আকাশের রঙ ফ্যাকাশে
আকাশের রঙ ফ্যাকাশে
একশত চারতম অধ্যায়
' খেলিছ এ' বিশ্ব লয়ে , বিরাট শিশু আনমনে '
মাঝরাতে এমন সুরেলা কন্ঠ শুনে বড়দার ঘুম ভেঙে যায় । তিনি দেখেন বীরেশ্বর রক্ষিত তাঁর সম্মুখে দাঁড়িয়ে গান করছেন । বিস্ফারিত চোখে সেই দৃশ্য দেখতে দেখতে তিনি উঠে বসলেন ।
- একি ! মিঃ রক্ষিত ! আপনি বেঁচে আছেন ? আর আপনি এত সুন্দর গান গাইতে পারেন ?
বীরেশ্বর রক্ষিত শুনেও না শোনার ভান করে বললেন - আমাকে কিছু বলছেন ?
বড়দা বললেন - এত রাতে আপনি কেন এসেছেন?
হাসলেন বীরেশ্বর রক্ষিত । সেই দমফাটা হাসি ।
- আমার সর্বত্র অবাধ গতি - ছিল, আছে এবং থাকবে । আপনি এখন কেমন আছেন মিঃ রায়চৌধুরী ?
- আমি ? আমি তো একদম ফিট আছি ।
আবার হাসলেন বীরেশ্বর রক্ষিত।
- এই কথা বলে অন্যকে প্রবোধ দিতে পারেন কিন্তু আমাকে বোঝানো দুষ্কর । আমি জানি আপনি কি রোগে ভুগছেন । মনে হচ্ছে আপনার যাবার সময় এসেছে। দুঃখ করবেন না । মানুষের জীবনই এই রকম । এই আছে এই নেই । নইলে আমাকেই দেখুন না ; কি ছিলাম, কি হয়েছি আবার কি হতে পারি !
- কি বলতে চান স্পষ্ট করে বলুন তো!
বীরেশ্বর রক্ষিত এবার বেশ গম্ভীর হয়ে গেলেন । তথাপি তাঁর মুখ দেখে বোঝার উপায় ছিল না তাঁর আগমনের উদ্দেশ্য কি ! তা-ছাড়াও একজন মৃত ব্যক্তি কি ভাবে সামনে দাঁড়িয়ে কথা বলতে পারেন ।
বড়দা বললেন - আপনি তো মারা গেছেন !
প্রচণ্ড বিকট হেসে বীরেশ্বর বললেন - মারা গেছি ? কে বলেছে ? আমার পার্থিব শরীর হয়তো আর নেই কিন্তু যে সুখ ও সমৃদ্ধি আমি এখন পেয়েছি, তার ছিটেফোঁটাও জীবদ্দশায় ছিল না । একেই বলে অন্তর্লীন অন্তর্দশা ।
বড়দা ভীতু নন । তিনি ভয় পাননি তবু তাঁর মুখ থেকে বেরিয়ে এল - আপনি কি আমাকে নেমন্তন্ন করতে এসেছেন ?
বীরেশ্বর বললেন - শিব শিব । আপনাকে আকারণে নিমন্ত্রণ জানাব কোন দুঃখ? মিঃ রায়চৌধুরী! আপনি আমার পরমাত্মীয় । আমার দুই মেয়েকে এবং সুনেত্রাকে , আর আমার জামাইকে বুক দিয়ে আগলে রেখেছেন । তাদের কি অনাথ করে দিতে পারি ?
- মানুষ হয়েও তো তখন আপনার মনুষ্যত্ব বোধটুকুই ছিল না !
- হতে পারে, সেটা হয়তো আপনার জন্য তোলা ছিল । তবে আমি....
- থাক আর বলতে হবে না। আপনার কথা আপনার কাছেই থাক । এখন বলুন তো কেন এসেছেন? আমাকে ভয় দেখাতে ? নাকি প্রতিশোধস্বরূপ মেরে ফেলতে ?
- ভয় ? হাসালেন আপনি । আমি জানি আপনি ভীতু নন , আর কিসের প্রতিশোধের কথা বলছেন? আপনি আপনার নির্দিষ্ট কাজ করেছেন , আমি আমার । আমি শুধু এসেছি আমার দু'টি প্রাণ যেন আপনার আশ্রয়ে নিরাপদে থাকে সেই অনুরোধ করতে ।
- মেয়েদের আপনি এত ভালবাসেন ? তবে দুই মেয়ের এমন সর্বনাশ করলেন কেন ?
- আপনার ভুল হচ্ছে মিঃ রায়চৌধুরী! যা ঘটেছে ত্রিলোকের জন্য ঘটেছে । তার উপযুক্ত শাস্তি তো সে পেয়েছে। তবে বলতে পারেন, আমার এখনও মুক্তি হয়নি ।
- কি করলে আপনি মুক্ত হবেন ?
- ওই অভিশপ্ত বাড়ী আপনারা বিক্রি করে দিন । সেই অর্থে কোন জনসেবা করুন । পাপের টাকায় তৈরী ওই বাড়ী । কোন পূণ্যকাজে তার সদ্ব্যবহার করুন । তাহলেই আমার মুক্তি হবে।
- এ কথা আমাকে বলছেন কেন ? যারা উত্তরাধিকারী তাদের বলুন। আমি তো সেই ডিশিসন নিতে পারি না ।
বীরেশ্বর খানিক ভেবে বললেন - আমি মেয়েদের সামনে আসার সাহস পাই না । আপনি তাদের বর্তমান অভিভাবক ; সুতরাং আপনার কথা ওরা ফেলবে না আমি জানি। আপনি নির্লোভ সদাচারী তাই আপনাকে বলছি ।
বড়দা বীরেশ্বরকে দেখছেন । ধীরে ধীরে অস্পষ্ট হতে শুরু করেছে তাঁর দর্শণ ।
এক সময় আর দেখা যায় না । অনেক চেষ্টা করেও যখন তিনি আর দেখতে পেলেন না সজোরে চিৎকার করে বললেন - মিঃ রক্ষিত !!!!
