Participate in 31 Days : 31 Writing Prompts Season 3 contest and win a chance to get your ebook published
Participate in 31 Days : 31 Writing Prompts Season 3 contest and win a chance to get your ebook published

Nandita Misra

Action Crime Thriller


3  

Nandita Misra

Action Crime Thriller


বিবেক যন্ত্র

বিবেক যন্ত্র

16 mins 48 16 mins 48

[এই গল্পের অনুপ্রেরণা আমার বাবা। আমার বাবা একজন সৎ এবং কর্তব্যনিষ্ঠ পুলিশ অফিসার ছিলেন। জীবনে কখনও তিনি অন্যায়ের কাছে মাথা নত করেননি। এই গল্প শুরু হচ্ছে একজন পুলিশ অফিসারের সঙ্গে কথোপকথনের মাধ্যমে। এই গল্পটি যদিও কাল্পনিক, তবুও গল্পের মেরুদণ্ড তৈরি হয়েছে বাবার অনুপ্রেরণা থেকে। আমার বাবা আজ আর পৃথিবীতে নেই। তাঁর স্মৃতির উদ্দেশ্যে তাঁকে নিয়ে এই গল্পের কাঠামো তৈরি করেছি। গল্পটি একটি থ্রিলার সাসপেন্স। আশা করি পাঠকের পছন্দ হবে।]

                                        

রজতের সামনে এখন একজন দীর্ঘদেহী মানুষ দাঁড়িয়ে আছেন। গায়ের রং তামাটে। শরীর টানটান, যাকে বলে সুঠাম চেহারা। বয়স আন্দাজ বছর চল্লিশ। পরনে পুলিশের উর্দি। 

-নমস্কার। আজ থেকে আমি এই কেসের তদন্ত করবো। আমার নাম বাদল সরকার। লেকটাউন থানার নতুন ওসি। চার্জশিট জমা করার আগে, এই কেসটা আরও একবার বুঝে নিতে এলাম। আসলে আমি সবে জয়েন করেছি। নতুন কেসটা ডিটেলে পড়তে গিয়ে একটু খটকা লাগল। সব কিছু যেন বড়ো বেশি সহজ! আপনাকে একবার ইন্টারোগেট না করলে মনটা কেমন খুঁত খুঁত করছে। তাহলে প্রশ্ন শুরু করছি! প্রথমেই জানতে চাই, আপনার রক্তের গ্রুপ কী? কারণ মৃতার দেহের পাশে অনেকটা রক্ত পাওয়া গেছিল।

-বি পজিটিভ।

-আর আপনার স্ত্রী'র রক্তের গ্রুপ যেন কী?

-দেখুন, আমি কিন্তু কোনওভাবেই খুনের সময় উপস্থিত ছিলাম না। পুলিশ সিসিটিভির ফুটেজ দেখেছে এবং একজন সন্দেহ ভাজনকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আটকও করেছে, উনি নাকি সাইবার থেকে ববিতাকে রোজ উত্তেজক মন্তব্য করতেন! তারপর রেপ এবং খুন। পুলিশ ভিসেরা টেস্টের রিপোর্ট ম্যাচ করলেই ফাইনাল পেপারস্ রেডি করবে। আমাকে আপনারা এবারে একটু নিষ্কৃতি দিন! একা থাকতে দিন।

-আমি এখনও কিন্তু আপনাকে তেমন কিছুই জিজ্ঞাসা করিনি! কী আশ্চর্য! আপনি এত অল্পে অযথা ভীষণ রিঅ্যাক্ট করছেন দেখছি! আপনার অসুবিধাটা কোথায়? নাকি আপনি থানায় বসে উত্তর দিতেই স্বচ্ছন্দ বোধ করবেন? জানেনই তো এই খুন নিয়ে চারিদিকে মিডিয়া এখন খুব মাতামাতি করছে। শুনছি এই কেস এবার সিআইডি হাতে নেবে। আমি ছেড়ে দিলেও ওরা কিন্তু আপনাকে ছাড়বে না।

-কিন্তু কেন? কেসটা তো খুব সোজা! আমার স্ত্রী আমার অনুপস্থিতিতে অনেকের সঙ্গে অবৈধ মেলামেশা করতেন, সেটা এখন প্রমাণিত, ওর ফোন থেকেই সব তথ্য পেয়েছেন আপনারা। আপনারা সিসিটিভিও দেখেছেন। তাহলে আর কী প্রশ্ন থাকতে পারে? তারাই কেউ হয়তো সেদিন এসেছিল এবং ___ তাছাড়া সেদিন অনেক লোক এই আবাসন চত্বরে এসেছিল। আবাসনের সামনের রাস্তায় সিসিটিভি আছে, যদিও এই আবাসনের ভেতর কোনো সিসি ক্যামেরা নেই।

-দেখুন আপাত দৃষ্টিতে যা জলের মতো সোজা মনে হয়, তার ভেতরে অনেক সময়ই অনেক গোপন গল্প থাকে। আমি আসলে সেই গোপন গল্পটাকেই খুঁজে বের করতে চাইছি। আপনি একদম প্রথম থেকে শুরু করুন। আমি আজকের পুরো রাতটা দরকার হলে এখানে থেকে যেতে পারি। আমি হাতে আজ অনেকটা সময় নিয়ে এসেছি।

-সে কী! এখন মাত্র সাড়ে পাঁচটা বাজে। পুরো রাত ধরে এখানে কি সিনেমার শ্যুটিং হবে?

