Click Here. Romance Combo up for Grabs to Read while it Rains!
Click Here. Romance Combo up for Grabs to Read while it Rains!

Sanghamitra Roychowdhury

Abstract Romance Tragedy


4.3  

Sanghamitra Roychowdhury

Abstract Romance Tragedy


আদান-প্রদান

আদান-প্রদান

9 mins 1.1K 9 mins 1.1K


মহালয়ার ভোরে অমৃতার মা ভারি নস্টালজিক হয়ে পড়েন। টিভিতে মহালয়া শুনে তাঁর ঠিক মন ভরেনা। রেডিওই চাই... বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্রের গলায় চণ্ডীপাঠ না শুনলে ভদ্রমহিলার যেন পিতৃপক্ষের অবসান হয়ে মাতৃপক্ষ শুরু হয়না। অমৃতা ভাবছিলো চোখ বুজে বসে-বসে। গাড়িটা ঘ্যাঁচ করে শব্দ করে ব্রেক কষে দাঁড়িয়ে পড়তেই অমৃতা চোখ মেলে তাকালো। মনেহয় অ্যাক্সিডেন্ট। ঝাপসা চোখে তাকিয়ে গাড়ির কাঁচের ভেতর থেকেই দেখে বুঝতে চাইলো। ঠিক বোঝা যাচ্ছেনা। সামনে গাড়ির লম্বা সারি। এখনো লকডাউন চলছে সরকারি নির্দেশিকা মেনে, নির্দিষ্ট দিনে-দিনে। অমৃতার ড্রাইভার রবি গাড়ি থেকে নেমে দেখতে গেলো। অমৃতা আবার চোখ বুজলো। এই গাড়ির ভিড়ে উপচানো শহুরে জঙ্গলে তাকিয়ে থাকতে ইচ্ছে করছেনা তার। আবার নিজের ভাবনায় ডুবে গেলো। ইদানিং মায়ের কোনো কথাই অমৃতার সহ্য হয়না। সামান্য বিষয় নিয়েও তুমুল কথা কাটাকাটি, অশান্তির চূড়ান্ত হয়। মা'কে কতবার মনেমনে অমৃতা 'স্বার্থপর আর মানিয়ে চলার ক্ষমতা নেই' বলে কটুকথা বলেছে। পরে অবশ্য শুধরে নিতে চেষ্টা করেছে... ভাগ্যিস মুখে কিছু বলে ফেলেনি। যতই হোক... মাতো অমৃতাকে বুকে করেই এতোলম্বা জীবনটা পার করেছে। পৃথিবীর ঘনিষ্ঠতম সম্পর্ক... মা-মেয়ের সম্পর্ক। অথচ সেখানেও মাঝেমাঝে ধুলো জমে, জং পড়ে, ফাটল ধরে। কিন্তু এগুলো এড়িয়ে চলা কি খুবই কঠিন? জানেনা অমৃতা। তবে আজ এইমুহূর্তে বুঝতে পারছে অমৃতা যে, মানুষে মানুষে সম্পর্কগুলো মাটির বাসনকোসন জিনিসপত্রের মতো। যত্নে ব্যবহার করলেই আজীবন টিকে যায়।


