Participate in the 3rd Season of STORYMIRROR SCHOOLS WRITING COMPETITION - the BIGGEST Writing Competition in India for School Students & Teachers and win a 2N/3D holiday trip from Club Mahindra
Participate in the 3rd Season of STORYMIRROR SCHOOLS WRITING COMPETITION - the BIGGEST Writing Competition in India for School Students & Teachers and win a 2N/3D holiday trip from Club Mahindra

Sipra Debnath

Horror Classics Fantasy


4.5  

Sipra Debnath

Horror Classics Fantasy


নৈনিতালের পরিত্যক্ত বাড়ি

নৈনিতালের পরিত্যক্ত বাড়ি

10 mins 428 10 mins 428


***নৈনিতালের পরিত্যক্ত বাড়ি***


বাড়িটি দেখে বেশ ভালো লাগলো। মোহাময়ী পরিবেশ, চিত্তাকর্ষক চারপাশ ঘেরা বাগান।

তবে ফল ফুল গাছের তুলনায় বড়োসড়ো গাছের সংখ্যাই বেশি। ব্যাডমিন্টন খেলার একটি কোর্ট রয়েছে। ফোয়ারা থাকে রঙিন জল পরছে। বাগানের ভেতরে ভেতরে ইটের মোজাক করা সরু রাস্তা বাঁধাই করা।

তিনতলা বাড়ি টির উপর তলায় একটি ঘর রয়েছে। বাকি ছাদের মধ্যে এক দোলনাও ঝুলছে। যদিও খুব একটা ফ্যাশনেবল নয় বাড়িটি তবে সেকেলেও বলা চলে না। একটা মার্জিত ভাব রয়েছে। দেখে মনেই হচ্ছে না যে বাড়িটা অনেক পুরনো। বাড়ির দেয়ালে কোথাও কোন চিড় ধরেনি কিংবা বটের ঝুরি ও গেড়ে বসেনি। অথচ কেন জানিনা বাড়িখানা বেশ রহস্যময় মনে হচ্ছে। একবারের জন্য ভাবলাম হয়তো বাগানজুড়ে মস্ত গাছগুলি বাড়ির মাথা ছাড়িয়ে উঠে ছায়া স্নিগ্ধ শান্ত পরিবেশ রচনা করেছে বলে একটি রহস্যময় আবহের সৃষ্টি হয়েছে। খুব আকর্ষণীয় লাগছে। রহস্য ব্যাপারটা বড্ড রোমাঞ্চকর। মনে মনে একটি অজানা খুশি অনুভব করছি কেননা শিশুকাল থেকেই আমি এসব ভালোবাসি।

নৈনিতাল স্বাস্থ্যকর জায়গা। চিকিৎসক জেঠুকে বায়ু পরিবর্তনের জন্য নৈনিতাল এর নামটা সাজেস্ট করেছিলেন। সাথে বাবা আর আমি।আমাদের ড্রাইভার কাঞ্চনদা বাড়িটা খুঁজে পেতে সাহায্য করেছে। বাড়িটা ভাড়াতে পেয়ে গেলে সে আবার গাড়ি নিয়ে বাড়ি ফিরে যাবে আমাদের এখানে রেখে। অর্থাৎ বাবা জেঠু আর আমি এখানে থাকবো কিছুদিনের জন্য। তারপর কাঞ্চন দা এসে আবার নিয়ে যাবে।


  কাঞ্চন দা বাড়ির সদর দরজার দিকে উদ্দেশ্য করে ডাকলো কেউ আছেন? শুনছেন? একটু বাইরে আসুন....

