অগ্নিকন্যা কল্পনা দত্ত
অগ্নিকন্যা কল্পনা দত্ত
পরাধীন ভারতের অবিভক্ত বাংলার চট্টগাম জেলার শ্রীপুর গ্রামে এক সাধারণ মধ্যবিত্ত পরিবারে ১৯১৩ সালের ২৭শে জুলাই কল্পনা দত্ত জন্মগ্রহণ করেন। পিতা বিনোদবিহারী দত্ত ছিলেন একজন সরকারী কর্মী। মাতা ছিলেন শোভনাবালা দেবী গৃহিণী। গ্রামে জন্ম হলেও পিতার চাকরি সূত্রে কল্পনা দত্ত ছোট্ট থেকে থাকতেন চট্টগ্রাম শহরে। এই শহরের প্রাণকেন্দ্রে তাদের বেশ বড় বাড়ি ছিল।
কল্পনা দত্তের পড়াশুনার হাতেখড়ি ঘটে পরিবারের মধ্যে। প্রাথমিক লেখাপড়া শেষে তাঁকে ডা.খাস্তগীর উচ্চ ইংরেজি বিদ্যালয়ে তাকে ভর্তি করে দেন তাঁর বাবা। বীরকন্যা প্রীতিলতাও এই স্কুলের ছাত্রী ছিলেন। কল্পনা দত্ত প্রীতিলতার এক ক্লাস নীচে পড়তেন। ডা. খাস্তগীর উচ্চ ইংরেজি বালিকা বিদ্যালয় ওই সময়ের অন্যতম নারী শিক্ষালয় ছিল। এই নামকরা স্কুলে প্রতিটি শ্রেণীতে কল্পনা দত্ত প্রথম কিংবা দ্বিতীয় ছিলেন।
ডা. খাস্তগীর স্কুলের শিক্ষিকা উষাদি ছাত্রীদের সাথে গল্প করতেন। তাঁদেরকে দেশ-বিদেশের বিভিন্ন গল্প শোনাতেন। কল্পনা দত্ত এই উষাদির সংস্পর্শে এসেই বিভিন্ন স্বদেশি বই পড়তে শুরু করেন। উষাদি ছিলেন স্বদেশীদের গোপন বিপ্লবী সহযোগী। তিনি মূলত কল্পনা দত্তের চেতনায় দেশপ্রেম ও বিপ্লবী রাজনীতির বীজমন্ত্র বুনে দেন।
স্কুলজীবনের শুরু থেকে কল্পনা দত্ত ‘ক্ষুদিরামের বসুর জীবনী’, ‘কানাইলাল দত্তের জীবনী’, ‘পথের দাবি’ প্রভৃতি স্বদেশি বই পড়তে শুরু করেন। এই বইগুলি তাঁর অন্তরে স্বদেশপ্রেমের দীপ প্রজ্জলিত করেছিল। তিনি ভীষণ মেধাবী ছাত্রী ছিলেন।
মাস্টারদা সূর্যসেন চট্টগ্রাম জেলা কংগ্রেসের সম্পাদক হওয়ার পর তার নেতৃত্বে চট্টগ্রাম জেলা রাজনৈতিক সম্মেলন, যুব সম্মেলন, ছাত্র- ছাত্রী সম্মেলন ও নারী সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়।এই সব সম্মেলনগুলোতে ওই সময় চট্টগ্রামের স্কুল-কলেজের বহু ছাত্র-ছাত্রী স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে দায়িত্ব পালন করে।
এই সময় কল্পনা দত্ত অন্যান্য মেয়েদের সঙ্গে স্বেচ্ছাসেবিকার দায়িত্ব পালন করেন। বিশেষ করে নারী সম্মেলনে স্বেচ্ছাসেবিকার দায়িত্ব পালন করার মধ্য দিয়ে কল্পনা দত্তের রাজনৈতিক জীবনের সূত্রপাত ঘটে।
কল্পনা দত্ত ১৯২৯ সালে চট্টগ্রাম থেকে ম্যাট্রিকুলেশন পাশ করেন। এই পরীক্ষায় খুব ভালো রেজাল্ট করার জন্য ব্রিটিশ সরকার থেকে মাসে ১৫ টাকা করে বৃত্তি পেতেন। ম্যাট্রিকুলেশন পাশ করার পর কলকাতার বেথুন কলেজে পড়াশোনার জন্য তিনি বিজ্ঞান বিভাগে আই এস সি-তে ভর্তি হন।
