একটি সত্য ঘটনা
একটি সত্য ঘটনা
তখন আমার বয়স দশ কি এগারো হবে। প্রতি বছরের মতো এবারেও আমরা গ্রীষ্মের ছুটিতে কয়েক দিনের জন্য গ্রামের বাড়িতে গিয়েছিলাম। আমার ছোট বেলাটা ঐ ধরুন বছর সাতেকের মধ্যে বছর চারেক ওখানেই কেটেছিল। তারপর আবার কোলকাতায় চলে আশাহয় বাবার কর্ম সূত্রে। এখানে এসে একটি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে ভর্তি হই। বর্তমানে অবশ্য আমাদের বিদ্যালয়ে উচ্চমাধ্যমিক পর্যন্ত পঠন পাঠনের ব্যবস্থা হয়েছে। যাই হোক এই গল্পে বিদ্যালয়ের নামটা উল্লেখ করলাম না কারণ, পরবর্তী সময় বিদ্যালয়ের উপর একটি গল্প লেখার ইচ্ছা রয়েছে এবং তখন বিদ্যালয় সম্বন্ধে বিস্তারিত আলোচনা করব। যাই হোক মূল গল্পে আসা যাক। আমরা বছরে প্রায় তিন বার গ্রামের বাড়িতে যেতাম। একবার শীতের ছুটিতে একবার গ্রীষ্মের ছুটিতে এবং পূজার দশমীরদিনটা প্রায় প্রতি বছর গ্রামেই কাটতো যতদিন আমার ঠাকুমা জীবিত ছিলেন। এই গল্পটি গ্রীষ্মকালের জৈষ্ঠ্য মাস আমের মরসুম। আমাদের বাড়িতেও বহুধরনের আমগাছ ছিলো কিন্তু ঝড় উঠলে লোকের বাগানে আম কুড়াতে যাও য়ার মজাই আলাদা।
যেহেতু ছোট বেলাটা আমি গ্রামে কাটিয়েছি সেহেতু আমার অনেক বন্ধু বান্ধব সেখানে ছিলো। আগের দিন দুপুরে আমরা গ্রামে পৌঁছেছি বিকালে সকলের সাথে কথাবার্তা হয়েছে অর্থাৎ বন্ধু বান্ধবদের সাথে। পরেরদিন সকাল থেকেই আকাশে একটা মেঘের আনাগোনা পরিলক্ষিত হচ্ছিলো। তখন ঘড়িতে সকাল দশটা হবে। সকল বন্ধুরা আমাদের বাড়িতে এসে হাজির। আটামেখে ছিপ হাতে নিয়ে আমরা পৌঁছেগেলাম আমাদের পুকুরে। সেই সময় আমার মাছ ধরবার নেশাছিল মারাত্মক তবে মাছ মুখে তুলতাম না আমি। ছিপদিয়ে খেলিয়ে মাছ ধরবো এটা একটা আলাদা আমেজ। কে কটা মাছ গাঁথতে পারে ছিপে। পুকুর ভর্তি মাছ ছিপফেললে চার খাবেনা এমনটা নয় তবে ধরা সকলে দেয়না। যাই হোক দেখতে দেখতে একটা বেজেগেল, একটা আধটা মাছ সকলেই ধরলাম হঠাৎ এক বন্ধু বলে উঠলো আজ একটা বেঁড়ে ঝড় আসবে রেতে আম কুড়াইতে যাবি নাকি। ওর আকাশের বিষয়ে একটা বিশেষ অভিঞ্জতা ছিলো। আকাশের দিকে তাকিয়ে অনায়াসে বলে দিতে পারত ঘড়িতে কটা বাজে। মেঘের রঙ দেখে বলেদিতে পারত বৃষ্টি হবে কিনা? তাই এ বিষয়ে আমরা তাকে যথেষ্ট বিশ্বাস করতাম। মাছ ধরার সরঞ্জাম গুছিয়ে নিয়ে একটা ছোট্ট মিটিং হয়ে গেল। গ্রামের বেশিরভাগ বাড়িতেই তখন চার বেটারির টর্চ, আমাদের বাড়িতেও দুটো ছিলো। আর টিমটিমে, হারিকেন ইত্যাদি। যাই হোক ও যখন বলেছে তখন ঝড় হবেই অবধারিত তাই মিটিং সেরে ফেললাম গোছগাছ কি করতে হবে। আলোচনায় নির্ধারণ হলো টর্চে নতুন ব্যাটারি ভরে নিতে হবে আর প্রত্যেকে একটা করে চটের ব্যাগ রেডি রাখতে হবে। এই পর্যন্ত আলোচনা হয়ে যেযার বাড়িতে চলে গেল স্নান- খাওয়া দাওয়া সেরে সবকিছু গুছিয়ে নিতে কিছুটা সময় লাগবে। তিনটে নাগাদ আমরা গ্রামের উত্তরের বাজারে যাবো ব্যাটারি আনতে। যেতে আসতে প্রায় এক ঘন্টা সময় লেগেই যাবে ওর অনুমান সন্ধা নাবতে না নাবতেই ঝড় আছরে পরবে গ্রামের উপর।
