STORYMIRROR

Rifay Amin

Abstract Inspirational Others

5.0  

Rifay Amin

Abstract Inspirational Others

ভাষা: ঐতিহ্যের ধারক

ভাষা: ঐতিহ্যের ধারক

4 mins
51

আজও আমার বুকের ভেতর জেগে আছে সেই সন্ধ্যাটা। দাদির কোলে মাথা রেখে প্রথম রূপকথা শোনার সন্ধ্যা। গল্পের কাহিনি আজ আর মনে নেই, কিন্তু কয়েকটি শব্দ এখনো আমার ভেতরে মৃদু প্রদীপের মতো জ্বলে। মনে হয়, শব্দগুলো কোনো গল্পের ছিল না; তারা এসেছিল বহু দূরের কোনো সময় থেকে। তখন বুঝিনি, আজ বুঝি; সেগুলোই ছিল আমার প্রথম উত্তরাধিকার, আমার প্রথম আশ্রয়।


মানুষ পৃথিবীতে আসে একেবারে খালি হাতে। কোনো স্মৃতি নেই, কোনো ইতিহাস নেই; শুধু একটি কাঁপা নিঃশ্বাস। কিন্তু জন্মের প্রথম মুহূর্ত থেকেই সে এক অদৃশ্য উত্তরাধিকারের অংশ হয়ে যায়। মায়ের কণ্ঠে ভেসে আসা স্নেহমাখা ডাক, বাবার বিস্মিত হাসির উষ্ণতা, ঘুমপাড়ানি গানের মৃদু দোলা; এসবের মধ্য দিয়েই তার প্রবেশ ঘটে ভাষার মায়াময় ভূগোলে।


ভাষা কেবল শব্দ নয়। ভাষা মানুষের স্মৃতির দীর্ঘতম যাত্রাপথ। তার ভেতর দিয়ে হেঁটে যায় অগণিত মানুষের হাসি, কান্না, প্রেমের প্রথম কম্পন, বিচ্ছেদের নীরবতা আর প্রার্থনার শেষ আলো। আমরা তাদের নাম জানি না, মুখও দেখিনি; তবু তাদের অনুভূতির ক্ষীণ রেণু আজও আমাদের প্রতিটি উচ্চারণে ঝলসে ওঠে।


আমি যখন "মা" শব্দটি বলি, তখন শুধু একজন মানুষকে ডাকি না। সেই ডাকের সঙ্গে জেগে ওঠে অগণিত যুগের স্নেহ, আশ্রয় ও মমতার ইতিহাস। একটি সাধারণ শব্দ কখনো কখনো একটি সভ্যতার চেয়েও দীর্ঘজীবী হয়ে ওঠে।


তাই ভাষা শুধু যোগাযোগের উপায় নয়; এটি মানুষের অস্তিত্বের দ্বিতীয় স্পন্দন।


জন্মভিটা ভেঙে পড়তে পারে। শৈশবের উঠোন নদীর জলে হারিয়ে যেতে পারে। পুরোনো বাড়ির দেওয়ালে শ্যাওলা জন্মাতে পারে। চেনা মুখগুলো একে একে সময়ের ওপারে চলে যেতে পারে। তবু মানুষ সম্পূর্ণ নিঃস্ব হয় না। কারণ কিছু শব্দ তার ভেতরে থেকে যায়; উনুনের নিভে যাওয়া ছাইয়ের নিচে লুকিয়ে থাকা আগুনের মতো।


দূর বিদেশের অচেনা জনসমুদ্রে হঠাৎ নিজের ভাষার একটি সুর কানে এলে বুকের ভেতরটা কেন কেঁপে ওঠে? কেন অকারণে চোখ ভিজে আসে? কারণ সেই শব্দের সঙ্গে জড়িয়ে থাকে মায়ের হাতের গন্ধ, বর্ষার দুপুরে টিনের চালের শব্দ, কাঁঠালপাতা-ঢাকা গ্রামের পথ, হারিয়ে যাওয়া বিকেলের আলো; জড়িয়ে থাকে একটি সম্পূর্ণ জীবন।


তখন ভাষা আর ভাষা থাকে না। সে হয়ে ওঠে মাতৃক্রোড়ের নিরাপত্তা। সে হয়ে ওঠে শেকড়ের নিঃশব্দ গভীরতা। সে হয়ে ওঠে ফিরে যাওয়ার অসম্ভব অথচ চিরকাঙ্ক্ষিত পথ।


