দানাবাবা
দানাবাবা
আমাদের বাড়ি বেশ প্রত্যন্ত এক গ্রামে। হিংলো,আর শাল নদী দিয়ে ঘেরা। বাইরে যেদিক থেকেই হোক গ্রামে আসতে হলে নদী পেরিয়ে আসতে হয়। নদীর দুই ধারে প্রচুর বাঁশ গাছের ঝাড় আছে। গ্রামে আসার রাস্তা বেশ দুর্গম ও ভয়ার্ত।
গ্রামের ভিতরে বাইরে অনেক ছোট বড়ো পুকুর আছে। এই সব পুকুর পাড়ে ও অনেক বাঁশের ঝাড় আছে, বড়ো বড়ো বট,অশত্থ,অর্জুন গাছ আছে। এইরকম দুর্গম যোগাযোগ ব্যবস্থা,আর বাঁশ ঝাড় ও গাছে ঢাকা ভয়ার্ত পরিবেশের জন্য একসময় স্বাধীনতা সংগ্রামী গণ এই গ্রামে গা ঢাকা দিতে পছন্দ করতেন।
একদিকে বাসস্ট্যান্ড থেকে গ্রামে আসার রাস্তায় নদী পেরিয়ে গ্রামে ঢোকার আগে একটা পুকুর পরে। ওই পুকুরটার নাম মজুমদার পুকুর।
মজুমদার পুকুরের পাড়ে অনেক বাঁশের ঝাড় আছে। তবে রাস্তার ধারে একটা বড়ো বাঁশ ঝাড়ের নিচে পাঁচ পোঁতা আছে।
গ্রামে যতো বাচ্চা ছেলে মারা যায় সবাইকে ওই বাঁশ ঝাড়ের তলে পোঁতা হয়। তাই ওই জায়গাকে পাঁচ পোঁতা বলা হয়।
এখন বাচ্চা মৃত্যুর হার কম। কিন্তু আগেকার দিনে সকলের বাড়িতে বাচ্চা হতো,আর মারাও যেতো বেশি। সেই সব বাচ্চা এখানে পোঁতা হতো।
শোনা যায় সন্ধ্যা হলে ওই রাস্তায় অনেক বাচ্চা একসাথে কাঁদতে কাঁদতে ঘুরে বেড়ায়। দূর থেকে বাচ্চাদের কান্না শোনাও যায়।
বাচ্চারা সরাসরি কোন মানুষের ক্ষতি করে না। তবে ওরা যখন বের হয় তখন দানাবাবা ও বের হন। আর দানা বাবার খপ্পরে কেউ পরে গেলে তার আর রক্ষে নেই।
ওই পাঁচ পোতার অধিপতি হলেন দানাবাবা। দানাবাবার পায়ে লোহার শিকল আছে। তাই তিনি যখন পুকুরে এধার থেকে ওধারে পার হয়ে যান তখন ঝনঝন আওয়াজ হয়।
ওই আওয়াজ পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই জল থেকে উঠে আসতে পারলে বেঁচে যাবে। ডাঙ্গায় শিকল পেঁচিয়ে একবারই দানাবাবা মেরেছিল বলে শোনা যায়।
একবার এক পিশাচ সাধক পাঁচ ফেলার বাচ্চা গুলো নিয়ে তপস্যা করতে শুরু করে। তপস্যা করতে গিয়ে বাচ্চা গুলো কথা না শুনলে ওই সাধক বাচ্চা গুলোর উপর অত্যাচার করতে থাকে।
দানাবাবা আর থাকতে না পেরে ক্ষেপে গিয়ে একদিন রাতে ওই সাধকের পায়ে শিকল পেঁচিয়ে হিরহির করে টানতে টানতে মজুমদারের জলে নিয়ে গিয়ে ডুবিয়ে মারে।
সকাল বেলায় গ্রামের লোক সাধক কে দেখতে না পেয়ে খোঁজখুঁজি শুরু করে। তারা দেখতে পায় যে সাধকের বসার আসন থেকে টেনে নিয়ে যাওয়ার দাগ রয়েছে। মাঝে ওই দাগে রক্তের দাগ। মৃত সাধক পুকুর জলে ভাসছে।
দানাবাবা সাধারণত মজুমদার পুকুরের জলে থাকেন। পাঁচ পোঁতার বাচ্চা ভূতদের ডাকে উঠে আসেন।
গ্রামের বহু ছেলে মেয়ে কে দানাবাবা মজুমদার পুকুরে দিনে দুপুরে ডুবিয়ে মেরেছেন।
গ্রামের সব ছেলে মেয়ে সাঁতার জানে। সাঁতার তাদের জীবনের প্রয়োজনে জানতে হয়। তাই কিভাবে তারা পুকুরে ডুবে মারা গেল বোঝা যায় না। আবার,সকলের
পায়ে শিকল বাঁধার দাগ লক্ষ করা যায়।
দানাবাবা পায়ে শিকল বেঁধে তাদের ডুবিয়ে মেরেছেন।তাই ওই দাগগুলো হয়েছে।
আসলে মজুমদার পুকুরে গ্রামের মেয়েরা সচরাচর দল বেঁধে স্নান করতে যেতো। একা স্নান করতে গেলেই দানাবাবা আক্রমণ করতো।
সর্বশেষ দাসেদের একটি মেয়ে গ্রিষ্মের দুপুরে ওই পুকুরে স্নান করতে গিয়ে মারা যায়। তার পর থেকে ওই পুকুরে যাওয়া বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে।

