ললন্তিকা ধারাবাহিক
ললন্তিকা ধারাবাহিক
পর্ব বিশ
ললন্তিকা আশায় আশায় থাকে কবে আরণ্যক তাকে প্রপোজ করেন । দিন যায় জলের মত গড়িয়ে। আরণ্যক থেকে যান আরণ্যকের মধ্যে । শরীরসর্বস্ব মানুষের ভেতরে তো ভালবাসা জন্মায় না ।
ললন্তিকা ভেবে দেখল এভাবে নিজেকে নি:শেষ করে দেওয়ার চেয়ে একবার ওকে বাজিয়ে নিলেই হয়। আজ এর একটা এসপার ওসপার হয়ে যাক।
অরবিন্দ সরখেলের মুখটা ভেসে উঠল তার চোখে। বেচারা ! শুধু উপেক্ষা নিয়ে পড়ে রইল । আর সেই উপেক্ষা তো সে-ই করেছে। ওর তো তেমন দোষ ছিল না।
স্ত্রীর সম্মান দিয়েছিল । তার স্বপ্নগুলো এত রঙীন কেন যে হল !
ফুটপাতের দোকানগুলো আগে যেমন ছিল আজও তেমনই অগোছালো হয়ে রয়েছে। ললন্তিকার মনে হল একটু সাজিয়ে গুছিয়ে রাখলে দোকানগুলোর চেহারাই বদলে যেত ।
ঠিক যেমন তার চেহারাটা এখন বদলে গেছে। রাস্তায় বেরোলে পাঁচটা লোক আগেও চেয়ে থাকত; এখনও থাকে, তবে একটু বেশি মাত্রায় । ওর মনে হয় লোকগুলো তাকে পেলে যেন নিজেদের ধন্য ভাবত ।
ইস্! এদের কেউ যদি তাকে ভালবাসত । উদাস নয়নে দোকানগুলোর দিকে চেয়ে দেখে ললন্তিকা।
অরবিন্দ না ? হ্যাঁ, ঠিক দেখেছি। অরবিন্দ । তার মামাতো দাদা কাম প্রাক্তন স্বামী ।
প্রাক্তন ! সত্যিই প্রাক্তন । ও নিজে ওকে প্রত্যাখ্যান করেছে। ভাবতে অবাক লাগে ছেলেটা কেমন যেন নিরুত্তাপ । তাকে সামনে দেখেও চিনতে পারছে না । কিম্বা হয়তো চিনলেও আর গ্রাহ্য করছে না ।
ললন্তিকার রাগ হল । ইচ্ছে হল ব্যাগ থেকে জলের বোতলটা দিয়ে ছুঁড়ে মারে ।
ললন্তিকা সেন । ডটার অফ লেট অনন্তমোহন সেন । মাধ্যমিকের এডমিট কার্ডে তাই লেখা আছে।
ললন্তিকা ভাবল মায়ের নাম কোথাও থাকে না কেন ! এডমিট বা সার্টফিকেটে লেট অনন্তমোহন সেন না থেকে যদি লেট শ্যামলী সেন থাকত - কি ক্ষতি হোত তা'তে।
একটা মোটরবাইক চাকা ঘষটে তার খুব কাছাকাছি এসে দাঁড়িয়ে গেল । চমকে উঠল ললন্তিকা । বাইকের চালকের মাথায় হেলমেট । মুখটা একেবারে বোঝা যায় না ।
- হারি আপ! উঠে পড় জলদি !
মোটরবাইকের চালক তাকে বলল ।
- কে আপনি ? আর আমি আপনার বাইকে উঠব কেন ?
- যেতে যেতে সব বলব । আগে উঠে পড় ।
- কিন্তু আমি তো আপনাকে চিনি না, জানি না। আপনার সঙ্গে যাব কেন ?
লোঅটি তখন গলা চড়িয়ে বলল - উঠতে তোমাকে হবেই। নইলে জোর করে --
ললন্তিকা ভয় পেয়ে গেল । কিন্তু সাহস দেখিয়ে বলল - আমি চিৎকার করব । পথের লোকজন জড়ো করে দেব।
বলে যেই চেঁচিয়ে উঠেছে লোকটা হেলমেট খুলে নিজের মুখটা দেখাল ।
- অরদা ! তুমি !
