আকাশের রঙ ফ্যাকাশে
আকাশের রঙ ফ্যাকাশে
অষ্টসপ্ততিতম অধ্যায়
অবশেষে আমাদের পরিকল্পনা - না - পরিকল্পনা ঠিক বলব না ; বরং পরামর্শই বলা ভালো। যাই হোক আমাদের পরামর্শ মেনে পুলিশ যে কাজ করেছে কোন প্রশংসাই এখানে যথেষ্ট নয় ।
আমাদের - বিশেষ করে আমার - শখের গোয়েন্দাগিরি যে করতে পারি - এ' কথা ভেবে গর্ব হচ্ছে । ভয়ও করছে । বীরেশ্বরের প্রেতাত্মা যদি আমার পিছু নেয় ! পরক্ষণেই নিজেকে ভীষণ বোকা ভাবছি । এ ভাবেই কেটে যায় দিন । গোপার কোন আক্ষেপ নেই, রূপাও তাই । শুধু সুনেত্রার মনটা ভালো নেই । বয়স কম তো ! মাঝে মাঝে বলে ফেলছে - আলতাফ বড়দাদুকে মারল কেন ?
আমরা ইনিয়ে বিনিয়ে ওকে বুঝিয়ে দিচ্ছি । তাতে ওর মন মানেনি । রূপা ধমক দিতেই চুপ করে গেল । বলল - তোকে আর এখানে রাখা যাবে না । বুকুনকে বলে দিই আমাদের দুমকা নিয়ে চলুক ।
- কেন মা ? আমরা তো এখানে বেশ আছি !
রূপা বলল - তোর তো ছুটি শেষ হতে চলল । এবার তো কলকাতায় ফিরতেই হবে রে !
- যাব না মা । ভাবছি চাকরিটা ছেড়ে দেব ।
গোপা বলল - চাকরি ছেড়ে কি করবি ? একদিন না একদিন কলকাতায় তো ফিরতেই হবে । এই যে বুকুন - দেখ বুকুন আপ্রাণ চেষ্টা করে যাচ্ছে কলকাতায় ট্রান্সফার নিতে । সরকারকে বলেছে কোন কোম্পানিতে সমপদে ট্রান্সফার করতে । ওর নাকি কলকাতা খুব ভালো লাগে । তখন তো আমাদেরও যেতে হবে ।
- তোমরা কেন যাবে মাসী ? শ্বশুরবাড়ী ছেড়ে কেউ বাপের বাড়ীতে থাকে নাকি !
গোপা জবাব দিতে পারে না । রূপা বলে - ফাজিল মেয়ে! এখন থেকে বাপের বাড়ী শ্বশুরবাড়ী কি বলছিস?
সুনেত্রা চুপ করে যায় । আমি যেমন বড়দার মুখের উপর কোন কথা বলতে পারি না ; সুনেত্রাও তেমনই রূপার উপরে কথা বলে না ।
রূপা বলে - আমরা কলকাতায় গেলেই কি ওই বাড়ীতে ফিরব নাকি ? কখনও না । ওটা অভিশপ্ত বাড়ী । ওর ইট কাঠ পাথর সবই মৃত । এই দেখ না আমার বাবা মানে তোর ছোট দাদু যা করে বেড়াচ্ছে , ওখানে গিয়ে কি শান্তিতে থাকতে পারব ?
- মা, তবে আমরা কোথায় থাকব ?
- ভাড়া বাড়ীতে । সূর্য্যসেন স্ট্রীট থেকে অনেক দূরে। যেখানে আমার বাবাও টের পাবে না আমরা কলকাতায় এসেছি ।
- মা ? তাহলে তো আমার অফিস অনেক দূরে হয়ে যাবে মা?
- কোন অসুবিধা হবে না । এই যে শিউলি, মসলন্দপুর থেকে যাতায়াত করছে; ওর কি অসুবিধা হয় শুনি !