হ্যাঁ, অমৃতা ঠিকই অনুমান করেছিলো। অ্যাকসিডেন্ট হয়েছে সামনে। একটি উচ্চগতির আধুনিক দামি গাড়ি এক হতভাগ্য ফুটপাতবাসীকে পিষে দিয়ে উল্কার বেগে চলে গেছে। মানুষটি বোধহয় সরকারি আশ্রয়ে থাকার ব্যবস্থা করতে পারেনি। অথবা হয়তো থাকতে যায়নি। কতরকমের চিন্তাভাবনা থাকে মানুষের। যেমন অমৃতার মায়ের আছে গতানুগতিক পথের বাইরে দিয়ে চলা চিন্তাভাবনা। কব্জি উল্টে ঘড়ি দেখল মেয়েটা। রাত সাড়ে বারোটা। এই ঘড়িটা মা কিনে দিয়েছিলো অমৃতাকে, দিল্লি ইউনিভার্সিটিতে পিএইচডি অ্যাডমিশনের পরে। সেওতো আজ কতবছর হয়ে গেল। তবুও যখন নার্সিংহোম থেকে ফোনটা এসেছিলো দুপুরে খেতে বসার সময়, তখন কী এক অব্যক্ত যন্ত্রণাসিক্ত মনে টেবিলের ওপর থেকে হাত বাড়িয়ে এই এইচএমটি গঙ্গা ঘড়িটা নিয়েই সাততাড়াতাড়ি কব্জিতে বেঁধে ফেলেছিল অমৃতা। গোল্ড প্লেটিং-এর রঙটা চটে গেছে, লেদার ব্যাণ্ডটাও ছাল-চামড়া উঠে জীর্ণ-শীর্ণ। যেকোনো মূহুর্তে ছিঁড়বে। তবুও কী এক অমোঘ আকর্ষণে আজ অমৃতার হাতে এই ঘড়িটাই উঠে এলো। একটা বেশ দামি ঘড়ি কিনেছে অমৃতা কিছুদিন আগে, চাবি-টাবি দেওয়ার ঝঞ্ঝাট ঝামেলা নেই। মা নতুন ঘড়িটা হাতে নিয়ে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেখে অদ্ভুতভাবে বলেছিলো, "জিনিস পুরোনো হলেই বাতিলের দলে, নাকি বল মিতু?" অমৃতা বিরক্ত হয়েছিলো মনেমনে, "সবসময় ট্যারাব্যাঁকা কথা!" মুখে অবশ্য কিছু বলেনি ভ্রূ-জোড়া কুঁচকানো ছাড়া। মাও আরকিছু বলেনি এই নিয়ে। তবে মনে করে ঠিক প্রতিদিন চাবি দিয়ে রাখতো পুরোনো ঘড়িটায়। চালু রাখতে। রোজ সকাল সাতটায়। অমৃতা আবার ঘড়ি দেখলো। অনড় একটা জ্যাম এতো রাতেও। অবশ্য এর সবটাই ওই অ্যাক্সিডেন্টটার জন্যই। শরীরটা ক্লান্তিতে ভেঙেচুরে আসছে অমৃতার। রাত দেড়টা। সেই দক্ষিণ থেকে উত্তরে... আসতে এতোটা সময়। দুপুরে একটায় বেরিয়েছে বাড়ি থেকে। প্রায় সাড়ে বারোঘন্টা পরে বাড়িতে এসে ঢুকলো অমৃতা। রবি গাড়িটা গ্যারেজে তোলার আগে জিজ্ঞেস করলো, "দিদি, খাবারদাবার আছেতো? আসলে আগে খেয়াল পড়েনি।" অমৃতা ঘাড় নাড়লো, অর্থাৎ আছে। আস্তেআস্তে বললো, "তুমি এবারে বাড়ি গিয়ে বিশ্রাম নাও। দরকার পড়লে কালকে ফোন করবো।" রবি চলে গেলো। কাছেই বাড়ি। হেঁটেই চলে যাবে। অমৃতা তালা খুলতে-খুলতে ভাবলো, "এতোক্ষণ তো তবু সঙ্গে রবিটা ছিলো। এবারে? একদম একলা আমি!" এই ক'দিন তো রাতে অমৃতা বাড়িতে একলাই রয়েছে, তবুও এমন অসহায় বোধ তো হয়নি।" অনেকক্ষণ ধরে স্নান করে এসে বারান্দায় বসলো অমৃতা বেতের চেয়ারটায়। এই চেয়ারটাও মা কারুশিল্প মেলা থেকে একরকম জোর করেই কিনে এনেছিলো। অমৃতার বারণ শোনেনি। অমৃতা ঘাড় কাত করে গুমরে কেঁদে উঠলো চেয়ারটা জড়িয়ে... মায়ের গায়ের ওমটা যেন এখনো লেগে আছে চেয়ারটায়। কঁকিয়ে উঠলো অমৃতা। মধ্যরাতের শহর এখন গভীর ঘুমে মগ্ন। আর অমৃতা চেয়ারে নির্জীব হয়ে বসে আছে।

