ললন্তিকা ধারাবাহিক
ললন্তিকা ধারাবাহিক
পর্ব সাতাশ
জামির, জহিরুল, এনামুল, এনায়েত , আর সাগর -
এই পাঁচ জন আতাউর কামালের সাগরেদ । এপার থেকে গোরু বাছুর নিয়ে এসে কামালের গোয়ালে জড়ো করে । পরে সময় বুঝে সেগুলো কাঁটাতারের বেড়া ডিঙিয়ে ওপারে চালান করে দেয় ।
বনগাঁর ওসি সব জানেন । কিন্তু প্রচুর টাকার লেনদেন থাকায় মুখ বন্ধ করে রেখেছেন ।
একদিন সীমান্তে গুলি ছোঁড়ার ঘটনা ঘটল । ওসি মনিরুজ্জামান মণ্ডল খবর পেয়ে ফোর্স নিয়ে সেখানে উপস্থিত হলেন । এসে দেখেন চার জন ছোকরার সঙ্গে আতাউর কামালের বচসা শুরু হয়েছে। সাগর নামের ছেলেটা আতাউরকে বলছে গোরুর সঙ্গে যে মেয়েটাকে ওপারে পাঠিয়েছ বস তার বখরাটা একলা মেরে দিয়েছ। আমরা কিছু বুঝি না নাকি দেখিনি ?
জামির , জহিরুল, এনামুল, এনায়েৎ সবাই সমস্বরে বলল - দেখেছি তো ! তোমার ডেরায় রাত্তিবেলায় এসে তোমার হাতে টাকা গয়না তুলে দেয়নি ?
আতাউর বলে - ওরে শালারা ! দেখি আমার আপাকেও ছাড় দিস না ! কি ভাবছিস আমার আত্মীয়কে দেশে পাঠাব তার জন্য তোদের টাকা দিতে হবে ? দেবো না। কেন দেব ?
ওরা একসাথে বলে ওঠে - সবাই তোর আপা অর আম্মি। আমরা যেন ছাগল । যা খাওয়াবি তাই খাব । নে অনেক হল এবার মালকড়ি ছাড় দেখি, নইলে থানায় খবর দেব।
কামাল ভাই শুন্যে এক রাউণ্ঢ গুলি ছুঁড়ে ভয় দেখাল। - - এগিয়েছিস কি চারটে লাশই ফেলে দেব।
ওরাও নিজেদের জারিজুরি খাটাতে কসুর করে না । নাগাড়ে বোমাবাজি শুরু করে দেয় । ফাঁক গলে সাগর পালিয়ে গিয়ে থানায় আবর দেয় - এখনি চলুন স্যার না হলে বেশ কয়েকটা লাশ পড়ে যাবে ।
- কি হয়েছে ?
- স্যার কামাল মানে আতাউর কামাল গত কাল রাতে এক বোরখা পরা মেয়েকে গোরু পাচারের সঙ্গে ওপারে পাঠিয়ে দেছে । আমরা বললাম মেয়েটার টাকাটা কিছুও দে , বড়বাবুকে কিছু দিয়ে আসি। কথাই শুনল না। পিস্তল বের করে গুলিগালাজ ছুঁড়তে শুরু করে দিল । আমি কোনমতে পালিয়ে বেঁচেছি । স্যার একবারটি চলেন ।
সাগরকে গাড়িতে তুলে মনিরুজ্জামান মণ্ডল চললেন সীমান্তে। সীমান্ত চৌকি বেশ কিছুটা দূরে । হয়তো ওরা শুনতে পায়নি । এতক্ষণে নিশ্চয় দু'চারটে লাশ পড়ে গেছে ।
ওসি সাহেব এসে দেখেন তুমুল হৈ-হট্টগোল চলছে। পুলিশ দল নামিয়ে ঘিরলেন জায়গাটাকে । শুন্যে গুলি ছুঁড়ে জানান দিলেন পুলিশ এসেছে। জামির, জহিরুলরা ক্ষান্ত হয়ে দু"হাত তুলে আত্মসমর্পন করল ।
ধরা গেল না আতাউরকে । পুলিশের আগমন দেখে গুলি ছুঁড়তে ছুঁড়তে অন্ধকারে গা ঢাকা দিল ।
সাগর বলল - মিথ্যে নয় স্যার । এসে পড়েছেন যখন ওর ডেরাটা একবার তালাশ করুন ।
মনিরুজ্জামান কামালের ডেরায় ঢুকলেন । খানাতল্লাশি করে একটা স্যুটকেস পেলেন । খুলে দেখেন বেশ কিছু দামী দামী শাড়ি, সায়া, ব্লাউজ, অন্তর্বাস এবং কয়েকটা গয়না পেলেন ।
সাগর যে মিথ্যে বলেনি - তা' ঠিক।
জিনিসপত্র বাজেয়াপ্ত করে গাড়িতে তুললেন ।কামালের একান্ত ব্যাক্তিগত মোবাইলটাও পাওয়া গেল ।
থানায় ফিরে ঝকঝকে আলোয় সেগুলো পরীক্ষা করতে লাগলেন । কাপড়চোপড়, গয়নাগাটি খুঁজতে খুঁজতে একটা কবিতার বইও পাওয়া গেল । মনিরুজ্জামান ভাবলেন কামালের কবিতা পাঠে সখ আছে । বইটা হাতে নিয়ে প্রচ্ছদে চোখ বুলিয়ে দেখন বইয়ের শিরোনাম ' এক গুচ্ছ কবিতা ' এবং তার লেখিকা ললন্তিকা সেন ।দু'একটা কবিতা পড়লেনও । কোন অখ্যাত কবির লেখা। কবিতাগুলো পড়ার মত নয় । সন্দেহ হল কে প্রকাশ করেছে এমন আজেবাজে কবিতা !
