সুবর্ণরেখা
সুবর্ণরেখা
সুবর্ণরেখা নদী বর্ষাকালে যেমন উদ্দাম, শীতকালে তেমনি নিস্তব্ধ। আশ্বিনের শেষে তাহার বুক জুড়িয়া কাশফুলের ছায়া পড়ে; চৈত্রের দুপুরে তাহার তলদেশের বালু রৌদ্রে চিকচিক করে। গ্রামের বৃদ্ধেরা বলে, বহুদিন পূর্বে এই নদীর বালুতেই নাকি স্বর্ণরেণু পাওয়া যাইত; সেই হইতে নাম সুবর্ণরেখা।
সত্য মিথ্যা কে জানে। মানুষ নাম রাখে আশা লইয়া; নদী সেই আশার দায় বহন করে না।
নদীর ধারে রায়বাড়ির ধ্বংসাবশেষ আজও দাঁড়াইয়া আছে। একদিন এই বাড়ির নহবতে সন্ধ্যার সানাই বাজিত, অন্দরমহলে দীপ জ্বলিত, অতিথিশালায় লোকের সমাগম থাকিত। এখন ভাঙা সিঁড়ির গায়ে শ্যাওলা, কার্নিশে বুনো গাছ, এবং ফাঁকা জানালাগুলি সারাদিন নদীর দিকে চাহিয়া থাকে। এই বাড়ির শেষ অধিবাসী ছিল রেখা।
রেখা যখন এই বাড়িতে বধূ হইয়া আসে, তাহার বয়স পনেরো। সে খুব কথা বলিত, খুব হাসিত, এবং অনর্থক কারণে মাঝে মাঝে ছাদে উঠিয়া নদী দেখিত। তাহার স্বামী অমিয় কলকাতায় ব্যবসা করিত। বিবাহের পর মাত্র তিন মাস সে গ্রামে ছিল।
যাওয়ার দিন অমিয় বলিয়াছিল, “পূজার আগেই ফিরিব।”
রেখা বিশ্বাস করিয়াছিল। প্রথম পূজা গেল। দ্বিতীয় পূজাও গেল। চিঠি আসিল অল্প; পরে বন্ধ হইল।
শুরুতে শ্বশুরবাড়ির লোকেরা বলিল, “অপেক্ষা করো।” পরে বলিল, “ছেলেরা শহরে গেলে বদলাইয়া যায়।” আরও পরে তাহারা রেখার মুখের দিকেও চাহিল না।
একদিন সংবাদ আসিল, অমিয় নাকি অন্যত্র সংসার পাতিয়াছে। সংবাদটি সত্য ছিল কি না, তাহা কেহ যাচাই করে নাই; কিন্তু তাহা যথেষ্ট ছিল।
রেখা সেই দিন কাঁদে নাই। সন্ধ্যায় সে একা নদীর ধারে গিয়া বসিয়া রহিল। অনেকক্ষণ পরে তাহার শাশুড়ি লোক পাঠাইয়া তাহাকে আনাইলেন।
তারপর বহু বৎসর কাটিয়া গেল। শ্বশুর-শাশুড়ি মৃত। সম্পত্তি নষ্ট। লোকজন ছড়াইয়া গেল। রেখা রহিল।
কেন রহিল, এই প্রশ্নের উত্তর সে নিজেও হয়তো জানিত না। হয়তো অভিমান, হয়তো অভ্যাস, হয়তো কোথাও যাইবার স্থান ছিল না।
গ্রামের স্কুলে নতুন শিক্ষক আসিল, নির্মল। সে বিধুর মানুষ। বয়স চল্লিশের কাছাকাছি। অল্পভাষী।
প্রতিদিন বিদ্যালয় হইতে ফিরিবার পথে সে নদীর ঘাট দিয়া যাইত। প্রথমে সে দূর হইতে রেখাকে দেখিত। পরে একদিন কহিল, “আপনি প্রতিদিন এতক্ষণ জল দেখেন কেন?”
