আকাশের রঙ ফ্যাকাশে
আকাশের রঙ ফ্যাকাশে
একশত সাততম অধ্যায়
শেষ পর্য্যন্ত বড়দার কথাই মিলে গেল । পোস্টমর্টেম রিপোর্ট অনুসারে গলা টিপে খুন করে ঝুলিয়ে দেওয়া হয়েছে - সেই রিপোর্টৈর একটা কপি এবং মৃতদেহ নিয়ে বাবলুদা এবং বউদিদির ফিরে আসার কথা । তারা আসছে না দেখে আমি উদ্বিগ্ন হয়ে বড়দাকে বলি - আমি কি বর্ধমানে যাব ?
বড়দা বললেন - যেতে তো হবেই। তবে সঙ্গে আরও দু'চারজনকে নিয়ে যা ।
- কিন্তু বাবলুদারা তো ওখানেই আছে ?
- ওরা ওখানেই থাকবে জানতাম। তাই ওদের যেতে মানা করেছিলাম । মীনাক্ষী কাকিমার নিকটতম আত্মীয় ওরা - মেয়ে জামাই । সুতরাং প্রথম সন্দেহভাজন ওরাই তো হবে ? আমি জানি ওদের পুলিশ ডিটেইনড করেছে । এতক্ষণে হয়তো হাজতে ঢুকিয়ে দিয়েছে ।
- সে কি কথা ? পুলিশ এমন করতে পারে না। ওদের তো কোন দোষ নেই!
- সে তো আদালত বিচার করবে । তবে প্রাথমিক সন্দেহের তালিকায় ওদের থাকাটা অপরাধ বিষয়ক তদন্তের প্রাথমিক শর্ত ।
আবার শর্ত ! আমার মনে হল প্রতি পদে যদি শর্ত সাপেক্ষ কাজ করতে হয় তবে পুলিশ তো গোয়েন্দাই হয়ে যেত ।
বললাম - সে তো প্রমাণ চাই। শুধু শুধু সন্দেহের বশে কাউকে কি আটক করে রাখা যায় ?
বড়দা আমার বালখিল্যতার জন্য হেসে ফেললেন। আমার মনে হল কোন বোকা বোকা উত্তর দিয়ে ফেললাম নাকি !
বললাম - কিন্তু আমরা জানি ওরা সম্পূর্ণ নির্দোষ।
- আমাদের জানা না জানায় কি আসে যায় ! এবার ওদেরই মানে বাবলুদেরই নিজেদের নির্দোষিতার প্রমাণ দিতে হবে ।
- এ কেমন কথা ? এটা তো পুলিশের কাজ - ওদের দোষী প্রমাণ করা ।
- সেজন্যই তো জিজ্ঞাসাবাদ করতে আটক করেছে। দেখ কিছু শর্ত দিয়ে হয়তো ছেড়েও দিতে পারে । যাকগে , আমাকে একবার বর্ধমানের এস পির সঙ্গে কথা বলতে হবে । তিনি কি বলেন শুনি !
বড়দা ফোন করলেন এবং জানতে পারলেন যে দু'জনকে আটক করা হয়েছিল তাদের ছেড়ে দেওয়া হয়েছে । ডেডবডি নিয়ে ওরা রওনা হয়ে গেছে ।
যাক আমাকে আর বর্ধমানে যেতে হল না । বড়দা বললেন - তোর কিন্তু ছুটি হয়ে গেল না ভাই । আমার শরীরটা ভালো নেই । তোকে একলাই সামলে নিতে হবে । ওরা ফিরে এলে তোকে স্পট ইনভেস্টিগেশনে যেতে হবে । স্ক্যানার নিয়ে বাড়ীটার তল্লাশি নিবি । কোন সন্দেহজনক কিছু দেখলে তা' রেকর্ড করবি ।
আমার মাথা ঘুরে গেল । স্ক্যানার নিয়ে কি দেখব , কি রেকর্ড করব - কিছুই বুঝতে পারলাম না। কিভাবে কি করব সে সম্বন্ধেও কিছু জানালেন না । আবার যদি প্রশ্ন করি তা'হলে তো উত্তর বাঁধাই আছে - আমড়া কাঠের ঢেকি!
খুব ইগোতে লাগল । আমিও কিছু না বলে চুপ করে দাঁড়িয়ে রইলাম।
বড়দা বললেন - আমার প্রথম থেকেই সন্দেহ হয়েছিল। কাকিমা অহেতুক কেন সুইসাইড করতে যাবেন ? ওঁর তো কোন শত্রু নেই ! হ্যাঁ, মাঝে মাঝে অন্যদের উল্টোপাল্টা কথা শুনিয়ে রাগিয়ে দিতেন । আচ্ছা ! তাদের কেউ এমন কাজ করতে পারে বলে তোর মনে হয় ?
আমি বললাম - অনেক কিছুই হতে পারে । এই যে বাবলুদা আর বউদিদিকে পুলিশ এতক্ষণ ধরে রাখল সে কি অকারণে ? হয়তো মেয়ে জামাই পরিচয় পেয়ে ওদের মনে সন্দেহ হয়েছে ; বিশেষত কেস যখন সুইসাইড নয় ; মার্ডার !
- যাক , বুঝেছিস তবে ?
আবার টিপ্পনি! হজম করতেই হল । গোয়েন্দা হবার শখ যে আমাকে পেয়ে বসেছে !
