একমুঠো স্বপ্ন
একমুঠো স্বপ্ন
বৃষ্টি থেমেছে ভোররাতে। উঠোনের কাদায় ছোট ছোট গর্তে জল জমে আছে। দরজার চৌকাঠে বসে নিতাই সেই জমা জলের দিকে তাকিয়ে আছে। উঠোনের এক কোণে কদমগাছটা দাঁড়িয়ে। ভেজা পাতার ডগা থেকে মাঝে মাঝে টুপ করে জল পড়ে কাদার ভেতর ছোট্ট বৃত্ত এঁকে দিচ্ছে।
ঘরের ভেতর মা পুরোনো শাড়ির পাড় সেলাই করছেন। জানালার ফাঁক দিয়ে আসা ভোরের আলো তাঁর মুখে এসে পড়েছে। সুচটা কাপড়ে আটকে তিনি হঠাৎ থামলেন। বললেন, "জানিস নিতু, আমি ছোটবেলায় একবার ইস্কুলের ঘরের সামনে গিয়ে দাঁড়িয়েছিলাম রে। ভেতরে ঢোকার সাধ্যি ছিল না। দূর থেকে দেখতাম ছেলেমেয়েরা স্লেটে খড়িমাটি দিয়ে লিখছে। সেদিন মনে হয়েছিল, আমিও যদি নিজের নামটা অন্তত একবার লিখতে পারতাম!"
কথা শেষ করে মা আবার সেলাইয়ে মুখ গুঁজলেন। সুচের খসখস শব্দটা ঘরের নীরবতায় মিশে গেল।
নিতাই বসে রইল। নিজের নাম লিখতে পারাটা কেমন? সে তো নিজের নামের চেহারাটাও চেনে না। তবু মায়ের কথাটা তার মনে রয়ে গেল, ঠিক যেমন বৃষ্টির পরে কদমপাতার ডগায় জলবিন্দু থেকে যায়।
গরু চরিয়ে ফেরার পথে পাঠশালার সামনে সে রোজ থমকে দাঁড়ায়। মাস্টারমশাই কালো বোর্ডে চক ঘষেন। ছেলেমেয়েরা একসঙ্গে চেঁচিয়ে পড়ে। নিতাই শোনে। তার মনে হয়, ওই সাদা সাদা দাগগুলোর ভেতর নিশ্চয়ই এমন কিছু আছে, যা মানুষকে অন্যরকম করে দেয়।
ঘরের চালার নিচে তার একটা পুরোনো টিনের কৌটো। ঢাকনায় জং ধরা। মহাজনের ফাইফরমাশ খেটে পাওয়া দু-এক আনা তামার কয়েন সে ওখানে জমায়। রাতে সবাই ঘুমিয়ে পড়লে কুপির আলোয় সে কৌটো উপুড় করে। গোনে। একটা বই, একটা খাতা, একটা পেন্সিল। কয়েক আনা বাঁচলে মায়ের জন্য লাল পাড়ের একটা শাড়ি। এই হিসাব সে প্রায়ই করে।
বর্ষা নামল। বৃষ্টি থামার নাম নেই। ভেজা বাতাসে মায়ের কাশিটা বাড়তে লাগল। রাতে নিতাই ঘুমোতে পারে না। পাশের ঘর থেকে একটানা কাশির শব্দ আসে। তারপর হঠাৎ থেমে যায়। ঘরটা নিস্তব্ধ হয়ে থাকে। এই নিস্তব্ধতাটুকুই নিতাইকে সবচেয়ে বেশি ভয় দেখায়।
এক সকালে কবিরাজ এলেন। মায়ের নাড়ি ধরে অনেকক্ষণ চুপ করে রইলেন। তারপর বললেন, "বড় ডাক্তারের ওষুধ লাগবে রে। গোটা পাঁচেক টাকা জোগাড় কর।" কথাটি বলেই তিনি চলে গেলেন।
সেই রাতে নিতাই কৌটোটা বের করল। মেঝেতে কয়েনগুলো ঢালল। বারো টাকা আট আনা। এর ভেতরেই তার বই আছে, খাতা আছে, পেন্সিল আছে, মায়ের শাড়ি আছে। হঠাৎ পাশের ঘর থেকে আবার কাশি শুরু হলো। একটানা, শুষ্ক। নিতাই অনেকক্ষণ মেঝেতে ছড়িয়ে থাকা কয়েনগুলোর দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর ধীরে ধীরে দুই হাত বাড়িয়ে সবগুলো কয়েন একসঙ্গে মুঠোর ভেতর তুলে নিল।
পরদিন দুপুরে শহর থেকে ওষুধের শিশি নিয়ে ফিরল সে। কৌটোটা পড়ে রইল একপাশে। খালি। মা ওষুধের শিশিটা হাতে নিলেন। কিছু বললেন না। শুধু ছেলের মাথায় হাত রাখলেন। নিতাই মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে রইল। তার মনে হলো, মায়ের হাতটা আগের চেয়ে হালকা হয়ে গেছে।
কয়েক সপ্তাহ পর পাঠশালায় নতুন বই এল। উঠোনে ভিড়। নতুন বইয়ের গন্ধে চারপাশ ভরে গেছে। ছেলেমেয়েরা আনন্দে বই বুকে চেপে বাড়ি ফিরছে। নিতাই দূরে একটা গাছের আড়ালে দাঁড়িয়ে। মাস্টারমশাইয়ের চোখে পড়ল।
"কী রে নিতাই, তুই বই নিলি না?"
