STORYMIRROR

Nityananda Banerjee

Horror Crime Thriller

3  

Nityananda Banerjee

Horror Crime Thriller

ললন্তিকা ধারাবাহিক

ললন্তিকা ধারাবাহিক

7 mins
182


রাত এগারোটা - সাড়ে এগারোটা নাগাদ অরবিন্দের ফোনে একটা কল এল । পুলিশ বেষ্টিত অরবিন্দ সেই কল তুলতে ইতস্তত করছিল । এ তো ললন্তিকা ফোন করেছে ! এখন যদি পুলিশের সামনে ও ললন্তিকার সাথে কথা বলে তবে তো ওর বিষয়ে পুলিশ খোঁজ নেবে ! 

অরবিন্দ চায় না ললন্তিকার সুখী সংসার অশান্তি বইয়ে দিতে । নিজে তো কিছু করতে পারেনি - এমনকি প্রেমের বাঁধনও ছিন্ন করে দিয়েছে । এখন যদি সে স্বামী সন্তান নিয়ে সুখে থাকে তো থাক না । 

ফোন ওঠাচ্ছিল না । অভয়ঙ্করবাবুর দিকে অসহায়ের মত চাইল । তিনি এসে হাত থেকে ফোন নিয়ে বললেন - মা, তুমি কাল সকালে ফোন কোরো ; এখন ছেলেটা ঘুমোচ্ছে , ঘুমোক। 

ললন্তিকা বলল - স্যার ঠিক আছে । আমি কালই ফোন করব । 

মি: গুপ্তও সেখানে ছিলেন । কার ফোন, এত রাতে ফোন কেন ইত্যাদি নানা বিষয়ে প্রশ্ন করছেন । অরবিন্দ গাঁইগুঁই করতে লাগল । আবার অভয়ঙ্করবাবুর হস্তক্ষেপে সে যাত্রা অরবিন্দ রক্ষা পেল ।

অধীর আগ্রহে বাড়িশুদ্ধ লোকজন এবং পুলিশ অপেক্ষা করছে । রাত বারোটা ,একটা, দেড়টা হয়ে গেল ; কোন সাড়াশব্দ বা ফোন এল না । 

অভয়ঙ্করবাবু বললেন - তোমার সাথে মস্করা করেছে।

মি: গুপ্তও অধৈর্য্য হলেন । বললেন - তুমি স্বপ্ন-টপ্ন দেখনি তো ?

অরবিন্দ দৃঢ় ভাবে উত্তর দিল - না স্যার । স্বপ্ন দেখিনি বা ওরাও ইয়ার্কি ঠাট্টা করেনি । ওসবের ধার ধারে না ওরা । হাড় বজ্জাতের দল । আসবে যখন বলেছে; তখন যে কোন উপায়ে আসবেই । 

গোপালকৃষ্ণ বাবু বললেন - লেট আস হ্যাভ পেশেন্স এণ্ড ওয়েট ফর দেম । অরবিন্দ ঠিকই বলেছে । আমার মনে হয় ওরা এসে গেছে। সুযোগ পেলেই ঢুকবে ।

পটকার মা, কাকীমা এবং বনলতা দেবী বললেন - ভীষণ ভয় করছে রে পটকা । এ কি অশান্তি এনেছ ঠাকুরপো ?

অভয়ঙ্করবাবু বললেন - আপনারা ভয় পাবেন না । সব কাজেই ঝুঁকি থাকে । এক্ষেত্রেও থাকবে । দেখছ না প্রচুর পুলিশ সহ গুপ্তসাহেব নিজে দেখাশোনা করছেন !

