Shubhranil Chakraborty

Classics Crime Thriller


4.1  

Shubhranil Chakraborty

Classics Crime Thriller


মারণ কোশ

মারণ কোশ

20 mins 485 20 mins 485

১।।

 রাত্রিবেলা খাবার পর বারান্দার একটা চেয়ারে বসে শূন্যদৃষ্টিতে বাইরের দিকে তাকিয়ে ছিল সুব্রত।কিছুক্ষণ পরে মীরা এসে তার পাশে দাঁড়াল।

“অনেক তো রাত হল, চল এবার শুয়ে পড়ি।“

সুব্রত চুপ। তাই দেখে মীরা একটু ঝাঁঝিয়ে উঠে বলল,”তোমার কি হয়েছে বলত? দু’তিনদিন ধরে দেখছি, কোন কাজে মন নেই,ডাকলে সাড়া দাওনা,কথাবার্তাও দায়সারা,কোন জগতে ডুবে আছো বলত?”

সংবিৎ ফিরল সুব্রতর। “ওঃ হো, শুতে যেতে হবে, তাই না। রুমি শুয়ে পড়েছে?”

“হ্যাঁ, ওর তো আজ স্কুলে একটা ফাংশন ছিল,তাই টায়ার্ড হয়ে পড়েছিল, খেয়েই শুয়ে পড়েছে। নইলে অন্যদিন বাপিকে ছাড়া ওর ঘুম আসে?”

“হুম, ঠিক আছে। চল তাহলে শুয়ে পড়ি।“

সুব্রত উঠে পড়ল। মীরা সুব্রতর সামনে এসে তার চোখে চোখ রেখে জিজ্ঞেস করল,

“তুমি তো আগে এমন ছিলে না।কি হয়েছে বলোই না?কেন এভাবে একা একা গুমরে মরছ?”

“ও কিছু না, এমনিই হয়তো একটু অন্যমনস্ক ছিলাম...”

“উঁহু। এটাকে এমনি অন্যমনস্ক হওয়া বলে না। তেরো বছর ধরে দেখছি তোমায়। খুব গুরুতর কিছু না হলে তোমায় তো এভাবে ভেঙ্গে পড়তে দেখিনি কোনদিন।“

“প্লিজ এভাবে চুপ করে থেকোনা। যা হয়েছে সেটা খুলে বলোই না... দেখবে মনটা অনেক হালকা লাগবে।“

একটু ইতস্তত করল সুব্রত। তারপর বললেন,”বসো বলছি।“

মীরা অন্য একটা চেয়ারে বসল। কিছুক্ষণ পর সুব্রত ধীরে ধীরে শুরু করলেন,

“কয়েকদিন ধরে জানত মীরা, আমার সাথে অদ্ভুত অদ্ভুত জিনিস ঘটছে। একদিন অফিসে গেলাম,রোজকারের মতন কাজ করছি, হঠাত কেমন যেন হারিয়ে গেলাম।“

“হারিয়ে গেলে মানে?”

“মানে মনেই রইল না, আমি কি,আমার পরিচয় নাম ধাম, আমি এখানে কেন আছি , এমনকি আমার অস্তিত্বের সত্যতা, সব কিছু।স্থির হয়ে বসে রইলাম, নড়ার ক্ষমতা নেই। কিছুক্ষণ পরে আবার সব স্বাভাবিক। কিন্তু এটা একবার নয়। বেশ কয়েকবার ঘটেছে এই কদিনে।“

“খুব কাজের প্রেশার যাচ্ছে নাকি? তাই হয়তো?”

“না না... তা নয় তা নয়। তুমি বুঝতে পারছ না। এটা কোন সাধারণ ব্যাপার নয়। কাজের প্রেশার তো সারাবছরই থাকে, কিন্তু এই অনুভূতিটা সম্পূর্ণ অন্যরকম। ওই সময়টুকুর জন্য আমার নিজের উপর কোন নিয়ন্ত্রণ থাকে না।মনে হচ্ছিল, আমি অসার কোন একটা পুতুল বা মূর্তি, যে দেখতে পারে সবই, কিন্তু তা থেকে অনুধাবন করার ক্ষমতা তার নেই। কালই তো...” বলে চোখ বুজল সুব্রত।

“কাল কী?”

নীচু গলায় সুব্রত বলল,”কাল ট্রেনটা চার নম্বরে দিয়েছিল। ওভারব্রিজে গেলে সময় লাগবে,তাই লাইন পেরিয়ে যাব ভাবলাম। দু নম্বর লাইনের দিকে এগোচ্ছি,এমনি সময় আবার স্থির। মনেই রইল না আমি কে, কেন এখানে। স্টেশন টাকে দেখতে পাচ্ছি, ব্যাস্ত লোকজনকে দেখতে পাচ্ছি, এমনকি...” বলতে বলতে কেঁপে উঠল সুব্রত।“এমনকি আমি এক নম্বর লাইনে দাঁড়িয়ে আছি, উলটো দিক থেকে একটা মেল ট্রেন ছুটে আসছে, সেটাও দেখতে পাচ্ছি, কিন্তু কী করা উচিত তা মাথায় আসছে না। আমি স্থির। কোন ভাবনাই মাথায় খেলছে না।“

মীরা একটা ভয়ের আওয়াজ করে বলল,”তারপর?”

“তারপর একজন ফেরিওয়ালা এসে এক ধাক্কায় আমায় নিয়ে সরে গেল, তার ঠিক কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে প্রচণ্ড বেগে মেল গাড়িটা এক নম্বর লাইন দিয়ে হু হু করে বেরিয়ে গেল। আর কয়েক সেকেণ্ড দেরি হলে...”মুখে হাত চাপা দেয় সুব্রত।

মীরা সুব্রতর হাতটা শক্ত করে ধরে বলল,”তুমি আর কাল থেকে একদম বাইরে বেরোবে না।ছুটি নিয়ে নাও অফিস থেকে কয়েকদিনের জন্য। যা বললে, শুনে ভীষণ ভয় করছে আমার।“

যেন মীরার কথা শুনতেই পায়নি, এমনভাবে সুব্রত বলে চলল,”ট্রেনটা চলে যাবার পর সব লোকেরা দারুণ চেঁচামেচি শুরু করেছিল,সবই আমি শুনতে পারছিলাম, কিন্তু বিপদের গুরুত্বটাই অনুধাবন করতে পারিনি। স্বাভাবিক হতে অনেকটা সময় লেগেছিল। তখন দেখলাম, ট্রেনটা বেরিয়ে গেছে, আর আমি চার নম্বর প্ল্যাটফর্মে বসে আছি। হয়তো কেউ আমায় ধরে ধরে নিয়ে গেছে,কিন্তু অনুভব করার ক্ষমতা আমার কাছে ছিল না” বলে থামে সুব্রত।

“এখন শোবে চল। আর কথা বোল না। তুমি কাল আমার সঙ্গে ডাক্তারের কাছে যাবে,” বলে মীরা উঠে দাঁড়াল।

বাধ্য ছেলের মতন মীরার পিছন পিছন শুতে গেল সুব্রত।

                                           ২।।


“বাপি বাপি, এই অঙ্কটা দেখ না বাপি। এই ভগ্নাংশের অঙ্কটা। সীমা ম্যাম কাল হোম ওয়ার্ক দিয়ে গেছিল, ভুল করলে ভীষণ বকবে।“

“দে দেখি,” বলে অন্যমনস্ক ভাবে সুব্রত মেয়ের হাত থেকে খাতাটা নিল। হালকা চালে পেনটা হাতে নিয়ে অঙ্কটা দেখে একটু ভ্রূ কুচকালো সুব্রত। মিনিটখানেক পর মেয়ের দিকে তাকিয়ে বলল,”ক্লাস ফাইভে তোদের এত শক্ত অঙ্ক সিলেবাসে দেয় কি করে?”