  কিছুক্ষণ অতিবাহিত হয়ে যাবার পর বাড়ির ভেতর থেকে একজন বৃদ্ধ লোক বেরিয়ে এলো। তাকে দেখে বোঝার জো নেই যে সেকি ঘরের মালিক বা কেয়ারটেকার। তার চেহারা দেখে সে কেমন ধরনের লোক কিছুই নির্ধারণ করা যাচ্ছে না। মাথায় সাদা ধবধবে চুল সাধারণের চাইতে অনেকটা বড়। বয়সের ভারে ন্যুব্জ হয়ে পড়েছে। কাঁধে একখানি আধময়লা গামছা।হাতে লাঠি নিয়ে ঠকঠক করে কাঁপতে কাঁপতে আমাদের সামনে এসে হাজির হলো। তার চলন ভঙ্গিতে একটা অসাধারণ ক্ষিপ্রতা দেখে আমাদের মধ্যে কারো কিছু মনে হয়েছিল কিনা জানিনা তবে আমি খুব আশ্চর্য বোধ করছিলাম। আমার মাথার ভিতরে কতগুলো প্রশ্ন খেলে গেল।

  ওই বৃদ্ধ লোক অত্যন্ত ক্ষিপ্রতার সঙ্গে জিজ্ঞেস করল---

  "কে আপনারা? কি চাই এখানে?"

কাঞ্চন দা বলল---

দেখলাম সামনের গেটের উপর লেখা রয়েছে

"To Let"তাই আর কি--

"আমরা কি বাড়িটি ভাড়া পেতে পারি?"

এতক্ষণ বৃদ্ধ লোকটি মাথা নিচু করেই কথা বলছিল যদিও কাঞ্চন দার কথা শুনে হঠাৎই সে মুখ তুলে তাকালো। লোকটার চোখ দুটো দেখাই যাচ্ছিলোনা প্রায়। তার ঝুলন্ত দুই ভ্রুর নীচে চোখ দুটো ঢাকা পড়ে আছে। এছাড়াও চক্ষু দুটি কেমন যেন অন্ধকার গর্তে ঢোকানো মত।কাঞ্চন দার কথা শুনে আচমকাই তার কোটর গত দুই চক্ষু দুটি 200 ভোল্ট এর বাল্বের মত চকচক করে জ্বলে উঠলো। চেহারায় খুশির ঝলক খেলে গিয়ে মুহূর্তেই মিলিয়ে গেল। মনে হল লোকটা যেন সাক্ষাৎ শয়তান!

মুখখানি নামিয়ে নিয়ে লোকটি বলল---

"বাড়িটি ভাড়া নিতে চাইছেন? ঠিক আছে ঠিক আছে, বেশ বেশ।"

কাঞ্চন দা বলল--

"বাড়ির বাইরেটা দেখে আমাদের পছন্দ হয়েছে, বাড়ির মালিককে একটু ডেকে দিন, কথা বলতে চাই।"

বৃদ্ধ লোকটি খরখরে গলায় বলল--

"বাড়ির বর্তমান মালিক ইউএসএ তে থাকেন, তার আগের মালিকের কথা আমি কিছু জানিনা"।

কাঞ্চন দা জিজ্ঞেস করল---

"তাহলে ভাড়ার টাকা কাকে দিব?"

বৃদ্ধ বললো---

"আমাকেই দিন"

কাঞ্চন দা বলল---

"কত টাকা নেবেন?"

সে বলল--

"আপনারাই একটা অনুমান করে দিন"।


এদিকে আমার ভেতরে পালপিটিশন বাড়ছে।বুঝতে পারছি না জেঠু বাবা আর কাঞ্চনদার মনের অবস্থা।

খুব রহস্যপূর্ণ এই বুড়ো আর বুড়োর বাড়ি। তার কথাগুলো থেকে আমি কেবলি রহস্যের গন্ধ পাচ্ছি।মনে হচ্ছে রহস্যের মাত্রাটা এতটা ছাড়িয়ে যাচ্ছে যে ব্যাপারখানা খুব বাড়াবাড়ি বলে মনে হচ্ছে।

 কি করবো কি বলবো ভেবে পাচ্ছিনা ঠিক তখনি দেখি আমার হাতের পাতার ওপর টুপ করে এক ফোটা জল পড়ল উপর থেকে। চমকে গিয়ে উপর দিকে তাকিয়ে দেখি আকাশে ঘন মেঘ করেছে যেন সব ভাসিয়ে নেওয়ার জন্য সে প্রস্তুত হয়েছে। 

