Jeet Guha Thakurta

Comedy Classics


5.0  

Jeet Guha Thakurta

Comedy Classics


রম্যকথা: আধুনিক নীতিকথা

রম্যকথা: আধুনিক নীতিকথা

7 mins 172 7 mins 172

হাসি কান্না হীরা পান্না : আধুনিক নীতিকথা


ছোটবেলায় আমরা প্রত্যেকেই নীতিকথার গল্প পড়েছি। সেগুলি আমাদের চরিত্র তৈরিতে বড়োই সহায়ক হয়েছিলো। কিন্তু এখন সেইসব গল্প নিয়ে ভাবতে বসলে যেন মনে হয় গল্পগুলি বর্তমান যুগের পুরোপুরি উপযুক্ত নয়। শিশুমনের জন্য হয়তো ঠিকই আছে। কিন্তু আমরা যারা জীবনের নানান ঘাত-প্রতিঘাতে ইতিমধ্যে পরিপক্ক হয়ে গেছি, তাদের জন্য সেইসব নীতিকথা অন্যভাবেও লেখা সম্ভব। আধুনিক জীবনযাত্রার সঙ্গে সঙ্গতি রেখে।


একটা উদাহরণ দেওয়া যাক। যেমন রাখালের গল্পটি।


এক রাখাল রোজ তার গোরুগুলিকে নিয়ে চড়াতে যেত। গোরুগুলিকে মাঠে ছেড়ে দিয়ে সে একটা গাছের তলায় বসে মোবাইল নিয়ে খুটখাট করতো। রোজ সে মজা করে স্ট্যাটাস দিতো, "আমার গরুর পালে বাঘ পড়েছে, প্লিজ হেল্প মি।" আর সেই স্ট্যাটাস দেখে তার বন্ধুবান্ধব পাড়া-প্রতিবেশী সবাই ছুটে আসতো। তাই দেখে রাখাল খালি হাসতো। ভাবতো, সবাই কী বোকা।


একদিন সত্যি সত্যিই তার গরুর পালে বাঘ পড়লো। সে সঙ্গে সঙ্গে স্ট্যাটাস দিলো, "আজ সত্যিই বাঘ পড়েছে আমার গরুর পালে, প্লিজ আমাকে বাঁচাও।" তখন সবাই তাতে রিপ্লাই দিলো, "তোমাকে বিশ্বাস করছি না। সত্যিই যদি তোমার গরুর পালে বাঘ পড়ে, তুমি বাঘের সঙ্গে একটা সেলফি তুলে পাঠাও দেখি। তাহলে মানবো।" অগত্যা রাখাল তখন বাঘের সাথে সেলফি তুলতে গেলো, আর বাঘের কবলে পড়ে মারা গেলো।


এই গল্পে সবই আছে। আধুনিকতাও আছে, আবার চরিত্র গঠনের নীতিবাক্যটিও বোঝা যায়। কিন্তু গল্প বেশি আধুনিক করতে গেলে নীতিবাক্যই হয়তো হাপিশ হয়ে যাবে। এরকমই একটা জলজ্যান্ত সত্য ঘটনা সেদিন আমার সাথে ঘটলো।


ছোটবেলায় ঈশপের গল্প তো আপনারা সবাই পড়েছেন। আমিও পড়েছি সেই কাক আর কলসীর গল্প। তাই এই গরমকালে একদিন ব্যাপারটা টেষ্ট করে দেখার ইচ্ছা হলো। করলাম কী, আমাদের বাড়ির ছাদে একটা কলসীতে করে অল্প একটু জল রাখলাম। আর আশেপাশে কিছু কুচো পাথরের টুকরো ছড়িয়ে রাখলাম। কাক আমাদের বাড়ির ছাদে প্রায়ই আসে। ভাবলাম দেখি কী করে।


একটু পরেই চালাকচতুর একটা কাক দেখি কলসীর উপর এসে বসলো। বসে কলসীর ভেতর ঝুঁকে কী যেন দেখলো। আশেপাশে দেখলো। তার একটু পরে উড়ে চলে গেলো।


পরদিন আবার সেই কান্ড। রোজই এরকম চলতে থাকলো। কাক এসে বসে। কলসীর ভিতরে নজর করে দেখে। তারপর উড়ে চলে যায়। পাথরকুচি যেমন পড়ে ছিলো তেমনি পড়ে আছে।