“না বাপি,শক্ত তো নয় খুব।এরকম অঙ্ক তো আমাদের ক্লাসে শিখিয়েছে, আমিও করেছি। কিন্তু আমার খুব সিলি মিস্টেক হয় তো, তাই সীমা ম্যাম খুব বকে। তাই তো তোমাকে বললাম একটু মিলিয়ে দিতে।“

সুব্রত একটু অসহায় বোধ করল। ক্লাস ফাইভের অঙ্ক নিয়ে নাজেহাল হওয়ার কথা তার নয়, কাতরভাবে সে মেয়েকে বলল,” আচ্ছা দাঁড়া আমি নিজে একবার অঙ্কটা প্রথম থেকে করে দেখি।“

সুব্রত বলল বটে, কিন্তু করতে গিয়ে আবার হোঁচট খেল। নাঃ এটা কি করে সম্ভব? ইঞ্জিনিয়ার হয়ে কিনা ক্লাস ফাইভের অঙ্ক…না না মাথা ঠান্ডা করতে হবে। পারতেই হবে তাকে অঙ্কটা।

অবিশ্বাস্য হলেও সুব্রত দেখল, কিছুতেই অঙ্কটা তার দ্বারা হবার জো নেই। পাতার পর পাতা অঙ্ক করছে, আবার কাটছে, কিন্তু কিছুতেই অঙ্ক আর মেলে না।

মাথার চুলগুলো খামচিয়ে ধরল সুব্রত। আর পারা যাচ্ছে না, মনে হচ্ছে যেন মাথার ভিতরটা ভেঙ্গে টুকরো টুকরো হয়ে যাবে।

“ঐ তো মামমাম এসে গেছে। মামমাম আমার এই অঙ্ক গুলো একটু দেখে দেবে? দেখো বাপিকে বলেছিলাম, বাপি না অঙ্কটা করতে পারেনি।“ বলে খিলখিল করে হেসে উঠল রুমি।

ওদের বাকি কথা আর কানে ঢুকছিল না সুব্রতর। মাথা নীচু করে মুখে হাত চাপা দিয়ে বসে রইল অনেকক্ষন।যেভাবে তিল তিল করে সে দিন দিন হারিয়ে যেতে দেখছে নিজেকে নিজের থেকে,সেই যন্ত্রণায়। এ কী অভিশাপ,তা সে জানে না।

মীরা রুমিকে বলল,” হ্যাঁ, ঠিক আছে।আর শোন,বাপিকে নিয়ে অমন মজা করে না।জান তো,বাপি সারাদিন কত কাজ করে।তাই হয়তো একটু মেন্টাল প্রেশারের মধ্যে রয়েছে।তোমার যদি হয়ে গিয়ে থাকে, তাহলে তুমি নীচের ঘরে গিয়ে খেলা করো। কিছুক্ষণ পরই তো তোমার সীমা ম্যাম চলে আসবে।“

রুমি দৌড়ে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল। মীরা সব্রতকে বলল,”কাল তোমাকে নিয়ে একবার ডাক্তারের কাছে যাব।। তুমি যাই বল, তোমার মনের উপর খুব প্রেশার যাচ্ছে। তাই এরকম হচ্ছে।আমার বিশ্বাস ডাক্তারের পরামর্শ মত ওষুধ আর কয়েকদিন ছুটিতে থাকলেই তুমি ভাল হয়ে যাবে।“

বিহ্বল চোখে মীরার দিকে তাকাল সুব্রত।

                                          ৩।।

নীলাদ্রি নিঃশব্দে বিতানের পিছনে এসে দাঁড়াল। বিতান তখন এক মনে ওর আঁকার খাতায় একটা গ্রামের সিনারি এঁকে চলেছে। বড় ভালো আঁকে ছেলেটা। বিভোর হয়ে দেখতে দেখতে বিতানের মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে থাকে নীলাদ্রি।

বিতান পিছন ফিরে তাকাল। একমুখ হাসি ফুটে উঠল তার। অতি উৎসাহের সঙ্গে সে নিজের খাতায় আঁকা ছবির দিকে নীলাদ্রির দৃষ্টি আকর্ষণ করতে থাকল।

“খুব ভালো হয়েছে রে। তুই একদিন অনেক বড় আঁকিয়ে হবি, মিলিয়ে নিস।“

বিতান আবার একগাল হেসে উঠল। ওর হাসির দিকে তাকালে একটা নির্মল আনন্দ পায় নীলাদ্রি, সেই সাথে একটা চাপা বেদনাও উঁকি দেয় মনের ভিতর। ছেলেটা জন্ম থেকেই বোবা। ওর মা মারা যায় তিন মাস বয়সে। সেই অবধি নীলাদ্রির কাছেই বিতান মানুষ হয়েছে। নীলাদ্রি সম্পর্কে ওর মামা।

নীলাদ্রি বিতানকে একটু আদর করে ঘর থেকে বেরিয়ে এল। বিতান একমনে আঁকছে, ওকে বিরক্ত করাটা ঠিক হবে না।

নিজের ঘরে এল নীলাদ্রি। ঘর নয়, ল্যাবরেটরি বলাই ভালো। ঘরময় সুনির্দিষ্ট অর্ডারে কেমিক্যাল,বিকার, বুনসেন বারনার, টেস্টটিউব সেট, ফ্লাক্স সাজানো রয়েছে।ওষুধপত্র আর রাসায়নিকের উপর তার চিরকালের আগ্রহ। কেমিস্ট্রির প্রফেসর হওয়ার পাশাপাশি একজন গবেষক ও সে। নানান এক্সপেরিমেন্ট করাটা তার হবি বলা যেতে পারে।

একবার তীক্ষ্ণ চোখে গোটা ঘরটা নিরীক্ষণ করল নীলাদ্রি। তারপর তার স্বভাবসিদ্ধ ভঙ্গিতে সে এসে তার টেবিলের সামনে বসল। হাতে তুলে নিল টেবিলের উপর রাখা বেশ কয়েকটা কাগজপত্র। সেগুলো পড়তে পড়তে তার অজান্তেই ঠোঁটের কোণে একটা ক্রূর হাসি ফুটে উঠল।

                                       ৪।।

“দেখ আমি ঠিকই বলেছিলাম, মিলল কিনা? ডাক্তারও বলেছে তোমার রেস্টের দরকার, শুধু শারীরিক নয়, মানসিক রেস্টও।“

“হুম। ঠিকই।“

মীরার মুখে হাসি,”তাহলে বল,ফল পেয়েছ কি পাও নি? এই যে দুতিনদিন ধরে বাড়িতে ছুটিতে রইলে, একদিনও ওরকম অনুভূতি হয়েছে?”

