STORYMIRROR

Shyamasree (শ্যামশ্রী)

Abstract Drama Thriller

3  

Shyamasree (শ্যামশ্রী)

Abstract Drama Thriller

জীবনযাপন ( পর্ব - আট)

জীবনযাপন ( পর্ব - আট)

7 mins
149

সেদিন রাতে সুজিত বাইরে থেকে খাবার কিনে নিয়ে এলো। ছেলে-মেয়েরা ভয়ে ভয়ে মায়ের দিকে তাকালো, কারণ মা বাইরের খাবার খাওয়া একদমই পছন্দ করে না। আরতি কথা হারিয়ে বিমূঢ় হয়ে পড়লো, বুঝতে পারলো ওর করা খাবার ছেলে-মেয়েদের খেতে দিতে নারাজ সুজিত। ও সব রান্না করেছে নিজে হাতে, দুপুরের রান্না আজ ছিলো না। বৃহস্পতিবার নিরামিষ হয়, তাই রাতে রুটি, পরোটা এসব কিছু বানায়, ছেলে-মেয়েদের জন্য বিশেষ করে। আজও পরোটার আটা মেখে রেখেছিলো, সাথে আলুর দম করে রেখেছে। হালকা শীত পড়েছে, নতুন ছোট আলুর দম সুজিতের বড্ড পছন্দ, তাই বেশি করেই করে আরতি সাধারণত। তাই আলু সিদ্ধ করে, ছুলতে অনেকটা সময় চলে গিয়েছে। তার উপর রান্না করা মশালা বেঁটে। অনেকটা সময় চলে গিয়েছে, তারপর ময়দা মেখে, অল্প সুজির পায়েস করে রেখেছে। নয়ন ঝাল তেমন খেতে পারেনা। সামান্য হয়তো বাবার সাথে দম মুখে দেবে, সুজির পায়েস দিয়েই পরোটা খাবে। এই ভেবে রেখেছিলো, ভেবেছিলো বিল্টুর যাওয়ার সাথে সাথে বিষয়টা টানবেনা সুজিত, এতোটা ভাবতে পারেনি। আরতি কিছু বললো না, মাথাটা ঘুরছিলো, টলমল পায়ে পাশের ঘরে গিয়ে দোর এঁটে শুয়ে পড়লো। তারপর ওর আর কিছু মনে নেই। আরতির যখন জ্ঞান ফিরলো তখন কত বেলা ঠিক ঠাওর করতে পারলো না সে। বাইরে এসে দেখে বেলা ভালোই হয়েছে, জানালা, দরজা সব বন্ধ ছিল তাই বুঝতে পারেনি। ও ঘরের বাইরে আসতেই কোথা থেকে ছুটে এসে নয়ন জড়িয়ে ধরলো মাকে।


" কি রে মা পড়তে যাসনি?"

" না, দাদারা গিয়েছে, আমার শরীর ভালো লাগছিলো না।"

" কেন রে মা, কি হয়েছে তোর? " বলে মেয়ের কপালে হাতে বুকে হাত বুলিয়ে পরখ করতে লাগলো সে। মনে হলো মেয়ের গা গরম গরম ঠেকছে। আরতি কালকের সব কিছু ভুলে গেল, তাড়াতাড়ি করে কাপড় বদলে এলো। তারপর সোজা রান্না ঘরে ঢুকলো। রান্না ঘরে ঢুকে বুঝতে পারলো সুজিত আনাড়ি হাতে রান্নাঘরে দুধ গরম করতে গিয়ে ছড়িয়ে ফেলে একশা করেছে। আরতি তাড়াতাড়ি করে পুরোনো ঘি গরম করে নিয়ে, মেয়ের সারা গায়ে মালিশ করে দিয়ে জিজ্ঞেস করল "মা খাবি কিছু, খিদে পেয়েছে? "

" ইচ্ছে করছে না, একদম ভালো লাগছে না।"