-ধরুন তাই!

-বাব্বা! আপনার দেখছি কাজে খুব নিষ্ঠা! কলকাতা পুলিশ ডিপার্টমেন্টে এমন সততা সচরাচর দেখা যায় না! এতখানি ডেডিকেশান! আমি ভাবতেই পারছি না!

-দিনকাল একদম পাল্টে গেছে মাস্টারমশাই। টেকনোলজি এখন অনেক উন্নত হয়েছে এবং পুলিশ ডিপার্টমেন্টও এখন একেবারে অন্যরকম হয়ে গেছে। যেমন আপনি যদি কোনও কথা মিথ্যে বলেন, তা ধরে দেবে আমার হাতের মাত্র কয়েক ইঞ্চির একটি যন্ত্র। এই যে আমার হাতের এই যন্ত্রটা দেখতে পাচ্ছেন, কালো ছোট কমদামী মোবাইলের মতো দেখতে, এই যন্ত্রটার নাম আমি দিয়েছি বিবেক যন্ত্র।

পুলিশ অফিসার হওয়ার আগে আমি মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং পাশ করেছিলাম। ছোটখাটো একটা চাকরিও করতাম। ছেড়ে দিয়ে সরকারি পুলিশের চাকরিতে ঢুকেছিলাম। এখানে একবারে অফিসারের পোস্ট পেলাম। তবুও সেই ইঞ্জিনিয়ারিং বিদ্যা আমি ভুলিনি। এই যন্ত্র আমার আবিষ্কার। অবশ্য এখনও এর পেটেন্ট নেওয়া হয়নি, তবে আমি কেস সলভ্ করতে এখন এই যন্ত্রটা ব্যবহার করছি। জানেন, বেশ ভালো ফলও পেয়েছি। নিন নিন! শুরু করুন! আপনার যা বলার আছে বলে ফেলুন! এক মিনিট! আপনার কপালের রগের দুপাশে এই যন্ত্রের সফ্ট প্যাড দুটো লাগিয়ে দিতে হবে। হ্যাঁ! এই তো বাঃ!


                      ২

-আমার নাম রজত। রজত কুমার বসু। থাকি কেষ্টপুরের দু কামরার ভাড়ার ফ্ল্যাটে। বছর দুয়েক আগে আমি ববিতাকে বিয়ে করেছিলাম। কেষ্টপুরে আমার বাসায় কেবল আমি এবং আমার স্ত্রী বসবাস করতাম। আমার বাবা মা নেই। মানে ছোটবেলায় বাবা মারা গেছেন। কলেজে পড়তে পড়তে মা-ও। জীবনে আমি খুব কষ্ট করে নিজের পায়ে দাঁড়িয়েছি।

মায়ের সঙ্গে মামাবাড়িতে থাকতাম। মা ওখানকার একপ্রকার অলিখিত কাজেরলোকই ছিল। আমিও মুখ বুজে সবার ফাইফরমাশ খাটতাম। পরিবর্তে আমাদের খাওয়া দাওয়া জুটতো, স্কুলে পড়তে পেতাম। তারপর একটু একটু করে বড় হলাম। কলেজে পড়ার সময় মা-ও মারা গেল। আমি পৃথিবীতে একদম একা হয়ে গেলাম। তারপর চাকরির পরীক্ষা দিতে দিতে শেষে এই স্কুলের চাকরিটা পেলাম। বারাসাতে স্কুল। ব্যাস! প্রথম মাসের মাইনে পেয়েই মামাবাড়ি থাকা ছেড়ে দিলাম। এখন আমি মুক্ত, স্বাধীন! কেষ্টপুরের ভাড়াবাড়িটা সেইসময়েই ঠিক করেছিলাম।

আমার একটা শখ আছে। আমি টাকা জমিয়ে প্রায়ই বহু জায়গায় বেড়াতে যাই। আমার জঙ্গল খুব ভালোলাগে। আমার একমাত্র লক্ষ্য হলো বিশ্বের বিভিন্ন জায়গার ফরেস্ট টাইপগুলো দেখা। বিশ্বের আগে ভারতেরই সব টাইপের ফরেস্ট দেখা হয়নি আমার। ট্রপিক্যাল এভারগ্রীন ওয়েট, সেমি এভারগ্রীন, ময়েস্ট ডেসিডুয়াস, ড্রাই ডেসিডুয়াস, থর্নি স্ক্রাব ফরেস্ট এমন কত ভাগ। আমাদের দেশের বিচিত্র ভাষার মতো জঙ্গলেরও বিভিন্ন ভাষা, বিভিন্ন প্রকাশ। আবহাওয়া এবং ভূমি প্রকৃতির বদলে তারাও তাদের বেশ আর ভূষা বদলে ফেলে। জঙ্গলে বেড়াতে যাওয়ার স্বপ্নও আমার নিজস্ব একটা গোপন ভালোলাগা।

-দেখুন আমার বিবেক যন্ত্র কিন্তু আপনার কথার ভুল শুধরে দিতে চাইছে। কিছু কি ভুল বললেন? একটু মনে করে দেখুন! দেখুন! লাল আলোটা কেমন জ্বলছে আর নিভছে।

-কী ভুল বললাম! আমার বেড়াতে যেতে ভালোলাগে, তাই-ই বলেছি। আরে রাখুন আপনার মেশিন! আমার জীবনে কোনও গোপন বিষয়ই নেই।

-ওই দেখুন আলোটা কেমন জ্বলছে। স্ক্রীনে একটা নাম ভেসে আসছে, মনে হয়! আরে এ যে মেয়েদের নাম! রিনি? রিনি মিত্র?

