অবেলার কদম ফুল
অবেলার কদম ফুল
কার্তিকের শেষ দিক। নদীর জল অনেকখানি নেমে গিয়ে চরের কাশবন আর সাদা নেই–ধূসর, নিস্তব্ধ, যেন দীর্ঘশ্বাসের রঙ মেখে আছে তার শরীরে। হেমন্তের রোদে মাঠের ঘাস শুকিয়ে আসে, বাতাসে শীতের প্রথম হিমেল ছোঁয়া। এই ম্রিয়মাণ প্রকৃতির মাঝেই ইলিয়াছ সাহেবের দিন কাটে।
বড় বাড়ির প্রশস্ত উঠোনে এখন কেবল রোদ আর ছায়ার নিঃশব্দ খেলা। এককালে এই বাড়ি মানুষের কোলাহলে মুখর থাকত–সন্তানদের হাসি, অতিথিদের আনাগোনা, রান্নাঘরের ধোঁয়া, সন্ধ্যার চায়ের গল্প–সব মিলিয়ে এক পূর্ণ সংসারের শব্দ ছিল এখানে। আজ কালের নিয়মে বাড়ির পলেস্তারা আর ইলিয়াছ সাহেবের জীবনের খসড়া–দুটোই পুরোনো হয়ে এসেছে। বড় ছেলে শহরে, ছোট ছেলে বিদেশে, মেয়ে তার নিজ সংসারে বহু দূরে। স্ত্রীর ছবিটা এখনো বারান্দার ভেতরের দেয়ালে টাঙানো; বিকেলের আলো পড়লে মনে হয়, তিনি যেন এখনো চুপচাপ তাকিয়ে আছেন।
উঠোনের দক্ষিণ-পশ্চিম কোণে দাঁড়িয়ে আছে একটি প্রাচীন কদম গাছ। বহু বছরের সঙ্গী। বর্ষায় যখন সারা গ্রাম কদমের গন্ধে মেতে ওঠে, তখন এই বুড়ো গাছটায় তেমন ফুল আসে না। যৌবনের দিন ফুরিয়েছে তারও। ইলিয়াছ সাহেব প্রায়ই ভাবেন–মানুষ আর গাছের বার্ধক্যের মধ্যে খুব বেশি তফাৎ নেই; দুজনেই ধীরে ধীরে ছায়া হয়ে যায়।
অথচ আজ, এই রুক্ষ কার্তিকের সকালে, যখন আকাশে এক ফোঁটা মেঘ নেই, উত্তরের বাতাসে শীতের হালকা শিরশির, তখন তিনি দেখলেন–সবচেয়ে ওপরের ডালটায় একটি মাত্র কদম ফুল ফুটে আছে।
তিনি অনেকক্ষণ তাকিয়ে রইলেন।
সোনালি-সাদা গোল সেই ফুলটি যেন আকাশের দিকে মুখ তুলে নীরবে দাঁড়িয়ে আছে। অবেলায় আসা এই অতিথিকে দেখে তার বুকের ভেতর কেমন এক অদ্ভুত টান জাগল। মনে হলো, এ যেন তার নিজেরই প্রতিচ্ছবি। যৌবনের সেই কোলাহল, সংসার, ব্যস্ততা–সব বর্ষার জলের মতোই কবে শুকিয়ে গেছে। এখন এই পড়ন্ত বেলায় তিনিও তো এই কদম ফুলটার মতোই একা জেগে আছেন। চারপাশের সবাই যখন ঝরে পড়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে, তখন এই একা ফুটে থাকা ফুলটি যেন সময়ের নিয়মের কাছে এক শান্ত অথচ গভীর বিদ্রোহ।
তিনি হঠাৎ মনে করতে পারলেন–তার স্ত্রী সালেহা কদম ফুল খুব ভালোবাসতেন। বর্ষার দুপুরে ভেজা শাড়িতে উঠোনে দাঁড়িয়ে বলতেন, “কদম ফুলের গন্ধে মনে হয়, আকাশ বুঝি মাটির খুব কাছে নেমে এসেছে।”
সেই কথাটা মনে হতেই বুকের ভেতর কোথাও হালকা ব্যথা উঠল। কত বছর হয়ে গেল! অথচ কিছু কিছু স্মৃতি কখনো বুড়ো হয় না–তারা ঠিক অসময়ের ফুলের মতোই হঠাৎ ফুটে ওঠে।
দুপুরের দিকে পড়শি রফিকের ছোট মেয়ে রুনি উঠোনে এলো বরই কুড়াতে। তার চঞ্চল পায়ের শব্দে উঠোনে যেন একটু প্রাণ ফিরে এল। গাছতলায় দাঁড়িয়ে হঠাৎ ওপরের দিকে তাকাতেই সে বিস্ময়ে বলে উঠল–
“দাদুভাই! এহন তো বাদল দিন না, মেঘও ডাকে না–তয় কদম ফুটলো ক্যান? ও কি রাস্তা ভুল কইরা আইছে?”
