Participate in 31 Days : 31 Writing Prompts Season 3 contest and win a chance to get your ebook published
Participate in 31 Days : 31 Writing Prompts Season 3 contest and win a chance to get your ebook published

Debdutta Banerjee

Horror


5.0  

Debdutta Banerjee

Horror


রুকু

রুকু

6 mins 934 6 mins 934

 


 

 




 


আমলকী গাছের ইরল চিরল পাতার ফাঁক দিয়ে দুপুরের অলস রোদ্দুর আলপনা আঁকছে ঝরা পাতার বুকে। রুকু পা টিপে টিপে ঝুপসি কুল গাছটার কাছে এসে দাঁড়ায়। টাউনের শেষ প্রান্তে বেশ অনেকটা জায়গা নিয়ে এই পরিত্যক্ত বাড়িটা । কোন এক সময় লাল ইট আর কাঠের কাজ করা এই  দোতলা বাড়িটাতে লোক থাকত রুকু শুনেছে। কিন্তু রুকু বরাবর বাড়িটাকে খালি দেখে এসেছে। ওদের বাড়ির পাশে কিছুটা বাঁশ ঝাড় আর জংলা ঝোপের পর পচা পুকুরের মাঠ, আর তার শেষ প্রান্তে এই বাগান বাড়ি। বাড়িটার একটা বদনাম আছে, লোকজন এড়িয়েই চলে এদিকটা। একেই টাউনের শেষ প্রান্তে তেমন কেউ আসে না। ঐ পচা পুকুরের মাঠে এক সময় খুব অসামাজিক কাজ কর্ম হত।


রুকুর অবশ্য ভয়ডর কম, রোজ দুপুরে ও ভাঙা পাঁচিল টপকে এই বাড়িতে চলে আসে। বাড়িটার বাগানে অযত্মে বেড়ে ওঠা ফল গাছ গুলো সারা বছর ফলে ভরে থাকে। এমন টুসটুসে রসালো ডালিম, মিষ্টি কুল, পাকা তেঁতুল গরমে আম, জাম, লিচু কি নেই এখানে। কয়েক বছর ধরে এসে এসে রুকু বাড়িটাকে ওর সম্পত্তি ভেবে নিয়েছিল।


তাই তো গতকাল যখন দোতলার জানালাটা খোলা দেখেছিল বেশ অবাক হয়েছিল। সামনের দরজার জং ধরা তালাটাও উধাও!! বড় পেয়ারা গাছটায় উঠে উঁকি ঝুঁকি মারতেই বৃদ্ধ লোকটাকে দেখতে পেয়েছিল ও। একদম সাদা চুল দাড়িতে অনেকটা রবিঠাকুরের মত দেখতে লেগেছিল।


তবে ভয় পায়নি রুকু। অল্প টোপা কুল তুলেই পালিয়ে এসেছিল। আজ ঢুকেই দেখে নিয়েছে লোকটা বারান্দায় টেবিল পেতে বসে কি সব লিখছে আর কাগজ ছিঁড়ছে। কেমন ঘোলাটে দৃষ্টি!!একটা কাঁচা তেঁতুল চিবোতে চিবোতে রুকু লোকটাকে ভালো করে লক্ষ্য করে। মা বলেছিল এটা দত্তদের বাড়ি, বহু বছর আগে ওদের শেষ বংশধর কলকাতা চলে গেছিল। প্রথম প্রথম বছরে এক দু বার আসত, পরে কমতে কমতে গত সাত আট বছর আর কেউ আসে না এখানে।


রুকু স্কুলের বইতে পড়েছিল পরের জিনিস না বলে নিলে তা চুরি, এতদিন এই বাড়িতে কেউ ছিল না বলে রুকু ইচ্ছা মত ফল ছিড়ে খেয়েছে। কিন্তু  আজ বড্ড খচখচ করছে মনটা। এতদিন তো এই লোকটা ছিল না, তাই তো রুকুর একটা অধিকার জন্মে গেছিল । তাছাড়া বাগানটায় ওর যাতায়াত আছে বলেই বাড়িটা এখনো সুরক্ষিত আছে। দু বছর আগে নবা পাগলা ঘাঁটি গাড়তে এসেছিল একবার। রুকুই তো ভয় পাইয়ে ওকে তাড়িয়েছিল। ঘন গাছের ফাঁকে রুকুকে কেউ দেখতে পায়নি। তাছাড়া হাত কাটা ভোলার দল দখল নিতে এসেছিল দু বার। রুকু গাছের ভেতর লুকিয়ে ফল ছুড়ে আর বিকট আওয়াজ করে এমন ভয় দেখিয়েছিল যে আর আসে নি। প্রমোটার মদনেরও নজর রয়েছে এই বাড়ির প্রতি রুকু জানে। ওকেও ঘোল খাইয়েছে রুকু। ওর হাসি পায়, সারা টাউনের লোক যাকে ভয় পায় সে একটা দশ বছরের বাচ্চার ভয়ে পালিয়েছিল সে দিন।