-আরে! আপনার মেশিন তো ভারী অদ্ভুত? এই নাম আপনি কোথায় পেলেন?

-আমি পাইনি। বিবেক যন্ত্র আপনার মাথার ভেতর থেকে খুঁজে পেয়েছে। মনে রাখবেন, যা বলবেন সত্যি বলবেন। না হলে মেশিন কিন্তু উল্টোপাল্টা আচরণ করবে।

-মা-মানে?

-ক্রমাগত মিথ্যে বললে এই মেশিন কিন্তু ভয়ঙ্কর হয়ে ওঠে। তখন যে ও কী করবে আমি বলতে পারবো না। মেশিন অনেক সময় শাস্তি দেবার ভার নিজের হাতেই নিয়ে নেয়! আপনি সাবধানে আর সত্যি বললে কোনও বিপদ নেই।

                      

                      ৩

-রিনি। হ্যাঁ ও আমার খুব কাছের বন্ধু ছিল একসময়। কিন্তু সত্যিই একসময়। এখন ওর সঙ্গে আমার আর কোনও যোগাযোগ নেই। রিনিকে প্রথম দেখেছিলাম কলেজের ফেস্ট এর দিন। ভীষণ সুন্দর করে সেজেছিল ও। লম্বাটে গড়ন, একটা নেভী ব্লু কামিজ আর সাদা পাতিয়ালা পরেছিল। ফেস্টের দিন ও গিটার বাজিয়ে গান গেয়েছিল। হ্যাঁ, সেদিন দেখার পর আমার ওকে ভালো লেগেছিল। লাগতেই পারে! এতে আমার কী দোষ? রিনি মেধাবী, সুন্দরী এবং বড়লোকের মেয়ে। কলেজে গাড়ি চড়ে আসতো। আমার মতো কয়েকশো ছেলের ওকে ভালো লাগতো।

আমার সঙ্গে রিনির প্রেম জাস্ট ভাবা যায় না। কম দামী পোশাক পরা, নিরীহ ধরনের একটা মুখচোরা ছেলে আমি। অথচ সেই চরম অদ্ভুত ঘটনাটাই ঘটলো। রিনি আমার প্রেমে পড়লো। আমাদের ডিপার্টমেন্টও আলাদা। আমার জিওগ্রাফি আর ওর কেমিস্ট্রি।

ছুটির পর অনেকটা পথ হেঁটে এসে আমরা বাসে উঠতাম। রিনিই আমাকে রেস্তোরায় খাওয়াতো। আমি পয়সা পাব কোথায়?

-তারপর?

-তারপর যা হয়। কলেজ শেষ হওয়ার পর আমি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হলাম। চাকরির চেষ্টা করতে শুরু করলাম আর রিনির বাড়ি থেকে ওর বিয়ে ঠিক করা হলো। আমি রিনিকে কোনও ভরসা দিতে পারিনি। তখন আমার চাকরি ছিল না। চাকরির পাওয়ার নিশ্চয়তাও ছিল না। রিনি আমার জীবন থেকে হারিয়ে গেল।

-বিবেক যন্ত্র বলছে, আপনি তা হতে দেননি। এই চার বছর ধরে আপনি প্রায়ই রিনির খোঁজ খবর নিয়েছেন। ওর যাবতীয় তথ্য আপনি জেনেছেন। আপনি রিনির আশা একেবারেই ছেড়ে দেননি। এই কয়েক বছরে বেশ কয়েকবার আপনাদের দেখা হয়েছে। তার কোনোটাই সমাপতন নয়। সমাপতন বা হঠাৎ দেখা হয়ে গেছে মনে হলেও আসলে সবগুলোকেই বিশেষ কায়দায় ঘটানো হয়েছে।

রিনির বরের ক্যানসার হয়েছে যখন জানতে পারলাম, তখন আমি সদ্য বিয়ে করেছি। বিয়ে আমি করতামই না। তবে রিনির সঙ্গে অনেকদিন পরে আবার দেখা হওয়ার পর, ওর অপমান আমার বুকে দারুণ হয়ে লেগেছিল। তখন আমাদের স্কুলের একজন বয়স্ক কলিগ, আমি তাকে বিনয়দা বলে ডাকি। তিনি আমাকে ববিতাকে বিয়ে করতে বলেছিলেন। ববিতা সম্পর্কে ওর ভাগ্নী হয়। অপমানের জ্বালায় আমি তখন জ্বলছি। তাই গ্রামের মেয়ে ববিতাকে বিয়ে করতে কোনও আপত্তি করিনি। ববিতা মাধ্যমিক পাশ। চেহারাও একদম সাধারণ। আমি তবুও সম্মতি জানিয়ে ছিলাম।

আমার মনে আছে আমি বিয়ের মন্ত্রপাঠ করার সময়ও রিনির মুখটাই মনে করছিলাম। সিঁদূর পরানোর সময় আমার চোখে জল এসে গেছিল। এই বিয়ে আমি চাইনি। বিয়ের আগে দু বছর ধরে অনেক সূত্র ধরে রিনির খোঁজ করেছি। তাতেই আমার দু বছর সময় ব্যয় হয়েছে। ওর ঠিকানা পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই আমি অনেক চেষ্টা করে রিনির সঙ্গে দেখা করেছিলাম। জেনেছিলাম ও বিয়ের পর দক্ষিণ কলকাতার একটা বিউটি পার্লারে প্রায়ই আসে। আমি সেই পার্লারের উল্টোদিকের একটা বইয়ের দোকানে দাঁড়িয়ে ওর অপেক্ষা করছিলাম।

