Exclusive FREE session on RIG VEDA for you, Register now!
Exclusive FREE session on RIG VEDA for you, Register now!

নন্দা মুখার্জী

Abstract Others


3  

নন্দা মুখার্জী

Abstract Others


গোপনই থাক

গোপনই থাক

2 mins 152 2 mins 152


  কলেজ ক্যান্টিনে জোরদার আড্ডা চলছে | আজ ধনীর দুলালী বিদীপ্তার জন্মদিন উপলক্ষে তার ঘনিষ্ঠ বন্ধুদের ট্রিট দেবে সে | কিন্তু সবাই এসে গেলেও শুভদীপের পাত্তা নেই | টিফিন আওয়ারের পরের ক্লাসটা অফ থাকাই সবাই তার আসা অবধি অপেক্ষা করতে থাকে | শেষে যখন সে এলো অনেকেই তার দিকে তেড়ে গেলো মারতে | কেউ ঠেকালো আবার কেউবা দুএক ঘা পিছনে বসিয়েই দিলো | বিদীপ্তা কিন্তু চুপচাপ বসে | সে অপলক তার প্রথম ভালোবাসার মানুষটার দিকে তাকিয়ে | 

  পৃথিবীর যত প্রেম , ভালোবাসা - বাস্তবে যা ঘটে , গল্প যেগুলি পড়া হয় , সিনেমা বা সিরিয়ালে যা দেখা হয় ; ভালোবাসার সাথে কষ্ট কিংবা বিরহ যেন একে অন্যের উল্টোপিঠ | আর সে ভালোবাসা যদি একতরফা হয় তাহলে তো কথাই নেই | বিদীপ্তার ভালোবাসাটাও ছিল ঠিক তাই | 

 শুভদীপ মধ্যবিত্ত পরিবারের বড় ছেলে | পাঁচ ভাইবোন ওরা | বাবার একটি স্টেশনারি দোকান আছে | অভাব নিত্য সঙ্গী | বড় পুত্রের মুখের দিকে তাকিয়ে গোটা পরিবার | চাকরির বাজার আজও যেমন তখনও ঠিক তেমনই ছিল | তবুও আশায় বুক বেঁধে সকলেই | শুভ পাশ করে যদি একটা চাকরি পায় | শুভদীপ সকাল সন্ধ্যা বেশ কয়েকটি টিউশনি করে | নিজের খরচ ছাড়াও মায়ের হাতে যত্সামান্য যখন যেমন পারে দিয়ে থাকে | কোন মেয়েকে নিয়ে স্বপ্ন দেখার সাহস কিংবা ইচ্ছা তার ছিলোনা | সুপুরুষ বলতে যা বোঝায় শুভদীপ ছিল ঠিক তাই | ছফুট লম্বা , চোখদুটি যেন কথা বলে | চোখ দেখে অনেকেই বলে সে নাকি কাজল পরে | আদতে তার চোখদুটিই অমন সুন্দর |মাথা ভর্তি চুল | তাই কলেজের মেয়েগুলির নজরটাও তার দিকেই থাকে | কিন্তু তার মাথায় সবসময় একটাই চিন্তা তার পরিবারটিকে কিভাবে দারিদ্রের অভিশাপ থেকে মুক্ত করবে | 

 স্মার্ট ,সুন্দরী বড়লোকের একমাত্র মেয়ে হয়েও সে এই অতিসাধারণ ঘরের ছেলেটিকে মনেমনে ভালোবেসে ফেললেও মুখে বলতে কোনদিনও সাহস পায়নি | শুভদীপের একটু সঙ্গ পেলেই বিদীপ্তার সেই দিনটা যেন ঘোরের মধ্য দিয়েই চলে যেত | শুভদীপ আর পাঁচটা মেয়ের মতই বিদীপ্তার সাথেও  হাসি , ঠাট্টা করতো | বিদীপ্তাদের বাড়িতে লক্ষীপূজায় প্রতিবছর বন্ধুদের নিমন্ত্রণ করে কিন্তু কোনবারই শুভদীপ যায়না | তারও অবশ্য কারণ আছে | শুভদীপ ব্রাহ্মণ | ঐদিন সে কিছু পুজো করে | অভাবের সংসারে একটু তো উপকার হয় | কিন্তু একথা বন্ধু মহলে সে কোনদিন প্রকাশ করেনি | সবাই হাসাহাসি করবে এই ভয়ে | 

