ললন্তিকা ( ধারাবাহিক)
ললন্তিকা ( ধারাবাহিক)
শ্রীযুক্ত গোপালকৃষ্ণ চাকলাদার মহাশয় এবং তাঁর পুত্রবধু কল্যাণী তাঁদের কৃষ্ণপুরের বাড়িতে যে যার ঘরে বসে রয়েছেন । অধিক রাত্রি অবধি কেহই নিদ্রা যেতে পারছেন না ।
গোপালবাবু তাঁর ধর্মপত্নীকে নিয়ে চিন্তায় আছেন । বৃদ্ধা কখন যে কি করে বসে বলা যায় না । তিনি তাঁর পুত্রকে তো চেনেন ; যতই এক্সিকিউটিভ ডিরেক্টর হোক না কেন , এত ভীতু যে কেউ জোর গলায় কথা বললে ভয় পেয়ে যায় ।
এখন যদি তাকে শ্মশানঘাটে যেতে হয় তবেই তো হয়েছে। আর বৃদ্ধাকেও বলিহারি; হয়তো বলেই দিয়েছে - বেটা, কনকের তো কেউ নেই; ছেলের মত তুইই না হয় মুখে আগুন দিস । আর বেটা তো মাতৃভক্ত বিদ্যাসাগর। বর্ষার দামোদর কেন ; প্রয়োজনে সুয়েজ ক্যানাল সাঁতরে পেরিয়ে যাবে ! ভয় পেয়ে যদি কিছু হয়ে যায় ! সেটাইতো ভাবনার বিষয় ।
অন্য ঘরে বসে কল্যাণী শিশুপুত্রের মুখের দিকে চেয়ে রয়েছে । রুদ্র কাছে না থাকলে সে অস্থির হয়ে পড়ে । এই বুঝি কোন অঘটন ঘটে গেল । মনে মনে মা বিপত্তারিণীকে স্মরণ করে বার কয়েক মাথায় হাত ঠেকালো ।
ওদিকে বনলতা দেবীও ভীষণ চিন্তামগ্ন রয়েছেন । লোভী বুড়োটা না তাঁর অনুপস্থিতিতে আদরের বউমার কাছে লোভনীয় খাবারের বায়না ধরে । হজম করার ক্ষমতা নেই; আর অখাদ্য কুখাদ্য খেতে এক্সপার্ট ।
শব দাহে সময় লাগে তা তিনি জানেন । সেইজন্য রুদ্রর ফিরতে দেরি হচ্ছে দেখেও তিনি নির্বিকার আছেন । তাঁর একটাই চিন্তা বাড়ি ফিরে বুড়োটাকে সুস্থ দেখতে পাবো তো ! চোখের সামনে আর একটা জ্যান্ত লাশ পড়ে আছে পঙ্গু হয়ে ।
বনলতা দেবী একবার আড়চোখে ভগিনীর স্বামীকে দেখে নিলেন । ঘুমোচ্ছে না জেগে রয়েছে বোঝার উপায় নেই । চামড়ায় ঢাকা অস্থিপঞ্জরের দোলদোলানী জানান দেয় শরীরে প্রাণটুকু আছে মাত্র ।
বাটিতে একটু জল আর একটা চামচ নিয়ে ঢুকলেন ওঁর ঘরে । এক চামচ জল মুখে দিলেন । মৃতপ্রায় শরীরে মুখটা একটু হাঁ করে এক ঢোক জল গিলে নিলেন । তারপর অসহায় দৃষ্টি দিয়ে শ্যালিকার মুখ পানে চাইলেন। বনলতা দেবীর চোখ থেকে এক ফোঁটা অশ্রু গড়িয়ে পড়ল শায়িত শরীরের ঠিক মাঝখানে।
আঁ আঁ করে কেঁদে উঠলেন কনকলতার স্বামী । বনলতাও কেঁদে ভাসালেন । অর্থাৎ কনকলতার মৃত্যু সংবাদ ভদ্রলোক হৃদয়ঙ্গম করতে পেরেছেন ।
বনলতা দেবী পরম স্নেহে আরণ্যক বসুরায়ের মাথায় হাত বুলিয়ে ঘুম পাড়ানোর বৃথা চেষ্টা করলেন । আরণ্যক বাবুর দু'চোখ বেয়ে তখন গঙ্গা ব্রহ্মপুত্রের ধারা নেমেছে।
কথা বলতে পারেন না । এমনকি হাত পা মাথাও নাড়াতে পারেন না । একটা অস্ফুট গোঙানী তার বক্ষ ভেদ করে গলা দিয়ে উঠে আসছে ।
প্রেসক্রিপশন বের করে ঘুমের ওষুধের ডোজটা দেখে নিলেন বনলতা দেবী ।
ATIVAN 2 MG ONCE AT NIGHT .
