STORYMIRROR

SUSHANTA KUMAR GHOSH

Tragedy Inspirational Children

4  

SUSHANTA KUMAR GHOSH

Tragedy Inspirational Children

ট্যাংরা হাঁটে খেলার মাঠে

ট্যাংরা হাঁটে খেলার মাঠে

7 mins
330

ট্যাংরা হাঁটে খেলার মাঠে

সুশান্ত কুমার ঘোষ

সকাল থেকেই আকাশের মুখ ভার। এ সময়টা মাঝে মধ্যে এমন হয় সেটা তিতাস জানে। কোনটা রাগ, কোনটা দুঃখ সেটাও বুঝতে পারে। রেগে থাকলে ঝর ঝর করে ঝরে পড়ে মুষলধারে। ভেসে যায় পথ ঘাট। সাদা চাদরে ঢেকে যায় চারপাশ । আর দুঃখ হলে ঝির ঝির করে ঝরে। পথ ঘাট ভিজলেও ভেসে যায় না। 

আজ আকাশটা রেগেই আছে। এই হুড়মুড়িয়ে ভেঙে পরল বুঝি। তিতাসের আজ স্কুল যেতে ইচ্ছে করছে না। একটু পরে বৃষ্টি নামবে, ঢেকে যাবে চারপাশ। ঘরে বসে জানালা খুলে বৃষ্টি দেখবে। দু' হাত দিয়ে লুফে নেবে বৃষ্টিধারা। মা বানাবেন তেলে ভাজা! গরম গরম তেলে ভাজা আর মুড়ি খেতে খেতে বৃষ্টি দেখা - বেশ জমবে! 

মা বললেন -" তিতাস, তৈরি হয়ে নাও।"

তিতাস বলল - " আজ স্কুলে যাব না মা। বৃষ্টি হবে যে! "

" সেকি কথা! বৃষ্টি তো এখনো শুরু হয়নি! তা ছাড়া বাড়ির সামনে থেকে বাসে উঠবে। স্কুল গেটে গিয়ে নামবে। সঙ্গে থাকবে রেইন কোট! বৃষ্টি হলেই বা ক্ষতি কি!"

মায়ের কথা ফুরতে না ফুরতেই তুতুন ডেকে উঠল-

" তিতাস, চলে আয়। বাস এসে যাবে! "

তুতুনের আবার রকম সকম আলাদা। মা বললেন, " তুতুন, আজ স্কুল যেতে হয় না। খুব জোর বৃষ্টি হবে মনে হচ্ছে।"

তুতুন বলল " হলেই বা বৃষ্টি, রেইন কোট আছে তো! বর্ষায় বৃষ্টি হবে না তো কি রোদ উঠবে! মিস বলেছেন, স্কুল ফাঁকি দিতে নাই। যারা স্কুল ফাঁকি দিয়ে বাড়িতে বসে থাকে, তারা ব্যাড বয়! " তা গুডবয় তুতুন যখন মেঘ বৃষ্টিতেও স্কুল যেতে চায়, মা আর কি করে নিষেধ করেন!

তিতাস বাড়ি থেকে বেরনোর আগেই স্কুল বাস এসে থামলো। তিতাস দৌড়ে এসে বাসে উঠল। স্কুলে পৌঁছনোর পরেই শুরু হল বৃষ্টি। চারপাশ সাদা হয়ে গেল। সামনে কিচ্ছু দেখা যায় না। টিফিনে তো ওরা মাঠে খেলতেই পারল না। বৃষ্টির বেগ একটু কমেছিল বটে, কিন্তু পুরো মাঠ ভরে গিয়েছিল জলে। তুতুন দারুণ খুশি। সে পাঁচটা নৌকা ভাসাল জলে। তিতাস কিন্তু একটাও নৌকা বানায় নি।

" এই তিতাস, নৌকা বানা। "

" না, আমি নৌকা ভাসাব না। খাতার পাতা ছিঁড়লে মা বকবে।"

তুতুনের অবশ্য বকাটকার ব্যাপার নাই। বাবা তো মাকে মাঝে মধ্যে বলেন -"ওকে বক কেন? ও এখন ছোট। বড় হলে সব ঠিক হয়ে যাবে। "

