কে আছে। যে লোকটা তার কাছে রোজ আসলো, গত তিনমাস আগে সে তার খুন করেছে। কারণ সে তাকে অন্য কারুর হতে দেবে না বলে। 


ওই মৃত ব্যক্তিকে নিয়ে প্রায় এক সপ্তাহ নাকি ওই ঘরে নিজেকে সে বন্ধ করে রেখেছিল। পরে সকলের ডাকাডাকি, পচা গন্ধ্যে ব্যাপারটা সকলের কাছে জানাজানি হয়। ওই ব্যক্তি যখন আসতো, তখন জেসমিনকে গল্প শোনাত, সেই গল্পের মধ্যে তারা ছিল। কখনো কখনো সে একাও ছিল। জেসমিন ওই গল্পের চরিত্রগুলোকে কল্পনা করতে করতে কখন সে নীহারিকায় পরিণত হয়, সে নিজেও জানে না। 


                সমাপ্ত


Rate this content
Log in

Similar bengali story from Action