Best summer trip for children is with a good book! Click & use coupon code SUMM100 for Rs.100 off on StoryMirror children books.
Best summer trip for children is with a good book! Click & use coupon code SUMM100 for Rs.100 off on StoryMirror children books.

Shubhranil Chakraborty

Abstract


3  

Shubhranil Chakraborty

Abstract


ডিম‌ওয়ালী

ডিম‌ওয়ালী

8 mins 11.7K 8 mins 11.7K

“ডিম আছে গো বাবু, দেশী ডিম।“

জানলার দিকে মুখ করে বসেছিলাম, কথাগুলো খট করে কানে এসে লাগল। এমন আওয়াজে অনভ্যস্ত আমি, তা বললে ভুল হবে, কারণ এ লাইনে প্রায়ই যাতায়ত করি, এবং এখানে ডিমওয়ালাদের প্রাচুর্য (অথবা উৎপাত) যে একটু বেশি, তা আমার অজানা নয়।

তাহলে কেন কানে লাগল? প্রথমত, যিনি বলেছেন, তিনি একজন ডিমওয়ালা নন, ডিমওয়ালী। আমার অভিজ্ঞতায় এতদিনের ট্রেনযাত্রায় বহু মহিলা ফেরিওয়ালিকে দেখেছি, কিন্তু কোন মহিলাকে ডিম বিক্রি করতে দেখিনি। এটা একটা কারণ হতে পারে। দ্বিতীয় এবং প্রধান কারণ গলার স্বর। লোকাল ট্রেনযাত্রীরা সবাই মোটামুটি জানেন ফেরিওয়ালাদের গলার স্বর কেমন হয়,সে তিনি মহিলাই হোন বা পুরুষ। কিন্তু আমি বাজি ফেলে বলতে পারি এইমাত্র যার কন্ঠস্বর শুনলাম, আমার জায়গায় অন্য যে কেউ থাকলেও বলতেন,এমন সুমধুরভাষিণী আর যাই হোন না কেন, ফেরিওয়ালি কিছুতেই হতে পারেন না। 

কৌতুহল বশত ঘাড় ঘোরাতেই হল। দেখলাম একজন লাল শাড়ি পরিহিতা মহিলা ডিমের ঝুড়ি হাতে উঠেছেন। গলাটা তারই। মুখটা দেখে এত চেনা চেনা কেন লাগছে? মুখটা সামনে থেকে দেখতে পেলে...এ কি?

মুখটা সম্পূর্ণ গোচরে আসার পর যে ধাক্কাটা খেলাম তার জন্য মোটেই প্রস্তুত ছিলাম না। সত্যি বলতে কি, কয়েক মুহূর্ত বিস্ময়ের ঘোর কাটিয়ে উঠতে পারলাম না। শ্রীরাধা ট্রেনে হকারি করছে, ডিমের ঝুড়ি নিয়ে ঘুরছে? এও কি সম্ভব? নাকি আমার চোখের ভুল?

ওপাশের সিটে একজন ডিম নেবে, শ্রীরাধা তার ডাকে সেদিকে এগিয়ে গেছে। আমি আবার চোখ কচলে নিয়ে ভাল করে দেখলাম। নাহ কোন সন্দেহ নেই, এ মুখ আমি কোনদিনও ভুলব না, ও শ্রীরাধাই। 

বিস্ময়ের ভাবটা কেটে যেতেই এক ধাক্কায় ফিরে গেলাম প্রায় পনেরো বছর আগে।

কলেজে সেকেন্ড ইয়ারে শ্রীরাধার সাথে পরিচয় হয়। পাসকোর্সে বটানি পড়ত, পড়াশোনাতে সেরকম ভাল ছিল না। আমার ছিল ফিজিওলজি অনার্স। পাসের বটানি ক্লাসেই আমাদের বন্ধুত্বটা শুরু হয়েছিল, পরে বন্ধুত্ব গড়ায় প্রেমে। কলেজের পরেও অনেকদিন প্রেম ছিল বজায়। কথা ছিল আমার একটা চাকরি হলে বিয়েটা সেরে নেওয়া যাবে। কিন্তু কিছুতেই চাকরি জুটছিল না। বিভিন্ন পরীক্ষা দেওয়ার চাপে বেশ কিছু সময়ের জন্য শ্রীরাধার সঙ্গে যোগাযোগও কিছুটা ক্ষীণ হয়ে এসেছিল।আর তারপরেই একদিন হঠাত খবর পাই শ্রীরাধার বিয়ে হয়ে গেছে। ঐ ছিল আমার শ্রীরাধার শেষ পাওয়া খবর। খবরটা পেয়ে বেশ ভেঙ্গে পড়েছিলাম, মনে আছে। তারপরে ধীরে ধীরে সামলেও নিয়েছিলাম। পরে নিজের চেষ্টায় চাকরি পেয়েছি, বিয়ে করেছি, আস্তে আস্তে শ্রীরাধার স্মৃতিও মন থেকে বিলীন হয়ে গিয়েছিল।

