Nandita Misra

Tragedy Classics Inspirational


5  

Nandita Misra

Tragedy Classics Inspirational


স্বপ্ন যাপন

স্বপ্ন যাপন

12 mins 10 12 mins 10

#Free India ভারতবর্ষের স্বাধীনতা এসেছে বহু মানুষের অনেক আত্মত্যাগ ও সংগ্রামের মধ্যে দিয়ে। স্বাধীনদেশের নাগরিক আজ তা বিস্মৃত হয়েছে। সমাজের প্রতিটি ক্ষেত্রে দুর্নীতি ও অবক্ষয়ের চিহ্ন। এত কালোর মাঝে আজকের একটি মেয়ের জীবন সংগ্রাম ও স্বাধীনতা আন্দোলন এক ফ্রেমে ধরা পড়েছে এই গল্পে।


                                                 

সাল ১৯১৯

চট্টগ্রাম ন্যাশনাল হাই স্কুলের অঙ্কের মাস্টারমশাই সুর্যসেন ক্লাস টেনের অঙ্কের ক্লাস নিতে এসেছেন। চেহারা তাঁর অতি সাধারণ। খর্বাকৃতি ও শীর্ণদেহে দেখার মত কেবল তাঁর দুটি চোখ। সে চোখ শান্ত ও সমাহিত। দেখলেই মনে হয় যেন এক ধ্যানমগ্ন ঋষি। অসাধারণ আন্তরিক ব্যবহার ও সেইসঙ্গে অঙ্কের গভীর জ্ঞানের জন্য তিনি সব ছাত্রের কাছে বিশেষ প্রিয়। তাদের প্রিয় স্যার সকলের কাছে মাস্টারদা নামে পরিচিত।

স্কুলের শিক্ষকতায় অতি সামান্য বেতনে সংসার চালানো শক্ত বলে সূর্য সেন স্কুলের সময়টুকু ছাড়া বাকি সময় অনেক টিউশানি করেন। সমস্ত চট্টগ্রামে সূর্য সেন মোটামুটি পরিচিত একটি নাম। কেবল শিক্ষক হিসেবে নয়, একজন অমায়িক এবং উপকারী মানুষ হিসেবেও তিনি বিখ্যাত। গরীব ছাত্রদের কাছ থেকে মাস্টারদা কোনো বেতন নেন না।

ক্লাসে আসতেই মেধাবী ছাত্র সুকুমার তাঁর কাছে একটা আর্জি নিয়ে এগিয়ে এল। আজ সূর্য সেনের মন ভালো নেই। মন ভালো থাকার কথাও নয়। কয়েকটা দিন আগে এক বিকেলে পাঞ্জাবের জালিয়ানওয়ালাবাগের এক ভয়ঙ্কর নরমেধ যজ্ঞ অনুষ্ঠিত হয়েছে জেনারেল ডায়ারের নেতৃত্বে। উদ্ধত ইংরেজবাহিনী সেদিন পোকা মাকড়ের মত হত্যা করেছে ভারতের শত শত নিরীহ সাধারণ মানুষ। সে কথা বৃটিশরাজ ভারতীয়দের কাছে এতদিন গোপন করেছিল। কোনো সংবাদপত্রে সেই খবর প্রকাশিত হতে দেয়া হয়নি। ঘটনার পরে প্রায় সাতদিন কেটে গেছে। এতদিন পরে সেই খবর আগুনের মত চারিদিকে ছড়িয়ে পড়েছে। খবর জানতে পেরে ভারতের সকল মানুষ শোকে রাগে দুঃখে হতবাক হয়ে গেছে। মাস্টারদার মন বিষাদে ভারাক্রান্ত। নদীনালা আর পাহাড়ের দেশ চট্টগ্রামে এই বীভৎস হত্যাকান্ডের খবর আজ সকালে এসে পৌঁছেছে। শহরের সব খবর সব সময় সঠিক সময়ে এখানে এসে পৌঁছায় না। এই ভয়াবহ সংবাদ জানার পর সূর্য সেন আজ সকালে খেতে পারেননি, স্কুলে তিনি না খেয়েই এসেছেন।

সুকুমার একটি দরখাস্ত নিয়ে এল মাস্টারদার কাছে। ছুটির দরখাস্ত। মাস্টারদা বললেন,

''ছুটি চাইছ কেন?''

