গোয়েন্দা ( ধারাবাহিক)
গোয়েন্দা ( ধারাবাহিক)
পর্ব আটত্রিশ
অনুপ্রভা দেবীর পারলৌকিক ক্রিয়াকর্ম এক প্রকার নির্বিঘ্নেই সম্পন্ন হল । কুটুম্বাদি জ্ঞাতিগোষ্ঠী সকলেই একে একে বিদায় নিয়েছেন । বিশ্বময়ী দেবীর আক্ষেপ শুধু সূর্য্যকিরণের উপর । শ্রাদ্ধের দিন দ্বাদশ ব্রাহ্মণ ভোজনের পর উচ্ছিষ্ট পাতাগুলো নিয়মানুযায়ী সূর্য্যর তোলবার কথা । শহরে না হোক, গ্রামাঞ্চলে এই রীতি বহুল প্রচলিত রয়েছে ।
বিশ্বময়ী দেবী গ্রামের মানুষ। তিনি চেয়েছিলেন ওগুলো সূর্য্যই তুলে দিক । এতে নাকি মায়ের আত্মা পরিতৃপ্ত হয় । বারোজন ব্রাহ্মণকে আপ্যায়ণ করে খাওয়ানোর পর তাঁদের হাতে পিতলের ঘট, একশত এক টাকা করে দক্ষিণা এবং সর্বোপরি প্রত্যেককে শ্রীমদ্ভগবদগীতার ক্ষুদ্র সংস্করণ দেওয়া হয়েছে । এই যথেষ্ট বিবেচনা করে সূর্য্যকিরণ এরূপ গ্রাম্যরীতি বর্জন করেছে। আর এখানেই বিশ্বময়ী দেবীর ক্ষোভ ফুটে উঠেছে।
সূর্য্যকে বলেছিলেন তোর ঠাকুর্দার শ্রাদ্ধের দিন তপনও এরকম কাজ করেছিল । তপনকিরণও সূর্য্যকে একই কথা বলেছিলেন; কিন্তু সূর্য্য তা' শোনেনি। উল্টে বিশ্বময়ী দেবীকে এরূপ কুসংস্কার মুক্ত হতে বলেছিল । ঠাম্মার গোঁসা অবশ্য বেশীক্ষণ টিকে নাই।
আসলে বিশ্বময়ী দেবীর একটাই অভীষ্ট - যে কোন প্রকারে শুভশ্রীর সঙ্গে সূর্য্যকে বেঁধে রাখা। অতিথি অভ্যাগতজন যেদিন সম্পূর্ণভাবে যে যার বাড়ি চলে গেছেন , বিশ্বময়ী দেবী সূর্য্যকে একান্তে ডেকে জিজ্ঞেস করলেন - দাদুভাই, শুভশ্রীকে তোর কেমন লাগে ?
অপ্রত্যাশিত ভাবে সূর্য্য উত্তর দেয় - ভালো-মন্দ বুঝি না ঠাম্মা আমাদের সঙ্গে ও যে ভাবে নিজেকে মানিয়ে নিয়েছে তা' নি:সন্দেহে প্রশংসাযোগ্য ।
ঠিক এমনই একটা উত্তরের আশা করেছিলেন বিশ্বময়ী দেবী । উৎসাহিত হয়ে বললেন - তোর পছন্দ হয়েছে ?
- দেখ ঠাম্মা! এমন জেরা শুরু করলে যেন নিজে থেকেই তোমাকে বলে দিই ওর সাথে আমার বিয়ে দিয়ে দাও । বাবা যে এর বিরুদ্ধে; তা তো তুমি জান!
- কে কার বিরুদ্ধে সে আমি বুঝে নেব'খন । তুই শুধু বল তুই রাজী কি না ! তোর মা চলে যেতেই এমনটাই আমার মনে হল । কারণ বউমাও সেদিন বলেছিল - কি সুন্দর মেয়ে ! আবার নিজে উদ্যোগী হয়ে গোটা বাড়িটা শুভোকে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেখিয়েছে। আহা রে ! বউমা যদি থাকত !
সূর্য্যকিরণ ঠাম্মাকে বলল - বাবা যদি রাজী না হয়!
- বলেছি তো সে আমি বুঝে নেব ।
- তবুও । আসলে কি জানো ঠাম্মা, বাবা বলছিলেন হা-ভাতে ঘরের মেয়েকে বাড়ির বউ করা যায় না।
- বলেছে বুঝি ? আর ও যাকে বিয়ে করেছিল সে কি উদয়পুরের রাজকন্যা ছিল ? সেও তো খুব গরীব ঘরের মেয়েই ছিল । তোর ঠাকুর্দা একবার দেখেই কথা দিয়ে এসেছিলেন ।
- তাই বুঝি ? তবে তো সমস্যা মিটেই গেল । আচ্ছা ঠাম্মা, দাদুর কথা তোমার মনে পড়ে ? না মানে, আমি তো দাদুকে দেখিনি কি না ।
- নাও, শোনো কথা । নিজের স্বামীর স্মৃতি কি ভোলা যায় রে ক্ষ্যাপা ?