সেদিন পার্লারে এসে ও মনে হয়, হেয়ার কাট্ করেছিল। বেরিয়ে এল যখন তখন ওর টানটান স্ট্রেট করা চুলগুলো পিঠের উপর ফেলা। চুলে বেশ কয়েক রঙের শেড। আগে এমন দেখিনি। অনেকদিন পর রিনিকে দেখে আমি মুগ্ধ হয়ে চেয়ে রইলাম। একটা ক্রেপ শিফনের শাড়ি পরেছিল রিনি, রঙটা খুব সম্ভবতঃ বেগুনি। মাথায় একচিলতে লাল। খুব সুন্দর লাগছিল রিনিকে। আমি দেখলাম রিনি আমাকে দেখে এক মুহূর্তের জন্য চমকে উঠলো। তারপর যেন আমাকে চিনতেই পারেনি এমন ভাব দেখালো।

আমিই এগিয়ে এলাম। কেমন আছিস?

তুই এখানে? রিনি ভুরু কুঁচকে বলল।

কেন আসতে নেই?

না, এমনি জিজ্ঞাসা করছি? এখানে কোথায়?

তোর কাছেই এসেছি।

মানে?

মানে বুঝতে অসুবিধা কীসের? তোকে দেখতে এসেছি।

-দেখ্ রজত আমি এ ধরণের ইয়ার্কি পছন্দ করি না। তুই এখন এখানে আর আসিস না। আমি অনেকের কাছেই শুনছি, তুই নাকি ডেসপারেটলি আমার ঠিকানা খুঁজছিস। আমি এখন একজনের স্ত্রী। সংসারে আমি অনর্থক অশান্তি বাড়াতে চাই না। এতদিন পর শুনছি তুই নাকি রিসেন্টলি চাকরি পেয়েছিস। তাতে কী এসে যায়। বল্? কী বা এসে যায়? পেয়েছিস তো একটা স্কুলের চাকরি! তোর ভরসায় থাকলে আমি একেবারে শেষ হয়ে যেতাম। জীবন একেবারে শেষ!

জানিস, আমার বর প্রায় লাখ খানেক টাকা মাইনে পায়। তার উপর অফিস থেকে গাড়ি, ফার্নিশড্ ফ্ল্যাট সব। গত বছর আমরা একুশদিনের ইউরোপ ট্যুর করে এলাম। তুই আমাকে কী দিতে পারতি? কী? এখন যা। ভবিষ্যতে আমাকে আর বিরক্ত করিস না। পার্লারের কাচের দরজার ভেতর থেকেই তোকে আমি দেখতে পেয়েছিলাম। বারবার এদিকে তাকাচ্ছিস আর ঘড়ি দেখছিস! এখনও কলেজ লাইফের মতো প্রেম করার শখ তোর মেটেনি দেখছি!

আমি চুপ করে রিনির কথা শুনলাম। একটা কথাও বললাম না। বাড়ি ফিরে এসে সিদ্ধান্ত নিলাম এবার বিয়ে করবো। কয়েক মাসের মধ্যেই ববিতা আমার জীবনে এল। এখনও এখানে একটা জিনিসের অভাব নেই! আর তা হলো বিবাহযোগ্যা কন্যা।


                      ৪

আপনার ঘরের মেঝেতে অনেকটা রক্ত পড়ে ছিল। খানিকটা ববিতাদেবীর শরীরের চারদিকে এবং কিছুটা দরজার কাছে। দুটো রক্তের রঙ আলাদা। ববিতাদেবীর রক্তে অ্যানিমিয়ার লক্ষণ আছে। গ্রুপ হলো এ পজিটিভ। দরজার বাইরে যে রক্ত ছিল তা আততায়ীর। সেই রক্ত গাঢ় রঙের। এর গ্রুপ এবি পজিটিভ। ববিতাকে রেপ করা হয়েছিল। খুন করার আগে তাকে একাধিকবার ধর্ষন করা হয়েছিল। আপনাদের আবাসনের বাইরে গেটের মুখে যে সিসিটিভি আছে তাতে আমরা ওই সময়ে আসা যাওয়া করা অনেকগুলো মুখ দেখেছি। পুলিশ সব ফ্ল্যাটে কথা চালাচ্ছে, খুব শিগগীর কোন ফ্ল্যাটে কে কে এসেছিল তার তালিকা হাতে পাবে। 

ববিতার মোবাইল ফোন সিজ করা হয়েছে। সেখানে একাধিক পুরুষের সঙ্গে মেসেঞ্জার এবং হোয়াটস অ্যাপে দীর্ঘ চ্যাট হিস্ট্রি পাওয়া গেছে। চ্যাট যারা করেছে বেশিরভাগই ফেক অ্যাকাউন্টের অধিকারী। যে ছবি তারা ব্যবহার করেছে, সবই বিভিন্ন বলিউডের অভিনেতাদের ছবি। আমরা অ্যাকাউন্টগুলো হয়তো খুঁজে বের করতে পারবো। ইতিমধ্যে খুঁজে পেয়ে অ্যাকশান নেওয়া হয়েছে। তবে এরা আবার বিভিন্ন সাইবারে গিয়েই এসব করে। এখনও চেষ্টা চালানো হচ্ছে।

-ববিতাদেবীর সঙ্গে আপনার সম্পর্ক কেমন ছিল? আপনার মন জুড়ে তো সব সময় অন্য একজন ছিলেন। আপনাদের বিবাহিত জীবন কি স্বাভাবিক ছিল?