আজ এতদিন বাদে এই লোকাল ট্রেনের কামরায় সম্পূর্ণ অপ্রত্যাশিত ভাবে শ্রীরাধাকে খুঁজে পেলাম,এখন আমার কি করা উচিত? ওর আর আমার মধ্যেকার স্মৃতিটা মোটেও সুখব্যঞ্জক নয় যে এখন ওর সঙ্গে দুটো পুরনো দিনের গল্প করা সাজে। রাগ উগড়ে দেব, ওকে ওর প্রতারণার সমুচিত জবাব দেব? সেটা হাস্যকর। আর তাছাড়া একটা ডিমওয়ালীকে ডেকে সিনক্রিয়েট করলে এখন ট্রেনের বাকি পাঁচটা লোক কি ভাববে? 

কিন্তু কথা বলতে না চাইলেও তো অনেক প্রশ্ন মনের ভিতরে জমা হয়। যেমন এখন আমার কাছে লাখ টাকার প্রশ্ন, শ্রীরাধা এখানে কেন? যতদূর শুনেছিলাম ওর ভাল বিয়ে হয়েছিল। পাত্র ইঞ্জিনিয়ার, ভাল কোম্পানিতে চাকরি করে। ইঞ্জিনিয়ারের স্ত্রীদের ডিম বিক্রি করে রোজগার করার দরকার থাকে বলে তো মনে হয় না। হ্যাঁ, তাদের রোজগার করতে বাধা নেই, কিন্তু সেটা নিজের যোগ্যতা অনুযায়ী রোজগার,স্বাবলম্বী হওয়ার জন্যে। কেউ তাদেরকে মাথার দিব্যি দেয় না যে তাঁকে যেন তেন প্রকারেণ কাজ করে সংসারে পয়সা দিতেই হবে,সে গৃহিণী হয়েই জীবনটা কাটিয়ে দিতে পারে, বদলে অবশ্য...কিন্তু সে যাই হোক, যদি খুব কষ্ট করেই ধরে নেওয়া যায় যে একজন ইঞ্জিনিয়ারের স্ত্রী ডিম বিক্রি করছে, তা হলেও সেই স্ত্রীলোকটি শ্রীরাধা হতে পারে, সেটা বিশ্বাস করাটা একটু কঠিন।

শ্রীরাধা খুব নাকউঁচু স্বভাবের মেয়ে ছিল। খুবই সাধারণ ঘরের ছেলে হওয়ার কারণে এই ফারাকগুলো সহজেই বুঝতে পারতাম। বড়লোক ঘরের মেয়ে হওয়া সত্ত্বেও রেজাল্টের জন্য সেরকম ভাল কলেজে ভরতি হতে পারেনি শ্রীরাধা। আমাদের কলেজের বেশিরভাগ ছেলেই ছিল গ্রাম থেকে উঠে আসা, শহরের কলেজে পড়া ছেলেদের মতন কেতাদুরস্ত ছেলে আমাদের কলেজে সেভাবে ছিল না। কলেজে কারুর সঙ্গে শ্রীরাধা মিশত না এমন নয়, তবে সেই মেশার মধ্যে কেমন একটু করুণা মিশে থাকত। কোনদিন সরাসরি প্রকাশ না করলেও হাবেভাবে সহজেই বোঝা যেত, বাকিদেরকে ও একটু নীচু নজরেই দেখে। এখন ভাবলে মাঝেমধ্যে অবাক লাগে আমার সঙ্গে এতদিন প্রেমটা টিকিয়ে রেখেছিল কি করে শ্রীরাধা? আমি ভাল ছাত্র ছিলাম বলে? আর সেই আমিই যখন এই চাকরির বাজারে মহা গাড্ডায় পড়লাম, তখন আমায় লাথি মেরে চলে গেল বাবার ঠিক করা পাত্রের সঙ্গে বিয়ে করতে? কিন্তু শ্রীরাধার মতন অবস্থাপন্ন ঘরের মেয়ের তো বিদ্বান অর্থবান বয়ফ্রেন্ডের অভাব হত না। কলেজে না থাকুক, বাইরে নিশ্চয়ই থাকতে পারত। আর তাহলে বিয়ের ক্ষেত্রেও ওকে দ্বিচারিতা করার দরকার পড়ত না।স্ট্যাটাস, অর্থ ,সুপ্রতিষ্ঠা এসব লক্ষ্যই যখন ছিল শ্রীরাধার তখন আমার মত একটা সাধারণ ছেলেকে মিথ্যে মোহে কয়েকটা বছর ঘোরাল কেন? ওর জীবনে আমার ভূমিকাটা ঠিক কি ছিল? নাকি আমি শুধু ওর কাছে একটা টাইম পাস করার মেশিন ছিলাম!

