STORYMIRROR

Rifay Amin

Abstract Classics Inspirational

5.0  

Rifay Amin

Abstract Classics Inspirational

সত্যের স্বরূপ

সত্যের স্বরূপ

3 mins
12

সত্য কোনো নৈতিক অর্জন নয়, যা দিয়ে মানুষ নিজের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণ করবে। সত্য হলো অস্তিত্বের চূড়ান্ত নগ্নতা। আমরা সারা জীবন সত্যকে খুঁজতে যাওয়ার ভান করি, অথচ আমাদের অবচেতন মন সারাক্ষণ সত্যের হাত থেকে পালিয়ে বাঁচার পায়তারা করে। কারণ আমরা জানি, সত্য আরাম দেয় না; সত্য আমাদের অহংকার, আমাদের পরিচিত পৃথিবী এবং আমাদের সযত্নে গড়া আত্মপরিচয়কে নির্দয়ভাবে পুড়িয়ে ছাই করে দেয়। কাচের আলমারিতে রাখা মৃত প্রজাপতির যে উপমা আমরা এতকাল দিয়ে এসেছি, তা বড্ড নিরাপদ। প্রকৃত সত্য হলো কালবৈশাখীর সেই প্রথম ঝাপটা, যা শুধু ধুলোই ওড়ায় না, আমাদের ঘরের চাল উড়িয়ে নিয়ে আমাদের মাথার ওপরের আকাশটাকে উন্মুক্ত করে দেয়। সেই বিশাল, অসীম আকাশের নিচে নগ্ন হয়ে দাঁড়ানোর নামই সত্য।

মানুষের ইতিহাস মিথ্যার সঙ্গে সত্যের লড়াইয়ের ইতিহাস নয়; মানুষের ইতিহাস হলো সত্যের হাত থেকে আত্মরক্ষার ইতিহাস। সভ্যতা যত এগিয়েছে, মানুষ তত নিখুঁতভাবে নিজেকে আড়াল করতে শিখেছে। আমরা শব্দের পর শব্দ সাজিয়ে মিথ্যার যে বিশাল ইমারত গড়ে তুলি, তার উদ্দেশ্য সমাজকে ঠকানো নয়; তার মূল উদ্দেশ্য হলো আয়নার সামনে দাঁড়ানো নিজের চোখের দৃষ্টি থেকে নিজেকে বাঁচানো। আমরা তথ্যের মহাসমুদ্রে ডুব দিয়েছি এই আশায়, যেন আত্মজিজ্ঞাসার সেই তীক্ষ্ণ স্বর আমাদের কানে না পৌঁছায়। কিন্তু সত্য কোনো বহিরাগত শত্রু নয় যে তাকে দুর্গের বাইরে আটকে রাখা যাবে। সত্য মানুষের রক্তের ভেতর দিয়ে প্রবাহিত এক আদিম প্রলয়, যা সুযোগ পেলেই ভেতর থেকে সব কিছু তছনছ করে দেয়।

সত্যের আগমন কখনো নিঃশব্দ, কখনো বা কানফাটানো বিস্ফোরণের মতো। নজরুলের রুদ্ররোষ আর রবীন্দ্রনাথের প্রশান্ত গভীরতা এখানে এসে একবিন্দুতে মেশে। যখন চারপাশের জগৎ ভণ্ডামির চাদর মুড়ি দিয়ে ঘুমায়, তখন সত্য আসে প্রলয়ংকরী বজ্র হয়ে। সে আপস চেনে না, সে শুধু ভাঙতে জানে। কিন্তু সেই ভাঙনের পর যে নৈঃশব্দ্য নেমে আসে, তা বড় ভয়াবহ, বড় গভীর। অন্যায়ের প্রতিবাদ করা সহজ, কারণ সেখানে প্রতিপক্ষ বাইরে থাকে। কিন্তু যখন নিজের ভেতরে লুকিয়ে থাকা আজন্ম লালিত ভ্রান্তির মুখোমুখি দাঁড়াতে হয়, তখন সত্য হয়ে ওঠে এক নির্মম জল্লাদ। সে আমাদের সবচেয়ে প্রিয় মোহগুলোকে এক এক করে হত্যা করে। এই হত্যার যন্ত্রণাকে যে হাসিমুখে আলিঙ্গন করতে পারে, কেবল সেই সৃষ্টির এক নতুন আনন্দ লাভ করে।