''স্যার জালিয়ানওয়ালাবাগের ঘটনার প্রতিবাদ। আপনি একটু রেকমেণ্ড করে দিন। আমরা হেডস্যারের কাছে গিয়ে রোল কলের পরেই ছুটির ব্যবস্থা করব। তারপর আমাদের একটা সভা হবে, আর তাতে আপনি হবেন সভাপতি।''

মাস্টারদা দরখাস্ত দেখলেন। জালিয়ানওয়ালাবাগের নৃশংস হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদে ছাত্রদের ছুটির প্রার্থনা। সূর্যসেন দরখাস্ত থেকে মুখ তুলে চাইলেন। তিনি খুব কম কথা বলেন। মৃদুস্বরে বললেন,

''কেবল একদিনের ছুটি? আর একটা সভা? এইটুকুতেই তোমাদের দায়িত্ব শেষ? এতবড় নিন্দনীয় ঘটনার কোনো প্রতিবাদ কি এতবড় দেশের কোথাও হবে না?''

ছাত্ররা চেয়ে রইল। তাদের মুখ থেকে কোনো কথা বের হল না। সকলেরই মনে হল ঠিক, তাই তো! ইংরেজদের একটা ভয়ানক শাস্তি দেওয়া উচিৎ। কিন্তু কীভাবে?

জেনারেল ডায়ার পাঞ্জাবে সভা সমিতি নিষিদ্ধ ঘোষণা করার পর তা জনসাধারণের কাছে বিশেষ একটা প্রচার করা হল না। জনগন না জেনে তাদের বৈশাখি উৎসব পালন করতে জালিয়ানওয়ালাবাগে এক বিশাল জন সমাবেশ করল। এই বাগানের বেরনোর রাস্তাটি ছিল খুবই সরু এবং গেট ছিল মোট পাঁচটি।

নিষেধাজ্ঞা না মানায়, কোনো ঘোষণা না করে হঠাৎ এখানে ইংরেজের সেনাবাহিনী নির্বিচারে গুলি বর্ষণ করতে থাকে। এর ফলে দলে দলে মানুষ মারা যায়। মানুষের রক্তে ভিজে ওঠে জালিয়ানওয়ালাবাগের সেই মাটি। ঘটনার তীব্র নিন্দা হয় সারা ভারত জুড়ে। রবীন্দ্রনাথ তাঁর নাইট উপাধি ত্যাগ করেন। চারিদিকে শুধুই কাগুজে বিক্ষোভ, কিন্তু এত রক্ত ঝরার কোনো প্রতিবিধান হবে না? ঘটনাটা জানা গেছে বেশ কয়েকদিন পরে। ইংরেজ সামরিক অফিসাররা নৃশংস এই হত্যাকাণ্ডটিকে দেশবাসীর কাছে লুকিয়ে রেখেছিলেন। তিন চারদিন পরে খবরটা জানাজানি হতেই সারাদেশ জুড়ে তীব্র প্রতিক্রিয়া শুরু হয়েছে।


সূর্যসেন বললেন,

''একটা কথা সর্বদা মনে রাখবে। আমরা পরাধীন। পরাধীন বলেই অবজ্ঞাভরে আমাদের হত্যা করা যায়, আমাদের উপর নিষেধের পাহাড় চাপিয়ে দেওয়া যায়। আজ থেকে তোমরা তোমাদের ভাবী জীবনের স্বপ্ন ও চিন্তায় সবকিছুর উপরে একটা কথা মনে রাখবে, এই পরাধীনতার পীড়ন ও শৃঙ্খল থেকে দেশকে মুক্ত করাই তোমাদের ভবিষ্যত লক্ষ্য হওয়া উচিত।'' ছাত্ররা সবাই সমস্বরে বলে উঠল,

''মনে রাখব স্যার।''

একজন ছাত্র উঠে দাঁড়াল। নাম তার রাখাল। রাখাল দে। সে বলল,


''জীবনের ব্রত স্বাধীনতা লাভ বললেই তো হল না, এই ব্রত পালন সহজ কথা নয়। কী ভাবে এগিয়ে যাব আমরা? আমাদের না আছে অস্ত্র, না আছে কৌশল। একটি নিরস্ত্রজাতি হঠাৎ রুখে উঠলে সে তো এমন জালিয়ানওয়ালাবাগের মানুষদের মতই পোকামাকড়ের মৃত্যুই উপহার পাবে। এ অসম্ভব, মাস্টারদা!''