“নাঃ। আর সত্যি বলতে কি, অনেকটা সুস্থও যেন বোধ করছি। মাথাটাও কাজ করছে ঠিকঠাক।“ সুব্রতর মুখে এই প্রথম হাসি দেখা দেয়।


মীরা হেসে বলে,” তবে তাই বলে ভেবো না, আবার কাল থেকেই অফিস জয়েন করবে। অন্তত আরো সাতদিন বাড়িতে রেস্ট করতে হবে,ডাক্তার বলেছে না?”

“হ্যাঁ, কিন্তু...”

“কিন্তু কিছু নয়।সামনের সোমবার রুমির বার্থ ডে, মনে আছে তো? এবারে ভাবছি ওদের বন্ধুদের ইনভাইট করে বাড়িতেই ছোটখাট একটা গ্যাদারিং করব।“

“হ্যাঁ, করলেই হয়। রুমি ছেলেমানুষ, শুনলে খুশি ই হবে।“

“হ্যাঁ, আর ততদিন পর্যন্ত তোমারও ছুটি। সেরকম ই জানিয়ে দাও অফিসে।“

“যো হুকুম।“ বলে একগাল হাসল সুব্রত।

                                          ৫।।

“হ্যাঁ রে বাবা, ঈশিতার নাম লিস্টে আছে। পাগল করে দিল মেয়ে আমার,” বলে হেসে উঠল মীরা।

“আর কাকে কাকে বলবি রুমি?” সুব্রত জিজ্ঞেস করে।

“বাপি আমার ড্রয়িং স্কুলের কয়েকটা বন্ধু আছে, ওদেরকে বলব?”

“হ্যাঁ, কেন বলবি না? তোর যাদের যাদের মনে হয় তুই সবাইকেই বলবি।“ মেয়েকে কোলে নিয়ে হেসে বলে সুব্রত।

“বাপি জানো আমি যেখানে আঁকা শিখি, সেখানে একটা ছেলে আসে,খুব ভালো আঁকে আর ও আমার খুব ভালো বন্ধু। ওকে বলব?”

“হ্যাঁ, নিশ্চয়ই বলবি। কী নাম ছেলেটার?”

“বিতান। বাপি জানো ওর না খুব দুঃখ। ওর বাবা মা কেউ নেই, আর ও না কথা বলতে পারে না।“

“আহারে।ইসস।কিন্তু কথা বলতে না পারলে তোরা ভালো বন্ধু হলি কী করে?”

“ও আমাকে আঁকা দেখিয়ে দেয়, লিখে লিখে অনেক কথা বলে। আমরা খুব ভালো বন্ধু বাপি।“

মীরা বলে,”নিয়ে আসিস তো ওকে। আহারে শুনেই খুব খারাপ লাগল।“

কয়েক মিনিট সবাই চুপ। তারপরই স্যোতসাহে রুমি আবার তার বাপির সঙ্গে তার জন্মদিনের প্ল্যানিং এ মেতে উঠল। মীরা কয়েক পলক তাকিয়ে উপভোগ করে বাপ মেয়ের এই নির্মল ছেলেমানুষি। সুব্রত আবার আগের সুব্রত হয়ে উঠছে।

মাথা নীচু করে একটা স্বস্তির হাসি হাসে মীরা।

                                          ৬।।

ল্যাপটপের সামনে বসে ছিল নীলাদ্রি। স্ক্রিনের ভিতর নড়াচড়া করছে সুব্রতদের বাড়ির ভিতরটা। আজ রুমির জন্মদিন।গোটা বাড়িটাকে বেলুন দিয়ে সাজানো হয়েছে, কয়েকজন আত্মীয় স্বজন আসতে শুরু করেছেন। সাড়ে পাঁচটা বাজতে চলল। কখন কেক কাটা শুরু হবে কে জানে!

বিতান বাড়ি নেই। স্কুল থেকে ফেরেনি এখনো। এত দেরি সাধারণত হয় না, কিন্তু আজ সেদিকে মন দিতে পারেনি নীলাদ্রি। তার মাথায় অন্য চিন্তা। মাত্র খানিকক্ষণের অপেক্ষা, রুমি কেক কাটতে যাবে, সুব্রতবাবুরা জড়ো হবেন, তারপর বহু জল্পনার অবসান ঘটিয়ে...বুম!!! ভাবতে ভাবতেই অট্টহাসিতে ফেটে পড়ে নীলাদ্রি। তার পরমুহূরতেই তার চোখে জ্বলে ওঠে জিঘাংসার আগুন। সুব্রত রায়, অনেক কষ্ট দিয়েছ তুমি আমাদের এতগুলো বছর, আর নয়।

নীলাদ্রির বানানো ড্রোন জানালার কাছে সবার অলক্ষ্যে ঘুরপাক খাচ্ছে, আর নীলাদ্রিকে পাঠাচ্ছে প্রতিটা মুহূর্তের চলমান ছবি। সময় ক্রমশ এগিয়ে চলেছে, হ্যাঁ, হ্যাঁ এই তো সবাই জড়ো হয়েছে। এবার কেক কাটা শুরু হবে, সুব্রতবাবুও আছেন, রুমি মীরা, রুমির বন্ধুরা আত্মীয় পরিজন সবাই দাঁড়িয়ে আছে, এই তো মাহেন্দ্রক্ষণ। গুড বাই সুব্রত,গুড বাই রুমি, গুড বাই এভ্রিওয়ান। চেয়ার থেকে নিজেকে হেলিয়ে দিয়ে রিমোট টা হাতে নিল নীলাদ্রি।

তখনই হঠাত কম্পিউটারের দিকে চোখ পড়তেই শিরদাঁড়া দিয়ে একটা ঠাণ্ডা স্রোত নেমে গেল নীলাদ্রির। ভিডিওতে রুমির পাশে এসে দাঁড়িয়েছে ও কে?রিমোটটা হাত থেকে পড়ে যায় তার। নিমেষের মধ্যে ঘর ছেড়ে দ্রুত পায়ে বেরিয়ে গেল সে।

                                        ৭।।

“হ্যাপি বার্থ ডে টু ইউ রুমি সোনা...”

“কিরে রুমি, তোর সব বন্ধুরা এসে গেছে, বিতান আসবে বলেছিলি, সে তো এলো না?” মীরা জিজ্ঞেস করে।

“ঐ তো বিতান এসে গেছে।“ হাসিমুখে বলে উঠল রুমি।

স্কুল ড্রেসেই রুমিদের বাড়ি চলে এসেছে বিতান। হাতে একটা গিফটের বাক্স।

বিতান এসে হাসিমুখে গিফটের বাক্সটা রুমির হাতে এগিয়ে ধরল। পাশ থেকে মীরা বলে উঠল,” ও মা, তুমি আবার গিফটও এনেছ রুমির জন্য?”