 রুক্ষ কন্ঠে বুড়ো আমাদের উদ্দেশ্যে বললো---

 "বৃষ্টি পড়ছে আপনারা সকলে ঘরের ভিতরে গিয়ে বসবেন চলুন"।

 অগত্যা আমরা সবাই বৃদ্ধ কে অনুসরণ করে নিচ তলার বারান্দায় এসে দাঁড়ালাম। ঝমঝম শব্দে মুষলধারে বৃষ্টি শুরু হল। গা টা কেমন ছমছম করে উঠলো।

 কাঞ্চন দা বলল--

 "বৃষ্টি যখন পড়ছে এখানে দাঁড়িয়ে থেকে সময় নষ্ট করে লাভ নেই। চলো সবাই উপরে গিয়ে ঘর গুলো দেখে আসি।"

 ঐ অস্থিচর্মসার বুড়ো দেখলাম আকাশের দিকে তাকিয়ে কিছু চিন্তা করছে। আমি ওনাকে ডাকলেও শুনতে পেল না। সম্বিৎ ফিরে পেয়ে সে আমাদের উদ্দেশ্যে জিজ্ঞেস করে---

 "কটা বাজে?"

 আমি মোবাইল ফোনের দিকে তাকিয়ে বললাম--

 "এখন সময় পৌনে পাঁচ।"

 শীর্ণকায় বুড়ো ঠকঠকিয়ে কাঁপতে কাঁপতে বলল---

 "আকাশে ঘন মেঘ জমেছে-

 অন্ধকার ছেয়ে গেছে। আজ তাড়াতাড়ি সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসবে। বৃষ্টি যে ভাবে পড়ছে সহজে থামার নয়।"

 আমি বললাম--

 "থেমেও তো যেতে পারে!"

 বুড়ো জোর দিয়েই বললো--

 ---"অসম্ভব এ বৃষ্টি থামার নয়, আমি মেঘের রকম দেখেই বলে দিতে পারি যে এই বৃষ্টি সারারাত চলবে।"

কাঞ্চন দা আশংকা নিয়ে বলল---

"সে কি! আমাকে তো আজ যেভাবেই হোক বাড়ি ফিরতেই হবে। এভাবে বৃষ্টি পড়তে থাকলে গাড়ি ড্রাইভ করা মুশকিল হয়ে পড়বে।"

বুড়ো বলল---

"এ বৃষ্টি থামার নয়। বৃষ্টির জলে নদী ফুলে উঠবে, মাঠ-ঘাট ভেসে যাবে পাহাড় ডুবে যাবে, যদি যেতে চান তো এক্ষুনি পালিয়ে যান। সন্ধ্যা ঘনিয়ে রাত হলেই ঝড় উঠবে। ঘুটঘুটে আঁধারে বনভূমি উচ্চঃস্বরে কান্নায় ফেটে পড়বে। সেই তীব্র বিদঘুটে 

আওয়াজ সইতে পারবেন না ভালো চান তো পালিয়ে যান।"

ব্যাটার অস্বাভাবিক কথাবার্তা শুনে আমরা সকলে মারাত্মক বিরক্ত বোধ করলাম।

কাঞ্চন দা রেগে গিয়ে বলল---


"তোমার হেঁয়ালি রাখ তো! বাড়িটা আমরা এই মুহূর্ত থেকেই ভাড়াতে নিচ্ছি। বৃষ্টি থামলো কি থামল না তোমাকে ভাবতে হবে না। শুধু বল ভাড়ার টাকা কত দিতে হবে মিটিয়ে দিচ্ছি।নিশ্চিন্তে থাকতে পারো রাতটা আমরা এখানেই থাকবো।"

বুড়ো আমাদের দিকে খানিকটা মুখ তুলে তাকাতেই আমি দেখলাম তার ঝুলে পড়া ভুরুর তলা থেকে চোখ দুটো শ্যেন দৃষ্টি নিয়ে চিকচিক করে উঠেছে। তার দুই চোখে যেন কিসের পিপাসা! তার মনের লালসা যেন দুই চোখের ঝিলিকে ঝরে পড়ছে। ফোকলা দাঁতে তার নীরব হাসি দেখে আমার যেন গা জ্বালা করে উঠলো। সে এবার মৃদু স্বরে বলল---


"আচ্ছা! রাতে এখানে থাকবেন? যদি থাকতে না পারেন?"