 বিদীপ্তাদের বাড়িতে যে ঠাকুরমশাই পুজো করেন তিনি এবছর পুজো করতে পারবেন না | কারণ তার কাল অশৌচ | মহা ফ্যাসাদে পড়েছে তারা | বন্ধু মহলে একথা বলতেই নীল বলে উঠলো ,

--- এই শুভ তুই তো বামুন , পৈতেও গলায় আছে | পুজো করতে পারিস ?দে না ওদের বাড়ির পুজোটা করে | পুজো করে যা পাবি আমরা তা দিয়ে ফিস্ট করবো | 

 বলেই সে হাসতে লাগলো |

 শুভ বিদীপ্তার মুখের দিকে তাকিয়ে বললো ,

--- সত্যিই যদি ঠাকুরমশাই না পাস আমায় একদিন আগে জানাবি কিন্তু আমার যেতে রাত হবে | 

 এবার বিমল শুভকে ধাক্কা দিয়ে বলে উঠলো ,

--- তুই সত্যি পুজো করতে পারিস |

--- কেন পারবো না ?

 বিদীপ্তা তাদের বাড়িতে শুভকে নিয়ে যাওয়ার এ সুযোগ হাতছাড়া করলো না | একটু দূরে শুভদীপের বাড়ি বলে সে পুজোর দিন গাড়ি পাঠিয়ে শুভকে তাদের বাড়িতে নিয়ে গেলো | বাবাকে আগেই জানিয়ে রেখেছিলো ঠাকুরমশাই সে ঠিক করে রেখেছে | তাই তার বাবা অন্য কোন ঠাকুরমশাই আর খোঁজেননি | 

 ধুতি , পাঞ্জাবি পরে শুভ যখন গাড়ি থেকে নামলো তখন সে জামাই নাকি ঠাকুরমশাই সেটা বুঝতে অনেকেরই ভ্রম হবে | হাতে পিতলের আসনে তার নারায়ন | নারায়ন হাতে বাড়িতে ঠাকুরমশাই আসলে অনেকেরই বাড়িতে নিয়ম আছে পিতলের ঘটিতে করে জল এনে  ঠাকুরমশাইয়ের পা ধুয়ে দিতে হয় | প্রতিবার এই কাজটি বিদীপ্তার মা করলেও এবার বিদীপ্তা যেন রেডি হয়েই ছিল | কিন্তু শুভ পড়লো অস্বস্তিতে | সে বারবার বিদীপ্তাকে নিষেধ করছে আর বিদীপ্তাও কাজটি করবে | শেষে বিদীপ্তার মা এসে বললেন ,

--- এটা আমাদের পরিবারের নিয়ম বাবা | তোমার বন্ধুকে ধুতে না দিলে আমাকেই কাজটি করতে হবে |

--- ওরে বাবা !সেতো আরও বিপদ | না তুইই ধুয়ে দে |

 শুভর পুজো করা দেখে সবাই খুব খুশি হয়েছিল | এটা যে তার প্রথম পুজো নয় তা পুজোর ধরণ দেখেই বুঝে গেছিলো সবাই | দক্ষিণাও পেয়েছিলো আশাতীত | সেই থেকে শুভই বিদীপ্তাদের বাড়ির ঠাকুরমশাই হয়ে গেলো | 

 পাশ করে বেরিয়ে শুভ তার সামান্য শিক্ষাগত যোগ্যতা দিয়ে কোন চাকরি খুঁজে পেলোনা | পুজো করাটাকেই সে তার প্রফেশন করে নিলো | আস্তে আস্তে সে বিয়ে , অন্নপ্রাশন , শ্রাদ্ধ - সবকিছু শিখে নিলো | গীতাপাঠ শুদ্ধভাবে উচ্চারণ করার জন্য বীরেন্দ্র কৃষ্ণ ভদ্রের ক্যাসেট এনে বাজিয়ে শুনতো | জোরে জোরে শুদ্ধ উচ্চারণে সে সমস্ত মন্ত্রপাঠ করতো | সুন্দর চেহারা আর শুদ্ধ মন্ত্র উচ্চারণ --- বেশ ভালোই কাজ পেতে থাকলো শুভদীপ | সাথে টিউশনি | কিছুটা হলেও পরিবারের অবস্থার উন্নতি হল | 