একদিন সেই কাক বাবাজীবন কলসীর উপর এসে বসতেই আমি বললাম, "কেসটা কী বলো তো ? পাথর-টাথর ফেলছো না। ঈশপের গল্প পড়োনি নাকি ?" কাকটা একটু ঘাড় বাঁকিয়ে আমার দিকে ত্যাড়ছা ভাবে তাকিয়ে উত্তর দিলো, "ঈশপের গল্প সেই কোনকালে লেখা। এটা ২০২০। টেকনোলজি এখন কোথায় এগিয়ে গেছে সেই খবর রাখো ? আমি তো রোজ এসে ব্লুটুথ দিয়ে জল খেয়ে যাচ্ছি। পাথর কী কাজে লাগবে ?" বলেই সে ডানা মেলে হুশ করে কোন একদিকে উড়ে গেলো। আমি কাছে গিয়ে কলসীটাতে উঁকি মেরে দেখি, ওমা জল তো সত্যিই প্রায় গায়েব! এ কী কান্ড।


তখন আমার মনে পড়লো একটা সদৃশ ঘটনার কথা। সেটাও ঈশপের গল্পে আছে।


একবার এক সারসকে মধ্যাহ্নভোজে নিমন্ত্রণ করলো এক চালাক শেয়াল। তারপর তাকে আপ্যায়ন করে বসিয়ে পুঁটি মাছের ঝোল খেতে দিলো চওড়া একটা থালায়। সারস তার সরু ঠোঁট দিয়ে কিছুই খেতে না পেরে বোকা বনে গেলো। তখন তার মনে পড়লো ঈশপের গল্পের কথা। সে শিয়ালকে পাল্টা একদিন নিমন্ত্রণ করলো মধ্যাহ্নভোজে। শিয়াল যখন তার বাড়িতে গেলো, সারস তাকে জব্দ করার জন্য সরু মুখওয়ালা একটা কুঁজোতে চিকেন স্যুপ খেতে দিলো। শিয়াল তার ব্যাগ থেকে একটা স্ট্র বার করে আরামসে খেয়ে নিলো। সারস তো হতভম্ব। খাওয়া-দাওয়ার পর শিয়াল একটা ঢেঁকুর তুলে বললো, "ভাই, ঈশপের গল্প আমিও পড়েছি।"


আর হ্যাঁ। ওই গল্পটা না বললে তো মহাপাপ হবে।


একবার একটা খরগোশ এসে কচ্ছপকে বললো, "চলো রেস করা যাক। পারবে তুমি দৌড়ে আমাকে হারাতে ?" কচ্ছপ বললো, "চেষ্টা করতে পারি।" শুনে খরগোশের সে কী হাসি।


যাইহোক, একদিন তারা দু'জনে দৌড় শুরু করলো। নির্জন বনের ধারে দীর্ঘ পথ। কচ্ছপ যাচ্ছে খুব আস্তে আস্তে। খরগোশ অনেকটা পথ দৌড়ে পার করে এসে ভাবলো, এইবার একটু ঘুমিয়ে নিতে গেলেই বিপদ। কচ্ছপ টপকে যাবে। এই ভেবে সে একটুও না থেমে বন-জঙ্গল পার করে ফিনিশিং পয়েন্টে পৌঁছে গেলো। পৌঁছে সেখানে দাঁড়িয়ে কচ্ছপের জন্য অপেক্ষা করতে লাগলো।


ওদিকে কচ্ছপ কী করেছে, অনেকটা পথ পেরিয়ে এসে ভাবলো, খরগোশ নিশ্চয়ই এতক্ষণে পৌছিঁয়েই গেছে। বেকার তাড়াহুড়ো করে লাভ নেই। বরং একটু জিরিয়ে নেওয়া যাক। এই ভেবে সে একটা গাছের গুঁড়ির পিছনে ঠান্ডা ছায়া দেখে সেখানে ঢুকে শুয়ে পড়লো। আর আরামে তার চোখে ঘুম নেমে এলো।


অন্যদিকে ফিনিশিং পয়েন্টে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ঘন্টার পর ঘন্টা কেটে গেলো খরগোশের। কচ্ছপ আর এসে পৌঁছায় না। তখন সে অধৈর্য্য হয়ে আবার পিছনে দেখতে গেলো যে কচ্ছপটা কতদূরে পড়ে আছে। সেই গাছও খরগোশ পেরিয়ে গেলো যার পিছনে কচ্ছপ ঘুমাচ্ছিলো। খুঁজতে খুঁজতে সে অনেকটা দূর চলে গেলো। কচ্ছপের পাত্তা নেই। কচ্ছপ তো ততক্ষণে ঘুম থেকে উঠে আবার গুটি গুটি চলতে শুরু করেছে। কিন্তু খরগোশ সেসব জানে না। সে দেখতে দেখতে প্রায় আবার দৌড় শুরুর জায়গায় চলে এসেছে। হঠাৎ তার মনে সন্দেহ হলো। ব্যাটা কচ্ছপ কোনো চালাকি করেনি তো ? যেই মনে হওয়া, খরগোশ তো দে দৌড়। হাঁফিয়ে হাঁফিয়ে সে যখন আবার ফিনিশিং পয়েন্টে এসে পৌঁছালো, দেখলো তার ঠিক আগেই কচ্ছপ এসে পৌঁছে গেছে। তাকে দেখে কচ্ছপ বললো, "আবার হেরে গেলে তো ? আমি সেই কোন সক্কালবেলা এখানে এসে তোমার জন্য অপেক্ষা করছি!"


