Kingkini Chattopadhyay

Comedy


3  

Kingkini Chattopadhyay

Comedy


নৈহাটির কাকিমা

নৈহাটির কাকিমা

6 mins 500 6 mins 500

যে সময়কার কথা কহিতেছি আমরা তখন নিতান্তই বালখিল্য| হাওড়ার বালি এলাকায় ছিল আমাদের প্রকান্ড একান্নবর্তী পরিবার| ছোটোবড়ো মিলাইয়া প্রায় জনা চৌদ্দ লোক| ঝি চাকর লইয়া আরো খান পাঁচেক বেশি | বাড়িতে সবসময়ই হৈচৈ লাগিয়াই থাকিত|


 কিছুদিন ধরিয়াই "লোকেশের বিবাহ" সংক্রান্ত গুঞ্জন কানে আসিতেছিল| বাড়ির বড়োরা যারপরনাই উচ্ছ্বসিত আগামী অনুষ্ঠান লইয়া| আমার মা, জ্যেঠিমা, কাকিমারা, পিসীরা বড়ো দিদিরা, কে কি পরিধান করিয়া যাইবেন, কেমন করিয়া চুল বাঁধিবেন ইত্যাদি আলোচনায় মশগুল| বাড়ির ছেলেদের এসব মেয়েলি বিষয়ে আগ্রহ নাই - তাঁহারা নেহাতই নির্লিপ্ত হইয়া শোনেন ও মাঝেমধ্যে চায়ের হাঁক পাড়িয়া নিজেদের অস্তিত্ব জানান দেন|


বিবাহটি কার তখনো বুঝি নাই| জিজ্ঞাসা করিতে মা বলিলেন নৈহাটিতে বাবাদের সব চেয়ে ছোট যে ভাইটি থাকেন, কিঞ্চিৎ দূর সম্পর্কের বোধ করি, তাঁহার বিবাহ স্থির হইয়াছে| ট্রেনে চাপিয়া সাজিয়াগুজিয়া এতজন মিলিয়া সেই বিবাহের নিমন্ত্রণ রক্ষা করিতে যাওয়া হইবে নৈহাটিতে - ইহাতেই সবাই বড়োই উৎফুল্ল| নৈহাটি ব্যাপারটি কি এবং কোথায় - শিশুমনের এই কৌতূহলটিও প্রশমিত হইলো কিছুক্ষনের মধ্যেই|


নির্ধারিত দিনে বেলা দ্বিপ্রহর হইতেই বাড়িময় সাজো সাজো রব পড়িয়া গেল | সবাই বিবিধ প্রকার শাড়ী গহনা ও প্রসাধনী সামগ্রী লইয়া ছুটাছুটি করিতেছেন| সময়মতো বাহির হইয়া স্টেশন এ পৌঁছাইয়া বিকাল চারিটার রানাঘাট লোকালে উঠিয়া বসিলাম আমরা চৌদ্দ ও পিসির পরিবারের চার - সর্বমোট এই আঠারো জন | ভাগ্যে কামরাটি মোটের উপর ফাঁকাই ছিল | বাচ্চারা জানলার ধারে বসিয়াছি, পুরুষেরা অন্য কামরায়, ও মহিলারা আমাদের পাশেই বসিয়া উচ্চৈঃস্বরে উত্তেজিত গল্প করিতে করিতে যাইতেছেন| আমরা ছোটরা নতুন বৌ দেখিতে বড়োই ভালোবাসিতাম | মিষ্টি মিষ্টি লাজুক চাহনি সুন্দর শাড়ী গহনা পরিহিতা একজন নবীনা কাকিমা পাইবো ভাবিয়া আমরাও উৎফুল্ল|


নৈহাটি পৌঁছিলাম সন্ধ্যা সাড়ে পাঁচটা নাগাদ| ইতিমধ্যে আকাশে মেঘ ঘনাইয়া অকালবর্ষণ আরম্ভ হইয়াছে| স্টেশন চত্বর হইতে বিয়েবাড়ি মিনিট পঁয়তাল্লিশের পথ -কন্যাপক্ষ সযত্নে গাড়ি পাঠাইয়াছেন আমাদের লইয়া যাইবার জন্য| তন্মধ্যে একটি ফুলমালা সজ্জিত বরের গাড়িও আসিয়াছে| বরের গাড়ি করিয়া কেন যাইবো কেহই বুঝিয়া উঠিতে পারিতেছিনা| শুনিলাম সহসা একটি গাড়ি বিগড়াইয়া যাওয়াতে অগত্যা বরের গাড়ি আসিয়াছে আমাদের লইতে| এই বিবাহের তিথিতে অনেক খোঁজ করিয়াও সারাদিনের জন্য দুটির বেশি গাড়ি জোগাড় করা সম্ভব হয় নাই - তাই কন্যাপক্ষ সর্বসাধ্যমতো দুটি গাড়ি ই পাঠাইয়াছেন| হঠাৎ বৃষ্টিতে আশপাশে রিকশা ইত্যাদি দৃষ্টিগোচর না হওয়ায় ও দুটিতেই কোনোক্রমে যাইতে হইবে|


