ইচ্ছাপূরণ
ইচ্ছাপূরণ
দীনদয়াল দরিদ্র ভাগচাষী।কখনো জমিদার বাড়ির জমিতে...কখনো কোনো পয়সাওয়ালা ধনী পরিবারের কর্তার নির্দেশে তাদের জমিতে বিচ্ছিন্নভাবে ভাগচাষীর কাজ করে তার এবং তার স্ত্রী সৌদামিনীর পেটের ঠেকা মিটিয়ে দিন গুজরান হয়ে যায় মোটামুটিভাবে।কিন্তু সৌদামিনীর মনে ভারী খেদ।বিয়ের দশ বৎসর পার হতে চলল...এখনো একটিও ছেলেপুলে হল না...!এ যে বড় কষ্টের...।চারপাশে সে দেখে আর পাঁচটা ঘরনী কেমন বছর বছর দুই তিনটে বাচ্চার মা হচ্ছে...তাদের লালনপালন যত্নআত্তি করে কি সুন্দর সংসার ধর্ম পালন করছে।বাচ্চাগুলো কেমন মা মা করে তাদের আঁচল ধরে ঘোরে...দেখে মনোকষ্টে যেন ভিতরে ভিতরে বুকটা ফেটে যায় সৌদামিনীর।তাদের স্বামী স্ত্রীর ছোট্ট সংসারে শ্বশুর শাশুড়ি দেবর ননদের কোনো অস্তিত্ব নেই।শুধুমাত্র স্বামী স্ত্রীর দুটি পেটের জন্য দুইবেলা ভাতের যোগাড় করার তাড়নাই হল তাদের বেঁচে থাকবার তাগিদ।সেই তাড়নাতেই দীনদয়াল প্রতিদিন ভোর না হতেই ছুটে যায় তার মজুরি খাটবার ক্ষেতে আর সৌদামিনী উনুন জ্বেলে বসে যায় ভাত সব্জীর বন্দোবস্ত করতে।রান্না সেরে, উঠোন নিকিয়ে,ঝাটপোঁছ সেরে ঘরদোর পরিষ্কার করে পুকুরে কাপড় ধুয়ে নিয়ে একখান ডুব দিয়ে এসে তারপর স্বামীকে তার মজুরির ক্ষেতে গিয়ে তার দুপুরের ভাতসব্জী দিয়ে ঘরে ফিরে এসে নিজে খায়।তারপর রাত হয়ে এলে ফের রাতের রান্নার যোগাড়।মাঝে মাঝে এই একঘেয়ে জীবনখানা বড় অসহ্য ঠেকে সৌদামিনীর।আর পাঁচজনের সংসারে কত মানুষ আছে,কত কথা আছে,হাসিকান্না-দুঃখ আনন্দের সাতকাহন দিয়ে পরিপূর্ণ জীবনের গতি আর ছন্দ আছে তা শুধুই নিজের উঠোনে বসে গোবর লেপতে লেপতে দীর্ঘশ্বাসের সঙ্গে নিরীক্ষণ করে চলে সৌদামিনী আর মনেপ্রাণে তার বন্ধ্যা ক্রোড়দেশ ভরিয়ে দেবার জন্য ঈশ্বরের কাছে কাতর আকুতি জানায়।এইভাবে দিন চলে।পাড়ার সবাই তাকে বাঁজা বলে এবং তার সংস্পর্শ এড়িয়ে চলে।নিজেদের শিশু সন্তানকে এর ওর হাতে দিলেও সৌদামিনীর হাতে দিতে কিছুতেই চায় না। সমস্ত আত্মীয় স্বজন আর পাড়া প্রতিবেশীদের কাছে এমন ব্যবহার পেতে পেতে মাঝে মাঝে সৌদামিনীর মরে যেতে ইচ্ছে করে।দীনদয়াল যদিও বলে...বৌ বন্ধ্যা বলে খুব অসুবিধে হয়নি।এই বাজারে দুটো পেটের বেশি পেট চালানোর দায়িত্ব নেওয়াটা ভীষণই চাপের ব্যাপার।কিন্তু শ্বশুর শাশুড়ি বিহীন সংসারে স্বামী তাকে এমন ছাড় দিলেও নিজেকে নিজে প্রতিনিয়ত শাপশাপান্ত করে সে।তার মনে হয়...যদি এমন দিন আসে কোনোদিন...যেদিন সেও সকলের সামনে দিয়ে কোলে একটা বাচ্চা নিয়ে ঘুরতে পারবে গটগট করে...সেইদিন সমস্ত অপমানের যোগ্য জবাব সে দিতে পারবে সব্বাইকে।কিন্তু কি আর করা...নিয়তির লিখন...খন্ডাবে কে!
থোড়বড়িখাড়া আর খাড়াবড়িথোড়...সময় তার নির্দিষ্ট ছন্দে নিস্তরঙ্গ বয়ে চলে।এমনই এক দুপুরে সৌদামিনী স্বামীর জন্য ভাত তরকারী রান্না করে গুছিয়ে ভরে ক্ষেতে গিয়ে তাকে বেড়েটেড়ে খাইয়ে তারপর এঁটো বাসন হাতে নিয়ে ফিরে গেল ঘরে।আর দীনদয়ালও দুপুরের খাওয়ার পর্ব চুকিয়ে আঁচানোর জন্য পুকুরের দিকে গেল।এইদিকটায় বড় একটা আসা হয় না তার।এবার মজুরি খাটার পালা তার যে এলাকায় পড়েছে সেই দিকের আটঘাট সে খুব একটা চেনেটেনে না।তার ভিটে থেকে যথেষ্ট দূরে হলেও মজুরি ভালো দিচ্ছে বলে এতদূরে হলেও এই জমির ক্ষেতমজুরির কাজটা খুশিমনেই সে নিয়েছে।আর যে জমিতে সে কাজ মজুরি খাটছে সেটা কদিন আগেও ছিল একটি ঘন জঙ্গল।মাত্র কিছুদিন হল...ওই জঙ্গল একটু একটু করে সাফ করা হচ্ছে আর সেখানে আস্তে আস্তে করে শুরু হচ্ছে চাষআবাদের কাজকর্ম। এই অচেনা অজানা জায়গায় এদিক সেদিকে পুকুরের খোঁজ না পেলেও একখানি পরিত্যক্ত জলা সে পেয়ে গেল।পরিত্যক্ত হলেও হাতমুখ ধোয়ার জন্য সেই উঠোনসম ছোট্ট জেলার জলখানি খুব অপরিষ্কার বলে মনে হল না তার।তার সাথে মজুরি খাটা বাকি ক্ষেতমজুরদের ঘর একেবারে লাগোয়া।তাই দুপুরে খাওয়ার সময় এলে তার সোজা নিজেদের ঘরে গিয়েই বউএর হাতে খেয়ে আসে।কিন্তু এখানে কাজ করতে আসা ইস্তক দীনদয়ালের দুপুরের খাবারটা সৌদামিনীকেই হাতে করে দিয়ে আসতে হয়।দীনদয়াল খাওয়াদাওয়া সেরে আঁচানোর জন্য এই পরিত্যক্ত জলাটাকেই ব্যবহার করবে বলে মনস্হির করেছে।তো প্রতিদিনকার মতো খাওয়া শেষ করে বউএর হাতে এঁটো থালাবাসন গুঁজে দিয়ে সে সোজা চলে এল সেই পরিত্যক্ত জলাটির কাছে।
এমনিতেই মালিকের কাছে কাজে দ্রুতগতিতে কাজ করার জন্য গুচ্ছের তাড়া আর গাল খেয়ে মেজাজ তিরিক্ষি হয়ে রয়েছে দীনদয়ালের।তার ওপর বউ রান্না করা ভাত তরকারী দিতে এসেও একটু মিষ্টভাষী থাকতে পারল না।সকালে পুকুরে জল আনতে যাবার সময় বাচ্চা কোলে প্রতিবেশীনীরা কিভাবে ওকে বাঁজা বলে ব্যাঙ্গ বিদ্রুপ করেছে,সেই একঘেয়ে পুরোনো বস্তাপচা কাহিনী...দীনদয়াল যতক্ষণ বসে খাচ্ছিল...ততক্ষণ ধরে একনাগাড়ে আউড়ে তার কানমাথা অতিষ্ঠ করে তোলার উপক্রম করে ছেড়েছিল।আরে বাবা...এই সমস্যা তো আর কারোর হাতে নয়...।তোমায় পাড়া প্রতিবেশী অতিষ্ঠ করছে তো কি হয়েছে...আমি তো তোমায় কোনো কটাক্ষ করিনি কোনোদিন...।সারাদিন ঘরে থাকো নিজের মতো...সংসার করো স্বাধীনভাবে। কোনো শ্বশুর শাশুড়ি বা দেবর ননদের খোঁটা শোনবারও বালাই নেই...তাহলে এক শোক মনের ভিতর জল বাতাস দিয়ে জিইয়ে রেখে পাড়াপ্রতিবেশীদের কথা শুনে শুনে কষ্ট পাওয়াটা বন্ধ করলেই তো হয়...।ধুত্তোর...জীবনখানাই যেন দিনকেদিন গাঁদাল পাতার থেকেও অখাদ্য হয়ে যাচ্ছে। একমন বিরক্তি নিয়ে দীনদয়াল জেলার দিকে পা চালাল হাতমুখ ধোবে বলে।হা ভগবান!এমন কোনো একটা রাস্তা খুলে কি দিতে পারো না যাতে জীবনটা একটু ঝামেলামুক্ত হয়...।আপন মনে গজগজ করতে করতে সে জলার ধারে পৌঁছে গেল।হাতের কোঁচড়ে করে একটু জল নিয়ে কুলকুচি করার জন্য মুখটা সে ডানপাশে একটুখানি ঘুরিয়েছে...একখানি দৃশ্য দেখে তার মাথা থেকে পা পর্যন্ত রীতিমতো শিহরণ দিয়ে উঠল।জলার অদূরেই সবুজ আগাছার জঙ্গলের আবডালেও পরিষ্কার দেখা যাচ্ছে একটা চকচকে সাদা মড়ার খুলি।তার ললাটদেশে টাটকা লাল রক্তের একখানি তিলক কাটা।ভয়ে দীনদয়াল একেবারে স্হবির হয়ে গেল।এমন কিছু নিষ্পলক নিঃশব্দ মূহুর্ত কাটার পর যখন হুঁশে ফিরল দীনদয়াল...তখনই তার মস্তিষ্কে তাকে একটাই কথা যেন পাখিপড়ার মতো বারংবার আবর্তিত হচ্ছে।
পালা দীনদয়াল...এখান থেকে পালা...এ জায়গা মোটে সুবিধের জায়গা নয়।দেরী আর না করে দীনদয়াল মুখ ধোয়ার কাজটা অসম্পূর্ণ রেখেই সেখান থেকে ভাগলভা হওয়ার জন্য পিছন ঘুরে ছুট দিতে যাবে...এমন সময় পিছন থেকে শুনল একটা ঘ্যাঁসঘ্যাঁসে অপার্থিব কন্ঠের অমোঘ পিছুটান। না...এ ডাক উপেক্ষা করার ক্ষমতা নেই দীনদয়ালের।কেউ যেন হাত দিয়ে দীনদয়ালের ঘাড় পিছন দিকে ঘুরিয়ে দিল।রক্ততিলকে সজ্জিত মড়ার খুলির মুখের পাটি দুখানি ফাঁক হয়ে গিয়েছে।সেখান থেকে নির্গত হচ্ছে অপার্থিব কন্ঠের আকুতি..."এদিকে এসো...এসো...আমি তোমার ক্ষতি করব না...এসো...।
যন্ত্রের মতো এক পা...দুই পা এগোতে থাকল দীনদয়াল।করোটি বলল...আমি মানুষের মনস্কামনা পূরণ করার ক্ষমতা রাখি।তুমি যদি আমাকে তুলে নিয়ে নিজের ঘরে রাখো তাহলে তোমার একটি মনোবাসনা আমি পূরণ করব।নিয়ে যাবে আমায় তোমার ঘরে??