দু'টো, আড়াইটে বাজল । অরবিন্দের ফোনে ম্যাসেজ এল - দরজা খুলে রাখ ; আমরা এসে গেছি ।

একটা আলোড়ন বয়ে গেল ঘর জুড়ে । 

মি: গুপ্ত পুলিশের দলকে নির্দেশ দিলেন - বুট জুতো খুলে রাবারের চপ্পল কিম্বা খালি পা হয়ে যান সবাই। 

সকলে হাওয়াই চপ্পল বের করে পরে নিল ।

- অধীরবাবু ( সেকেণ্ড অফিসার ) আপনি বাড়ির ছাদে চলে যান। লক্ষ্য করুন ওরা কোনদিক থেকে আসছে। কিছু দেখলেই ম্যাসেজ করবেন ।

সেকেণ্ড অফিসার ছাদে চলে গেলেন । বিশাল লম্বা চওড়া ছাদ । বাগানের আমগাছের ডাল এসে ছাদ ছুঁই ছুঁই। একটা নারকেল গাছ এমন ভাবে বেঁকে আছে যার ডগাটা ছাদের কার্ণিশে এসে ঠেকেছে। ইজিলি কেউ এই নারকেল গাছ বেয়ে উঠে যেতে পারে। 

তিনি ছাদে উঠে চিলেকোঠার দরজায় বাইরে থেকে তালা লাগিয়ে দিলেন । আর নিজে সেই নারকেল গাছের ঠিক নীচে রিভলবার বের করে দাঁড়িয়ে রইলেন।

মি: গুপ্ত পুলিশ দলের ছয় জনকে বাগানে এবং দু' জনকে সামনের গেটে মোতায়েন করে দিলেন । বাকিদের সমেত নিজে একতলার রুমে যেখানে আগে অরবিন্দ থাকত সেখানে বাগানের দিকের দরজা খুলে ভেতরে গিয়ে ঘাপটি মেরে বসে রইলেন ।

বাড়ির লোকেদের বললেন - আপনারা সকলে দোতলার একটা ঘরে দরজা বন্ধ করে থাকুন।

অভয়ঙ্করবাবু বললেন - সরি মি: গুপ্ত ! আমি ঘরবন্দী হয়ে থাকতে পারব না । আমাকে কোন উন্মুক্ত জায়গায় পোস্টিং দিন । 

পটকা এবং রুদ্রও একই কথা বলল । মি: গুপ্ত বললেন - ফলো মি।

তারপর অরবিন্দকে নিয়ে ওরা গ্রাউণ্ড ফ্লোরের সেই ঘরে গিয়ে উঠলেন ।

অরবিন্দের ফোনে যে ম্যাসেজ এসেছে তাতে করে কোন জায়গা দিয়ে ঢুকবে কিছু বলা ছিল না । তাই সম্ভাব্য এই ব্যবস্থা ।

ওরা চারজন সন্তর্পণে গুটিগুটি পায়ে এগিয়ে বাগানের বেড়া ডিঙোল । একজনকে নারকেল গাছে চেপে ছাদে যেতে বলল । বাকি তিনজন একতলার সেই কোণার ঘরের দিকে গেল । 

জাহিদ নারকেল গাছে চেপে ছাদে উঠে গেল । অন্য তিনজন নীচের রুমে দরজা খোলা দেখে খুব খুশি হল । হালকা সুরে অরবিন্দকে ডাকতেই বাগানে মোতায়েন ছয় জন পুলিশ টর্চ জ্বালিয়ে ওদের ঘিরে ধরল । ভেতরে মি: গুপ্তসহ অন্যেরাও বেরিয়ে এলেন । 

মি: গুপ্ত হুংকার ছেড়ে বললেন - খবরদার ! পিস্তল বের করার চেষ্টাও করবি না ; হ্যাণ্ডস আপ ! বলে পিস্তল বের করে শুন্যে গুলি ছুঁড়লেন।

তিনজন আত্মসমর্পন করল । আর ছাদে উঠে জাহিদ কার্ণিশ থেকে ছাদে লাফ দিতেই সেকেণ্ড অফিসারের সঙ্গে ধ্বস্তাধ্বস্তি শুরু হল । শক্ত সমর্থ জোয়ান ছেলেকে একলা বাগে আনতে তাঁকে একটু বেগ পেতে হল বৈকি । কিন্তু সেকেণ্ড অফিসারে একটি থাপ্পড় খেয়েই জাহিদ কাবু হল । তিনি পিছমোড়া করে জাহিদকে হাতেপায়ে চেন দিয়ে বেঁধে ফেললেন ।

তারপর ছাদের দরজা আনলক করে খুলে দিলেন। জাহিদ ওই অবস্থাতেও নারকেল গাছটা ইতিমধ্যে ছুঁয়ে ফেলেছে। সেকেণ্ড অফিসার অধীরবাবু এবার তার কোমরে সোজা মারলেন এক লাথি । তিন হাত ছিটকে পড়ল জাহিদ। ওরই পিস্তল কেড়ে মাথায় ধরলেন তিনি।

মি: গুপ্ত লাফিয়ে লাফিয়ে সিঁড়ি বেয়ে ছাদে উঠে এলেন ।

- আর ইউ ওকে, অধীরবাবু ?