রাত সাড়ে নটা... কেওড়াতলা মহাশ্মশান চত্বর। তুমুল হৈচৈ হট্টগোল আর চিৎকার চেঁচামেচিতে সরগরম। রীতিমতো অশান্ত পরিবেশ। তবে এইসব কিছু মৃতব্যক্তিদের আত্মীয়-বন্ধু পরিবারবর্গদের প্রকট শোকপ্রকাশের স্বাভাবিক চিৎকার চেঁচামেচি নয়। এই অশান্তি মহাশ্মশান কর্তৃপক্ষের সঙ্গে মৃতদের ক্ষুব্ধ আত্মীয়-পরিজনদের ঝগড়াঝাঁটির। আপাতত এই করোনাকালে নাকি দাহকার্য বন্ধ রয়েছে এই মহাশ্মশানে। ডোমেদের নাকি দাহকার্যে আপত্তি। বেশ কিছুদিন যাবতই নাকি বিস্তর ঝঞ্ঝাট ঝামেলা চলছিলো। অমৃতা জানতোনা। আসলে গত পনেরোটা দিন ধরে অমৃতাকে বিরাট দৌড়ঝাঁপ করতে হচ্ছিলো। সিভিয়ার হার্ট অ্যাটাকে মা'কে হাসপাতালে ভর্তি করার পরে একবিন্দুও সময় পাচ্ছিলোনা অমৃতা। দুশ্চিন্তা আর ধকলে ক্লান্ত অমৃতা কোনো খবরই রাখেনি এতোদিন। রবি একটু আগেই ভিড়ের মধ্যে ঠেলে-গুঁতিয়ে কোনোরকমে এই খবরটুকু নিয়ে এসেছে যে সিরিটি, রাজপুর, নিমতলা... সব শ্মশানেই নাকি একই অবস্থা। "দিদি, এখন কী করা যায় বলুনতো? এখন এই বডি নিয়ে কোথায়ইবা দৌড়োদৌড়ি করা যায়? আর কোথায়ইবা একটু সাহায্য পাওয়া যায়?" অমৃতা ভাবলো, সত্যিইতো, সে একদম একা। বসন্ত বিদায় নিয়েছে জীবন থেকে কবেই। মধ্যপঞ্চাশের ফ্যাকাশে কপাল আরো বড়ো হয়েছে... পাতলা ফিনফিনে রূপোলি দাগধরা চুল কয়েকগাছি ইতস্ততঃ উড়ছে। প্রৌঢ়ত্বের গম্ভীর পদধ্বনি শোনে অমৃতা নির্ভুলভাবে। একদম একলা অমৃতা এখন কী সিদ্ধান্ত নেবে? দুপুর সাড়ে বারোটা থেকে রাত সাড়ে নটা... ন'ঘন্টা পার। চোখ চলে গেলো পিছনে দাঁড়ানো "অমর্ত্ত্যলোক যাত্রা"র কাঁচঘেরা শববাহী গাড়িটা। ভেতরে নীলচে আলোয় ধাতব স্ট্রেচারে শুয়ে আছে মা... অমৃতার মা। তবে সমাজে সর্বত্র পরিচিতি ছিলো নীতিপ্রিয়া ঘোষ নামে। অমৃতার মা কক্ষনো ব্যবহার করেনি মুখার্জি পদবী। প্রবল আত্মসম্মানবোধ থেকেই হয়তো... এখন অন্তত তাই মনে হচ্ছে অমৃতার। অমৃতার মায়ের সাথে বাবার রেজিস্ট্রি বিয়ে হয়েছিলো, সেই সূত্রেই ভালোবাসার দুর্বল মুহূর্তে অমৃতার জন্ম হয়েছিলো। চন্দ্র-সূর্যের মতো সত্য... কোনো খাদ নেই তাতে। তারপর সামাজিক অনুষ্ঠানে লোকদেখানো বিয়েটারও দরকার পড়লো। অমৃতা আসার জানান হয়েছিলো... দু'মাস। কিন্তু কী আশ্চর্য! অমৃতার বাবা পরিবারের অমতে আর সংসার গড়তে পারলোনা অমৃতার মা'কে নিয়ে। ব্রাহ্মণ কায়স্থ বিবাদে একলা হয়ে গেলো মা। এমনকি নিজের পরিবার থেকেও বিতাড়িত তখন। একলা অমৃতার মা লড়াই ছাড়েনি... অমৃতাকে জন্ম দিয়েছে, বড়ো করেছে, উচ্চশিক্ষায় শিক্ষিত করে মাথা উঁচু করে বাঁচার পাঠ শিখিয়েছে। কিন্তু অমৃতার মা কখনো তার বিয়ে দেওয়ার কোনো চেষ্টাই করেনি। মা অদ্ভুতভাবে নির্লিপ্ত গলায় বলতো, "আমি তো মিথ্যেকথা বলতে পারবো নারে। যেখানেই তোর বিয়ে দিতে যাবো, সেখানেই জানাতে হবে, তোর বাবা দু'মাসের অন্তসত্ত্বা আমাকে বেমালুম একলা নিজের হালে ছেড়ে দিয়েছিলো। কোনো দায় নেয়নি। পরিবারের কথাটা তার ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়া, রেজিস্ট্রি বিয়ে করার আগে মনে পড়েনি। অনেক প্রশ্নের ঝড় উঠবে। কেউ মেনে নেবেনা মিতু, কেউ মেনে নেয়না। তোর দাদু-দিদা মামারাই মানেনি, তো বাইরের লোক!"