কাঞ্চনদা বিরক্তি মিশিয়ে নিয়ে বললো---

"আচ্ছা! কেন থাকতে পারব না একটু বুঝিয়ে বলবে?"

বুড়ো আবার আমতা আমতা করে নিচু গলায় বলল---

"আজ্ঞে আসলে বাড়ীর পুরনো মালিক আজ রাতে আসবেন। আ-আ-আসলে উনি কোথায় থাকেন সে কথা আমি জানিনা, সত্যি কথা বলতে আশে পাশের কেউই জানেনা।আমি যবে থেকে আছি এই বাড়িতে দেখেছি প্রত্যেক ঝড়-বৃষ্টির রাতে তিনি এখানে আসেন।উপরতলার ঘরটা আসলে উনার জন্য খোলা রাখতে হয়।আর এ কথাটাই বলতে চেয়েছিলাম যে মালিকের এখানে আসা কিন্তু আপনাদের জন্য মোটেও সুখপ্রদ হবে না। এরকমই এক ঝড় বাদলের রাতে উপরের ঘরে এক ভয়ানক কান্ড ঘটেছিল।"

কাঞ্চনদা বলল---

"কি ঘটেছিল খুলে বলুন"

 এক দীর্ঘ শ্বাস টেনে নিয়ে বুড়ো বলতে শুরু করল---

 "সে এক ভয়ানক রক্তাক্ত কান্ড! তখন সন্ধ্যা বেলা, মালিক বাড়ি ফিরলেন-

 ওই সময় ঝমঝম করে অঝোর ধারায় বৃষ্টি পড়ছে, শিকারের পোশাক পরহিত হাতে বন্দুক! থাক পরের ঘটনা শুনে আপনাদের কাজ নেই। আর সে সময় থেকে আজ পর্যন্ত এই বাড়ির কেউ ভাড়াতে নেয়নি, এভাবেই পড়ে আছে। আসলে সবার মনে আতঙ্ক।"


আমি যেমন বিরক্ত হচ্ছিলাম তেমনি হাসি পাচ্ছিল বুড়োর পাগলাটে ধরনের কথাবার্তা শুনে। হা হা হা হা করে হেসে উঠলাম। বললাম---

"খ্যাপা নাকি! আপনি কি আমাদের পাগল ভাবছেন? তখন থেকে যা তা কথা বলে যাচ্ছেন! আপনি আমাদের ভয় দেখাতে চাচ্ছেন? ওসব বস্তাপঁচা ফাঁকা কথায় আমরা ভয় পাই না।"

বুড়োও একটু বিরক্ত হয়ে বলল---

"তোমরা যখন চাইছো তবে থেকেই দেখো আমি তোমাদের সাবধান করতে চাইছিলাম।

আবারো বলছি সাবধান!"

তারপর বুড়ো লাঠি ভর দিয়ে ঠকঠক করে কাঁপতে কাঁপতে অত্যন্ত দ্রুত পদে বাগানের দিকে এগিয়ে যেতে যেতে উধাও হয়ে গেল।


কাঞ্চনদা বলে উঠলো---

"বদ্ধ পাগল!"

আমার মুখ ফসকে বেরিয়ে গেল---

"মোটেও পাগল নয় মস্ত বড় এক পাজি! সাক্ষাৎ শয়তান, আসলে সে চায় না অন্য কেউই বাড়িতে প্রবেশ করুক। এই বাড়িতে ওর রাজত্ব এতটুকুও খর্ব হোক সেটা এই ব্যাটা চায়না।বাইরেতো ভাড়া দেবে বলে একটা প্লেট টানিয়ে রেখেছে তাহলে চিন্তা কোথায়? চলো আমরা সবাই মিলে দোতলা ঘর গুলো দেখে আসি।"

