কাপালিক পর্ব সতেরো
কাপালিক পর্ব সতেরো
শেষ পর্য্যন্ত জগন্নাথকে কাছে টেনে আনলেন তান্ত্রিক তারানাথ । যোগাযোগের মাধ্যম হিসাবে পঞ্চানন তো ছিলই । জগন্নাথ আর বেশীদিন ' না ' করে থাকতে পারেনি ।
একদিন শীতের সন্ধ্যায় জগন্নাথ উপস্থিত হল শ্মশান ঘাটের মন্দিরে । তারানাথ তখন সেখানে ছিলেন না । গুহার অভ্যন্তরে মাতৃমূর্তির পদতলে বসে শ্রীকৃষ্ণ কীর্তন করছিলেন । আর পঞ্চানন ওরফে পাঁচু জগন্নাথকে সঙ্গে নিয়ে মন্দির চত্বরে বটগাছের বাঁধানো চাতালে এসে বসল ।
পাঁচু বলল - একটু বস কত্তা । আমি একবার ভেতরে গিয়ে দেখে আসি বাবা আছেন কি নেই ।
এমন গা ছমছমে স্থানে শীতের সন্ধ্যায় একা বসে থাকতে জগন্নাথ ভয় পেল । একে তো শ্মশান । জনশুন্য প্রান্তর , তায় শীতকাল । পাঁচটা বাজতে না বাজতেই সূর্য্য মুখ লুকিয়েছে । ঘন অন্ধকারে ঢাকা আশ্রম । কেউ কোথাও নেই । বটগাছের নীচে তো নি:সীম অন্ধকারে ছেয়ে আছে । জগন্নাথ ঘন ঘন টর্চের আলো ফেলে চারি পাশ লক্ষ্য করছে ।
- আচ্ছা পাঁচু !
জগন্নাথ ভয়ে ভয়ে বলল - আজ তো শনিবার ।
পাঁচু বলল - আজ্ঞে হ্যাঁ কত্তা ।
জগন্নাথ বলল - অমাবস্যাও পড়েছে না কি ?
পাঁচু উত্তর দিল - এই দেখ কত্তা । আমি কি ক্ষণ মুহুর্ত গুনে এখানে তোমাকে এনেছি ? তবে মনে হয় মাঝ রাতে অমাবস্যা পড়বে ।
জগন্নাথের ভয় দ্বিগুন বেড়ে গেল । সে তো শুধু বারের কথা জিজ্ঞেস করেছে । আর এ তো তিথিটাও জেনে নিয়ে এসেছে । নির্ঘাত তান্ত্রিকের পক্ষে একটা মাহেন্দ্রক্ষণ । ওরে জগু আগে পিছে না ভেবে কেন চলে এলি ! এবার বউটার কি দশা হবে !
পাঁচু জগন্নাথকে চুপ করে থাকতে দেখে বলল - তোমার কোন ভয় নেই কত্তা । বাবা নিজে যখন তোমাকে এত্তেলা দিয়েছেন তখন জেনে রাখ পিথিবির কোন শক্তি তোমার কোন ক্ষতি করতে পারবেনি ।
জগন্নাথ মুহুর্মুহু টর্চের আলো ফেলতে ফেলতে বলল - এ্যাই পাঁচু ! চল বাড়ি ফিরে যাই । মনে হচ্ছে তোর সাধু বাবা কোথাও গেছেন । আমরা অন্যদিন আসব ।
পাঁচু বলল - সেই জন্যই তো বলছি একবার ভেতরে গিয়ে দেখে আসি বাবা আছেন কি নেই !
জগন্নাথ পাঁচুর হাতে ধরে বলল - চল, তবে আমিও যাই ।
এ ভাবে যখন পাঁচু ও জগন্নাথের কথাবার্তা চলছে ঠিক
সেই মুহুর্তে গুহার ভেতর থেকে একটা আলোকরশ্মি নির্গত হল এবং সেই রশ্মি জগন্নাথকে স্পর্শ করা মাত্র জগন্নাথ বলে উঠল - ওই তো সাধু বাবা এসে গেছেন ।
পাঁচু কিছু দেখতে পেল না । শুধু সেদিনের সন্ধ্যায় কর্তার সাষ্টাঙ্গে প্রণাম করার দৃশ্য ওর চোখে ভেসে এল ।
স্মিতহাস্যে তারানাথ এসে দাঁড়ালেন তাদের সম্মুখে । পাঁচুকে আদেশ করলেন - পেঁচা! বাবুকে এখানে বসিয়ে রেখেছিস কেন ? ওকে ভেতরে নিয়ে আয় ।
সবার আগে তান্ত্রিক, তারপর জগন্নাথ এবং শেষে পঞ্চানন গুহার ভিতরে চলে গেলেন । তারানাথ জগন্নাথকে মহাকাল এবং মহাকালীর সামনে নিয়ে এসে বললেন - কি দেখছিস ?
জগন্নাথের বলার মত কিছু ছিল না । শুধু দেব দেবীকে প্রণাম নিবেদন করে বলল - বাবা ! আমাকে এখানে নিয়ে এলেন কেন ?
