ভোরের সূর্য্য তেত্রিশ পর্ব
ভোরের সূর্য্য তেত্রিশ পর্ব
গাজীকে জব্দ করা ফারজানার একার পক্ষে কোনমতেই সম্ভব নয় - একথা তরুণী ফারজানা মনেপ্রাণে বুঝতে পেরেছিল । তাই সুযোগ খুঁজছিল কারও সহায়তা পাবার জন্য ।
সরস্বতীর সঙ্গে আলাপ হবার পর ফারজানা ভাবল এই মেয়েটিও তার মতই অভাগা । যার দাদা ফাঁসির আসামী এবং যার স্বামীর খোঁজ নেই - তার টাকাকড়ির অভাব না থাকলেও একটা না একটা কিছুর অভাব তো থাকবেই।
ফারজানার যেমন একজন গাজীর প্রয়োজন ছিল হয়তো সরস্বতীরও তেমন কিছু থাকতে পারে । সেই জন্য গাজীকে ডেকেছিল । কিন্তু গাজী যে গভীর জলের মাছ সে কথা সে কি করে বুঝবে ! ভেবেছিল গাজীর চরিত্র সংগত প্রয়োজন মেটাতে সরস্বতী কাজে আসবে ।
সরস্বতী কিন্তু গাজীর কাজে লেগে গিয়েছিল। বলেছিল - গাজী সাহেব অগর আপকা কোই সেফ শেল্টার নেহি মিল রহা হ্যায় তো ফারজানাকো লেকর হমারে ইয়াহা আ যাইয়ে ! হমলোগ একসাথ মিলকে কাম করেঙ্গে ।
গাজী ধূর্ত ; চতুর তো বটেই । তাই কৌশলে সেই প্রস্তাব এড়িয়ে গিয়েছিল এবং ফারজানাকে সরস্বতীর বাড়িতে ডেপুটেশনে রেখে কাজ হাসিল করতে উঠে পড়ে লাগল ।
শ্যামলকে বোমা, পিস্তল পাচারের জন্য চিরতরে পেয়ে গেল । শশাঙ্ক তখনও তার ডেরায় বন্দী । দু'বেলা খাবারটুকু পায় - আর কিছু না । তীব্র মানসিক যন্ত্রণায় ভুগছিল শশাঙ্ক । একেক সময় মনে করত গলায় ফাঁস লাগিয়ে মরে দেয় ।
ইশ্বরও হয়তো সেই ব্যবস্থাই করে রেখেছিলেন । অভাগা বললেও কম বলা হয়; শশাঙ্ক সত্যিই হতভাগা । নইলে ফাঁসির আদেশ হবে কেন !
যাই হোক ফারজানার স্থান হল সরস্বতীর বাড়িতে। অহিন্দু বলে সমাজে কথা উঠবে ভেবে সরস্বতী ওর নাম রেখেছিল গুলাবী বহু ।
সেই গুলাবী বউ এবং সরস্বতী যে রাজসাক্ষী হয়ে গাজীর বিরুদ্ধে আদালতে সাক্ষ্য দেবেই - একথা নিশ্চিত করে বুঝে গেল বিপাশা । ডক্টর অক্টারলোনীকে তাদের কথা বলে দিল। অক্টারলোনী সাহেব মিঃ হককে সে কথা জানিয়ে দিলেন । এ ভাবে এস পি সাহেব হয়ে কথাগুলো সর্বেশ্বর পাণ্ডেকেও জানানো হল ।
চারিদিকে আঁটঘাট বেঁধে আসরে নেমে পড়লেন মিঃ পাণ্ডে । সব তথ্য ভিডিওতে ধরে তা তুলে দিলেন ডিভিশন বেঞ্চের হাতে ।
শুরু হল শুনানি । প্রথমেই স্ট্যাণ্ডে ডাক পড়ল আবেদনকারী বিপাশা ও ডাক্তারবাবুর ।
বিপাশার মুখে সেদিনের ঘটনা শুনলেন বিচারকেরা । ডাক্তারবাবুও হসপিটালের ঘটনা এবং বর্ধমান স্টেশনে গাজীর ধরা পড়ার ঘটনা বিশদে বললেন ।