রবির কথায় চমক ভাঙে অমৃতার, "দিদি, রাত দশটা বাজে। বলছিলাম কী একবার বিপুলদাকে বললে হয়না? বিপুলদাইতো এই ডিপার্টমেন্টটা দেখেন কর্পোরেশনে।" অমৃতা যেন এগারোহাজার ভোল্টের ঝটকা খেলো। অন্তত আটত্রিশ-চল্লিশ বছর পিছনে পিছিয়ে গেলো অমৃতা। মাধ্যমিক দেবে-দেবে সময়ে... বিপুলদা তখন বিএসসি অনার্স সেকেন্ড ইয়ারে। পাড়ায় সরস্বতী পুজোর দিনে চারচোখ এক হয়েছিলো অমৃতা আর বিপুলদার। তারপর কোচিং ক্লাসে যাওয়া আসার ফাঁকফোকরে ছোটছোট চিরকুট চালাচালি... একটু হাসি, একটু আড়চোখে চাওয়া, বা লুকিয়ে চিরকুট দিতে গিয়ে হাতে একটু আলগোছে ছোঁয়াছুঁয়িতে রক্তে আগুন ধরে যেতো। চলছিলো বেশ। পাড়ার এমাথায় ওমাথায় দু'জনের বাড়ি। তখন অমৃতা উচ্চ মাধ্যমিক দিয়ে কলেজে ফার্স্ট ইয়ারে, বিপুলদাও এমএসসি শেষ করে স্কুলে স্কুলে ঘুরছে... ম্যানেজিং কমিটিকে ধরাকরা করে যদি কোথাও একটা ঢুকতে পারে পড়াতে। চোখে তখন অনেক স্বপ্ন। অমৃতার চোখে সেই স্বপ্ন চালান করে দিতো ছোটছোট চিরকুটে। বিভোর হয়ে যেতো অমৃতা স্বপ্ন বুনতে-বুনতে। একদিন মায়ের হাতে পড়ে গেলো আলমারি গুছোতে গিয়ে। মা মন দিয়ে সব শুনলো। আর কিছুদিন অমৃতাকে যোগাযোগ রাখতে বারণ করলো। সাতদিনের মাথায় বুকে সাহস সঞ্চয় করে বিপুলদা অমৃতাদের বাড়িতে এসেছিলো। অমৃতার মা... রাশভারী সরকারি চাকুরে ভদ্রমহিলা। বিপুলদার কথাও শুনলো চুপচাপ। তারপর বললো, "আপাতত কিছুদিন মেলামেশা বন্ধ রাখো। আমি তোমাদের বাড়িতে কথা বলে নিই আগে।" আরো সপ্তাহ দুয়েক অমৃতা আর বিপুলদা দেখা করেনি, যোগাযোগ করেনি। দু'সপ্তাহ পরে এক নির্জন দুপুরে অমৃতা একলা বাড়িতে... মর্নিং কলেজ ওর। মা অফিসে। দুপুরে খেয়েদেয়ে উঠে জানালার পাশে একটা ম্যাগাজিন নিয়ে বসেছিলো। পড়ায় মন ছিলোনা, বিক্ষিপ্ত মনে ভাবছিলো, "মা কি বিপুলদাদের বাড়িতে গিয়ে কথা বলে এসেছে? কই কিছু বললো নাতো কী কথা হলো না হলো?" হঠাৎ ঠপাস করে এসে একটা কাগজের দলা পড়লো অমৃতার গায়ে... জানালার বাইরে থেকে। অমৃতা চট করে বাইরে তাকালো... বাঁকের আড়ালে তখনই বিপুলদার পাঞ্জাবির কোণটা হারিয়ে গেলো। দোমড়ানো মোচড়ানো কাগজটা খুলে পড়তে লাগলো অমৃতা, "মিতু, তোমার মা না তোমার শত্রু? আমাদের বাড়িতে এসে ঢাক-ঢোল পিটিয়ে নিজের নির্লজ্জ অতীতের কাহিনী না শোনালেই চলছিলো না? কে জানতে চেয়েছিলো এসব? যাচ্ছেতাই। আমার বাড়িতে আর কিছু বলবার মুখ রাখেনি তোমার মা। যাইহোক, ভালো থেকো। আর পারলে নিজের মা'কে একটু সামলে রেখো। নামেও নীতিপ্রিয়া আর কাজেও নীতিপ্রিয়া নীতিকথার গল্পমালা হলে আজকের দুনিয়ায় চলেনা। গুড বাই।" এর বছরকয়েক পরে রজনীগন্ধা আর গোলাপের মালায় সাজানো অ্যাম্বাসাডরে করে বিপুলদা সুন্দরী সদ্যবিবাহিতা নববধূকে নিয়ে স্বপ্নের সংসারে প্রবেশ করেছিলো। আর অমৃতা হারিয়ে গিয়েছিলো রাশিকৃত ভাঙা স্বপ্নের স্তুপের তলায়। আজ আবার সেই বিপুলদার কাছেই সাহায্য চাইতে হবে মায়ের দাহকার্য সম্পন্ন করার জন্য? নিয়তির কী নির্মম পরিহাস!