স্ট্রিপ থেকে ঘুমের ওষুধ বের করে চামচে জল নিয়ে তা ঘষে ঘষে গুলে ফেললেন। তারপর সন্তর্পনে সেই গোলা ওষুধ আরণ্যকের মুখে দিলেন । আরণ্যক বসুরায়ের হয়তো মনে হল এটাই যেন তাঁর চিরঘুমের ডোজ হয় ।
আরণ্যক বসুরায় । কবি-সাহিত্যিক আরণ্যক বসুরায় । কলকাতার একটি নামকরা প্রকাশনা সংস্থার কর্ণধার ।
নতুন নতুন কবি লেখকদের নিকট একটি প্রাত:স্মরণীয় নাম । সাহিত্যের অ আ ক খ জানলেই হল । কবিতাই বলুন বা গল্প, উপন্যাস, প্রবন্ধ যাই কেউ লিখুক না কেন; ভুলভ্রান্তি ঠিক করে দিয়ে তার লেখা নামমাত্র মূল্যে প্রকাশ করতেন ।
যারা অর্থ দিয়ে তার মূল্য পরিশোধ করতে পারত না তাদের লেখাও কখনোসখনো প্রকাশ করে দিয়েছেন ।
নিজে একজন লেখক হয়ে প্রথম জীবনে প্রকাশকের দরজায় যাতায়াত করে জুতোর সুকতালা খুইয়েছিলেন। তথাপি কোন প্রকাশক তাঁর বই প্রকাশ করতে রাজী হননি। তখনই ঠিক করেছিলেন স্বাধীন প্রকাশনা সংস্থা তৈরি করবেন । করেও ছিলেন । মধ্য চল্লিশের এই খ্যাতনামা প্রকাশকের মনে পরকীয়ার জন্ম হয়েছিল। সুন্দরী তরুণীদের শরীরের বিনিময়ে তিনি তাদের লেখা প্রকাশ করতে গিয়ে সর্বস্বান্ত হলেন ।
তেমনই একজন তরুণী - ললন্তিকা । যেমন দুধে আলতায় গোলা গায়ের রং তেমনই সুশ্রী । তার যে কোন লেখা তিনি মন্ত্রমুগ্ধের মত প্রকাশ করেছেন । চুক্তি একটা হয়েছিল ঠিকই - যতদিন তার লেখা প্রকাশ হবে ততদিন তাকে তাঁর দেহোপজীবিনী সেজে থাকতে হবে । আর ভবিষ্যতে কোনদিন বিবাহের জন্য কোনরূপ আগ্রহ দেখানো যাবে না ।
ললন্তিকা সম্মতি দিয়েছিল । চোখে তখন তার লেখিকা হিসাবে নাম কামাবার লিপ্সা । উচাটন মনে ললন্তিকা রাজী হয়ে আরণ্যক বসুরায়ের একপ্রকার রক্ষিতা হয়েই জীবন কাটাতে হয়েছিল ।
বলা বাহুল্য, ললন্তিকার কোনরূপ সাহিত্য জ্ঞান ছিল না।
তথাপি তার অনেক বই মুদ্রিত হয়েছিল । কিন্তু সে বইয়ের কোন পাঠক ছিল না । ফলে সুপারফ্লপ লেখিকা হিসাবে সমাজে তার পরিচিত নাম হল ' চলন্তিকা ' ।
পরিচিত জনেরাও যখন তাকে 'চলন্তিকা' নাম ধরে ডাকতে শুরু করল তখন তার বোধোদয় হল । ততদিনে তার দু'তিনবার গর্ভপাত করিয়ে দেওয়া হয়েছে । অবশেষে অবসাদগ্রস্ত হয়ে সে একদিন বাসের চাকার তলায় নিজেকে সমর্পন করে আত্মাহুতি দিতে বাধ্য হয়েথে ।
অনেক অনুনয় বিনয় করেও আরণ্যক বসুরায়কে টলাতে পারেনি। অবশ্য সেই সুযোগ তার ছিল না । কারণ আরণ্যক বসুরায়ের সঙ্গে কনকলতা দেবীর অনেক আগেই বিবাহ হয়ে গিয়েছে । বসুরায় পত্নীর প্রতি অবিচার করেননি । আর পাপ পুণ্যের ভয় তাঁর ছিল না । কারণ চুক্তি অনুসারে ললন্তিকার দাবী ধোপে টেকেনি।
পুলিশ একটি আত্মহত্যার মামলা রুজু করে দায় শেষ করে। আরণ্যক বসুরায়ের সুনাম এবং অর্থের বলে পুলিশ তাঁকে জিজ্ঞাসাবাদের পন্থা পরিহার করেছিল ।