নিতাই মাথা নিচু করে বলল, "টাকা জোগাড় হয়নি।"
"কেন? তোর না জমানো কৌটো ছিল?"
"মায়ের ওষুধ কিনেছি।"
মাস্টারমশাই কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন। তারপর নিজের ঘরের ভেতরে গেলেন। ফিরে এলেন হাতে একটা পুরোনো, মলাট-ছেঁড়া বই নিয়ে। বইটি নিতাইয়ের হাতে দিয়ে বললেন, "এটা আমার ছেলের বই ছিল। ও তো আর ফিরবে না। তুই রাখ।"
নিতাই বইটা দুই হাতে নিল। পুরোনো কাগজের একটা গন্ধ উঠল। নতুন বইয়ের মতো নয়; যেন অনেকদিন ধরে কারও কাছে থাকা কোনো জিনিসের গন্ধ। সেদিন রাতে কুপির আলোয় সে বইটা খুলল। প্রথম পাতায় একটা নাম লেখা। নিতাই একটা খড়ির টুকরো নিল। অনেক যত্ন করে সেই অচেনা নামের নিচে নিজের নামটা লেখার চেষ্টা করল।
নিতাই
অক্ষরগুলো বেঁকে গেল। সে হাতের তালু দিয়ে মুছে আবার লিখল। আবার বেঁকে গেল। সে আবার লিখল। বাইরে তখন বৃষ্টি পড়ছে। ঘরের ভেতর কুপির আলো কাঁপছে। আর বহুদিন আগে মায়ের বলা একটি বাক্য নীরবে তার পাশে বসে আছে।
অনেক বছর কেটে গেছে। পুরোনো কদমগাছটা ঝড়ে উপড়ে গেছে। মাটির ঘরের জায়গায় ইটের দেয়াল উঠেছে। মায়ের কবরের পাশে নতুন একটা কদমগাছ বড় হয়েছে। নিতাই এখন এই গ্রামের উচ্চবিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক।
আজও বর্ষার দুপুর। স্কুলে নতুন বই দেওয়া শেষ। একে একে সব ছাত্র বাড়ি ফিরে গেছে। শুধু একটা ছেলে বারান্দার কোণে চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছে। গায়ে তালি দেওয়া শার্ট, খালি পা, মাথা নিচু। নিতাইবাবু এগিয়ে গেলেন।
"কী রে, বই নিসনি?"
ছেলেটি নিচু গলায় বলল, "টাকা হয়নি স্যার।"
"বাবা দিতে পারেনি?"
ছেলেটি মাথা নেড়ে সম্মতি জানাল।
নিতাইবাবু আর কিছু বললেন না। নিজের ঘরে ফিরে ড্রয়ার টানলেন। ভেতর থেকে জং ধরা সেই পুরোনো টিনের কৌটোটা বের করলেন। বহু বছর ধরে কৌটোটা তিনি ফেলে দেননি। ঢাকনা খুললেন। ভেতরে জমানো টাকা। তিনি সবগুলো টাকা বের করে ছেলেটির হাতে দিলেন।
"যা, বই নিয়ে আয়।"
ছেলেটি প্রথমে টাকার দিকে তাকাল, তারপর তাঁর মুখের দিকে। পরমুহূর্তেই সে একছুটে বেরিয়ে গেল। কিছুক্ষণ পরে বারান্দা ফাঁকা হয়ে গেল। স্কুলবাড়িটা নিস্তব্ধ। নিতাইবাবু টেবিলের ওপর রাখা কৌটোটার দিকে তাকিয়ে রইলেন। কৌটোটা আবার খালি।
তারপর তিনি আলমারিটা খুললেন। ভেতর থেকে সেই পুরোনো মলাট-ছেঁড়া বইটা বের করলেন। প্রথম পাতাটা উল্টালেন। ঝাপসা হয়ে যাওয়া একটি নাম। তার নিচে কাঁপা কাঁপা হাতে লেখা:
নিতাই
নিতাইবাবু আঙুল রেখে রইলেন নামটার ওপর। বাইরে বৃষ্টি পড়ছিল। জানালার ওপারে নতুন কদমগাছটার ডালে প্রথম ফুলটি নীরবে দুলছিল।