শীত পড়তে শুরু করলেই আরতি চিন্তায় পড়ে যায়। ওর ছেলে-মেয়েদের ঠান্ডার ধাত রয়েছে। শীত পড়লেই সর্দি-জ্বরে ভুগতে শুরু করে। একজন সারতে না সারতে আরেকজনের হয়ে যায়, আরতির একটা রাতও নিশ্চিন্তে কাটেনা। অয়নটা খেলাধুলা করে, তাছাড়া ও বড়ও হয়েছে, তাই ও অসুস্থ হলে অস্থির হয়ে পড়ে না তেমন। কিন্তু চয়ন আর নয়ন যেমন নিজেরাও অস্থির হয় এবং বাড়ির বাকিদেরও অতিষ্ঠ করে তোলে।অবশ্য আরতি সবার ক্ষেত্রেই চিন্তায় কাঠ হয়ে থাকে।

আরতি বুঝতে পারলো মেয়েটার জ্বর আসতে পারে, এমনই হয় ওর জ্বর আসার আগে। সে রান্নাঘরে গিয়ে দেখলো আটা তেমনি করে মাখা রয়েছে। পরীক্ষা করে দেখলো সামান্য ঠান্ডা পড়েছে আর ভেজা কাপড় দিয়ে ঢাকা ছিল দেখে যেমনকার তেমন রয়েছে আর সুজিটা তেমন কিছু হয়নি। সামান্য শক্ত হয়ে গিয়েছে। আরতি সুজি বাটিতে তুলে গরম দুধ দিয়ে ফুটিয়ে নিলো। আর আলুর দমটাও গরম করে নিয়ে, গোটা ষোল পরোটা ভেজে নিয়ে, মেয়ের ঘরে গেল তার মধ্যে থেকে চারখানি নিয়ে গেল। জানে চারটা খেতে পারবে না। খুব জোর দেড়খানা খাবে। তবুও সাথে নিয়ে গেল। রাতে কি খেয়েছে কে জানে? আর বাকিগুলো ছেলেরা পড়ে এসে খাবে বলে ভেজে রাখলো। সাধারণত আরতি ভেজে রাখে না কিছু। কিন্তু কি আর করবে? বাড়ির যা অবস্থা হয়ে রয়েছে। কোথাও ঝাড়ু পড়েনি।গোবর ছরা পড়েনি, নিকানোও হয়নি তুলসী তলা খানি। মেয়েকে খাইয়ে ওসব কাজে হাত দিতে হবে। তার আগে ছেলেরা এসে পড়লে খিদেতে ছটফট করবে। তখন ওদের নিজেই বেড়ে নিতে বলবে। এই খাবার দেখলে নিজেই বেড়ে নেবে ওরা। তবে খুব জোর চারটি করে খাবে। তবুও বেশি করেই ভেজে রাখলো। যদি উনি খান..

ঘরে গিয়ে দেখে নয়ন ঘুমিয়ে পড়েছে। আরতি আদর করে মেয়েকে কোলে তুলে নিয়ে আদর করে বললো " মা ঘুমো করছো? একটু খেয়ে নিয়ে ঘুমু করো।"

" না মা খাবো না।"

আরতি আরও মেয়েকে গভীর করে জড়িয়ে বললো " এমা না খেলে হয়? দেখো তো মা কি এনেছে নয়নের জন্য। "

নয়ন খাবো না খাবো না বলে যাচ্ছিল তবুও। আরতি এক টুকরো পরোটা ছিঁড়ে সুজির পায়েস দিয়ে মুখে দিতেই নয়ন চোখ খুলে বললো " পরোটা আর সুজির পায়েস? "

" হ্যাঁ সোনা মা, আমি জানি তো আমার মাটা খেতে বড্ড ভালোবাসে।"

আরতি মেয়েকে কোলে তুলে আরেক টুকরো মেয়ের মুখে দিয়ে চুমু খেলো।

নয়ন মুখেরটা শেষ করে হা করেছে, আরতি পরোটা ছেঁড়ার জন্য হাত বাড়িয়েছে, সুজিত এসে থালাটা হাত সামনে থেকে উঠিয়ে নিয়ে বললো "আমি বলেছি না, আমার সন্তানদের থেকে দূরে থাকবে।"