গল্পের নীতিকথাটি খুব সহজ। সেটি হলো, ভাগ্য সর্বদা কচ্ছপের সহায় হয়। খরগোশ বরাবরই হেরে যায়, আর কচ্ছপ বরাবর জিতে যায়। একটু অন্যভাবে বললে, গরিব চিরদিন গরিবই থেকে যায়, আর বড়োলোক আরো বড়োলোক হয়। ভেবে দেখুন তো, এর চাইতে নিষ্ঠুর সত্য আর কী আছে ?


এর পরের গল্পটা অবশ্য ততোটা নিষ্ঠুর নয়। সেটা একটা গ্রামের গল্প। সেই গ্রামের সবাই নীতিশিক্ষার খুব ভক্ত ছিলো।


তো সেই গ্রামে ছিলো এক গরিব কৃষক। কৃষকের অনেকগুলি ছেলে ছিলো। তারা সবসময় নিজেদের মধ্যে ঝগড়া-ঝামেলা করতো। এই দেখে কৃষক একদিন তাদের নীতিশিক্ষা দেবার কথা ভাবলেন।


তিনি অনেকগুলি মোটা লাঠি একসঙ্গে একটা বান্ডিল করে বাঁধলেন। বেঁধে তার ছেলেদের ডাকলেন। আর বললেন, ওই বান্ডিলটা মাঝখান থেকে ভাঙার চেষ্টা করতে। তারা অনেক চেষ্টা করেও পারলো না। তখন তিনি বান্ডিলটা খুলে তাদের প্রত্যেককে একটা একটা করে লাঠি দিয়ে সেগুলো ভাঙতে বললেন।


কিন্তু মোটা মোটা লাঠি। ভাঙা কি অতোই সহজ ? ছেলেরা কেউই প্রায় ভাঙতে পারলো না। তাই দেখে কৃষকের তো মাথায় হাত। সারাদিন বসে বসে ফেসবুক চালিয়ে সবকটা ছেলেই অকাল-কুস্মান্ড তৈরী হয়েছে। একটা লাঠিও ভাঙতে পারে না। তবে তার বড়ো ছেলে অন্যদের চেয়ে একটু বলশালী ছিলো। শুধু সে ভেঙে ফেলতে পারলো তার লাঠিটা।


কৃষক তবু একটু খুশি হয়ে সবাইকে কাছে ডাকলেন। তার উদ্দেশ্য পুরোপুরি বিফল হয়নি। তিনি বড়ো ছেলেকে জিজ্ঞাসা করলেন, "আজকের এই অভিজ্ঞতা থেকে তাহলে কী প্রমাণ হলো তুমি বলো।"


বড়ো ছেলে বললো, "আজ প্রমাণ হয়ে গেলো যে আমি একাই সলমন খান, বাকিরা কাদের খান।"


কৃষক তখন মাথা চাপড়িয়ে বললেন, "না রে বাবা না। ভগবান, তুমি এ কাদের বাপ বানিয়েছো আমাকে ?" তারপর বড়ো ছেলের উদ্দেশ্যে বললেন, "আমি প্রথমে ইচ্ছা করেই লাঠিগুলো একসঙ্গে গিঁট বেঁধে রেখেছিলাম। তখন তোমরা কিছুতেই সেটা ভাঙতে পারলে না। কিন্তু যেই একটা লাঠি সেখান থেকে আলাদা করে নিলে, তুমি সহজেই ভেঙে ফেললে। এটা থেকে তুমি কী শিখলে সেটা সবাইকে বলো।"


বড়ো ছেলে এবার ব্যাপারটা বুঝতে পেরে অন্য ভাইদের বললো, "এটার মানে তো খুব সোজা। যখন কোনো কাজ করতে গিয়ে তোমরা দেখবে যে সেটা খুব শক্ত লাগছে, তখন বুঝে নেবে যে আমাদের গুণধর বাপ তাতে নিশ্চয়ই কিছু গেঁড়ো করে রেখেছে।"