''তুমি যা বলছো তা তোমার জানার সীমানার ভেতরে আবদ্ধ। কি করে সম্ভব? সেটা বড়ো কথা নয়, বড়ো কথা হল এই সম্ভব করতে চাওয়ার জন্য তোমার ভেতরের আগ্রহ। আগ্রহ এবং চাওয়ার সাধনাই হল বড় কথা। কি আমরা করতে পারির চেয়েও বড় হল কি আমরা দিতে পারি? ত্যাগ করতে হবে। তারপর আমরা ইতিহাস তৈরি করব। স্বাধীনতা হল সব মানুষের জন্মগত অধিকার, সে অধিকার থেকে তাকে বঞ্চিত করে রাখা যায় না। যতদিন আমরা সকলে নিজেদের অধিকার সম্পর্কে সচেতন হতে পারব না, ততদিন এমন জালিয়ানওয়ালাবাগের বীভৎসতা, অমানুষিকতা আমাদের মনুষ্যত্ববোধকে আঘাত করে ফিরবে।''

অনেক ছাত্ররা আজ স্যারের এইসব কথা শুনতে চায় না। তারা জালিয়ানওয়ালাবাগের ঘটনার জন্য বিরাট কিছু ভাবিতও নয়। তারা চায় ছুটি, একদিনের ফাঁকি দেওয়ার একটা সুযোগ। তারা হঠাৎ অস্থির হয়ে ওঠে। একজন বলে ওঠে,

''স্যার! এবার আমাদের দেরি হয়ে যাচ্ছে। এরপর হেডস্যার আমাদের আর ছুটি দেবেন না, উনি ক্লাসে চলে যাবেন।''


সূর্যসেন ব্যস্ত হয়ে বললেন,

''বেশ বেশ আমি লিখে দিচ্ছি। তোমরা যাও।''

সবাই বেরিয়ে গেলেও সূর্য সেন একা কিছুক্ষণ ক্লাসে বসে রইলেন। তাঁর মুখ বেদনার ছায়ায় ম্লান। ইংরেজরা কি কোনো জবাব পাবে না? এই নৃশংসতার জবাব দিতে বাংলার কি ভূমিকা নেওয়া উচিৎ? কে হবে এর কাণ্ডারী? এমন সময় ঢং ঢং করে ঘন্টা বেজে উঠল। ছুটির ঘন্টা। হেড স্যার আজকে আবেদন মেনে ছুটি দিয়েছেন। তবে সভাপতির ভাষণ দিতে মাস্টার দা'কে সময় মত কোথাও পাওয়াই গেল না। বরাবর তিনি বক্তৃতা দিতে পছন্দ করেন না। তিনি বাড়ি ফিরে গেলেন। তার হৃদয় আজ বেদনা মলিন, মনের ব্যথাকে তিনি সহসা মুখের ভাষায় ব্যক্ত করতে চান না।


সূর্য সেন চট্টগ্রাম শহরে একটা বাসা ভাড়া করে থাকেন। ছুটি পেলে দেশে তার গ্রামের বাড়িতে যান। সেখানে তাঁর বড়দাদা চন্দ্রকুমার সেন সপরিবারে থাকেন, আর থাকেন সূর্যসেনের স্ত্রী পুষ্পকুন্তলা দেবী। বাসা বাড়িতে ফিরে অবসন্ন শরীরে মাস্টারদা আজ আর কিছু খেলেন না। সকালের রান্না ভাতে জল ঢেলে দিয়ে, বিছানায় শুয়ে আকাশ পাতাল ভাবতে লাগলেন।

এমন সময় তাঁর স্কুলের তিনটি ছাত্র রাখাল, সুকুমার এবং দলিল রহমান এসে উপস্থিত হল। সকলের মন খারাপ। সূর্য সেন তাদের নিয়ে কাছাকাছি কর্ণফুলী নদীর ধারে বেড়াতে এলেন। নদীর বেলাভূমি বেশ চওড়া, দিনের আলো পড়ে আসছে। মাস্টারদা সুকুমারকে গান করতে বললেন।

সুকুমার গান ধরল,

''ভারত আমার ভারত আমার!

যেখানে মানব মেলিল নেত্র,

মহিমার তুমি জন্মভূমি মা!