প্রচ্ছদ উল্টে দেখতে গিয়ে তো তাঁর চক্ষু ছানাডড়া । ' ' 'কনকাঞ্জলী প্রকাশনী ' কলকাতা । এমন বিখ্যাত প্রকাশনী সংস্থা এমন নিম্নমানের কবিতা ছাপায় বিশ্বাস করতে পারলেন না । তিনি জানেন এই প্রকাশনীর মালিক স্বয়ং বিখ্যাত সাহিত্যিক আরণ্যক রায় । তিনি এমন লেখিকার লেখা ছাপাবেন - ভাবতে অবাক লাগে।
হতে পারে এটি কোন জাল সংস্থার কর্ম । খুঁজলে হয়তো তার অস্তিত্ব পাওয়া যাবে না ।
সবচেয়ে বড় চিন্তার বিষয় কামালের মত একজন দুষ্কৃতির কবিতার উপর ভক্তি । কেন সে ওই বইটা কিনেছিল ?
তিনি ফোন করলেন প্রকাশনী সংস্থায়। কিন্তু সংস্থাটি বন্ধ থাকায় টেলিফোন বেজে গেলেও কেউ তা ওঠায়নি।
মনিরুজ্জামান নি:সন্দেহ হলেন সংস্থাটি ভুয়ো । আর লেখিকার হয়তো অবিতা লেখায় নেশা থাকতে পারে ; নিজস্ব কবিতা ছাপার আকারে দেখতে কার না ভালো লাগে ! টাকা দিয়ে তো ছাপাই যায় !
কিন্তু আতাউর কামালের নিকট বইটা পাওয়া গেল কেন ? তবে কি লেখিকার সাথে কামালের রিলেশন আছে !
তিনি ফোন করলেন কলেজ স্ট্রীট থানায় । আই সি পরমেশ্বর ভট্টাচার্য্য বললেন - মি: ভট্টাচার্য্য স্পিকিং। আপনি কে বলছেন ?
মনিরুজ্জামান সাহেব বললেন - বনগাঁ থানা থেকে বলছি ওসি মনিরুজ্জামান মণ্ডল । কোন ভণিতা না টেনে সোজাসুজি প্রশ্ন করলেন আপনার থানা অঞ্চলে বইপাড়ায় কনকাঞ্জলী প্রকাশন বলে কোন সংস্থা রয়েথে ?
- হ্যাঁ আছে তো ! কিন্তু ওটা এখন বন্ধ রয়েথে। ওর প্রোপ্রাইটার আরণ্যক বসুরায় এখন অসুস্থ বলে হাসপাতালে ভর্তি আছেন ।
- বেশ ! আপনি কি জানেন বা নাম শুনেছেন লেখিকা ললন্তিকা সেনের ।
চেয়ার ছেড়ে তড়াক করে লাফ দিয়ে উঠলেন পরমেশ্বর ভট্টাচার্য্য।
- ললন্তিকা সেন ? তাকে কি পাওয়া গেছে ?
- মানে ? ললন্তিকা সেন বলে কেউ সত্যিই আছেন ?
- ললন্তিকা মিঃ আরণ্যক বসুরায়ের অফিসে কাজ করত। সে একজন দুর্বৃত্তের সঙ্গে জড়িত। পুলিশ তাকে খুঁজে বেড়াচ্ছে । আপনি কি তার কোন সন্ধান পেয়েছেন ?