দীনদয়াল এতটাই ভড়কে গেল যে তার মুখ দিয়ে যেন বাক্য সরছে না।কামারের হাতুড়ি পেটা নিজের বুকখানা হাত দিয়ে চেপে ধরে কোনোমতে সে বলল...
---আ...আ...আমার ঘরে?
---"হ্যাঁ। আমায় তোমার হাতে তুলে নিয়ে তোমার ঘরে সাতদিন মতো রেখো।তোমার একটা মনোবাসনা আমায় বোলো আমি তা পূরণ করে দেব।"
দীনদয়াল মন্ত্রমুগ্ধের মতো আরো কয়েক পা এগিয়ে গেল।হঠাৎই যেন ভয়টাও বেশ খানিকটা কমে গিয়েছে তার।সে আস্তে আস্তে করে হাঁটু মুড়ে বসল।করোটি আর দীনদয়াল মুখোমুখি।
কোনো অলীক যাদুবলের অজ্ঞাত শক্তির আবহে একটু একটু করে গলিত মোমবিন্দুর মতো সাহস সঞ্চয় হতে থাকল দীনদয়ালের মনের মধ্যে।কাঁপা কাঁপা কন্ঠে কোনোমতে তার মুখ থেকে কথা বেরোলো।
"আ...আ...আমার একখানি মনোবাসনা আছে বটে।আমি যদি তোমায়...থুড়ি...তোমার এই হাড়খানা নিয়ে আমার ঘরে সাতদিন রাখি...আমার ইচ্ছা তুমি পূরণ করে দেবে?
---"দেব...দেব রে দেব।জীবদ্দশায় আমি ছিলাম প্রসিদ্ধ তান্ত্রিক।কথা দিয়ে আমার কথার কোনোদিন নড়েচড় হয়নি...।আমায় শুধু তুই নিজের ঘরে একবার নিয়ে চল।তারপর তোর মনের ইচ্ছাখানি একটিবার বলিস।তারপর দেখে যাস শুধু...
দীনদয়াল মনে মনে বলল,জীবনখানা তো এমনিতেই জ্বলেপুড়ে একেবারে লবঝড়ে পাঁপড় হয়ে গিয়েছে।নতুন করে আর যাই ক্ষেতি হোক...আপাতত সেইসবের পরোয়া করবার দরকার নেই।ভাগ্যে যখন যা হোক একটা উপায় কড়া নেড়েছে...তখন ভয়ডর একপাশে সরিয়ে রেখে,দেখাই যাক তাকে একবার পরখ করে...
সে সংকোচভরা কম্পিত হস্তে একটু একটু করে হাত বাড়াল মড়ার খুলিটার দিকে।হাতের আঙুলগুলি তার সজোরে কাঁপছে।এইভাবে ধীরগতিতে হাতদুখানি এগিয়ে দিতে দিতে একটা সময়ে খপ করে দুইহাতের তালুতে ধরে ফেলল সে মড়ার খুলিখানি।
তারপর আস্তে আস্তে সেটি নিজের চাদরের ভিতরে জড়িয়ে নিল।চারপাশে কেউ যেন না দেখে...এইভাবে চোরের মতো লুকিয়ে সে ধীরপায়ে পরিত্যক্ত জলা থেকে বেরিয়ে এল।নিজের সাথে থাকা ঝোলাখানির ভিতরে কোনোমতে ঠেসেঠুসে পুরে ফেলল মড়ার খুলিখানি।তারপর সেখানি একপাশে সন্তর্পণে সরিয়ে রেখে সে কোনোমতে মালিক গিয়ে বলল...তার ধুম জ্বর এসেছে।আজ সে আর কাজ করতে পারবে না।আজ সারাদিনের কাজের কোটা অর্ধেকেরও বেশি সে পূরণ করে দিয়েছে।আজকের মতো যদি তাকে ছুটি দেওয়া হয় তাহলেই সে কৃতার্থ হয়।মালিক বিবেচনা করে দেখলেন দীনদয়ালের কথা একেবারে ফেলে দেওয়ার মতো নয়।সত্যিই সে আজকের দিনের কাজের কোটা অর্ধেকেরও বেশি পূরণ করে দিয়েছে।তাই এইটুকু সময়ের জন্য তাকে ছুটি দেওয়া যেতেই পারে।মালিকের অনুমতি পেতে খুব বেশি বেগ পেতে হল না দীনদয়ালকে।সে মালিকের সামনে থেকে আড়ালে সরে এসে নিজের পোটলাখানি নিয়ে,ঘুরপথে...যেই রাস্তা ধরে লোকজন যায় কম...সেই আল আর উঁচুনীচু এবড়োখেবড়ো জলাজঙ্গলময় রাস্তা ধরে একেবারে চোঁ চাঁ দৌড় দিল।আর এমনিতেই তখন সূর্য অস্ত যাবার সময়।গ্রামেগঞ্জের সব মানুষজনের নিজেদের সমস্ত কাজকর্মের ঝাঁপি বন্ধ করে ঘরে ফেরারই সময় হয়েছে।অতএব ওই বিঘত আকৃতির পোটলাসমেত দীনদয়ালকে আর কোনো মানুষের মুখোমুখি হতে হল না।এক্কেবারে নিজের ঘরের দরজা পেরিয়ে ঘরের ভিতর ঢুকে তবে সে থামল।বদ্ধ উন্মাদের ন্যায়ে বারংবার দীনদয়ালের ঘরের দরজায় করাঘাত আর সৌদামিনীর দরজা খুলে দেওয়ামাত্র প্রায় ঝড়ের মতো ভিতরে ঢুকে গিয়েই কুকুরের মতো হাঁপাতে থাকা স্বামীকে দেখে সৌদামিনী যারপরনাই অবাক হয়ে গেল।
----"বন্ধ করো...বন্ধ করো গিন্নি...দরজাখান বন্ধ করো শিগগির।"
দীনদয়ালের তাড়া শুনে তড়িঘড়ি দরজা বন্ধ করে দিল সৌদামিনী। পিছন ফিরে দেখল...দীনদয়ালের ঘর্মাক্ত মুখে চোখে কেমন যেন ভীতি অথচ চাপা এক আনন্দ মিশ্রিত অদ্ভুত এক অভিব্যক্তি। সৌদামিনী পুরো ব্যাপারটার কিছু থই পেল না।
"তোমার কি হয়েছে বলো দিকি...এইভাবে তো চোর...নয় জেল পালানো আসামী ঢোকে নিজের ঘরে...আর তোমার হাতের থলেটাতে কি আছে?উল্টোপাল্টা কোনো কাজ করে বসলে না তো তুমি!সত্যি করে বলো..."
উত্তেজিত চিন্তিত কন্ঠে বলে উঠল সৌদামিনী।
"শ্...শ্...শ্....আস্তে...চেঁচিও না।চুপ করো...।
স্বামীর এই চাপা অথচ দৃঢ়... শীতল সতর্কবাণী শুনে সৌদামিনী চুপ করে গেল।কেটে গেল কিছু নিঃশব্দ বোবা মুহূর্ত।দেওয়ালের পাশ থেকে টিকটিকি যেন সজোরে বলে উঠল...ঠিক...ঠিক...ঠিক।
তারপর ধীরে ধীরে চাপা এবং দৃঢ়কন্ঠে দীনদয়াল বলে উঠল...
"শোনো বউ...এখন আমি তোমাকে যা বলতে চলেছি এবং যেটা দেখাতে চলেছি,সেটা তুমি সহজে মন থেকে হজম করে নিতে পারবে না সেটা বলার অপেক্ষা রাখে না।কিন্তু আমার কথা শুনে এবং আমার সাথে আনা এ জিনিসটি চোখে দেখে তোমার কিন্তু কোনোরকম টুঁ শব্দটি করা চলবে না।মাথায় রেখো...এই জিনিসটিই কিন্তু একমাত্র পারে আমাদের মনোবাঞ্ছা পূর্ণ করতে।"
দীনদয়ালের কথা শুনে অবাক চোখে তার দিকে তাকাল সৌদামিনী।শুধাল...
"আমার কোল ভরাতে পারবে তোমার সাথে আনা জিনিস?"
---"হ্যাঁ গো গিন্নি পারবে।এখন আমি জিনিসটা তোমার সামনে ঝোলা থেকে বার করছি।খবরদার গিন্নি...কাকপক্ষীতেও যেন টের না পায়..."