তিনি এত জোরে চিৎকার করেছিলেন যে আমাদের সকলের ঘুম ভেঙে গেল । শব্দের উৎস সন্ধানে বেরিয়ে বারান্দায় আসতে দেখি বড়দা কাত হয়ে পড়ে আছেন । তখন কেউ জল, কেউ হাওয়া দিয়ে, মুখে চোখে ফুঁ দিয়ে তাঁর শ্বাস ফেরানোর চেষ্টা করছি । সব চেষ্টা বিফল হতেই মনে পড়ল ডাক্তার দত্তের কথা ।
ফোনে ফোনে আস্থির করে তুললাম। শেষে একলাই বেরোলাম তাঁর বাড়ীর দিকে । তখন আমার যা অবস্থা কোন বাধাই বাধা বলে মনে হল না । ডাক্তার দত্তকে উঠিয়ে নিয়ে এলাম এক রকম জোর করেই । নাড়ী টিপে তিনি জানিয়ে দিলেন ' হি ইজ নো মোর ' । একটা কোরামিন ইঞ্জেকশন দিচ্ছি যদি কিছু হয় । সকালে আবার খবর নেব ।
গোপা , রূপা, সুনেত্রা কেঁদে কেঁদে আছাড় খাচ্ছে । আমি পাষাণের মত দাঁড়িয়ে আছি । বাবলুদাকে বুকুনকে ফোনে দু: সংবাদ দিতে যাব ; বড়দা হঠাৎ গোঁ গোঁ আওয়াজ করতে লাগলেন । আমরা বুকে হাপরের মত করে একবার চাপ দিচ্ছি, আবার ছেড়ে আবার চাপ দিচ্ছি । বড়দা এবার চোখ মেলে চাইলেন ।
নিমেষে কান্নার অশ্রু আনন্দাশ্রুতে পরিণত হয়ে গেল । ধরাধরি করে ওঁকে বিছানায় শুইয়ে দিলাম । বড়দা ঈশারা করে বলতে চাইলেন বিপদ কেটে গেছে । আমি দত্ত ডাক্তারকে ফোন করে আশ্চর্য্য ঘটনার কথা বললাম ।
ডাক্তার দত্ত বললেন - স্ট্রেঞ্জ ! মিরাকেল।
ভোর বেলাতেই বাবলুদা এসে গেছে । বলল - একটা বাজে স্বপ্ন দেখে ঘুম ভেঙে গেল । কিন্তু রাতে বেরোতে সাহস হয়নি বলে ভোর না হতেই চলে এলাম । এসে দেখি আমার স্বপ্ন সত্যি । যাক বাবা স্বপ্নেরা সবসময় যেন ভুলই হয় ।
বড়দা বললেন- আমার স্বপ্নটা ভুল নয় বাবলু , হকিকত।
বাবলুদা বলল - বড়দা ! বড়দা ! আপনি এখন বিশ্রাম নিন। কথা বলতে হবে না । সুস্থ হলে সব শুনব ।
আমিও তাই বললাম । কিন্তু বড়দা শুনলেন না। বললেন - আমাকে বলতেই হবে । নইলে আমি পরপারে গিয়েও শান্তি পাব না ।
- কিন্তু আপনি এখন তো বলার মত অবস্থায় নেই ! না না, আপনাকে এখনই কিছু বলতে হবে না। ভগবানের কৃপায় যখন ঠিক আছেন তখন আপনার সব কথা পরে শুনব ।
বাবলুদা বড়দার পায়ে ধরে বলল ।
বড়দা তখন উঠে বসলেন । যেন প্রমাণ করতে চাইলেন তিনি একেবারে সুস্থ আছেন । আমরা সবাই মিলে অনুরোধ করতে লাগলাম।
বড়দা বললেন - বউমা এক কাপ চা দাও তো !
বাবলুদা বলল - আমি এখনই চা করে আনছি । বলে কিচেনে চলে গেল ।
সুনেত্রা বড়দার হাত পা টিপতে লাগল । রূপা তাঁর মাথায় জোরে জোরে পাখার বাতাস দিতে লাগল । রূপা বলল - এখন কেমন ফিল করছেন বড়দা ?
বড়দা বললেন - হঠাৎ মাথা ঘুরে পড়ে গেছিলাম। এখন ঠিক আছি ।
বাবলুদা চা বিস্কুট নিয়ে এল । বলল - এই দুটো খান বড়দা, শরীরে তাগদ পাবেন । চায়ে ডুবিয়ে খান দেখি !
চায়ে চুমুক দিয়ে বড়দা বললেন - বীরেশ্বর রক্ষিত এসেছিলেন । আমার সঙ্গে দীর্ঘক্ষণ কথা বললেন। আমি গোপা ও রূপার সঙ্গে কথা বলতে বললাম । উনি বললেন ওদের সামনে দাঁড়াতে পারব না । আপনিই শুনুন ।
( চলবে )