আরণ্যক বসুরায়ের নিকট প্রত্যাখ্যাত হয়ে ললন্তিকা ওনার বাড়িতে চলে যায় । কনকলতা দেবীর সঙ্গে আলাপ জমায় । ধীরে ধীরে তাঁর কীর্তি-কাহিনী ব্যক্ত করে।
কনকলতা তার কথায় পাত্তা দেননি । আরণ্যকের মত স্বনামধন্য পুরুষের গায়ে কলঙ্ক লেপনের জন্য ললন্তিকাকে তীব্র ভর্ৎসনা করেন । ক্রোধে অগ্নিশর্মা হয়ে ওঠে ললন্তিকা ।
বলে - আমার জীবন যে নষ্ট করেছে তাকে আমি ছাড়ব না । আমার সামনে মরে যাওয়া ছাড়া কোন বিকল্প নেই। তাই যাবার আগে তোমাকে অভিশাপ দিয়ে যাচ্ছি ; আমি যেরূপ অপঘাতে প্রাণ বিসর্জন দিতে চলেছি , ঠিক তেমনই ভাবে তোমাকেও মরতে হবে ।
ললন্তিকা চলে যায় । তবে কনকলতাকে অভিশাপ দিলেও আরণ্যক সম্বন্ধে কোন উক্তি করেনি ।
অভিশাপ ফলে গেল কয়েকদিন পরেই। তবে উল্টো হয়ে । আরণ্যক বসুরায় স্পণ্ডিলাইটিসে আক্রান্ত হলেন ।
অনেক চিকিৎসা করিয়ে, ফিজিও থেরাপী করিয়েও কোন লাভ হল না । শীঘ্রই তিনি শয্যাশায়ী হলেন । ধীরে ধীরে সমস্ত অঙ্গ প্রত্যঙ্গ আক্রান্ত হল । চলচ্ছক্তিহীন হয়ে পড়লেন তিনি । একসময় গলা জড়িয়ে এল । কথা জড়িয়ে গেল । ক্রমে কথা বলাও বন্ধ করে দিলেন।
কনকলতাকে এর পূর্বে বলেছিলে - আমি দু:খিত কনক। তোমাকে তোমার প্রাপ্য দিতে পারিনি। আসলে আমাদের নি:সন্তান থাকার দায় আমারই ।
আক্ষেপ করে কনকলতা বলেছিলেন - তোমার কেন হবে ? এই দুর্ভাগ্য শুধুই আমার । তুমি বরং আর একটা বিয়ে করে নাও । কথা দিলাম আমি কোন প্রতিবন্ধক হব না ।
- না না কনক ! এ কি বলছ তুমি ? দোষ তোমার নয়, আমার ।
কনকলতা বলেন - তাই কখনো হয়। আমিই বন্ধ্যা ।
আরণ্যক বলেন - আমার কথা শোনো কনক ! তিন তিনটে বছর পেরিয়ে গেলেও আমাদের ঘরে যখন কেউ এল না; লুকিয়ে ডাক্তারের কাছে পরীক্ষা করিয়েছিলাম ।
- কি পরীক্ষা ?
- সেমেন ।
কনকলতা হতবাক হয়ে গিয়েছিলেন ।
- কি বলছ যা তা ?
- হ্যাঁ কনক, ডাক্তারবাবু পরীক্ষা করে বলেছিলেন আমার বীর্য্যে স্পার্ম অত্যন্ত নগণ্য এবং যতটুকু আছে তা' এতই দুর্বল যে ডিম্বানুকে স্পর্শ করতে পারে না ।
কনকলতা প্রায় অজ্ঞান হয়েই যাচ্ছিলেন । কিন্তু স্বামীর অকপট কথায় আশ্বস্ত হয়েছিলেন এই ভেবে যে ললন্তিকা এমন এক জনের নামে অপবাদ দিয়েছে যে নি:সঙ্কোচে আপন দোষ স্বীকার করে নেয় ।
আরণ্যককে বলেছিলেন - সবার কপালে ছেলেপুলে জোটে না । সুস্থ থাকো এই আমার প্রার্থনা ।
সব মন পড়ছে আরণ্যক বসুরায়ের। এ টু জেড সব। ললন্তিকা, সীমা, কাজল, ইন্দ্রানী, দেবশ্রী এক এক করে সবার কথা । ললন্তিকা বলেছিল দু'তিনবার তাকে গর্ভ- পাত করাতে হয়েছে। মিথ্যে বলেছিল । আর সত্যিই যদি করিয়েও থাকে তবে অবশ্যই সে ছিল বারো ভোগ্যা ।
( ক্রমশ )