বিতান দুষ্টু করে হাসে। মীরা পরম স্নেহে বিতানকে হাত ধরে সোফায় নিয়ে গিয়ে বসাল। কথায় কথায় কিছুটা রুমির মাধ্যমে, আবার বিতানের কাছ থেকেও মীরা জেনে নিচ্ছিল তাদের বাড়িতে কে কে আছে, কোন স্কুলে পড়ে, কোন ক্লাস ইত্যাদি। এরইমধ্যে মীরা খেয়াল করেনি কখন সুব্রত তার পাশে এসে দাঁড়িয়েছে। একদৃষ্টিতে সে তাকিয়ে ছিল বিতানের দিকে।

মীরা পাশে তাকাতেই দেখতে পেল সুব্রতকে। “তুমি এখানে কখন এলে? ও ভালো কথা, এই ছেলেটিই হল বিতান, যার কথা রুমি আমাদেরকে বলছিল। খুব ভালো ছেলে, ক্লাস সেভেনে পড়ে, দেখ রুমির জন্য কি সুন্দর গিফট এনেছে। ওর বাড়িতে ও আর ওর মামা থাকে। ওর মামা একজন কেমিস্ট।“

সুব্রত কিছুক্ষণ বিতানের দিকে তাকিয়ে রইল চুপচাপ। তারপর একটু হাসবার চেষ্টা করে বলল,”কি নাম তোমার মামার?”

বিতান তার হাতের সাদা খাতাটায় বড় বড় করে পেন্সিল দিয়ে লিখল তার মামার নাম।

কেউ লক্ষ্য করল না, কিন্তু একমুহূর্তের জন্য সুব্রতর মুখটা হঠাত করে কেমন কাগজের মতন সাদা, রক্তশূন্য হয়ে গেল। খানিক্ষণ সে স্তম্ভিতের মতন দাঁড়িয়ে রইল।তাকে চুপচাপ দেখে মীরা জিজ্ঞেস করল,”কি হল? তুমি চেনো নাকি এই ভদ্রলোককে?”

নিজেকে সামলে নিয়ে সুব্রত বলল,”না না, আমি কি করে চিনব? ওই নামটা একটু চেনা ঠেকছিল, তাই ভাবছিলাম। শোন মীরা, অতিথিরা প্রায় অনেকেই চলে এসেছেন, আর সন্ধ্যেও হতে চলল,আর দেরি করা যায় না। চল এবার কিছুক্ষণ পর কেক কাটা শুরু করতে হবে, তারপরে খাওয়াদাওয়াও শুরু করে দিতে হবে, অনেকেই দূর থেকে এসেছেন, তাড়াতাড়ি চলে যাবেন। না না আর দেরি কোর না। চল চল।“

মীরা হেসে বলল,”হ্যা হ্যাঁ যাচ্ছি। কিন্তু তার আগে দেখ তো, বেচারা বিতান এই স্কুল ড্রেস পড়েই চলে এসেছে, ও একটু ফ্রেশ হয়ে নিক। ওকে বরং একসেট ফ্রেশ জামা নামিয়ে দেই, ও পড়ে নিক। চল বিতান।“

সুব্রত বলল,”বেশ, ঠিক আছে।“

বিতানের সঙ্গে রুমি আর মীরাও উপরে গেল। খানিকক্ষণ পর ওরা নীচে নেমে এলে সুব্রত সবাইয়ের কাছে ঘোষণা করল,”এবার কেক কাটা শুরু হবে, সবাই প্লিজ একটু সামনে এগিয়ে আসুন।“

সবাই সামনে এগিয়ে এল। তারপর একরাশ করতালি আর সম্মিলিত হ্যাপি বার্থ ডে টু ইউ ধবনির সাথে কেক কাটা পর্ব সম্পূর্ণ হল। রুমি কেকের প্রথম খণ্ডটা কেটে তার মাকে সবে খাওয়াতে নিয়েছে, এমনি সময় হঠাৎ গগনভেদী একটা আওয়াজে সবাই চমকে উঠে পিছনে তাকালো।

নীলাদ্রি এসে দাঁড়িয়েছে। তার দুচোখ স্থির, আর তা থেকে তীব্র ঘৃণা আর জিঘাংসার আগুন ঠিকরে বেরোচ্ছে। আগের মতই গগনভেদী আর কর্কশ গলায় সে বলে উঠল,”বিতান কোথায়? আমি বিতানকে নিয়ে যেতে এসেছি। চল বিতান।“

সমবেত লোকজনের মধ্যে একটা বিস্ময় আর আতঙ্কের ভাব তৈরী হল। বাচ্চারা ভয়ে যে যার বাবা মায়ের পিছনে মুখ লুকিয়েছে। বিস্ময় ভাবটা কেটে যেতেই একটা গুঞ্জন তৈরী হল। কয়েকজন জিজ্ঞেস করে বসল, “আপনি কে মশাই? বিতান কে?”

সম্মিলিত গুঞ্জন থেমে এল লোকটার হুঙ্কারে।“চুপ। কেউ একটাও কথা বলবে না। যার মুখ দিয়ে একটা আওয়াজ বেরোবে, তার জীবনের দায়িত্ব আমি নিতে পারব না।“

 রুমি তার বাপির পিছনে মুখ লুকিয়েছে ভয়ে। বিতানও বোধকরি তার মামার এমন বীভৎস রূপ কখনো দেখেনি,সেও এগিয়ে যাবার সাহস পাচ্ছে না। মীরা ভয়ে ভয়ে একবার আড়ে দেখল সুব্রতকে। তার চোখের মধ্যে ভয় আর প্রতিহিংসার একটা বিমিশ্র ভাব ফুটে উঠেছে।

 ঠিক তখনই ঘরজুড়ে একটা ভয়ের রোল উঠল।

কারণটা আর কিছুই নয়, নীলাদ্রির পকেট থেকে বেরিয়েছে একটা রিভলভার।

“চুপ। আমি বলছি কারো কোন ক্ষতি হবে না। বিতানকে ফেরত পেলেই আমি চলে যাব। কিন্তু কেউ কোন গোল করার চেষ্টা করবেন না। নিজের নিজের বাচ্চাকে সামলে রাখুন। আমার কথা অমান্য করলে কিন্তু আমি গুলি চালাতে বাধ্য হব।“

নীলাদ্রি সমবেত লোকজনের দিকে তাকিয়ে কথাগুলো বলছিল। আর সেই সুযোগে টেবিল থেকে কেক কাটার ছুরিটা নিয়ে একলাফে ফিরে এসে বিতানের গলায় ধরল সুব্রত। বিতান ভয়ে একটা অস্ফুট আর্তনাদ করে উঠল।

কর্কশ গলায় সুব্রত বলল,”খেলা শেষ নীলাদ্রি। তুমি কারো দিকে গুলি চালানোর চেষ্টা করলেই আমি ছুরিটা বিতানের গলায় বসিয়ে দেব। মানে মানে এখান থেকে ফিরে যাও নীলাদ্রি,নয়তো...”