 অবশ্য তপন ফলওয়ালাকে রুকু কিছু বলে না। ও বেচারা খুব গরীব। মাঝে মধ্যে ও ঢুকে চুপচাপ কিছু ফল পেরে নিয়ে যায়। তা যাক না, ওর তিনটে বাচ্চা, বৌ টা চির রুগ্ন। ও যদি এই বাগানের ফল বিক্রি করে ওর বাচ্চাদের দু দিন পেট ভরে খেতে দেয় তা তো ভালো। এত ফল তো রুকু একা খেতে পারে না। পাখিতে খায় কিছুটা, কত পড়ে নষ্ট হয়।


পরদিন দুপুরে রুকু দেখল লোকটা দোতলার বারান্দায় দাঁড়িয়ে উদাস হয়ে আকাশ দেখছে। নিশ্চই মন খারাপ, মাঝে মাঝে মা কাজ থেকে দেরি করে ফিরলে রুকুর ও এমনি হয়। দুটো ডাঁসা পেয়ারা ঐ বারান্দায় ছুড়ে দেয় রুকু। এরপর ও কয়েকটা ফল নিতেই পারে মনে মনে ভাবে। লোকটা ফল দুটো দেখে একটু থতমত খেয়ে চারদিকে তাকায়। কিন্তু রুকুকে দেখতে পায় না। বড় আম গাছের পাতায় ছাওয়া ডালে বসে রুকু লোকটাকে দেখে ভালো করে।


কিন্তু হঠাৎ ডালের ঐ প্রান্তে বড় লতাটাকে দেখে কেঁপে ওঠে রুকু। এই বাগানে এমন লতা আছে দুটো, অনেকেই বাস্তু প্রহরী বলে ওদের। এই একটা জিনিসকেই ভয় পায় ও, আর ভয় পেয়ে ডাল থেকে লাফ মারতেই বৃদ্ধ ওকে দেখে ফেলেছিল।


আচমকা লাফ দিয়ে পা টা মচকে গেছিল বলে ছুটতেও পারছিল না ও। বৃদ্ধ ওকে পাঁচিলে ওঠার আগেই ধরে ফেলেছিল।


-'' তুই কে ? কি করছিস এখানে ? "


কর্কশ কণ্ঠে  বেশ জোরেই প্রশ্ন ভেসে আসে।


রুকু অবশ্য এমন হতে পারে জানত। বলল -''আমি রুকু, তুমি কে ? এমন বকছ কেনো ?''


-''বকলাম কোথায়? পড়ে গিয়ে পা ভাঙলে কি হত জানিস !! আমি এ বাড়ির মালিক নটবর দত্ত।''


-''ভাঙেনি, মচকে  গেছে একটু। ''


বৃদ্ধ ভালো করে ওর পা টা দেখেন, নীলচে হয়ে উঠেছে।রাগতে গিয়েও পারেন না ঠিক। বলেন -''এই দুপুরে কি করছিলি এখানে ? তোর স্কুল নেই ?''


-''শীতের ছুটি চলছে তো। এই বাগানে কত ফল, কেউ খায় না, তাই তো ...''


-'' এই জঙ্গলে ফল পারতে ঢুকিস !! ভয় নেই তোর ? সব তো সাপের বাসা হয়ে আছে। ''


-''সে তো আছেই, ঐ দেখেই তো লাফ মারলাম। তোমরা পরিষ্কার করাও না, থাকো না, আসো না তাই তো এই অবস্থা। '' রুকুর পায়ের ব্যথাটা বাড়ছে। ও হাত বুলোয় জায়গাটায়।


-''ঘরে আয়, ওষুধ লাগিয়ে দেবো। হাঁটতে পারবি তো ?''