আপনারা সবাই নিশ্চয়ই সেই গল্পটি পড়েছেন যেখানে এক হাঁসের কথা বলা ছিলো যে রোজ একটি করে সোনার ডিম পাড়তো। একদিন হাঁসের মালিক ভাবলো, রোজ একটা করে ডিম নিয়ে কী হবে। আরো চাই। লোভ করলো সে। তারপর হাঁসকে গিয়ে বললো, "ভাই তুমি একদিন একটা স্বাভাবিক ডিম পাড়ো তো।" হাঁস পরদিন স্বাভাবিক ডিম দিলো। সেই ডিম ফুটে বাচ্চা হাঁস বেরোলো। ক'দিন পরে সেই হাঁসও সোনার ডিম দিতে লাগলো। একই প্রজাতির হাঁস তো।


রোজ দু'টো করে সোনার ডিম পেয়েও লোভী মানুষটা সন্তুষ্ট হলো না। আবার তাদের থেকে আরো দু'টো স্বাভাবিক ডিম নিয়ে চারটে হাঁস বানালো। সবকটা হাঁসই রোজ সোনার ডিম পাড়ে। এইভাবে তার সম্পদ বহুগুন বেড়ে গেলো।


এই গল্পের নীতিকথাটি হলো, অতি লোভ করলে তাঁতী তাঁত বোনা ছেড়ে গার্মেন্টস এর বিজনেসে যেতে পারে। শুধু বুদ্ধি থাকা চাই।


সবশেষে বলবো সেই কাঠুরিয়ার গল্প। এক কাঠুরিয়া একদিন এক নদীর ধারে একটা গাছ কাটছিলো। হঠাৎ হাত ফস্কে তার কুড়ুলটা পাশেই নদীর জলে পড়ে যায়। সে কাঁদতে বসে। তখন নদী থেকে জলদেবী উঠে এসে তাকে প্রথমে একটা রুপোর কুড়ুল, পরে সোনার কুড়ুল দেখালেন। সে বললো কোনোটাই তার কুড়ুল নয়। তখন জলদেবী ওই কুড়ুলগুলো সরিয়ে কাঠুরিয়ার লোহার কুড়ুলটা এনে তাকে দিলেন। সে আনন্দে চোখ মুছে বললো, "হ্যাঁ, এই তো, এইটাই তো আমার কুড়ুল।"


জলদেবী তার সততায় সন্তুষ্ট হয়ে বললেন, "আমি তোমার সততা দেখে সত্যিই মুগ্ধ। তোমার মঙ্গল হোক। তোমার পরিবার চিরকাল সুখে থাকবে।"


এই বলে জলদেবী অন্তর্ধান হচ্ছিলেন। কাঠুরিয়া বললো, "দাঁড়ান, দাঁড়ান। এক মিনিট। আপনি কিছু ভুলে যাচ্ছেন কি ?"


"কী ভুলছি ?" জলদেবী অবাক হয়ে প্রশ্ন করলেন।


"না মানে, আমি এতো ভালো পারফরম্যান্স দিলাম, আমাকে ওই সোনা-রুপোর কুড়ুলগুলো গিফ্ট করবেন না ?"


জলদেবী বললেন, "ওসব শুধু গল্পে হয়। আমার কাছে তো এগুলো একটা করেই আছে। আর সাপ্লাই নেই এখন। তোমাকে এগুলো যদি দিয়ে দিই, আমি পরের বার কীভাবে কী করবো ?"


পুনশ্চ: একবার এক মোবাইল বিক্রেতা অনেকগুলি মোবাইল নিয়ে দূরে যাচ্ছিলো। পথিমধ্যে ক্লান্ত বোধ করাতে সে একটা বড়ো গাছের ছায়াতে মোবাইলের ব্যাগটা রেখে একটু বসলো। বসে থাকতে থাকতে সে একসময় ঘুমিয়েই পড়লো। ঘুম থেকে উঠে দেখে গাছের সব হনুমান তার ব্যাগ থেকে মোবাইলগুলো বার করে নিয়ে উপরে উঠে গেছে। সে বুদ্ধি করে তার মোবাইলটা দূরে ছুঁড়ে ফেললো, এই আশায় যে হনুমানগুলো তাকে কপি করবে। কিন্তু তার এই কান্ড দেখে হনুমানের সর্দার গাছ থেকে নেমে এসে প্রথমে তার ছুঁড়ে ফেলা মোবাইলটা কুড়িয়ে নিলো। তারপর মোবাইল বিক্রেতার কাছে এসে সপাটে তার গালে একটা চড় কষিয়ে দিয়ে বললো, "ভার্সন আপডেট করোনি ? তুমি যদি মোবাইলটা ছুঁড়ে না ফেলে গাছের তলায় মিছিমিছি চার্জে বসাতে, তাহলে বরং আমরাও এসে চার্জে বসিয়ে রেখে যেতাম।"



Rate this content
Log in