আরতি স্তব্ধ হয়ে গেল,"ছেলে-মেয়েরা আমারও", ওর মুখ থেকে এই সামান্য কথাটা পর্যন্ত বের হলোনা। ও খালি অসুস্থ মেয়েটার মুখের দিকে তাকালো, মেয়েটা কত খিদে ও আশা নিয়ে ওর সামনে মুখ হাঁ করেছিলো।

আরতি নিজের অপমান ভুলে অতি ধীর কন্ঠে বললো "নয়নের শরীরটা ভালো নেই, সামান্য ওই টুকু খাওয়াতে দাও।"

" না, আমার মেয়ের ভালো আমি বুঝবো।"

" জানি বুঝবে, যখন হাতে করে নিয়ে এসেছি, দাও না গো খাওয়াতে।"

বলে হাত বাড়াতে যেতেই সুজিত খাবারের থালাটা ছুঁড়ে ফেলে দেয়। আরতি আর নিজেকে সংযত রাখতে পারে না, এক ছুটে বাড়ির বাইরে বেড়িয়ে যায়। নয়ন এতোক্ষণ চুপ করেই ছিল, কিন্তু বাবাকে খাবারের থালা ফেলে দিতে দেখে আর মাকে ছুটে বেড়িয়ে যেতে দেখে, নয়ন চিৎকার করে কেঁদে উঠে। সুজিত মেয়ের কান্না শুনে বাস্তবের মাটিতে ফিরে আসে। ছুটে যায় মেয়ের দিকে।

সুজিত অনেক কষ্টে মেয়েকে শান্ত করে। তারপর মেয়েকে কোলে তুলে নিয়ে বলে "চল তোকে বাইরে থেকে খাইয়ে নিয়ে আসি। বল কি খাবি।"

মেয়ে খাবো না, খাবো না করে যাচ্ছে। আর বলে যাচ্ছে " মা যাব, মা কই?"

সুজিত বুঝতে পারেনি আরতি বাড়ি ছেড়ে বেড়িয়ে গিয়েছে, ভেবেছে পাশের ঘরেই রয়েছে। সে ওদিকে খেয়াল না করে মেয়েকে ঠান্ডা করার জন্য মেয়েকে কোলে নিয়ে যায় ওর জন্য মুখরোচক কিছু একটা কিনে দেবে।

মেয়েকে কোলে নিয়ে এদিকে ওদিকে ঘুরিয়ে, এটা ওটা খাইয়ে দেড় ঘন্টাখানেক পরে ঘরে ফিরে আসে। ঘরে ফিরে দেখে অয়ন আর চয়ন বসে বসে পরোটা, সুজি আর আলুর দম খাচ্ছে, অবশ্য খাওয়া প্রায় শেষ। সুজিতের বড্ড রাগ হলো। ভাবলো আরতিই খাবারটা বেড়ে দিয়েছে। তার আপত্তি সত্ত্বেও এই কাজ করেছে দেখে হিতাহিতজ্ঞানহীন হয়ে পড়ে সুজিত। মেয়েকে কোল থেকে নামিয়ে রেখে বলে "খুব সাহস বেড়েছে তাই না? বলছি না আমার ছেলে-মেয়েদের থেকে দূরে থাকবে। আমার এখানে থাকতে হলে চুপচাপ এক কোনে পড়ে থাকবে। কি স্বভাব আমার জানতে বাকি নেই। অন্য কোনো স্বামী হলে ঘাড়ে ধাক্কা দিকে বেড় করে দিতো। নেহাৎ আমি সুজিত ভদ্দরনোকের বেটা। তাই সহ্য করে যাচ্ছি সব।"

অয়ন চয়ন অবাক হয়ে বাবার দিকে তাকিয়ে রয় আর নয়ন ভয় পেয়ে দাদাদের গা ঘেঁষে বসে। ওরা ঠিক বুঝতে পারে না বাবা কাকে ওমনি করে বলছে?