ঘাড় নেড়ে একটা পা টেনে রুকু বৃদ্ধর সাথে যায় একতলায়। সারা বাড়িতে একটা ভ্যাঁপসা গন্ধ, পুরু ধুলোর আস্তরণ। রুকু দু বার নাক টেনে বলে -''বাবা রে, এই নোংরায় মানুষ থাকে। অসুস্থ হয়ে যাবে যে কেউ। ''


বৃদ্ধ ততক্ষণে একটা ঢাউস ওষুধের বাক্স এনে ওর পায়ে একটা স্প্রে লাগাতে ব্যস্ত হয়ে পড়েছেন।


কিছুক্ষণের মধ্যে দুই অসমবয়সীর মধ্যে বন্ধুত্ব হয়ে যায়। এই জন মানবহীন জায়গায় একটা কথা বলার লোক পেয়ে বৃদ্ধ দত্ত বাবু বেশ খুশি হন। বলেন -''আসলে বহুবার প্ল্যান করেও আসা হয় নি এ বাড়িতে। তাই এবার হঠাৎ চলে এসেছি, লোকজন জোগাড় করতে পারিনি । কত বছর পর এলাম জানিস !! গ্ৰামটাই বদলে গেছে। পুরানো লোক একটাও নেই। ছেলেরা তো আসতেই চায় না। নাতিটার খুব ইচ্ছা ছিল আসার। কলকাতার ইট কাঠ পাথরে সাজানো ফ্ল্যাটে বসে এই বাগান বাড়ির গল্প শুনে কতবার আসতে চেয়েছে। কিন্তু ছুটি পড়লেই ওরা সিঙ্গাপুর, ব্যাংকক যায়, মাল দ্বীপ যায়, ইউরোপ যায়, এসব গ্ৰামে ওর বাবা মা আসতেই দেয় না। '' একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে আসে বৃদ্ধর বুক চিড়ে।


-''  তুমি নিজে আসো নি কেন এতদিন ? ''


-''কাজ আর কাজ, ব‍্যবসার কাজে দেশ বিদেশ ঘুরেছি শুধু। কাজ করতে করতেই শেষ হয়ে গেল গোটা জীবন, এখন অখণ্ড অবসর। তাই তো এলাম। ''


দত্ত বাবু চোখের কোন মোছেন।


পায়ের ব্যথাটা কমে আসতেই রুকু ফিরে যায়। মনটা বেশ ভার দত্ত বাবুর কথা ভেবে।


 


পরদিন গিয়ে দেখে বৃদ্ধ লেখায় ব্যস্ত। চারদিকে ছেড়া কাগজ। দু একটা তুলে নিয়ে রুকু পড়ে দেখে। কবিতা লেখার চেষ্টা করছেন দত্ত বাবু। রুকুকে দেখেই বলে -''আয় আয়, তোর কথাই ভাবছিলাম আমি। ''


পকেট থেকে কবাঁশ বাগানের মাথা- /সূর্য্যি ধরে ছাতা,


আমলকীর ঐ পাতা /ফুলের মালা গাঁথা ....''


 


হি হি করে হেসে ফেলে রুকু। বলে -'' ধুত, মিল থাকলেই কি কবিতা হয় নাকি?''


-''হাসবি না একদম, তুই কি বুঝিস কবিতার ?''


-''উফ, আমায় তবে শোনালে কেনো ?''


-''আ.. আচ্ছা আচ্ছা, আরেকটা শোন তবেআম গাছের ঐ ডালে / তিনটে বাদুর ঝোলে


নীল রঙের ঐ আকাশ //মিষ্টি মিষ্টি বাতাস....


এটা কেমন বল?''


 একটা পাকা কুল মুখে ভরে বিজ্ঞের মত রুকু বলে -''প্রথম দু লাইন তবু চলে, কিন্তু তারপর জমল না। ''


 -''এটা শোন তবে,


বাগান খানি জোড় / ফলের গাছে ভরা


কত পাখি আসে / মেঘের দেশে ভাসে ....''


-" পাখি আকাশে ওড়ে, মেঘের দেশে ভাসে না। অন্য কিছু ভাবো তো। ''


বৃদ্ধ এবার  মন খারাপ করে বলেন -''তুই ও বলছিস হচ্ছে না!! তাহলে ...''


-''এত কাগজ নষ্ট করেছো কেনো ? জানো, পাতা ছিঁড়লে আমার মা কত বকে ?'' চারদিকে তাকিয়ে রুকু বলে।


-"সারা জীবন শখ ছিল কবি হব, কবিতা লিখব। এখন এই অবসরে ভেবেছিলাম এটা নিয়েই থাকব। ''


-''চেষ্টা করো। মা বলে চেষ্টা করলেই হবে। কবিতা না আসলে গল্প লেখো। '' রুকু বেশ বড়দের মত গম্ভীর হয়ে বলে।


বৃদ্ধ বিরক্ত হয়ে উঠে পড়েন, ঘর থেকে কিছু ক্রিম বিস্কুট এনে রুকুকে দেন। বলেন -''সারা দুপুর এই টক ফল গুলো চিবাস। অসুস্থ হয়ে পড়লে ?''