এন আই এ এবং ' র' এর রিপোর্ট খতিয়ে দেখলেন । মূল ষড়যন্ত্রকারী হিসাবে ফকরুদ্দিন গাজী মোল্লাকে সনাক্ত করা গেল ।
তারপর বিচারক দু'জন নিজেদের মধ্যে কিছুক্ষণ কথা বলে নিলেন । শ্যামল ও গাজীর সঙ্গে ভিডিও কনফারেন্সে যোগাযোগ করা হল ।
বিচারকদের সামনে তারা সত্য কথাগুলোই বলল । সরস্বতী এবং গুলাবী বউকে যা যা প্রশ্ন করলেন তারাও সব তথ্য দিল ।
বিচারকগণ বললেন - সর্বশেষ সংযোজন হিসাবে শশাঙ্কর মুখ থেকে কিছু কথা শুনতে চাইলেন ।
মিঃ পাণ্ডে বললেন - ধর্মাবতার ! শশাঙ্ক দত্তগুপ্ত নামে যে যুবককে প্রাণদণ্ড দেওয়া হয়েছে : আজ প্রায় ছ'মাস হতে চলল সেই যুবক কণ্ডেমড সেলে থেকে নিজেকে সব সংশয়ের উর্দ্ধে নিয়ে গেছে এবং নিজেকে ফাঁসির জন্য মনেপ্রাণে তৈরী করে নিয়েছে ।
এই অধম তার সঙ্গেও সাক্ষাৎ করেছেন এবং জেনে নিয়েছেন যে ওই যুবক কোনরকম সাহায্য, দয়া-দাক্ষিণ্য চায় না । সুতরাং তাকে আদালতে নিয়ে এলেও আর নিজের প্রাণভিক্ষার আবেদন করবে না ।
মহাশয়, আদালত যে উকিল তার জন্য বরাদ্দ করেছেন ওই যুবক সসম্মানে তা ফিরিয়ে দিয়েছে । তার মতে তার এই পরিণতি ঈশ্বরপ্রদত্ত । অতএব সে সর্বান্ত:করণে তার মৃত্যুর প্রতীক্ষা করছে ।
বিচারপতিরা পরস্পরের মুখের দিকে চাইলেন । একজন বিচারক বললেন - শশাঙ্ক দত্তগুপ্তের ব্যাপারে তদানীন্তন তদন্তকারী অফিসারকে কিছু প্রশ্ন করতে চাই। তিনি কি আদালতে উপস্থিত আছেন ?
মিঃ হক লাফ দিয়ে উঠে হাত তুলে বললেন - ইয়েস স্যার ।
সর্বেশ্বর পাণ্ডে বললেন - স্ট্যাণ্ডে যান ।
মিঃ হক স্ট্যাণ্ডে উঠতেই বিচারক প্রশ্ন করলেন - শশাঙ্ককে আপনি গ্রেপ্তার করেছিলেন ?
- স্যার এক গোপন ডেরা থেকে..
- হাঁ কি না বলুন । ও সব অনেকবার শুনেছি।
মি: হক বললেন - হাঁ স্যার ।
- কি ভাবে গ্রেপ্তার করলেন ?
- কলিহানপুর গ্রামে তখন একটি রাজনৈতিক দলের বিশাল জমায়েৎ হয়েছে । পুলিশ ইতস্তত ছড়িয়ে ছিটিয়ে রাখা ছিল । এমন সময় মাঠের পূর্বদিকে আগুন ও ধোঁয়ায় ভর্তি হয়ে যায় । মানুষের আর্ত চিৎকারে দিগ্বিদিক ভরে যায় । আমাকে একজন বললেন - অপরাধী এখানে নেই । পালিয়েছে । আর দেখলাম কয়েকজন পুলিশ ছড়ানো টাকা তুলে পকেটে ভরছে । আমি একলা সেখান থেকে একজনকে ফলো করি । সে লোকটা তখন দৌড়চ্ছে ।
আমি বলি - থাম নইলে গুলি করব । সে দাঁড়িয়ে যায় । বলে অপরাধীকে চাইছেন, আসুন আমার সঙ্গে ।
বিচারক বললেন - তারপর !
( চলবে )