তারপরও আমরা সকলে সিঁড়ি বেয়ে দোতলায় উঠে এসে বারান্দায় দাঁড়ালাম। দোতালার বারান্দা থেকে সামনে চোখ মেলে দেখলে অনেক দূর পর্যন্ত দেখা যাচ্ছে। আকাশের দিকে তাকিয়ে গা ছমছম করে উঠলো। ঘন কালো মেঘ সম্পূর্ণ আকাশ ছেয়ে ফেলেছে। বৃষ্টি ও পড়ছে আগের তুলনায় বেশি জোরে।প্রবল বৃষ্টি ঝমঝম শব্দ ঝড়ের শনশন আওয়াজ বুকের মধ্যে মারাত্মকভাবে ভয়ের সঞ্চার করছে। সন্ধ্যা নেমে আসার আগেই ঘন অন্ধকার। দূরের পাহাড় গুলো আর দেখা যাচ্ছে না। নদীর বুক ফুঁসে উঠছে দুরন্ত ঢেউ তা বুঝিয়ে দিচ্ছে। দুই ধার জল থৈ থৈ। বড় গাছগুলো ঝড়ের দাপটে মাতালের মতো টলছে। ওদের বড় বড় দীর্ঘশ্বাস টের পাচ্ছি।


আকাশে মেঘের মতো কাঞ্চনদার চোখে মুখেও অন্ধকার ছাপ। দেখেই বোঝা যাচ্ছে অত্যন্ত বিষন্ন। কাঞ্চনদা বলল---

"বুড়োর কথাই ঠিক হলো তাহলে! আজ আমি এখানেই আটকা পড়লাম।"

জেঠুকে আর বাবাকেও বিমর্ষ দেখাচ্ছে। মুখে কিছু বলছে না। আমি কাঞ্চনদা কে বললাম---

"এ ছাড়া আর উপায় কী? এই অবস্থায় তুমি কোথায় বেরোবে?"

কাঞ্চন দা বলল---

"রাতে কি খাবি? সারাদিন তো পেটে কিছু পরেনি,আমার গলা শুকিয়ে আসছে, বোতলের জল শেষ।"

আমি বললাম---

"বৃষ্টির জল খাও"

কাঞ্চন দা বলল---"ঘুমোবি কোথায়?"

তৎক্ষণাৎ পিছন ফিরতেই হলঘর টার দিকে চোখ পড়ল। ঘরটার সবকটা দরজাই হা করে খোলা। আবছা দেখা যাচ্ছে। বড় সোফা সেট টি টেবিল আর অনেকগুলো কারো কার্য শোভিত দামী কাঠের চেয়ার। ঘরের দেয়ালে অনেকগুলো পেইন্টিং ঝুলানো আরেকটি বড় আয়না। মেঝেতে খুব সুন্দর কার্পেট পাতা রয়েছে।আমি আশ্চর্য হচ্ছি এই ভাবে এতো সুন্দর সাজানো-গোছানো বাড়ির দরজা এভাবে খোলা! বাড়িতে কোন মানুষও দেখা যাচ্ছে না কেন?

কাঞ্চনদার মুখটা শুকনো দেখালো, বলল---

"তাহলে কি বুড়োর কথাই ঠিক?"

আমি বলে উঠলাম---

"খেপেছো নাকি?তুমি ভূতের বাড়ি ভাবছো এটা? তবে আমার কী মনে হচ্ছে জানো কাঞ্চন দা, ওই বুড়োটাই বোধহয় ভূত!

রহস্যজনক মনে হচ্ছে কিন্তু কিছু ধরতে পারছিনা, ভেতরে আমার তালগোল পাকিয়ে যাচ্ছে, অনেক প্রশ্ন মাথাচাড়া দিয়ে উঠছে।"


আমি বললাম--"কি বিচিত্র! এই বুড়োর মত চেহারার মানুষ আমি দুটো দেখিনি, কি ভয়ানক তার চাহুনি।"

ঠিক সে সময় হঠাৎ কানে ভেসে এলো অপূর্ব এক কণ্ঠসঙ্গীত! ভালো করে খেয়াল করলাম, হ্যাঁ কোন মেয়ে হারমোনিয়ামে সুর তুলে গান গাইছে। সাথে তানপুরার টানটান মিষ্টি সুর। স্পষ্ট শুনতে পাচ্ছি রবীন্দ্র সংগীত! "সজনি সজনি রাধিকা লো দেখ অবহুঁ চাহিয়া"

