জীবনযাপন ( বিংশ পর্ব)
জীবনযাপন ( বিংশ পর্ব)
"মা একবারটি চোখ খোল, কি রে মা খুলবিনা চোখ? দেখ কে এসেছে? "
আরতির মেসোমশাই আরতির কথা শুনে থাকতে না পেরে ছুটে এসেছেন মালদা মেডিক্যাল কলেজে, যেখানে আরতি ভর্তি আছে। সাথে অজিত আর অপু।
" আপনি নিজেকে সামলান দাদু।"
অপু উনার কাঁধে হাত দিয়ে বাইরে নিয়ে এসে বসালো, তিনি আর্দ্র গলার বললেন " দাদা তোমার কাকিমাকে আমি জন্মের পরে থেকে মানুষ করেছি, ও আমার নিজের মেয়ের চেয়ে কম না। বাপ হয়ে এমন করে মেয়েকে দেখতে কি কষ্ট তা তুমি এখন বুঝতে পারবেনা। যেদিন বাপ হবে বুঝতে পারবে।"
অপু আর কথা না বলে চুপ করে রইলো। ওরও মনটা কষ্টে ফেঁটে যাচ্ছিল, সেও যে বড্ড ভালোবাসে তার কাকিমাকে। আর ছোট ছোট ভাইবোনদের দিকে তাকিয়ে যন্ত্রণাটা হাজারো গুন বেড়ে যায়।
ডাক্তার বাবুর সাথে কথা বলে অজিত এসে জানালো এখন থেকে লাভ নেই।
" আমি যাব না বাবা, ওর মাসির কাছে কি করে দাঁড়াবো বলো?"
অজিত পাশে বসে বললো " আপনাকে সান্ত্বনা দেওয়ার কোনো ক্ষমতা আমার নেই। কি বলে সান্ত্বনা দেবো? একজন বাপের কাছে মেয়ে কি আমি জানি। তবুও এতোটুকুই বলব আপনাকে শক্ত হতেই হবে, আপনি যে আমাদের ভরসার স্থল। আমাদের দিকে তাকিয়ে যদি.. "
অজিতের এই কথা শুনে নিজেকে সামলাতে না পেরে কেঁদে ফেললেন তিনি। অপু সইতে পারলো না। তার ছোটবেলায় হারানো দাদূর কথা মনে হওয়ায় সে জড়িয়ে ধরলো। অজিত অলক্ষ্যে নিজের চোখ মুছলো।
------
" আচ্ছা মেসোমশাই ঘুমিয়েছেন? আর সুজিত আছে কেমন? "
অজিত জিজ্ঞেস করল স্ত্রী সুমতিকে। আজ ফিরতে সন্ধ্যা গড়িয়ে গিয়েছিল। এতোক্ষণ পরে রাতের খাবার শেষ করে সব সামলিয়ে ঘরে এসেছে সুমতি। স্ত্রীর ফেরার অপেক্ষায় ছিল সে। আজ জানতো বাচ্চারা তাদের দাদুর সাথে ঘুমোবে।
সুমতি দরজার আগড় বন্ধ করতে করতে বলে " সে সুজিত ঘুমিয়ে পড়েছে, ঘুমের ওষুধ দেওয়া আছে যে। আর মেসোমশায়ের কথা বলতে পারি না, নাতি নাতনিদের সাথে পেয়ে উভয় দেখলাম কিছুটা স্বাভাবিক হয়েছে। তপুটাকে বললাম ওর ঘরে মানে দাদাদের ঘরে ওর খাটে গিয়ে শুতে। শুনলো না। চারজন মিলে দাদুকে ঘিরে শুয়ে রয়েছে। "
" তা তুমি কি করে আশা করো যে ও দাদাদের ঘরে শোবে? ওতো ছোটই বলো। বেচারা দাদুকে পায়নি।"
সুমতি ছদ্ম রাগ করে বললো "সে না হয় বুঝতে পারলাম তা তুমি জেগে আছো কেন?"