এই বলে সে নিভে আসা মোমবাতির আবছা আলোয় ছোট্ট ঘরের মাদুরের ওপর বসে আস্তে আস্তে ঝোলা থেকে উন্মুক্ত করল টাটকা রক্ত দিয়ে কপালে তিলক কাটা মড়ার খুলিখানি।
জানলা দিয়ে আধফালি চাঁদের মায়াবী হাসির আদরে স্নাত ,অগোছালো থোড় বড়ি খাড়া ঘরগেরস্হালীর ছোট্ট চৌহদ্দির ভিতরে পিদিম জ্বলা আলোআঁধারীর আবহে হঠাৎ করে যখন ঝোলা থেকে উন্মুক্ত হয়ে পড়ল একখানি আস্ত মড়ার খুলি...তার রক্ততিলক কাটা ললাটদেশের দুইপাশে দুই বীভৎস কালো অতল গর্তের মূক আতঙ্ক আর হাঁ হয়ে থাকা উন্মুক্ত মুখের চারিধারে বর্শার ফলাসদৃশ দাঁতের সারি যেন তীব্র অট্টহাসির সাথে জীবনের প্রতি বিদ্রুপ ছুঁড়ে দিচ্ছে।সৌদামিনী এই দৃশ্য দেখে ভয়ে একেবারে কাঠ হয়ে গেল।তার বিস্ফারিত দুইচোখে সমস্ত সজীবতা আতঙ্কের করাল ছায়া গ্রাস করে নিল।মুখ থেকে একটা অদ্ভুত চাপা গোঁ গোঁ শব্দ বার হতে থাকল ক্রমাগত।দীনদয়াল ব্যাপারটার জন্য মানসিকভাবে তৈরিই ছিল।সে স্ত্রীকে অতি কষ্টে জল খাইয়ে পাখায় বাতাস দিয়ে ঠান্ডা করল।তারপর ধীরেসুস্হে নিজের সঙ্গে ঘটে যাওয়া সমস্ত ঘটনা তাকে সবিস্তারে গুছিয়ে বলল।আস্তে আস্তে...বেশ কিছুটা সময় পরে সৌদামিনী একটু ধাতস্থ হল।সে ভালো করে ব্যাপার স্যাপার জেনে আর বুঝে তারপর সে স্বামীর সাথে আলোচনায় বসল।একবার যখন তাদের দিকে ভগবান মুখ তুলে চেয়েছেন,তখন সে এবারে এতদিনের সমস্ত অপমান আর ব্যঙ্গবিদ্রুপের উপযুক্ত জবাব হিসেবে নিজের কোল ভরিয়ে সকলের মুখের ওপর একেবারে ঝামা ঘষে দেবে।দীনদয়ালও এক কথায় সহমত হল।এরপর
দীনদয়াল আর সৌদামিনী সারা রাত জেগে তাদের ঘরের ভিতরের একটা জায়গা খুঁড়ে তাতে গর্ত করল।এরপর সৌদামিনী নিজে হাতে করে পরম যত্নের সাথে মড়ার খুলিখানি নিয়ে ওই গর্তের ভিতরে রেখে তার ওপরটা মাটি দিয়ে ভরাট করে দিল।তীব্র উত্তেজনার সাথে রাতটা কাটল।ক্রমে ভোরের আলো ফুটল।দীনদয়াল প্রতিদিনের মতোই কাজে গেল আর সৌদামিনীও মন দিয়ে রান্নাবান্না আর ঘরগেরস্হালীর কাজ করতে লাগল।কলসি কাঁখে পুকুরে জল আনতে গেল।তাদের ঘরের ভিতরে মড়ার খুলিখানি সযত্নে সংরক্ষিত থাকল।তাদের দুজনের হাবভাব বা আচার ব্যবহারে কোনোরকম অসংগতিই দেখা দিল না।গ্রাম্য জীবনের প্রতিদিনের রোজনামচার চলতে লাগল নিজস্ব ছন্দেই।কেউ দীনদয়ালের ঘরের নরকঙ্কালের করোটির উপস্থিতির খবর জানল না।ক্রমে দিনের আলো নিভে সন্ধ্যা নেমে এল আর তারপর ক্রমে সন্ধ্যা হতে রাত।দীনদয়াল তার দিনমজুরি সেরে ফিরে এল তার ঘরে।ফের জানলা দিয়ে জেগে উঠল মায়াবী চাঁদ আর দীনদয়ালের ছোট্ট ঘরখানাকে স্নিগ্ধ আলোর আদর মাখাতে শুরু করল যার সাথে ঢিমে আঁচের পিদিমের আলোআঁধারী মিশে গিয়ে ঘরখানা ঘরের ভিতরে এক মায়াবী আবহ তৈরি হল।চারদিকে ঝিঁঝিঁ পোকা ডাকছে।ব্যাঙগুলো তাদের শোরগোল তুলে দিয়েছে।ওপাশের জঙ্গল হতে,থেকে থেকে ডেকে উঠছে শিয়াল।দীনদয়াল আর সৌদামিনী আর সময় নষ্ট করল না।তারা তাদের ঘরের ভিতরের খুঁড়ে রাখা গর্তের ওপরের মাটি সরিয়ে বার করল মড়ার খুলিখানি।তারপর সেটা সামনে রেখে তার সামনে হাঁটু গেড়ে বসল দীনদয়াল আর সৌদামিনী। সৌদামিনী প্রথম কথা বলে উঠল।আমতা আমতা করে সে বলতে আরম্ভ করল...
---আ...আ...আমরা তোমার কথামতো তোমায় নিজেদের ঘরে রেখেছি।এবার আমাদের ইচ্ছাপূরণ করবেন তো?
মড়ার খুলির বর্শার ফলার মতো নিরাবরণ নগ্ন দাঁতের সারির ভিতর হতে বেরিয়ে এল অপার্থিব কন্ঠের মৃদু হাসির শব্দ।
---করব রে করব।বল তোদের কি মনোবাসনা।
সৌদামিনী আনন্দে ষোলোখানা হয়ে গেল যেন।সে হাতজোড় করে গদগদ কন্ঠে বলল,
"আমার কোলে একটা বাচ্চা দাও।"
---কোল ভরাতে চাইছিস রে মা?তবে তাই হবে।আমার কথামতো কাজ কর...তাহলে অল্পদিনের মধ্যেই তুই মা ডাক শুনবি।
---কি কাজ?আপনি যা বলবেন আমরা তাই করব।আপনি একবার হুকুম করুন।
জোড়হাত করে বলে উঠল দীনদয়াল।
---"আসছে অমাবস্যার রাতে একটা দশ বছরের নীচে যেকোনো মানবসন্তানকে আমার সামনে বলি দিতে হবে।তাহলেই তোর গিন্নির কোল আলো করে আসবে সন্তান। "
বাতাসের কোলে ভেসে আসা চাপা ফিসফিসানির মতো হৃদয়ে শিহরণ তোলা এই কথাগুলো ছোট্ট ঘরখানির দেওয়ালে দেওয়ালে যেন তীব্রভাবে প্রতিধ্বনিত হয়ে বার বার সৌদামিনীর কানে মর্মবিদারক হয়ে বাজছিল।কোল খালি থাকার যন্ত্রনা দূর করতে যে মাতৃত্বের কাতর বিলাপ নিয়ে আঁচল পেতে দাঁড়িয়েছে,সেই মমতা ঢালবার পূর্বে তার হাত দুখানি নিষ্পাপ শিশুর রক্তে রাঙাতে হবে!
এ কিভাবে সম্ভব!
মাথায় হাত দিয়ে বসে পড়ল সৌদামিনী।তার মাথায় যেন আকাশ ভেঙ্গে পড়ল।দীনদয়ালও কথাটা শোনামাত্রই ভীষণভাবে চমকে উঠল।একটা শিশুকে হত্যা করতে হবে নিজের হাতে!সে নিজের কানকে ভুল প্রমাণ করতে মরিয়া হয়ে কাতর কন্ঠে বলল..."আ...আজ্ঞে কি করতে হবে ?"
---"বলি দিতে হবে বলি।দশ বছরের নীচে একটি শিশুর বলি দিবি এই আসছে অমাবস্যার রাতে তবেই তোর গিন্নি শুনবে মা ডাক।বুঝতে পারলি?"
না।এবার আর শুনতে কোনো ভুল হয়নি দীনদয়ালের।সৌদামিনীরও নয়।
তাদের মুখ থেকে আর একটি বাক্যও সরছে না।ব্যাপারটা তাদের এতটাই বিস্মিত করল যে তারা নিজের নিজের জায়গায় বেশ কিছুক্ষণ একেবারে স্হবির কাঠপুতুলের মতো দাঁড়িয়ে রইল।প্রথম কথা ফুটল সৌদামিনীর মুখে।সে কম্পিত কন্ঠে বলে উঠল..."দয়া করুন...আপনি যা আদেশ করবেন আমরা তাইই পালন করব। কিন্তু দয়া করে ছোট বাচ্চাকে খুন করার আদেশ ফিরিয়ে নিন...।আপনি আর যা যা বলবেন আমরা দুইজনে একেবারে অক্ষরে অক্ষরে পালন করব।"
তীব্র ক
আকুতিপূর্ণ কন্ঠে বলে উঠল সৌদামিনী। চারপাশে ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক আরও দ্বিগুণ হয়ে উঠেছে।নেকড়ে আর শৃগালেরা মহোল্লাসে যেন মেতেছে কোনো পৈশাচিক উৎসবে...।এই প্রথমবার নিজের এই চেনা ঘরটিতে নিজেরই আতঙ্কে যেন দমবন্ধ হয়ে আসছে সৌদামিনীর।ফের ঘর কাঁপিয়ে প্রতিধ্বনিত হল অপার্থিব প্রেতকন্ঠ।
"কোল ভরাতে চাইলে কারোর না কারোর কোল খালি করে আমার সামনে বলি দিতেই হবে।এইটাই একমাত্র বিধান।"
দীনদয়াল আর সৌদামিনী দুজনেই এবার ধপ করে মাটিতে বসে পড়ল।এ ওর মুখের দিকে শুন্যদৃষ্টিতে চেয়ে রইল শুধু।সামনে রাখা রয়েছে ললাটদেশে রক্তের তিলক কাটা ভয়াল দর্শন মড়ার খুলি। চারপাশে স্যাঁতসেঁতে আলোআঁধারীর গা ছমছমে আবহে জানলার মধ্য দিয়ে
দৃশ্যমান বাঁকা চাঁদের ফালির অপার স্নিগ্ধতাও যেন তাদের দিকে তাকিয়ে বিদ্রুপের হাসি ছুঁড়ে দিচ্ছে...।
বোবা সময়ের গতি ক্রমশ সময়ের সাথে তাল মিলিয়ে এগোতে থাকল।যখন হুঁশ এল দুজনের...তখন ভোরের আলো সবে ফুটতে শুরু করেছে।সারা রাত দুজনে দুচোখের পাতা এক করতে পারেনি।আলো বেশি পরিষ্কার হয়ে ফোটবার আগেই হন্তদন্ত হয়ে দীনদয়াল তাড়াতাড়ি করে মড়ার খুলিটা ফের ঢুকিয়ে দিল মাটির তলায়।আর তার ওপরে চাপিয়ে দিতে থাকল কিছু পুরোনো বাসন কোসনের ঢিপি।আস্তে আস্তে আস্তে হুঁশ ফিরল সৌদামিনীরও।সেও দুশ্চিন্তাগ্রস্হ হতভম্ব মুখচোখ নিয়ে স্বামীর সাথে সে কাজে হাতে হাত মেলাল।ক্রমশ জোরালোভাবে ফুটে উঠল দিনের আলো।সৌদামিনীর মনের ভিতর তিল তিল করে জ্বলে ওঠা স্বপ্নপূরণের পিদিমখানি এক লহমার ফুৎকারে এইভাবে নিভে নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে,এটা দীনদয়াল আশা করেনি।কারণ মৃত তান্ত্রিকের একটি অস্হিসর্বস্ব করোটি যেভাবে তার সাথে কথা বলে উঠেছে,তাতে ওই করোটির মুখনিঃসৃত প্রতিটি শব্দে জোরালো আস্হা জন্মে গিয়েছিল দীনদয়াল আর সৌদামিনী দুজনেরই।তারা ধরেই নিয়েছিল যে কোনো একটা অপার্থিব শক্তি আশীর্বাদ হয়ে এসেছে তাদের দুঃখ ঘোচাতে।কিন্তু এখন দীনদয়াল নিজেই এতটা ভেঙ্গে পড়েছে,যে স্ত্রী কে কি সান্ত্বনা দেবে সেইটাই ভেবে পাচ্ছে না।কিন্তু যত যাই হোক...কাজ কামাই করলে চলবে না।ওদিকে সৌদামিনী মনে এক পাহাড় আশাভঙ্গের অবসাদ নিয়ে গালে হাত দিয়ে আনমনা হয়ে বসে রয়েছে উঠোনে।দীনদয়াল আর তাকে কিছু বলল না।হাতমুখ ধুয়ে কিছু মুখে না দিয়েই বেরিয়ে গেল কাজে।দুপুরে যে খেতে পাবে সে আশাটুকুও মন থেকে ঝেড়ে ফেলে "কপালের লিখন খন্ডাবে কে" এই সান্ত্বনা বাক্য দিয়ে দৈনন্দিন কাজে মনোনিবেশ করল।ক্ষেতএ পৌঁছোনোমাত্রই কাজের তাড়নায় মন থেকে সমস্ত অবসাদ নিমেষে গায়েব হয়ে গেল।ক্রমশ বেলা গড়িয়ে এল।সূর্য একেবারে মাথার উপরে উঠে গিয়েছে।তার সাথে যে ক্ষেতমজুরেরা কাজ করছিল তারা সবাই যার যার ঘরে চলে গিয়েছে দুপুরের খাওয়ার জন্য।দীনদয়াল একপেট ক্ষিদে নিয়ে একটা বড় দীর্ঘশ্বাস ফেলে ফের কাজে মন দিল।হঠাৎ বৌএর গলা শুনে পিছন ফিরে তাকাল।অমাবস্যায় জ্যোৎস্নার স্নিগ্ধতার মতো একমুখ প্রশান্তি নিয়ে খাবারের পুঁটুলি হাতে নিয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে সৌদামিনী। দীনদয়াল দারুণ অবাক হয়ে গেল।তারপর বুঝল...পরিস্থিতি মেনে নিয়ে স্বাভাবিক হয়ে গিয়েছে বৌ। মনের দুশ্চিন্তার সমস্ত কালোমেঘ এক লহমায় দূরে ঠেলে বৌএর হাত থেকে খাবারটা নিয়ে খাওয়ায় মনোনিবেশ করল।ক্ষিদে পেটে সে বেশ গোগ্রাসেই খাচ্ছিল।তৃপ্তি করে খেতে খেতে সে বলল,"আজ মাছের ঝালটা খাসা বানিয়েছ গিন্নি। ভুলে যাও...ভুলে যাও...সব দুঃখ ভুলে যাও...এই তোমাতে আমাতে মিলে জীবন সুন্দর পার হয়ে যাবে কি বল!আর ওই অলুক্ষুণে মড়ার খুলি কালকেই আমি ঘর থেকে বিদেয় করব'খন।যেই জঙ্গল থেকে পেয়েছি...ওটাকে ঠিক সেখানেই ফের রেখে একেবারে গঙ্গাজলে হাত ধুয়ে ঘরে আসব।"
---"খবরদার বলে দিচ্ছি...অমন কথাখান মুখেও এনো না।যে কিনা আমার খালি কোল দুদিন বাদে ভরিয়ে দেবে...সেটার সম্পর্কে কোনো অকথা কুকথা আমি শুনব না এই বলে দিলাম...।"
ভাতের গ্রাস হাত থেকে পড়ে গেল দীনদয়ালের।সে চোখ বড় বড় করে স্ত্রীর দিকে তাকাল।বলল,
"তুমি কি বলছ তার মানে জান?মা ডাক শোনার জন্য যে পাপকাজের শর্ত সেটা দিয়েছে ভুলে গেছ?"