তান্ত্রিক বোধ করি অসন্তুষ্ট হলেন । হাতের ত্রিশুল গম্ভীর নাদে মাটিতে পুঁতে দিয়ে বললেন - তোর এত সাহস - তুই আমাকে প্রশ্ন করিস ? আমি কে জানিস ?
তারপর নিজেই নিজের প্রশ্নের উত্তর দিয়ে বললেন - আমি মহাকাল স্বয়ং । এই গ্রামকে অনাচারমুক্ত করতে এই শ্মশানে রয়েছি । তোকে কি এমনি এমনি ডেকেছি নাকি ! ওরে , অকারণে কাউকে বিব্রত করা তান্ত্রিকের কর্ম নয় । তোকে ডেকেছি কেন তার উত্তর এখনই পেয়ে যাবি ।
তান্ত্রিক থেমে গেলেন । চোখ দু'টি বন্ধ করে কিছু সময়ের জন্য মৌন হয়ে ধ্যানমগ্ন হয়ে পড়লেন । জগন্নাথও তেমন কেউকেটা না হলেও এক্কেবারে হেলাফেলা নয় । স্বর্গত রামচরণ ভট্টাচার্য্য মহাশয়ের বংশধর । পিতামহ রামচরণ এই মন্দিরের সেবক ছিলেন । বাবার আদেশমত এই মন্দিরে নিজের হাতে মহাকাল প্রতিষ্ঠিত করে মহাকালের চরণে নিজেকে নিবেদন করে গেছেন ।
চোখ না খুলেই সাধু বাবা জগন্নাথকে উদ্দেশ্য করে বললেন - এই তো মনে পড়েছে রে শালা । আমিও তো জানি তুই রামচরণের নাতি । সেইজন্য কিছু কথা বলার জন্য তোকে ডেকে পাঠিয়েছি ।
সাধু বাবা পাঁচুকে বললেন - পেঁচো ! ওকে নিয়ে মন্দিরের বাইরে অপেক্ষা কর । আমি একটু পরে আসছি।
পাঁচু জগন্নাথের সঙ্গে বেরিয়ে এসে আবার চাতালে বসল ।
গুহার অভ্যন্তর থেকে সাধু বাবার অট্টহাসির শব্দ স্পষ্ট শোনা যাচ্ছে । জগন্নাথের মত পাঁচুও এবার সেই হাসির শব্দ শুনে ভয়ে ঠকঠক করে কাঁপতে লাগল । বটগাছে নিশাচরদের ডাক শোনা গেল । কয়েকটা শৃগাল শবদেহের অবশিষ্টাংশ নিয়ে নিজেদের মধ্যে ঝগড়া করতে লাগল ।
জগন্নাথ সে সব দেখে তো প্রায় কেঁদে ফেলার পর্য্যায়ে পড়ে গেল । পাঁচু তখন রামনাম জপ করছে ।
সাধু বাবা বেরিয়ে এসে ওদের সামনে দাঁড়ালেন । শৃগালেরা পোড়া মাংস নিয়ে চলে গেল । গাছের নিশাচরেরাও ঝিম মেরে গেল । সাধু বাবা বললেন - তুই তো পিতা হতে চলেছিস রে জগাই ! তোর পিতামহের আত্মা এবার মুক্তি পাবে ।
জগন্নাথের তখন মাথা ঘুরছে । কি পাগলের সামনে এসে পড়লাম রে বাবা !
জগন্নাথ ভাবল নিশ্চয় পাঁচু বাবাকে খবর দিয়েছে। কটমট করে পাঁচুর দিকে চেয়ে জগন্নাথ বলল - ডাক্তার বাবু তো তাই বলেছেন বাবা !
তান্ত্রিক শান্ত মেজাজে বললেন - বলবেই তো । যা সত্যি সে কথা বলতে বাধা কি ! তোর সন্তান ভূমিষ্ঠ হলেই তোর পিতামহের চিরদিনের জন্য মুক্তি হয়ে যাবে । বড় অসহায় হয়ে পড়েছে রে ! আমাকে প্রতিদিন বড় বিরক্ত করে মেরেছে । বাবা মুক্তি দাও !
জগন্নাথ হাঁ হয়ে সব শুনছে । তার পিতা তো গয়ায় গিয়ে পিণ্ডদান করে এসেছিলেন তথাপি ঠাকুর্দার মুক্তি হয়নি ?
সাধু বাবা বললেন - না রে , এখনও মুক্তি পায়নি । তবে এবার পাবে। ওই জন্যই তো তোর বউটাকে অন্তঃসত্ত্বা করে দিলুম রে !
জগন্নাথ চমকে উঠল । একি কথা শুনছি! সাধু বাবা .......
আবার অট্টহাসিতে ফেটে পড়লেন তান্ত্রিক । সেই হাসির ঝিলিক পড়ল গিয়ে বটগাছের শরীরে । প্রবল দমকা হাওয়ায় গাছশুদ্ধ চাতাল যেন ভূকম্পের মত কেঁপে উঠল। জগন্নাথ পাঁচুকে জড়িয়ে ধরে উভয়ে ভয়ে চোখ বন্ধ করে ফেলল । পাখিগুলো কিচিরমিচির করতে করতে আবার স্তব্ধ হয়ে গেল ।
( চলবে )