ইলিয়াছ সাহেব বারান্দার ইজিচেয়ার থেকে মৃদু হাসলেন। সেই হাসিতে আক্ষেপ ছিল না, ছিল দীর্ঘদিনের স্বীকার করে নেওয়া শান্তি।
তিনি ধীরে বললেন,
“সবাই কি আর সময়ের হিসাব মেলাইতে পারে রে দাদু? কেউ কেউ তো একলা ফুটবে বলেই এই অসময়ের জন্য বেঁচে থাকে। ভরা শ্রাবণে তো সবাই ফোটে–সেটা সহজ। কিন্তু কার্তিকের এই অবেলায় যে ফোটে, সে নিয়ম মানতে আসে না; সে আসে একটুখানি মায়া রেখে যেতে।”
রুনি কথাটার মানে পুরো বুঝল না। সে কিছুক্ষণ ফুলটার দিকে তাকিয়ে রইল, যেন নিজের ছোট্ট মনে উত্তর খুঁজছে। তারপর হঠাৎ একটা বরই কুড়িয়ে হাসতে হাসতে ছুটে গেল বাড়ির পথে। শিশুরা প্রশ্ন ফেলে যায়, উত্তর নয়।
বিকেলের আলো ধীরে ধীরে ফিকে হয়ে এলো। পশ্চিম আকাশে রোদ যেন পুরোনো চিঠির রঙ ধরল। দূরের মসজিদ থেকে মাগরিবের আজান ভেসে এলো নদীর শান্ত জলের ওপর দিয়ে। সেই ধ্বনি সন্ধ্যার নিস্তব্ধতায় আরও গভীর হয়ে বাজল।
সূর্য ডোবার পর নদীর দিক থেকে কনকনে হাওয়া উঠল। উঠোনের শুকনো ঘাস কেঁপে উঠল মৃদু শব্দে।
ইলিয়াছ সাহেব তাকিয়ে ছিলেন।
হঠাৎ তিনি দেখলেন–অবেলার সেই কদম ফুলটি নিঃশব্দে খসে পড়ল।
কোনো শব্দ নেই। কোনো অভিযোগ নেই। যেন তার কাজ শেষ হয়েছে।
কার্তিকের রুক্ষ ধুলোর ওপর পড়ে থেকেও ফুলটি অপমানিত লাগছিল না; বরং মনে হচ্ছিল, ফুরিয়ে যাওয়ার আগে সে নিজের সমস্ত সৌন্দর্য নিঃশব্দে পৃথিবীর হাতে সমর্পণ করে গেছে। সে রেখে গেল তার না-বলা শ্রাবণের গল্প–এক অসময়ের পূর্ণতা।
ইলিয়াছ সাহেব বারান্দা থেকে উঠলেন না।
অন্ধকারে ডুবে যাওয়া উঠোনের দিকে তাকিয়ে তার মনে হলো, প্রকৃতির এই খামখেয়ালিপনার মাঝেই কোথাও এক গভীর সান্ত্বনা লুকিয়ে আছে। মানুষের জীবনের শ্রেষ্ঠ সৌন্দর্যগুলো বুঝি এমনই–সবাই যখন হিসাব কষে মুখ ফিরিয়ে নেয়, ঠিক তখনই তারা অবেলায় নিঃশব্দে ফুটে ওঠে। কারও করতালির প্রয়োজন হয় না, স্বীকৃতিরও নয়। তারা শুধু তাদের স্বল্প আলোটুকু রেখে যায়, তারপর শান্ত হয়ে ঝরে পড়ে।
আর যারা দেখার মতো চোখ রাখে, তারা সেই ঝরে পড়ার মধ্যেও সৌন্দর্য চিনে নেয়।
রাত আরও গভীর হলো। দূরে নদীর কালো জলে চাঁদের ভাঙা আলো কাঁপছিল। ইলিয়াছ সাহেব ধীরে উঠে দাঁড়ালেন। উঠোনে নেমে এসে তিনি ঝরে পড়া কদম ফুলটি হাতে তুলে নিলেন।নাকে নিয়ে মৃদু গন্ধ শুঁকলেন।
তারপর খুব আস্তে, যেন কাউকে বিরক্ত না করতে চান, স্ত্রীর ছবির নিচে রাখা ছোট পিতলের বাটিতে ফুলটি রেখে দিলেন।
ঘরের ভেতর নিঃশব্দে সন্ধ্যা নেমে রইল।
আর সেই নীরবতার মধ্যেই, বহুদিন পর, ইলিয়াছ সাহেবের মনে হলো–সব ফুরিয়ে গেলেও, কিছু সুবাস কখনো শেষ হয় না।

