STORYMIRROR

Nikhil Mitra Thakur

Abstract Others

3  

Nikhil Mitra Thakur

Abstract Others

অগ্নিকন্যা কল্পনা দাশগুপ্ত

অগ্নিকন্যা কল্পনা দাশগুপ্ত

4 mins
172


দাশগুপ্ত পরিবারের আদি বাড়ি ছিল বিক্রমপুরের বিদগাঁও গ্রামে। সুরেন্দ্রনাথ দাশগুপ্ত ঢাকা শহরে বসবাস করতেন। তার স্ত্রী ছিলেন চারুলতা দেবী। তাদের এক কমলা দাশগুপ্ত ১৯০৭ সালে ১১ই মার্চ ঢাকা শহরে জন্ম গ্রহণ করেন।

কমলা দাশগুপ্ত পড়াশোনায় মেধাবী ছাত্রী ছিলেন। তিনি দীর্ঘ দুই বৎসর মাসে ১৩ টাকা করে ব্রহ্মময়ী তারাসুন্দরী বৃত্তি পেয়ে পড়াশোনা করেন। ১৯২৪ সালে তিনি ঢাকার ব্রাহ্মবালিকা শিক্ষালয় থেকে প্রবেশিকা পাশ করেন। 

কল্পনা দাশগুপ্ত প্রবেশিকা পাশ করার পরে পরিবারের সাথে কলকাতায় চলে আসেন। কলকাতায় এসে তিনি বেথুন কলেজে ভর্তি হন। ১৯২৮ সালে বেথুন কলেজ থেকে বি.এ ডিগ্রি লাভ করেন। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইতিহাসে এম.এ পাস করেন।

কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে এম.এ পড়ার সময়ে তার মধ্যে জাতীয়তাবাদী আন্দোলন সম্পর্কে ধারণা পরিপুষ্ট হতে থাকে। তিনি ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনে যোগ দিতে মনস্থির করেন। এই সময়ে তিনি লেখাপড়া ত্যাগ করে সবরমতি আশ্রমে থেকে দেশের হয়ে কাজ জন্য মহাত্মা গান্ধীকে চিঠি দিলেন। সঙ্গে সঙ্গে মহাত্মা গান্ধীর কাছ থেকে উত্তর এলো,"বাবা মায়ের অনুমতি নিয়ে চলে এসো"। তিনি বাবা মায়ের অনুমতি পেলেন না। এবং তাকে পরিবারের চাপে পড়ে কলকাতায় থেকে পড়াশোনা চালিয়ে যেতে হয়। 

এই সময়ে যুগান্তর দলের বেশ কয়েকজন বিপ্লবীর সাথে তার পরিচিতি ঘটে। তাদের মধ্যে বিপ্লবী দীনেশ মজুমদারের কাছে তিনি লাঠিখেলা শিখতে থাকেন। দীনেশ মজুমদারের মাধ্যমে বিপ্লবী রসিকলাল দাসের সাথে তার পরিচয় হয়। রসিকলাল দাসের প্রেরণায় গান্ধীর অহিংসবাদ ত্যাগ করে সশস্ত্র সংগ্রামের জন্য ১৯২৯ সালে যুগান্তর দলে যোগ দেন।

১৯৩০ সালে দলের নির্দেশে কমলা দাশগুপ্ত বাড়ি ত্যাগ করেন এবং গড়পার রোডের এক মহিলা হোস্টেলে ম্যানেজারের চাকরিতে যোগ দেন। এখানে তার দলীয় দায়িত্ব ছিল চাকরির অন্তরালে থেকে বিপ্লবীদের জন্য তৈরি বোমা বা বোমা তৈরির সরঞ্জাম লুকিয়ে রাখা। বিপ্লবী রসিকলাল একদিন রাতে উপরে ফল দিয়ে ঢাকা বড় একটি ধামায় করে বোমা পাঠালে তিনি সেগুলি বিভিন্ন সুটকেসে ভরে ভাড়ার ঘরে লুকিয়ে রাখেন। 

ভাড়ার ঘরের চাবি তার কাছে থাকতো। একটু অসতর্ক হলেই সর্বনাশ। তাই খুব সন্তর্পনে রসিকলালের কাছ থেকে সাংকেতিক নির্দেশ নিয়ে আসা এক-একজন আগন্তুকের হাতে এক-একদিন কয়েকটি করে বোমা তিনি সুটকেসে ভরে তুলে দিতেন। কখনো আবার তিনি রসিকলালের নির্দেশে নির্দিষ্ট স্থানে বোমা পৌঁছে দিয়ে আসতেন।

১৯৩০ সালে দীনেশ মজুমদার সহ কয়েকজন বিপ্লবী কুখ্যাত ইংরেজ পুলিশ চার্লস টেগার্টকে হত্যার জন্য ডালহৌসি স্কোয়ারে বোমা নিক্ষেপ করে। খুব অল্পের জন্য চার্লস টেগার্ট প্রাণে বেঁচে যান। কমলা দাশগুপ্ত এই বছর ১৬ই সেপ্টেম্বর ডালহৌসি স্কোয়ার বোমা ষড়যন্ত্র মামলায় গ্রেফতার হন এবং ২১ দিন হাজত বাস করার পর প্রমাণের অভাবে ছাড়া পান।

জেল হেফাজতে থাকার ফলে তার হোস্টেলের চাকরি চলে যায়। মুক্তি পেয়ে তিনি একটি স্কুলে শিক্ষকতার কাজে যোগ দেন। কল্যাণী দাস জেলে থাকা কালীন ১৯৩২ সালে একদিন কমলা দাশগুপ্ত তার বাড়ি যান। কল্যাণী দাসের বোন বিপ্লবী বীনা দাস গভর্নর স্ট্যানলি জ্যাকসনকে হত্যা করার জন্য তাকে একটি রিভলভার চায়। তিনি রামমোহন লাইব্রেরির একটি নিরিবিলি ঘরে বসে রিভলবারের প্রত্যেকটি অংশ খুলে বীণা দাসকে বুঝিয়ে দেন।

