নন্দা মুখার্জী

Classics

3  

নন্দা মুখার্জী

Classics

ভোলা যায়না

ভোলা যায়না

3 mins
607


 না,অঙ্কুশকে আজও সুমনা ভোলেনি  ।কি করে ভুলবে?এতো স্মৃতি কি ভুলে থাকা যায়।স্মৃতির খাতায় ময়লা জমলেও অক্ষরগুলো আজও বড্ড স্পষ্ট।মনেহয় এই তো সেদিনের কথা।

   সেদিন খুব বৃষ্টি হচ্ছিলো।সুমনা ওরফে সুমি গীতবিতান হাতে করে দোকানের একটা শেডের নিচে দাঁড়িয়ে ছিলো।পুরো ভিজেই গেছিলো।বইটাকে ভেজার হাত থেকে বাঁচাতে দোকানের দিকেই মুখ করে দাঁড়িয়েছিল।কলেজস্ট্রীটের ছোট্ট ছোট্ট বই এর দোকানে দাঁড়ানোর কোন জায়গাও থাকেনা।হঠাৎ মনেহল কেউ পিছনে ছাতা খুলে এসে দাঁড়ালো।কিন্তু সামনের দিকে ফেরার কোন উপায়ও নেই।আস্তে আস্তে বৃষ্টিটা কিছুটা কমে গেলে সুমনা পিছন ফিরে অঙ্কুশকে দেখেই বলে, 

---আরে তুই এখানে? 

---ওমা তুই?পিছন দিক থেকে দেখে তোকে চিনতেই পারিনি।বাব্বা কি মোটা হয়েছিস তুই!ছিলি তো একটা কঞ্চির মত। 

---এখনও ভুলিসনি ওই কঞ্চি ডাকটা? 

---আরে কি করে ভুলবো তোকে?তুই তো আমাকে কোনদিন পাত্তায় দিলিনা। 

--উফ্ফ্ফ সেই একই রকম থেকে গেছিস।ইয়ার্কি আর ইয়ার্কি!কেমন আছিস বল আর এখন তুই কি করছিস? 

--- মা, বাবার কপাল জোরে ব্যাংকে একটা কেরানির চাকরী পেয়ে গেছি।দু'বছর ধরে কেরানিগিরি করছি।

---মাসিমা,মেশোমশাই এর কপাল গুনে পেয়েছিস?কেন নিজের কপাল গুনে নয় কেন? 

---আমার কপাল?ও তো ভাঙ্গা কপাল।যেমন ধর, কলেজলাইফ থেকে একটা মেয়েকে ভালোবাসি।তাকে যখনই বলি সেকথা আর সে কিনা ভাবে আমি ইয়ার্কি করছি! 

---আর পারিনা তোকে নিয়ে।আমি কিছুতেই তোকে বুঝাতে পারলামনা বিয়ে আমার কপালে নেই। 

   কথা বলতে বলতে ওরা অনেকটাই এগিয়ে এসেছে।অঙ্কুশের অনুরোধে কফি হাউজে ঢোকে ওরা দু'জনে কফি খেতে।অঙ্কুশই শুরু করে আবার, 

---হ্যাঁ কি যেন বলছিলি? বিয়ে তোর কপালে নেই? আরে ছেলে রেডিবিয়ে করতে আর মেয়ে বলে, 'বিয়ে কপালে নেই?'এর মানেটা কি? 

---অঙ্কুশ অনেক কথা আছে যা মুখে বলা যায়না।আমার সম্মন্ধে যদি পুরোটা জানিস তাহলে তোর মাথা থেকে আমাকে বিয়ে করার ভূতটা নেমে যাবে। 

---হ্যাঁ সেটাই তো আমি জানতে চাই। 

---নিজের মুখে নিজের জীবনের কলঙ্কিত অধ্যায়ের কথা কি করে বলি বলতো? 