স্ত্রী কাছে ডেকে পাশে বসতে বলে একটা ধরে ছোট্ট করে একটা শ্বাস ছেড়ে অজিত বললো "তোমার সাথে একদণ্ড কথা বলার সময় হয়না, তুমি যেভাবে করে দু'হাতে সবটা সামলাচ্ছো, সেজন্য আমি কৃতজ্ঞ।"
সুমতি স্বামীর হাতে মৃদু চাপ দিয়ে বললো "আমি কি একা কিছু করছি নাকি? সবাই মিলে.."
" নাগো তুমি আছো তাই বাড়ির সবকিছু তোমার ঘাড়ে চাপিয়ে নিশ্চিন্তে আছি। নয়ন.."
হঠাৎ একটা চিৎকার শুনা গেল বাইরে থেকে।
" বাইরে শব্দ কার? "
অজিত কিছু বলার আগেই ওর দরজায় করাঘাত শোনা গেল।
অজিত উঠতে যেতেই সুমতি বললো " তুমি দাঁড়াও আমি দেখছি।"
সুমতি দোর খুলতেই দেখে মেজো ছেলে দীপু দাঁড়িয়ে, কিছু প্রশ্নের আগেই সে বলে উঠে " মা কাকাই ছুটে বেড়িয়ে যাচ্ছিল ঘর থেকে দরজা খুলে। দাদা শুনতে পেয়ে আমাকে জাগিয়ে দেয়। দুইভাই মিলে কোনো মতে আঁটকেছি। ভাগ্যিস আজকে ঘরের মাঝের দরজাটা খোলা রাখতে বলেছিলেন। "
অজিতের দিকে একবার তাকিয়ে নিয়ে দ্রুত পায়ে বেড়িয়ে যায় সুমতি। অজিতও ফতুয়াটা কোনো মতে জড়িয়ে বেড়িয়ে আসে। বাইরে এসে দেখে অপু আর বাড়ির সবসময়ের চাকর বিপুল ধরে আছে সুজিতকে। সুজিত চিৎকার করে বলছে "ছাড় আমাকে ছাড়, যেতে দে আমাকে আরতির কাছে।"
অজিত ভাইয়ের এই অবস্থা দেখে অসহায় বোধ করে। সুমতি তাড়াতাড়ি করে সব বাতি জ্বালিয়ে দেয়।লক্ষ্য করে নয়নরা সবাই চলে এসে দাঁড়িয়ে রয়েছে ওদের দাদুর গাঁ ঘেঁষে, ভয়ে ছোট্ট হয়ে গিয়েছে সবার মুখ।সুমতি সেদিক লক্ষ্য করে এগিয়ে যায়। "মেসোমশাই.. "
উনি হাত দিয়ে সুমতিকে থামতে বলে ইশারায় বাচ্চাদের ঘরে নিয়ে যেতে বলে সুজিতের উদ্দেশ্যে বলে " কি পাগলামো শুরু করেছে সুজিত মাঝরাতে?"
গুরুগম্ভীর গলার আওয়াজখানি ওষুধের মতো কাজ হয় হঠাৎ শান্ত হয়ে যায় সে, তারপর পেছন ঘুরে মেসো শ্বশুরকে দেখেই ছুটে গিয়ে সবাইকে অবাক করে পায়ে পড়ে যেতে দেখে তিনি জামাইকে দু'হাতে তুলে নিয়ে বলেন " কি করছো সুজিত? " এই গলায় কেমন একটা স্নেহ মেশানো অসহায়তা।
" মেসোবাবা আপনি জানেন না আরতি কোথায়? আপনার কাছে আছে তাই না? জানেন আমি কত্তো খুঁজে বেড়াচ্ছি, কিন্তু খুঁজেই পাচ্ছিনা। মানলান দোষ করেছি, তাই বলে এতো শাস্তি দেয় কেউ?"
তিনি কিছু না বলে সুমিতের মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে লাগলেন, রাগ অভিমান, অভিযোগ সব ভেঙ্গে পড়তে লাগলো উনার।
সুমিত আবদারের সুরে আবার বললো " আমাকে নিয়ে যাবেন মেসোবাবা, কেউ নিয়ে যাচ্ছে না। কতদিন দেখিনি ওকে, .."