বলাই বাহুল্য মাত্র দুটি অ্যাম্বাসেডর গাড়িতে আমাদের আঠারো জনের বসিবার বড়োই স্থানাভাব| তাই এক অভিনব পন্থা আবিষ্কৃত হইলো| স্তরে স্তরে বসা হইবে| প্রথমে বসিলেন পুরুষেরা, তাঁহাদের উপরে চাপিলেন তাঁহাদের গৃহিণীরা, ও তাঁহাদের উপর বসিল কচিকাঁচার দল| এমন অবস্থা হইলো যে সর্বোচ্চ তৃতীয় স্তরে সব থেকে ছোট বাচ্চাটির মাথা বারংবার গাড়ির ছাদে ঠোকা খাইতে লাগিল, সে বেচারি নড়িতে চড়িতে না পারিয়া তাহাই হজম করিতে লাগিল|


আমাদের সকলকে গাড়িতে ঠাসিয়া গাড়ির চালক একে একে দরজা বন্ধ করিতে সচেষ্ট হইলেন| একদিকের দরজা বন্ধ হয় তো অন্যদিকের হয়না, কোনোক্রমে বাঁদিকেরটি লক করিয়া যান তো ডান দিকের দরজা দিয়া সব হুড়মুড় করিয়া পড়িয়া যায়, পুনরায় ঠেলিয়া ঠুলিয়া স্তরে স্তরে বসিবার উপক্রম করিতে থাকে| শহর থেকে আগত বরযাত্রীদের এই রূপ কান্ড দেখিয়া আশপাশে পল্লীবাসীগণ জমায়েত হইয়া গিয়াছেন, তাঁহারাই কোনোক্রমে বলপূর্বক গাড়ির দরজা লাগাইয়া দিলেন| এই সমস্ত ঝামেলায় স্টেশন হইতে বাহির হইতেই বিলম্ব হইয়া গেল| সব চেয়ে উপরের স্তরের সেই ভাইটি এখনো কাঁদে নাই.. সন্দেহ জাগে- বাঁচিয়া আছে তো !


যাইহোক বিয়েবারি পৌঁছানো গেল |কারো সাজের আর কিছুই অবশিষ্ট নাই| সবাই বিশ্রস্তবসন, আমাদের উদ্ভ্রান্ত উদ্বাস্তুদিগের মতো দেখাইতেছে| দেখিলাম অভ্যর্থনার জন্য কন্যা পক্ষের কেহ কেহ আগাইয়া আসিতেছেন| কিঞ্চিৎ নিকটে আসিয়া গাড়ির ভিতরে উঁকি মারিয়া তাঁহাদের হাসি মিলাইয়া গেল; সভয়ে পিছাইয়া গেলেন ও উদ্ভ্রান্তের ন্যায় অন্দরে ছুটিলেন| মুহূর্তমধ্যে আরো দুই তিনজন বয়স্থ ব্যক্তি আসিয়া উপস্থিত হইলেন ও জোড়হস্ত নিমন্ত্রণকর্তার ভূমিকা হইতে একত্রে কোমর বাঁধিয়া উদ্ধারকর্তার ভূমিকায় অবতীর্ন হইলেন| খুব সন্তর্পনে একদিকের দরজা খুলিলেন, আলুর বস্তার ন্যায় দুই তিনটি বাচ্চা গড়াইয়া পড়িয়া গেল গাড়ির বাহিরে| দরজার সাহায্যেই তাহারা ঠাসা ছিল এ যাবৎ | অতঃপর তাহাদের মা জননীরা একে একে শাড়ী আঁচল কেশ ইত্যাদি সামলাইতে সামলাইতে নামিতে লাগিলেন| কাহাকেও চেনা যায়না, কলকাতা হইতে যাহারা ট্রেনে চাপিয়া বাহির হইয়াছিল - ইহাদের সহিত তাহাদের সাদৃশ্য সামান্যই| উপরের দুই স্তর নামিয়ে যাইবার পর সর্বনিম্নে পুরুষদের পুনরায় দেখা যাইলো - তাঁহারা নরম আলুভাতের ন্যায় চটকাইয়া গিয়াছেন, পাঞ্জাবী অবিন্যস্ত, চশমা খুলিয়া গিয়াছে, কেশ এলোমেলো, ধুতি লুটাইতেছে| সোজা হইয়া দাঁড়াইতেই পারিতেছেন না|