-ববিতা খুব ভালো মেয়ে ছিল। মানে আমি অন্ততঃ তাই মনে করতাম। অথচ ও এই গত দু'বছর ধরে আমাকে ঠকিয়েছে। ওর ভালোমানুষ মুখ দেখে আমি বুঝতেই পারিনি, ও ভেতরে ভেতরে এমন কিছু করতে পারে! বিয়ের পর শখ করে আমিই ওকে একটা স্মার্ট ফোন কিনে দিয়েছিলাম। সোনি এক্সপিরিয়া। বেশ দামী সেট। ও ব্যবহার করতে পারতো না। আমিই শিখিয়ে দিয়েছিলাম। পরের দিকে ও ফোনে খুব বেশি অভ্যস্ত হয়ে গেছিল।

ববিতার ফোনে আমি কখনও হাত দিতাম না। আমি ব্যক্তি স্বাধীনতায় বিশ্বাসী। কারুর ব্যক্তিগত জীবনে আমি হস্তক্ষেপ করতে চাই না। ববিতা ছিল সাধারণ একজন গৃহবধূ যেমন হয়, ঠিক তেমন। সারাদিন টুকটাক ঘরের কাজ করতো। সন্ধ্যা হলে সিরিয়াল দেখতে বসে যেত। আমি বাড়ি ফিরতাম বেশ রাত করে। আগেই বলেছি আমার বেড়ানোর নেশা। তাই আমি বেশি রোজগারের আশায় স্কুলের পর কয়েকটা কোচিং সেন্টারে পড়াতাম। সবই ওই বারাসাতের দিকে। যখন বাড়ি আসতাম, আমাকে দেখেই ববিতা রোজ টিভি বন্ধ করে দিত।

ববিতার সঙ্গে আমার সম্পর্কটা ঠিক সহজ হয়ে ওঠেনি। একটা ঠান্ডা আরষ্টতা ছিল আমাদের দুজনের মধ্যে। ববিতা কেন জানি না আমাকে সামান্য এড়িয়ে চলতো সব সময়। এখন বুঝতে পারছি কেন ও এমন করতো। ববিতা অনেকের সঙ্গে অবৈধ সম্পর্ক গড়ে তুলেছিল। সারাদিন ববিতা একা একা থাকতো। আমার অনুপস্থিতিতে তাদের কারুর সঙ্গে সে হয়তো বড় বেশি রকমের জড়িয়ে পড়েছিল।

-হ্যাঁ এমন একজনকে ববিতাদেবীর সোশাল মিডিয়ার প্রোফাইল থেকে আমি খুঁজে বের করেছি। সে হয়তো এখনই এখানে এসে পড়বে।

-কে?

যার সঙ্গে ববিতার সম্পর্ক হয়েছিল।

-তাই নাকি? আশ্চর্য! কে বলুন তো?

-আপনার নিশ্চয়ই আগ্রহ হচ্ছে। হওয়াটাই স্বাভাবিক! ওই দেখুন উনি এসে পড়েছেন। আলাপ করিয়ে দিই। উনি সুরজিৎ রায়, যাদবপুর ইউনিভার্সিটির স্টুডেন্ট। কম্প্যারেটিভ ইন্ডিয়ান লিটারেচার এ এমএ করছেন, থাকেন উল্টোডাঙায়। ইনি হলেন রজত বসু। ববিতার হাজব্যান্ড। স্কুলে ভূগোল পড়ান। মাস্টারমশাই। আপনার কথা বলুন সুরজিৎ। আমরা শুনতে চাই। আমার মনে হয়, উনি মিথ্যে বলবেন না। তাই এখানে আমার বিবেক যন্ত্র ব্যবহারের দরকার নেই।


                       ৫

-ববিতা ফেসবুকে একদিন আমাকে ফ্রেন্ড রিকোয়েস্ট পাঠিয়েছিল। ওর প্রোফাইল খুলে দেখি, মেয়েটার বেশিরভাগই পুরুষ বন্ধু। ফেসবুকে ও খুব একটা কমেন্ট করে না, কিন্তু প্রায় সারাদিন অ্যাক্টিভ থাকে। আমার ওর ছবিটা দেখে খুব ইনোসেন্ট মনে হয়েছিল। কেমন মায়া হয়েছিল, কেন কে জানে! আমি ওর রিকোয়েস্ট অ্যাকসেপ্ট করে নিয়েছিলাম। ফেসবুকে আমার নিজের ছবি ছিল না, প্রোফাইলে ছিল ব্র্যাড পিটের ছবি। একদিন রাতের দিকে, প্রায় বারোটার সময় আমাকে চ্যাট করতে থাকে ববিতা।

কি গো কেমন আছো? আমি তোমাকে ভালোবেসে ফেলেছি। তুমি কি আমার হবে?