এশিয়ার তুমি তীর্থক্ষেত্র।''

অপূর্ব সেই গান যেন দিগন্তে মিশে যেতে লাগল। বহুদূরে নদীর ওপারে ঘন বনচ্ছায়া। এপারে জল ও আকাশ অস্তগামী সূর্যের লালিমা মেখে অপরূপা হয়ে উঠেছে।

মাস্টারদা ধ্যানমগ্ন। তাঁর ভাসা ভাসা দুটি চোখ আত্মস্থ হয়ে যেন কোন অজানার ধ্যানে মগ্ন। অনন্তবিসারী স্বপ্নভরা তাঁর দুটি চোখ।

সুকুমার হঠাৎ মাস্টারদার পায়ে হাত দিয়ে প্রণাম করল। বলল,

''আপনি আজ ক্লাসে ইঙ্গিত দিয়েছেন। কিন্তু কী আমরা ত্যাগ করবো মাস্টারদা?''

''আনন্দমঠ পড়তে দিয়েছিলাম, ওটা পড়েছিস?''

''পড়েছি মাস্টারদা।''

''ওখানে বলা আছে, জীবন সর্বস্ব ত্যাগের কথা। জীবনও তুচ্ছ, দিতে হবে ভক্তি। জীবনের অর্ঘ্যের চেয়েও ভক্তির অর্ঘ্য বড়। আজ আমরা জীবন দিয়ে জীবন পাব। এভাবেই জীবনকে সার্থক ও সফল করব। যে পথে ক্ষুধিরাম, বাঘাযতীন এগিয়েছিলেন, সে পথে আমাদেরও যেতে হবে। এই পথ কিন্তু বেহিসাবের পথ। লাভ ক্ষতির আশা করা এ পথে বৃথা।''

সন্ধ্যা নেমে এল ধীরে ধীরে। নদীর তীরে এক বুক স্বাধীনতার স্বপ্ন নিয়ে বসে রইলেন এক মাস্টারমশাই ও তাঁর তিন নিবিষ্ট ছাত্র।



২০১৯ সাল                   


টিচারস রুম থেকে ঘন্টার শব্দ স্পষ্ট শোনা যায়। ঘন্টা বাজার সঙ্গে সঙ্গেই পুপু এক মুহূর্ত দেরি না করে উঠে দাঁড়াল। সেকেণ্ড পিরিয়ডের বেল, তাকে ক্লাসে যেতে হবে। হাতের বইটা বন্ধ করে মোবাইলটাও টেবিলে রেখে দিল পুপু। মাত্র একমাস হল, সে এই পড়ানোর কাজটা পেয়েছে। পড়ানোর জন্য তার সমস্ত শরীর মন যেন উদগ্রীব হয়ে থাকে। পুপু এই স্কুলের আংশিক সময়ের শিক্ষিকা। তার এই চাকরির মেয়াদ আর কতদিন? সে জানে না। তবে চেষ্টা করে, যতদিন আছে, ততদিন কেবল নিজের কাজটুকু ভাল করে করতে। তার ক্লাসে যাবার তাড়া দেখে অ্যাসিস্টেন্ট হেডমিস্ট্রেস হাসতে হাসতে বললেন,

''কমলিকা বোসো। আরে যাবে, যাবে! অত তাড়ার কী আছে! মেয়েরাও তো ক্লাস শেষ হলে একটু ঘোরাঘুরি করতে চায়! বোঝোই তো!''


এই স্কুলের অধিকাংশ ছাত্রীরাই খুব গরীব বাড়ি থেকে এসেছে, তাদের কথাবার্তা, পোশাক দেখে, সেটা আন্দাজ করতে পারে পুপু। বেশিরভাগেরই পড়াশুনোর এতটুকু ইচ্ছেই নেই। তারাই ক্লাশের বাইরে আর করিডরে ঘোরাঘুরি করে। বই বোধহয় বাড়িতে কখনও খুলেই দেখে না। কারো বাবা ভ্যান চালায়। কারুর মা লোকের বাড়ি থালা বাসন মাজে। আবার এদের মধ্যেও কয়েকজন আছে ব্যতিক্রম। কেউ কেউ মনোযোগী হয়ে ক্লাসের পড়া শোনে। বাড়িতে পড়া দিলে, সেই পড়া করেও আনে। পুপু তাদের জন্যই ক্লাসে ছুটে যেতে চায়। সেই মনোযোগী চোখগুলোকে সে সাহায্য করতে চায় যতরকমভাবে সে পারে। কিন্তু কতদিন? জানে না পুপু। এই স্কুলে অনেক পোস্ট খালি পড়ে আছে। পড়ানোর লোক নেই। তাই পুপুর মত কয়েকজনকে স্কুল ঠিক করেছে পড়ানোর জন্য। স্কুলে তাদের বলা হয় পার্টটাইম টিচার। পুপু এবং পুপুর মত অনেকেই বেকার, তারা শিক্ষিত অথচ কর্মহীন।


