ললন্তিকা ধারাবাহিক
ললন্তিকা ধারাবাহিক
পর্ব একশত তিন
গঙ্গাসাগর থেকে কলকাতায় ফিরে সজ্জন সিং বললেন - অব হমে ঘর জানা হ্যায় জী ! কাম তো তামাম হো হি গিয়া তো অব হমে ইজাজত দিজিয়ে।
ললন্তিকাও বলল - হ্যাঁ কাকাবাবু, আমরা এবার আসি এত সুন্দর ভাবে অপারেশন সাকসেসফুল হবে ভাবতেই পারিনি। সবই কপিলমুনির ইচ্ছার প্রকাশ ।
অভয়ঙ্করবাবু বললেন - আর তোমাদের বাধা দেব না মা ! শুধু আজকের দিনটা থেকে যাও। একটু সেলিব্রেট করি।
মিঃ ভৌমিক এবং রজনী দেবী উভয়ে তাদের আগাম নেমন্তন্ন জানিয়ে রাখলেন একবার বাংলাদেশে তাঁদের বাড়িতে যাবার জন্য ।
সজ্জন বললেন - আপলোগোঁ য্যায়সা গুণীয়োকে সাথ মিলকর বহত অচ্ছা লগা। আইয়ে না স্যার, হমারে সাথ নয়ডা ঘুমকে আইয়েগা।
মিঃ ভৌমিক বললেন - অভি নেহি সর্দারজী। অব হমে ভি জানা হ্যায় । বহোত দিনো সে ঘরমে নেহি হুঁ। ক্যায়সা হ্যায় ওয়াহাঁ কে রকমসকম পতা নেহি।
অভয়ঙ্করবাবু বাবু বললেন - সবারই যাবার তাড়া আছে দেখছি।
তারপর গোপালবাবুর দিকে চেয়ে বললেন - সবাই যেখানে যাই যাই করছেন; আমি কোন লজ্জায় বলি থাকি!
বাড়িতে হাসির রোল উঠল । সজ্জন মোটামুটি বাংলাটা বুঝতে পারেন । তিনিও হাসিতে যোগ দিলেন ।
বনলতা দেবী বললেন - দেবেন তোমরা কি কালই যাবে ?
- হ্যাঁ দিদি । আর আটকে রাখবেন না প্লীজ ।
বনলতা দেবী কপট রাগ দেখিয়ে বললেন - আমরা কি তোমাদের আসতে বলেছি ? নিজের কাজে এসেছ সরকারের অতিথি হয়ে । এখন দুটো দিন না হয় আমাদের অতিথি হয়েই থেকো।
রজনী দেবী বললেন - ও দিদি, আর কথা বাড়াসনে। ওনার অনেক কাজ রয়েছে । পরশু দিন যেতেই হবে ।
অনন্ত মোহন সরখেল কাকে কি বলবেন বুঝে উঠতে পারছেন না । ললন্তিকা ওঁকে চুপ থাকতে দেখে বলল - বড়মামা ! তুমি চল আমাদের সাথে নয়ডায় । সজ্জন বলছিল তোমাকে নিয়ে যেতে ।
অনন্তের তো এ ছাড়া কোন উপায় নেই ! ঘরবাড়িও হয়তো এতদিনে দখল হয়ে গেছে। তা-ছাড়া আইনের ধারায় তিনি মৃত ঘোষিত। এমন অবস্থায় তাদের সঙ্গে যাওয়া ছাড়া আর কোন উপায় নেই ।
তিনি ললন্তিকাকে বললেন - ঠাকুরের যা ইচ্ছে করুন।
মিঃ ভৌমিক বললেন - মিঃ সরখেল ! আপনার উপন্যাস ' কেউটের ছোবল ' আমি পড়েছি। এত সুন্দর লেখালেখি করেন আপনি ?