- ইয়েস স্যার । তবে এই ইয়ং ম্যান শক্তি ধরে খুব । কাবু করতে বেগ পেতে হয়েছে বেশ !

মি: গুপ্ত এবার ওকে ধরে সিঁড়ির সামনে এনে পাছায় লাগালেন মস্ত লাথি । জাহিদ গড়িয়ে পড়তে লাগল সিঁড়ি বেয়ে । এ ভাবে লাথি মারতে মারতে নিয়ে এলেন নীচের বারান্দায় যেখানে সকলে উদ্বিগ্ন হয়ে অপেক্ষা করছিলেন সেকেণ্ড অফিসারের জন্য।

এবার চারজনকে পিছমোড়া করে বেঁধে প্রিজন ভ্যানে তুলে নিয়ে যাওয়া হল ।

অভয়ঙ্করবাবু বললেন - ট্রিটমেন্ট কেমন হবে দেখতে পারি মি: গুপ্ত ?

মি: গুপ্ত বললেন - দুর্বল প্রকৃতির হলে যাবেন না যেন !

অভয়ঙ্করবাবু হেসে বললেন - আমাকে সেরকম মনে করেন নাকি ?

- বেশ তো চলুন। যারা যাবেন আসতে পারেন। কিন্তু জিজ্ঞাসাবাদের সময় থাকতে পারবেন না ।

অভয়ঙ্করবাবু বললেন - তা'হলে থাক। তবে দরকার পড়লে আমাকে ডেকে নেবেন । থার্ড ডিগ্রি দেওয়ার অভিজ্ঞতা আমারও আছে স্যার ।

মি: গুপ্ত বিদায় নিলেন । 

অ্যারেস্ট হওয়ার সময় জাহিরুল কটমটে চোখে অরবিন্দকে কিছু বলতে চেয়েছিল । বুড়ো আঙুল দেখিয়ে অরবিন্দ বলল - এই ঘা সামলে নে আগে ; তারপর না হয় সামনা করিস ।

জাহিদ ,জামির ও জাহির বলল - আমাদের ধোঁকা দিয়ে ভালো করলি না কিন্তু। পরে পস্তাসনি যেন ।

টানতে টানতে ওদের ভ্যানে তুলে পুলিশ চলে গেল ।

তারপর থানায় গিয়েই শুরু হল অত্যাচার । কোন প্রশ্ন না করে চলল বেদম প্রহার ।

অধীর বাবু বললেন - কয়লা বোঝাই লরিটা কোথায়?

জামির এমন ভাবে উত্তর দিল যেন ভাজা মাছটি উল্টে খেতে জানে না। 

পায়ের গোছে দুমদাম লাঠির বাড়ি পড়ল । হাউমাউ করে কেঁদে উঠল জামির ।

পরের জন জাহিরুল। সেও বলল জানি না স্যার । অমনি শুরু হল মার । তারপর জামিরের সামনে আসতেই সে প্যান্ট ভিজিয়ে ফেলল।

অধীর বাবু বললেন - উপুড় হয়ে বোস !

জামির তাই করল । অধীরবাবু বললেন - চেটে সাফ কর নোংরাটা ।

ভয়ে জামির নিজের প্রস্রাব পান করে নিল । 

- এবার বল , গাড়িটা কোথায় ?

জামির শুকনো মুখে জাহিদের দিকে তাকাল। অধীর বাবু লাঠি দিয়ে জামিরকে পেটাতে শুরু করলেন ।

মি: গুপ্ত ঢুকলেন ভেতরে । জাহিদের সামনে দাঁড়িয়ে বললেন - বাবুলাল ঘঞশ্যামদাস ঝুনঝুনওয়ালা তোদের সঙ্গে দেখা করতে আসছেন । গাড়ির মালিক। ভালো ভাবে বলছি উনি আসার আগে বলে দে গাড়িটা কোথায় বিক্রি করেছিস । তা না হলে কি করব জানিস ?