  এর মধ্যে কফি এসে যায়।কফির কাপে চুমুক দিতে দিতে অঙ্কুশ বলে,

---ভনিতা না করে বলতো সব।বিশ্বাস কর তোকে ভালোবাসি বলেই আজও আমি বিয়ে করতে পারিনি।কিছুতেই তোকে ভুলতে পারিনা।তোর সাথে দেখা না হলে কি হবে?প্রতিটা ক্ষণ প্রতিটা মুহূর্ত আমি তোকে মিস করি।

---আমার সব কথা জানলে তুই আমায় ঘৃণা করবি। 

---আর কিন্তু আমি ধর্য্য ধরতে পারছিনা।হয় বল নাহলে আমার প্রস্তাবে রাজি হয়ে যা। 

   সুমনা কিছুক্ষণ গুম মেরে বসে থেকে শুরু করে।আগে এখানে আমাদের বাড়ি ছিলোনা।আমাদের বাড়ি ছিলো আসামে। বিশেষ কারনবশত ওই বাড়ি বিক্রি করে এই কলকাতায় আমরা চলে আসি। আর সেই কারনটা হল যখন আমার বয়স বারো বছর একদিন স্কুল থেকে আসার পথে আমি রেপড হই।বলতে গেলে মরেই গেছিলাম।বাবা সেই সময় আসামের ডাক্তারের পরামর্শমত আমার ভালোভাবে চিকিৎসা করার জন্য কলকাতা নিয়ে আসেন।তখন ওই ঘটনা নিয়ে ওখানে তোলপাড়।আমি সেই যে আসি আর কখনোই আসামে ফিরিনা।আমি হাসপাতাল ভর্তি থাকার সময়েই বাবা একটা ঘর ভাড়া করে মাকে সেখানে রেখে আসাম ফিরে যান এবং সাত দিনের মধ্যে বাড়ি ঘর বিক্রি করে কলকাতায় পাকাপাকিভাবে চলে আসেন।সেই থেকে আমরা এখানেই আছি।আমি কি করে এই অপবিত্র জীবনের সাথে তোর মত একটা মানুষের জীবন জড়াবো? 

---অঙ্কুশ হো হো করে হেসে উঠে বলে, 

---যে ঘটনার জন্য তুই দায়ী না তারজন্য নিজেকে অপরাধী বানিয়ে আমার জীবনটাকেও নষ্ট করতে চাচ্ছিলি? 

---মানে ? 

---দূর বোকা!আমি তোকে ভালোবাসি তোর অতীতকে নয়।ভাগ্যিস তোকে জোর করলাম।তাই তো সব জানতে পারলাম।এখন বল তুই আমায় ভালোবাসিস তো ? 

---তুই বুঝিসনা? 

   লাফ দিয়ে অঙ্কুশ উঠে দাঁড়িয়ে বললো, 

---চল। 

---কোথায়? 

---তোদের বাড়িতে।মাসিমা,মেসোমশাই এর কাছে।বিয়ের প্রস্তাব দেবো। 

---আরে এতো তাড়া কিসের? 

---অনেকগুলো বছর নষ্ট হয়ে গেছে।আর এক মুহূর্ত সময় নষ্ট করবোনা।তুই এখানে দাঁড়া আমি রাস্তা ক্রস করে একটু মিষ্টি কিনে নিয়ে আসি।

   ছুটতে ছুটতে অঙ্কুশ রাস্তা পার হয়ে বড় এক প্যাকেট মিষ্টি কিনে ----না,ফিরে আর সুমনার কাছে আসতে পারেনা।ট্রাফিক সিগনালের জন্য তার আর তর সয়না।সে ছুটেই রাস্তা পার হতে যেয়ে দুরন্ত গতিতে ছুটে আসা একটি বাসের তলায় পিষ্ট হয়ে যায়।সুমনা দেখতে পায় তার ভালোবাসা রক্তের বন্যায় ভেসে যাচ্ছে।

    মুহূর্তের মাঝে জীবনের সমস্ত রং মুছে গিয়ে সাদা আবরণে তাকে ঢেকে দিলো। 


(বিষয় -দুর্ঘটনা)


Rate this content
Log in

Similar bengali story from Classics