ভোরের সূর্য্য পর্ব চব্বিশ
ভোরের সূর্য্য পর্ব চব্বিশ
পর্ব চব্বিশ
সরস্বতী গুলাবী বউকে বলল - অ বউ ? তেনারা এইছেন এই ভর দুপুরে , অন্তত চা-বিস্কুটও তো খাওয়া !
গুলাবী বউ ' এখনি আনছি' বলে ভেতরে ঢুকে গেল । সরস্বতী বলল - স্যারেরা ভিতরে এসে বসুন। বাইরে তপ্ত রোদে মুখ পুড়ে যাবে ।
হক সাহেব ভাবলেন - মুখ তো তুই অলরেডি পুড়িয়ে দিয়েছিস সাহেবের সামনে । এখন আবার নতুন করে কি পোড়াবি ।
বললেন - ভেতরে বসার জায়গা আছে ? এইটুকু তো ঘর !
এস পি সাহেব হকের দিকে চেয়ে বললেন - চলুন । বলছে যখন ।
বাইরে থেকে দেখে বাড়িটাকে ছোট মনে হলেও সত্যিকারের তা' নয় । ষোলো বাই আঠারো ফুটের একটা বৈঠকখানার মত ঘরে একটা সোফা , দুটো গদি- আঁটা চেয়ার , চারটে প্লাস্টিকের চেয়ার এবং একটা সেন্টার টেবিল বেশ সাজিয়ে গুছিয়ে রাখা আছে ।
হক সাহেব দেখলেন , হয়তো খুশীও হলেন । এস পি সাহেবকে সোফায় বসিয়ে নিজেও পাশে বসলেন । সরস্বতী একটা প্লাস্টিকের চেয়ার টেনে এনে তাঁদের সামনে বসল ।
- বলুন স্যার, কি সেবা করতে পারি ? গৃহস্থের বাড়িতে দুপুর বেলায় আগমন - আগে থাকতে জানা গেলে রান্না করে রাখতাম ।
গুলাবী বউ একটা সার্ভিং ট্রে-তে কফি মগে চা এবং গুচ্ছেক বিস্কুট এনে নামিয়ে দিল । সরস্বতী ট্রে থেকে চায়ের কাপ তুলে ওঁদের হাতে হাতে দিল । মগ হকের হাতে দিতে গিয়ে সরস্বতী আলতো করে হাতে হাত ঠেকিয়ে দিল । ইচ্ছে করেই । বিস্কুটগুলো যে ডিশে রাখা ছিল সেখানেই রইল । সরস্বতী বলল - আগে এই আপ্যায়ণটুকু গ্রহন করুন । আমি বসে রইলাম।
পরক্ষণে গুলাবী বউকে বলল - অ বউ ? বাইরে যারা দাঁড়িয়ে আছেন তাদেরও চা বিস্কুট খাইয়ে আয় ।
হক সাহেব বললেন - এবার কাজের কথায় আসি । আপনাকে একবার দিল্লি যেতে হবে ।
সরস্বতী বলল - দিল্লি ? কেন স্যার ?
- শ্যামলকে গ্রেপ্তার করে এখন তিহার জেলে রাখা হয়েছে। আপনাকে সনাক্ত করতে হবে সে-ই শ্যামল সামন্ত কি না !
সরস্বতীর ভাবান্তর হল । কি মুশকিল ! মিন্সেটা বেঁচে আছে তা'হলে ! পোড়া কপাল আমার । তথাপি নিশ্চিত হবার জন্য বলল - সনাক্ত করতে হবে - মানে- ও কি...
এবার মড়াকান্না জুড়ে দিল ।
এস পি সাহেব ওকে আশ্বস্ত করে বললেন - মরে যায়নি । ওকে জেলে রাখা হয়েছে । মরে গেলে তো মর্গে পাঠিয়ে দিত।
সরস্বতী ভাবল হতচ্ছাড়া মরল না কেন । পুলিশ সমাজটা না এরকমই ! মেরে দিলে ল্যাঠা চুকে যেত । এমনিতে তো সেই বিধবা হয়েই আছি ।
হক সাহেব বললেন - শুনেছি আপনাদের সাংসারিক অবস্থা আগে ভালো ছিল না । তা' হঠাৎ করে কি লটারি লেগে গিয়েছিল যে এমন উন্নত অবস্থা চোখে পড়ছে ?
সরস্বতী যেন এই কথাটাই শুনতে চেয়েছিল ।
বলল - একদম ঠিক কথা বলেছেন স্যার । আগে দু'বেলা খাবার জুটত না । আমার দাদা শশাঙ্ক বেশ মোটা রকম রোজগার করত । জানি না কি উপায়ে! নিশ্চয় ভালো কাজে না ; নইলে ফাঁসির আদেশ হবে কেন । তা যাকগে, দাদাকে দেখে আমার মনে হল আমার সোয়ামীও যদি ওরকম একটা কাজ পায় তো সংসারের অবস্থাটাই পাল্টে যায় । খোঁচা মারলাম স্যার । বাড়িতে এলেই খুঁচিয়ে ঘা করে দিতাম দাদার কথা শুনিয়ে । কোথা থেকে কি হয়ে গেল ! একদিন দেখি আমার সোয়ামী এক থলে টাকা নিয়ে আমার হাতে তুলে দিল । বলল ' এবার থেকে পায়ে পা তুলে আয়েশ কর । আমি চাকরি পেয়ে গেছি ।
এত টাকা স্যার জন্মেও দেখিনি । আবার ভ্যাবাচ্যাকাও খাইনি । ভেবেছি মা-বাপটা তো টাকার অভাবেই মরল । এখন যদি বড়লোক হই তো আর দেখতে হবে না ।
এস পি বললেন - কখনও জানতে ইচ্ছে করেনি কোত্থেকে এত টাকা আনছে ?
সরস্বতী হাসল । সে হাসিতে সৌন্দর্য্য ছিল কিন্তু ব্যঞ্জনা ছিল কদর্য । হাসতে হাসতে বলল - না স্যার । মরদ কি করে তা জানার কোন কৌতূহল আমার কোনকালেই ছিল না । আমি চেয়েছি টাকা । দিনের পর দিন গুনে যাই টাকা। আমার অতশত জেনে কি হবে ?
হক সাহেব বললেন - টাকাগুলো কোথায় রাখেন? ব্যাঙ্কে না পোস্ট অফিসে ?
- বোকামি আমি করি না স্যার । ওখানে রাখলে তো সরকারের শ্যেনদৃষ্টিতে পড়ব ।
হক সাহেব বললেন - তবে কি বাড়িতেই রেখেছেন? চুরির ভয় নেই ?
আবার হাসল সরস্বতী । বলল - অ গুলাবী বউ? কোথায় গেলি রে ?
গুলাবী বউ সামনে এসে দাঁড়াল।
সরস্বতী বলল - ওই চেয়ারটা টেনে বোস । কথা আছে।
এস পি সাহেব বললেন - ওকে কেন ? ওর থাকার দরকার নেই ।
সরস্বতী বলল - আছে স্যার । ও যে আমার সেক্কেটারী । আমার রাজ্যের অর্থমন্ত্রী ।
এস পির চোখ কপালে উঠল । হক সাহেব বিষম খেলেন ।
সরস্বতী বলল - টাকাগুলো কোথায় রেখেছিস বলে দে ।
দু'জন ধুরন্ধর পুলিশ অফিসার মুখ চাওয়াচাওয়ি করতে লাগলেন । একি কথা শুনি আজ মন্থরার মুখে !
( চলবে )

