শিউলি ফুলের মালা
শিউলি ফুলের মালা
শরতের ভোরে বাতাসে যখন হিমের মৃদু শিহরণ, ভেজা মাটির সাথে পুরোনো ইটের ঘ্রাণ মিশে চারপাশটা এক ভারী, বিষণ্ণ চাদরে ঢাকা। অমলা দাওয়ায় উপবিষ্ট। কোলের ওপর একটি জীর্ণ বাঁশের ডালা। ডান পায়ের গিঁটে বাতের পুরোনো ফোলা; তবু ঘাসের ওপর ছড়ানো সাদা শিউলিগুলো কুড়াতে তার কোনো ক্লান্তি নেই। ফুল কুড়াতে কুড়াতে নখের কোণে বোঁটার কমলা কষ জমে ওঠে। এই কালচে দাগগুলো চামড়ার এত গভীরে বসে গেছে যে শত ধুলেও আর মেটে না।
ডালাটি ফুলে ফুলে ভরে উঠলে অমলা দাওয়ায় ফেরে। কাঁপা হাতে সুঁইয়ের সূক্ষ্ম ছিদ্রে সুতো পরায়। ঠিক সে-সময় বেড়ার ওপাশ থেকে ভেসে আসে মিনুর একটানা, খকখকে কাশির শব্দ। এককালে এই মিনুর সাথেই সে ধলেশ্বরীর ঘোলা জলে সাঁতার কেটেছে, চৈত্রসংক্রান্তির মেলায় কাঁচের চুড়ির শব্দে চারপাশ মুখরিত করেছে। আজ মিনু লাঠিতে ভর দিয়ে অতি কষ্টে হাঁটে, রোদ পোহায়। অমলার দিকে তাকালে তার ঘোলাটে চোখে কেবল এক শূন্যতা ফুটে ওঠে।
এমন সময় মিনুর নাতনি পুঁটি ফ্রক উড়িয়ে ছুটে আসে অমলার উঠোনে। কপালে তার ভোরের কুয়াশাভেজা ঘামের বিন্দু। মাটিতে পড়ে থাকা একটি তাজা শিউলি তুলে সে পরম আহ্লাদে কানের ওপর গুঁজে দেয় এবং চপল কণ্ঠে শুধায়, “ঠাম্মা, মালাটা দেবে?”
অমলা হাতের সুঁই থামিয়ে স্থির চোখে মেয়েটির দিকে তাকায়। অমলার কপালেও একসময় ঠিক এমনি সতেজ ঘাম জমতো। কিন্তু উত্তরের কোনো অপেক্ষা না করেই পুঁটি বেড়ার ওপাশে ফড়িংয়ের পিছে ছুটে মিলিয়ে যায়।
আঙুলগুলো আবার অবশ সুঁইয়ের ওপর ফেরে। মনে পড়ে যায় লণ্ঠনের আলোয় সুতো ছিঁড়ে যাওয়ার সেই রাত। আশ্বিনের হাওয়া সেদিনও ছিল এমনি চঞ্চল। দাওয়ায় মিটিমিটি লণ্ঠন জ্বলছে, আর ঘরের ভেতর থেকে ভেসে আসছে বাবার নিচু, ভাঙা গলা, “গাঁয়ের মানুষের কথা আর কত সইব? জমি-জিরাত যা আছে জলের দরে বেচে দিয়ে ওপারে চলো, মান-ইজ্জত নিয়ে তো বাঁচতে হবে।”
বারান্দায় বসে অমলার কোলের ওপর দিনভর গাঁথা মালা। অন্ধকার উঠোনের দিকে তাকিয়ে হঠাৎ তার বুকের ভেতরটা মুচড়ে ওঠে। সে দু’হাতে সুতোটা চেপে ধরে প্রবল হ্যাঁচকা টান দেয়। সুতো ছিঁড়ে ফুলগুলো উঠোনের কাদার ওপর ছিটকে পড়ে। হাতের তালুতে সুতোর কর্কশ টানে চামড়া ছিলে রক্ত জমে যায়, তবু অমলা সেদিন এক ফোঁটা কাঁদেনি।