আমি তো হতভম্ব! এমন কথা বলছে একজন সাধারণ চেহারার গৃহবধূ? কেন? কী চায়? মেয়েটাকে তো এমন মনে হয়নি! আমি উত্তর দিলাম না। পরেরদিন সকালে দেখলাম যথারীতি মেয়েটা ফেসবুকে অ্যাক্টিভ আছে। আমি ওকে মেসেঞ্জারের মাধ্যমে ফোন করলাম। প্রথমে ফোন ধরেনি। বেশ কয়েকবার ফোন বাজার পর ভীরু মুখের একটা সরল মেয়ে কাঁপা গলায় ফোন তুললো। ওকে দেখতে পেলাম আমি। ঠিকানা নিলাম। আগেরদিনের চ্যাটের কথা জিজ্ঞাসা করতেই ও তো আকাশ থেকে পড়লো। আমার এবার অবাক হওয়ার পালা। যাইহোক সেদিনই আমি ওর বাড়িতে গেলাম। পুরো বিষয়টা আমি আসার পর বুঝলাম। ববিতা ফেসবুক করতেই পারে না। ও একেবারে সাধাসিধা আর গাঁইয়া একটা মেয়ে। আজকাল গ্রামের সব মেয়ে অবশ্য এমন হয় না। ও একটু অভাবী বাড়ির মেয়ে, এসব ও কিছুই জানে না।

সকালবেলা বাড়ি থেকে বেরোনোর সময়, ওর বর ওর ফোনে ফেসবুক খুলে রেখে চলে যায়। রাতে ফিরে এসে নানা রকম উত্তেজক কমেন্ট করে। অথচ মেসেঞ্জার ব্যবহার করতেই পারে না ববিতা। আমি আশ্চর্য হয়ে গেলাম। মেয়েটার স্বামীর নিশ্চয় কোনও বদ মতলব আছে বুঝতে পারলাম। নাহলে বউয়ের ফোন নিয়ে এমন করবে কেন?

-কী বলছেন? তখন থেকে যা মুখে আসে আমার সম্পর্কে বলে যাচ্ছেন?

-একদম চুপ করে থাকুন! এখন আপনি কেবল শুনবেন। আমি আমার কথা শেষ করার পর, যা মনে হয় বলবেন। তারপর সেইদিনই আমি ওকে অনেক কিছু শেখালাম। বললাম তোমাকে সাবধানে থাকতে হবে। তোমার স্বামী বাড়ি থেকে চলে গেলেই তুমি ফোন সুইচ অফ করে দেবে। আবার যখন ফিরে আসবে তার আগে ফোন খুলবে। উনি তোমার ফোন নিয়ে যা খুশি করুক, ফোন বন্ধ থাকলে তোমার বিপদ নেই। ঘরেও সাবধানে দরজা বন্ধ করে থাকবে। সব ছেলেরা কিন্তু সুরজিৎ রায় হয় না। তোমার খুব বিপদ হতে পারে। চোখ কান খোলা রেখে চলবে।

-তবে মেয়েটা আমার কথা বিশ্বাস করলো না। টিপিক্যাল সনাতনী বধূর মতো, কিছুতেই বরকে দোষ দিল না। বললো,

-ও হয়তো মজা করে এমন করছে। আমার চরিত্রের পরীক্ষা নিতে চায় হয়তো।

আমার ববিতার জন্য খুব মায়া হলো। এরপর মাঝে মাঝে দুপুরের দিকে সময় পেলে আমি ওর কাছে আসতাম। আমাদের বেশ বন্ধুত্ব হয়ে গেল। ববিতাকে আমি নাম ধরেই ডাকতাম। আর ও আমাকে সুরো বলে ডাকতো। এক নির্জন দুপুরে ববিতা আমাকে অনেক কথা বললো। ওর বর ওর প্রতি কেমন আশ্চর্য উদাসীন সে কথা বলল ও। কয়েকমাস আগেই ওর বর স্কুল থেকে দীর্ঘ ছুটি নিয়ে প্রায় মাস খানেকের উপর মুম্বাই বেড়াতে চলে গেছে। ওকে সঙ্গে নিয়ে যায়নি। কথাটা বলে ববিতা খুব অসহায়ের মতো কাঁদতে লাগল।

সেই সময় বিশ্বাস করুন, সেই সময় মনটা এমন খারাপ হয়ে গেল যে, আমি ওর ঘর থেকে বেরিয়ে গেলাম। মেয়েটা এত সরল কেন? আর সরল মানুষগুলোর সঙ্গেই ভগবান এমন কেন করেন কে জানে?

ওর বরের ছবি দেখেছিলাম। একদিন আসার সময় হঠাৎ করে আবাসনের অন্য একটা ফ্ল্যাটে তাকে ঢুকতে দেখতে পেলাম। তখন শুনেছিলাম উনি মুম্বাই থেকে ফিরে এসেছেন। সময়টা মনে হয়, এই সন্ধ্যা ছটা কি সাড়ে ছটা হবে। পরেরদিন ববিতাকে জিজ্ঞাসা করলাম উনি কখন বাড়ি ফিরেছেন? ববিতা বললো,

যথারীতি দশটার সময়। আমার ভেতর বরাবর একটা অনুসন্ধিৎসু মন আছে। খোঁজ নিয়ে জানলাম ফ্ল্যাটটা ভাড়া নিয়েছেন রিনি মিত্র নামের একজন বিধবা ভদ্রমহিলা। তার স্বামী হঠাৎ ক্যানসারে মারা গেছেন। ভদ্রমহিলা দেখতে শুনতে বেশ ভালো। ওর ফ্ল্যাটে মাস্টারমশাই ঘন ঘন যাতায়াত করেন। এবং বাড়ি ফিরে বউয়ের ফোন থেকে অশ্লীল কমেন্ট করতেন। আমি মনে করেছিলাম, উনি বউকে ডিভোর্স দেবেন বলে প্রমাণ একত্র করতে চাইছেন। এটা এতটাও কিছুই ভয়ানক নয়। যতটা ভয়ানক সিদ্ধান্ত উনি নিয়েছিলেন। ববিতাকে উনি খুন করেছেন।