তারপর নিশ্চিত হলাম কাঞ্চন দা জেঠু বাবা সকলেই সে সুরের মূর্ছনা শুনতে পাচ্ছে। আশ্চর্য হবার সাথে সাথে সকলের কপালে চিন্তার ভাঁজ স্পষ্ট। এদিকে আকাশ থেকে অঝোর ধারায় বৃষ্টি পড়েই চলছে সঙ্গে বিদ্যুতের ভয়ানক তর্জন গর্জন আর ঝলকানি। বাইরের দিকে চোখ মেলে দেখতেই ভয় করছে।

জেঠু বলে উঠলো---

"গানের আওয়াজ শুনতে পাচ্ছি, সুরের মাদকতায় আমি আচ্ছন্ন হচ্ছি কিন্তু কোথা থেকে এই সুর ভেসে আসছে সেটাই তো ঠাওর করতে পারছিনা?"

আমি বললাম---"হুম আমিও শুনতে পাচ্ছি"।

তবে বাবা কিছুই বলল না।

কাঞ্চন দা বলল---

"হল ঘরের ভেতর থেকেই গান ভেসে আসছে যতদূর মনে হয়"

সঙ্গে মোবাইল আছে তাই চট করে টর্চ জ্বাললাম, আলো ফেলে সবাই মিলে হল ঘরের ভিতরে ঢুকে পড়লাম। অবাক হলাম! দেখলাম ঘরের ভিতরে বসার আসন গুলো সবকটাই খালি। সেখানে একটি দামী পিয়ানো রয়েছে কিন্তু তার সামনে কেউ নেই।


কাঞ্চন দা জোর গলায় বলে উঠলো--

"যে গান গাইছে সে নিশ্চয়ই এঘরেই কোথাও রয়েছে"।

আমি বললাম--

"না, গানের সুরটা অন্য ঘর থেকে ভেসে আসছে"।

কাঞ্চনদা অস্বস্তি নিয়ে বলল---

"আরে না গান এই ঘরেই হচ্ছে, গায়িকা এখানে সশরীরে নাই যদিও আমি তার উপস্থিতি টের পাচ্ছি। আমার মনে হচ্ছে আমি কোন হিমঘরে আছি। খুব ঠান্ডা অনুভব করছি। এ ঠান্ডা তেমন ঠান্ডা নয়। এ ঘর জীবন্ত মানুষের ঘর হতেই পারে না"।


জেঠুকে অস্থির দেখাচ্ছে বাবা কিছুই বলছে না। আমরা তড়ি ঘড়ি সকলে বাইরে বেরিয়ে এলাম। অনুভব করলাম সত্যিই ঘরের ভেতরের চাইতে বাইরের দিকটা অনেক উষ্ণতম। অথচ বাইরে অঝোর বৃষ্টি আর ঝড়ো হাওয়া বইছে। তাহলে কাঞ্চনদার অনুমান মিথ্যে নয়। 

বিস্মিত হয়ে যখন এর কারণ বোঝার চেষ্টা করছি ঠিক তেমন সময় খটখট করে একটা নতুন আওয়াজ কানে আসতে শুরু করলো।

হ্যাঁ, পরিষ্কার বুটের শব্দ। এ তো সিড়ি ডিঙিয়ে উপরে আসছে শব্দটা! কিন্তু এটাতো বুড়োর পায়ের শব্দ নয়! তাহলে কে?

কাঞ্চনদা বলে উঠলো---

"বুড়ো নিশ্চয় আমাদের মিথ্যা কথা বলছে, এ বাড়ি খালি হতেই পারে না, বাড়িতে কেউ না থাকলে গান গাইছে কে আর কেইবা উপরে উঠে আসছে?"

মোবাইলের টর্চটা জ্বেলে সিঁড়ির নিচের দিকে

আলো ফেলে অপেক্ষা করতে থাকলাম যে দেখি কে উপরে উঠে আসছে!

