ললন্তিকা ধারাবাহিক
ললন্তিকা ধারাবাহিক
পর্ব সাতষট্টি
গোপালকৃষ্ণ চাকলাদার এণ্ড ফ্যামিলি অভয়ঙ্করবাবুর আমন্ত্রণ পেয়ে চলে এলেন রাণীগঞ্জে । পটকা স্টেশন থেকে তাঁদের নিয়ে এল ।
সিং- দরজায় অভ্যর্থনা করলেন রুক্মিণীদেবী, শৈল দেবী আর ঐশী । কোলে তার একটি ফুটফুটে প্রাণচঞ্চল শিশু। মাসখানেক হল পটকার পুত্রসন্তান জন্মেছে। গোটা বাড়িতে উৎসবের ঢল । বনলতা দেবীর খুব ইচ্ছে করছিল দেখতে আসার ।
রুদ্রও খুশি হয়েছিল খুব। এবার কিছুদিনের জন্য আরণ্যকের ছায়া পড়বে না বলে ।
অভয়ঙ্করবাবু বাড়িতে ছিলেন না । তিনি অরবিন্দকে নিয়ে বাজার করতে বেরিয়েছেন । অরবিন্দকে বলে দিয়েছেন - তেমন মনে করলে সে যে কোন সময় চলে যেতে পারে । কিন্তু অরবিন্দ তেমন করেনি । বেশ আছে এখানে।
অভয়ঙ্করবাবু অরবিন্দকে সঙ্গে নিয়ে থানায় দেখিয়ে নিয়ে যান ; এটা এখন রোজকার কাজ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
ফেরার পথে বাজার করে ওঁরা বাড়ি ঢুকলেন । গোপাল বাবুরা তখন সকলে দোতলায় ডাইনিং টেবিলে বসে গল্প গুজব করছেন । আরণ্যককে নিয়ে আলোচনা চলছে।
পটকা বলল - ওই বুঝি কাকাবাবু এসে গেলেন বাজার থেকে ।
- জানিস ফুড়কি ? কল্যাণীকে উদ্দেশ্য করে পটকা বলল - যার হাত দিয়ে মাসীমা ( কনকলতা ) খুন হলেন সেই ছেলেটাকে কাকাবাবু বাড়িতে রেখেছেন । শুনলে অবাক হবি থানায় নিয়ে যাওয়া সত্বেও পুলিশ ওকে অ্যারেস্ট করেনি স্রেফ কাকাবাবুর কথায় ।
গোপালকৃষ্ণ বাবু বিস্মিত হয়ে বললেন - তার মানে আরণ্যক খুন করেনি ?
বনলতা দেবী বললেন - আরু তো তখন শয্যাশায়ী । আমি বলেছিলাম না ও খুন করেনি ।
এমন সময় অভয়ঙ্করবাবু অরবিন্দকে নিয়ে ঘরে ঢুকলেন ।
- না না বেয়ানদিদি ! আপনি ভুল করছেন । আরণ্যক বেয়াই নিজের হাতে খুন করেননি ঠিকই ; কিন্তু তাঁর পরামর্শেই তাঁকে মেরে ফেলা হয়েছে। আর যে মেরেছে সেই ছেলেটি হল ( অরবিন্দকে দেখিয়ে) এই অরবিন্দ সরখেল ।
রুদ্রের তো পায়ের রক্ত মাথায় উঠে গেল । ভীমবেগে একটা থাপ্পড় বাগিয়ে তেড়ে এল অরবিন্দের দিকে । ভাগ্যিস অভয়ঙ্করবাবু অরবিন্দকে টেনে সরিয়ে দিলেন; না হলে সেই থাপ্পড় যদি অরবিন্দের গালে পড়ত তবে নি:সন্দেহে সে অক্কা পেত ।
অভয়ঙ্করবাবু বললেন - দ্য কেস ইজ আণ্ডার ট্রায়াল । রুদ্র প্লীজ ডোন্ট মেক এনি মিসটেক নাও। আমি এই ছেলেটিকে পাঞ্জাবী মোড় থেকে ধরে এনেছি আরণ্যক বসুরায়কে চ্যালেঞ্জ ছুঁড়তে। পুলিশ পুলিশের কাজ করছে । আমরাই বা চুপ থাকব কেন ? সেই জন্য এই ছেলেটির বেঁচে থাকা প্রয়োজন। এখন এমন কিছু করবে না যাতে আরণ্যকের সুবিধা হয়ে যায় ।
রুদ্র সামলে নিল নিজেকে - সরি, ভেরি সরি ।
পটকা বলল - কাকাবাবু ! আপনি রেঞ্জার না হয়ে তো পুলিশ অফিসার হলে নাম কুড়োতন !