তুতুন তো ছোট। ছোটদের কেউ বকেনা।

ছুটির সময় বৃষ্টি থেমে গেল। কিন্তু খেলার মাঠের জল তখনো সরে নাই। একটা মাত্র নিকাশি নালা বেয়ে ওই জল গিয়ে পরে স্কুলের পাশের জলায়। আগে জলাভূমিটা অনেক বড় ছিল। ওদিকে ঘর বাড়ি কিছু ছিল না। তুতন যখন প্রথম এলো স্কুলে, তখনো সব ফাঁকা। দোতলার বারান্দায় দাঁড়ালে দিগন্ত জোড়া সবুজ মাঠ দেখা যেত। মাত্র দু তিন বছরে জলাভূমির একটা দিক পুরো ভরাট হয়ে গেল। ওদিকটা এখন নতুন পল্লী। আগের মতো দিগন্ত জোড়া সবুজ ক্ষেত এখন আর দেখা যায় না। এখন এপাশে সামান্য একটু জলাভূমি অবশিষ্ট আছে। ওখানটাতেও কারা যেন কি সব বানাতে চেয়েছিল। স্কুলের আপত্তিতেও কাজ হয়নি। শেষে তাদের এলাকার পরিবেশ রক্ষা কমিটির কাকুরা তাদের স্কুলের ছেলেমেয়েদের নিয়ে শহরের পথে পথে ঘুরল। তাই রয়ে গেছে জলা টুকু। সেই সময় কাকুরা বলেছিল, বসতি বা স্কুল এলাকার কাছাকাছি জলাশয় থাকা খুব দরকার। নয়তো আগুন লাগলে জল কোথায় পাওয়া যাবে। বড় বড় শহরে কাছাকাছি জলের ব্যাবস্থা থাকে না বলেই তো আগুন নেভানো যায়না।

তাদের শহরটা অবশ্য বড় নয়। এখনো অনেক পুকুর জলাভূমি আছে। তবে তিতাস মাঝে মধ্যেই বাবাকে বলতে শোনে, তাদের শহরটাও নাকি বর্ধমানের মতো বড় হয়ে যাবে। ওরাও তো দেখছে। প্রথম যখন স্কুল আসত, রাস্তার দুপাশে ধান জমি ছিল সব। এখন সেখানে কত বড় বড় ঘর বাড়ি, দোকান, অফিস হয়ে গেছে সব। বাস থেকে এখন আর ধানের ক্ষেত দেখাই যায় না।

ক্লাস থেকে বেড়িয়েই তুতুন দৌড়ে নেমে এলো মাঠে । এখনো মাঠে ছিপছিপে জল জমে আছে। এই জলে দৌড়াতে তুতুনের খুব ভালো লাগে। পা ফেলার তালে তালে পায়ের নিচের জল ছড়িয়ে পরে চারদিকে। জলের ছিটে এসে গায়ে লাগে। শরীর কেমন শিউরে ওঠে। সেই অনুভূতিটা তুতুন কাউকে বোঝাতে পারেনা। মাকে তো নয়ই। বৃষ্টি শেষে উঠোনে নামলেই মা কেবল বকা দেন।

" তুতুন, উঠে এসো। ঠান্ডা লাগবে। "

আজ সে উঠছে না। এখানে তো মা নেই। কে তাকে বকবে!

এদিকে তিতাস হন্যে হয়ে খুঁজে ফিরছে তুতুনকে। মাঠে নেমে দেখা মিলল তুতুনের। 

" এই তুতুন, দৌড়াস না। পরে যাবি। "

কে শোনে কার কথা। তুতুন লাফিয়ে বেড়ায়। তার মনে হয়, তিতাসটাও যেন কেমন! সেও মায়েদের মতো শাসন করতে শিখে গেছে। কিন্তু ও সব নিয়ে ভাববার সময় এখন নয়। সে তিতাসকে ডাকল-" আয় এখানে। "

তিতাসেরও ইচ্ছে করছে জলে জলে দৌড়াতে। কিন্তু স্কুলের পোশাক ভিজলে মা বকবেন যে!