বিশ্বময়ী দেবীর চোখের কোণ চিকচিক করে উঠল । কোনমতে অশ্রু সম্বরণ করে তিনি বললেন - মরার বয়স কি তাঁর হয়েছিল ? তপনের বিয়ের মাসখানেকের ভেতর তিনি খুন হলেন ।
সূর্য্য ভয় পেয়ে বলল - খুন? সেকি ঠাম্মা? কে দাদুকে খুন করল - আর কেনই বা করল ?
বিশ্বময়ী দেবী চোখ মুছে বললেন - কি বলব দাদুভাই! আসলে একটা অদ্ভুতদর্শণ লোক - নাহ্ লোক বলা যাবে না; অন্তত পাড়ার লোকেরাই বলেছিল - একটা জন্তু এসে তোর দাদুকে বাগানের নিমতলায় ডেকে কামড়ে ধরেছিল ঘাড়ে । দু'বার ঝাঁকানি দিতেই নাকি তোর দাদুর প্রাণবায়ু বেরিয়ে গিয়েছিল ।
- তোমরা পুলিশে খবর দাও নি?
- তখন কি আর অতশত বুঝতাম! পাড়া প্রতিবেশীরা এসে বলল' জানোয়ারে মারলে নাকি পুলিশ সে ব্যাপারে কোন কেস নেয় না ।
- দাদুর কেসটা এখন যদি রি-ওপেন করি!
- তথ্য প্রমাণ, সাক্ষী ছাড়া কেস দাঁড়ায় না দাদুভাই। আর এতকাল পর সেগুলো পাই কোথায় ?
সূর্য্যকিরণ চিন্তা করতে লাগল । বিরিঞ্চিবাবার মত কাউকে পাওয়া গেলে তবু একটা কথা ছিল । এখন সে তো জেলে !
ঠিক সেই সময় তপনকিরণ কানে মোবাইল রেখে কারও সাথে কথা বলতে বলতে ঘরে ঢুকছেন।
- হ্যালো ! কে বলছেন ?
অন্যপ্রান্ত থেকে বলল - আপনি আমাকে চিনবেন না স্যার । আমি আলাপন দস্তিদার ডেপুটি কমিশনার অব পুলিশ কথা বলছি । আপনি কি মিঃ তপনকিরণ চৌধুরী ?
- আজ্ঞে হ্যাঁ স্যার।
তপনকিরণ খুব ভয় পেয়ে গেলেন। তবে কি পবন কুমার নামের লোকটা অনুকে নিয়ে পুলিশে দরবার করেছে ।
তপনকিরণ বললেন - বলুন স্যার ।
- মিঃ চৌধুরী ! আপনার স্ত্রীর নাম কি অনুপ্রভা ?
গোটা শরীরে বিদ্যুৎ খেলে গেল যেন । তপনকিরণের মনে হল পবন কুমার নিশ্চয় ডি এন এ পরীক্ষার কথা বলেছে । তাহলে তো সমাজে মুখ দেখানোই দায় হয়ে যাবে । তবু বলতেই হল - হ্যাঁ স্যার, তাঁর নাম অনুপ্রভা চৌধুরীই ছিল ।
- ছিল মানে ? এখন নেই নাকি ।
- স্যার, গত একপক্ষকাল আগেই তিনি পৃথিবী ছেড়ে চলে গেছেন ।
- আই অ্যাম সরি । আর একটা কথা বলুন তো, আপনার বাবা মানে লেট অরুণকিরণ চৌধুরী কি মার্ডার হয়েছিলেন ।
- জাস্ট এ মিনিট স্যার । এ ব্যাপারে আমার মা খুব ভালো বলতে পারবেন। একটু ধরুন স্যার, আমি আমার মাকে দিচ্ছি ।
বলে ফোন দিলেন বিশ্বময়ী দেবীর হাতে। তিনি এবার প্রশ্ন করলেন কে বলছ বাবা ?
- নমস্কার । আমি ডি সি পি কথা বলছি । আপনি কি লেট অরুণকিরণ চৌধুরীর স্ত্রী কথা বলছেন ?
- বলছি। বলুন কি বলবেন!
- আমার জানার প্রয়োজন ছিল আপনার স্বামীর হঠাৎ মৃত্যু নিয়ে । আপনার কি মনে হয়; সে মৃত্যুটা স্বাভাবিক ছিল না অস্বাভাবিক?
সূর্য্যকিরণের চোখমুখ জ্বলজ্বল করে উঠল । যাক পুলিশ এতদিন পর হলেও কেসটা নিজে থেকে একসেপ্ট করেছে।
( চলবে )

