অজানা পথেপর্ব ২৪
অজানা পথেপর্ব ২৪
ময়নার আর ছাদে যাবার সাহস হল না।ডাইনিং রুমের উত্তরের তারে তার শাড়ি ব্রাউজ শায়া শুকনো করতে দিল। তারপর হাত মুখ পরিস্কার করে ধুয়ে রান্না করল।বিনয়ের জন্য রান্না করতে বিনয় আজ দিনের বেলার জন্য নিষেধ করে।অফিসেই খেয়ে নেবে বলেছিল।
গোপাল তো ভাত না খাবার মত।কালকের মাংস খানিক ফ্রীজে রাখা , আর দৈ আছে।গরম ভাতে এতেই তার আর গোপালের দিনের খাবার হয়ে যাবে। শুধুমাত্র হাঁড়িতে চাল ফুটিয়ে ভাত আর একটা আলু সিদ্ধ করে ,তেল কাঁচা পেঁয়াজ লঙ্কা কুচিয়ে মেখে নেব।আঁচার আছে আর কী দরকার!ময়না মনে মনে ভাবছিল।
গোপালকে এগারটার মধ্যেই স্নান করিয়ে তাকে পোষাক পরিয়ে ময়না ,নিজের কোলে যত্ন করে গোপালকে খাইয়ে দিল ।নিজে সকালে পায়ের নিচে থেকে মাথা অবধি ভালো করে সাবান ঘষে স্নান করেছিল। গ্রীষ্মের দিন,খুব সকালে একবার স্নান করলেও আবার বার স্নান করল।দুপুরের ভাত খেল।এঁটো বাসন ধুয়ে রান্নার ঘরটাও সে ধুয়েমুছে পরিস্কার পরিচ্ছন্ন করল।শরীরটা তার খুব দুর্বল লাগছিল এবার একটু বিশ্রাম নিতে গোপালকে কোলের কাছে টেনে বিছানায় শুয়ে আদর করে মাথায় পিঠে হাত বুলিয়ে দিচ্ছিল।গোপাল ঘুমিয়ে পড়লে সে একটু ঘুমুবে ভাবলেও চিন্তা হচ্ছিল যদি বিনয়দা কোন ফোন করে বা বাড়ি চলে আসে আর সে গভীর ঘুমে শুনতে না পায়! তাই মনে মনে ভাবল,গোপালকে গল্প বলি ও জেগে থাক,আমিও জেগে থাকি।গোপাল ঘুমলে একা জেগে থাকতে তার গতরাতে কেমন এঘরে ভয় করছিল তারপর বাথরুমের চাপ আসতে ঘর খুলে বাথরুম যেতে গিয়ে কী সব যে সে দেখল শুনল! তারপর সে তো
ডাইনিং রুমের মেঝে পড়েছিল! বাথরুমের কাজ না সেড়ে নিজের শাড়ি শায়া অচেতন ঘোরে ভিজিয়ে ফেলেছিল! এসব ভাবতেই তার শরীর দুর্বল যতই হোক ঘুমটা চমকে গেল।
গোপাল আবার নিজেই গল্প শোনার বায়না করল।
ময়না গোপালকে খুব কাছে টেনে একটু সাহস পাচ্ছিল। গোপালকে গল্প বলছিল।
গোপাল ভুতের গল্প শুনতে ভালবাসে।ভুতের গল্প শুনতে চাইলেও ময়না ভুতের গল্প বলতে খুব ভয় ভয় করছিল।রূপকথা পরী গল্প বলছিল। হঠাৎই ময়নার গাটা কেমন কাঁটা দিচ্ছিল ভয় ভয় মনে গোপালের মৃত মায়ের ছবির দিকে তাকাল।
ময়নার মনে হচ্ছিল গোপালের মায়ের ছবিটা যেন উজ্জ্বল ভাব চক চক করছে। এমন হলেই তার ভীষণ ভয় নার্ভাস লাগে।গোপালের চোখ ঘুমে জড়িয়ে এসেছে।নার্ভাস মনে ময়না ঘর থেকে বের হয়ে ডাইনিং রুমের সোফায় বসেছিল।কেমন তার শরীরটা আনচান করছে মাথাটা ঝিম ঝিম করছে চোখ দুটো ভারী হয়ে আসছে।
একটা কালো বিড়াল যেন তার দিকে ধীরে ধীরে আক্রমণের ভঙ্গীমায় এগিয়ে আসছে।লাল চোখ কীভাবে হিংস্র ভঙ্গিতে তাকাচ্ছে! এই দুদিনে এমন কোন বিড়াল সে এ গৃহে দেখেনি। খুব ভয় করছিল মনে মনে ভাবছিল যদি বিড়ালটা আক্রমণ করে! ভয়ে থর থর করে কাঁপছিল। শরীর দুর্বল মনে হচ্ছিল হার্ট ফেল করবে।ঘেমে সারা শরীরটা ভিজে গেছিল।আচমকাই সে ধরধরিয়ে উঠে বসল।খুব শ্বাস কষ্ট হচ্ছিল হাঁপ নিয়ে যেন বাঁচল।এটা স্বপ্ন বুঝে ময়না একটু যেন মনে শক্তি বল এল।
ডাইনিং রুমের দেওয়াল ঘড়িটা দেখে সে চমকে গেল, দেখল দুটো কুড়ি। প্রায় দুঘন্টা তার যেন ঘোরে কাটল। ভোরের সময়ের মত তবে কী সে আবার অচেতন হয়ে খারাপ স্বপ্ন দেখছিল!