---"কিচ্ছু ভুলিনি আমি।মা ডাক না শুনতে পেলে এ পোড়া জীবন রাখাবার কোনো মানেই নেই।একবার যখন ভগবান মুখ তুলে চেয়েছেন...আমাদের একটা সুযোগ দিয়েছেন...সেটাকে হেলায় হারানোর মত মূর্খামি আর যেই করুক...আমি করতে পারব না।
রাগত স্বরে বলল সৌদামিনী। দীনদয়াল লক্ষ্য করল...তার হাতের মুঠোখানি শক্ত হয়ে মুষ্ঠিবদ্ধ হয়ে গিয়েছে।ফুটে উঠেছে নীলচে শিরার দাগ।
দীনদয়াল এবার বৌএর কাঁধ সজোরে ঝাঁকিয়ে দিয়ে বলল,"তোমার কি মাথা খারাপ হয়ে গেছে?এখনো তুমি মা হওয়ার আশা বুকে নিয়ে বসে রয়েছ?ঘোর থেকে বেরিয়ে এস বৌ যত তাড়াতাড়ি সম্ভব।যত নষ্টের গোড়া ওই মড়ার খুলিটা...ওটা নির্ঘাত কোনো অপশক্তি।প্রথমে আমাকে বশ করেছিল,এবারে তোমার মাথাটা চিবিয়ে খেতে আরম্ভ করেছে।আমি কালই ওই আপদটাকে হাতে করে নিয়ে এসে যেখান থেকে পেয়েছিলাম ওইখানেই ওটাকে রেখে আসব।"
এ কথা শুনে একেবারে তেলেবেগুনে জ্বলে উঠল সৌদামিনী।
সে সাংঘাতিক রোখের সঙ্গে সজোরে দীনদয়ালের মুখে হাত চেপে ধরল।তারপর চাপা অথচ দৃঢ়কন্ঠে সে বলল,"খবরদার!অমন কাজ করা তো দূরে, থাক...মনেও আনবে না।ভগবান মানুষকে সুযোগ একবারই দেন বার বার নয়।আমি দিনরাত ঠাকুরকে ডেকেছি তাই আজ তিনি আমার ডাক শুনেছেন।আমি এ সুযোগ কোনোমতে হাতছাড়া করব না।ওই তান্ত্রিকের প্রেতাত্মা আমায় যা বলবে আমি তাইই করব।বাচ্চা আমার চাইই...।
সৌদামিনীর কথা শুনে ভীষণভাবে ঘাবড়ে গেল দীনদয়াল।সে বৌএর সাথে আর কোনো কথা না বাড়িয়ে চুপচাপ গোগ্রাসে খাবারটা শেষ করে নিল।সে মনে মনে ঠিক করে নিল,ওই মড়ার খুলি সে আজই ঘর থেকে বিদায় করবে যেমন করে হোক আনমনা থেকে কোনোমতে কাজ সেরে সে ঘরে ফিরল।কাজ শেষ হতে হতে অনেকটাই দেরী হয়ে গিয়েছিল।আর ঘরে ফিরতে ফিরতে প্রায় দিনের আলো নিভু নিভু...।সে প্রতিদিনের মতো নিজের ঘরে ফিরে বৌএর নাম ধরে গলা ছেড়ে হাঁক দিয়ে দরজায় ঘা দিতে যাবে...ও মা...অবাক কান্ড...!দীনদয়ালের হাতের স্পর্শে দরজা আপনা হতেই খুলে গেল।এরপর সে যে দৃশ্য দেখল,তাতে তার মাথার চুল থেকে পায়ের নখ পর্যন্ত ভীষণভাবে শিহরণ দিয়ে উঠল।এটুকু বুঝতে তার কোনো অসুবিধা হল না,যে তার বৌএর মাথাখানি পুরোপুরিই খারাপ হয়ে গিয়েছে।না হলে ঘরের দরজা ভিতর থেকে বন্ধ না করে...ঘরের একেবারে মাঝ বরাবর পিদিম জ্বেলে তার পাশে মড়ার খুলিখানি রেখে তার সামনে সৌদামিনী এভাবে হাঁটু গেড়ে ঠায় বসে রয়েছে দুনিয়া জগৎ ভুলে...।দীনদয়ালের মাথায় দপ করে আগুন জ্বলে উঠল।ওই সর্বনেশে অপশক্তি ঘর থেকে বিতাড়িত করতেই হবে!এক্ষুনি!সে খুলিটা হাত বাড়িয়ে তুলে ঘরের বাইরে নিক্ষেপ করার জন্য হনহন করে এগোতে যাবে...এমন সময় হঠাৎ হিসহিসে কন্ঠে ঘর কাঁপিয়ে খুলির উন্মুক্ত হাঁএর ভিতর হতে অপার্থিব কন্ঠ বলে উঠল..."কোনো লাভ নেই দীনদয়াল। একবার যখন আমায় তুলে এনে নিজের ঘরে রেখেছিস...তখন আর আমার ইচ্ছা ব্যতীত এখান থেকে আমায় সরিয়ে দেওয়াটা তোর কম্ম নয়।তুই যেখানেই আমাকে রেখে আয় না কেন...আমি এইখানেই ফিরে আসব।আর যদি আমায় অন্যত্র হতে ফিরে আসতে হয়...তবে সেটা তোর বা তোর বৌ...কারোর পক্ষেই খুব একটা সুখকর হবে না।"
মড়ার খুলি হতে নির্গত কন্ঠস্বর শুনে
সৌদামিনী ঘরে তার স্বামীর প্রবেশের বিষয়ে অবগত হল।সে জিজ্ঞাসু চোখে তাকাল স্বামীর দিকে।সে তখন কাঁপাকাঁপা হাত দুখানি জড়ো করে জড়ানো কন্ঠে বলল,"আমাদের ছে...ছেড়ে দিন দয়া করে...।আমরা দিন আনি দিন খাই মানুষ।কোনো সাতে পাঁচে আমরা নেই।মানুষ খুন করা...বলি দেওয়া...এসব ভাবলেই যে জ্বর আসে...।আপনি জীবদ্দশায় তন্ত্রসাধণা করে অনেক সিদ্ধিলাভ করেছেন।আমাদের মতো কেঁচো শামুকের দিকে কেন হাত বাড়াবেন...আপনাকে বরং যেখানে পেয়েছিলাম সেখানেই রেখে আসি...।"
"ভুলেও ও কথা আর মুখে আনবি না।আমি যেখানে যাই সেখানকার মানুষের মনোবাসনা পূর্ণ করে তবেই বিদায় নিই।তোর মনোবাসনা আমি জেনেছি।এবার আমার তা পূরণ করার সময় এসেছে। তোরা এখন চুপচাপ আমার হুকুম পালন করে যা...দেখবি...তোদেরও মনোবাসনা পূর্ণ হয়েছে।এই ঘরের উঠোনে আর কদিন বাদেই ছুটে বেড়াবে একটি একরত্তি।এখন তোরা বলি দেওয়ার বন্দোবস্ত করার জন্য উঠে পড়ে লেগে যা।দশ বছরের নীচে একটি শিশুর শিরশ্ছেদের রক্ত আমার চাই।চাইই চাই।
ঘর কাঁপিয়ে ফের হিসহিসে কন্ঠে ক্রোধের মৃদু আস্ফালনের প্রতিধ্বনিত হল মড়ার খুলি নির্গত অপার্থিব কন্ঠ।দীনদয়াল এবার মাথায় হাত দিয়ে বসে পড়ল।সে পরিষ্কার বুঝে গেল...একেবারে ইঁদুরের কলে পড়ে গেছে সে।আগেপিছে ডাইনেবাঁয়ে তাকানোর পর্যন্ত আর উপায় নেই।এখন শুধুমাত্র সেইসবই তাকে করতে হবে যা অদৃষ্ট তাকে ঘাড় ধরে করাবে।অপরপক্ষে এও তো ঠিক...মড়ার খুলির ভিতরে তন্ত্রসাধনায় সিদ্ধ পুরুষের প্রেতাত্মার বাস।সে অন্তত কথা দিয়ে তার খেলাপ করে তাদের সাথে মিথ্যাচার করবে না এটাও সে মনে মনে আন্দাজ করে নিয়েছে।মায়াবী আলোআঁধারীর মধ্যে কপালে রক্ততিলক কাটা মড়ার খুলির হাঁ মুখের সামনে হাঁটু গেড়ে বসে দীনদয়াল এবার তার পরবর্তী পদক্ষেপ মনে মনে স্হির করতে থাকল।বলি দেবার জন্য একটা শিশু তাকে যোগাড় করতে হবে।সে তার ডান হাতের তালুতে সৌদামিনীর দৃঢ় চাপ অনুভব করল।গা ছমছমে নিস্তব্ধতার ভিতরে শুধুমাত্র ঝিঁঝিঁ পোকাদের মহোল্লাস আর শৃগালধ্বনির। আদিমতার আবহে দীনদয়াল যেন সৌদামিনীর অনুচ্চারিত কথা শুনতে পেল স্পষ্টভাবে..."তুমি যা ভাবছ একদম ঠিক ভাবছ।আর দেরী করা ঠিক নয়...।"
দীনদয়াল এবার দাঁতে দাঁত ঘষে নিয়ে মনে মনে প্রস্তুত হতে শুরু করল নিজের হাতে নরহত্যা করার জন্য।বাকি রাত্তিরটা দুজনের কাটল নির্ঘুমে...তীব্র উৎকন্ঠা নিয়ে...পরস্পর পরস্পরের হৃদস্পন্দন যেন একে অপরের সঙ্গে সমান ছন্দে আন্দোলিত হতে থাকল রাতের নিকষ অন্ধকারের গভীরতা ছিঁড়েফুঁড়ে...।
রাত কেটে ক্রমশ ভোরের আলো ফুটল।সেই আলো ধীরে ধীরে পরিপূর্ণতার রূপ নিতে থাকল।দীনদয়াল কাজে যাবার জন্য প্রস্তুতি নিতে থাকল আর সৌদামিনী ঘরকন্নার কাজে মন দিল।দুজনেই চুপচাপ।কারোর মুখে কথাটি নেই।দীনদয়ালের মাথায় শুধু এই চিন্তা ঘুরপাক খেতে থাকল,নরবলি দেবার জন্য যেকোনো মানুষ হলেই যে চলবে তা নয়।লাগবে দশ বছরের নীচে একটা শিশু।এখন দশ বছরের নীচে শিশু বলি দেবার জন্য কোথা থেকে কিভাবে যোগাড় করবে সে!দীনদয়াল হাজার ভেবেও কোনো কূলকিনারা করতে পারল না।সাতপাঁচ ভাবনাচিন্তা করতে করতেই সে পুকুরে গিয়ে একটা ডুব দিয়ে চলে এল।তারপর টিন থেকে বাটি করে কিছু মুড়ি আর কিছু নাড়ু বাতাসা নিজেই বার করে খেয়ে নিয়ে বেরিয়ে গেল কাজে।যন্ত্রের মতো সে পৌঁছাল কাজের জায়গায়।যন্ত্রের মতো করতে থাকল কাজ।মন তার পড়ে রয়েছে অন্য চিন্তা আঁকড়ে।দশ বছরের নীচে শিশু এখন সে কোথা থেকে যোগাড় করবে!প্রতিবেশীদের ঘরের কোনো শিশুকে সেইভাবে হাত করার সুযোগ আসবার প্রশ্নই নেই।আর কাজে যাওয়া আসার পথে...গভীর চিন্তায় পড়ে গেল সে।কাজে ভুল হওয়ার জন্য দু একবার মালিকের কাছে জোর ধমকও খেল দীনদয়াল। কিন্তু তা সত্ত্বেও মাথার ভিতরে চেপে বসে থাকা চিন্তাটা ক্রমশ আরো যেন চেপে বসে যেতে থাকল।সূর্য পশ্চিমে ঢলতে থাকল।সারাদিনের কাজের কোটা শেষ করে দীনদয়াল আনমনা হয়ে ঘরের দিকে রওনা দিল।একদিন যায়...দুইদিন যায়...আর অমাবস্যার তারিখ ক্রমেই বড়ো বেয়াড়াভাবে ঘাড়ের কাছে নিঃশ্বাস ফেলতে থাকে।সৌদামিনীর উৎকন্ঠার পারদও দিন দিন চড়তে থাকে।একদিন দীনদয়াল সৌদামিনীকে খেতে বসে বলল,"একটা জিনিস লক্ষ্য করেছ গিন্নি!"
