STORYMIRROR

Rifay Amin

Abstract Classics Inspirational

4.5  

Rifay Amin

Abstract Classics Inspirational

কালের জবানবন্দি

কালের জবানবন্দি

3 mins
16

মানুষ আজ আকাশ ছুঁয়েছে, অথচ মানুষের হৃদয় আজও মাটির নিচে কাঁদে। সভ্যতা আজ বিদ্যুতের বেগে ছুটে চলে, কিন্তু মানুষের বিবেক অনেকখানি পাথর হয়ে গেছে। নগরের কোলাহলে আজও শুনি ক্ষুধার্ত শিশুর কান্না; উপাসনালয়ের প্রাচীরে যুগে যুগে দেখি মানুষের রক্তের দাগ। এ কোন যুগ? এ কোন সভ্যতা? এ কোন উন্নতি, যেখানে মানুষ যন্ত্রকে জয় করেছে, অথচ নিজেকেই হারিয়েছে?

আজ কালের আদালতে দাঁড়িয়ে সময় নিজেই যেন নিজের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দিচ্ছে।

সে বলছে:

“আমি দেখেছি মানুষের জন্ম। দেখেছি আগুনের আবিষ্কার। দেখেছি পিরামিড, দেখেছি পানিপথ, দেখেছি পলাশীর প্রান্তর। আমি দেখেছি সাম্রাজ্যের উত্থান, দেখেছি পতন। কিন্তু সবচেয়ে ভয়ংকর যে দৃশ্য আমি আজ দেখি, তা হলো, মানুষের ভিতর থেকে মানুষের মৃত্যু।”

একদিন মানুষের হাতে ছিল লাঙল, আজ তার মুঠোয় মহাবিনাশের আগুন। একদিন মানুষ নদীর কাছে গান শিখত, আজ সে শিখছে ধ্বংসের অঙ্ক। একদিন কবিরা লিখতেন প্রেমের পদাবলি, আজ পৃথিবীর দেওয়ালে দেওয়ালে লেখা হচ্ছে ঘৃণার ইশতেহার। সভ্যতা যত উপরে উঠেছে, মানুষের মন তত কোথাও নিচে নেমেছে। আজ মানুষ অট্টালিকা গড়তে জানে, কিন্তু ভাঙা হৃদয় জুড়তে জানে না।

আমরা এমন এক যুগে এসে দাঁড়িয়েছি, যেখানে সত্যের চেয়ে প্রচার বড়, জ্ঞানের চেয়ে প্রদর্শন বড়, মানুষের চেয়ে মতবাদ বড়। মানুষ আজ নিজের আত্মাকে বিসর্জন দিয়ে মুখোশকে অলংকার করেছে। সামাজিক যোগাযোগের রঙিন মেলায় আজ মানুষের নিঃসঙ্গতা সবচেয়ে বেশি। চারদিকে হাজারো কণ্ঠস্বর, অথচ হৃদয়ের গভীরে গভীর নীরবতা।

আজকের পৃথিবী যেন এক বিশাল আলোকিত অন্ধকার।

এ যুগের মানুষ চাঁদে যেতে পারে, কিন্তু পাশের মানুষের ঘরে আলো জ্বালাতে পারে না। সে মহাকাশে প্রাণের সন্ধান করে, অথচ পৃথিবীর মানুষকে মানুষ বলে স্বীকার করতে কুণ্ঠা বোধ করে। ধর্মের নামে বিভেদ, রাজনীতির নামে প্রতারণা, সভ্যতার নামে লুণ্ঠন, এইসব দেখে কাল আজ ক্লান্ত।

