STORYMIRROR

Rifay Amin

Abstract Classics Inspirational

5.0  

Rifay Amin

Abstract Classics Inspirational

অস্তিত্বের সংকট: একটি অসমাপ্ত অনুসন্ধানের নাম

অস্তিত্বের সংকট: একটি অসমাপ্ত অনুসন্ধানের নাম

4 mins
6

একদিন গভীর রাতে ঘুম ভেঙে গেলে মানুষ হঠাৎ বুঝতে পারে, পৃথিবী আসলে কত নিঃশব্দ। সেই নিঃশব্দতা শূন্য নয়। বরং মনে হয়, অদৃশ্য কোথাও একটি প্রশ্ন যুগ যুগ ধরে প্রতিধ্বনিত হচ্ছে। দিনের বেলা যে শহরকে অদম্য মনে হয়, রাতের শেষে সেই শহরও ক্লান্ত হয়ে পড়ে। জানালার বাইরে রাস্তার বাতি জ্বলে থাকে, দূরে কোথাও কোনো কুকুর ডাকে, কোনো কোনো ঘরে তখনও আলো জ্বলে। অথচ এই সমস্ত দৃশ্যের মাঝখানে মানুষ যখন নিজের ভেতরের দিকে তাকায়, তখন একটি প্রশ্ন ধীরে ধীরে তার সামনে এসে দাঁড়ায়—


"আমি কে?"


মানবসভ্যতার ইতিহাসে এর চেয়ে পুরোনো প্রশ্ন খুব কমই আছে। সাম্রাজ্য উঠেছে ও পতিত হয়েছে, ভাষা বদলেছে, বিশ্বাস বদলেছে, পৃথিবীর মানচিত্র বদলেছে; কিন্তু এই প্রশ্নের যাত্রা থামেনি। কারণ মানুষ কেবল বেঁচে থাকার প্রাণী নয়। সে নিজের বেঁচে থাকার অর্থ জানতে চায়। সে জানতে চায়, তার জীবন কেবল সময়ের স্রোতে ভেসে চলা একটি ক্ষণস্থায়ী ঘটনা, নাকি তার ভেতরে লুকিয়ে আছে আরও গভীর কোনো তাৎপর্য।


আমাদের সময়ের সবচেয়ে বড় বৈপরীত্য সম্ভবত এখানেই। আমরা পৃথিবীর মানচিত্র এঁকেছি, কিন্তু নিজেদের হৃদয়ের কোনো মানচিত্র আমাদের কাছে নেই। আমরা দূরতম নক্ষত্রের দূরত্ব মেপেছি, কিন্তু নিজের ভেতরকার নীরবতার গভীরতা মাপতে পারিনি। আমরা তথ্যের পাহাড় নির্মাণ করেছি, অথচ প্রজ্ঞার একটি ঝরনা আবিষ্কার করতে পারিনি। আমরা একে অপরের কাছে পৌঁছানোর অসংখ্য মাধ্যম সৃষ্টি করেছি, কিন্তু মানুষের অন্তর্গত নিঃসঙ্গতা আজও অনুবাদহীন রয়ে গেছে।


এইখানেই অস্তিত্বের সংকটের সূচনা। এটি কোনো রোগ নয়। কোনো দর্শনশাস্ত্রের বিমূর্ত সমস্যা নয়। বরং এটি সেই মুহূর্ত, যখন মানুষ হঠাৎ উপলব্ধি করে যে তার সমস্ত পরিচয়, সমস্ত অর্জন, সমস্ত ব্যস্ততার নিচে আরও গভীর কোনো প্রশ্ন নীরবে অপেক্ষা করে আছে।


আমরা জন্মের পর ধীরে ধীরে নানা পরিচয়ে আবৃত হয়ে যাই। নাম, পরিবার, শিক্ষা, পেশা, সাফল্য, ব্যর্থতা, সম্মান, অপমান—সব মিলিয়ে আমরা নিজেদের একটি প্রতিকৃতি নির্মাণ করি। একসময় সেই প্রতিকৃতিই এত স্পষ্ট হয়ে ওঠে যে মানুষটি আড়াল হয়ে যায়। তখন আমরা নিজেদের পরিচয় জানি, কিন্তু নিজেদের চিনি না। আমরা কী করছি, তা জানি; কিন্তু কেন করছি, তা জানি না। আমরা কোথায় যাচ্ছি, তার হিসাব রাখি; কিন্তু কেন সেখানে যেতে চাই, তার উত্তর হারিয়ে ফেলি। এই হারিয়ে ফেলার নামই অস্তিত্বের সংকট।


অনেকে মনে করেন, এটি আধুনিক যুগের ব্যাধি। কিন্তু সত্য হলো, সংকটটি নতুন নয়; নতুন হলো তার মুখ। একসময় মানুষ প্রকৃতির কাছে অসহায় ছিল। আজ মানুষ নিজের কাছেই অসহায়। একসময় মানুষ ঝড়কে ভয় পেত। আজ সে ভয় পায় নিজের নীরবতাকে। একসময় অন্ধকার ছিল বাইরের। এখন অন্ধকারের একটি অংশ মানুষের ভেতরেও বাস করে। কারণ নীরবতার মধ্যে এমন কিছু প্রশ্ন জেগে ওঠে, যেগুলোকে কোনো সাফল্য, কোনো ব্যস্ততা, কোনো বিনোদন দীর্ঘদিনের জন্য স্তব্ধ করে রাখতে পারে না।