-অসম্ভব! চিৎকার করে উঠল রজত।

অসম্ভব? দেখুন আপনার কথার প্রতিবাদ করছে বিবেক যন্ত্র। এতক্ষণ অনেকবার লাল আলো জ্বেলেছিল মেশিন। আমি কিছু বলিনি। কারণ, আমি দেখতে চেয়েছিলাম আপনি কী বলেন! তবে আর দেরী নয়। এতখানি যখন জানা হলো, বাকিটা আপনিই বলে ফেলুন রজতবাবু। আজ আপনার মুক্তি নেই। আপনি ধরা পড়ে গেছেন!


                      ৬

রিনিকে আমি ভুলতে পারিনি আর সেটাই আমার একমাত্র দোষ। ববিতাকে আমার ভালোলাগতো না। ওকে দেখলেই আমার মনে পড়ে যেত রিনি আমার কাছ থেকে হারিয়ে গেছে। তবুও দায়সাড়া ভাবে আমাদের সংসার চলছিল। হয়তো আমি সব কিছু ধীরে ধীরে মেনেও নিতাম। কিন্তু একদিন বিয়ের পর পরই, খুব সম্ভবতঃ একমাসের মাথায়, রিনি আমাকে ফোন করলো। ও ভীষণ ভেঙে পড়েছে। বললো, ওর বরের লিভার ক্যানসার ধরা পড়েছে।

আমি ওর সঙ্গে তারপর থেকে আগের বন্ধুত্বটা ঝালিয়ে নিলাম। আমাদের রোজই নানা রকম কথা হয়। আমি নিজের মনের দুর্বলতা প্রকাশ করি না। বন্ধু হিসাবেই মরাল সাপোর্ট দিতাম। মাঝে মাঝেই দেখা হতো আমাদের।

রিনিই প্রথম আমাকে কাছে টানলো। ওর মধ্যে আবার আগেকার প্রেম ফিরে এল। আমিও নিজেকে হারিয়ে ফেললাম। এদিকে ওর বরের তখন লাস্ট স্টেজ। কলকাতার বড় এক প্রাইভেট হসপিটালে কেমো চলছে। রিনি একবার মুম্বাইয়ের টাটা মেমোরিয়াল যেতে চায়। আমি সঙ্গে সঙ্গে ছুটি ম্যানেজ করে রিনির সঙ্গে মুম্বাই গেলাম। ওর বর আমাকে রিনির বন্ধু হিসাবে তাদের সঙ্গে মেনে নিল। তাছাড়া তখন ওদের একজন সাহায্যকারীরও বিশেষ প্রয়োজন ছিল।

মুম্বাইয়ে যাওয়ার পর, ওখানেই সব শেষ হয়ে গেল। ওর বর মারা গেল। বিধ্বস্ত রিনিকে কোনওরকমে বাড়ি ফিরিয়ে আনলাম। রিনি একেবারে ভেঙেচুরে গেছিলো।

আগেকার অহংকারী রিনি কোথায় হারিয়ে গেছে! ও কেমন যেন নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছিল। আমাকে ও বিয়ের কথা বললো। এই প্ল্যান আমার আগেই করা ছিল। আমি ববিতাকে দুশ্চরিত্র প্রমাণ করে খোরপোশ দেব না বলেই, চ্যাট বক্সে খারাপ কমেন্ট করতাম। খুন করিনি আমি। আমি কিছুই জানি না। আর কিচ্ছু আমি জানি না। আমি আর পারছি না। এবার আপনাদের যা করার করুন! আমাকে মুক্তি দিন!

-মুক্তি এত সহজে আপনি পাবেন না। বলুন! কী করে বউকে খুন করলেন বলুন?

না, আমি খুন করিনি। একজন অন্য লোক এসেছিল। এই সুরজিতের রক্তের গ্রুপ এবি পজিটিভ! আপনি পরীক্ষা করে দেখুন, ওর রক্তই আছে দরজার কাছে। ও-ই খুন করেছে ববিতাকে।

-মিথ্যে কথা! রাগের মাথায় আপনি আপনার স্ত্রীকে খুন করেছেন! কেবল খুন নয়, খুনের আগে ধর্ষনও করেছেন।

এবার তাহলে সুরজিতই বাকিটা বলে ফেলুন! আমার মনে হয়, তাতেই আমরা কেসের এন্ড পয়েন্টে চলে আসবো।

-''আমি মোটামুটি নিশ্চিত হয়ে গেছিলাম যে ববিতার বর রিনি মিত্রর সঙ্গে সময় কাটান। একদিন সে প্রমাণও দিলাম ববিতাকে। অনেকদিন ধরেই ওর কাছ থেকে খবরটা চেপে রেখেছিলাম আর সহ্য হচ্ছিল না। ববিতাকে আমি ভালোবেসে ফেলেছিলাম। কিন্তু ভালোবেসে ফেলার মতো কিছুই ওর ছিল না। না রূপ, না মেধা, না গুণ! ও ছিল বড়ো বেশি সাধারণ। তবে ওর অসহায়তা আর সারল্যই আমাকে ওর দিকে টেনে নিয়ে এসেছিল। ভালোবাসা কোনও হিসেব করে না।