মা মেয়ের এই তর্কের মধ্যে আর গেলাম না । টিভিতে নিউজ চ্যানেল খুলে দেখছি । সব চ্যানেলেই একটাই নিউজ - বীরেশ্বর রক্ষিত শুটেড আউট । আততায়ী পুলিশ এনকাউন্টারে মৃত । কিন্তু কোন চ্যানেলই বলছে না কেন তাঁকে মারা হল ।
এমন সময় বড়দার ফোন বেজে উঠল । ওপার থেকে মিঃ পরমেশ্বরের কন্ঠ ভেসে এল । এখন কলকাতায় স্থিতাবস্থা চলছে । কোন গোলমাল হচ্ছে না । রাজ্যপাল কিছুদিনের জন্য সভা সমাবেশ মিছিল নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছেন ।
নির্বাহী মুখ্যমন্ত্রীও চুপ করে গেছেন । এমতাবস্থায় আপনারা যদি একবার সময় করে ললালবাজারে আসতে পারেন; পরবর্তী পদক্ষেপের জন্য আলোচনা করতাম ।
বড়দা বললেন - সকালে গিয়ে বিকেলে ফিরে আসতে পারব তো ?
- একদম । একদম । কোন অসুবিধা নেই । ঘন্টাখানেকের মত সময় দিলেই হবে ।
বড়দা বললেন - মুখার্জী সাহেবও থাকবেন নিশ্চয় ।
- শুধু মুখার্জী সাহেব নন: খোদ পুলিশ কমিশনার আপনার সঙ্গে মিলিত হতে চাইছেন ।
বড়দা উৎফুল্ল হয়ে বললেন - ঠিক আছে আমরা সকাল সকাল বেরিয়ে পড়ছি । ধন্যবাদ।
পরদিন ভোরবলায় বেরিয়ে পড়লাম। ট্রেনের অনেক ঝামেলা । তাই বাসে করে ধর্মতলায় নেমে একটা ট্যাক্সিতে চলে গেলাম লাল বাজারে।
ঘড়ির কাঁটা এগারোটা ছুঁই ছুঁই। কমিশনার সাহেব কনফারেন্স রুম থেকে বেরিয়ে চেম্বারে ঢুকলেন । মিঃ মুখার্জী আমাদের আগমন বার্তা কমিশনারকে দিতেই বললেন - চেম্বারেই নিয়ে আসুন ।
আমরা শুভেচ্ছা প্রতিশুভেচ্ছা জানিয়ে রুদ্ধদ্বার কক্ষে বৈঠকে বসলাম ।
বড়দা বললেন - গোটা প্ল্যানটাই আমার এই ছোট ভাইয়ের মস্তিষ্কপ্রসুত । আলোচনার মাধ্যমে যা করা হয়েছে এ'ছাড়া অন্য উপায় ছিল না ।
কমিশনার সাহেব আমি কি করতাম , কি করার প্রোগ্রাম আছে জানতে চাইলেন ।
বললেন - একটা বড় কাঁটা তো বের করতে সক্ষম হয়েছেন ; পরেরটার জন্য কি উপায় ঠিক করেছেন ?
আমি বললাম - বীরেশ্বর ত্রিলোকেশ্বরের মত সরাসরি রাজনীতিতে যুক্ত ছিলেন না । দলীয় মুখপাত্র বলে কাজটা সারতে বেগ পেতে হয়নি । কিন্তু ত্রিলোকেশ্বর রক্ষিত আরও ধুরন্ধর । ভিজে বিড়ালটির মত থাকেন বটে, আসলে উনিই আমার মনে হয় নাটের গুরু । সুতরাং একই পদ্ধতিতে দু'জনকে সরিয়ে দেওয়া মনে হয় সমীচীন হবে না । অবশ্য আপনারা দীর্ঘদিন অপরাধ বিজ্ঞান নিয়ে চর্চা এবং কাজ করছেন। আমার চেয়ে তা' আপনারা আরও ভালো বুঝবেন ।
- তবুও আপনার কি কোন স্বতন্ত্র পরিকল্পনা আছে ?