বেথুন কলেজে ভর্তি হওয়ার কয়েক দিনের মধ্যেই তার প্রীতিলতা দেবীর সাথে পরিচয় ঘটে। যাঁকে তিনি ডা.খাস্তগীর স্কুলের শিক্ষিকা উষাদির আলোচনার আড্ডায় প্রায়ই দেখতেন। বেথুন কলেজে পড়ার সময় স্কুল জীবনের সুপ্ত দেশপ্রেমের বীজ কল্পনা দত্তের চেতনায় অঙ্কুরিত হয়।
প্রীতিলতা আন্তরিকতা, সাংগঠনিক দক্ষতা ও ব্যবহারের মাধ্যমে মেয়েদেরকে খুব আপন করে নিতে পারতেন। প্রীতিলতা বেথুন কলেজে ইংরেজী সাহিত্যে বি.এ. পড়তেন। থাকতেন ছাত্রীনিবাসে। এখানে মাষ্টারদার নির্দেশে সাংগঠনিক কর্মকাণ্ড পরিচালনা করতেন। তিনি গড়ে তোলেন এক বিপ্লবী চক্র। এই বিপ্লবীচক্রে অন্যান্য মেয়েদের সাথে কল্পনা দত্ত যুক্ত হয়ে যান। এই চক্রের মূল কাজ ছিল বিপ্লবীকর্মী তৈরীর পাশাপাশি অর্থ সংগ্রহ করা। অর্থ সংগ্রহ করে প্রীতিলতা চট্টগ্রামে পাঠাতেন।
বেথুন কলেজে পড়ার সময় শহীদ ক্ষুদিরাম বসু এবং বিপ্লবী কানাইলাল দত্তের আদর্শে উদ্বুদ্ধ হয়ে ছাত্রী সংঘে যোগদান করেন।
কল্পনা দত্ত কল্যাণী দাসের ‘ছাত্রীসংঘের সাথেও যুক্ত ছিলেন। এসময় বেথুন কলেজে হরতাল পালন এবং অন্যান্য আন্দোলনে তিনি সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেন। দেশের মুক্তি সংগ্রাম, মাতৃভূমির স্বাধীনতা, নারীদের মর্যাদা রক্ষার জন্য বীর সন্তানদের আত্মত্যাগ ভাবিয়ে তোলে কল্পনা দত্তকে। তিনি প্রীতিলতার সাথে যুক্ত থেকে বিপ্লবী ধারার কাজ করতে করতে নিজেই বিপ্লবী কর্মী হয়ে যান।
সম্মেলনের পর কল্পনা দত্ত কলকাতায় চলে যান। ওই সময় কলকাতায় বিপ্লবীদের এক গোপন কারখানায় তখন তৈরি হত বোমার খোল। মাষ্টারদার নির্দেশ অনুযায়ী সে বোমার খোল সংগ্রহ করেন প্রীতিলতা। ওই বছরের শেষের দিকে পূজার ছুটিতে প্রীতিলতা, কল্পনা দত্ত, সরোজিনি পাল, নলিনী পাল, কুমুদিনী রবিত চট্টগ্রাম আসেন। মাষ্টারদার নির্দেশে তাঁরা বোমার খোলগুলো চট্টগ্রামে বিপ্লবীদের হাতে পৌঁছে দেন।
বেথুন কলেজে পড়াশোনা শেষ করে ১৯৩০ সালে কল্পনা দত্ত চট্টগ্রামে ফিরে যান। তিনি চট্টগ্রাম কলেজে বই এস সি পড়ার জন্য ভর্তি হন। পড়াশোনার ফাঁকে ফাঁকে বিপ্লবের কাজ করতে থাকেন।
তার বিপ্লবী মন মাস্টার দা সূর্যসেনের প্রতিষ্ঠিত তরুণ ও ছাত্রদের বিপ্লবী যুগান্তর দলে যোগ দেওয়ার আকাঙ্খায় উদ্বেল হয়ে ওঠে। মেয়েদের বিপ্লবে অংশ গ্রহণের অনুমতি চাওয়ার জন্য দেখা করতে চান সর্বাধিনায়ক সূর্যসেনের সাথে।
ওই একই সময় তিনি বিপ্লবী নেতা পুর্ণেন্দু দস্তিদারের সংস্পর্শে আসেন, যিনি ছিলেন মাস্টারদা সূর্য সেনের একান্ত অনুগামী। পুর্ণেন্দু দস্তিদার প্রভাবেই কল্পনা দত্ত বিপ্লবী দলে যোগদানের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন এবং
