Participate in 31 Days : 31 Writing Prompts Season 3 contest and win a chance to get your ebook published
Participate in 31 Days : 31 Writing Prompts Season 3 contest and win a chance to get your ebook published

শুভায়ন বসু

Comedy


4  

শুভায়ন বসু

Comedy


ফিসফাস

ফিসফাস

6 mins 140 6 mins 140


রোজ ভোরে ঘুম ভাঙার মুহূর্তে শব্দটা শুনছেন কুশলবাবু। এটা আগে হত না, মানে এই সিটি দেবার শব্দটা আরকি। ক'দিন ভেবেছিলেন, ছেলেটাই করছে বোধহয়, বকাবকিও করেছিলেন। 

'কি রে, খুব সিটি দিতে শিখে গেছিস, না?'

'আমি? সিটি ?কখন দিলাম?'

'কখন আবার ?ন্যাকামো হচ্ছে? ভোরবেলা নিজের কানে শুনলাম।'  

'কি যা তা বলছ?'  

'যা তা বলছি? খুব উন্নতি হয়েছে তোর আজকাল। রাস্তাঘাটে মেয়ে দেখে ,সিটি দিতেও শিখে গেছিস। আর কি কি শিখেছিস, শুনি?' 

'আরে, বলছি তো আমি করিনি।'

কুশলবাবু বুঝলেন, ছেলে কিছুতেই স্বীকার করবে না। তার ওপর গিন্নি এসে যথারীতি ছেলের পক্ষ নিলেন, 'কি ফালতু বকছো ছেলেটাকে।অত ভোরবেলা ও ওঠে ?পড়ে পড়ে ঘুমোয়,জান না ?' সেটা অবশ্য ঠিক। ছেলেটার কলেজ এখন ছুটি বলে, বেশ বেলা অব্দি ঘুমোয় । অগত্যা রণে ভঙ্গ দিলেন কুশলবাবু।পরেরদিন দেখলেন, ঠিকই, সে বেচারা ঘুমিয়ে আছে, তবুও শব্দটা তিনি সবেমাত্র শুনেছেন। বুঝলেন পাড়ার কোন বখাটে ছেলের কান্ড। রোজ সিটি বাজিয়ে ঘুম ভাঙ্গানোটা তার মোটেই পছন্দ হলো না ।কিন্তু তক্কে তক্কে থেকেও কাউকে ধরতে পারলেন না ,সিটি মারা চললই। শেষে একদিন বিরক্ত হয়ে গিন্নিকেই দুষলেন, "রোজ সকালে প্রেসার কুকারে কি এত রান্না কর,শুনি?রোজ ঘুম ভেঙে যাচ্ছে।" গিন্নি মুখঝামটা দিলেন, "ফের বাজে বকছ?আমার আর খেয়েদেয়ে কাজ নেই ,যে অত সকালে প্রেসার কুকার চাপাব!' 'তাহলে প্রেসারে সিটি পড়ে কেন?' 'আবার সিটি নিয়ে পড়েছ?আর পারি না বাপু। তোমার কানটা দেখাও এবার, বুঝেছ?' কুশলবাবুর মনে হল,তাই তো। সমস্যাটা তার নিজের কানে নয় তো? 

গোলমালটা হল কদিন পর। এবার ভোরে তিনি সিটির বদলে ফোন রিং হবার শব্দ শুনলেন।মহা জ্বালাতন। বাড়িতে গোটাতিনেক মোবাইল, সবকটা চেক করা হল। যথারীতি আবার ছেলেই ধমকটা খেল। 

'কিরে সকাল-সকাল কার ফোন এলো রে তোর ?' 'আমার ফোন? কই না তো ।'

'আবার মিথ্যে কথা। যতসব বদমাশ বন্ধু জুটিয়েছে। সকালবেলা ফোন করে ডিস্টার্ব করা। বাড়িসুদ্ধ লোকের ঘুম ভাঙানো ।'

'কি উল্টোপাল্টা বকছো? আমার ফোন তো সুইচড অফ থাকে। আমি ঘুমোনোর সময়, রোজ বন্ধ করে শুই।' 

'ও তাই বুঝি? দেখি ফোনটা।'