শ্রীরাধা এবার এদিকে এসেছে। আমাকে এখনো দেখেনি। আমার থেকে ঠিক চারজন পরে একজন ভদ্রলোক ডিম চাইছিলেন, শ্রীরাধা তার সামনে ঝুড়িটা নামিয়ে উবু হয়ে বসে ডিম ছুলতে লাগল। 

 ট্রেনে যারা এখন বসে আছে, তাদের বেশিরভাগেরই এই সামান্য ডিমওয়ালির দিকে মনোযোগ দেবার সময় নেই, যারা ডিম নিচ্ছে তারা ছাড়া। কিন্তু কতিপয় আধবুড়ো কিংবা চ্যাংড়া দু একটি ছেলে যারা চোখ দিয়ে এই লাবণ্যময়ী ডিমওয়ালিটিকে তৌল করছে, তাদের নজর আঁচল সরে যাওয়া বুকের দিকে নিবদ্ধ। বেশ অস্বস্তি হচ্ছিল দেখে। চোখ সরিয়ে নেবার চেষ্টা করলাম। কিন্তু হঠাত একটা জিনিস চোখে পড়ে যাওয়ায় আমাকে তাকাতেই হল।

আঁচলটা খানিকটা সরে যাওয়াতে ওর পিঠের খানিকটা অংশ চোখে পড়ছিল আমার। পিঠের ওপর লালচে বিলীন হয়ে আসা কতগুলো দাগ, অনেকটা বেল্ট বা চাবুক দিয়ে পেটালে যেরকম হয় সেরকম।

শিউরে উঠলাম আমি।এর অর্থ...এর অর্থ...মুহূর্তের মধ্যে মাথার মধ্যে অনেক কটা ছবি এসে হাজির হল...এতক্ষণ যে বিস্ময়বোধটা ভিতরে কাজ করছিল তার একটা স্পষ্ট কারণ মনের ভিতরে ধরা দিল। এবং আরো একটু ভালো করে দেখতে খেয়াল পড়ল, শ্রীরাধার ঘাড়ের কাছে আর হাতেও বেশ কিছু পোড়া দাগ, সম্ভবত সিগারেটের।

মনটা বেশ উত্তেজিত ছিল, শ্রীরাধাকে কাছ থেকে দেখার পরে সেই উত্তেজনাটা মন থেকে মুছে গিয়ে তার জায়গায় মনে এমন একটা অনুভূতি এল, সেটাকে ঠিক কিভাবে ব্যাখ্যা করা যায় আমি জানি না। সহানুভূতির? প্রতিহিংসার আনন্দের? দুঃখের? বিস্ময়ের? করুণার? নাকি এগুলো সবকটার মিশ্রণ? শ্রীরাধা আমাকে ঠকিয়েছিল, আমার বিশ্বাস নিয়ে ছেলেখেলা করেছিল, আজ ওর এই অবস্থায় তো আমার খুশি হওয়ার কথা। বুঝুক ও কারুর সঙ্গে প্রতারণা করলে ঠিক একদিন না একদিন তোমাকেও ঠিক এইভাবেই মূল্য চোকাতে হবে। জগতের নিয়ম।

এসব জেনেও কেন পুরোপুরি শান্তি পাচ্ছি না? কেন বারেবারে চোখ চলে যাচ্ছে ওর শরীরের পুড়ে যাওয়া, ক্ষতবিক্ষত অংশগুলোর দিকে, আর কেনই বা সেগুলো দেখে কোথাও গিয়ে বুকের ভিতরে একটা চিনচিনে ব্যথা হচ্ছে? তাহলে কি আমার অবচেতন মন এখনো ভালবাসে শ্রীরাধাকে? যত দোষ ওর থাক, সেসব ভুলে আবার ওকে কাছে টেনে নিতে চায় মন?