 একজন পুরুত ঠাকুরের সাথে যে মেয়ের বিয়ে দেবে না বাড়ির লোক এটা বিদীপ্তা ভালোভাবেই জানতো | তাই শুভকে ভালোবাসার কথাটা বুকেই রেখে দিয়েছিলো সে মুখে আনতে পারেনি কোনদিন | বিদীপ্তার বিয়ের পুরোহিতও ছিল শুভ | বুকের ভিতর হাতুড়ি পেটানোর শব্দ নিজেই চাপা দেওয়ার চেষ্টা চালিয়ে গেছিলো | বিয়ের পর চলে গেলো বিদীপ্তা আমেরিকায় | 

 যুগের পরিবর্তন হয়েছে | মুঠোফোন এখন হাতে হাতে | বছর খানেক পর বিদীপ্তা বাপের বাড়িতে আসলে ওর মা সত্যনারায়ণ পুজো দেওয়ার জন্য শুভকে ফোন করেন | বিদীপ্তা তার সেলে শুভর নম্বরটা সেভ করে নেয় | এবারেও বিদীপ্তা শুভ নারায়ণ নিয়ে আসলে তার পা ধুইয়ে দেয় | মামুলি কথাবার্তা হয় | মাসখানেক থেকে বিদীপ্তা ফিরে যায় তার প্রবাসী স্বামীর কাছে | এর মাসদুয়েক পরে বিদীপ্তা ফোন করে শুভকে | শুভ বিদীপ্তার কথা শুনে আনন্দে আত্মহারা হয়ে যায় | বিদীপ্তা তাকে প্রস্তাব দেয় ওখানকার বাঙ্গালী এসোসিয়েশন ওরা যে চত্বরে থাকে সেখানে এ বছর থেকে দূর্গাপূজা করতে চায় | শুভর যদি আপত্তি না থাকে তাহলে প্রতিবছর পুজোর সময় সে আমেরিকা গিয়ে বেঙ্গলী এসোসিয়েশনের পুজোটা করতে পারে | এই এসোসিয়েশনই যাতায়াতের টিকিট , থাকা , খাওয়া ব্যবস্থা ছাড়া হাতে এক থেকে দেড়লাখ টাকা দক্ষিণা দেবে | আস্তে আস্তে এই টাকাটা বাড়বে বৈ কমবে না | তাছাড়া প্রণামী , পুজোর অন্যান্যদক্ষিণা সব ঠাকুরমশাইয়ের | শুভ প্রস্তাবটা লুফে নিলো |

 সেই থেকে আজ বারো বছর শুভ আমেরিকা গিয়ে বিদীপ্তার বাড়িতে উঠে প্রায় কুড়ি থেকে পঁচিশদিন থাকে | দুর্গাপুজোর আগে যায় আর কালীপুজো শেষ করে ফেরে | বিদীপ্তা তার সমস্ত মনপ্রাণ উজাড় করে এই কটাদিন শুভর সেবা করে | শুভদের পরিবারে এখন কোন অভাব নেই | বোনদের বিয়ে দিয়েছে ভালো ঘরেই , ছোট ভাইকে ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ানোর ইচ্ছা আছে | বাড়িটার সংস্কার করেছে | বাবা মাঝে মধ্যে এখনো দোকানটা খোলেন | মাসের প্রায় প্রতিটাদিনিই শুভর কোন না কোন কাজ থাকে | আমেরিকার ওই পুজোর পরিচয়ের সূত্র ধরে তাদের এখানকার বাড়িগুলিতেও এখন ঠাকুরমশাই সে | টাকা তারা বেশ ভালোই দেয় | 

 আর বিদীপ্তা তার প্রথম ভালোবাসাকে নিজের করে না পেলেও শুভর এই আর্থিক উন্নতিতে সে ভীষণ খুশি | ভালোবাসা যে সবসময় ভোগেই আনন্দ দেয়না -- ত্যাগ করে তার বিপদে আপদে তার পাশে থেকে তার উন্নতিতে হাত বাড়িয়ে দিতে পারার মধ্যে যে কত আনন্দ বিদীপ্তা সেটা আজ ভালোভাবেই বুঝতে পেরেছে | যে কষ্টটা সে এতো বছর ধরে পেয়ে এসেছে আজ তার নিজের চেষ্টায়  শুভর উন্নতি দেখে তার মনেহয় তার ভালোবাসার কথা শুভকে না জানিয়েই মনেহয় সে ভালো করেছিল | 



Rate this content
Log in

More bengali story from নন্দা মুখার্জী

Similar bengali story from Abstract