দেখা গেল, সত্যি ফোনটা সুইচড অফ। তবু বিশ্বাস হল না।জোরজার করে ফোনটা নিয়ে ,অন করে ,চেক করে দেখা গেল, সত্যিই কিন্তু ফোনে কল আসেনি।শুধু ছেলের কেন,কোন ফোনেই ফোন আসেনি।গিন্নির ফোন ঘাঁটতে গিয়ে ফিলতু কয়েকটা গালাগালিও খেতে হল,'যত্ত সব সন্দেহ বাতিক।বুড়ো বয়েসে ভিমরতি।ছ্যাঃ'। সেসব হজম ক'রে কুশলবাবু মনে মনে ভাবতে লাগলেন,তাহলে কার ফোন বাজল? ল্যান্ডফোন তো বাড়ীতে নেই, তবে কি পাশের বাড়ি?তাও খোঁজ নেওয়া হল। আবার কি তিনি কানে ভুল শুনলেন? খুব চিন্তায় পড়ে গেলেন। কালই ডাক্তার দেখাবেনবলে, ঠিক করলেন।শুনেছেন টিনিটিস না কি সব হয় ,কানে কম শুনলে।শেষকালে এই অদ্ভুত ব্যামো তারই হল নাকি?


কিন্তু পরের দিনে আরেক সমস্যা। সেদিন তিনি কাদের সব ফিসফাস করতে শুনলেন। কারা যেন কি সব শলা-পরামর্শ করছে, হাল্কা গানের সুরও ভেসে এল। ঘুম তো যথারীতি গেল ভেঙে । কুশলবাবু এবার বেশ দোটানায় পড়ে গেলেন, এটা তার মনের সমস্যা না কানের? তিনি স্বপ্ন দেখে, স্বপ্নের মধ্যেই শব্দ শুনছেন না তো? নাকি কেউ কিছু তাকে বলতে চাইছে? কোন অশরীরী টশরীরী। ফিসফাস করে কারা তাকে কি শোনাচ্ছে, অনেকক্ষণ কান খাড়া করেও তিনি কিছু বুঝতে পারেননি । আর কাউকে কিছু বলতে সাহস হল না। ইএনটি ডাক্তার ,বাল্যবন্ধু অমিতের কাছে গেলেন। 'কিরে কুশু, কি মনে করে?' 

'আর বলিস না, কানটা মনে হচ্ছে গেছে।'

'মানে?' 

'মানে আবার কি? সকালবেলা ঘুম ভাঙতে না ভাঙতেই ,যত সব অদ্ভুত অদ্ভুত শব্দ শুনছি।' 'কিরকম শব্দ বলতো?' 

'আরে, কখনো সিটি পড়ছে, কখনো ফোনে রিং হচ্ছে। আবার কখনো বা শনশন ঝড় বইছে। মাথা খারাপ হবার জোগাড়।' 


'বুঝেছি, দাঁড়া, কানটা দেখতে দে।' 

অমিত নানা টেস্ট করল,একটা হেডফোন পরিয়েও শব্দ শুনতে বলল। তারপর বলল,'তোর কানের উপর কখনো বোম ফেটেছিল কি ?বা খুব জোরে কোন শব্দ?' 

'কই,না তো। সেরকম কিছু মনে পড়ছে না।তবে কালীপুজোয়, চকলেট বোম তো কতই ফাটিয়েছি।' 'আরে সে বলছি না ।ঠিক আছে, শোন,তোকে আরো কটা টেস্ট লিখে দিচ্ছি। আর একটা হিয়ারিং এড,তোকে পড়তে হবে। কানের শব্দগুলো কাটাকুটি করার জন্য। দেরি করিস না ।নইলে,শ্রবণশক্তি আরো কমে যাবে।' 

'তার মানে, তুই বলছিস, আমি কালা হয়ে যেতে পারি?' 