সত্য কোনো আদর্শিক ধর্মগ্রন্থের শ্লোক নয়, যা মুখস্থ করে পুণ্য অর্জন করা যায়। সত্য হলো সেই কৃষকের ঘাম, যে জানে ফসল না ফললে কাল তার সন্তান অনাহারে থাকবে। সত্য হলো কারখানার সেই শ্রমিকের কালশিটে পড়া হাত, যে হাত পৃথিবীর সব বড় বড় দর্শনকে উপহাস করে টিকে থাকার লড়াই করে। ক্ষুধার্তকে নিজের শেষ অন্নটুকু দিয়ে দেওয়া সেই মায়ের কাছে কোনো নৈতিকতার তত্ত্ব নেই, তার কাছে আছে নাড়ির এক অকাট্য টান। এই টানই হলো জীবনের সবচেয়ে আদিম সত্য। সত্য আমাদের বিভক্ত করে না, আবার সে আমাদের কৃত্রিমভাবে মেলায়ও না। সত্য কেবল আমাদের সেই অভিন্ন অস্তিত্বের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দেয়, যেখানে আমরা সবাই সমানভাবে অসহায় এবং সমানভাবে মুক্ত।

আমাদের সমকালের সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডি এই নয় যে আমরা মিথ্যা বলছি। ট্র্যাজেডি হলো, আমরা সত্যকে একটি পণ্য বানিয়ে ফেলেছি। আমরা সত্যকে নিজেদের সুবিধার মাপে কেটে ছেঁটে ব্যবহার করছি। কিন্তু খণ্ডিত সত্য হলো সবচেয়ে ভয়ংকর মিথ্যা। সত্য কোনো অবস্থাতেই আংশিক হতে পারে না। তাকে গ্রহণ করতে হয় তার সমস্ত রুক্ষতা, নির্মমতা এবং কাঠিন্যসহ। সত্যকে ধারণ করার অর্থ হলো নিজের ভেতরকার সমস্ত নিরাপত্তাবোধকে বিসর্জন দেওয়া। যে সত্য আঘাত করে না, যে সত্য আমাদের আত্মতৃপ্তির ভিত্তিমূল কাঁপিয়ে দেয় না, তা আদৌ সত্য নয়; তা স্রেফ একটি সুন্দর সান্ত্বনা।

সত্য মানুষকে রক্ষা করে না, সত্য মানুষকে ধ্বংস করে। সে মিথ্যার আবরণে গড়া মেকি মানুষকে ধ্বংস করে এক নতুন, নির্ভীক এবং স্বাধীন সত্তার জন্ম দেয়। বাইরের কোনো শৃঙ্খল মানুষের সবচেয়ে বড় কারাগার নয়; মানুষের সবচেয়ে বড় কারাগার হলো তার নিজেরই তৈরি করা স্বস্তিদায়ক মিথ্যাগুলো। সত্য এসে সেই কারাগারের দেয়াল ভেঙে দেয়। মুক্ত বাতাসের প্রথম ঝাপটা যেমন শ্বাসরুদ্ধকর মনে হয়, সত্যের প্রথম স্পর্শও ঠিক তেমনি যন্ত্রণাদায়ক। কিন্তু এই মৃত্যু ও পুনর্জন্মের যে অন্তহীন চক্র, তাতেই মানবজীবনের চূড়ান্ত সার্থকতা লুকিয়ে আছে।

অতএব সত্যের স্বরূপ খোঁজার চেষ্টা করা বৃথা। সত্য কোনো গন্তব্য নয় যে হেঁটে সেখানে পৌঁছানো যাবে। সত্য কোনো অলংকার নয় যে তাকে সযত্নে ধারণ করা যাবে। সত্য হলো সেই নিরবচ্ছিন্ন দহন, যে আগুনে পুড়তে পুড়তে একদিন মানুষ নিজেই আলো হয়ে যায়। আর সেই পবিত্র আলোর কোনো ছায়া থাকে না।


Rate this content
Log in

Similar bengali story from Abstract