জাহিদ দাঁড়িয়ে ছিল । মি: গুপ্ত পিস্তল বের করে ওর হাঁটুতে গুলি করলেন। পড়ে গেল জাহিদ। রক্ত দেখে ভয় পেয়ে গেল অন্যেরা । জামির বলল - স্যার পঞ্চাশ হাজারে বিক্রি করে দিয়েছি মঙ্গলপুরের একটা স্পঞ্জ আয়রণ কারখানায়।

মি; রঞ্জিত গুপ্ত বললেন - কয়লাসমেত ট্রাক মাত্র পঞ্চাশ হাজারে ?

জাহিরুল বলল - স্যার ট্রাক আর ড্রাইভারকে ছেড়ে দিয়েছি ।

- আর খালাসীটা ? তাকে চলন্ত গাড়ি থেকে ফেলে দিয়ে মেরে ফেলেছিস কে ?

জাহিদের দিকে আঙুল তুলে ওরা তিনজন দেখিয়ে দিল ।

জাহিদ তখন কাতরাচ্ছে। 

- আর অরবিন্দ সরখেলকে হুমকি দিয়েছিলি কেন ?

ওদের উদ্দেশ্যের কথা সবিস্তারে শোনার পর মি: গুপ্ত বললেন - তার মানে অরবিন্দ তোদের সাথে যোগ দিতে চায়নি - তাই তো ?

সমস্বরে ওরা বলল - হাঁ স্যার ।

মি: গুপ্ত বললেন - চল এবার কয়লা কোথায় বেচেছিস , কোন কারখানায় দেখাবি চল ।

জাহিদকে রেখে ওদের তিনজনকে সাথে নিয়ে এক ভ্যান পুলিশ গেল মঙ্গলপুর ইণ্ডাস্ট্রিয়াল এস্টেটে । যে কারখানাটা ওরা দেখাল সেটির মালিক স্বয়ং বাবুলাল ঘনশ্যামদাস ঝুনঝুনওয়ালা । মি: গুপ্তর চক্ষু তো চড়কগাছ হয়ে গেল । তিনি সঙ্গে সঙ্গে অধীরবাবুকে ফোন করে জানতে চাইলেন - বাবুলাল কি এসেছেন থানায় ?

- না তো স্যার !

- যদি এসে থাকেন ওকে আটকে রাখবেন যো কোন উপায়ে। প্রয়োজন হলে টেনে হাজতে ঢুকিয়ে দেবেন !

একটা আস্ত শয়তান লোকটা। নিজের জিনিস চুরি করিয়ে নিজেই কিনে রাখেন । ইন্স্যুরেন্সের টাকা মেরে দিতে ।

অধীর বাবু অবাক হলেন না বরং একটু ভীত হলেন। কারণ বাবুলাল ঘনশ্যামদাস তাঁকে সেদিন ডায়েরী লেখাবার নামে বেশ মোটা টাকা ঘুষ দিয়েছিলেন ।

তিনি চিন্তান্বিত হয়ে বাবুলালকে ফোন করলেন ।

- হাঁ জী বোলিয়ে সাব ।

বাবুলাল অধীর বাবুর ফোন পেয়ে বললেন ।

- আপ ইসিবক্ত সব কুছ ছোড়কে কঁহি ভী চলা যাইয়ে। সাব নে আপকা ফ্যাক্টরী সিল কর দিয়া হ্যায় ঔর আপকা তলাশ মে হ্যায় । আপ কিসি ভী সময় অ্যারেস্ট হো সকতে হ্যায় । কিউকি আপকা পর্দা ফাঁস হো চুকা হ্যায় ।

ফোন কেটে দিলেন অধীর বাবু। ওদিকে বাবুলাল পালিয়ে যেতে ব্যস্ত হয়ে পড়ল ।

( ক্রমশ )



Rate this content
Log in

Similar bengali story from Horror