-"কি?"
-ওই মড়ার খুলিটা যখন সাথে করে নিয়ে এসেছিলাম,তখন ওটার কপালের রক্ততিলক একেবারে জ্বলজ্বল করছিল।যত দিন যাচ্ছে...তিলকটা তার ঔজ্জ্বল্য হারাচ্ছে আর ক্রমশ অদৃশ্য হচ্ছে।আর সেই সাথে তাল মিলিয়ে বেড়ে চলেছে খুলিটার "বলির'" জন্য ছটফটানি।তাই নয় কি?
---হ্যাঁ গো আমারও তাই কেমন কেমন ঠেকছে ব্যাপারখানা।হাতে করে মানুষের বাচ্চার মাথা কেটে কোলে বাচ্চা পাবার বদলে আবার না ফাঁসিতে ঝুলতে হয়...।
---কি জানি...সবকিছুই আমার কেমন গোলমাল হয়ে যাচ্ছে।এটা অন্তত নিশ্চিত যে এখন পরিস্থিতি আমাদের হাতের বাইরে।ওই মড়ার খুলির মুখ থেকে যে কথা বার হয়েছে সেটা অক্ষরে অক্ষরে পালন করা ছাড়া আমাদের এখন আর কোনো গতি নেই।ওদিকে অমাবস্যার রাতটা যেন আমাদের দুজনের দিকে ট্রিগার তাক করে বসে রয়েছে।হয় মর,নাহলে বাপ মা হওয়ার স্বপ্নপূরণ করার জন্য মনুষ্যেতর কাজে ঝাঁপিয়ে পড়...কিচ্ছু করার নেই...নিজে হাতে করে একটা অবোধ শিশুর মুন্ডু ধড় থেকে আলাদা করতে পারব কি পারব না সেটা ভাববার পর্যন্ত অবকাশ নেই।দেখি...কি করা যায়...
একটা একটা করে দিন যায়...দীনদয়াল আর সৌদামিনী দুজনেই এখন মরিয়া কোনোমতে একটা দশ বছরের নীচে শিশুকে মানুষের চোখের আড়ালে একটু হাতে পাবার জন্য।ওরা এখন পরিষ্কার লক্ষ্য করছে...মড়ার খুলিটির নিকষ কালো দুই অক্ষিগহ্বরের মাঝখানের রক্ততিলকখানি একেবারে নিশ্চিহ্ন হয়ে আসছে।আর সেই সাথে বাড়ছে বলির জন্য তার অমানুষিক ছটফটানি।ওই নর করোটির সুমিষ্ট কথার হাতছানিতে সাড়া দিয়ে দীনদয়াল যে ফাঁদে পড়েছে তাতে হাজার মাথা কুটেও আর কোনো নিস্তার নেই তারা দুজনেই সেটা স্পষ্টভাবে বুঝতে পারছে।সন্তান তারা চেয়েছে বটে কিন্তু নিজেদের হাতকে এইভাবে নৃশংস পাপের রক্তে রাঙিয়ে কখনোই নয়।তারা রীতিমতো যন্ত্রবৎ শুধুমাত্র একটা দশ বছরের নীচে একটা শিশুর খোঁজ করতে নিজেদের শান্তির নিঃশ্বাসটুকু পর্যন্ত বিসর্জন দিয়ে বসে আছে।শেষ পর্যন্ত এল সেই অমাবস্যার তারিখ।হাতে আর মাত্র কয়েক ঘন্টা সময় বাকি আছে।সূয্যি ডোবার সময়টুকু পর্যন্ত তাদের হাতে সময়ের মেয়াদ।ভয়ে আতঙ্কে তাদের হাত পা একেবারে ঠান্ডা হয়ে এল।এমনিই গোটা রাত্তিরটা তারা দুচোখের পাতা এক করতে পারেনি।আকাশ একটু একটু করে পরিষ্কার হচ্ছে আর সেইসাথে দীনদয়াল আর সৌদামিনীর মনের ভিতর জমতে শুরু করছে আতঙ্কের কালো মেঘ।নীল আলো ফুটতে শুরু করল।চারদিকে প্রাণ জুড়ানো ঠান্ডা হাওয়ার স্নিগ্ধ আমেজ।তার মধ্যেই দীনদয়াল আর সৌদামিনী একেবারে ঘেমেনেয়ে একশা।হঠাৎ দীনদয়াল বাট টিপে ধরা ছাতার মতোই গায়ের চাদর সরিয়ে তড়াক করে উঠে দাঁড়াল।গম্ভীর কন্ঠে বলল..."গিন্নি...তুমি উঠোন ঝাঁটপোছ করে রান্না চাপাও গে...আমি প্রাতঃকৃত্যটা সেরে আসছি।বলেই সে হনহন করে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল।
সৌদামিনী একটু অবাক চোখে তাকাল স্বামীর দিকে।তারপর আর কোনো কথা না বাড়িয়ে আস্তে আস্তে করে রান্নাঘরে গিয়ে রান্না চাপানোর উদ্যোগ করতে শুরু করল দীনদয়ালের দুপুরের খাওয়ার জন্য।নিজের খাওয়ার চিন্তা তার মাথায় উঠেছে। তায় রান্না করতে গিয়ে নুনের জায়গায় চিনি...এ মশলার জায়গায় সে মশলা...এইসব করে কোনোমতে সে কিছু অখাদ্য নামাল উনুন থেকে।
তারপর চিন্তান্বিত...উথালপাথাল মন নিয়ে স্বামীর ফেরার জন্য অপেক্ষা করতে লাগল।কিন্তু তাজ্জব ব্যাপার...!ঘন্টার পর ঘন্টা কেটে যায়...দীনদয়াল আর ঘরে ফেরে না...তার কাজে বেরোনোর সময় পেরিয়ে গিয়ে এখন সূর্য মাথায় উঠতে আরম্ভ করে দিয়েছে।কিন্তু প্রাতঃকৃত্য সারতে সেই যে কাকভোরে বেরিয়েছিল দীনদয়াল...তার আর পাত্তা নেই...।একে তো সূর্য ডোবার পরেই শুরু হবে অমাবস্যার রাত...।এ রাতে যদি তারা ওই নরকরোটিকে বলি না নিবেদন করতে পারে তাহলে কপালে যে কি আছে...কে জানে!উপরন্তু এখন সূয্যি মাথায় উঠতে শুরু করে দিলেও সেই কাকভোরে বেরোনো মানুষটার আর পাত্তাই নেই।একসঙ্গে এত দুশ্চিন্তা আর নিতে পারছে না সৌদামিনী।দুইহাতে মাথার দুইপাশ ধরে উঠোনে বসে সে কাঁদতে লাগল।সকাল হতে সে অভুক্তই আছে।এইভাবেই ক্রমশ বেলা পার হল...দুপুর গড়িয়ে এল...।দীনদয়ালের পাত্তা নেই।এবার ক্রমশ দিনের আলো নিভু নিভু হয়ে এল।এবার আর পারল না সৌদামিনী।এমনিতেই একটু বেলা পড়বার পর থেকেই তার মনের ভিতরটা ভয়ানকভাবে কু ডাক দিতে আরম্ভ করেছে।হাজারো ভয় আর দুশ্চিন্তা তার মাথার মধ্যে যেন ফণা তুলতে আরম্ভ করেছে।এখন যখন পশ্চিম আকাশে সূর্যটা আকারে এক্কেবারে ছোট্টটি হয়ে রক্তবর্ণ ধারণ করেছে...তখন সৌদামিনী স্বামীর ভয়ানক একটা কিছু বিপদের গন্ধ পেল।সে আর স্হির থাকতে না পেরে যে কাপড় জড়িয়ে যেমন আলুথালু চুল দিয়ে উঠোনে একা বসেছিল...সেইভাবেই সে ঘর থেকে বেরোনোর জন্য পা টা বাড়াতে যাবে...ঠিক এমন সময় সে শুনতে পেল সেই পরিচিত কন্ঠস্বর।চাপা গলায় যেন হিসহিস করে বৌ কে ডাকছে দীনদয়াল। "গিন্নি...ও গিন্নি...দরজা খোলো...।দীনদয়ালের গলা শুনে ধড়ে প্রাণ এল সৌদামিনীর।সে তাড়াতাড়ি করে গিয়ে একছুটে দরজার শিকল খুলে দিল।দরজা খুলে দেখল...দীনদয়াল সুস্হ শরীরেই ঘরে ফিরে এসেছে।তবে তার চোখের চাহনিতে ভীষণরকমের অস্বাভাবিকতা বিরাজ করছে।কপালে বড় বড় শিশিরবিন্দুর মতো জ্বলজ্বল করছে বিন্দু বিন্দু ঘাম।চারপাশটা একবার সতর্কভাবে চোখ বুলিয়ে নিয়ে চাপাস্বরে বলল দীনদয়াল..."গিন্নি...কাজে লেগে পড়ো...আর দেরি নয়...সূর্য ডুবতে আর কিন্তু বেশি সময় বাকি নেই।এসো আমার সঙ্গে।বলির ব্যবস্হা হয়ে গিয়েছে।
সেই কাকভোর হতে আক্ষরিক অর্থে গায়েব হয়ে গিয়ে সারাদিন শেষে যখন দিনের আলো নিভু নিভু...তখন বিদ্যুতের ঝলকানির মতোই অকস্মাৎ প্রায় দরজা ভেঙ্গে ঘরের ভিতর ঢুকে আসা দীনদয়ালের পরিশ্রান্ত দুই চোখে ভীতি আর উদ্বেগ মিশ্রিত অদ্ভুত চাহনি দেখে সৌদামিনী যারপরনাই ঘাবড়ে গেল।সে একটা ঢোক গিলে ভীতিপূর্ণ কন্ঠে বলল..."কি বলছ!বলির ব্যবস্হা করে ফেলেছ!কোথা থেকে বাচ্চা পেলে?"