পুর্নেন্দু দস্তিদারের মাধ্যমে তিনি মাস্টার দা সূর্য সেনের সাথে পরিচিত হন এবং মাস্টার দা প্রতিষ্ঠিত ইন্ডিয়ান রিপাবলিকান আর্মির চট্টগ্রাম শাখায় যোগদান করেন। সেই সময় মহিলাদের বিপ্লবী দলে প্রবেশের ক্ষেত্রে কিছু প্রতিবন্ধকতা ছিল। কিন্তু মাস্টার দা সমস্ত নিয়ম নীতি শিথিল করে কল্পনা দত্তকে বিপ্লবী দলে গ্রহণ করেন।
ধলঘাটের সংঘর্ষে ক্যাপ্টেন ক্যামেরুন নিহত হওয়ার পর সারা চট্টগ্রাম নিস্তব্ধ হয়ে যায়। গ্রামে-গঞ্জে-শহরে মিলিটারী ও পুলিশের চরম নির্যাতন শুরু হয় । কল্পনা দত্ত পুরুষের পোশাক পরিধান করে সেইসময় তাঁদের আন্দরকিল্লার বাসা থেকে গোপন বিপ্লবী কেন্দ্র কাট্টলী যাওয়ার উদ্দেশ্যে রওনা হন। কিন্তু পথে আটকা পড়েন। পাহাড়তলী স্টেশনের পাশে ভেলুয়ার দীঘির কোনায় কিছু গুণ্ডা প্রকৃতির ছেলের সহায়তায় পুলিশ বিপ্লবী কল্পনা দত্তকে গ্রেপ্তার করে। শুরু হয় তাঁর রাজনৈতিক কারাজীবন।
১৯৩১ সালের মে মাসে ছাড়া পাওয়ার পর তিনি কলকাতা থেকে উচ্চ ক্ষমতা সম্পন্ন বিস্ফোরক দ্রব্য কৌশলে নিয়ে আসার দায়িত্ব পান। মাস্টার দার নির্দেশে ডিনামাইট ফিউজ দিয়ে চট্টগ্রাম আদালত ভবন ও কারাগার উড়িয়ে দিয়ে বিচারাধীন বিপ্লবীদের মুক্ত করার পরিকল্পনা গ্রহণ করেন তিনি ।
১৯৩১ সালের এপ্রিল মাসে এক বিশেষ আদালতে রাজদ্রোহ মামলায় বা চট্টগ্রাম অস্ত্রাগার দখল মামলায় অভিযুক্ত ৩২ জন বন্দির বিচার শুরু হয়। মাস্টারদা বন্দিদের মুক্ত করার জন্য এক দুঃসাহসিক পরিকল্পনা গ্রহণ করেন। তিনি মাইন ব্যবহার করে জেলের প্রাচীর উড়িয়ে দিয়ে বন্দিদের মুক্ত করা এবং একই সাথে আদালত ভবন ধ্বংস করার উদ্যোগ নেন। এ পরিকল্পনা বাস্তবায়নে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন কল্পনা দত্ত। হামলার দিন ধার্য করা হয় ৩ জুন, ১৯৩১ সাল। সব প্রস্তুতিও গোপনে সম্পন্ন হয়ে যায়। কিন্তু একেবারে শেষ মুহূর্তে সর্বশেষ মাইনটি বসানোর সময় পুলিশের নজরে পড়ে যাওয়ায় গোটা পরিকল্পনা ব্যর্থ হয়ে যায়।
এ ঘটনায় পুলিশ কল্পনা দত্তকে সন্দেহভাজন রূপে তাঁর গতিবিধি নিয়ন্ত্রণ করার সিদ্ধান্ত নেয়। তাঁকে শুধু চট্টগ্রাম কলেজে গিয়ে বি.এস.সি. পড়বার অনুমতি দেওয়া হয়।এরপরেও তিনি খুব সন্তর্পনে প্রায়ই মাস্টার দার সাথে গ্রামে গ্রামে ঘুরে ঘুরে মানুষের সুখ দুঃখের খবর নিতেন। একই সাথে তিনি ও প্রীতিলতা দেবী প্রত্যেকদিন গুলি চালনার প্রশিক্ষন নিতেন।
১৯৩১ সালে মাস্টার দা সূর্য সেন,কল্পনা দত্ত ও প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদারকে চট্টগ্রামের ইউরোপীয় ক্লাব আক্রমণের দায়িত্ব দেন। নির্দিষ্ট দিনের এক সপ্তাহ আগে পুরূষের ছদ্মবেশে একটি সমীক্ষা করতে গিয়ে কল্পনা দত্ত ধরা পরেন ও গ্রেফতার হন। জেলে বসে তিনি অপারেশন পাহারতলী এবং বীরাঙ্গনা প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদারের আত্মহত্যার খবর পান।