বারংবার করজোড়ে ক্ষমাভিক্ষা করিতে লাগিলেন কন্যাপক্ষ - আমরাও ভারী অস্বস্তিতে পড়িলাম| আসিতে প্রাণান্তকর অবস্থা হইয়াছে মানিতেছি - কিন্তু তাহাতে ইঁহাদের দোষ কোথায়? হঠাৎ গাড়ি বিগড়াইয়া যাইলে কি করা যাইবে, আর ইহাও সত্য যে পাড়াগাঁয়ে বলিলেই অন্য গাড়ি পাওয়া যায়না| বৃষ্টি মাথায় করিয়া গরুর গাড়ি চাপিয়া বরযাত্রীর আগমন ও বিবেচ্য নয় |


ইতিমধ্যে প্রায় সাড়ে ছটা বাজিয়া গেছে| টিপ টিপ বৃষ্টি ঝমঝম বৃষ্টিতে পরিণত হইয়াছে| সঙ্গে শন শন ঝড়ের ইঙ্গিত, ঘন ঘন বিদ্যুৎ চমকাইতেছে|এবার শীঘ্রই বর কনে দেখিয়া লইতে হইবে| আকাশের যা দুর্দশা জলদি খাবার পাট চুকাইয়া পূর্ববৎ হুলুস্থূল করিয়া ফিরিতে হইবে| আমাদের ইচ্ছা ছিল রাত্রি নয়টার ট্রেন এ ফিরিবার- তাহাতে বিবাহ প্রাঙ্গনে ঘন্টা দুয়েক কাটাইনো যায়| কিন্তু এই দুর্যোগের রাতে পাছে সেই ট্রেনটিও বাতিল হইয়া যায় - ইহা ভাবিয়া বড়রা দুশ্চিন্তাগ্রস্ত হইয়া উঠিলেন|


হঠাৎ ভিড়ের মধ্যে কে যেন চেঁচাইয়া কহিলেন - শোওয়া আট টা নাগাদ শিয়ালদাহগামী একটি থ্রু ট্রেন আছে - নৈহাটিতে দুই মিনিটের জন্য দাঁড়ায়-সেটি ধরিতে চেষ্টা করা উচিৎ| কিন্তু তাহা হইলে এখুনি খাইয়া লইতে হয়| ইহা শুনিয়া কন্যাপক্ষ আমাদের পড়ি কি মরি করিয়া ভোজের স্থানে লইয়া গেলেন| একবার উঁকি মারিয়া আমার পিসি দেখিতে গিয়েছিলেন কনেকে, কিন্তু বিবাহলগ্নে তাহাকে সকলে ঘিরিয়া থাকায় কিছুই দেখিতে পান নাই| এদিকে হাতে সময়ও নাই| হুড়মুড় করিয়া খাবার ঘরে যাইয়া দেখিলাম সদ্য প্রথম ব্যাচটি বসিবার উপক্রম করিতেছে| বরযাত্রীদের আসিতে বেগ পাইতে হইয়াছে -কন্যাপক্ষ যেন উন্মুখ হইয়া ছিলেন আমাদের খাওয়াইয়া তৃপ্ত করিতে| সময় নষ্ট হইবার ভয়েই বোধকরি কেহই জিজ্ঞাসা করিলেন না বর কনে দেখিয়াছি কিনা|


খাওয়ার পর্ব শেষ হইলো প্রায় সাড়ে সাত টা| আমরা পুনরায় গাড়ির সামনে ঠেলাঠেলি করিতেছি দেখিয়া কন্যাপক্ষ নিজেরাই তৎপর হইয়া আমাদের গাড়ির ভিতর ঠাসিয়া দিলেন ও প্রথম প্রচেষ্টাতেই দরজা বন্ধ করিতে সফল হইলেন | আসিতে বিলম্ব হইয়াছে, কষ্ট হইয়াছে - অতএব ফিরিতে যেন কোনোরূপ বিঘ্ন না ঘটে| ট্রেনটি যেন না ফসকাইয়া যায়| গাড়ি তীরবেগে আমাদের স্টেশন এ লইয়া আসিল|