এদের দিয়েই স্কুল কোনোরকমে পড়ানোর কাজ চালিয়ে নিচ্ছে। পুপুদের মাইনে খুবই কম। বলতে গেলে এই মাইনেতে একটা ভাল রান্নালোকও কাজ করে না। তবুও পুপুরা আছে, শুধু সামান্য কটা টাকার জন্য নয়, কারণটা আজকের দিনেও আশ্চর্য! তাদের পড়াতে ভাললাগে।

পুপু বাড়ির রান্না সেরে অলস দুপুরগুলো স্কুলে কাটাতে ভালবাসে। আংশিক সময়ের টিচাররা অনেকে আবার স্কুলের মেয়েদের টিউশনি করিয়েও বেশ ভাল উপার্জন করে। পুপু তা করে না। তার সময়ের বড় অভাব, বাড়িতে স্বামী, সন্তান। তাছাড়া এই মেয়েগুলোকে দেখে তার ভীষণ মায়া হয়, পুপু আগ্রহী মেয়েদের বলে,

''আমার কাছে যা পারবে না, ক্লাসের পর এসে জেনে নেবে।'' মেয়েরা বলে,

''আপনি পড়িয়ে গেলে আর বাড়ি গিয়ে মুখস্থ করতে হয় না। পড়া এখানেই তৈরি হয়ে যায়।'' স্কুলে মাত্র একমাসের মধ্যেই পুপুর বেশ জনপ্রিয়তা হয়েছে।

ক্লাসে ঢুকে বোর্ডে তারিখ লিখতে গিয়েই পুপু চমকে উঠল। আজ ১৩ই এপ্রিল ২০১৯ সাল! সে ক্লাশের দিকে তাকলো। ক্লাস সেভেন বি। এখানে তাকে অঙ্ক করাতে পাঠানো হয়েছে। যখন যেখানে অভাব পুপুকে সেখানেই পাঠিয়ে দেন অ্যাসিস্টেন্ট হেডমিস্ট্রেস। পুপু দেখেছে শিক্ষিকাদের অনেকেরই পড়ানোর তাগিদ নেই তার মত। স্টাফরুমে বসে কেবল শাড়ি আর খাওয়াদাওয়ার গল্পে মত্ত থাকে সবাই। অবশ্য ব্যতিক্রম যে নেই, তা নয়।


পুপুদের মত আংশিক সময়ের টিচারদের বসার জায়গা আলাদা। স্কুলের স্থায়ী শিক্ষিকারা চা পায়। পুপুদের ভাগ্যে সেটাও জোটে না। ক্লাস নিতে নিতে গলা শুকিয়ে গেলে খুব চা খেতে ইচ্ছে করে পুপুর। সে মনকে বোঝায়, 'সময় মত যখন চাকরি জোটেনি তোমার, তেমন এই চা-ও জুটবে না।'

যেসব টিচার মিড ডে মিলের রান্নার তদারকিতে থাকে, তাদের ক্লাশগুলোও পুপুই নেয়। তার বিষয় অনুযায়ী নেওয়ার কথা লাইফ সায়ন্স। কিন্তু পুপুর আগ্রহ দেখে, তাকে দিয়ে ইচ্ছেমত কাজ করিয়ে নেওয়া হয়। তার পাশ সাবজেক্টে কেমিস্ট্রি ছিল বলে ফিজিক্যাল সায়ন্স আর ছোটোদের ক্লাসের অঙ্ক, এমনকী ভালো পারে বলে বাংলার ক্লাসেও পাঠানো হয় তাকে। তাছাড়া তার বিষয় জীবনবিজ্ঞান এর ক্লাস তো আছেই। আজ অঙ্কের টিচার এসেছেন, কিন্তু তার ভয়ানক সর্দি হয়েছে, অতএব পুপুকে সেই ক্লাসে পাঠানো হয়েছে।


পুপু বলল,

''আজ থেকে ঠিক একশো বছর আগে এক ভয়ানক অবিচার হয়েছিল ভারতবর্ষের মানুষদের প্রতি। তোমরা কি কেউ বলতে পারবে, ১৯১৯ সালের ১৩ই এপ্রিল কি ঘটেছিল? আজ থেকে ঠিক এক বছর আগে?''