রেখা বলিল, “জল প্রতিদিন একরকম থাকে না।”
নির্মল হাসিল। “মানুষও কি থাকে?”
রেখা উত্তর দিল না।
ক্রমে কথাবার্তা বাড়িল। কথাগুলি বড় কথা নহে; আকাশে মেঘ, গ্রামের খবর, বই, পুরোনো দিনের স্মৃতি। কিন্তু দীর্ঘ নীরব জীবনে সামান্য কথাও কখনো গভীর হয়ে ওঠে।
একদিন নির্মল বলিল, “আমি বদলি চাহিয়াছি। হয়তো মাসখানেকের মধ্যে চলিয়া যাইব।”
রেখা কেবল বলিল, “ভালো।”
কিন্তু সেই রাতে বহুদিন পরে তাহার ঘুম আসে নাই। সে বুঝিল, মানুষ যখন ভাবে তাহার আর কিছু হারাইবার নাই, তখনই নিয়তি নিঃশব্দে পরীক্ষা লয়।
কয়েকদিন পরে নির্মল বলিল, “আপনি চাইলে... আপনার জন্য অন্য জীবন সম্ভব।”
রেখা শান্তভাবে জিজ্ঞাসা করিল, “এই বয়সে?”
“জীবনের বয়স হয় না।”
রেখা দীর্ঘক্ষণ নীরব থাকিয়া বলিল, “যে ঘরে বহুদিন প্রদীপ জ্বলে নাই, সেখানে হঠাৎ আলো জ্বালিলে সব ধুলো স্পষ্ট দেখা যায়।”
নির্মল আর কিছু বলিল না।
সেই বৎসর বর্ষা অস্বাভাবিক ছিল। দিনের পর দিন বৃষ্টি। নদী ক্রমে ফুলিয়া উঠিল। গ্রামের লোকেরা ঘর ছাড়িতে লাগিল।
নির্মল এক সন্ধ্যায় আসিয়া বলিল, “আজ রাত্রেই আপনাকে চলিতে হইবে।”
রেখা জানালার বাইরে নদীর দিকে চাহিয়া রহিল।
“সবাই কি যায়?”
“যারা বাঁচিতে চায়।”
রেখা মৃদু হাসিল। “সবাই কি সমানভাবে বাঁচে?”
রাত্রি গভীর হইল। ঝড়, বৃষ্টি, অন্ধকার। নির্মল নৌকা লইয়া ফিরিল।
রায়বাড়ির অর্ধেক ইতিমধ্যে ভাঙিয়া গিয়াছে।
সে ডাকিল, “রেখা!”
কোনো উত্তর নাই। শুধু উপরের জানালায় একবার ক্ষীণ আলো জ্বলিল। তারপর নিভিয়া গেল।
প্রভাতে বৃষ্টি থামিল। সূর্য উঠিল অদ্ভুত শান্ত মুখে। নদী অনেক দূর পর্যন্ত ছড়াইয়া পড়িয়াছে। রায়বাড়ির শেষ অংশটুকুও আর নাই।
রেখাকে কোথাও পাওয়া গেল না।
দুই দিন পরে ভাটার সময় ঘাটের ভাঙা সিঁড়ির ধাপে একটি পিতলের সিন্দুক উদ্ধার হইল। তাহার ভিতরে ছিল কিছু শাড়ি, কয়েকটি পুরোনো চিঠি, এবং শুকাইয়া যাওয়া শিউলি ফুলের মালা।
নির্মল চিঠিগুলি খোলে নাই। সে কেবল মালাটির দিকে অনেকক্ষণ চাহিয়া রহিল। তারপর আবার নদীর জলে ফিরাইয়া দিল।
সুবর্ণরেখা নিঃশব্দে বহিয়া চলিল। মানুষের যাহা কিছু অসমাপ্ত, নদী তাহার কোনো উত্তর দেয় না।