রবি খুব করিৎকর্মা ছেলে। একে তাকে জিজ্ঞেস করেকরে বিপুলদার ফোন নম্বর জোগাড় করে ফেলেছে। তারপর নিজেই ডায়াল করে অমৃতার হাতে দিয়েছে মোবাইলটা... রিং টোন বাজছে, "আমায় একটু জায়গা দাও মায়ের মন্দিরে বসি..." শেষ হতেই ভেসে এলো গম্ভীর স্বর, "হ্যালো, হ্যালো... কে বলছেন?" আর দেরি করা যাবেনা... লাইন কেটে দেবে কিছু না বললে... অমৃতার কাঁধে এখন মাতৃদায়। গলাটা একটু কেঁপে গেলো অমৃতার, মরিয়া হয়ে বলে, "আমি মিতু বিপুলদা... কেওড়াতলা শ্মশানে দাঁড়িয়ে আছি। মা'কে দাহ করতে পারছিনা। একটু যদি..."! অমৃতাকে বাকি কথা শেষ করতে দেয়নি বিপুলদা, "ও, আচ্ছা, আচ্ছা, কিচ্ছু চিন্তা কোরোনা। আমি এক্ষুণি আসছি..."! ফোনটা হাতে নিয়ে হতভম্বের মতো দাঁড়িয়ে রইলো অমৃতা। রবি বারবার জিজ্ঞেস করছে, "বিপুলদা কী বললেন দিদি? বিপুলদা কী বললেন দিদি?" যেন বহুযুগের ওপার থেকে ভূতগ্রস্তের মতো উত্তর দিলো অমৃতা, "আসছেন বললেন।"