" বকে তো বকুক। বকাই তো খাব!" এই ভেবে তিতাসও দৌড়ে এল তুতুনের কাছে। দুজনে দৌড়াতে দৌড়াতে চলে এসেছিল পাঁচিলের কাছে। একটা ট্যাঁ ট্যাঁ শব্দ কানে এলো। তুতুনই শুনল শব্দটা প্রথম। শব্দ অনুসরণ করে একটু বাম দিকে যেতেই জিনিসটা ওদের চোখে পরল। একটা ট্যাংরা মাছ জল শূন্য ডাঙায় বুকে হেঁটে যাচ্ছে আর ট্যা ট্যাঁ শব্দ করছে। তুতুন " ট্যাংরামাছ ট্যাংরামাছ " বলে লাফাতে লাফাতে মাছটাকে ধরতে গেল। তিতাস তুতুনের একটা হাত টেনে ধরে - " যাস না তুতুন। ওদের কাঁটা আছে! হাতে বিঁধে দেবে! "

তিতাসের কথা শেষ হতে না হতেই ট্যাংরা ট্যাঁ ট্যাঁ শব্দে বলে উঠল -" এসো তুতুন! এসো তিতাস! আমার সঙ্গে খেলবে এসো! তোমাদের সঙ্গে বড্ড খেলতে ইচ্ছে করছে! আমি তো আর বেশিক্ষণ বাঁচব না! "

ওরা দুজনেই চমকে উঠলো! এগিয়ে এলো ট্যাংরার পাশে! তুতুন মাটির কাছে মুখ নামিয়ে জিজ্ঞাসা করল -" বাঁচবে না কেন? "

" তোমরা আর আমাদের বাঁচতে দিচ্ছ কই!"

ওরা দুজনেই বেশ অবাক হয়ে গেল! ওরা কি দোষ করল! ওরা তো ট্যাংরাকে মারেও নাই, ধরেও নাই! তাহলে ট্যাংরা অমন কথা বলছে কেন! তুতুন বলল-

" আমরা তো তোমার কিছু করি নাই! "

" তোমরা না করলেই বা। তোমাদের বড়রা যে আমাদের বংশ লোপের জোগাড় করছে! '

" কি করেছে বড়রা? " তিতাস জিজ্ঞাসা করল।

" কি আর বলি বলো তো! যে জমিতেই যাই, সেখানেই বিষ! জ্বলে গেল! আমার সর্বাঙ্গ জ্বলে গেল! "

ওরা দুজন অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকে একে অপরের মুখের দিকে! দুজনেই অস্ফুটে বলে ওঠে "বিষ!"

" হ্যাঁ বিষ! এই দেখো না! দিব্যি খেলছিলাম দামোদরের জলে! "

" দামোদর? সে তো এখান থেকে অনেক দূরে! " তিতাস বলল।

" হ্যাঁ, দামোদর। ওখানেই তো জন্ম আমার! জন্মের পর বেশ খেলছিলাম মায়ের সঙ্গে আমরা! আমি তো গুনতে শিখি নাই। তাই আমার কত ভাই বোন বলতে পারব না। তবে বেশ মজা করেই সবাই মিলে দল বেঁধে ঘুরছিলাম! ঘুরতে ঘুরতে এক জায়গায় এসে দেখি নদী থেকে খাল পথে জল বেরচ্ছে। ওই খাল পথ দেখিয়ে মা আমাদের কয়েক জনকে বলল -তোমরা চলে যাও এই পথে। পথের দুপাশে পাবে সবুজ ধানক্ষেত। ধানক্ষেতের নরম মাটিতে অনেক কেঁচো থাকে। খুব সুস্বাদু। মনের আনন্দে কেঁচো খাবে আর ক্ষেতের জলে ঘুরে বেড়াবে। তবে একটা কথা মনে রেখো, কেঁচো খাওয়ার আনন্দে ক্ষেতের জল শুকাবার আগে কোনো গভীর জলাশয়ে নেমে যেতে যেন ভুলে যেও না। "

" তারমানে তুমি ক্যানেলের জলে ভেসে এসেছো? কিন্তু ক্যানেল তো এখান থেকে অনেক দূরে! তুমি এলে কিভাবে? " তিতাস জিজ্ঞাসা করল।