গোটা ক্লাস চুপ করে চেয়ে থাকে, তবে সবার চোখে একধরণের কৌতূহল দেখতে পেল পুপু। সে বলে,

''ঠিক আছে তাড়াতাড়ি অঙ্ক করে নাও। তারপর তোমাদের গল্প বলবো।'' মেয়েরা সকলে গলা মিলিয়ে বলে,

''না দিদি আগে গল্প, গল্প বলুন!''

পুপু হাসে। এক মুহূর্ত ভেবে নেয়। ভাবে, ঠিকই তো ইংরেজদের এই অবিচারের কথা বলা উচিৎ ছোটদের। সবার জানা উচিৎ।


পাঞ্জাবের অমৃতসরে জালিয়ানওয়ালাবাগ নামে একটি বাগানে এইদিন নিরীহ নিরস্ত্র শত শত মানুষদের হত্যা করা হয়েছিল। ইংরেজ সেনাবাহিনীর অধিনায়ক জেনারেল ডায়ারের নেতৃত্বে এই হত্যাকাণ্ড ঘটেছিল। ইংরেজরা ঘটনাটি ঠিক হয়নি, বলে ভারতের বুকে প্রচার করলেও সেই লজ্জাজনক ঘটনার নায়ক ডায়ার দেশে ফিরে এলে তাঁকে মানপত্র ও অর্থ পুরস্কার দিয়ে বরণ করে নেওয়া হয়। তবে আজ সমগ্র বিশ্ব ডায়ারকে একজন নৃশংস হত্যাকারী এবং কলঙ্কিত মানুষ হিসেবে চিহ্নিত করেছে।''

কথার মাঝখানে পুপুর চোখ চলে যায় শেষ বেঞ্চের দিকে। ওখানে তপতী ঘুমাচ্ছে। তপতী? অবাক হয়ে যায় পুপু। তপতী এই ক্লাসের খুবই মনোযোগী ছাত্রী, এমন অসময়ে ঘুমাচ্ছে কেন ও? সে চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ায় তারপর ক্লাসের শেষ প্রান্তে গিয়ে তপতীর পিঠে হাত রাখে।

''কী হয়েছে?'' চমকে জেগে ওঠে মেয়েটা।

''যাও চোখে মুখে জল দিয়ে এসো। ক্লাসে বসে ঘুমাতে নেই জানো না?''

মেয়েটা বিশ্রীভাবে দুলে দুলে হাঁটতে হাঁটতে বেরিয়ে যায়। মুখে জল দিয়ে ফিরে আসে। একইভাবে দুলে দুলে হাঁটতে থাকে।

''কী হয়েছে তোমার?''

পুপুর সহানুভূতি পেয়ে মেয়েটা হঠাৎ কেঁদে ওঠে। কাঁদতেই থাকে। পুপু মেয়েটাকে বুকে জড়িয়ে ধরে। তার ষষ্ঠ ইন্দ্রিয় বলছে কিছু একটা ভয়ানক সমস্যা হয়েছে।

''মা আমাকে কাজে পাঠিয়ে দেয়। আমার ওই কাজ ভাল লাগে না। কিন্তু যে কাকুর সঙ্গে যাই, তিনি স্কুলের সেক্রেটারী, তাই কিছু বলতে পারি না। না গেলে আমাকে স্কুল থেকে তাড়িয়ে দেবেন উনি।''


তপতীরা নিরন্ন গরীব। ওর মা কয়েক বাড়ি থালা বাসন মাজে। বাবা নেই। ওর একটা বোন আছে। সে নীচু ক্লাসে এই স্কুলেই পড়ে। তপতী দেখতে খুব সুন্দর। চেহারাও বাড়ন্ত ধরণের। ওর মা স্কুলের সেক্রেটারির বাড়িতে কাজ করে। পুপু বলে,

''তুমি কী কাজ করো?''