"সে সব ফিরিস্তি দেবার মত আর সময় নেই।আকাশের দিকে তাকিয়ে দেখেছ?সূর্য ডুবল বলে...কথা না বাড়িয়ে একটা দা নিয়ে এসো আমার সঙ্গে।ঘরের পিছনের ওই জঙ্গলটায় সন্ধ্যের পরেই সাপখোপ...ভূতপ্রেতের ভয়ে জনমনিষ্যি আসে না।আমাদের তো এখন জলে কুমির ডাঙায় বাঘ।অতএব ভয়ডর-যদি-কিন্তু র কোনো বালাই না রেখে তাড়াতাড়ি চলে আসো।ওদিকটা একটু সাফসুতরো করতে হবে।ওখানেই বলির ব্যবস্হা করতে হবে।
থরহরিকম্প সৌদামিনী এতক্ষণে বুঝে গিয়েছে...কিছু একটা হিল্লে"
'র ব্যবস্হা করে ফেলেছে দীনদয়াল।অতএব এখন কাজটা উদ্ধার করাটাই একমাত্র লক্ষ্য।বিনা বাক্যব্যয়ে সৌদামিনী যন্ত্রের মতো জানলার পাশে রাখা দা টা হাতে নিল।ঘরের ভিতর ফের শুরু হল নরকরোটির বলির রক্ততৃষ্ণার তুমুল আস্ফালনের বহিঃপ্রকাশস্বরূপ চাপা গোঙানির তীব্র তান্ডব।যেন আজ সূর্যাস্তের পর বলির রক্ত না পেলে পৃথিবী ওলটপালট করে ফেলবে সে।উঃ...আর কিভাবে সহ্য করা যায় এই সীমাহীন ক্রমবর্ধমান আতঙ্ক...।সৌদামিনী দা টা হাতে শক্ত করে ধরল।যাই হয়ে যাক...নরকরোটির ভিতরের অতল অন্ধকারের গর্ভে যে দুরাত্মার বাসই হোক না কেন...সে যা চায়...যেভাবে হোক সেটা দিয়ে তাকে তৃপ্ত করে মানে মানে ঘর থেকে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব নরকরোটিটাকে বিদেয় করে সারাঘর গঙ্গাজল দিয়ে ধুয়ে পরিষ্কার করতে হবে।ঘর থেকে দুজন বেরিয়ে এল।চলে গেল ঘরের পিছন দিকের হাঁটাপথ পেরিয়ে ঘন বাঁশঝাড়ের জঙ্গলটার ভিতরে।সূর্য ডুবে গিয়েছে।চারপাশের আলো ঝাপসা হতে হতে এখন পুরো জঙ্গল অমাবস্যার অন্ধকারের গ্রাসে।চারদিকে নেকড়ে,শেয়াল তাদের সম্মিলিত মহোল্লাসে মত্ত হয়ে উঠেছে।নিকষ অন্ধকারের হাঁএর ভিতর জঙ্গলের একটি ছোট্ট জায়গার এক কোণে শুধু কিছু লতাপাতা জড়ো করে তাতে ধরানো হয়েছে একটু আগুন।ওই আলোতেই জনমানুষের অজ্ঞাতে দীনদয়াল আর সৌদামিনী তাড়াতাড়ি করে লতাপাতা জঙ্গল দা দিয়ে উপড়ে সামান্য একটু জায়গার বন্দোবস্ত করতে লাগল বলি দেবার ব্যবস্হা করার জন্য।আর ওই জঙ্গলেরই একপাশে হাত পা মুখ বাঁধা অবস্থায় পড়ে রয়েছে একটা বছর পাঁচেকের বাচ্চা ছেলে।তার মুখ দেখা যাচ্ছে না।তাকে উল্টো করে শুইয়ে রেখেছে দীনদয়াল।শিশুটিকে ওভাবে পড়ে থাকতে দেখে এক অব্যক্ত যন্ত্রনায় বুকের ভিতরটা ভীষণভাবে মোচড় দিতে থাকল সৌদামিনীর।আহারে...নিশ্চয়ই এতক্ষণে এর বাপ মা চিন্তায় পাগল হয়ে গেছে...।পরক্ষণেই তার মাথায় বেজে উঠল বলির রক্তপিপাসু নরকরোটির তীব্র রোষানলের আস্ফালনের শব্দধ্বনি।আর কালবিলম্ব না করে সে আরো দ্বিগুণ দ্রুতগতিতে জঙ্গলে বলি দেবার জায়গা প্রস্তুত করার জন্য জঙ্গলের একটা ছোট্ট পরিসর বেছে সেটুকু পরিষ্কার করতে শুরু করল।এই জঙ্গল ঘিরে গাঁ গঞ্জের মানুষজনের মনে যা কুসংস্কার আর ভীতি ঠেসে বসে রয়েছে...তাতে এই শিশুর বাবা মা পরিবার পরিজন শিশুটির খোঁজ করতে এখানে দিনের বেলা যদিও বা আসার সম্ভবনা আছে...সূর্য ডুবে যাওয়ার পরে নৈব নৈব চ।দীনদয়াল বলি দেবার জন্য একেবারে ঠিক জায়গাই বেছেছে।কিন্তু শিশুটা কোন বাড়ির?মুখ তো দেখা যাচ্ছে না...।চেনা পরিচিত কারোর বাচ্চা নাকি ভিন গাঁয়ের কারোর সন্তান!তবে হাত যখন রক্তে রাঙাতেই হবে...তখন এ চেনা না অচেনা ঘরের ছেলে সে দিয়ে কি আর হবে!মনে আর কোনো চিন্তাভাবনাকে ঠাঁই না দিয়ে সৌদামিনী আর দীনদয়াল খুব অল্প সময়ের মধ্যেই জনমানুষের চোখের আড়ালে বলিপ্রদানের ব্যবস্হা করে ফেলল।কোথা থেকে একটা বড় পাথরের চাঁই জোগাড় করে সেটাকে টেনে এনে রাখল সেখানে।আর তারপর বলিপ্রদানের জন্য ধরে আনা শিশুটিকে পাথরটার পাশে পাশে শুইয়ে দিল।হাতমুখ বাঁধা অবস্থায় উপুড় করে রাখল তাকে।কারণ শিশুটির মুখ একবার যদি সৌদামিনী দেখে নেয়,তাহলে সে কিছুতেই শিশুটিকে বলি দিতে রাজী হবে না।সূর্য ডুবে চারদিক নিকষ অন্ধকারে ডুবে গিয়েছে আর জনমানবশুন্য ত্রাস জাগানো এই গভীর জঙ্গলের ভিতরে জনমানুষের অজ্ঞাতে ঘটতে চলেছে এক ঘৃণ্য পাপকার্য।ধিকিধিকি জ্বলছে আগুন আর তার পাশে রাখা বড় পাথরের চাঁইএর গা ঘেঁষে অঘোরে ঘুমিয়ে রয়েছে নিষ্পাপ একটি শিশু।আগুনের ওই মৃদু কম্পমান আলোতেও সৌদামিনীর কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম দেখতে পেল দীনদয়াল।
ওদিকে বলির ব্যবস্হাপনাও একেবারে প্রস্তুত।দীনদয়াল সৌদামিনীর পাশে এসে দাঁড়িয়ে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল...আর একটুক্ষণ অপেক্ষা করো...আমি করোটিটা এখানে নিয়ে আসছি।আজকেই ওর সব তড়পানি আর গর্জন আমি শেষ করে বিদায় করে ছাড়ব আমাদের জীবন থেকে।
এই বলে দীনদয়াল অদূরে রাখা করোটিটা আগুনের সামনে নিয়ে এল।এই কদিনের মধ্যেই করোটির কপালের রক্ততিলকটি একেবারে অদৃশ্য এবং নিশ্চিহ্ন হয়ে গিয়েছে।তার মুখগহ্বর উন্মুক্ত হয়ে পড়ছে ক্রমশ।চারপাশে সম্মিলিত শৃগালধ্বনির গা ছমছমে আবহে আগুনের সামনে রাখা করোটির নগ্ন হাঁএর ভিতর হতে যেন যুগ যুগ ধরে উপোসী ও তৃষ্ণার্ত কোনো জিঘাংসার পৈশাচিক আকুতি ছড়িয়ে পড়ছে চারপাশের বাতাসের প্রতিটি কণায়...।ধিকিধিকি আগুনের ধোঁয়ার সাথে এক হয়ে মিশে গিয়ে যেন উল্লাসে ফেটে পড়ে ধরিত্রী কাঁপিয়ে নিজের দাবী জানাতে উন্মুখ..."দে দে...আমায় রক্ত দে"...।
দীনদয়াল অচৈতন্য শিশুটিকে যখন ধরে ওই পাথরের ওপরে শুইয়ে দিল শিরশ্ছেদ করার জন্য...সৌদামিনী আর সে দৃশ্য সইতে পারল না।সে দুইহাতে নিজের মাথাখানি ধরে কাটা কলাগাছের মতো ধপ করে বসে পড়ল।ওদিকে চারপাশের বাতাস কম্পমান হয়ে উঠেছে।হিসহিস করে তীব্র আকুতির রোষানলে তেড়েফুঁড়ে উঠে যেন বলতে চাইছে..."দেরী করছিস কেন...এক্ষুনি রক্তের ফোয়ারা ছুটিয়ে দে...আমার সাংঘাতিক পিপাসা পেয়েছে...।"