বড়োজোর আধঘন্টাটাক। একটা টাটা সুমো এসে হাজির। পেছনে আরো কয়েকটা মোটরবাইক। বিপুলদা টাটা সুমো থেকে নেমে এগিয়ে এলো ভিড় ঠেলে ঘাড় উঁচিয়ে উঁচিয়ে। পরিচিত মানুষকে খুঁজে পেতে বোধহয় বিশেষ অসুবিধা হয়না... যত ভিড়ই থাকুক না কেন! বিপুলদা একধারে জড়সড় হয়ে দাঁড়িয়ে থাকা অমৃতার সামনে এসে দাঁড়ালো। অমৃতা দেখলো... কত মোটা হয়েছে বিপুলদা। এতোবড়ো একটা ভুঁড়ি, মাথাজোড়া টাক, আঙুলে ঝিকিয়ে ওঠা সারি সারি রত্নখচিত আংটি। পেছনে অনুসরণ করা এক ক্ষুদ্র বাহিনী। বিপুলদা সব বুঝিয়ে দিলো তাদের নির্দেশ দিয়ে। পরবর্তী একঘন্টায় অমৃতা চুপচাপ দাঁড়িয়ে শুধু দেখলো... আজীবন দৃঢ় মেরুদণ্ডের অধিকারিণী সততার প্রতিমূর্তি নীতিপ্রিয়া ঘোষের নশ্বর দেহ... যথাবিহিত পারলৌকিক আচারক্রিয়া পালনের পরে চারজন অপরিচিত যুবকের দ্বারা বাহিত হয়ে ঢুকে গেলো কেওড়াতলা মহাশ্মশানের ইলেকট্রিক চুল্লিতে। মালসায় মায়ের অস্থি-নাভি নিয়ে পতিতোদ্ধারিণী পবিত্র আদিগঙ্গার অন্ধকার কালচে জলে হাঁটু অবধি নেমে অমৃতা পিছন ফিরে দেখলো ঐ চার অপিরিচিত যুবক এবং বিপুলদাও নেমেছে তার সঙ্গে আদিগঙ্গার বুকে। নিজেদের মাথায় ছিটে দিচ্ছে পুণ্যসলিলা আদিগঙ্গার জলের।


"অমর্ত্ত্যলোক যাত্রা"র শববাহী গাড়ির ভাড়া চুকিয়ে, নিজের গাড়িতে ওঠার আগে কাঁপা গলায় অমৃতা দু'হাত জোড় করে বিপুলদাকে বলে, "তোমরা না এলে, আমার মাতৃদায়ই তো উদ্ধার হতোনা বিপুলদা!" অমৃতার গালদুটো ভেসে যাচ্ছে উদ্গত নোনা অশ্রুধারায়। উত্তরের অপেক্ষা না করেই গাড়িতে উঠে বসল অমৃতা। পিছনে পড়ে রইল মা, একমুঠো অহঙ্কার-পোড়া ছাই হয়ে। আর অমৃতার চোখের আড়ালে দূরে মিলিয়ে গেলো ভিড়ে থিকথিকে কেওড়াতলা মহাশ্মশান। অমৃতার ছোট্ট মারুতিকে পাশ কাটিয়ে বিপুলদার টাটা সুমো হুশ করে বেরিয়ে গেলো কেওড়াতলা মহাশ্মশান চত্বর ছেড়ে। বারান্দায় একলা বসে থাকতে-থাকতে কখন যেন অমৃতার চোখদুটো লেগে এসেছিলো। মোবাইলটা বাজছে... এতো রাতে কে? আননোন আনসেভড নাম্বার। কে হতে পারে? যেই হোক... প্রয়োজনেই ফোন করেছে নিশ্চয়ই। নইলে রাত আড়াইটের সময় কে আর শখ করে ফোন করবে?