- হ্যাঁ আমি। কিন্তু তোমার অরদা নই । বরং বলতে পার তোমার প্রাক্তন পতিদেব ।
ললন্তিকা অবাক হয়ে গেল । এই তো একটু আগেই অরবিন্দকে দেখল একটা বইয়ের দোকানে বই বিক্রি করতে । সে হঠাৎ বাইকে এল কি করে ?
জিজ্ঞেস করল - তুমিই কি ওই বইয়ের দোকানে কাজ করছ ?
- কি আর করব ? পেট চালাতে হবে তো ! শুনেছি তুমি এখন ভালো রোজগার করছ ।
ললন্তিকা পাল্টা প্রশ্ন করল - তুমি আমাকে চিনতে পারলে কি ভাবে ? আমি তো প্লাস্টিক সার্জারি করিয়ে মুখের আদলটাই বদল করে ফেলেছি ।
অরবিন্দ হাসল - মেঘে ঢাকা চাঁদের হাসির মত ম্লান অথচ সে হাসি ললন্তিকার মনে হল সে হাসিতে কোন খাদ নেই।
অরবিন্দ বলল - দেখ, তোমার চলন বলন গড়ন ধরণ সবই আমার নখদর্পণে। এমনকি তোমির শরীরে কতগুলো তিল কোথায় কোথায় আছে আমি সভ দেখেছি। মিথ্যে যদি বলি তবে তুমি আয়নায় দেখে নিও তোমার ডানদিকের স্তনের নীচে একটা লাল জড়ুল আছে। তোমার মনে আছে কতবার আমি ওই জড়ুলটা নিপল ভেবে আলতো কামড় দিয়েছি ।
ললন্তিকা বলল - থাক, আর বলতে হবে না। এতদিন পর কুড়চিনামা খুলে কি লাভ ?
- লাভ লোকসানের কথা নয় । যা জানি তাই বললাম। সেদিনই বুঝে গিয়েছিলাম তুমি যেদিন আমার কথার জবাব না দিয়ে চলে গিয়েছিলে । তোমার চলার ধরণ দেখেই বুঝেছিলাম । তবু সিওর হতে চেয়েছিলাম তোমার গলা শুনে। তুমি কথা বলনি ।
ললন্তিকা হয়তো কৃতকর্মের জন্য লজ্জা পেল । মুখ নামিয়ে বলল - কোথায় যেতে বলছ ?
- মাকে রাজী করিয়েছি । মা তোমাকে বরণ করে নেবে বলেছে। আমি এখানেই একটা পুরানো মেসে থাকি আর ওই বই দোকানে কাজ করি। তুমি রাজী থাকলে আমি না হয় আবার ভাড়া বাড়িতে চলে যাব । তুমি তো দেশের বাড়ি যাবে না। তাই বলছি --
ললন্তিকার ভাবনায় ছেদ পড়ল । অরবিন্দ তবে এখনও ওকে ভুলতে পারেনি । এদিকে আরণ্যকের হাতছানি এড়ানো তার পক্ষে অসম্ভব । কিন্তু অরবিন্দের সাথে তর্কে না জড়িয়ে ঠাণ্ডা মাথায় বলল - আজ থাক। আজ আমার একটা বিশেষ কাজ আছে । কাল ঠিক এমনি সময়ে এই বই দোকানে তোমার সঙ্গে দেখা করব ।
অরবিন্দ সরখেল ললন্তিকার এই ছলনা ভালো লাগল না । কঠোর কন্ঠে বলল - তোমার কোন কথা শুনতে চাই না। তোমাকে আমার সাথে যেতেই হবে। আর আমি জানি ওই আরণ্যক বসুরায় তোমাকে কি ভাবে ব্যবহার করছে। আচ্ছা, তোমার এই প্লাস্টিক সার্জারির খরচ তো তিনিই দিয়েছেন ।
- হ্যাঁ ।
ললন্তিকা বলল।