জামিনে মুক্তি পাওয়ার পর মাস্টার দার নির্দেশে চট্টগ্রাম কলেজের পশ্চিমে দেব পাহাড়ে আবার আত্মগোপন করেন কল্পনা দত্ত। তিনি তখন বি. এস. সি.র ছাত্রী। ১৯৩৩ সালের ১৬ ফেব্রুয়ারী সমুদ্র তীরবর্তী গৈরালা গ্রামে ইংরেজ ফৌজের সঙ্গে সংঘর্ষে মাস্টারদা ও তারকেশ্বর দস্তিদারের সঙ্গী ছিলেন তিনি। পরে মাস্টারদা ও ব্রজেন সেন পুলিশের হাতে ধরা পড়লেও কল্পনা দত্ত পালিয়ে যেতে সক্ষম হন।
কিন্তু তিন মাস পর ১৯ মে গৈরালা গ্রামে এক সশস্ত্র সংঘর্ষের পর কল্পনা দত্ত এবং তাঁর সতীর্থ কয়েকজন বিপ্লবী ধরা পড়েন।ওই বছর ১৪ আগস্ট একটি বিশেষ ট্রাইব্যুনাল সূর্যসেন ও তারকেশ্বর দস্তিদারকে ফাঁসি দেয় এবং অন্যদেরকে আন্দামান সেলুলার জেলে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেয়।
চট্টগ্রাম অস্ত্রাগার দখল মামলার (‘চট্টগ্রাম অস্ত্রাগার লুণ্ঠন সেকেন্ড সাপ্লিমেন্টারি কেস’) দ্বিতীয় বিচার পর্বে কল্পনা দত্তকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডে দণ্ডিত করা হয়।
তার বিপ্লবী কাজকর্ম লক্ষ করে স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ তাকে অগ্নিকন্যা উপাধি দিয়েছিলেন।
প্রায় ৬ বছর কারাভোগের পর এই বিপ্লবী নেত্রী ১৯৩৯ সালে কারামুক্ত হন।১৯৩৯ সালে মুক্তি লাভের পর তিনি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অঙ্কে সাম্মানিক সহ স্নাতক ডিগ্রী লাভ করেন। তারপর তিনি ভারতের কমিউনিস্ট পার্টিতে যোগদান করে ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলন চালিয়ে যান।
১৯৪৩ সালে C.P.I নেতা পূরণচাঁদ যোশীর সাথে তার বিয়ে হয়। বিয়ের পর তিনি চট্টগ্রামে ফিরে যান এবং দলের মহিলা ও কৃষক সংগঠনকে চাঙ্গা করেন। ১৯৪৬ সালে C.P.I প্রার্থী হয়ে তিনি চট্টগ্রাম বিধানসভা কেন্দ্র থেকে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দিতা করেন। কিন্তু জয়ী হতে পারেন নি।
স্বাধীনতার পর তিনি ভারতে চলে আসেন। ১৯৫০ সালে ইণ্ডিয়ান স্ট্যাটিস্টিক্যাল ইনস্টিটিউটে চাকরি নেন। পরে দিল্লীতে থাকতেন। তিনি দিল্লীতে নারী আন্দোলনে মুখ্যভূমিকা নেন। ভারত ও তৎকালীন সোভিয়েত রাশিয়ার মৈত্রী সম্পর্কের ক্ষেত্রে তার যথেষ্ট অবদান ছিল। তিনি ‘অল ইণ্ডিয়া ইন্সটিটিউট অফ রাশিয়ান ল্যাঙ্গুয়েজ' এর সাধারণ সম্পাদক ছিলেন। ‘চট্টগ্রাম অভ্যুত্থান’ তার প্রণীত গ্রন্থ। ১৯৯৫ সালে ৮ ফেব্রুয়ারি নয়া দিল্লীতে তিনি অজানার পথে পাড়ি দেন।