নাঃ সেটা কিভাবে সম্ভব। নিজের মনকেই ধমকাই আমি। আর যদি সম্ভব হতও, তাহলেই বা কেন সেটা করতাম আমি? আমার বিয়ে হয়েছে আজ নয় বছর, ছেলে আছে সাত বছরের, আমার বিবাহিত জীবনে আমি সুখী আমি। তাহলে এসব উদ্ভট চিন্তা মাথায় আসার কারণ কি?

 চিন্তার প্রক্রিয়া বড় জটিল জিনিস। সাদা মনে দেখলে বা চিন্তা করলে আমার জায়গায় অন্য কেউ থাকলে তারও মনে হত, যা হয়েছে বেশ হয়েছে। প্রতারক প্রতারণার শিকার হয়েছে। খুব গেছিলি বড়লোকের গলায় ঝুলে থাকতে। বোঝ এবার। নিম্নবিত্ত সংসারে নারী নির্যাতন নতুন নয়। শ্রীরাধাকে এইভাবেই সারাজীবন তার কর্মের ফল ভোগ করে যেতে হবে। উচিত শিক্ষা।

 কিন্তু অবচেতন মনের চালচলন একটু ভিন্ন। গতানুগতিকতার বাইরে গিয়ে আসলকে, সত্যকে ফুটিয়ে তুলতে চায়।

শ্রীরাধা নাকউঁচু স্বভাবের ছিল, অন্যদের প্রতি ওর নজর একটু নীচু ছিল। কত মেয়েই তো এমন হয়। কিন্তু জোর দিয়ে এটা কি বলা যাবে, যে তাদের সবাই প্রতারক?তারা কেউ ভালোবাসতে কিংবা ভালোবাসার মর্যাদা করতে জানে না? আমি ভাবছি শ্রীরাধা আমায় ঠকিয়েছে, কিন্তু এমনও তো হতে পারে ও একটা পরিস্থিতির শিকার? এমনও তো হতে পারে একটা ভয়ঙ্কর সত্যকে আমার থেকে স্রেফ লুকিয়ে রাখা হয়েছে পরিকল্পনামাফিক, যাতে আমি ওর থেকে দূরে সরে যেতে পারি। হয়ত সেই সত্যের মূল বহু গভীর পর্যন্ত বিস্তৃত যার একটা ছোট্ট প্রতিচ্ছবি আমি আজ দেখতে পাচ্ছি, শ্রীরাধার এই ডিমওয়ালি রূপে?

শ্রীরাধা সচ্ছল পরিবারের মেয়ে ছিল এটুকু জানলেও ওর পরিবারের সম্পর্কে সেরকম বিশেষ কিছুই জানতাম না। শ্রীরাধা আমার সঙ্গে কখনো ওর পরিবার নিয়ে কথা বলেনি সেভাবে, আমিও জানার ধৃষ্টতা করিনি। সচ্ছল পরিবারের মেয়ে শ্রীরাধার পরিবার আমার মতন সাধারণ ছেলেকে মেনে নেবে না জানতাম। তাই চাকরি জোটানোটাই ছিল আমার সর্বপ্রথম চ্যালেঞ্জ। 

আচ্ছা শ্রীরাধা সব সত্যি বলত আমায়? ও বলেছিল আমার কথা ওর পরিবারে কেউ জানে না। কিন্তু ও যদি ভুল বলে থাকে? যদি ওর পরিবার আমার সব কথা জেনে থাকে। শ্রীরাধার বাবাকে কলেজে দু-একবার দেখেছিলাম কানাঘুষোয় শুনেছিলাম তিনি একজন দারুণ রাশভারী মানুষ। শ্রীরাধার আগে দুই দিদি,তাদের সবার ভাল বিয়ে হয়েছিল। অনেক সচ্ছল পরিবারের অধিকর্তারা বাড়ির সম্মানের কথা ভেবে কি না করতে পারে তার ঠিক নেই। ছোট মেয়ে অব্রাহ্মণ তথা নিম্নবিত্ত এক ছেলের সাথে প্রেম করছে, এটা মেনে নেওয়া নিঃসন্দেহে কঠিন। তাই কোনভাবে আমাদের সম্পর্কের কথা জেনে ফেলে উদবিগ্ন হয়ে পাত্রের সন্ধানে লেগে পড়া এবং বিয়েতে রাজি না হলে পথের কাঁটা উপড়ে ফেলার হুমকি দিয়ে ভয় দেখানো...এই কাজগুলো কি খুবই কঠিন?পরিবারের সম্মান রক্ষার্থে, সর্বোপরি আমার জীবন রক্ষার্থে যাতে আমার পরিবারে কোন বিপদের ঝড় না আসে, তাই শ্রীরাধা এভাবে ভাগ্যের হাতে নিজেকে সঁপে দিয়েছে,পরিস্থিতির শিকার হয়েছে এটা ভাবাও কি খুব কঠিন।


হঠাৎ মনে হল,এতক্ষণ যা ভেবে এসেছি সবটা আমার নিজের অনুমান। আমার মনের মধ্যে ওঠা সমস্ত প্রশ্ন,সমস্ত যাবতীয় জটের সমাধান আছে শ্রীরাধার কাছে। কিন্তু এতদিন পরে, ও কি আমায় চিনবে? আর এত লোকের মাঝখানে কি করে ওকে এত কথা জিজ্ঞেস করব?