"হ্যাঁ হ্যাঁ, ওই ক্যানেল পথে। আমরা তো ওসব বুঝি না, আমরা খাল বুঝি আর জল বুঝি! ওই ক্যানেলেই একদিন দেখলাম একটা গলি পথ ধরে জল বাইরের দিকে ছুটছে। সেই পথ ধরে বাইরে আসতেই মনটা আনন্দে ভরে গেল! মা যা বলেছিল তাই! চারিদিকে সবুজ ধানক্ষেত! ঢুকে পরলাম একটা ক্ষেতে! কিন্তু ঢুকেই মনটা খারাপ হয়ে গেল! ক্ষেতের মাটি নরম! কিন্তু তন্নতন্ন করে খুঁজে একটা কেঁচোরও সন্ধান পেলাম না! ভাবলাম ক্যানেল থেকে বেড়িয়ে এখানেই তো সবাই প্রথম আসে! তাই সব খেয়ে ফেলেছে। পরের ক্ষেত গুলোতে নিশ্চয় আছে! এই ভেবে পাশের ক্ষেতটায় যেই ঢুকেছি, অমনি একটা উৎকট গন্ধ এলো নাকে! গা জ্বলে গেল! ছুটে গেলাম পাশের ক্ষেতে! এইভাবে যত এগিয়ে যাই তত জ্বলন বাড়ে! লাফিয়ে ডাঙায় উঠি! জ্বলন তবু থামে না! এইভাবে সাঁতার কেটে লাফ দিয়ে অনেক কষ্টে এসে পৌঁছলাম তোমাদের পাশের জলায়! সেখানেও শান্তি নাই! গায়ের ছাল চামড়া উঠে যাওয়ার অবস্থা! ঠিক তখনই নামল বৃষ্টি! সেই জলের ধারা বেয়ে উঠে এলাম এখানে! এখন একটু ভালো লাগছে! গায়ের জ্বলনটা একটু কমেছে! কিন্তু এখানে থাকলেও তো বাঁচব না! "

" কেন কেন ট্যাংরা! বাঁচবে না কেন? "

" আমরা তো জলের প্রাণী! জল ছাড়া বাঁচি কেমন করে! "

" তাহলে জলে ফিরে যাও! চলো আমরা তোমাকে জলে দিয়ে আসি! " বলল তুতন।

" জলটা যে বিষে ভরে গেছে তুতন! ওখানে গেলে আর এক মুহুর্ত বাঁচব না! "

" কি হবে তাহলে! "তুতুনের গলায় হতাশার সুর!

" কি আর হবে বলো! তবে তোমরা যদি চাও, তাহলে অন্যেরা আমার মতো অকালে মারা যাবে না! তারা তোমাদের মতো হেসে খেলে মনের আনন্দে দিন কাটাতে পারবে! "

ওরা দুজনেই উত্তেজিত! ট্যাংরাদের ওরা এভাবে মরতে দিতে পারেনা!

" বলো, কি করতে হবে বলো! তুমি যেমন বলবে আমরা তেমনটাই করব! "

কান্না জড়ানো গলায় বলল তুতন!

" তেমন কিছু নয় তুতুন! কেবল তোমাদের বড়দের বলবে, ক্ষেতের জলে যেন বিষ না মেশায়! তাহলে আমরাও তোমাদের মতো হেসে খেলে মনের আনন্দে দিন কাটাতে পারব! তোমরা যেমন ডাঙায় ডাঙায় খেলে বেড়াও,আমরাও তেমনি জলে জলে সাঁতার কাটি! "

ওদিকে ড্রাইভার কাকু ডাক দিয়েছে। ফিরতে হবে। ওরা দুজনেই এগিয়ে যায় বাসের দিকে। ট্যাংরাকে ছেড়ে যেতে ইচ্ছে করছিল না। একবার মনে হল ওকে বাড়িতে নিয়ে যায়! কিন্তু বাড়িতে তো পুকুর নাই। রাখবে কোথায় তাকে! বিশ্বাস কাকুদের বাড়ির পাশে একটা ডোবা ছিল। সেটা এখন বুজিয়ে দিয়েছে। ওখানে নতুন বাড়ি উঠেছে!

জল! হ্যাঁ জলই তো! বিশুদ্ধ জল! তাদের বাড়িতে ফিল্টার আছে! সেই জল তারা পান করে। বাইরের জল তাদের পান করতে দেওয়াই হয় না। ওতে নাকি শরীর খারাপ হয়! তাহলে ট্যাংরাদের জল এভাবে বিষিয়ে দেওয়া হচ্ছে কেন! আজই ওরা এর কৈফিয়ৎ চাইবে বাড়িতে! তাদের বেলা এত সতর্কতা, আর ট্যাংরাদের বেলা এত অবহেলা কেন? 


Rate this content
Log in

Similar bengali story from Tragedy