সেদিন দুপুরে আমি ববিতার সঙ্গে মিলিত হয়েছিলাম। এতদিন আমাদের কোনও শারীরিক সম্পর্ক ছিল না। আমরা কেবল বন্ধুই ছিলাম। ববিতার কান্না হঠাৎ আমাকে কেমন খেপিয়ে তুলেছিল। একটা অন্ধ রাগ হচ্ছিল। মেয়েটাকে বুকের উপর টেনে নিয়েছিলাম। তারপর বেখেয়ালে দুজনে দুজনকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরলাম। তারপর আমি আর কিছু জানি না। একটা প্রবল ঝড়ের আবেগে যেন ভেসে গেলাম আমরা দুজন। হঠাৎ দরজার সামনে থেকে কে যেন ছায়ার মতো সরে গেল, দেখতে পেলাম। আমি ব্যাপারটাকে পাত্তা দিলাম না। আসলে তখন মনে হয়, ডুপ্লিকেট চাবি ঘুরিয়ে ঘরে ঢুকে আমাদের অসতর্ক মুহূর্তে দেখে ফেলেছিলেন মাস্টারমশাই।

আমি বেরিয়ে যাওয়ার জন্য দরজার দিকে পা বাড়াতেই একটা প্রবল জোরে আঘাত পেলাম মাথায়। ববিতা চমকে চেঁচিয়ে উঠলো। আমার মাথা থেকে রক্ত পড়তে লাগলো। তাকিয়ে দেখলাম আমার সামনে লোহার একটা রড হাতে দাঁড়িয়ে আছে রজতবাবু। মার খেয়ে সেদিন একটাও কথা না বলে আমি ওখান থেকে বেরিয়ে এলাম। তবে ভীষণ দুশ্চিন্তা হচ্ছিল ববিতাকে নিয়ে।

পরেরদিন কাগজে ববিতার খুনের খবর পেলাম আমি। তারপর সোজা থানায় গিয়ে আপনার সঙ্গে যোগাযোগ করি। সব কথাই খুলে বলেছিলাম আপনাকে। আপনি আমার কথা শুনে একটা লাল আর সবুজ আলো জ্বলা বাচ্চাদের খেলনা মোবাইল নিয়ে এখানে এলেন। আপনাকে বললেন এটা বিবেক যন্ত্র, এবং হঠাৎ রিনির কথা বলে রজতবাবুকে ভয়ানক চমকে দিলেন। রজতবাবু ফ্ল্যাট থেকে সেদিন বেরই হননি। কেবল এক ফ্লোর থেকে অন্য ফ্লোরে গেছিলেন। যে ফ্লোরে রিনির ফ্ল্যাট ছিল, সারাদিন উনি সেখানেই ছিলেন। তাই দুপুরের দিকের সিসিটিভির ফুটেজে তাকে পাওয়া যায়নি।

তবে স্যার! আপনার বিবেক যন্ত্রের আইডিয়াটা কিন্তু ব্যাপক! অবশ্য এমন একটা করে যন্ত্র কিন্তু আমাদের সবার মনের ভেতরেই আছে। কোনটা সত্যি আর কোনটা মিথ্যে তা নিজের বিবেকের থেকে ভালো আর কে জানে! তাহলে কি আইপিসিসি তিনশো চার ধারায় রাগের মাথায় খুনের অপরাধে রজত বসুকে গ্রেফতার করা হবে?''


                        ৭

উফ! কী ভয়ানক স্বপ্ন! কোথায় কে? বাদল সরকার কোথায়? কোথায় বা সুরজিত আর বিবেক যন্ত্র? তাহলে এতক্ষণ দুঃস্বপ্ন দেখছিলাম? তাই হবে। তাছাড়া অমন যন্ত্র আবার সত্যি সত্যি হয় নাকি? মনে পড়েছে, ববিতার ফেসবুক অ্যাকাউন্ট ঘাটতে ঘাটতে যাদবপুরের এই ছেলেটাকে পেয়েছিলাম। অ্যাকাউন্টে ব্র্যাডপিটের ছবি। ডিটেলস থেকে ইউনিভার্সিটি ঘুরে নাম পেয়ে গেছিলাম। আমার হাতে মাথায় জব্বর আঘাত খেয়ে বাছা আর ইউনিভার্সিটিমুখো হয়নি। খোঁজখবর করে নামও পেয়েছিলাম গতকাল। কিন্তু ছেলেটা থানায় যায়নি। যায় কখনও! তাহলে যে ও নিজেই ফেঁসে যেত! আর থানায় ইতিমধ্যে যথেষ্ট টাকা ছড়ানো হয়েছে। এখন কোনো অফিসার আর জেরা করতে আসবে না। এই ফ্ল্যাটটা এই মাসের ভেতরই ছেড়ে দিতে হবে। রিনিকে নিয়ে বারাসাতের কাছেই একটা নতুন ফ্ল্যাট কিনে থাকব। এখানে আর নয়। এখন তো আর টাকার অভাব নেই, এবার আমার স্বপ্নপূরণ হবে। সবকটা ফরেস্ট-টাইপে লাক্সারিয়াস লম্বা ট্যুর!

তবে স-স-স! দেওয়ালেরও কান আছে!


Rate this content
Log in

More bengali story from Nandita Misra

Similar bengali story from Action