তাড়াতাড়ি ঘরে ঢুকে গোপালকে দেখতে গেল। গোপাল তখনও গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন। ভয়ে ভয়ে শিবানী ছবির দিকে সে তাকাল এখন আর তার ছবিটা উজ্জ্বল চক চকে লাগছিল না।ময়না ভয়ে বা ভক্তিতে শিবানীর ছবির দিকে দুহাত জোর করে প্রনাম করল।
বেলা তখন আড়াইটা গোপাল তখনও গভীর ঘুমে । নিঃসঙ্গতা ময়নাকে যেন আজ আবার ভরা দুপুরে গ্রাস করেছিল।আবার সেই রাতের মত খাঁ খাঁ ঘরের নির্জন পরিবেশ।দুঘন্টা তার ঘোরে কাটল কি সব ভয়ের স্বপ্ন দেখল। ময়নার ভীষণ নার্ভাস লাগছিল একবার ভাব ছিল গোপালকে তুলে দি।আবার ভাবছিল ছেলেটার কাঁচা ঘুম নষ্ট হবে। সে তো জাগিয়ে রাখতে চেয়েছিল! গল্প শুনতে শুনতে কখন যে গোপাল ঘুমিয়ে গেছিল রূপসী বুঝতেই পারেনি।
কলিং বেলের আওয়াজ শুনে ছুটে ময়না দরজা খুলল। একরাত বাইরে কাটিয়ে পরদিন দুপুরে বিনয় একরাশ উদ্বিগ্নতা আর চিন্তা নিয়ে বাড়ি ফিরেছিল। শারীরিক যত ক্লান্তি যেন তার গোপাল আর ময়নার সুরক্ষার চিন্তায় জন্য ভুলে গেছিল।
বিনয়কে দেখে ময়না ভীষণ খুশী আজ রাতে গোপালকে নিয়ে আর একা নিঃসঙ্গ নির্জন এ থমথমে পরিবেশে বাড়িতে একা থাকতে হবে না।
ঘন্টা খানেক আগে বিনয় অবশ্য ফোনে বাড়ির খবর জানতে চেয়েছিল।যে কারনেই হোক বিজি দেখাচ্ছিল তাই বিনয়ের তাতে চিন্তা বেশ কগুন বেড়েছিল।তখন ময়না ঘোরের মধ্যে ছিল।
বিনয় সোফায় বসল।
ময়না আবেগ আনন্দে বিনয়ের পায়ের কাছে বসে বিনয়ের পায়ের জুতো খুলতে গেল।
বিনয় একটু বিব্রত হয়ে বলে
" আরে করছ কী! আমি এত ভি আই পি নয়। বরং পারো তো একটু সরবৎ বা বাতাসা জল দাও খুব তেষ্টা পেয়েছে।"
ময়না দ্রুত বেসিনে হাত ধুয়ে বিনয় দুপুরে আসবে অনুমান করে মিছরী জলে ভিজিয়ে রেখেছিল।
একগ্লাস ভর্তি করে নিয়ে এল।
বিনয় খুব খুশী মনে বলল,
"তুমি মেশিন নাকী! এর মধ্যেই সরবৎ রেডি!"
ময়না হেসে বলল
"আপনি দুপুর আসবেন অনুমান করে মিছরী জলে ভিজিয়ে ঢাকা দিয়ে রেখেছিলাম।"
"বাবা তুমি দেখছি দ্বিতীয় শিবানী!"
ময়না খুশি খুশি মুখে বলল,
"দিদি এমন করতেন দাদা!"
"হ্যাঁ ভীষণ যত্ন করত,সে তবু স্ত্রী ছিল তুমি তা নও তবু কি তোমার যত্ন!"
"স্বামী না হোন আপনি আমার ঈশ্বর ।"
"এতটা বাড়াবাড়ি করে প্রশংসা করলে আমার খুব লজ্জা করে রূপসী।"
রূপসী একটু পরিতৃপ্তির হেসে এর কোন উত্তর না দিয়ে জিজ্ঞেস করল,
"আপনার শরীর ঠিক আছে তো দাদা!"
"আমি ঠিক আছি ,বরং তোমাকে দেখে কেমন দুর্বল শুকনো লাগছে। রাতে ঘুম হয়েছিল তো!"