-''আমার কিছু হয় না। তুমি একা একা কি খাচ্ছ শুনি?''


-''ঐ তো, দু দিন ভাতে ভাত করেছি, রাতে বাজার থেকে রুটি নিয়ে আসি। ''


-''স্টেশনের কাছে মাসির হোটেল আছে, হোম ডেলিভারি দেয়। মা তো চাকরি করে সময় পায় না। কিনেই আনে রাতে। ভালো খাবার। আর একটা লোক দিয়ে বাড়িটা পরিষ্কার করো। ''


-''হুম, দেখি। কয়দিন আর থাকব। আসলে ভেবেছিলাম এই ফাঁকা জায়গায় এলে কবিতা লিখতে সুবিধা হবে !!'' বৃদ্ধ খাতা কলম গুলো নাড়াচাড়া করেন আপন মনে।


-''কবিতা আসার হলে এমনি আসবে। '' বেশ কিছুক্ষণ গল্প করে রুকু উঠে পড়ে।


 


ভালোই জমে উঠেছিল বন্ধুত্ব। সেদিন দুপুরে রুকু গিয়ে দেখে বৃদ্ধ সব কাগজ একসাথে করে আগুন ধরিয়েছেন। কি ব‍্যাপার জিজ্ঞেস করতেই উনি বললেন -''কবি আর হতে পারলাম না রে। এবার ফিরতে হবে। ছেলেরা এই বাড়ি বিক্রি করে দিতে চাইছে।


-''কেনো ?''


-''দেখাশোনা কেউ করতে পারে না। এখানে এখন ফ্ল্যাট তৈরি হচ্ছে। মদন প্রমোটার যোগাযোগ করেছে ওদের সাথে। ''


রুকু চেনে ঐ প্রমোটার কে, এলাকায় যে কটা ফাঁকা বাড়ি ছিল সব ওর দখলে। ওদের ছোট্ট টাউনটা শহর হয়ে উঠছে ধীরে ধীরে।


মনটা খারাপ হয়ে যায়। বলে -''তুমি চলে যাবে ? তোমার নাতিকে আনবে না ?''


-''আর হবে না। ''


বৃদ্ধ হাতের কাগজ গুলো আগুনে ফেলে উঠে দাঁড়ান। রুকুকে নিয়ে ঘরে ঢুকে আসেন।


-''ছোটবেলা থেকে বই পড়তে ভালো লাগত । ভাবতাম লেখক হবো। স্বপ্নই থেকে গেলো। এ জীবনে আর পূরণ হল না। '' অবসাদ ঝরে পড়ে ওনার গলাতে।


-''এত সহজে হার মেনে নিলে ?'' মুচকি হাসে রুকু।


-''কত চেষ্টা করলাম দেখলি তো ....''


-''কবিতা যদি না আসে গল্প লেখো । এই আমায় নিয়েই একটা গল্প লেখো না, আমার বাবা নেই , মা আর আমি থাকি ঐ মাঠের ধারের হলুদ বাড়িতে। রোজ দুপুরে আসতাম তোমাদের এই বাগানে। যদিও বাড়িটার বদনাম আছে, মা কত বলত যাস না, ভূত না থাক সাপ খোপের বাসা ও বাড়ি। .... তারপর এক দুপুরে আমি যখন আম গাছের ডালে বসে দোল খাচ্ছি হঠাৎ ....''


খকখক করে কেশে ওঠে রুকু। গল্পের নেশায় ওরা খেয়াল করেনি কালো ধোঁয়ায় ঘর ভরে গেছে। কাগজের আগুন থেকে বাগানের শুকনো পাতায় আগুন লেগেছিল। যা সারা বাড়িতে ছড়িয়ে পড়েছে। কাঠের কড়িবরগা জ্বলে উঠেছে। রুকু এক ছুটে বারান্দায় বেরিয়ে চারপাশটা দেখে নেয়। দত্ত বাবু ভয়ে কেমন হয়ে গেছেন, দেওয়াল তেতে উঠেছে, মেঝে গরম হচ্ছে। পুরানো বাড়ি, ফাটতে শুরু করবে হয়তো এবার। টাউনের শেষ মাথায় বলে লোকের চোখেও পড়বে দেরিতে। শীতের হাওয়ায় আর শুকনো পাতায় তাড়াতাড়ি ছড়িয়ে গেছে আগুন।