বিপ্লবী বীনা দাস ১৯৩২ সালে ফেব্রুয়ারি মাসে বাংলার গভর্নর স্ট্যানলি জ্যাকসনকে গুলি করে হত্যার চেষ্টা করে। এই মামলাতেও ১৯৩২ সালে ১লা মার্চ কমলা দাশগুপ্ত গ্রেফতার হন এবং কয়েকদিনের মধ্যেই তিনি প্রমাণের অভাবে মুক্তি পেয়ে যান।

কিন্তু, ইংরেজ পুলিশ বাহিনী প্রমাণ সহ তাকে ১৯৩৩ সালে তাকে আবার গ্রেফতার করে। প্রথমে প্রেসিডেন্সি জেলে, পরে মেদিনীপুরের হিজলি জেলে তাকে রাজবন্দী হিসেবে রাখা হয়। ১৯৩৬ সালে জেল থেকে মুক্তি পেলেও ১৯৩৮ সাল পর্যন্ত তাকে গৃহবন্দী করে রাখা হয়। এই বছরেই গান্ধীর সাথে যুগান্তর দলের আলোচনার ফলে যুগান্তর দল কংগ্রেসের সাথে এক হয়ে যায়।

কমলা দাশগুপ্ত কংগ্রেস দলে যোগ দেন। তিনি এই সময় থেকে কয়েক বছরের জন্য মহিলাদের পত্রিকা "মন্দিরা" সম্পাদনার দায়িত্ব পান। এই পত্রিকার উদ্দেশ্য ছিল দেশের মানুষের মধ্যে, বিশেষ করে মহিলাদের মধ্যে দেশাত্মবোধের উদ্দীপনা ও প্রেরণা জাগানো। ১৯৪১ সালে তিনি বঙ্গীয় প্রদেশ মহিলা কংগ্রেসের সম্পাদিকা হন। 

১৯৪২ সালের ৮ই আগস্ট কমলা দাশগুপ্ত ভারত ছাড়ো আন্দোলনে যোগ দিয়ে আবার প্রায় চার বছর ১৯৪৫ সাল পর্যন্ত কারাবাস করেন। জেল থেকে ছাড়া পেয়ে তিনি ১৯৪৬ থেকে ১৯৭২ সাল পর্যন্ত কলকাতার আদর্শ হিন্দি হাই স্কুলে শিক্ষকতা করেন। সাথে সাথে বিপ্লবের মূল স্রোতে ফিরে আসেন।

১৯৪৬ সালের ১০ই অক্টোবর নোয়াখালীর একতরফা সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা বাঁধে। তিনি গান্ধীর নির্দেশে সেখানে

ছুটে যান এবং নোয়াখালী রিলিফ ক্যাম্প পরিচালনার দায়িত্ব ভার গ্রহণ করেন। এইসময় তার কাছে ৮৬ টি চিঠি এসে পৌঁছায় যেখানে বিভিন্ন যুবক স্বেচ্ছায় ধর্ষিত নারীদের বিয়ে সম্মত আছে বলে মত প্রকাশ করেছে। তিনি চিঠিগুলি নিয়ে তিনি নোয়াখালীর শ্রীরামপুর গ্রামে গান্ধীজির কাছে ছুটে যান। মৌনব্রতে থাকা গান্ধী তাকে লিখে জানালেন, " এমন অশুভ ঘটনার সংখ্যা এতবেশী বলে আমি মনে করি না। এরকম ঘটনা খুব বেশি আমার নজরে আসে নি। যাইহোক,যে সব যুবক এমন মেয়েদের বিয়ে করতে চায় তাদের কথা মনে রেখো এবং যখন এরকম প্রকৃত ঘটনার সন্ধান পাবে তখন কী করতে পারো দেখো।"

সুচেতা কৃপালানী কমলা দাশগুপ্তকে দিয়ে বিজয়নগর গ্রামে একটি কর্মকেন্দ্র স্থাপন করলেন। হিন্দু এবং মুসলমানের মধ্যে শান্তি ও সম্প্রীতি স্থাপন করা ছিল তাদের কাজ। ১৯৪৭ সালের ৯ই ও ১০ই ফেব্রুয়ারি গান্ধীজি নিজে বিজয়নগরের এই কর্মকেন্দ্রে ছিলেন। ৯ই ফেব্রুয়ারি কমল দাশগুপ্ত নিজে নন্দীগ্রাম থেকে গান্ধীজিকে বিজয়নগরে যান। সেখানে তিনি গান্ধীজির নির্দেশে হিন্দু মুসলিম সকল মহিলাদের প্রার্থনা সভায় সমবেত করেন।

 কমলা দাশগুপ্ত দলীয় কাজের বাইরে লেখালেখির সাথেও জড়িত ছিলেন। বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায় তিনি লিখতেন। তাঁর লেখা দুটি গ্রন্থ আত্মজীবনী "রক্তের অক্ষরে" ১৯৫৪ সালে এবং "স্বাধীনতা সংগ্রামে নারী" ১৯৬৩ সালে প্রকাশিত হয়। এই গ্রন্থ দুটিতে তাঁর বিপ্লবী ও রাজনৈতিক জীবনের নানা বিষয় উঠে এসেছে। ২০০০ সালের ১৯শে জুলাই কলকাতায় তিনি পৃথিবীর মায়া ত্যাগ করেন।


Rate this content
Log in

Similar bengali story from Abstract