পরদিন ভোরে প্রথম কাক ডাকার পর দরজা খুলতেই সে দেখে উঠোনের মেটে কাদার সাথে ছেঁড়া মালার ফুলগুলো লেপ্টে একাকার। অথচ শিউলি গাছের নিচে ততক্ষণে জমে উঠেছে সাদা ফুলের নতুন আস্তরণ। অমলা খালি ডালাটি হাতে নিয়ে আবার ঘাসের ওপর নিচু হয়।
আশ্বিনের সেই ভোর, কুয়াশায় ঢাকা ধলেশ্বরী নদীর ঘাটের পথ। অরুণের কাঁধে চটের ব্যাগ। অমলা সারারাত জেগে গাঁথা নতুন মালাটা এগিয়ে দেয়। ছেঁড়া মালার ক্ষতে তখনো তার হাত চড়চড় করছে। অরুণ মালাটা হাতে নিয়ে একটুক্ষণ তাকিয়ে থাকে সাদা ফুলগুলোর দিকে। তারপর খুব নিচু গলায় বলে, “আমার বড্ড ভয় করে, অমলা। এই ঘর, এই উঠোন, এই চেনা বাতাস সব দেখলে আমার শ্বাস আটকে আসে। ওরা যেকোনো দিন আগুন লাগিয়ে দেবে, আমি আর পারছি না।”
মালাটা সে চটের ব্যাগের একপাশে গুঁজে রাখে। অমলা কোনো কথা বলে না। সে কেবল নিজের শাড়ির আঁচলটা ডান হাতের আঙুলে শক্ত করে পেঁচিয়ে ধরে। অরুণ নৌকায় ওঠে, অমলা পেছন ফিরে তাকায় না।
আজ সকালে ডালা থেকে একটি আধফোটা ফুল তুলে সুঁইয়ে বিঁধতে গিয়ে ধারালো মুখটা তার তর্জনীর ডগায় গভীরভাবে গেঁথে যায়। এক ফোঁটা গাঢ় রক্ত বেরিয়ে আসে। আঙুলের ডগায় জমে থাকা কমলা কষ আর এইমাত্র বেরিয়ে আসা উষ্ণ রক্ত এক হয়ে মিশে যায়।
অমলা থমকে যায়। অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে নিজের আঙুলের দিকে। কত দীর্ঘ এই আঙুলগুলোর আয়ু। কত সহস্র ফুল এরা কেবল একাকীত্বের সুতোয় বিঁধেছে এক অলীক স্মৃতির টানে।
হঠাৎ তার হাতটা তীব্রভাবে কাঁপতে শুরু করে। এবার আর কোনো দ্বিধা নয়। সুঁইটা সে উঠোনের ঘাসে ছুঁড়ে ফেলে। কোলের ওপর রাখা বাঁশের ডালাটা দু’হাতে ধরে এক ঝটকায় উল্টে দেয়।
অর্ধেক গাঁথা মালা আর তাজা শিউলি ফুলগুলো দাওয়ার ধুলোমাখা মাটিতে ছড়িয়ে পড়ে। অমলা তার জীবনের শেষ মালার গাঁথুনি অসমাপ্ত রেখে দেয়।
দূরে চটকলের ভোঁ বেজে ওঠে। উঠোনের বেড়ার ফাঁক দিয়ে একটি রুগ্ন কুকুর উঁকি দিয়ে চলে যায়। বাতাসে ঘাসের ডগা থেকে এক ফোঁটা শিশির টুপ করে ঝরে পড়ে।
অমলার হাত দু’টি কোলের ওপর স্থির। সে দাওয়ার খুঁটিতে পিঠ ঠেকিয়ে একদম সোজা হয়ে বসে থাকে।
পড়ে থাকা সাদা সুতোটার এক মাথা ভোরের হালকা বাতাসে সামান্য কাঁপতে থাকে।
ছড়িয়ে থাকা ফুলগুলোর গায়ে একটু একটু করে রোদ এসে পড়ে।
এ ছোট গল্পটার জন্য একটা চমৎকার সুন্দর এবং সার্থক প্রচ্ছদ ইমেজ বানাও