প্রাথমিকভাবে খানিকটা দোনোমোনো করেও ফোনটা শেষপর্যন্ত তুললো অমৃতা। ওপারে সেই গমগমে স্বর, "দরজাটা এসে খুলে দাও মিতু, আমি বাইরে দাঁড়িয়ে আছি।" অমৃতা হাউহাউ করে কেঁদে ফেললো, "বিপুলদা...!" ছুটে গিয়ে দরজা খুলে দিয়ে কিশোরীর মতো ভেঙে পড়লো বিপুলদার বুকে। বিয়ের ছ'মাসের মাথায় বিপুলদার সুন্দরী বৌ তার প্রাক্তন প্রেমিকের সাথে গৃহত্যাগ করেছিলো। দুই-একবার রাস্তাঘাটে বিপুলদার সাথে দেখা হয়েছে বটে অমৃতার, কিন্তু কোনো কথা হয়নি। দু'জনেই কী এক দুস্তর সঙ্কোচে চোখ নামিয়ে নিয়েছে। তারপর যে যার মতো নিজের জগতে একলাই থেকেছে। আজ একটা মৃত্যু, একটা দুর্বিষহ সামাজিক সঙ্কট, একটা অসহায় একাকীত্বের বোধ আবার দু'জনকে এক করে মিলিয়ে দিলো। অমৃতার চোখের জলে ধীরেধীরে ধুয়ে যাচ্ছে সব গ্লানি, সব বিষাদ। বিপুলদা পরমস্নেহে অমৃতার মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছে। এতোদিনের অবরুদ্ধ ভালোবাসা, অভিমানী প্রেম... অন্তঃসলিলা ফল্গুধারার বুক চিরে বেরিয়ে এসেছে এক প্রতিশ্রুতিময় ভরসার আদান-প্রদানের পরিপূর্ণ ডালি সাজিয়ে নিয়ে।

******

দেখতে-দেখতে চারটে গোটামাস পার। গুটিগুটি শরৎকাল এসে গেছে। পরেরদিন মহালয়া। অমৃতাদের পুরোনো রেডিওটা এক চেনা দোকানে সারিয়ে ব্যাটারি লাগিয়ে এনেছে বিপুলদা। রাতেই বসেবসে রেডিওর টিউনিং করেছে বিপুলদা আর মোবাইলে অ্যালার্ম দিয়েছে ভোর চারটেয়। অমৃতা মুখে ক্রিম লাগাতে-লাগাতে সবই দেখছিলো। বিপুলদা হাসলো, "তোমার ঘুম ভাঙেতো অ্যালার্ম শুনে? আমার আজকাল ভোরবেলাটাই গাঢ় ঘুম আসে।" অমৃতা ঘাড় নেড়ে আলো নিভিয়ে দেয়। হাতড়ে-হাতড়ে মশারীটা গুঁজে দিয়ে অমৃতা বিপুলদার বুকে মুখটা রাখে, পাশ ফিরে হাত বাড়িয়ে বিপুলদা অমৃতাকে বুকে জড়িয়ে পরম শান্তিতে চোখ বোজে। ভোর চারটেয় অ্যালার্মটা বাজতেই দু'জনেই ধড়মড় করে উঠে বসে। আকাশবাণীর সেই বিখ্যাত মিউজিক বাজছে। বিপুলদা বিছানা থেকে নেমে গিয়ে রেডিওটা বুককেসের ওপরে রাখা অমৃতার মায়ের ছবিটার সামনে রাখলো। মহালয়া শুরু হয়ে গেছে... বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্রের গলায় চণ্ডীপাঠ চলছে। অমৃতার চোখ দিয়ে অঝোরধারায় ঝরা জলে দুগাল ভেসে যাচ্ছে। বিপুলদা গাঢ়স্বরে বলে, "ছিঃ মিতু, মায়ের তর্পণেই তো মায়ের তৃপ্তিসাধন। সেইসময় কি এমন করে চোখের জল ফেলতে আছে? মায়ের কষ্ট হবে তাতে।" অমৃতা মায়ের ছবিটার দিকে অপলকে তাকিয়ে রইলো... এইতো জীবনের আদান-প্রদান, ভালোয়-মন্দে, সুখে-দুঃখে, হাসি-কান্নায়, পদেপদে আপদে-বিপদে।



Rate this content
Log in

More bengali story from Sanghamitra Roychowdhury

Similar bengali story from Abstract