মেয়েটা কিছু বলে না। পায়ের নখ দিয়ে মেঝেতে আঁকিবুকি কাটে।

''বলো? কোথায় গেছিলে তুমি?'' সে মেয়েটাকে নিয়ে ক্লাসের বাইরে করিডরে আসে।

''আমাকে কাকু দীঘায় নিয়ে গেছিল। ওখানে কাকুর সঙ্গে গেলে প্রতিবার একটা খুব বড় হোটেলে থাকি আমরা। মানে কাকু আর আমি। খুব বড় বাথরুম, চারদিকে আয়না লাগানো। কাকু আমাকে অনেক কিছু খাওয়ায়। কিন্তু ওখানে কাকু আমার সঙ্গে খারাপ কাজ করে। আমার খুব লাগে দিদি! কাকু আমার অনেক ছবিও তোলে ওখানে। টাকাও তো দেয় প্রতিবারেই, আবার সাজার জিনিসও কিনে দেয়, কিন্তু আমার ভাল লাগে না। দীঘায় গেলে ফেরার পর থেকে আমার খুব ঘুম পায়। ভাল করে হাঁটতেও পারি না, অনেকদিন।''

পুপু কী বলবে ভেবে পায় না। বলে,

যাও কেন ওখানে? মা সব জানে?

''জানে। মা-ই তো আমাকে পাঠায়। না গেলে মা মেরে পিঠের ছাল তুলে দেয়।''

পুপু আর ক্লাস নিতে পারে না। তার গলার কাছে কী যেন দলা পাকিয়ে ওঠে। সে হঠাৎ কিছু ভেবে পায় না। কেবল তার খুব কান্না পায়। এখন তপতীকে নিয়ে কী করবে সে? কিন্তু মেয়েটা তার সাহায্য চেয়েছে। এতটুকু একটা কিশেরী মেয়ে! রোগা ফিরফিরে। হাড়গুলো জেগে আছে পিঠের উপর! ক্রন্দনরত তপতীর পিঠে হাত রেখে পুপু বলে তুমি একদম কাঁদবে না। আমি দেখছি। ক্লাসের মেয়েদের বলে,

''তপতীর একটা সমস্যা হয়েছে। তোমরা বোসো। আমি ওকে নিয়ে বড়দির ঘরে যাচ্ছি।''

ঘটনাটা জানে কেবল পুপু, বড়দি আর তপতী। মেয়েটার ফোনেও সেক্রেটারির সঙ্গে মেয়েটার কয়েকটা ঘনিষ্ঠ মুহূর্তের ছবি আছে সমুদ্রের পটভূমিতে। পুপুকে দেখায় মেয়েটা। পুপু বলে

''তুমি স্কুলে ফোন নিয়ে এসেছো?''

''হ্যাঁ। অনেকেই আনে। আমি রোজ আনি, ফোন লুকিয়ে রাখি।''


থানায় ফোন করা হল। বিষয়টা স্পর্শ কাতর। স্কুলের সেক্রেটারি বিশিষ্ট মানুষ। ওয়ার্ড কাউন্সিলর। এবং শাসকদলের বিশেষ ঘনিষ্ঠ। তপতীর মাকেও ডেকে পাঠানো হল। কিছুক্ষণের মধ্যেই কাউন্সিলার বাইক নিয়ে স্কুলে ছুটে এলেন।

বড়দির দিকে তাকালেন, ওঁর চোখদুটো লাল। বড়দিকে বললেন,

''আপনি পুলিশ ডাকার আগে, আমাকে একবার জানালেনও না? কী এক ফাউয়ের টিচার বানিয়ে বানিয়ে কীসব বলল, আর সেই শুনে আপনি পুলিশ ফুলিশ ডেকে আনলেন?''

পুপুর দিকে সেক্রেটারি বিষাক্ত দৃষ্টিত তাকালেন। অবজ্ঞা ভরা গলায় বললেন,

''আপনি করিয়েছেন এইসব? কেন? আমার স্কুল থেকেই তো মাইনে পান আপনি। এরপর চাকরিটাই তো আপনার থাকবে না, কমলিকা দেবী! তখন বিদ্রোহ করবেন কেমন করে? যান যান ফুটুন এখান থেকে! কাল থেকে আর আসবেন না এখানে। আমি আপনাকে এখানে আর এক মুহূর্তও দেখতে চাই না।

পুলিশ অফিসারের ঘাড়ে হাত রাখলেন সেক্রেটারি গগন মিত্র।

''আরে! অফিসার! আপনি বেমক্কা কেন ছুটে এলেন? আমাকে একবার ডাকলেই তো হত। পেটি কেস। মেয়েটার আমার উপর অভিমান হয়েছে। একটা দামি জামা চেয়েছিল কিনে দিইনি। তাই ওসব বলেছে। ও তো ছোটো থেকে আমার বাড়িতেই মানুষ। আমাকে কাকু বলে ডাকে।''