নীলাদ্রি এক মুহূর্তের জন্য হতবাক হয়ে গিয়েছিল। তারপরেই সে হুঙ্কার ছেড়ে বলল,”ভুল করবে সুব্রত, খুব বড় ভুল করবে। আজকের নীলাদ্রি সেই পনেরো বছর আগেকার নীলাদ্রি নয়, জেনে রাখো। আজ তুমি আমার একটা ক্ষতি করলে আমি তোমার সর্বনাশ করে দেব। তুমি তোমার বৌ, তোমার মেয়ে এত লোক, কেউ বাঁচবে না।“

“ভুলে যেও না, তাতে তোমার বিতানও রক্ষা পাবে না।“

“আমি জানি তুমি বিতানকে কতটা ভালোবাসো। বিতানের কোন ক্ষতি তুমি মেনে নিতে পারবে না সে বিষয়ে আমি নিশ্চিত। কিন্তু পূর্বের ইতিহাস থেকে তুমি ভালো করেই জানো, আমার দয়ামায়া বলে কোন বস্তু নেই। প্রয়োজন হলে পনেরো বছর আগে যে কাজ অসমাপ্ত থেকে গেছিল, সেই কাজ করতে আমি পিছপা হব না। সুতরাং মানে মানে এখান থেকে বেরিয়ে যাও।“

মীরা ঘটনার আকস্মিকতায় একেবারে স্তম্ভিত হয়ে গিয়েছিল। সুব্রত আর নীলাদ্রির কথাবার্তার মাথামুণ্ডুও সে বুঝতে পারছিল না। সম্বিত ফিরে আসতেই সে সুব্রতকে চেঁচিয়ে বলল,”কি করছ? ছুরিটা ওর গায়ে লেগে যাবে তো।“

মীরা গিয়ে স্বামীর হাত চেপে ধরল। “ছেড়ে দাও, কি করছ কি, বিতানকে ধরে রাখতে হবে” বলে চেঁচিয়ে ওঠে সুব্রত। এর মধ্যেই সুব্রতর হাত একটু আলগা হওয়ায় বিতান নিজেকে ছাড়িয়ে নিয়ে ঘরের এককোণে সিটিয়ে দাঁড়িয়ে রইল।

নীলাদ্রির মুখে একটা চওড়া হাসি ফুটে উঠল।

“গুড জব বৌদি। এবার অনুগ্রহ করে বিতানকে আমার দিকে পাঠিয়ে দিন।বিতান ভয় পাচ্ছ কেন, আমি তোমার মামা না? আমি তোমার কোন ক্ষতি করতে পারি? আমার সঙ্গে বাড়ি চল, আমি তোমায় খুব সুন্দর একটা জিনিস দেব।“

বিতান তবু স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। মীরা বিতানের কাঁধে হাত রেখে দাঁড়িয়েছে। সুব্রত রাগে ফুঁসছে এখনো।

মীরা ভেবে পাচ্ছে না কি বলবে। এদিকে নীলাদ্রি রিভলভার তাক করে সন্তর্পণে এগিয়ে আসছে বিতানের দিকে।

সে কাছাকাছি আসতেই সুব্রত একটা ঘটনা ঘটাল।

সে নীলাদ্রির রিভলভার ধরা হাতটায় নিমেষে জোরে এক লাথি চালাল। নীলাদ্রি এ ঘটনার জন্য প্রস্তুত ছিল না মোটেই, তার হাত থেকে রিভলভারটা ছিটকে পড়ল। সুব্রতর চোখে হিংসার আগুন জ্বলছে, সে পর পর আবারো দুবার আঘাত করল নীলাদ্রিকে।

তারপর কলার ধরে বলল,”শুয়োরের বাচ্চা, কি ভেবেছিস তুই? আমার মেয়ের জন্মদিনে রিভল্ভার নিয়ে ভয় দেখিয়ে গুণ্ডামি করবি আমার বাড়িতে?তোকে আজ মেরে আধমরা করে তারপর পুলিশে খবর দেব,রাস্কেল।“

নীলাদ্রি বিস্মিত চোখে তাকিয়ে ছিল। প্রতি আক্রমণের দিকে সে গেলো না। এক মুহূর্ত কি ভাবল, তারপর সে সুব্রতকে এক ঝটকায় সরিয়ে দিয়ে বিতানের দিকে এগিয়ে গেল।

সুব্রত তাকে জাপটে ধরল। তারপর নীলাদ্রির সঙ্গে ধস্তাধস্তি শুরু হল সুব্রতর। সুব্রতর বলিষ্ঠ শরীর, নীলাদ্রি তার সাথে পারবে কেন? সুব্রত তাকে মারতে মারতে ঘরের বাইরে নিয়ে গেল।

ঘরের সবাই যেন এতক্ষণে চেপে রাকা নিঃশ্বাস্টা মুক্ত করল। কয়েকটা বাচ্চা ভয়ে কেঁদেও ফেলল। মীরা থুপ করে মেঝের উপর বসে পড়েছে। রুমি আর বিতান মীরার কাছে ঘেঁষে এসে বসল।


কয়েক মুহূর্ত কেটে গেল।ধীরে ধীরে সবাই প্রকৃতিস্থ হতে শুরু করল, দু একজন ভাবছিল এবারে পুলিশে খবর দেওয়া উচিত কিনা।আর ঠিক তার পরমুহুর্তেই ভয়ঙ্কর ঘটনাটা ঘটল।

প্রচণ্ড একটা বিস্ফোরণের আওয়াজে গোটা বাড়িটা কেঁপে উঠহল।এত সাংঘাতিক তার তীব্রতা, যে শব্দের অনুরণন চলতে লাগল কয়েক মিনিট ধরে।

কিছুক্ষণের জন্য গোটা বাড়িতে যেন শ্মশানের নিস্তব্ধতা নেমে এল। ভয়ে সবাই বোবা হয়ে গেছে। সবাই সামলে নেওয়ার খানিকক্ষণ পর কয়েকজন দৌড়ে গিয়ে দেখতে গেল ব্যাপারটা কি। মীরাও দমকটা সামলে নিয়ে ছুটল বিষয়টা দেখার জন্য।

বাইরে সারা পাড়া থেকে লোক বেরিয়ে এসেছে। রীতিমত আতঙ্কের সৃষ্টি হয়েছে গোটা এলাকায়। ভাগ্য ভাল ছিল যে রুমিদের বাড়ির সামনেটায় কোন ঘর ছিল না, ফাঁকা মাঠ,আর ব্লাস্টটা সেখানেই হয়েছে। আশেপাশে কয়েকটা পরিত্যক্ত ঝুপড়ি মত ছিল, সেখানে আগুন ধরে গেছে। মোটকথা, পাড়ার লোকের কোন প্রাণহানি হয়নি।

কিন্তু সুব্রত আর ঐ নীলাদ্রি?

মীরা ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে ছিল। আশেপাশের লোকেদের কোলাহল ওর কানে ঢুকছিল না। হঠাত করে ওর পা একটা কি জিনিসের উপর এসে পড়ল। ভয়ে শিউরে উঠে নীচের দিকে তাকাল মীরা। প্রথম দেখে মনে হল একটা ঝলসানো মাংসপিণ্ড, কিন্তু একটু ভালো করে খেয়াল করতেই মীরার সারা শরীরে একটা বৈদ্যুতিক শক লাগল, কারণ...ওটা...হাত। একটা দলাপাকানো ভস্মীভূত হাতের খণ্ড। আর সেই হাত কার বলে দিতে হয় না, তার কারণ সেই হাতে খুব চেনা একটা বিশেষ ব্র্যান্ডের ঘড়ির ডায়াল আমূল গেঁথে আছে।

সুব্রত!!!