দীনদয়াল বুঝল...আর দেরী করা ঠিক নয়।এই অমাবস্যায় যদি এই করোটির দাবী পূর্ণ না হয়...সে অভুক্ত থেকে যায়...তাহলে এর পরিণতি হবে ভয়ঙ্কর।সে দ্রুতগতিতে পাথরের চাঁইটির সামনে গিয়ে শক্তহাতে একটি বড় কাটারি নিয়ে দাঁড়াল আর শিশুটির ধড় আর মাথার অবস্হান এক মূহুর্ত লক্ষ্য করে নিয়ে পরমূহুর্তেই নিজের দুইচোখ তীব্রভাবে বন্ধ করে সজোরে চালিয়ে দিল নিজের হাত।মূহুর্তের মধ্যে ফিনকি দিয়ে রক্ত উথলে উঠে চারপাশটাতে একেবারে স্রোতের মতো বইতে শুরু করল।চারপাশে শৃগালধ্বনির বন্য হুঙ্কার যেন আকাশ ও ধরিত্রী খানখান করে ভীষণভাবে বন্য হয়ে উঠল।রক্তমাখা কাটারি হাতে থরথর করে কাঁপছে দীনদয়াল।সৌদামিনী এতক্ষণে জ্ঞান হারিয়ে পড়ে রয়েছে একপাশে।দীনদয়াল তখনো হুঁশে ফেরেনি।তার জ্ঞান সচেতন আর হুঁশ থাকলে সে দেখত,পাথরের চাঁইএর উপরে শিশুটির মুন্ডহীন ধড়ের গলা হতে ফিনকি দিয়ে বেরিয়ে আসছে রক্তের ধারা,পাথরের চাঁইএর সামনে বসানো নরকরোটি তার পৈশাচিক তৃষ্ণার জ্বালা নিবারণ করতে তার অস্হিসর্বস্ব নগ্ন মুখগহ্বর উন্মুক্ত করে ফেলেছে আর ওই হাঁয়ের ভিতর থেকে বেরিয়ে এসেছে সাপের জিভের মতো এক দীর্ঘকায় লকলকে রক্তাভ লাল জিভ।আর ওই জিভ পরম তৃপ্তির সঙ্গে চেটে সাফ করে খেয়ে নিচ্ছে ফিনকি দিয়ে বেরিয়ে আসা ওই রক্ত।ওই অপার্থিব নারকীয় দৃশ্য শুধু দেখে গেল নিকষ কালো আকাশ আর কতগুলো বন্য বৃক্ষ।খুব অল্প সময়ের ভিতরেই সমস্ত রক্ত একেবারে চেটেপুটে সাফ হয়ে গেল।নরকরোটির অতল অন্ধকারে স্নাত গোলাকৃতি দুই অক্ষিগহ্বরের মাঝখানে একটু একটু করে উজ্জ্বল হয়ে উঠল টকটকে লাল রক্ততিলক।আর ধীরে ধীরে বাতাসে মিলিয়ে যেতে থাকল সদ্য বলি হওয়া শিশুটির বিচ্ছিন্ন ধড় ও মুন্ডসমেত নিষ্প্রাণ দেহখানি...।
শিশুটির সবটুকু চিহ্ন ধরিত্রী থেকে ধুয়েমুছে সাফ হয়ে যাওয়ার পরক্ষণেই ধীরে ধীরে বাতাসে ধোঁয়ার মতো মিলিয়ে যেতে থাকা টাটকা রক্ততিলকধারী পৈশাচিক ক্ষুধায় তৃপ্ত নরকরোটির অস্হিসর্বস্ব অস্তিত্বের সবটুকু চিহ্ন।দীনদয়াল এই ভয়াবহ অপার্থিব দৃশ্যের সবটুকু,এই জনমানবশুন্য আতঙ্কের কালো চাদরে মোড়া ঘুটঘুটে অমাবস্যার এই রাত্রে সম্পূর্ণ একা নীরিক্ষণ করে গেল।তার সারা শরীরের রক্ত যেন জমে বরফ হয়ে যাওয়ার উপক্রম।গায়ের সবকটা রোম শজারুর কাঁটার মতো জেগে উঠে সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে গেছে তার।মনে হচ্ছে...এক্ষুনি সে জ্ঞান হারাবে।কিন্তু যাই হয়ে যাক...তাকে শক্ত থাকতেই হবে।তাদের পাপের যাবতীয় প্রমাণ বাতাসে ধোঁয়ার ন্যায়ে মিলিয়ে যাওয়ার ওই অপার্থিব দৃশ্যটি নীরিক্ষণ করার সময় খানিকটা নিশ্চিন্ততার শীতল বাতাস যে তাকে ছুঁয়ে আস্বস্ত করে যায়নি তা নয়,কিন্তু অন্যের জমিতে মজুরি খেটে খাওয়া দীনদয়ালের বুকে সবটুকু সাহস একত্রিত হওয়ার পরেও ভীষণভাবে অসহায় লাগছে তার।তবু সে এতটুকু বুঝতে পারছে,যে করেই হোক,তাকে ঠিক থাকতেই হবে।যেমন করেই হোক,বৌকে নিয়ে এই জঙ্গল থেকে তাকে সূর্যোদয়ের আগেই বেরিয়ে নিজের ঘরে পৌঁছোতে হবে।সে নিজের ভিতরের সমস্ত শক্তিকে এক জায়গায় এনে জমা করে এক নাগাড়ে শুধুই রামনাম জপ করতে লাগল চোখ সজোরে বুঁজে।এভাবে কাটল বেশ কিছুক্ষণ।ক্রমে দীনদয়াল বুঝতে শুরু করল...নিকষ কালো এই গহিন রাতের গায়ে আস্তে আস্তে ভোরের আলোর আস্তরণ পড়া আরম্ভ হবে।সূর্যোদয়ের আর দেরী নেই।এখন যত তাড়াতাড়ি সম্ভব স্ত্রীকে নিয়ে এখান থেকে তাকে সরে পড়তে হবে।সে সামনের দিকে তাকিয়ে দেখল,শুকনো পাথরের চাঁইয়ের একপাশে সৌদামিনীর অচেতন দেহ বীরুৎলতার ন্যায়ে লুটিয়ে পড়ে রয়েছে।সে আর কালবিলম্ব না করে একছুটে সৌদামিনীর কাছে গেল।পাশে পাত্রে রাখা জলের ভিতরে হাত ঢুকিয়ে হাতের কোঁচড়ে একটুখানি জল নিয়ে সে স্ত্রীর চোখেমুখে ছেটাতে শুরু করল ভীষণ উচাটন হয়ে।বেশ কিছুক্ষণ পর ধীরে ধীরে চোখ মেলল সৌদামিনী।ঘোর থেকে বেরিয়ে চারপাশের বহির্জগতের সঙ্গে নিজেকে মেলাতে তার কয়েক মূহুর্ত সময় লাগল।তার মনে পড়তে লাগল সমস্ত ঘটনা।তারপরেই সে স্বামীর দুইকাঁধ ধরে তীব্র ঝাঁকুনি দিয়ে বলে উঠল,"বাচ্চাটাকে মারোনি তো তুমি...বলো...বলো...।"
দীনদয়াল স্ত্রীর চোখের দিকে চোখ মেলাতে পারল না।মাথা নীচু করে রইল।সৌদামিনী বুঝতে আর কিছু বাকি রইল না।সে দুইহাতে মুখ চাপা দিয়ে ঝরঝর করে কেঁদে ফেলল।দীনদয়ালের কাছেও যে এছাড়া কোনো উপায় ছিল না সেটা ভালোভাবেই বুঝতে পারছিল সে।সে স্বামীর বুকে মুখ গুঁজে অঝোরে কাঁদতে থাকল।দীনদয়ালের চোখেও জল এল।সে দুইহাতে স্ত্রীকে নিজের বুকের মধ্যে চেপে ধরে তাকে সান্ত্বনা দিতে লাগল।
"অদৃষ্ট আমায় দিয়ে এই পাপকাজটা করাল গো...আর কোনো উপায় ছিল না যে...।তবে চিন্তা কোরো না গিন্নি। ওই অপশক্তির এখন আর কোনো চিহ্নমাত্র নেই।সে বলির রক্ত পেয়ে আমাদের পরিত্রাণ দিয়ে বাতাসে মিলিয়ে অদৃশ্য হয়ে গিয়েছে।আর খুনের দায় আমাদের ধরাও পড়তে হবে না গো...।ওই অপশক্তি বলির সব রক্ত শুষে নিয়ে মৃতদেহটা পর্যন্ত গায়েব করে দিয়েছে। বাচ্চাটার বাবা মা ওকে খুঁজে না পেলে সে দোষ কোনোদিনই আর আমাদের ওপর এসে পড়বে না।তুমি নিশ্চিন্তে থাকো...।
দীনদয়ালের কথা শুনে সৌদামিনী অবাক দৃষ্টিতে তাকাল স্বামীর দিকে।
দীনদয়াল আবার বলে উঠল।
"গিন্নি...ওই অপশক্তি আসলেই একটা পিশাচ।ওটার শুধুই রক্তের ক্ষিদে।আমাদের ইচ্ছাপূরণ করার গল্প ফেঁদে ওই অপশক্তি আমাদের দিয়ে ওর প্রয়োজন পুষিয়ে নিয়েছে সেটা বুঝতে পারছ তো!বাপ মা হওয়া আমাদের কপালেই নেই।অদৃষ্টকে মেনে নাও গো...এতেই আমাদের মঙ্গল...।ঘরে চলো...ভোরের আলো ফুটতে শুরু করে দিয়েছে।"
সৌদামিনী হঠাৎ দীনদয়ালের হাত চেপে ধরে বলে উঠল,"কোন বাচ্চাকে তুমি কাটলে?আমায় বলো...।"
"যেদিন ওই অপশক্তি ঘরে আনলুম ওইদিন বিকেলেই বোধহয়...একটা বাগদি বৌ স্বামীর ঘর থেকে বিতাড়িত হয়ে একটা বাচ্চা কোলে আমাদের ঘরের পিছন দিকটার বটগাছের তলায় এসে উঠল না...,বাচ্চাটা প্রতিবেশীদের কাছে খাবার চাইতে গিয়ে ঠ্যাঙানি খেত প্রতিদিন...ওই বাচ্চাটা রোজ ভোরে পুকুরের পিছনের ঝোপটাতে প্রাতঃকৃত্য সারতে যায় আমি দেখেছি।বাচ্চাটার প্রতি বড়ো মায়া পড়ে গিয়েছিল জান...এক আধ দিন আমি ওকে খাবারও দিয়েছি টুকটাক।ওকে মারতে মন বড়ো কাঁদছিল।দিন পার হয়ে যাচ্ছিল আর উপায় না পেয়ে..."
দীনদয়াল কপালে হাত দিয়ে নিস্তব্ধ হয়ে গেল।
সৌদামিনী জোরে জোরে কপাল চাপড়ে বলল..."হা ভগবান...ওই বাপে খেদানো অভাগা ছেলেটাকেই শেষে তোমায় বলি চড়াতে হল...।ওর খোঁজ করবার জন্যও তো ওর ওই অভাগী মা ছাড়া আর কেউ নেই দুনিয়ায়।ওর মা টা তো পোয়াতি ছিল।ওর চশমখোর স্বামীটা আরেকটা বিয়ে করে ঘরে নতুন বৌ তুলে একে এই অবস্থাতেই ছেলেশুদ্ধ এক কাপড়ে ঘর থেকে বার করে দিয়েছে। স্বামীকে আঁচলে বেঁধে না রাখতে পারার দোষারোপ করে পাড়াশুদ্ধ সবাই ওকে দুয়ো দেয়।ওই বাচ্চাটার কর্কট রোগ ধরা পড়েছিল।দুটো পেটের অন্নসংস্হান করাই দুরুহ ছিল...চিকিৎসার পয়সা জোগাড় করা তো স্বপ্ন!আমি ওর মাকে কয়েকবার বেঁচে যাওয়া খাবার দিয়েছি।বেচারি ছেলেকে বাঁচানোর জন্য নিজেকেও বেচতে রাজি ছিল।তুমি কি জানতে এত কিছু!"
দীনদয়াল পুরো বৃত্তান্ত শুনে একেবারে গুম হয়ে গেল।
"বাচ্চা হারিয়ে এতক্ষণে বেচারির না জানি কি অবস্হাই না হয়েছে!"