- আপাতত আমি আগে আপনাদের পরিকল্পনার কথা জানতে চাই ।
বড়দা এতদিন আমাকে মুখচোরা অপবাদ দিয়ে এসেছেন । আজ আমার কথা শুনে তিনি যেন হাঁ হয়ে আছেন ।
কমিশনারকে বললেন - হি ইজ রাইট স্যার । আইনশৃঙ্খলার ব্যাপারটা আপনারা ভালো জানেন । আগে আপনারা কেউ বলুন কি ভাবে সিচুয়েশন কন্ট্রোল করবেন ।
কমিশনার সাহেব একবার মুখার্জী এবং ভট্টাচার্য্যের মুখের দিকে চেয়ে বললেন - ভটচাজ, মুখুজ্জে ! বলুন কি বলবেন ?
মিঃ মুখার্জী বললেন - স্যার । নির্বাচনী নির্ঘন্ট এবং আচরণবিধি চালু হয়ে গেছে । এই সময় একজন ক্যাণ্ডিডেট মরে গেলে সেই কেন্দ্রের নির্বাচন স্থগিত হয়ে যাবে । সুতরাং আমি বলছিলাম অবস্থার একবার পরিবর্তন হোক তারপর কোন ব্যবস্থা নেওয়া যাবে ।
মিঃ ভট্টাচার্য্যও সম্মতি দিলেন ।
বড়দা বললেন - অবস্থার পরিবর্তন বলতে আপনারা কি মিন করছেন ? রাজনৈতিক পটপরিবর্তন নাকি পূর্বেকার শাসকদলের পুনরাগমন ?
আমি বললাম - ত্রিলোকেশ্বর রক্ষিতকে ক্ষমতায় আসতে দেওয়া বাঞ্ছনীয় নয় । আমার ক্ষুদ্র বুদ্ধিতে যেটুকু বুঝেছি তাতে শাসকদলের পুনরাভিষেক প্রায় অসম্ভব । গত কয়েক বছরে সরকারের কাজের খতিয়ান যা বলে তাতে জনসাধারণ যে ক্ষুব্ধ একথা হলফ করে বলা যায় ।
বড়দা বললেন - ও ঠিকই বলছে স্যার । নিচুতলার কিছু পুলিশ অফিসার দুর্নীতির সঙ্গে আপোষ করেছেন । সেজন্য জনগণ একপ্রকার ক্ষোভে ফুঁসছেন। নির্বাচন স্থগিত হলে মহাভারত অশুদ্ধ হয়ে যাবে না কিন্তু ত্রিলোকেশ্বরকে বাঁচিয়ে রাখার সুযোগ দিলে সে আরও ভয়ংকর হয়ে উঠবে । দুর্ভাগ্যক্রমে আমরা তাঁর ঘনিষ্ঠ আত্মীয় । তাই বলে তাঁকে আর রেয়াত করা ঠিক হবে না ।
কমিশনার সাহেব বললেন - তাহলে আপনারা বলতে চাইছেন ইমিডিয়েট অ্যাকশন নিতে ।
আমি বললাম - এক্জাক্টলি । হোক না সেম মেথড। সেখানে একটু হেরফের করে দিলেই ঝামেলা শেষ ।
মিঃ মুখার্জী বললেন - পুলিশ কি শুট করতে পারবে? এতে তো চরম বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হবে ।
আমি বললাম - পুলিশ কেন শুট আউট করবে ? বীরেশ্বরের মত ত্রিলোকেশ্বরেরও অনেক পোষা কুত্তা আছে । তাদের কাউকে বা ভাড়া করা বাইরের লোক এনে ফিনিশ করে দিলেই হল । তবে এবার পুলিশ আততায়ীকে পালিয়ে যেতে হেল্প করবে । আর অজ্ঞাতপরিচয় আততায়ীর হাতে মরলে তো কারও কিছু বলার থাকবে না । বড় জোর আদালত সি বি আই এনকোয়ারী চাইবে । তখন তো বড়দা রয়েছেন। ' র' এর প্রাক্তন গোয়েন্দা। তিনি ম্যানেজ করে দেবেন ।
বড়দার মুখে হাসি ফুটল দেখে আমিও স্বপ্নের বীজ বোনা শুরু করলাম ।
( চলবে )