ইতিহাস রাজা-বাদশাহদের কথা মনে রাখে, যুদ্ধের তারিখ মনে রাখে, বিজয় আর পরাজয়ের কাহিনি মনে রাখে। কিন্তু একটি জাতির হৃদয়ের গোপনতম সত্য; সন্তানকে আদর করার কোমলতা, শোকের নীরবতা, বৃষ্টিভেজা সন্ধ্যায় গানের সুর, ভালোবাসার মুহূর্তে কণ্ঠের কাঁপন; এসব সংরক্ষিত থাকে ভাষার অন্তরালে। সে-ই একটি জাতির সবচেয়ে সত্য, সবচেয়ে অন্তরঙ্গ আত্মজীবনী।


কোনো ভাষা হারিয়ে গেলে শুধু কিছু শব্দ হারায় না। পৃথিবীকে দেখার একটি স্বতন্ত্র দৃষ্টি নিভে যায়। অনুভূতির একটি সম্পূর্ণ রঙমালা অদৃশ্য হয়ে যায়। মানুষের অভিজ্ঞতার একটি আকাশ চিরতরে অন্ধকার হয়ে যায়।


তবু এর সবচেয়ে বিস্ময়কর সৌন্দর্য এই যে, সে শুধু অতীতকে বহন করে না; ভবিষ্যতেরও জন্ম দেয়। প্রতিটি নবজাতক শিশুর কণ্ঠে সে আবার নতুন করে পৃথিবীতে আসে। প্রতিটি নতুন প্রেম তাকে নতুন অর্থ দেয়। প্রতিটি নতুন বেদনা তাকে আরও গভীর করে। সে বদলায়, প্রসারিত হয়, নতুন রূপ ধারণ করে; তবু তার অন্তস্তলে পূর্বপুরুষদের উষ্ণ নিঃশ্বাস অমলিন থেকে যায়।


কখনো কখনো আমার মনে হয়, মানুষ আসলে দু'বার জন্মায়। একবার শরীরে, আরেকবার শব্দে। প্রথম জন্ম তাকে পৃথিবীতে আনে, দ্বিতীয় জন্ম তাকে মানুষ করে।


জীবনের শুরুতে এই ভাষাই আমাদের মায়ের কাছে নিয়ে যায়। জীবনের পথে নিয়ে যায় মানুষের কাছে। আর জীবনের অন্তিম প্রহরে ফিরিয়ে দেয় স্মৃতির কাছে।


একটি শিশুর প্রথম "মা" ডাক আর এক বৃদ্ধ মানুষের শেষ কাঁপা শব্দের মাঝখানে বিস্তৃত সমগ্র জীবনকে নীরবে, মমতায় বয়ে নিয়ে চলে সে।


আমরা পৃথিবীতে অল্প সময়ের অতিথি। আমাদের পদচিহ্ন মুছে যায়। ছবিগুলো বিবর্ণ হয়ে আসে। ব্যবহৃত জিনিসপত্র অন্যের হয়ে যায়। কিন্তু যা আমরা ভালোবেসেছি, যা নিয়ে কেঁদেছি, যা নিয়ে স্বপ্ন দেখেছি; তার এক অমর অংশ থেকে যায় শব্দের ভেতরে।


এই কারণেই ভাষা কেবল ঐতিহ্যের ধারক নয়। ভাষা নিজেই এক জীবন্ত ঐতিহ্য। সে মৃত মানুষের নিঃশ্বাসে উষ্ণতা খুঁজে পায়, সে অনাগত মানুষের জন্য আলো সঞ্চয় করে, সে সময়ের দুই তীরকে একটি অদৃশ্য সেতুতে বেঁধে রাখে।


যতদিন কোনো শিশু মায়ের চোখে চোখ রেখে প্রথম শব্দ উচ্চারণ করবে, যতদিন দূরদেশে দাঁড়িয়ে নিজের ভাষার একটি পরিচিত সুর শুনে কেউ অকারণে আবেগে ভেসে যাবে, যতদিন মানুষের হৃদয়ে ভালোবাসা, বেদনা আর আশার জন্ম হবে; ততদিন সে বেঁচে থাকবে।


কারণ ভাষা বেঁচে থাকা মানে শুধু শব্দের বেঁচে থাকা নয়। মানুষ চলে গিয়েও সম্পূর্ণ চলে না যাওয়া। সময়ের কাছে হারিয়েও সম্পূর্ণ হারিয়ে না যাওয়া। মৃত্যুর ভেতর দিয়েও স্মৃতির মতো,

 আলোর মতো, ভালোবাসার মতো বেঁচে থাকা।


Rate this content
Log in

Similar bengali story from Abstract