এই জায়গায় এসে আমরা একটি গভীর সত্যের মুখোমুখি হই। মানুষ বিচ্ছিন্ন হয়ে জন্মায় না; সে বিচ্ছিন্ন হয়ে ওঠে। যে শিশুটি প্রথম পৃথিবীতে আসে, সে আকাশ, বাতাস, আলো, মাটি এবং মানুষের সঙ্গে এক স্বতঃস্ফূর্ত সম্পর্ক নিয়ে আসে। কিন্তু বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে তার চারপাশে দেয়াল তৈরি হতে থাকে। অহংকারের দেয়াল, প্রতিযোগিতার দেয়াল, ভয় ও স্বার্থের দেয়াল। একসময় সে পৃথিবীর মধ্যে বাস করেও পৃথিবী থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। সেখানেই শুরু হয় আত্মার খরা। আমরা পৃথিবীর মধ্যে বাস করি, কিন্তু পৃথিবীর সঙ্গে বাস করি না। আমরা মানুষের ভিড়ে থাকি, কিন্তু মানুষের সঙ্গে থাকি না। আমরা নিজের শরীরের মধ্যে বাস করি, কিন্তু নিজের আত্মার সঙ্গে বসবাস করি না। বাইরে জীবন চলতে থাকে, অথচ ভেতরে কোনো সুর বাজে না।


কিন্তু মানুষের গল্প কেবল বিচ্ছিন্নতার গল্প নয়। মানুষের ইতিহাস একইসঙ্গে পুনরাবিষ্কারের ইতিহাস। মানুষ বারবার হারিয়েছে, আবার বারবার নিজেকে খুঁজে পেয়েছে। এইখানেই সাহসের প্রয়োজন। কারণ নিজেকে চিনতে সাহস লাগে। নিজের ভয়ের মুখোমুখি হতে সাহস লাগে। নিজের ভেতরের মিথ্যাকে স্বীকার করতে সাহস লাগে। মানুষের সবচেয়ে কঠিন যুদ্ধ বাইরের কোনো শক্তির সঙ্গে নয়; মানুষের সবচেয়ে কঠিন যুদ্ধ তার নিজের সঙ্গে। যে মানুষ নিজের অন্ধকারকে অস্বীকার করে, সে কখনো আলোর প্রকৃত অর্থ বুঝতে পারে না। আর যে মানুষ সেই অন্ধকারের দিকে স্থির চোখে তাকাতে পারে, তার ভেতরেই নতুন সম্ভাবনার জন্ম হয়।


এই কারণেই অস্তিত্বের সংকটকে কেবল দুর্ভাগ্য বলা যায় না। এটি অনেক সময় মানুষের দ্বিতীয় জন্মের প্রসববেদনা। বীজ যখন মাটির গভীর অন্ধকারে চাপা পড়ে থাকে, তখন বাইরে থেকে তাকে মৃত মনে হয়। অথচ সেই অন্ধকারের ভেতরেই তার রূপান্তর ঘটে। সে ধীরে ধীরে নিজের খোলস ভেঙে নতুন জীবনের দিকে অগ্রসর হয়। মানুষের ক্ষেত্রেও অনেকটা তাই। যে প্রশ্ন আমাদের অস্থির করে, সেই প্রশ্নই অনেক সময় আমাদের গভীর করে। যে সংকট আমাদের ভেঙে দেয়, সেই সংকটই অনেক সময় আমাদের নতুনভাবে গড়ে তোলে।


হয়তো অস্তিত্বের সবচেয়ে বড় বিয়োগান্তক সত্য সংকট নয়। হয়তো সবচেয়ে বড় বিয়োগান্তক সত্য হলো, কোনোদিন সংকটে না পড়া। কারণ যে মানুষ কখনো নিজের জীবনকে প্রশ্ন করেনি, সে হয়তো কখনো সত্যিকার অর্থে নিজের জীবনকে দেখেইনি। ধীরে ধীরে আমরা বুঝতে শিখি, মানুষের জীবন সম্ভবত সব প্রশ্নের উত্তর পাওয়ার জন্য নয়। বরং কিছু প্রশ্নের সঙ্গে বেঁচে থাকার জন্য। হয়তো অর্থ খুঁজতে খুঁজতেই জীবনের অর্থ তৈরি হয়। হয়তো গন্তব্যে পৌঁছে নয়, পথ চলার মধ্যেই মানুষ নিজেকে আবিষ্কার করে।


হয়তো অস্তিত্ব কোনো সমাধান নয়; এটি একটি চলমান যাত্রা। আর সেই যাত্রার সবচেয়ে বিস্ময়কর দিক হলো, মানুষ শেষ পর্যন্ত কোনো চূড়ান্ত উত্তর হয়ে ওঠে না। সে একটি অনুসন্ধান, একটি বিস্ময়, একটি অসমাপ্ত প্রশ্ন। এবং সম্ভবত মানুষের সমস্ত সৌন্দর্য, সমস্ত বেদনা, সমস্ত সৃজনশীলতা ও সমস্ত মহিমা এই অসমাপ্ততার মধ্যেই নিহিত।


মানুষ উত্তর হওয়ার জন্য জন্মায়নি। মানুষ জন্মেছে প্রশ্ন করার জন্য। কারণ প্রশ্নই তাকে অস্থির করে, প্রশ্নই তাকে গভীর করে, প্রশ্নই তাকে নিজের সীমা অতিক্রম করতে শেখায়। যেদিন মানুষ প্রশ্ন করা বন্ধ করে দেবে, সেদিন হয়তো তার অস্তিত্বের সংকটও শেষ হবে। কিন্তু সেই দিন তার মানুষ হওয়াও শেষ হয়ে যাবে।


অস্তিত্বের সংকট তাই পরাজয়ের নাম নয়। এটি মানুষের জীবন্ত 

থাকার সবচেয়ে নির্ভুল প্রমাণ।


Rate this content
Log in

Similar bengali story from Abstract