'সেসব নয়। এই টেস্টগুলো কর না। আর একজনের নাম্বার দিচ্ছি, হিয়ারিং এডের ব্যাপারে কথা বলে নিস ।আর এই ওষুধগুলো খাবি, টেনশন করবি না।'

কুশলবাবু চলে আসেন। ফোন করে জানলেন, হিয়ারিং এডের অনেক দাম, টেস্টগুলো করাতেও মেলা খরচ। এত খরচায় যেতে কুশলবাবুর বড় বাধলো। ছেলেটা এখনও বেকার, তার হাতে ফালতু খরচ করার মতো টাকাও বিশেষ নেই ।তার চেয়ে বরং ফ্রিতে গান, ফিসফাস, রিংটোন শোনাচ্ছে; চলুক না। সারাদিন তো কোন অসুবিধে নেই, শুধু ভোরবেলা ঘুম ভাঙার যন্ত্রণা,এই যা।ও কদিনেই সয়ে যাবে ।তাছাড়া তার মনে মনে একটা স্পষ্ট বিশ্বাস বা অনুভূতি হচ্ছে, তার স্বর্গত বাবা-মাই বোধহয় তার কানে ফিসফিস করে কিছু বলতে চাইছেন। কোন গোপন জমিজমার কাগজ বা টাকাপয়সার সন্ধান দিতে চাইছেন না তো? মনটা তার আশার দোলাচলে দুলে ওঠে। মনে মনে একটু ভালোও লাগে ,বিশ্বাস করতে শুরু করেন,না, এটা কানের কোন অসুখ নয়- কারো কথা বা কারো মনের ভাবই তিনি শুনতে পাচ্ছেন বোধহয়,হয়তো নিজের বাবা-মারই ।এখন থেকে রোজ শুতে যাবার সময় মনে মনে তৈরি হয়েই শোন,কাল ভোরে উঠে নতুন কি শুনবেন। যাই শুনুন, শুনে বুঝতে হবে।টেনশনে ভাল ঘুম হয় না। আবার ফিসফাস, রিংটোনও বেশিক্ষণ স্থায়ী হয় না ,এমনকি সিটিও গোটা দুই তিন এর বেশি নয়। ঘুমটা ভেঙে গেলেই দফারফা। সব শব্দ গায়েব। ওপারের মানুষগুলোর সঙ্গে যোগাযোগের বাঁধনটা কেটে যায়, তখনই মনটা খারাপ হয়ে যায়। আবার পরের দিনের প্রতীক্ষা। বেশ কাটছিল দিনগুলো। গিন্নি বা ছেলেদের কাউকে কিছু আর বলেননি। টেস্টগুলো করাননি, অমিতের দেওয়া ঘুমের ওষুধগুলোও খাননি। হিয়ারিং এইড তো কখনোই নয়,এই সুযোগ কেউ ছাড়ে ?কানে ঠুলি পড়লে তো সব শেষ।না,তাকে শুনতেই হবে। বাবা মা হোক বা কোন অজানা আত্মা বা স্বয়ং ভগবান ,কিছু তো একদিন বলবেনই। অপেক্ষায় দিন কাটে ।


একদিন ভোরবেলা কলের জল পড়ার শব্দ পেতেই ঘুমটা ভাঙল। দেখলেন সত্যিই কলে জল এসেছে। তাহলে কি তিনি আর স্বপ্নে ফিসফাস শুনছেন না? মনটা খারাপ হয়ে গেল। পরের দিনও তাই । ওভারফ্লো পাইপের জলের শব্দ। সেদিন তো তিনি ভালো করে কারো সঙ্গে কথাই বলতে পারলেন না ।মনটা ভার। বাবা-মা এসেও চলে গেলেন, সেই কথাটা তো শোনা হল না। কেন বন্ধ ফিসফাস, গান, রিংটোন ,সিটি ?তিনি কি কোন অন্যায় করেছেন? ভীষণ মনোকষ্টে ভুগলেন সারাদিন। বিকেলে ওভারফ্লো পাইপের নিচে দুটো পাপোশ পেতে দিলেন ,যাতে ওই বাজে শব্দে ঘুম না ভাঙ্গে। এদিনও রাতে ভাল ঘুম হয়নি আশঙ্কায়। কি বলছেন শুনতে হবেই ।গান হলে তাই শুনবেন ,তার বাবা যৌবনে কোনদিন সিটি মেরেছেন কিনা, তা তার জানা নেই। যদি মেরেও থাকেন ,বেশ করেছেন। বাবা হলেন বাবা ।যা করছেন করুন ,মা-বাবার ফালতু আলাপ হলেও তিনি ওনাদের হারিয়েছেন; আবার ফিরে পাবার সুযোগ কিছুতেই ছাড়বেন না। কিন্তু সেদিন ভোরেও কোন শব্দ শুনলেন না ,কাগজওলার ঘণ্টি ছাড়া। সেটা অবশ্য তিনি জেগেই শুনেছেন, মটকা মেরে পড়ে থাকা অবস্থায় ।ভোরে ঘুম ভাঙ্গাটা খুব একটা একঘেয়ে,জোলো আর বৈচিত্র্যহীন বিষয় হয়ে গেল ।একটা সুন্দর অনুভূতি পেয়েও হারাতে হল কুশলবাবুকে। তিনি জানেন না ,এটা যদি কানের অসুখ হয়ে থাকে, সে কি আপনিই সেরে গেল? আর তাহলে তা ফিরেই বা আসবে কিভাবে? আর যদি তিনি অশরীরীর কথা শুনেছেন ,তাদেরই বা মান ভাঙানো যাবে কিভাবে? এসব কথা তো কাউকে বলা যাবেনা, কেউ বিশ্বাস করবে না। জ্ঞানী বন্ধুরা টিনিটিসই বলবে। আসল রহস্য কেউ বুঝবে না । আবার গেলেন অমিতের কাছে ।