মীরার মাথাটা ঘুরে উঠল। জ্ঞান হারানোর আগে সে শুনতে পেল, পাড়ার লোকেরা বলাবলি করছে, আরে এই লোকটা এখনো বেঁচে আছে যে, হাসপাতালে নিয়ে গেলে হয়তো বেঁচে যাবে।


৮।।

এই ঘটনার তিন চারদিন পরের কথা...

মীরা আর মীরার ভাই অদ্রিজকে থানার ওসি ডেকে পাঠিয়েছিলেন। ওরা এখন থানায় বসে। মীরা স্থির ভাবে বসে, মুখে কোন কথা নেই। অদ্রিজও চুপচাপ, তবে এর মধ্যে মোটামুটি নিজেকে সামলেছে সে।

ওসি একটা কাজে বাইরে গেছিলেন, ঘরে ঢুকে বললেন,”নমস্কার মিসেস দত্ত আর মিঃ বসু। আপনাদের মানসিক অবস্থা বুঝতে পারছি, সেজন্য দুঃখিত, কিন্তু বেশ কিছু চমকপ্রদ সত্য জানতে পেরেছি যেগুলো আপনাদেরও জানা দরকার। তাহলেই বুঝতে পারবেন, এই কেসটা কতটা ভয়ঙ্কর।“

অদ্রিজ বলল,”ভয়ঙ্কর বলতে কি বোঝাতে চাইছেন অফিসার? হ্যাঁ ঘটনাটা সত্যিই ভয়াবহ ও দুর্ভাগ্যজনক। আমরা এখনো ট্রমার মধ্যে রয়েছি। সবটাই তো এখনো ধোয়াশারই মতো।

“রয়েছে বইকি। আচ্ছা আপনি বলুন তো,বিস্ফোরণটা কিভাবে হল? কোন আইডিয়া?”

“এতো খুব সহজ। ওই লোকটা সম্ভবত মানববোমা হয়ে এসেছিল দাদাকে মারতে। বোমাটা ওর শরীরে বাঁধা ছিলো।“

“না, মিঃ বসু, যদি তাই হত তাহলে নীলাদ্রির অবস্থা ঠিক সেইরকম হত যেমন অবস্থা সুব্রতবাবুর হয়েছিল। নীলাদ্রিকে জীবিত অবস্থাতেই পেয়েছিলাম আমরা, গুরুতর আহত অবস্থায়। তার মৃত্যু হয়েছে কাল রাত্রিবেলায়।“

“তাহলে হয়তো সে তাক করে দাদার দিকে বোমাটা ছুঁড়ে মেরেছিল।“

“তাহলে সে গুরুতর আহত কেন হল? তা ছাড়া ইনভেস্টিগেশনে আমরা কোন ফিজিকাল বোমার ট্রেস পাইনি।“

“তাহলে আপনিই বলুন অফিসার। আমরা তো কিছু বুঝতে পারছি না।“

“বলছি। এই ঘটনার শুরু হয় আজ থেকে প্রায় পনেরো বছর আগে। কিছু তথ্য ইনভেস্টিগেশনে পেয়েছি, আর কিছু নীলাদ্রির জবানবন্দী।“

“সুব্রত তখন তরুণ, যুবাবয়েস। সদ্য সদ্য চাকরিতে ঢুকেছে। এমনি সময় সে ঘটনাচক্রে প্রেমে পড়ে সুনীতির। সুনীতি পড়ত সেকেন্ড ইয়ারে। গরিব ঘরের মেয়ে, বাবা নেই, ভাইটা ছোট, ক্লাস টেনে পড়ে। সংসারের রোজগার বলতে ছিল সুনীতির টিউশনি আর ওর মায়ের কয়েক বাড়ি কাজ।“

“জীবনে হঠাত করে বসন্ত এলে যা হয় আর কি, এক্ষেত্রেও তার ব্যতিক্রম হল না। ওরা দুজনে অপার সুখের সম্ভারে ডুব দিল, কিন্তু বুঝল না জল কত গভীর। হুঁশ হল যখন, তখন সুনীতি দুমাসের অন্তঃসত্ত্বা।“

“সুব্রত ভয় পেয়ে গেল। গরিব অসহায়া মেয়েদের সাথে ফুর্তি করলে তাদের হয়ে বলার কেউ থাকে না, কিন্তু ভগবান ঠিক জবাব দেন। সুব্রত দায়িত্ব নিতে প্রস্তুত ছিল না মোটেই। সুনীতি তাকে সন্তানের কথা বলতে এলে সে সরাসরি তাকে অস্বীকার করে, সম্মানহানির ভয় দেখায়। সুব্রত ভালো করেই জানত, এ নিয়ে থানাপুলিশ করার সাহস সুনীতির মত মেয়েদের হবে না, কারণ গরিব মানুষ একটা জিনিসই আঁকড়ে ধরে বাঁচতে চায়, সেটা হল সম্মান।“

“সুনীতি পড়া ছেড়ে দিল। মা আর ভাইকে নিয়ে সে অন্যত্র চলে গেল অজ্ঞাতবাসে। কারণ এ অবস্থায় পাড়ায় টেঁকা যায় না। সুনীতির মা তার মেয়ের এই ঘটনায় বেশ গুরুতর আঘাত পেয়েছিলেন, কারণ এর পর মাস তিনেকের বেশি আর বাঁচেননি তিনি। সুনীতি তার ভাইকে নিয়ে পড়ে গেল একা। ওই শরীর নিয়ে সুনীতির পক্ষে কাজ করা সম্ভব ছিল না, তাই ওইকটা জমানো টাকাতে খুব কষ্টেসৃষ্টে সংসার চলতে থাকে তাদের। সুনীতির ভাইয়ের স্কুলে যাওয়া বন্ধ হয়েছিল আগেই,এবারে সে কিছু ছুটকো ছাটকা কাজ করে আয় করার চেষ্টা করল।“

“যথাসময়ে সুনীতির একটি পুত্রসন্তান হল। দু একমাস যাবার পর সে হয়ত ভেবেছিল যে এবার হয়ত নতুন করে ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা শুরু করবে সে, কিন্তু এবারে সেই ভয়ঙ্কর ঘটনাটা ঘটল।“

“সুব্রত কিভাবে যেন তাদের খোঁজ পেয়ে গিয়েছিল। এতদিন বাদে হয়ত তার মনে আশঙ্কা দেখা দিয়েছিল যে ভবিষ্যতে সুনীতি কিংবা তার সন্তান বেঁচে থাকলে একটা বিপদের আঁচ রয়ে যেতে পারে, তাই সে গুন্ডা পাঠায় তাদের পুরো সংসারকে নির্বংশ করতে।“

“পরিকল্পনা মাফিক গুন্ডারা সুনীতিকে হত্যা করে, কিন্তু সুনীতির ভাই কোনরকমে বাচ্চাটিকে নিয়ে পালিয়ে যেতে সক্ষম হয়।“