-''আমার সাথে এদিক দিয়ে এসো। '' রুকু টেনে নিয়ে যায় বৃদ্ধ কে। বাথরুমের পেছনে মেথর আসার ঘোরানো সিঁড়ির দরজাটায় এখনো আগুন লাগেনি। ওটা খুলে দু জনে নেমে আসে, নিচের তিনটে সিঁড়ি ভাঙা। চোখ বন্ধ করে রুকুর সাথে লাফ দেন বৃদ্ধ। ভাগ্যিস নিচে বালির ঢিপি ছিল। তবুও এই বয়সে এমন একটা ঝটকা ...., চারপাশে তাকিয়ে রুকুকে আর দেখতে পান না উনি । ততক্ষণে কালো ধোঁয়া দেখে লোকজন জমতে শুরু করেছে সামনের দিকে। অন্ধকার শীতের দিন বলে বেশ তাড়াতাড়ি নামে। বহুদূর থেকে দেখা যাচ্ছে আগুনের শিখা। দত্ত বাবু সামনে আসতেই দমকলের গাড়ির আওয়াজ ভেসে আসে। নিশ্চই কেউ খবর দিয়েছে। কয়েক ঘণ্টার মধ্যে আগুন নিয়ন্ত্রণে চলে আসে। হঠাৎ রুকুর কথা মনে হতেই ভিড়ের মধ্যে আবার চোখ বোলান দত্ত বাবু। বোধহয় ভয় পেয়ে বাড়ি চলে গেছে।


পরদিন সকালে ছেলেরা খবর পেয়ে চলে এসেছিল। নিচতলাটা পুড়লেও দোতলাটা অক্ষত আছে কিছুটা। সব ঝামেলা মিটিয়ে বিকেলে দত্ত বাবু মাঠের শেষে বাঁশ বাগানের মাঝে ঐ বাড়িটায় যান একবার । ছোট্ট হলুদ বাড়িটার কড়ায় তালা ঝুলছে। রুকু বলেছিল ওর মা চাকরি করে। ছেলেটা হয়ত আদারে বাদারে ঘুরছে। চলেই আসছিলেন উনি, হঠাৎ মদনের সাথে দেখা। বাড়ি বিক্রির ব্যাপারে কথা বলতে আসছিল। কোথায় এসেছিলেন বলতেই দত্ত বাবু রুকুর কথা বলেন ।


 -''কাল ঐ তো আমায় বাঁচালো। নাহলে আমার মাথাই কাজ করছিল না। ''


হঠাৎ উনি দেখেন মদনের মুখ ফ্যাঁকাসে , ও বলে -''কার কথা বলছেন, ফরসা করে কোঁকড়া চুল, বড় বড় চোখ.... ঐ হলুদ বাড়িতে থাকত যে বাচ্চাটা ....''


-''হ্যাঁ,  ঐ তো রুকু। ''


-'' ওকে দেখেছেন !!''


-''আরে বাবা ঐ তো বাথরুম দিয়ে বের করল আমায়। রজ আসে, গল্প করে কত ....''


 মদনের  রক্ত শূন্য মুখটা দেখে অবাক হন দত্ত বাবু। কাঁপা গলায় মদন বলে -'' তি..তিন বছর আগে বাচ্চাটা আপনার বাড়ির বাইরে সাপের কামড়ে মরে পড়ে ছিল এমনি এক শীতের বিকেলে। ফল পারতে ঢুকেছিল। সাপের কামড় খেয়ে পালাতে গিয়ে ....''


আর একটা কথাও কানে ঢোকে না দত্ত বাবুর। মদন হঠাৎ বাইক স্টার্ট দিয়ে উল্টো পথে ফিরে যায়। ঝুপ করে অন্ধকার নামতেই কুয়াশার চাদরে ঢেকে যায় চারদিক। মাঠের শেষে নিজের বাড়িটাকে ঠিক পোড়ো বাড়ি মনে হচ্ছে। দুই ছেলেই রাতটা স্টেশনের পাশে হোটেলে কাটাবে। অলস পায়ে নিজের বাড়ির দিকে হেঁটে আসেন দত্ত বাবু। মদনের কথা গুলোর অনুরণন চলছে মনের ভেতর। দমকলের লোক ও বলেছিল একটা বাচ্চা ছেলে ফোনে খবর দিয়েছিল। নাম বলেনি।


ক্লান্ত পায়ে বসায় ঘরে ঢুকে দেখেন লেখার টেবিলে কাগজ কলম সাজানো। অথচ কাল সব পুড়ে গেছিল !! হঠাৎ মনে পড়ে রুকু একটা গল্প লিখতে বলেছিল.... তার গল্প। গল্পর শেষটা শোনা বাকি এখনো। বাড়িটা সারিয়ে নিতে হবে নতুন করে।


  





Rate this content
Log in

More bengali story from Debdutta Banerjee

Similar bengali story from Horror