একটা দুর্বার কৌতূহল আমায় পেয়ে বসল। জানতেই হবে, সব কথা আমায় জানতেই হবে। শ্রীরাধা, তোমায় আজ আমার সব প্রশ্নের উত্তর দিতেই হবে।

শ্রীরাধাকে ডাকলাম, “এই যে দিদি, শুনছেন...”

শ্রীরাধা ঝুড়ি নিয়ে উঠে দাঁড়িয়েছিল সামনের স্টেশনে নেমে যাবে বলে। আমার ডাকে ফিরে আমার দিকে তাকাল। কয়েক মুহূর্ত আমরা পরস্পরের দিকে তাকিয়ে রইলাম। শ্রীরাধার চোখে কোন বাড়তি উত্তেজনা নেই। তার মানে সে চেনেনি আমাকে।

এখন আমি কি করব? “শ্রীরাধা আমি তোমার কল্লোল, চিনতে পারছ না...” বলে চেঁচিয়ে উঠব? বড্ড সিনক্রিয়েট হয়ে যাবে। এরকম নাটুকেপনা আমার পছন্দ নয়। আর তাছাড়া ও যদি আমাকে চিনেও চিনতে অস্বীকার করে?তাহলে?

আমাদের দুজনের সম্পর্ক একটা অতীত ছিল, অতীতকে গলা টিপে মেরেই আমরা এগিয়ে গেছি। এখন আমার একটা বর্তমান আছে, শ্রীরাধারও। বর্তমানকে অস্বীকার করে অতীতের পিছনে ছুটে লাভ নেই, অন্তত অনুমানের উপর ভিত্তি করে তো নয়ই। শ্রীরাধা আমায় চিনতে পারেনি, ও চায় না আমিও ওকে আর চিনতে পারি। আর ওর বর্তমানের নেপথ্যে কি কারণ লুকিয়ে আছে, তা ও আমাকে কখনো জানাতে চাইবে বলে মনে হয় না। আর ওর বর্তমান যেমনই হোক না কেন, তাতে তো আমার কোন অধিকার নেই।

তার থেকে না জানাই ভাল। থাক না অনেক রহস্যই তো অজানাই থাকে, এটাও না হয় থাকল। আমাদের ভালোবাসা না হয় এভাবেই রহস্যের অবগুন্ঠনে লুকোচুরি খেলুক,তাতে তো কারও ক্ষতি নেই।

কিন্তু এখন আমার ওকে কি বলা উচিত? ডেকেছি বিনা কারণে জানলে নিজেকেই অপ্রস্তুত হতে হবে। কিন্তু ওর যে বর্তমান, তা যে বেদানাদায়ক, তাও তো মিথ্যা নয়। ওকে কিছু টাকা দিয়ে সাহায্য করব?

পরক্ষনেই আবার মনে হল, যে কারণে ওকে টাকা দিয়ে সাহায্য করার কথা ভাবছি, তাতে কি খুব বেশি লাভ হবে? আমার ধারণা সত‍্যি হলে টাকা কোনদিন ও ওর কাছে গচ্ছিত রাখতে পারবে না সে যত টাকাই পাক না কেন। তাছাড়া টাকা দিলে শ্রীরাধা কে করুণা করা হবে।সেটাও মন থেকে মেনে নিতে পারলাম না।

তার চেয়ে বরং সেটাই করি, যেটা এই পরিস্থিতিতে করতে পারি। 

জীবনে কোনদিন ডিম খাইনা ট্রেনের, আজ জিজ্ঞেস করলাম,”ডিম কত করে?”

“হাঁসের ডিম বাবু বারো টাকা, মুরগি দশ।“

“দাও,একটা হাঁসের আর একটা মুরগির ডিম ছুলে দাও। হাফ বয়েল তো?”

শ্রীরাধা ঝুড়ি নামিয়ে আবার ডিম ছুলতে বসল।


Rate this content
Log in

More bengali story from Shubhranil Chakraborty

Similar bengali story from Abstract