“সুনীতির ভাই কোলের বাচ্চাটিকে নিয়ে কলকাতা থেকে দূরে চলে যায়। অতিকষ্টে ওই দুমাসের শিশুকে দেখভাল করার সাথে সাথে সে নিজের পড়াশুনা চালিয়ে গেল, একদিন কলেজেও ভরতি হল। ততদিনে বাচ্চাটি খানিকটা বড় হয়েছে। তবে সমস্যা একটাই, বাচ্চাটি কথা বলতে পারে না। জন্ম থেকেই সে বোবা।“

“যাই হোক, দুঃখের প্রহর শেষে সুখের পায়রা হাসে। সুনীতির ভাই কেমিস্ট্রিতে মাস্টার্স করল, একটা কলেজে জবও পেয়ে গেল। ততদিনে বাচ্চাটি স্কুলে ভরতি হয়েছে, ওয়ানে পড়ে। কলেজে পড়ে টিউশন করে রোজগার চালাত মোটামুটি, কিন্তু চাকরিটা পেয়ে যেতেই তাদের দুজনের সংসার মোটামুটি সচ্ছল হয়ে উঠল।“

“এবার সে ঠিক করল, তাদের সাথে ঘটে যাওয়া দুদফায় হওয়া অন্যায়ের শোধ সে তুলবেই। সুব্রতকে সে চরম শাস্তি দেবে। তার প্রস্তুতি নেওয়া শুরু হল। কলকাতার কলেজেই চাকরি হয়েছিল তার, তাই সে আবার ফিরে এলো কলকাতাতেই। ভাগ্নেকে সে এখানের একটা স্কুলে ভরতি করে দিল।“

“সুনীতির ভাই খুব মেধাবী ছাত্র ছিল। কেমিকাল নিয়ে রিসার্চ করার ন্যাক ছিল কলেজ থেকেই। সে ঠিক করল সুব্রতকে সে উপহার দেবে বীভৎস এক মৃত্যু, যাতে করে তার বোন আর মায়ের আত্মা শান্তি পায়। তাই সে গবেষণা করা শুরু করল বাড়িতেই ল্যাব বানিয়ে। দীর্ঘ পাঁচবছর গবেষণা করে সে আবিষ্কার করল একটা সাংঘাতিক অস্ত্র।“

“অস্ত্র?” অদ্রিজ জিজ্ঞাসা করল।

“হ্যাঁ, বায়োলজিকাল ওয়েপন। আজ অবধি পৃথিবীতে এমন অস্ত্র কেউ বানাতে পারেনি।“

“কিরকম?”

“বলছি। আপনি মানববোমার কথা বলছিলেন না? এটাও মানববোমাই, তবে পার্থক্য এটাই যে এই মানববোমা কোন ডিভাইস নয়, এটা মানবকোশের একটা মারণ রূপান্তর।“

“আমরা সুনীতির ভাই ওরফে নীলাদ্রির বাড়ি খানাতল্লাশি করে অনেক গবেষণার কাগজপত্র আর বেশ কিছু কেমিক্যালের স্যাম্পেল পেয়েছি। নীলাদ্রি এমন একধরনের কেমিক্যাল বানিয়েছিল যা মানবদেহে প্রয়োগ করলে সেটা তার দেহের কোশগুলোর চরিত্র পাল্টাতে শুরু করে। এইভাবে সমস্ত কোশগুলি পালটে যায় এবং তার মধ্যে একটা দ্বৈত ধর্ম দেখা যায়। স্বভাবে এই কোশগুলো নরমাল সেলের মতই, কিন্তু এদের রিমোট দিয়ে একটিভেট করলে এরা কয়েক মিনিটের মধ্যে বিস্ফোরণে সেই মানুষটিকে ও তার চারপাশের জায়গাকেও ধ্বংস করতে পারে।“

“হোয়াট।“

“হ্যাঁ এসব তথ্যই আমরা ওনার রিসার্চ জার্নাল ঘেঁটে পেয়েছি। আমাদের ফরেন্সিক ডক্টরেরাও চেক করেছেন। বায়োলজিকাল ওয়েপনের কথা হয়ত অনেক শুনেছেন, যেমন বিভিন্ন ভাইরাস, যা মানবদেহে নানা সংক্রামক ব্যাধি ছড়ায়। কিন্তু এরকম বায়োলজিকাল বম্ব বিশ্বে কেউ কোনদিন বানাতে পারেনি। স্যাম্পেলটা বিভিন্ন ল্যাবে পাঠানোর ব্যাবস্থা হয়েছে, এখানকার সায়েন্টিস্টরা এমনও বলেছেন যে এর এনালিসিস করাটা একটা দুরূহ ব্যাপার হতে পারে, কারণ এরকম বোম সত্যিই হতে পারে কিনা আর এটা তৈরী করতে কোন পথে অগ্রসর হওয়া উচিত, তার ছিটেফোঁটা জ্ঞানও আজকের বিজ্ঞানী মহলে নেই। সেদিক দিয়ে দেখতে গেলে নীলাদ্রি ছিল মানবজাতির বিস্ময়। তবে সময়মতন রহস্য উদ্ঘাটন না হলে এই অস্ত্র যদি কোনভাবে নাশকতাবাদীদের হাতে চলে যেত, তাহলে গোটা পৃথিবী জুড়ে কি ধ্বংসলীলা চলতে পারে,তা ভাবলেই হাত পা ঠান্ডা হয়ে যায়। আমরা খুব কনফিডেনশিয়ালি ওটাকে সরানোর ব্যাবস্থা করেছি।“

ইন্সপেক্টর থামলেন। মীরা আর অদ্রিজ দুজনেই বোবা হয়ে গেছে। মিনিটখানেক পর নিস্তব্ধতা ভেঙ্গে অদ্রিজ আপনমনে বলে উঠল,”এত ভয়ঙ্কর প্ল্যানিং! কিন্তু স্যার, ওই লোকটা দাদার উপর কেমিক্যালটা কি করে প্রয়োগ করেছিল?”

“হ্যাঁ, বলছি। নীলাদ্রি এক্ষেত্রে ড্রোনের সাহায্য নিয়েছিল,যেমনভাবে সে সুব্রতবাবুর গতিবিধির উপর নজর রাখত। একটা আধ ইঞ্চি সিরিঞ্জ পরিমাণ কেমিক্যালই মানুষকে বোমা বানাতে যথেষ্ট। ভিড়ের সুযোগ নিয়ে কোনভাবে সে এই কাজটা করেছিল, সুব্রত বুঝতেও পারেনি। প্রয়োগের পর মানুষ সম্পূর্ণ রূপে বোমা হতে মোটামুটি আট দশ দিন সময় লাগে। ট্রান্সফরমেশন শুরুর দিকে নানান পিকিউলিয়ার কন্ডিশন সে ফেস করতে পারে, যেমন ব্রেইন ফগ,স্মৃতিভ্রংশ বা মস্তিষ্কের সাময়িক কার্যলোপ ইত্যাদি। মীরাদেবী, আপনি তো সুব্রতবাবুকে প্রথম থেকে দেখেছেন, ওনার কোন অস্বাভাবিকতা লক্ষ্য করেছিলেন কী?”