এক একটা সিঁড়ি ভেঙ্গে খটখট আওয়াজ করে উপরে এসে ঘরের দরজার সামনে বুটের শব্দ থেমে গেল। আর যা দেখে আমাদের চক্ষু চড়কগাছ হলো তা হচ্ছে এ বারান্দার দরজা পর্যন্ত এসে শব্দটা বন্ধ হলো শুধু তাই নয় তার সঙ্গে একজোড়া হাঁটু পর্যন্ত বুট দরজার সামনে স্থির হয়ে থাকল অথচ কোনো মানুষের চিহ্ন পর্যন্ত দেখতে পাচ্ছি না! নিজের চোখকে বিশ্বাস হচ্ছে না। বুট জোরা জীবন্ত মানুষের মতন হেঁটে উপরে এল কি করে? এমন সময় আমার মন বলে উঠলো---

"নিশ্চয়ই কোন অদৃশ্য দেহ ওই হাটু পর্যন্ত দৃশ্যমান বুট পড়ে বারান্দায় উঠে এসে আমাদের মত অনাহুতদের দেখে থমকে দাঁড়িয়ে পড়েছে ।পরমুহূর্তেই আবার মনে হল কেউ কোন ম্যাজিক করছে না তো?"

 আমি বিস্মিত।

 কাঞ্চনদা অস্ফুট স্বরে বলে উঠলো---

 "এতো শিকারি বুট!বুড়ো তো বলেছিল যে বৃষ্টির রাতে শিকারির পোশাক পরে বাড়ির মালিক এসেছিল, আজও ঝড়-বৃষ্টি, এমন দিনেই নাকি ওর মালিক বাড়িতে আসে?"

 আমি কিছু বলার পূর্বেই যেন কোন ভারী দেহধারী ওজন বহন করে শিকারি বুট জোড়া

ঘর কাঁপিয়ে যেনো আমাদের দিকেই এগিয়ে আসছে।

আমাদের দৃষ্টি স্থির! ভয়ে আতঙ্কে আমাদের হৃৎস্পন্দন স্পষ্ট শোনা যাচ্ছে ধুকপুক ধুকপুক । গলা বুক শুকিয়ে কাঠ। প্রাণটা প্রায় বেরিয়ে যাচ্ছে বলে। আতঙ্ক আর উৎকণ্ঠা নিয়ে আমরা পিছোতে থাকলাম পায়ে পায়ে।

হলঘরের দ্বিতীয় দরজার সামনে এসে বুট জোড়া আবার থামল কিছুক্ষণের জন্য। তারপর পুর্ণ গতিতে ঢুকে গেল ঘরের ভেতর। তৎক্ষণাৎ থেমে গেল ভেসে আসা গান। পটকা ফাটানো মত দুবার সাংঘাতিক আওয়াজ হলো। সঙ্গে তীব্র আর্তনাদ ভেসে এসে মিলিয়ে গিয়ে একটা গোঙানির মতো শব্দ শুনতে পেলাম।

আমরা অসহায় বোধ করলাম।পাগল প্রায় দিশেহারা হয়ে একেক লাফে তিন চার ধাপ করে সিঁড়ি টপকে যখন নিচে এসে পৌঁছলাম টর্চের আলো ফেলতেই দেখি সেই বুড়ো সেখানে আমাদের দিকে তীক্ষ্ণ দৃষ্টি ফেলে অদ্ভুতভাবে স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে বিভৎসভাবে তাকিয়ে রয়েছে। বুড়োর লতপতে দেহ একবারের জন্য যে আমাদের দিকে মুখ তুলে তাকালো। কোটরে ঢুকে যাওয়া তার কালো চোখ দুটিতে এখন আগুনের গোলা জ্বলছে দপ দপ করে। খিলখিল করে অট্টহাসিতে ফেটে পড়ল বুড়ো। খ্যাংরা কাঠখোট্টা গলায় বলে উঠলো---

"কি বাছারা মালিকের দেখা পেলে? তা কি কথা হলো তোমাদের সাথে? এখনও বাড়ি ভাড়া নেবার মতলব আছে নাকি?হি হি হি হি হা হা হা হা" অট্টহাসিতে চতুর্দিকে যেন ভূমিকম্প হতে শুরু করল। ভয়ে আমাদের পা সরছে না।প্রানপনে ছোটে পালাতে চেষ্টা করলাম। দ্রুত দৌড়াতে দৌড়াতে যখন বাড়ির বাগান পার হয়ে রাস্তায় এসে পৌঁছালাম তখনো বুড়োর অট্টহাসির আলোড়ন থামেনি।


Rate this content
Log in

More bengali story from Sipra Debnath

Similar bengali story from Horror