হৃদয়খণ্ড
হৃদয়খণ্ড
চৈত্রের অপরাহ্ণ। আকাশে মেঘের লেশমাত্র নাই। সারাদিনের দহন শেষে রৌদ্র যেন ক্লান্ত হইয়া পৃথিবীর উপর নিস্তেজ হইয়া পড়িয়াছে। দীঘির ধারের ঝাউগাছগুলোর মাথায় তপ্ত বাতাস দীর্ঘনিশ্বাস ফেলিয়া ফিরিতেছিল। দূরের মাঠ হইতে রাখালের গোরু ফিরিবার ঘণ্টাধ্বনি ভাসিয়া আসিতেছিল। গ্রামের জমিদার হরিশঙ্কর রায়ের চণ্ডীমণ্ডপে পাশা খেলার ছক তখনও গুটানো হয় নাই, অথচ বনপথের ছায়াগুলো দীর্ঘ হইয়া সন্ধ্যার ভিতরে মিশিয়া যাইতেছিল। হরিশঙ্কর রায়ের একমাত্র কন্যা মৃণালিনী। মাতৃহীনা এই কন্যাই ছিল বৃদ্ধের জীবনের শেষ আশ্রয়। বয়স আঠারো পেরাইয়াছে, অথচ বিবাহ হয় নাই; গ্রামে এ লইয়া অনেক কথা ছিল। হরিশঙ্কর শুনিতেন, কিন্তু মনে স্থান দিতেন না। সন্ধ্যাবেলায় প্রদীপের আলোয় যখন মৃণালিনী চুপ করিয়া মালা গাঁথিত, তখন তাঁহার মনে হইত, এমন শান্ত মানুষকে পৃথিবীর ভিড়ে পাঠাইতে হয় কেন? কিন্তু সমাজ অপেক্ষা করে না। অবশেষে পাশের গ্রামের শিক্ষিত যুবক অনিরুদ্ধর সহিত তাহার বিবাহ স্থির হইল। অনিরুদ্ধ কলিকাতায় পড়াশোনা করিত। তাহার মধ্যে শিক্ষার অহংকার অপেক্ষা কোমলতাই বেশি ছিল। প্রথম যেদিন সে মৃণালিনীকে দেখিল, পড়ন্ত রোদ উঠানের শিউলি গাছতলায় নিঃশব্দে পড়িয়া ছিল। মৃণালিনী মাথা নিচু করিয়া দাঁড়াইয়া ছিল। অনিরুদ্ধর মনে হইল, কিছু মানুষ শব্দ করিয়া সুন্দর হয় না। বিবাহ হইয়া গেল। বিদায়ের দিন হরিশঙ্কর কন্যার হাত অনিরুদ্ধর হাতে তুলিয়া দিয়া বলিলেন, “বাবা, ও খুব নরম মনের মানুষ। ওর কষ্ট আমি সহিতে পারিব না।” অনিরুদ্ধ মাথা নত করিয়া বলিল, “আপনি নিশ্চিন্ত থাকুন।” পালকি চলিয়া গেল। হরিশঙ্কর অনেকক্ষণ পথের দিকে চাহিয়া দাঁড়াইয়া রহিলেন। পালকি আর দেখা গেল না, কিন্তু তিনি ফিরিলেন না। নতুন গৃহে মৃণালিনী কোনো ত্রুটি রাখিল না। শাশুড়ির সেবা, গৃহকার্য, অতিথিসৎকার; সবই নিঃশব্দে করিতে লাগিল। তবু তাহার ভিতরে যেন একটি দরজা চিরকাল বন্ধ রহিয়া গেল। একদিন গভীর রাত্রে অনিরুদ্ধ জিজ্ঞাসা করিল, “তুমি কি সুখী নও?” মৃণালিনী কিছুক্ষণ চুপ করিয়া থাকিয়া বলিল, “সুখের কথা জানি না। তবে মাঝে মাঝে মনে হয়, বাবার বাড়ির উঠোনে বিকেলের রোদ এখনও আমার জন্য পড়ে থাকে।” অনিরুদ্ধ কোনো উত্তর দিতে পারিল না। সে বুঝিল, মানুষকে কাছে পাওয়া যায়, কিন্তু তাহার সমস্ত অতীতকে নয়। দিন চলিতে লাগিল। সংসারের সূক্ষ্ম অবহেলা, অলংকারের হিসাব, আত্মীয়দের কটুকথা; এই ছোট ছোট আঘাত ধীরে ধীরে মৃণালিনীকে ক্লান্ত করিয়া তুলিল। অনিরুদ্ধ প্রতিবাদ করিতে চাহিয়াও পারিল না। নিজের দুর্বলতার কাছে সে প্রতিদিন ছোট হইয়া গেল। শীত শেষ হইল। আমের মুকুলের গন্ধে বাতাস ভরিয়া উঠিল। ঠিক সেই সময় মৃণালিনী অসুস্থ হইল। বৈদ্য বলিলেন, “ভয়ের কিছু নাই।” কিন্তু দিন দিন সে যেন পৃথিবী হইতে একটু একটু করিয়া দূরে সরিয়া যাইতে লাগিল। খবর পাইয়া হরিশঙ্কর আসিলেন। কন্যার মুখ দেখিয়া তিনি কিছু বলিতে পারিলেন না। শুধু মাথার কাছে বসিয়া কপালে হাত রাখিয়া রহিলেন। মৃণালিনী চোখ খুলিয়া মৃদু হাসিল। “বাবা, তুমি এসেছ?” হরিশঙ্কর কাঁপা গলায় বলিলেন, “চল মা, তোকে বাড়ি লইয়া যাই।” মৃণালিনী ধীরে মাথা নাড়িল। তারপর অনিরুদ্ধর দিকে চাহিয়া বলিল, “মানুষ তার সমস্ত হৃদয় এক জায়গায় রাখিতে পারে না। আমার একখণ্ড তোমার কাছে ছিল... আর একখণ্ড বাবার কাছে রয়ে গেল।” অনিরুদ্ধ মাথা নিচু করিল। তাহার বলিবার কিছুই ছিল না। রাত্রির শেষ প্রহরে, প্রথম কোকিল ডাকিবার একটু আগে, মৃণালিনী নিঃশব্দে চলিয়া গেল। যেন একটি প্রদীপ নিভিয়া গেল, কোনো শব্দ না করিয়া। পরদিন চিতা নিভিয়া গেলে অনিরুদ্ধ নদীর ধারে বসিয়া রহিল। তার মনে হইল, সে এতদিন যার পাশে ছিল, তাহাকে সম্পূর্ণ কোনোদিন জানিতেই পারে নাই। হরিশঙ্কর লাঠি হাতে ফিরিয়া চলিলেন। ঘাটের ধারে মৃণালিনীর ছোটবেলায় লাগানো শেফালি গাছ হইতে কয়েকটি ফুল পড়িয়া ছিল। তিনি একটি ফুল তুলিলেন। মুঠোর ভিতর অনেকক্ষণ ধরিয়া রাখিলেন। তারপর নদীর জলে ফেলিয়া দিলেন। ফুলটি ধীরে ধীরে স্রোতের সঙ্গে দূরে ভাসিয়া গেল। হরিশঙ্কর চাহিয়া রহিলেন। হঠাৎ তাঁহার মনে হইল, মানুষের প্রিয়জনেরা বোধ হয় মরে না। তাহারা শুধু একদিন হাতের নাগালের বাইরে চলে যায়। আর তাদের জন্য বিকেলের রোদ বহুদিন শূন্য উঠোনে পড়ে থাকে।

