সকালবেলার বাজার
সকালবেলার বাজার
আমাদের বাপ মায়ের ছোটবেলায় টাকা পয়সা দিতো না। তাই হাত খরচ জোগাড় করতে বাজার করাটা একটা পেশা ছিলো আমাদের। বাজার করে আনলে কিছু টাকা বকশিস মিলতো। আর দরাদরি করে যে টাকা বাঁচাতে পারতাম, তার অর্ধেকটা আমাদের পুরস্কার হিসেবে দিয়ে দিতো বড়রা। তবে এই পেশাটা পরে আমার নেশা হয়ে গিয়েছিলো।খুব ছোটবেলা থেকে বাজারের হাতে খড়ি তাই আমার অভিজ্ঞতা প্রশংসা পেতে খুব ভালো লাগে আরকি। মোটামুটি পাকা বাজারু হিসেবে আমার তারিফ সবসময় করে সবাই। ভাইকে ভাইএর বলে ঠেস দিয়ে বলে আমার থেকে বাজার করা শিখতে।
বিদেশে চাকরি করি ছুটি তে এসে বছরে বড়জোড় একমাস থেকে দুই মাস বাজার করার সুযোগ পাই। যেদিন কিছু বাজার করার থাকে না, সেই দিন মনটা উশখুশ করতে থাকে বাজারে যাবার জন্য। খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে মাকে জিজ্ঞেস করতে থাকি। রসুন ? ধনেপাতা? টমাটো? লেবুর কিছু একটা আনাতে হবে কিনা জিজ্ঞেস করি। ফন্দি খুঁজি বাজারে যাবার।
কিন্তু মা চিলায় 'বাজারে গেলেই অযথা এক ব্যাগ বাজার করে না আনলে মন ভরে না তোর। আগের বারে তুই যাবার পর এক মাস বাজার যেতে হয়নি।"
ভাই এর রূপাও আপত্তি করে আজকাল বাজারে যাওয়া নিয়ে । বলে, "খাওয়ার লোক নেই, শুধু বাজার করে আনলেই হল।সেগুলো উদ্ধার হবে কি করে ?। আর আমি এতো রান্না করতে পারবো না । বাজার করার সখ তো বিয়ে করে বৌ আনো।" আমার ভাই এর বৌ রূপা আবার খুব হিসাবি । এখন আবার আমাকে বাজারের ফর্দ ছাড়া বাজার করতে পাঠায় না। মনে বড় কষ্ট বাজার করার স্বাধীনতা চলে গেছে।
আজ যেমন বাজারে গিয়ে কি বিপদে পড়লাম।সিজিন চেঞ্জের সাথে সাথে বাজারে কত নতুন জিনিষের দেখা মিলো। অথচ ফর্দ মিলিয়ে বাজার করলে চলে?এই তো সেদিন, বাজারে বেশ ডাঁশালো সবুজ জলপাই এসেছিল। একটু নরম দেখে নিয়ে ভাল করে ধুয়ে, নুন চিনি, তেল আর কাঁচালংকা দিয়ে চটকে রোদে ঘন্টা তিনেক ফেলে রেখো তার শেষ পাতে খেতে দারুন ! ভাবে জিভে জল এসে যায়। কিন্তু ওই যে ভিলেন বাঁধা ফর্দের ।বাজারে এলেই চোখ জুড়িয়ে যায় আমার। শীতকাল মানেই সব্জী সুন্দরীদের আনাগোনা। রূপের ডালি নিয়ে হাজির হবে পিঁয়াজকলি থেকে ফুল কপি । পিঁয়াজকলির দেহ দেখেছো, কোন সুন্দরীর রমনীর কোমল হাতের আঙ্গুল। আবার হাজির হয় গাজর, ফুলকপি, বাঁধাকপি, সিম মটরশুঁটিরা। দেখেছেন মরশুমের প্রথম বাঁধাকপি , মনে হয়না গাঢ় সবুজের রঙের শাড়ী পরা ঘোমটা টানা নতুন বৌ এর মতো। ঘোমটার আড়াল দিয়ে উঁকি মারছে ।নিতে গিয়ে নিতে পারি না। পকেট থেকে ফর্দটা বার করে পেট মোটা কুমড়োর নিতে হয়। তাও গোটা নেওয়া যাবে না নিতে হবে এক ফ্যালি। ফ্যালা করে কেটে রাখা বিচি ভর্তি কুমড়োগুলো হলদে ছোপওয়ালা দাঁত বের করে হাসছিলো আমার দিকে তাকিয়ে দিকে তাকিয়ে। একে রূপা বার বার মনে করিয়ে দিয়েছে মাছের মাথা গুলো অনেকদিন ধরে পড়ে আছে ফ্রীজে। ঝিঙ্গে, বেগুন দিয়ে ঘ্যাঁট হবে। কিন্তু বেগুন কিনতে গিয়ে চোখে পড়ল সতেজ মুলোর দিকে। গোলাপী আর সাদা স্যুট পরে মুলো সুন্দরীরা হেসে একে ওপরের গায়ে যেন লুটিয়ে পড়ছে। কোন ফরমান না মেনে আঁটি খুলে দুপিস মুলো বার করেই দিলাম । পুরো আঁটিটাই দিতে চাই ছিলো মাত্ৰ তো দশটাকাতে । ওই দুপিস না হয় কোনমতে ঘ্যাটের মধ্যে চালান হয়ে যাবে। বেশি বকাঝকা খেতে হবে না।