অনন্ত মুখ নীচু করে বললেন - সে তো কেউ জানে না স্যার।
ভৌমিক সাহেব তাঁর দুঃখ কোথায় অনুভব করলেন । মিঃ অভয়ঙ্কর সরকার এগিয়ে এসে বললেন - আপনার স্বত্ব আপনি ফিরে পাবেনই। আদালতে এর কয়েকটা শুনানী হয়েও গেছে। আর বড় জোর দু'তিনটে হিয়ারিং হলেই রায় বেরোবে এবং আমি নিশ্চিত জয় আপনার অবধারিত।
মিঃ ভৌমিক বললেন - আপনি আমার সাথে বাংলাদেশের বাড়িতে চলুন । আপনার লেখার ব্যাপারে প্রচুর হেল্প পাবেন।
অনন্ত হাত জোড় করে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করলেন ।
সজ্জন সিং বললেন - উনহোনে কঁহি নেহি জায়েগা। মামাজী আইয়ে মেরে সাথ । হম সব মিলকে রহুঁগা ।
অল রেসপনসিবিলিটি হামার ।
মিঃ ভৌমিক , সরকার সাহেব, গোপালকৃষ্ণ বাবু সকলে খুব খুশি হলেন ।
দিন দুয়েকের মধ্যে সকলেই জেনে গেলেন আরণ্যক আবার পালিয়েছে। হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছিল, সুযোগ বুঝে পালিয়েছে।
তখন ভৌমিক সাহেব, ললন্তিকারা এবং অভয়ঙ্করবাবুর পরিবার যে যার বাড়িতে চলে গেছেন ।
অভয়ঙ্করবাবু বললেন - কি সাংঘাতিক লোকটা !
ভৌমিক সাহেব অবাক এবং হতাশ হলেন।
সজ্জন বললেন - অব কেয়া হোনেবালা হ্যায় , বাহে গুরু হী জানে !
অনন্ত সরখেল বললেন - আমি জানতাম। আরণ্যক বসুরায় এত সহজে হার মেনে নেবে না। অবাক হয়ে যাচ্ছি এই সভ্যতার যুগেও আরণ্যক বসুরায়ের মত লোকেরা অলৌকিক ভাবে রক্ষা পেয়ে যায়
ললন্তিকা বলল - তুমি এত ভেবো না বড়মামা। পুলিশ বাচ্চাছেলে নয়; ঠিক ধরে নেবেই।
বাংলাদেশে নিজের বাড়িতে এসেও ভৌমিক সাহেবের আশঙ্কা রয়েই গেল । কি জানি ! আরণ্যক যদি এখানেও এসে পড়ে !
মসজিদ চত্বরে বাছিরুদ্দিন আশ্রয় নিয়েছেন । রাতে মসজিদে যা জোটে খেয়ে নেন, এবং রাত কাটান । আর দিনের বেলায় এর তার সাথে নিজে থেকেই আলাপ করেন। বাছিরুদ্দিনের মিষ্টি কথায় অনেকেই আসে তাঁর সঙ্গে গল্প গুজব করতে।
আরণ্যক খোঁজ করেন কোন মিলিশিয়া গোষ্ঠী তাহেরপুরে আছে কি না ।
একজন বলে ফেলে - বলেন কি কত্তা ! বাংলাদেশ এইটা। এহেনে মিলিশিয়া গুষ্টিতে ভর্তি । আপনি বলেন কোন গুরুপের আপনি।
লোকটার সাথে কয়েকদিন ধরে আলাপ বেশ জমে উঠেছে। সন্ধান পেলেন তাহেরপুরে ( একটি দলের নাম বলে ) গোষ্ঠীটি খুবই সক্রিয় । এই সেই দল যারা বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে পাকিস্তানকে সমর্থন জানিয়ে গণহত্যা, লুঠপাট, জমি দখল, ধর্ষণ কত কি করেছে ।
চতুর বাছিরুদ্দিন লোকটিকে বললেন - তুমি কি ওদের সমর্থন কর ?