পৌঁছাইয়াই গাড়ির চালক টিকিট কাটিতে ছুটিলেন| আমরা উদ্ভ্রান্তের ন্যায় দৌড়াইতে দৌড়াইতে প্লাটফর্মে পৌঁছাইলাম| পিসি দেখিলাম আমার ছোট বোনকে চ্যাংদোলা করিয়া লইয়া ছুটিতেছেন, পিসেমশাই বড়ো বোন কে এক হস্তে বগলদাবা করিয়া অন্য হস্তে ব্যাগ লইয়া হাঁপাইতে হাঁপাইতে ওভারব্রিজের সিঁড়ি ভাঙিতেছেন| বাকিরা সবাই ইতস্তত ছড়াইয়া আছেন - যাহার সম্মুখে যে কামরা পড়িবে তাহাতেই চাপিবেন| অতঃপর শোয়া আটটার শিয়ালদাহ লোকাল কাঁটা মিলাইয়া আসিয়া উপস্থিত হইলো ও যথাসময়ে ছাড়িয়া গেলো| বরকনে দেখা আর হইলোনা সে যাত্রা| উপহারগুলি যে কোনো এক মুহূর্তে কনের বাপ কে ধরাইয়া দেওয়া হইয়াছিল -ইহাই রক্ষা|


এই ঘটনার পর দীর্ঘকাল আমাদের নৈহাটি যাওয়া হয় নাই| বছর তিনেক পর আরেকটি নিমন্ত্রণ আসিলো - নৈহাটির কাকার পুত্রের মুখেভাত- আমরা যেন অবশ্যই যাই| পুনরায় আমরা সমান আগ্রহে সাজিতে তৎপর হইয়া উঠিলাম ও নির্ধারিত দিনে প্রথমে ট্রেন ও পরে গাড়ি সহযোগে নির্বিঘ্নে অনুষ্ঠানবাড়ি পৌঁছাইলাম|


বিয়ের দিনের কথা মনে পড়িয়া যাইতেছিল| সেদিন যাঁহাকে লইয়া এতো উত্তেজনা ছিল, যাঁহাকে নববধূরূপে দেখিবার সৌভাগ্য হয় নাই - পুত্রের অন্নপ্রাশনে তাঁহাকে প্রথমবার দেখিলাম| কাকিমার নাম ছিল সুরূপা - সার্থকনাম্নী তিনি -উপরন্তু অত্যন্ত মিষ্টভাষী ও সদাহাস্যময়ী| বাচ্চাদের মধ্যে অনতিবিলম্বেই কাকিমা জনপ্রিয় হইয়া উঠিলেন| কিন্তু নাম ধরিয়া সম্বোধন করিবার রেওয়াজ ছিলনা আমাদের বাড়িতে - তাই তিনি সেদিন হইতে আমাদের মধ্যে "নৈহাটির কাকিমা " নামেই পরিচিত হইলেন ও তাঁহার সাতান্ন বৎসর ব্যাপী জীবনে যতদিন বাঁচিয়া ছিলেন - সেই নামেই উল্লিখিত হইতেন|


সেদিনকার সেই বিবাহযাত্রা কোনোদিন বিস্মৃত হইবনা| কত বৎসর কাটিয়া গিয়াছে, সেইদিনের বরযাত্রীদের মধ্যে অনেকেই পরলোকে চলিয়া গিয়াছেন| বিকাল চারিটার রানাঘাট লোকাল ও এখনো আর চলেনা, নৈহাটিও আজ আর পাড়াগাঁ নেই, বেশ একটি গমগমে শহরতলি হইয়া উঠিয়াছে| এখনো পুরোনো সেই দিনের অদ্ভুত এই বিয়েবাড়ির কথা আলোচনা হয় আমাদের মধ্যে- সেইদিন যারপরনাই বিপর্যস্ত হইলেও আজ সেইসব স্মরণ করিয়া সশব্দে হাসিয়া উঠি|


Rate this content
Log in

More bengali story from Kingkini Chattopadhyay

Similar bengali story from Comedy