সুজিত দেখে ছেলেরা তখনও খাচ্ছে, সামনে এসে দাঁড়িয়ে বললো " ফেল ওসব, ফেলে দে বলছি।"

অয়ন আর চয়ন প্রায় একত্রে বলে উঠে " কেন কেন ফেলবো? মা বলে খাবার নষ্ট করতে নেই।"

" খুব বলে, মহাপণ্ডিত তো উনি। আমি বলছি আর খাবি না। ফেলে দে বলছি বাকিটা।"

চয়নের পাতে সামান্য সুজির পায়েস আর অয়নের পাতে অর্ধেক পরোটা আর আলুর দম ছিল।দুইজনে প্রায় একসাথে তাড়াতাড়ি করে বাকি খাবার টুকু মুখে ঢুকিয়ে নেয়। সুজিত ছুটে আসে, চয়ন আর অয়ন ততক্ষণে গোগ্রাসে গিলতে শুরু করেছে মুখের খাবারটুকু। সুজিত ছেলেদের নিরস্ত করতে না পেরে রাগে ফেঁটে পড়ে স্ত্রীর উপর।

"খুব ভালো শিক্ষা দিয়েছ, ছেলে মেয়েরা যাতে বাবাকে অমান্য করে তাই না। আমার বাড়িতে থাকবে, আমার বাড়িতে খাবে আর আমার ছেলে মেয়েদের ভুল শিক্ষা দেবে?"

অয়নরা এবারে বেশ ভয় পেয়ে গেল, বাবাকে বলতে সাহস পেলো না মা বাড়ি নেই বা তারা বাড়ি ফিরে মাকে দেখেনি। ওরা ভেবেছে মা পাড়ায় কারো বাড়ি গিয়েছে। কোথায় গেলে মা বলে যায়, ও খাবার ঢেকে রেখে যায়। আজও তাই মিনিট তিরিশেক অপেক্ষা করার পরে মাকে আসতে না দেখে রান্না ঘরে ঢুকে দেখে পরোটা ঢাকা দিয়ে রাখা আছে। ওরা দুইজনে নিজের মতো করে খাবার সাজিয়ে নিয়ে খেতে বসে পড়ে। খিদেও পেয়েছিল ওদের বড্ড। তার উপর কাল রাতে ওসব খাবারে পেট ভরেনি। সকালে বাবা দুই দিয়েছিল বটে, কিন্তু চিনি বা চিড়ামুড়ি কিছুই খুঁজে পায়নি। তাই এক গ্লাস প্রায় ঠান্ডা দুধ খেয়ে পড়তে যেতে হয়েছিল। সামনে তাদের এই প্রিয় খাবারটা দেখে খেতে বসে গিয়েছে তারা।

সুজিত নিজে নিজেই কিছুক্ষণ চিৎকার করে কোনো উত্তর না পেয়ে ঘরে গিয়ে দেখে ঘর ফাঁকা, তারপর সব ঘর খুঁজে দেখে কোনো ঘরেই আরতি নেই। এবারে বাইরে এসে ছেলেদের সামনে দাঁড়িয়ে বললো "তোর মা কোথায় গিয়েছে? "

অয়ন চয়ন নিজেদের মুখ চাওয়া-চায়ী করলো।

" কি রে উত্তর দিচ্ছিস না কেন?"

" আমরা জানিনা বাবা।"

" কেন কোথায় গেল বলে যায়নি?"

"না কি করে বলবে? আমরা তো এসে মাকে দেখিনি।"

" দেখিস নি মানে? কে খেতে দিলো তবে তোদের?"

" আমরা নিজেরাই নিয়ে নিয়েছি।"

সুজিত আর কিছু বললো না, গোঁজ ধরে বসে রইলো.....


চলবে..



Rate this content
Log in

Similar bengali story from Abstract