" আমি নিয়ে যাবো তোমাকে, যাও গিয়ে ঘুমিয়ে পড়ো বাবা। "
" সত্যি? "
" তুমি জানোনা তোমার মেসোবাবা মিথ্যা কথা বলে না।"
সুজিত মাথা দুলিয়ে চলে যেতে লাগলো অপুর সাথে, তবে যাওয়ার পথে বারকয়েক তাকালো উনার দিকে।সেই দৃষ্টিতে একটা দীর্ঘ শ্বাসের সাথে সাথে একটা কথাই বেড়িয়ে এলো " মা তুই কারো জন্য না, সুমিতের জন্য সুস্থ হয়ে ফিরে আয়। তোকে ছাড়া ছেলেটা বাঁচবেনা.."
বলে ধুতির খুঁট দিয়ে চোখ মুছে নিলো৷ অজিত কখন এসে দাঁড়িয়েছে লক্ষ্য করেননি তিনি, মেসোবাবা ডাকটা উনাকে আরও অস্থির করে তুলেছে। এই ডাকটায় ডাকে উনাকে একমাত্র আরতি। মেসো আর বাবা মিলে একসাথে। "মেসোমশাই আপনি বিশ্রাম নিন, শরীর টিকবেনা এমন চলতে থাকলে। "
সচকিতে অজিতের দিকে তাকিয়ে বললো " বাবা তুমি, হ্যাঁ যাই.."
অজিত হাত ধরে ধরে ঘরে ঢুকিয়ে দিয়ে এলো। ঘরে ঢুকতে যেতেই দেখে বাচ্চার সুমতিকে শক্ত করে ধরে রয়েছে, উনাকে আসতে দেখেই তাড়াতাড়ি করে উঠে বসে মাথায় আঁচল দিতে দেখেই তিনি বলেন "তুমি ওদের সাথে থাকো মা, আমি অন্যত্র শুয়ে পড়ি।"
" তা কি হয়?"
" খুব হয় মা, এখন ওঁদের দরকার তোমাকে।"
অজিতের দিকে তাকাতেই সে বললো " আমি দীপুকে নিয়ে শুয়ে পড়ছি। উনাকে ওখানে.. "
" কিন্তু.. "
" কোনো কিন্তু নয় মা, এই বেশ । "
অজিত মুকুন্দবাবুর হাত ধরে ওই ঘরে নিয়ে গিয়ে শুইয়ে দিলেন।অবশ্য তিনি শুতে চাইছিলেন না। অপু আর দীপু তখনও পাশে সুজিতের কাছে। সুজিত শুয়েছে ঠিকই কথা বলে চলেছে। ছোট্টবেলায় কাকুর নয়নের মনি ছিল দুটোতে। তাই আজও সুজিতকে কেউ সামলাতে না পারলেও ওরা দুইভাই পারে।
" সুজিত ঘুমিয়ে পড় ভাই।"
" দাদা " বলে বিছানায় উঠে বসে সুজিত। ইশারায় অজিতকে ডেকে বলে " দাদা কাল যাব আরতির কাছে, তুই যাবি তো?"
অজিত ছোটবেলার মতো ভাইয়ের মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে দিতে বললো " হ্যাঁ যাব তো সাথে তুই এখন ঘুমো দেখি। "
কিছুক্ষণের মধ্যে সুজিত ঘুমিয়ে পড়লো, মুখে কেমন একটা খুশীর হাসি। অজিত ভাইয়ের আশান্বিত মুখের দিকে তাকিয়ে থাকতে পারলেন না। মেজো ছেলেকে ইশারা করে বাইরে বেড়িয়ে এলেন।
পরের দিন সকাল থেকে উঠে সুজিত মাতিয়ে তুললো। মুকুন্দবাবু কথা মতো জামাইকে নিয়ে রওনা হলেন মালদা মেডিক্যাল কলেজের উদ্দেশ্যে।
চলবে.....