'কিরে কান কেমন আছে? ঘুম ঠিকঠাক হচ্ছে তো?' 'আরে, রাখ তোর ঘুম ।কানে তো আর সেই শব্দগুলো শুনতেই পাচ্ছি না।' 

'পাচ্ছিস না? বাহ্ , তাহলে তো ভালো হয়ে গেছে, সেরে গেছে। ওষুধে কাজ দিয়েছে ,বল।' 

'ধুর,আমি তো ওষুধ খাইইনি। তবু সেরে গেল?' 

'অনেক সময় টিনিটিস এমনিই সেরে যায়। তাহলে আর কি? এবার এনজয় লাইফ।' 

'ইয়ার্কি মারছিস? আমি শব্দগুলো শুনতে পাচ্ছি না কেন? কেন বন্ধ হয়ে গেল ফিসফাস?' 

'মানে?' অমিতের মুখটা হাঁ হয়ে ঝুলে যায়। 

'মানে ,আবার সেই সব শব্দগুলো, সেইসব ফিসফাস আমি শুনতে চাই।' 

'কি বলছিসটা কি ? কানের অসুখটা সেরে গেছে বলে তুই খুশি নোস?'

'নই'ই তো, কত কথা বাকি ছিল রে। কিছুই শোনা হল না ! কি করে যে আবার হবে এই অসুখ?' 


অমিতের মুখে আর কথা সরে না। এরকম অদ্ভুত কথা সে আগে কখনো শোনেনি ।রোগী ,তার রোগ ফেরত আনার জন্য, ডাক্তারকে তম্বি করছে। ওর বেশ কিছুক্ষণ লাগল ব্যাপারটা বিশ্বাস করতে।

কুশলবাবু বুঝলেন, যা গেছে, তা আর ফিরে আসবে না ।সে জিনিস ফিরিয়ে আনার ক্ষমতা কারো নেই ।আর কথা না বাড়িয়ে,তিনি চেম্বার ছেড়ে বেরিয়ে পড়লেন। মনটা সেই থেকে ভেঙে গেছে ।দিনগুলো আবার আগের মতোই নীরস ।কেউ নেই ,কোথ্থাও নেই ।শুধু সিলিং ফ্যানের একঘেয়ে শোঁ শোঁ শব্দ। জীবনটা বড়ই পানসে, শুধু দিন গোনা।


কুশলবাবু ঠিক করলেন আর কদিনই বা। গিন্নির তো সবেতেই শাসন আর মুখঝামটা, মৃত্যুর পর গিন্নিকে এরকমই কানে কানে ফিসফিস করে জ্বালাবেন খুব, মজাটা টের পাওয়াবেন।এমনকি প্রাণপ্রিয় ছেলেকেও, যে তার সঙ্গে ভাল করে কথাই বলে না কোনদিন ।মৃত্যুর পর না বলতে পারা কথাগুলো আশ মিটিয়ে বলে যাবেন সবাইকে।


Rate this content
Log in

More bengali story from শুভায়ন বসু

Similar bengali story from Comedy