অভয়ঙ্করবাবু হাসলেন। সে হাসিতে যতটা না দম্ভ ছিল তার চেয়ে বেশী ছিল বুদ্ধিমত্তা । বুদ্ধি খাটিয়ে তিনি অরবিন্দকে বন্দী করেছেন । তাই তো এত তাঁর বন্দনা করা হচ্ছে ।
গোপাল বাবু অরবিন্দকে বললেন - কেন মেরেছ বাবা ? কেউ তোমাকে বলল আর তুমি একটা প্রাণ ঝরিয়ে দিলে ? তোমার গুনাগার তো ও ছিল না ।
টসটস করে দু'চোখ দিয়ে জল গড়িয়ে মেঝেতে পড়ল।- আমি একটা ক্রিমিনাল। ক্ষমা করা বা ক্ষমা চাওয়া আমার ধাতে নেই । তাই কিছু বলছি না । আমি তো নিজেকে আপনাদের কাছে উৎসর্গ করেই দিয়েছি ; এবার আপনাদের মর্জিমত আমার পাপের শাস্তি দিন। আমি প্রতিরোধ বা প্রতিবাদ কিছুই করব না ।
এমন সময় জাহিদের ফোন এল অরবিন্দের কাছে। নাম্বার দেখে ঘেন্নায় মুখ ফিরিয়ে নিল অরবিন্দ । অনেক হয়েছে। আর অন্তত কুকাজ করা থেকে নিজেকে বিরত রাখবে বলে প্রতিজ্ঞা করেছে। জাহিদের ফোন রিফিউজ করে দিল ।
বনলতা দেবী বললেন - একে আমার সামনে থেকে নিয়ে যান বেয়াই মশাই। আমি একদম সহ্য করতে পারছি না ।
অভয়ঙ্করবাবু বললেন - এখন কিন্তু এইই আমাদের দাবার চাল বেয়ানদিদি । আমরা যেমন সহ্য করে নিয়েছি তেমনই আপনারাও একটু ক্ষমাঘেন্না করে দিন। ছেলেটি নিজেই আরণ্যকের শিকার । ওর কথা শুনলে অবাক হয়ে যাবেন ।
গোপাল বাবু বললেন - যতই হোক সে একটা খুনি। আসামী । তাকে পুলিশ কেন গ্রেপ্তার করল না সেটাই তো আশ্চর্য্যের !
অভয়ঙ্করবাবু বললেন - বেড়াই মশাই ! একটু ধৈর্য্য ধরুন। কালক্রমে সব জেনে যাবেন ।
- কিন্তু ও যদি পালিয়ে যায় ?