- তা' এক আধটু পেয়েছি বৈকি । কিছু দামী শাড়ির সঙ্গে কিছু গয়নাগাটি আর আতাউর কামাল নামের এক চোরাচালানকারী লোকের একটা মোবাইল ।
- দেখুন তো ওই মোবাইলে ললন্তিকা সেনের কোন ফোন নং আছে কি না ?
- এক্জাক্টলি ললন্তিকা সেনের নাম নেই । তবে গত ২৬ তারিখ থেকে সামওয়ান আপা নামে কেউ ঘনঘন কামালকে ফোন করে গেছেন ।
- হুমম্ ! ঠিক আছে আপনি ওগুলো সব হেফাজতে রাখুন । আমি আপনার অফিসে যাচ্ছি। ওগুলো দেখব যদি কোন সুত্র মেলে । আর একটা কথা আতাউর কি ধরা পড়েছে?
- না, রাতের অন্ধকারে সে হয়তো বাংলাদেশে পালিয়েছে। আমরা বাংলাদেশের সীমান্ত চৌকিতে জানিয়ে দিয়েছি ।
- ওকে । তাহলে বিকেলে মিট করব ?
- ওকে থ্যাঙ্ক ইউ ।
সে রাতে আতাউর কামাল বাংলাদেশে যায়নি । কাঁটাতারের বেড়া চট করে পেরিয়ে যাওয়া অসম্ভব । কারণ ওই বেড়ায় ইলেকট্রিক কারেন্ট পাস করানো থাকে । ফাঁকা মাঠ ধরে দৌড়তে দৌড়তে কামাল চলে আসে অরবিন্দ সরখেলের ভাড়া বাড়িতে । সেখানে তাকে না পেয়ে রাতটা কাটিয়ে দেয় শিয়ালদা স্টেশনের বাইরে কোন এক জায়গায় ।
পার্সোনাল ফোনটা ফেলে এসেথে । দ্বিতীয় ফোন যেটা দিয়ে সে কর্মকাণ্ড চালায় তা' থেকে ফোন করে কাউকে । কিছু কথা হয়। আবার ফোন সুইচ অফ করে রেখে দেয় ।
পরমেশ্বর ভট্টাচার্য্য কোশ্চেন রুমে অরবিন্দকে বলেন - আতাউর কামাল বলে কাউকে চেন ?
অরবিন্দ উত্তর দেয় না ।
প্রশ্নের পুনরাবৃত্তি করেন মিঃ ভট্টাচার্য্য। তবু মুখ খোলে না অরবিন্দ ।
মিঃ ভট্টাচার্য্য রুলের এক পেল্লাই গুঁতো দিয়ে বলেন - বল , শালা শুয়োরের বাচ্চা । নইলে দেখ কেমন মজা দেখাচ্ছি ।
বলে কনস্টেবল রামেশ্বর কে ডাকেন । বলেন - এর পা দুটো বেঁধে মাথা নীচে করে ঝুলিয়ে দাও ।
রামেশ্বর বলে - এখুনি ব্যবস্থা করে দিচ্ছি স্যার ।
- আর ওই যে ধেড়ে ইঁদুরগুলোকে দু'দিন না খাইয়ে রেখেছি ; খাঁচা থেকে বস্তায় ঢুকিয়ে নিয়ে এস । বেটার মুখটা যখন খুবলে খুবলে খাবে ; সত্যি কথা বলতে শুরু করবে নইলে মরবে , কি আর করি !
অরবিন্দ শুনে ভয়ে প্যান্ট ভিজিয়ে ফেলেছে । তবু চুপ থেকে গেল । ভাবল ভয় দেখিয়ে কথা আদায় করতে চাইছে।
রামেশ্রর, ত্রিলোচন, আর গঙ্গাধর - এই তিন কনস্টেবল এসে সিলিং এ অরবিন্দকে ঝুলিয়ে দিল ।
মিঃ ভট্টাচার্য্য বললেন - এবার ইঁদুরগুলো নিয়ে এস । দেখি কি করে !
ঘটনাটা সত্যি হতে চলেছে দেখে অরবিন্দ ভয়ে ভয়ে বলে - স্যার অমন করবেন না । আমি সব সত্যি বলছি ।
পরমেশ্বর বললেন - বল তাহলে, আতাউর কামাল কে ? আর ললন্তিকা সেনের সাথে ওর পরিচয় কি করে হল ?
( ক্রমশ )