কিন্তু পুরোটা নিলে কি ভালো হতো।ঝিরিঝিরি করে কুরে,স্রেফ ভাজা ভাজা । সাথে নারকেল কোরা আর বড়ি দিলে কথা নেই। শীতের বাজারে সবজির কোন নাম নেই লিস্টে। মুলোটাও জোর করে নিয়ে নিলাম। মুলো মানে শুধু কি মুলো। নরম মুলোশাকই বা কি ফেলে দেবার ? নরম মুলোশাক কুচিকুচি করে ভেজে নিলে কথা নেই ভাতের সাথে।
বাজারে থেকে বেরিয়ে মাছ বাজারে দিকে যেতে গিয়ে চোখে পড়লো সবুজ বোঁটাওয়ালা ছাড়া ছাড়া ফুলকপি যেন সাদা লক্কা পায়রার মত পেখম মেলেছে।ওই ফুলকপি ছাড়া যায় না।কাতলা বা পুকুরের ভেটকির গাদা, ফুলকপি, সিম আর হিং এর বড়ি দিয়ে ঝোল,করলে কথা নেই। সুন্দরী বাঁধাকপি, যুবতীর কোমল পদ্মকলি আঙ্গুলের মত মটরশুঁটি, লাস্যময়ীর রাঙা ঠোঁটের মত কচি গাজর আর শীতের বিট ? কিছুই কেনা হলো না কবে এসবের নাম ফর্দে ঢুকবে কে জানে ? ততদিন পর্যন্ত ওই উচ্ছে, বেগুন, কুমড়ো, আর ঢেঁড়স খেয়ে কাটাতে হবে । ওই ফর্দের জন্য বাজার করার স্বাধীনতা নেই। যেমন পুজোর ঠিক আগে আগেই, মাছ বাজারে গিয়ে একটা ইলিশ হাতে পেয়ে ছিলাম। ইলিশ যাই যাই করছে। সাইজও ভাল নেই। মাত্র কয়েক পিস পরে আছে।তার মধ্যেই ছ সাতশো ওজনের ইলিশটা হাত তুললাম। হাত দিয়ে পরীক্ষা করে দেখলাম বেশ টাইট আর গোলালো পেট। নেবেন কি নেবেন না এই দোনামনায় ছিলাম।ইলিশ লিষ্টে ছিলো না, কিন্তু ভাল জিনিসটা হাতছাড়া করতে ইচ্ছে করছিলো না। ইতিমধ্যে একজন ঢুকেও গেল ইলিশ কিনতে। দরাদরি চলছিলো ।রাগ করে পাঁচটে ইলিশ নিয়ে নিয়েছিলাম। তাই নিয়ে অনেক অশান্তি হয়েছিল। মা বলেছিলো আর বাজারে আসতেই দেবে না আমায়। তাই ফর্দ ছাড়া কিছুই নেবার ঝুঁকি নিতে পারি না।
পিঁয়াজশাক আমার খুব প্রিয় । কিন্তু নিয়ে গেলেই অশান্তি হয়। পিঁয়াজশাকের গোড়ায় মাটি লেগে থাকে রান্না ঘর নোংরা হয়। তাই নেওয়া হয় না তেমন। মাছ কেনার কথা ছিলো না কিন্তু মাছবাজারে ঢুকে দেখি আমার পরিচিত সুজন বাবু মৌরলা নিচ্ছেন, ভালই সাইজ। আমাকে দেখে একগাল হেসে বললেন "পিঁয়াজকেলি নিয়েছি। তাই এই মৌরলা নিচ্ছি। দিয়ে মৌরলা ভাজা ভাজা পিঁয়াজকেলি , আমার দারুন লাগে বুঝলেন না।"
আমার জিভ দিয়ে নোলা সুড়ুৎ করে গড়িয়ে পড়ল।মন বিদ্রোহী হয়ে গেলো। আবার সেই সময় সুজন বাবু র ব্যাগ থেকে পিঁয়াজ কলি গুলো উঁকি দিলো।পিঁয়াজকলির ডগায় পদ্মফুলের আধফোটা কুঁড়ির মতন ফুল, যেন ইশারায় ডাকছে। লোভে পড়ে মাছের অর্ডার দিয়ে দিলাম বেছে একটু বড় সাইজের দিতে বললাম। মাছ নিয়ে পিঁয়াজকলির খোঁজে গেলাম। আরো একটা নতুন থলে কিনে থলে ভর্তি করে ঘরে পৌঁছতেই শুরু হল অশান্তি। রূপা বললো ফ্রীজে নাকি সবজী আর মাছ পেঁচে যাচ্ছে। আজ কিছু ফেলতে হবে।
এ কথা শুনে আমাদের কাজের মেয়ে মিঠাই তাড়াতাড়ি বললো। " বৌদি তুমি ওগুলো ডাসবিনে না ফেলে একটা প্যেকেটে রেখে দাও। আমরা তো সকাল বেলায় বাজার করতে পারি না। সকালের বাজারে সব কিছুর দাম আগুন। বেলাতেই বাজার করি তাই ঐ পচা পেটকো খাওয়া আমাদের আভ্যাস আছে। তাছাড়া এ সপ্তাহ বাজারে মুখ দেখিনি আমরা। তোমাদের ফেলে দেওয়া সবজী গুলো থেকে বেছে নিয়ে ছেলেমেয়েদের মুখে একটু সবজী করে ভাত তুলে দেবো নাহয় আজ।"