তখন ঘড়িতে ঠিক ছয়টা বাজে। গ্রামের পূর্বপ্রান্ত থেকে একটা শোঁ শোঁ শব্দ কানে ভেসে আসে, আর শবটদের আগে ভেসে আসে আমার বন্ধুরা আমরা যুদ্ধে অবতীর্ণ হতে প্রস্তুত। প্রত্যেকের হাতে একটা করে টর্চ আর একটা করে চটের ব্যাগ। বস্তা বললেও কম হবেনা। শব্দ ঝড়ের আকার নিয়ে আছরে পড়ে। আমরাও তার সাথে গতি মিলিয়ে ছুটতে থাকি আমবাগানের দিকে। আমাদের বাড়িথেকে একটা পাড়া পার করলেই কর্তার বাগান, দিনে বাগান পাহারা দেবার লোক থাকলেও রাতে ঐ বাগানে কাউকে থাকতে হয়না। কারণ ভয়ে রাতের বেলায় ঐ বাগানে কেউ যায়না। এর আগে কখনো আমরাও যাইনি, সেদিন কি হলো আমাদের এক বন্ধু বলল বাড়ির বাগানের আম বাড়ির লোকেরা কুড়িয়ে নেবে কর্তার বাগানে এবার ব্যাপক আম হয়েছে আর রহিম চাচা রাতে ও বাগানে যাবেনা তাতে ওনার চাকরি চলে যাকনা কেন তাই এই সুযোগটাকেই আমরা কাজে লাগাবো। যেমন চিন্তা তেমন কাজ। আমরা সোজা পৌঁছেগেলাম কর্তার বাগানে।
আমনারা হয়তো বিশ্বাস করবেন না তবে এতটুকু ভেজাল নেই এই গল্পে, আমরা এক ঘন্টা ঐ বাগানে ছিলাম সেদিন আর টানা এক ঘন্টা ঐ বাগানের উপর ঝড় যেভাবে দাপট চালিয়েছিল তাতে ঔ বাগানের গাছে একটাও আম থাকবার কথায় নয়। এক ঘন্টায় প্রত্যেকে এক বস্তা করে আম সংগ্রহ টেনে হিচরে নিয়ে বাড়িতে ফিরলাম আর সাথে সাথেই বাড়ির লোকেদের চিৎকার এতক্ষণ ধরে তোরা কোথায় ছিলি। হঠাৎ এই ধরনের প্রশ্নে আমরা কিছুটা হতবম্ব হয়েই বললাম কেন আম কুড়াচ্ছিলাম এই দেখনা এক বস্তা করে আম কুড়িয়ে এনেছি আরও আম মাটিতে বিছিয়ে রয়েছে কিন্তু পাত্র না থাকায় আনতে পারলাম না। টানা এক ঘন্টা ঝড়ে বোধহয় সমগ্র বাগান সাফ হয়ে গিয়েছে। হঠাৎ চোখে পড়লো বারান্দায় গোটা পনেরো আম পড়ে রয়েছে আমি আবার উপযাচক হয়ে বললাম তোমরা বাগানের আম কুড়াওনি? ছোটকাকা বলল মনে হচ্ছে তোদের মাথা খারাপ হয়ে গিয়েছে। আমি অবাক হয়ে বললাম মানে। ছোটকাকা বলে ঝড়তো পাঁচ মিনিটও দাঁড়ায় নি তোরা একঘন্টা ধরে কোথায় আম কুড়ালি? আমাদের সারা বাগানে মাত্র এই কটাই আম পড়েছে। এবার আমাদের মনের মধ্যে একটা ভয় জন্মালো তাহলে কি হয়েছে আমাদের সাথে, টর্চের আলো চার দিক দিয়ে ফেলে আমার আমের ব্যাটা ঢেলে দিলাম। এগুলো কি দেখছি বস্তায় একটাও আম নেই বিভিন্ন মাপের ছোট - বড়ো ইঁট। সকলে স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইলাম কয়েক মুহুর্ত আমাদের দেহে যেন প্রাণবলে আর কিছু নেই। কয়েক মুহুর্ত পরে সকলে একে একে বস্তা উল্টে কয়েক কেজি ইঁট জমা করলাম উঠানে এর পর কারো আর নরবার মতো শক্তি ছিলোনা। মা আর কাকিমা আমাকে ঘরে নিয়ে গেল। বাবা আর কাকা মিলে ওদের যার যার বাড়িতে পৌঁছে দিয়ে এলেন। ঘরে ঢুকতে না ঢুকতেই ঠাকুমা মাথায় গঙ্গার জল ছিটিয়ে কি সব মন্ত্র দিয়ে ঝেড়ে দিলেন আমাকে। সবটাই বুঝতে পারলাম কিন্তু রাতে আর কিছুই বলতে পারলাম না। কি খলাম কখন শুলাম কিছুই মনে নেই আমার।
পরের দিন সকালে ঘুম ভাঙতে নিজেকে অনেকটা স্বাভাবিক মনে হলো। ঠাকমা জিঙ্গাসা করলেন কোথায় গিয়েছিলি আম কুড়াতে আমি জানালাম কর্তার বাগানে। জানতে পারলাম আমাদের পাঁচজনের মধ্যে দুই বন্ধুর ধুম জর। ঔষধে কোন কাজ করছেনা। ঠাকমার সাথে তাদের বাড়িতে গেলাম, সেদিন শুক্রবার ছিলো ঠাকমা বললেন এ ডাক্তারের কাজ নয় ওদের মসজিদে নিয়ে যাও নমাজের পর কাজি সাহেবের কাছ থেকে ঝাড়িয়ে নিয়ে এসো। ঠাকমার কথা মতো আমার বন্ধুদের বাবারা ওদের মসজিদে নিয়ে গেলেন। গ্রামের মসজিদে মহিলাদের প্রবেল নিসেধ হওয়াই ওদের মায়েরা কেউ যায়নি। কাজিসাহেব ওদের ঝাড়িয়ে জলপোড়া বানিয়ে দিলেন তারপরথেকে ধিরে ধিরে সুস্থ হয়ে উঠলো তারা। সেদের ঘটনা ভাবলে আজো আমার গা সিউরে ওঠে।
🙏 সমাপ্ত 🙏