আগুপিছু আর কিছু না ভেবেই সৌদামিনী তড়াক করে উঠে দাঁড়িয়ে বলে উঠল,আমি এক্ষুনি ওর মায়ের কাছে যাব।দীনদয়ালকে আর কিছু বলবার সুযোগ না দিয়েই সৌদামিনী প্রায় ছুটে বেরিয়ে গেল দীনদয়ালের সামনে থেকে।
ভোরের চাপা আলো কেটে এখন সকাল হয়ে গিয়েছে।যে বটগাছের তলায় অভাগী মা তার রোগগ্রস্হ সন্তানের হাত ধরে আশ্রয় নিয়েছিল,সেই গাছের চারপাশে এখন স্হানীয় মহিলাদের থিকথিকে ভীড়।ভীড় ঠেলে সৌদামিনী ভীড়ের ভিতরে ঢুকে দেখল এক করুণ দৃশ্য। অভাগী মায়ের পেট থেকে নাড়িশুদ্ধ বেরিয়ে রয়েছে একটি সদ্যজাত শিশু।মায়ের চারপাশে কয়েকজন মহিলা তার প্রসবজনিত কাজে ব্যস্ত।চারপাশে দাঁড়িয়ে থাকা মহিলারা নিজেদের মধ্যে বলাবলি করছে,"দেখেছ কান্ড!যে ছেলের হাত ধরে বেরিয়ে এসেছে ঘর থেকে তার তো রক্তে কর্কট রোগ।ও ছেলে তো আজ নয় কাল মারণযন্ত্রণায় ভুগে ভুগে মরবে।যে কটা দিন বেঁচে আছে তার ঝক্কিই কম নয়...তার ওপরে এখন আরেকটা বিইয়েছে।তিনটে পেট চলে কি করে সেইটাই এখন দেখার কি বলো দিদি?"
---"হ্যাঁ সেই...যা বলেছ।"
পাশ থেকে একটি মহিলা কন্ঠ প্রত্যুত্তরে বলে উঠল।
পাশে প্রসবের কাজে ব্যস্ত মহিলারা ততক্ষণে নাড়ি কেটে বাচ্চাকে আলাদা করে ফেলেছে।তাদের এই কথোপকথনের মাঝেই হঠাৎ যন্ত্রনায় কঁকিয়ে উঠল সদ্য জননী।আর তার পরক্ষণেই একটা লম্বা শ্বাস ফেলে সে ঢলে পড়ল মৃত্যুর কোলে।সবাই মুখ চাওয়া চাওয়ি করতে লাগল।একজন বলে উঠল..."এটা হওয়ারই ছিল দিদি...মেয়েটা এই পোয়াতি অবস্থাতেও দিনের পর দিন উপোস থাকত।বাচ্চাটা যে বেঁচে গিয়েছে সেটাই আশ্চর্যের।"
এইসব দেখেশুনে গা জ্বলতে শুরু করল সৌদামিনীর।এদের ঘরেই যখন মেয়েটা উথলে ওঠা পেটের ভার সামলে দুটো ভাতের আশায় হন্যে হয়ে ঘুরত তখন ঠ্যাঙানি ছাড়া আর কিছুই জোটেনি কপালে।আর এখন মরণকালে দরদ একেবারে উপচে পড়ছে।
প্রসবের কাজে ব্যস্ত ছিল যে,সে সব কাজকর্ম শেষ করে হাতটাত ধুয়ে নিয়ে বলে উঠল..."দেখো বাপু...আমি যতটুকু জানি সেইমতো করে দিয়েছি।এখন এ বাচ্চার তো কোনো দাবীদার নেই।ওর বাপের কাছে নিয়ে গিয়েও কোনো লাভ হবে না,সে আমরা সবাই জানি।ওর সোয়ামি তো এ মেয়েমানুষের চরিত্তিরের দোষ দিয়ে এ বাচ্চাকে অস্বীকারই করবে।তো এখন এই বাচ্চার দায়িত্ব তোমাদের মধ্যে যে নেবে সে নিতে পারো...আমি বাবা ঘরে চললুম।আমার মেলা কাজ পড়ে রয়েছে।
এতক্ষণে সৌদামিনী এগিয়ে এসে সোজা কোলে তুলে নিল সদ্যজাত শিশুটিকে।সে সজোরে বলে উঠল...এ আমার ছেলে।এখন থেকে আমি এর মা।শুনে রাখো সবাই...আমি ওকে আমার ঘরে নিজের ছেলে হিসেবে পালব।"
এই বলে সস্নেহে শিশুটিকে নিজের বুকে আঁকড়ে ধরল সৌদামিনী।
ভীড়ের ভিতর থেকে একজন বলে উঠল..."তা বেশ বেশ।এতে করে তোমার অন্তত এ জীবনে মা ডাকটুকু শোনা হবে।কিন্তু এর যে একটা মারণ রোগগ্রস্হ দাদা রয়েছে সে খেয়াল আছে কি?ও ছেলে যতদিন না মরছে,ততদিন তার দায়িত্ব কে নেবে?শুনেছি ওর মস্তিষ্কে কর্কট রোগ বাসা বেঁধেছে।ছটফট করে মরবে সে ছেলে আর জীবদ্দশায় তার পিছনে খরচাও কিছু কম নয়।তা একে কোলে তুলে নিলে যখন সেটিকেও তোমার ঘরে ঠাঁই দাও...তবে বুঝব মা ডাক শোনবার যোগ্য তুমি।"
---"ও কথা বলিস না দিদি...দিনমজুরির দিন আনি দিন খাই পয়সায় এত চাপ এমনিই কুলোবে না।দুটো দিন যেতে দে...বাপ বাপ বলে দুটোকেই এই বটগাছের তলাতেই রেখে দিয়ে যাবে তুই আমার কথা মিলিয়ে নিস...।"
ভীড়ের ভিতর থেকে একজন বলে উঠল।ভীড় সবে আলগা হতে শুরু করেছে...এমন সময় দীনদয়াল এসে হাজির হল সেখানে।সে সজোরে বলে উঠল,
"সে আমাদের ব্যাপার আমরাই বুঝে নেব।কত ঘরে দুটো তিনটে করে ছেলেমেয়ে থাকে।আর ওই ছেলে তো আজ নয় কাল এমনিই মরবে।তাই ওকে নিয়ে বা এই কোলের শিশুটাকে নিয়ে কিভাবে রাখব সে দায়িত্ব আমরাই নিলুম।আপনাদের সে নিয়ে ভাবতে হবে না।আমার ঘরে সন্তান এসেছে। এখন তাকে আমরা ভালোয় ভালোয় ঘরে নিয়ে যাই...আর ও ছেলে যখন প্রাতঃকৃত্য সেরে আসবে এখানে...ওকে বরং আমার ঘরে যেতে বলে দিও তোমরা।"
এই বলে দীনদয়াল সৌদামিনীর কাঁধে সযত্নে হাত রেখে বলল, "গিন্নি...আজ তুমি মা হলে।আর কেউ তোমাকে ব্যঙ্গ বিদ্রুপ করতে সাহস পাবে না।চলো...ঘরে চলো।
সৌদামিনী দুরু দুরু বক্ষে সদ্যজাত শিশুকে বুকের মধ্যে আগলে জড়িয়ে নিয়ে ধীরপায়ে ঘরের অভিমুখে এগিয়ে চলল।
এরপরে কেটে গেল বহুদিন।সৌদামিনীর কোলের ছেলেটির অগ্রজের খোঁজ গাঁয়ের কেউই আর তেমন করল না।সবাই এটাই জানল,সে ভোরবেলা ঝোপের কাছে প্রাতঃকৃত্য সারতে গিয়ে নিখোঁজ হয়ে গিয়েছে।
আর ওদিকে সৌদামিনীর উঠোন জুড়ে এখন ছোট্ট শিশুর কলকানি এখন মাতিয়ে রেখেছে।ওদের আঁধার ঘরে যেন পূর্ণিমার হাসির বাঁধ ভেঙ্গেছে
দিন যায় এমনিভাবেই।কয়েক ক্রোশ দূরে এক গাঁয়ের ভিতরের এক জঙ্গলে একদিন এক কিশোর ছেলে গলদঘর্ম হয়ে কাঠ কাটছিল।কাঠ কাটতে কাটতে শ্রান্ত হয়ে পাশেরই এক গাছতলায় বসে একটু বিশ্রাম নিচ্ছিল।হঠাৎ সামনে আগাছার ভিতরে জড়ানো অবস্হাতেও একটা নরকরোটি তার চোখে পড়ল।তার ললাটদেশ টাটকা রক্তের তিলক দ্বারা অলঙ্কৃত।এই দৃশ্য দেখে সে প্রথমটায় ভয়ানক হচকিয়ে গেল।সে ভয় পেয়ে তৎক্ষণাৎ সেখান থেকে পালাতে গেল।ঠিক তখনই নরকরোটি হঠাৎ অপার্থিব কন্ঠে কথা বলে উঠল।
"আমায় দেখে ভয় পেয়ো না বালক...আমায় তোমার ঘরে নিয়ে যাও...কটা দিন রাখো...তোমার মনের যে কোনো একটি ইচ্ছা আমি পূরণ করে দেব।আমার কথা শোনো...।"
ছেলেটি কিঞ্চিৎ হতভম্ব হয়ে আস্তে আস্তে পিছন ফিরল।
---"ভাবছিস কি!আমায় তোর ঘরে নিয়ে চল...তারপর তোর যে কোনো একটি ইচ্ছা আমায় বলিস।তারপর দেখে যা শুধু...। "
অপার্থিব কন্ঠে নির্জন জঙ্গল কাঁপিয়ে বলে উঠল নর করোটি।
ছেলেটি কাঁপা কাঁপা কন্ঠে বলল,"যা চাই তাই দেবে?"
---"দেব রে দেব।শুধু একবার আমায় তোর ঘরে নিয়ে চল।"
জঙ্গল গমগম করে উঠল
ছেলেটি এবার ডাইনে দেখল আর বাঁয়ে দেখল।তারপর চতুর্দিকে ভালো করে চোখ বুলিয়ে দেখে নিল।কেউ কোথাও নেই।
কি যেন ভাবল সে কিয়ৎক্ষণ।তারপর হঠাৎ কি ভেবে সে এক পা এক পা করে নরকরোটির দিকে এগোতে থাকল।তারপর একবুক সাহস সঞ্চয় করে খপ করে দুইহাতে ধরে নিল নরকরোটিটাকে।তারপর তাড়াতাড়ি করে নিজের ঝোলায় পুরে নিয়ে চোঁ চাঁ দৌড় লাগাল।এখন তার গন্তব্য তার ভগ্ন কুটির,যেখানে অভাব একেবারে জাঁকিয়ে বসে আছে।পঙ্গু বাবার চিকিৎসা আর হাড় জিরজিরে মায়ের কান্না দিয়ে মোড়া সে সংসারের হাল এই বয়সেই তার দুইকাঁধ জুড়ে চেপে বসেছে।একটুকু মুক্তির নিস্ফল আশায় ব্যাকুল ছেলেটা আজ হঠাৎ প্রতিদিনের রোজনামচা শিকেয় তুলে দিয়ে শুধু দৌড়চ্ছে এই নির্জন ভোরবেলা।একেবারে নিজের ঘরের উঠোন পর্যন্ত পৌঁছোনোর আগে তার থামবার কোনো সম্ভবনাই নেই।
সমাপ্ত

