ভোরের সূর্য্য
ভোরের সূর্য্য
পর্ব আঠারো
- জানেন ম্যাডাম ! আমার সহোদরা বোন - যার বিয়ের জন্য আমি সর্বস্বান্ত হতেও কুন্ঠা করিনি ; দিব্যি বিধবার বেশে আমার সামনে এসে দাঁড়াল। আমি ওকে দেখেই বুঝে গেলাম শ্যামল আর নেই । গাজীর দলে ভিড়েছিল - দেরীতে হলেও জেনেছি । আমিও তো ওই দলেরই ছিলাম তবু কোনদিন ওকে সামনাসামনি বা আড়াল থেকেও দেখিনি । হয়তো অন্য কোথাও গাজী তাকে পাঠিয়েছিল ।
যাই হোক - সেই শ্যামল যখন আদালতে সাক্ষী দিল ; সমস্ত রাগ গিয়ে পড়ল আমার বোনটার উপর । খুব অভিমান হল নিজের উপরই । নাহ্ এ জগতে আমার প্রয়োজন ফুরিয়েছে। এখন বুঝতে পারছি বিধবা হয়েও কেন সে সেদিন আমাকে দেখে এক ফোঁটাও চোখের জল ফেলেনি ।
ওর এই বৈধব্য বেশ সহ্য করতে না পেরে কেঁদেছিলাম ; আর ওর সামনে দাঁড়াইনি । পালিয়ে বেঁচে ছিলাম যখন দেখলাম তার বৈভব তাকে কোনদিন কষ্ট দেবে না । শ্যামল বেঁচে আছে এবং নিয়মিত বাড়িতে যাতায়াত করে - আদালতের কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে তা অনুভব করলাম ।
রায় ঘোষণা হল । জজ সাহেব বললেন - তোমার আর কিছু বলার আছে ?
মনে মনে ভাবলাম বলার তো অনেক কিছুই ছিল স্যার । কিন্তু যে কথাগুলো আর কেউ বিশ্বাস করবে না ; ঘৃণায় সকলে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে - তেমন কথা বলে আর লাভ কি ! তার চেয়ে কৃতকর্মের ফল ভোগ করাই বাঞ্ছনীয়।
জজসাহেব আবারও বললেন - তোমার কি কিছুই বলার নেই ?
আমি বললাম - না হুজুর ।
জজসাহেব বললেন - শেষ বারের মত বলছি ; তোমার যদি কিছু বলার থাকে এখনও বলতে পার । নইলে আমাকে নিয়মানুসারে রায় ঘোষণা করতে হবে ।
আমি চুপ করে রইলাম । জজসাহেবের কথাগুলো ঘুরেফিরে কানে বাজতে লাগল ।
আমি চিৎকার করে বলে উঠলাম - আমি কোন দোষ করিনি । আমাকে ফাঁসিয়ে দেওয়া হয়েছে ।
গোটা আদালত হেসে উঠল । জজসাহেব হাতুড়ি পিটিয়ে ' কিপ সাইলেন্স প্লীজ' ' অর্ডার অর্ডার ' বলে বাধা দিতে লাগলেন । আমাকে আবার বললেন - তোমার কাছে এ বিষয়ে কোন প্রমাণ আছে ?
বুঝুন ম্যাডাম ! কেমনতর দেশ আমাদের । নিজের নির্দোষিতা নিজেকেই প্রমাণ করতে হবে । অথচ দোষী সাব্যস্ত করার জন্য পুলিশ আছে, গোয়েন্দা আছে, উকিল আছে । কিন্তু নির্দোষের কোন ক্ষমা নেই ।
জজ সাহেব বললেন - পারবে পক্ষে কোন প্রমাণ দিতে ?
আমি মাথা নাড়িয়ে বললাম - নির্দোষিতার প্রমাণপত্র কেউ পকেটে রেখে ঘোরে না হুজুর । সময় পেলে প্রমাণ জোগাড় করতে পারি । আপনি কি আমাকে কিছুদিনের জন্য মুক্তি দিতে পারবেন হুজুর ?
উল্টো কেস খেয়ে জজসাহেব বিষমচিকা খেলেন ।
উকিল বাবু একলাফে চেয়ার থেকে নেমে বিচারকের আসনের সামনে দাঁড়িয়ে তাণ্ডবনৃত্য শুরু করলেন ।
- আসামী শুধু চতুর নয় ; মহাধূর্তও বটে স্যার । একবার ছেড়ে দিলে তার টিকিটিও পাওয়া যাবে না । প্রশাসনের সমস্ত প্রচেষ্টা ধূলোয় মিশে যাবে হুজুর ।
জজসাহেব আমাকে বললেন - অবান্তর কথা বলে আদালতের সময় নষ্ট করবে না ।
তারপর কিছুক্ষণ নীরব থেকে বললেন - এবার তাহলে রায় ঘোষণা করছি ।
কোর্টময় পিনড্রপ সাইলেন্স । সকলের প্রত্যাশিত রায় ঘোষণা হয়ে গেল । মৃত্যুদণ্ড - উইল বি হ্যাঙ্গড টিল ডেথ ।
বাবার মৃত্য দৃশ্য , বিনা চিকিৎসায় মা'র প্রাণান্ত, বোনের খুশি - ইত্যাদি মনে পড়ল । নিজেকে আর ধরে রাখতে পারিনি স্যার । মাথা ঘুরে পড়ে গেলাম ।
তদন্তকারী অফিসার তাঁর দলবল নিয়ে আমাকে চ্যাঙ দোলা করে তুলে প্রিজন ভ্যানে উঠিয়ে দিলেন নিশ্চয় । আমি তো সে সব কিছুই জানি না। অজ্ঞান ছিলাম তো ! পরে নিজেকে এই কনডেমড সেলে পড়ে থাকতে দেখলাম। টাইম ধরে খাওয়া, শোয়া, ঘুমের বড়ি গিলিয়ে ঘুম পাড়ানো নিয়মিত চলল কিছুদিন ।
সময় কাটানোর জন্য শ্রীমদ্ভাগবদ্গীতা দিয়ে গেল একজন। বলল - স্নান সেরে শুদ্ধ মনে এই পবিত্র গীতা পাঠ করলে তোমার মন শান্ত হবে । নিজেকে ভগবানের দাস বলে ভাববে ।
দু'চারদিন বইটার দিকে তাকাইনি পর্য্যন্ত । বড় অসহায় লাগত । মাঝে মাঝে রক্ষীরা এসে দেখে যেত । পরে বইটাতে হাত দি । যথারীতি পড়তে থাকি ।
এখন আর নিজেকে বোরিং লাগে না । বরং ভালো লাগে পড়তে । মনটা এখন বেশ সংযত ।
কিন্তু ম্যাডাম আমি এখনও ভেবে পাই না আমার প্রিয় বোন আমার সঙ্গে কেন এমন করল ! তারপর শ্যামলই বা এমন আচরণ করল কেন ?
( চলবে )