পুপু তপতীর মোবাইলটা এগিয়ে দিল। ছবিগুলোতে চোখ বুলিয়ে হা হা করে হেসে উঠল গগনবাবু।

''ফুঃ! এই ছবি দেখিয়ে আমার বিরুদ্ধে কেস করবেন! যান যান এখনও দাঁড়িয়ে আছেন? ও তো আমার মেয়ের মত। বাপ মেয়ে মিলে আমরা একটু মজা করেছিলাম সেদিন।'' তপতী গুনগুন করে কী একটা বলতে যায়---- গগনবাবু বলে ওঠেন,


''চোপ! একদম চুপ করে থাকবি তুই। এইটুকু মেয়ে! আবার পাকামি শিখেছিস!''

পুপু আস্তে আস্তে স্কুল চত্বরের বাইরে আসে। কাল থেকে তার কাজটা আর থাকল না। সে দেখতে পেল তপতীকেও বাড়ি নিয়ে যাচ্ছে ওরা। তপতীর মা গগনবাবুর বাইকের পেছনে উঠে বসেছে। মুখে চোখে গনগনে রাগ। মনে হয় মেয়েটাকে বাড়ি নিয়ে গিয়ে, ওরা সবাইমিলে খুব মারবে। হয়তো স্কুলেও আসতে দেবে না। পুপু দেখতে পেল, গগনবাবু তপতীর গালে ভীষণ জোরে সপাটে একটা চড় মারল।


''এখানে এসে শালা ঢ্যামনামি দেখাচ্ছিলি!''

পুপুর মনে হল চড়টা ওরই গালে এসে লাগল। বাড়ি ফিরে এল পুপু। দুপুরে কখন কাঁদতে কাঁদতে ঘুমিয়ে পড়েছিল পুপু। স্বপ্নে একজন খর্বকায় ব্যক্তিকে দেখল পুপু। তাঁর চোখদুটো স্বপ্নমাখা আর ভাসা ভাসা। বললেন,


''পুপু! আমি মাস্টারদা! আজ ১৩ই এপ্রিল। আজ থেকে একশো বছর আগে আমিও এই দিনের একটা ঘটনায় চোখের জলে প্রতিজ্ঞা করেছিলাম, দেশ স্বাধীন করবো। পারিনি, তবে আমৃত্যু কিন্তু চেষ্টা করেছিলাম। চট্টগ্রাম অস্ত্রাগার লুন্ঠনকে অনেকে ডাকাতির ঘটনা বলে ছোটো করতে চায়। কিন্তু তাতে আমার উদ্দেশ্য ব্যর্থ হয়ে যায় না। আমি ফাঁসিতে ঝোলানোর আগে পর্যন্ত জেলের রাজবন্দীদের উদ্দেশ্যে আমার ভবিষ্যৎ কর্মপন্থা বলে যেতে চেয়েছিলাম। যদি পরে কেউ এগিয়ে আসে! কারুর মধ্যে এতটুকু আগ্রহ তৈরি হয়! সবটা বলার আগেই জেলের গার্ডরা আমার গলা টিপে ধরেছিল। আমাকে আর তারকেশ্বরকে একইদিনে ফাঁসিকাঠে ঝোলানো হয়েছিল। একেবারে না বলে কয়ে, একদিন ভোর রাতে হঠাৎ এসে আমাকে ফাঁসির মঞ্চে নিয়ে গেছিল ওরা। তবে আমরা ব্যর্থ হয়নি। আমাদের একই আদর্শে দেশ স্বাধীন করেছিল রাসবিহারী ও সুভাষরা। তুমিও শপথ নাও। অসত্য, লোভ ও দুর্নীতির পরাধীনতায় দেশ ভরে উঠেছে এখন, তাদের বিরুদ্ধে জয়ের শপথ। অসতো মা সদগময়। তমসো মা জ্যোতির্গময়। আমার বিশ্বাস তুমি পারবে।''

।।।।।।।।।।।।।।।।।।।।।।।।।।।।।।।।।।।।।।।।।।।।।।।।।।।।।।।।।।।।।।।।।।।।।।


Rate this content
Log in