অরবিন্দ বলল - মা কসম । আমি নিজে থেকে পালাব না। বিশ্বাস করুন বা না করুন আরণ্যাক বসুরায় গ্রেপ্তার না হওয়া পর্য্যন্ত পুলিশ যদি আমাকে ধরে নিয়ে না যায় ; আমি কোথাও যাব না ।
অভয়ঙ্করবাবু বললেন - আজ সন্ধ্যায় তোমাকে কিন্তু গান শোনাতে হবে - যেমনটি শোনাতে গীতা আশ্রমে।
বনলতা দেবী বললেন - গান ? যে মানুষ খুন করতে পারে সে গাইবে গান ? এ যে দেখি এক অঙ্গে বহু রূপ ।
- আজ্ঞে হ্যাঁ। ঠিক বলেছেন । অনেকে বলে যে গান আর ফুল ভালবাসে না ; সে খুন করতে পারে । আমি কিন্তু ফুল এবং গান ভীষণ ভালবাসি । অথচ দেখুন কেমন অস্বাভাবিক ভাবে মানুষকেও মেরে দিয়েছি । যাক গে, আজ সন্ধ্যায় গান গাইব । শুনে বলবেন কেমন লেগেছে।
বনলতা দেবী মুখ ভেঙিয়ে মাথা ঘুরিয়ে নিলেন ।
অভয়ঙ্করবাবু বললেন - অরবিন্দ ! বাগানে যাও, দেখ কোন গাছে জল দিতে হবে !
অরবিন্দ চলে গেল । অভয়ঙ্করবাবু বললেন - ছেলেটি বর্ণ- ক্রিমিনাল নয় । পরিস্থিতি ওকে ক্রাইম করতে হেল্প করেছে । তার জন্য আমিও কম দায়ী নই !
রূদ্র বলল - এ কি বলছেন আপনি ? ওর জন্য আপনি কেন দায়ী হবেন ?
অভয়ঙ্করবাবু বলতে লাগলেন রেঞ্জার জীবনের টুকরো কিছু স্মৃতি ।
বাগানে ঘুরে ঘুরে গাছগুলো পর্য্যবেক্ষণ করছিল অরবিন্দ । জাহিরুলের ফোন পেয়ে এবার ফোন তুলে বলল - কেন তোরা আমায় এত জ্বালাস বল দেখি ? বলেছি না; আমাকে ফোন করবি না । আমি আর তোদের দলে নেই । এবার আমাকে ছেড়ে দে ।
- শুনেছিস , সাগরকে পুলিশ ধরে রেখেছে ? ওদিকে ওর বউ বাচ্চাকে ইকবাল মেরে ফেলেছে ?
- তো ? আমি কি করব শুনে ?
- ওরে শালা শয়তান ! তোর জিগরী দোস্ত যে রে। মায়া হচ্ছে না?
- একদম না । হল তো ? এবার রাখ দেখি !
- আচ্ছা ঠিক আছে। তুই এখন কোথায় রে ?
- হাজতে।
- কোন হাজতে ?
- কি করবি শুনে ? তার চেয়ে নিজের ধান্দায় থাক।
- ওই ধান্দার কথাই তো বলছি ! শোন মন দিয়ে ।
- আমার এখন সময় নেই শোনার । আমি রাখছি। আর শোন আমাকে জ্বালাতন করবি না ।
জাহিরুল ভীষণ রেগে গেলে । শালা কাণাকড়ি ! কি দেমাক বেড়েছে রে তোর ! কোনদিন সামনে পেলে বুঝিয়ে দেব কত ধানে কত চাল !
জাহিরুল একনাগাড়ে বলে গেল কথাগুলো। কিন্তু শুনল কে ? অরবিন্দ ফোন ছেড়ে তখন গাছের পরিচর্যা করছে। আর মনে মনে ভাবছে - আর নয় ! অনেক খারাপ কাজ করেছি। এবার মানুষের বিশ্বাসযোগ্যতা অর্জন করতে হবে । আর তো পিছুটান বলতে কিছু নেই। বাবা নেই, মা নেই, এমনকি ললন্তিকা - যাকে নিয়ে জীবনে স্বপ্ন দেখা শুরু সেও তো ছেড়ে পালিয়েছে। অতএব ভয় কিসের ? এবার আর পিছনে নয় সামনে এগিয়ে যেতে হবে। সত্যের মুখোমুখি হতে হবে ।
( ক্রমশ )