মীরা কলের পুতুলের মতন একদিকে ঘাড় নাড়ল।

অফিসার বলে চললেন,”যদিও এটা বেশিদিন স্থায়ী হয়না। কিছুদিনের মধ্যেই সে স্বাভাবিক হয়ে যায়, সেই সাথে হয়ে ওঠে ভয়ঙ্কর বোমা।“

“সাধারণত, একজন বোমা মানুষ আর সাধারণ মানুষে কোন পার্থক্য থাকে না। সে খাওয়াদাওয়া চলাফেরা সবকিছুই করতে পারে স্বাভাবিক ভাবে। তাকে এক্সপ্লোড করতে গেলে রিমোটের প্রয়োজন হয় যা তার শরীরের কোশ গুলিকে বিস্ফোরিত হবার জন্য লোড করে দেয়। এর পাঁচ মিনিটের মধ্যেই অবধারিত বিস্ফোরণ। তবে খুব বেশি ধাক্কাধাক্কি বা অনবরত বডি শক পেলেও ব্লাস্ট হতে পারে। এক্ষেত্রে সেটাই হয়েছিল আমার অনুমান, কারণ আপনারা স্বীকার করেছেন যে সুব্রত ও নীলাদ্রি লড়াই করছিলেন। নীলাদ্রি হয়ত একটু দূরে সরে গেছিল যেই সময় ব্লাস্ট টা ঘটে।“

“নীলাদ্রির প্ল্যান পুরোপুরি সাকসেসফুল ছিল। সে বিস্ফোরণের দিনক্ষণ হিসেবে রুমির জন্মদিনটাকেই বেছে নিয়েছিল, কারণ একটা নাটকীয়তা। অনেক লোক সমাগম হবে, তারপর নিমেষে সব সাফ। প্রতিশোধও চরিতার্থ হবে, সুব্রতর পরিবারও নির্বংশ হবে, এই মারণবোমার ক্ষমতা কতদূর তার টেস্টিং ও হয়ে যাবে। এক ঢিলে তিন পাখি। আসলে ছোট থেকে প্রতারণা পেয়ে পেয়ে নীলাদ্রি এক নৃশংস নরদানবে পরিণত হয়েছিল। কিন্তু একটা ছোট্ট ভুলের জন্য তার কার্যসিদ্ধি হল না, আর আপনারাও প্রাণে বেঁচে গেলেন। কার জন্য বলুন তো?”

ইন্সপেক্টরের হুকুমে একজন কনস্টেবল একটা বাচ্চা ছেলেকে নিয়ে ঢুকল। মীরা অস্ফুটে বলল,”বিতান!”

“হ্যাঁ, বিতানকে আমরা নিয়ে এসেছিলাম, তারপর থেকে এখন আমাদের কাছেই রেখেছি ওকে। খুব বুদ্ধিমান ছেলে, সুন্দর ছবি আঁকে, শুধু কথা বলতে পারে না এই যা। লিখে লিখে অনেক আলাপ হয়েছে ওর সাথে। জানতে পেরেছি, ওর মামা ওকে খুবই ভালোবাসত। আর ওর জন্যই তো, নীলাদ্রির আর বোতাম টেপা হল না, কারণ যদি সব শুদ্ধ ধ্বংস হয়, তাহলে বিতানও তো...। সেই জন্যই তো প্রাণপ্রিয় ভাগ্নেকে বাঁচাতে ছুটে গিয়েছিল সেদিন নীলাদ্রি।“

অদ্রিজ বলল,”বিতানের মামা জানতেন না যে ও আজ এখানে আসবে?”

“সে কথাও ওকে জিজ্ঞেস করেছি। বিতান বলেছিল নীলাদ্রিকে যে আজ ওর এক বন্ধুর বাড়ি নিমন্ত্রণ আছে, তবে কোন বন্ধু সে নাম বলেনি। প্রতিশোধ নেশায় উন্মত্ত নীলাদ্রিও আর ব্যাপারটা যাচাই করে দেখেনি সেদিন। তাই হয়ত মিসটেকটা হয়ে গেছে।“

ইন্সপেক্টর কাহিনী শেষ করলেন। তারপর বলে চললেন ধীর গলায়,

“জানেন মিসেস দত্ত, মিঃ বসু, এ ঘটনায় আপাতদৃষ্টিতে দুঃখ জনক কিছুই নেই, তার কারণ সুব্রত ছিল একাধারে প্রতারক ও খুনি , এবং নীলাদ্রি ছিল বদ্ধ উন্মাদ, যদিও তার মাথাটা ছিল এসেট। কিন্তু যাই বলুন না কেন, কষ্ট শুধু এক জায়গায়, কেন বলুন তো? এই ছেলেটির জন্য।“

পরম স্নেহে বিতানের মাথায় হাত বুলিয়ে তিনি বললেন,”ছেলেটা কথা বলতে পারে না, ছোট বেলায় মাকে হারিয়েছিল, এখন ওর মামাকেও হারালো। হোক ওর মামা পাগল খুনি, তবু ওকে তো সত্যিকারের ভালোবাসত। ওর জন্য অন্তত নীলাদ্রির মনে এতটুকু ছিদ্র ছিল না। এখন আর ওর কেউ রইল না। হয়ত এখন থেকে অনাথ আশ্রমই হবে ওর ঠিকানা।“

“এই ছিল গোটা কেসটার কাহিনী। আপনারা এখন আসতে পারেন।“

“দাঁড়ান।“

মীরার গলায় থমকে গেলেন ইন্সপেক্টর। বললেন,”কিছু বলবেন?”

“আমি এই বাচ্চাটিকে আমার সঙ্গে নিয়ে যেতে চাই।“

 ঝিমিয়ে পড়া বিহ্বল স্বরে নয়, রীতিমত আত্মবিশ্বাসের সাথে বলল মীরা।

“আপনি?”

“হ্যাঁ আমি। ও আমার স্বামীর সন্তান। আমার স্বামী অন্যায় করেছিলেন, ঠকিয়েছিলেন ওদের সকলকে,কাউকে না কাউকে তো এর প্রায়শ্চিত্ত করতেই হবে। সুব্রত তার শাস্তি পেয়েছে,আমি তার জন্য এতটুকু দুঃখিত নই। কিন্তু এই ছেলেটাকে এখন অনিশ্চিত ভবিষ্যতের দিকে ঠেলে দিলে আমি যে নিজেকে কোনদিন ক্ষমা করতে পারব না অফিসার।“

ইন্সপেক্টর প্রসন্নবদনে বললেন,” ঠিক আছে, আপনি যখন চাইছেন, আমাদের দিক থেকেও কোন সমস্যা নেই।“

মীরা বিতানের মাথায় হাত বুলিয়ে স্নেহমাখানো কণ্ঠে জিজ্ঞেস করল,”কিরে বিতান, তুই এই মাসির সঙ্গে থাকবি না? ধরে নে আজ থেকে আমি তোর নতুন মা।“

বিতানের মুখে এক ঝিলিক হাসি খেলে গেল।


                                          




Rate this content
Log in

More bengali story from Shubhranil Chakraborty

Similar bengali story from Classics