লোকটা এত অন্তরঙ্গ হয়ে গেছে যে স্বীকার করে ওই দলের সমর্থক সে ।
ব্যস ! আর পায় কে ? বাছিরুদ্দিন হাতে চাঁদ পেয়ে গেলেন । বললেন - হিন্দুদের আমি একেবারেই সহ্য করতে পারি না । তা এখানে মানে এই তাহেরপুরে মোটামুটি কি রকম সংখ্যায় হিন্দু আছে ?
- কত আর , একশ দেড়শ হব।
- তাহলে ভাইয়া, ওদের তাড়িয়ে দিলে হয় না ?
- আমরা তো তাই চাই । কিন্তু মুশকিল হচ্ছে ওই শালা পুলিশ কত্তা। কি যেন নামটা ? দেবেন। দেবেন ভৌমিক । ব্যাটা পুলিশের আই জি হইসিল হাসিনা সরকারের আমলে । ওই ব্যাটার বাড়িটাও এহেনে - তায়েরপুরে । চাকরি ছাইড়া দেছে, পুলিশ তাকে ছাড়ে নাই । কি আর করুম ! হা পিত্যাস কইরা বইয়া আছি কবে বেটা টাইসা যায় ।
- ওর বাড়িটা কোথায় ?
ইচ্ছে করেই জিজ্ঞেস করেন বাছির ।তিনি অনেকবারই এখানে এসেছেন । তা' প্রকাশ করলেন না ।
- আপন যাবা নাকি কত্তা ! চলেন চলেন দেখাইয়া লইয়া আসি ।
বাড়িটার পাশ দিয়ে যেতে যেতে পুরানো দিনের কথা মনে পড়ে গেল বাছিরুদ্দিনের অর্থাৎ আরণ্যক বসুরায়ের ।বাগানের বকুল গাছটা বেশ বড় হয়ে গেছে। একদিন ওই বকুলতলায় বসে অনন্ত মোহনের ' কেউটের ছোবল ' পাণ্ডুলিপিটা নাড়াচাড়া করছিলেন । ভদ্রলোক এত সুন্দর লিখতে পারেন তা তাঁর ধারণাই ছিল না । কথা দিয়েছিলেন ছাপিয়ে দেবেন । দিয়েও ছিলেন। আর সেই আইডিয়াটা পেয়েছিলেন ওই বকুলতলাতেই । লেখকের নাম রাতারাতি বদলে হয়ে গেল আরণ্যক বসুরায় ।
সঙ্গের লোকটি বলল - পা চালাইয়া চলেন কত্তা। কড়া পাহারা বইসা আছে । সন্দেহ হইলেই থানা আর ধুলাই।
আরণ্যক পা চালিয়ে ফিরে এলেন মসজিদ চত্বরে।
বললেন - তোমার নামটি তো জানা হয়নি ভায়া ! কি নাম তোমার ?
- আগে আপনার নাম কয়েন কত্তা ।
- বাছিরুদ্দিন । তুমি বাছির বলে ডেকো।
- আমি আলমগীর হোসেইন । দলে আমার নাম আলম । আপনি চলেন কত্তা আমার বাটিতে। এহেনে মসজিদে থাইক্যা কি হইব ? রাত্তিরে দলের তায়েরপুর শাখার প্রধান আইবেন । আলাপ কইরা দিমু ।
বাছিরুদ্দিন আলমের বাড়িতে গেলেন । রাতে মোগলাই খানা পেটপুরে খেলেন । পরিচয় হল শাখা প্রধানের সঙ্গে। আলোচনাও হল দেবেন্দ্র ভৌমিকের অন্তিমকাল নিয়ে। শাখাপ্রধান বলল - আপনি এ কাজ করতে পারবেন ?
- কেন পারব না ? আপনারা একটু হেল্প করলেই সহজ হয়ে যায় ।
শাখার প্রধান কথা দিলেন সাহায্য করবেন।
( ক্রমশ )