- কিন্তু কেন ? কি দরকার ছিল এর ? আমি কি বুঝি না ভাবছ ? শোনো, তুমি ভুল পথে চলেছ। ওই আরণ্যক তোমার সর্বস্ব লুটে নিয়ে ছুঁড়ে ফেলে দেবে। তখন তোমার মরণ ছাড়া কোন গতি থাকবে না । তার চেয়ে আমার সঙ্গে চল; আমরা নতুন করে সংসার গড়ি ।
ললন্তিকা আশৈশব জেদী । আজও অরবিন্দকে ফিরিয়ে দিয়ে বলল - বললাম তো ! কাল তোমার সঙ্গে দেখা করব, তখন তুমি যা বলবে আমি করব ।
অরবিন্দ বাইক থেকে একরাশ ললন্তিকার সর্বাঙ্গ রাগে জ্বলতে থাকল । কিন্তু ওই যে নামজাদা লোকেদের কথার জবাব দিতে নেই তাই চুপচাপ সেখান থেকে বেরিয়ে গেলছেড়ে চলে গেল ।
ললন্তিকা হাঁটতে হাঁটতে অফিসের সামনে এসে দাঁড়াল।
চারিদিকে চোখ বুলিয়ে টুক করে ঢুকে গেল ভেতরে ।
আরণ্যক বসুরায় কিছু পূর্বেই এসে গেছেন । ললন্তিকাকে দেখে তাঁর প্রথম সওয়াল - কার সাথে কথা বলছিলে ?
এই রে ! জেনে ফেলেছে বা দেখে নিয়েছে ওদের । ললন্তিকার পিলে চমকে গেল ।
কথা বলতে গিয়ে কথা জড়িয়ে গেল । গলা ধরে এল । কোনমতে বলল - কার সাথে কথা বলছিলাম ? কারও সাথে না তো ! আমি তো ফুটপাত ধরে হেঁটে আসছি।
- সে তো আজ ! সেদিন ?
- কোন দিন বলুন তো ? আমার তো কিছু মনে পড়ছে না !
- ও , তবে মনে করিয়ে দিই ! তুমি যেদিন আমার টয়লেটে ঢুকেছিলে !
ললন্তিকা যেন আকাশ থেকে পড়ল । এ তো তাঁর জানার কথা নয় ! সে তো সন্তর্পণে ঢুকেছে , বেরিয়েছে । কাক পক্ষীও টের পায়নি , তথাপি ---
কন্ঠস্বর গম্ভীর করে আরণ্যক বললেন - তোমারই এক হমসকলকে দেখেছ , বল দেখনি?
ললন্তিকা চুপ থাকতে বাধ্য হল ।
আরণ্যক বললেন - আমি তোমাকে যে ভাবে দেখতে চেয়েছি ; তা স্মরণে রাখতেই তোমার মুখটা বদলে ফেলেছি। বাট সরি, তোমার চরিত্র বদলাতে পারিনি। তুমি আজ যার সাথে কথা বলছিলে আমি জানতে পেরেছি সে তোমার মামাতো দাদা । আর তার সাথে তোমার প্রেমের সম্পর্ক আছে । এমনকি বেশ কয়েকবার তোমাকে সেইজন্যই এবরশন করতে হয়েছিল । আমি তোমাকে এই মুহূর্তে ত্যাগ দিলাম । নীচে রিসেপশনে গিয়ে তোমার পাওনা গণ্ডা নিয়ে বিদেয় হও । আই নো লঙ্গার নিড ইউ ।
ললন্তিকার সর্বাঙ্গ রাগে জ্বলতে থাকল । কিন্তু ওই যে নামজাদা লোকেদের কথার জবাব দিতে নেই তাই চুপচাপ সেখান থেকে বেরিয়ে গেল ।
রিসেপশনে সাড়ে পাঁচ লক্ষ টাকার চেক হাতে নিয়ে মনে মনে প্রতিজ্ঞা করল আরণ্যকের চরম সর্বনাশ করবেই ।
( ক্রমশ )