বাবলুদা লাশ নিয়ে ফিরল । গ্রামের লোকজন একে একে সবাই জড়ো হতে লাগল কাকিমার দরজায় । কেউ বলল - বড়ো ভালো ছিল গো ! কি করে যে এমন ঘটল কে জানে!
কেউ বলল - বড় আঁতে ঘা দিয়ে কথা বলার স্বভাব ছিল বুড়ীটার । কি জানি কি ঘটে গেল ?
আবার কেউ বলল - ও মরার পর শত্তুরও ভালো হয়ে যায় । যা হয়েছে মন্দ নয় ।
আমি সব শুনছি , সব দেখছি আর ছবি তুলে রাখছি । নিয়ম মত ডেডবডি তুলসী তলায় নামিয়ে রেখে হিন্দু বিধি মেনে কেউ প্রণাম, বা শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করল ।
বাবলুদা বলল - আর একটু হলেই কেস খেয়েছিলাম ছোকরা ! পুলিশকে পাশ কাটানো যে কি সমস্যা কি বলব !
আমি ওর মুখে পুলিশের প্রশ্নমালা জেনে নিচ্ছি , জ্যোৎস্না বউদিদি জোরে জোরে কান্নাকাটি করছে। পাড়ার লোকেরা গায়ে মাথায় হাত বুলিয়ে ওকে সান্ত্বনা দিচ্ছে। বাবলুদাকে বললাম - একবার ওই জায়গাটা দেখে আসি ।
- কোন জায়গা?
- যেখানে কাকিমাকে ঝুলিয়ে দেওয়া হয়েছিল ।
- তুমিও বলছ ? পুলিশও একই কথা বলেছে । বলেছে আমরা ওই জায়গাটা আবার দেখতে যাব ।
বাবলুদাকে বললাম - চল তো দেখে আসি !
বাবলুদা নিয়ে গেল । বলল - এখানে - ঠিক এইখানটায় শাশুড়ি মা ঝুলছিল । জিভটা এক হাত বেরিয়ে এসেছিল ।
- সে তো আমিও দেখেছি।
বলে বেশ কয়েকটা ছবি নিলাম । কড়িকাঠে যেখনে ঝুলিয়ে দেওয়া হয়েছিল সে ছবিও নিলাম ।
বাবলুদা বলল - তুমি কি ছাঁদ বিঁধ করছ নাকি ?
কোন উত্তর না দিয়ে ওকে বললাম - শ্মশানে কখন নিয়ে যাবে ?
- সব কিছু রেডি হয়ে যাক । তারপর ..
- মানে এখনও ঘন্টাখানেক লেগে যাবে । আমি অবশ্য তার আগেই চলে আসব ।
- এখন যাচ্ছ কোথায় ?
- বাড়ীতে । গামছা আনতে ভুলে গেছি । আমি আসছি ।
বাবলুদা ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে রইল ।
বাড়ীতে ফিরে বড়দাকে ছবিগুলো দেখালাম । বড়দা বললেন - আমি দেখছি ; তুই এখন আয় - শ্মশানে যেতে হবে তো !
শ্মশান যাত্রার আগেই আমি আরও একবার বডিটা দেখতে চাইলাম । হাত পা, এবং বিশেষত গলাটা ভালো করে চেক করলাম । গলায় বা দেহের অন্যান্য জায়গায় ফাঁসের দাগ ছাড়া কিছুই বুঝতে পারলাম না। সেজন্য বডিটার ছবি মোবাইলে বিভিন্ন কর্ণার থেকে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে তুলে রাখলাম ।
শবদাহ শেষে যখন স্নান করে বাড়ীতে আসি তখন প্রায় ভোর হতে চলেছে । ঘন অন্ধকার কাটতে শুরু করেছে।
আমি বাড়ী ঢোকার মুখে একটা কিসের যেন কনকনে ছোঁয়া পেয়ে পায়ের দিকে নজর দিলাম । দেখি একটা সাপের মত দেখতে সরীসৃপ লকলকিয়ে হেলে দুলে চলে যাচ্ছে ।
বাড়ীতে এসে আবার স্নান করে বসলাম । চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে বড়দাকে এই ঘটনার কথা জানালাম। বড়দা বললেন - পায়ের যেখান দিয়ে ওটা চলে গেল সেখানে একটুকু চুণ লাগিয়ে নে ।
বললাম - চূণ ! এখন চূণ খুজতে কোথায় যাব ?
- ওরে আমি কলিচূণের কথা বলছি । দেখগে গোয়াল ঘরে একপাশে রাখা আছে । সিঁধ বন্ধ করতে প্রলেপ দেবার জন্য এনেছিলাম ।
বড়দা বললেন; অতএব আমাকে চূণ লাগাতেই হল । আর তখনই স্পষ্ট হয়ে গেল ওই সরীসৃপের কারসাজি । পায়ের ওই জায়গাটা ধুয়ে দেখি একটা হলদে রঙের দাগ ।
বড়দা বললেন - কিছু দেখলি ?
আমি বললাম - এই দেখুন জায়গাটা হলুদ হয়ে গেছে । বড়দা তখন বীরেশ্বর রক্ষিতের চিরকুট আমার হাতে দিয়ে বললেন - মিলিয়ে দেখ তো এ'রকমই হলদে কি না !
একটা হলদে কাগজে লঙ্কেশ্বর চিঠি লিখেছিলেন । আমি পায়ের কাছে ধরে দেখি হুবহু একই রকম হলুদ হয়ে আছে পায়ের ওই স্থান ।
( চলবে )