কারণ মানুষ ক্লান্ত।

তবুও আমি নিরাশ নই।

কারণ ইতিহাস সাক্ষী, অন্ধকার কখনো চিরস্থায়ী হয় না। মানুষের বুকের ভিতর এখনও একফোঁটা আলো বেঁচে আছে। সেই আলোই কবিকে কবিতা লিখতে শেখায়, মাকে সন্তানের জন্য উপবাস রাখতে শেখায়, তরুণকে অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে শেখায়। পৃথিবী এখনও বেঁচে আছে কিছু নিঃস্বার্থ ভালোবাসার জন্য, কিছু নির্মল চোখের জলের জন্য, কিছু প্রতিবাদী কণ্ঠের জন্য।

গত শীতের এক সকালে আমি দেখেছিলাম, ফাটা চাদর জড়ানো এক বৃদ্ধ নিজের শেষ রুটিটুকু রাস্তার এক ক্ষুধার্ত শিশুর হাতে তুলে দিচ্ছে। পৃথিবীর সমস্ত সভ্যতা সেই মুহূর্তের কাছে ক্ষুদ্র মনে হয়েছিল। কারণ মানুষ এখনও সম্পূর্ণ নিঃশেষ হয়ে যায়নি।

যে শিশুটি আজও ক্ষুধার মাঝেও আকাশ দেখে হাসে, যে কৃষক খরার মাটিতে দাঁড়িয়েও আগামী দিনের স্বপ্ন বোনে, যে তরুণ অন্যায়ের বিরুদ্ধে একা দাঁড়ায়, মানবতার শেষ প্রদীপ এখনও তাদের হাতেই জ্বলছে।

আজ আমাদের সবচেয়ে বড় সংকট অর্থের নয়, প্রযুক্তির নয়, আত্মার। মানুষ তার আত্মাকে হারিয়ে ফেলছে। আর যে জাতি আত্মাকে হারায়, সে জাতি একদিন ইতিহাসের অন্ধকার গহ্বরে হারিয়ে যায়। রোম হারিয়েছে, ব্যাবিলন হারিয়েছে, বহু পরাক্রমশালী সভ্যতা ধুলায় মিশেছে। কারণ শক্তি মানুষকে বড় করে না, মানবতা বড় করে।

আজ দরকার নতুন বিদ্রোহ।

সে বিদ্রোহ অস্ত্রের নয়, হৃদয়ের।
সে বিদ্রোহ ঘৃণার নয়, বিবেকের।
সে বিদ্রোহ মানুষকে ধ্বংস করার নয়, মানুষকে মানুষ করার।

আজ দরকার এমন এক নবজাগরণ, যেখানে ধর্ম মানুষকে বিভক্ত করবে না, আলিঙ্গন করবে; জ্ঞান অহংকার সৃষ্টি করবে না, প্রজ্ঞা সৃষ্টি করবে; রাজনীতি ক্ষমতার সিংহাসন হবে না, মানুষের সেবার অঙ্গীকার হবে।

কালের জবানবন্দি আজ আমাদের সামনে এক নির্মম সত্য তুলে ধরেছে:

সভ্যতার সবচেয়ে বড় পরাজয় তখনই ঘটে, যখন মানুষ তার মানবিকতা হারায়।

তাই আজও সময় আমাদের ডাকে।
ডাকে বিবেককে, ডাকে ভালোবাসাকে, ডাকে মানবতাকে।

কারণ পৃথিবী শেষ হয়ে যায় না যুদ্ধের আগুনে,
পৃথিবী শেষ হয়ে যায় মানুষের হৃদয় শুকিয়ে গেলে।

মানুষের মৃত্যু পৃথিবীর মৃত্যু নয়; মানবতার মৃত্যুই পৃথিবীর অন্তিম সন্ধ্যা।

আর যতদিন মানুষের হৃদয়ে একফোঁটা মমতা বেঁচে থাকবে, ততদিন এই পৃথিবী ধ্বংস হবে না। ততদিন ইতিহাসের শেষ পৃষ্ঠায় লেখা থাকবে:

“মানুষ এখনও বেঁচে আছে।”


Rate this content
Log in

Similar bengali story from Abstract